সাঁকোয় দাঁড়িয়ে

লেখক:

Sakoy-Dariya

ভগীরথ মিশ্র

‘জীবনে যারা শক্তপোক্ত ডাঙা খুঁজে-খুঁজে হয়রান হয়, তাদের একটিবারের জন্য ম্যাজেলানের কথা ভাবতেই হবে।’ ধীরার কোলে মাথা রেখে যেদিন ওকে ম্যাজেলানের গল্প শোনাল ঋষিণ, গল্পের অনুষঙ্গ হিসেবে যেদিন ওই কথাটা বলল, তারপর থেকেই কথাটা যখন-তখন ঘাই মারে ধীরার মনে।

ম্যাজেলান কেমন দেখতে সেটা ঠিক জানা নেই ধীরার। কেবল ঋষিণের মুখে গল্প শুনে এইটুকু জেনেছে, তিনি এক দুর্ধর্ষ নাবিক ছিলেন। সারাজীবন, সারাটা জীবন শক্তপোক্ত ডাঙা খুঁজে বেড়িয়েছেন প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে।

ধীরা মিত্র নাবিক নয় কোনো অর্থেই। সে বকুলতলার মেয়ে। তার কানের লতিতে পীরাঙ্গ স্যাকরার দুল ঝিকমিক করে। তার বুকে দোলে গিফ্ট হাউসের স্পেশাল পুঁতির মালা। সে হাওড়ার একটা মেয়েদের স্কুলে বায়োসায়েন্স পড়ায়। সেই সুবাদে তাকে বকুলতলা বাস স্টপেজে রোজ সকাল সাড়ে আটটায় দেখা যাবেই। ছুটিছাটার দিনেও।

তখন, উত্তীর্ণ প্রভাতের পবিত্র হাওয়ায়, তার সাদা খোলের ধবধবে শাড়ির আঁচল ফুরফুরিয়ে উড়তে থাকে। তার ফর্সা কপালে মাতামাতি করে দু-একটা দুরন্ত চুলের কুচি।

তখন তাকে দেখে মনেই হয় না, এই মেয়েটি, বকুলতলার এই ধীরা মিত্র, ডাঙা খুঁজতে বেরিয়েছে সাত সকালে। এবং এই মুহূর্তে তার দুচোখে একটি সুসজ্জিত ডাঙার স্বপ্ন উঁকিঝুঁকি মারছে।

 

সামনে দিগমেত্মর গায়ে চকমিলানো পাহাড়, বনভূমি, তুঁত রঙের গাছ-গাছালি, গাছে-গাছে সুমিষ্ট ফল, মিষ্টি জলের অফুরন্ত ঝরনা,
বনে-বনে সুন্দর-সুন্দর প্রাণী, পাখি…। ধীরার কল্পনায়, সে এক আশ্চর্য দ্বীপ… !

কিংবা ঝকঝকে চকমিলানো ঘরদোর, সামনে বাগান, লন, রান্নাঘরে অফুরন্ত খাবার, শোবার ঘরে অফুরন্ত সুখ-সম্ভোগ-ভবিষ্যৎ, সিঁদুর কৌটোয় অফুরন্ত সিঁদুর, জানালার ওপাশে আকাশটা ঝকঝকে নীল…। ধীরার কল্পনায়, সে এক বহু-আকাঙিক্ষত আশ্চর্য সংসার!

অথই সমুদ্র পেরিয়ে একচিলতে ডাঙা, কিংবা দুর্গম খোয়াই পেরিয়ে একচিলতে সংসার, যা নিয়েই ভাবুক না কেন, ধীরার ভাবনায় ইদানীং একটিবারের তরে ম্যাজেলান আসবেই।

 

এমন আকুলভাবে খুঁজলে পাওয়াও যায় বুঝি সবকিছু। ধীরা মিত্র ডাঙা পেয়েছে। ধীরার মনে হয়েছিল, বেশ শক্তপোক্ত ডাঙা। সেই সুবাদে বেশ কিছুকাল যাবৎ ঋষিণ সিন্হার মাথাটা নিজের শুভ্র কোলে চেপে ধরে ওর মুখ থেকে হরেক কিসিমের গল্প শুনত ধীরা। তার মধ্যে ওই ডাঙা খোঁজার গল্পটাও ছিল।

রাত তখন আন্দাজ আটটা। দেবু বোসের তিন কামরার ফ্ল্যাটখানাতে একটা মূর্তিমান বৈপরীত্যের সহাবস্থান। ঘরভর্তি
দামি-দামি জিনিস। স্টেরিও-টেপ-ক্যামেরা, ঘড়ি। বুক-সেলফে অজস্র দামি বই। আলনায় মূল্যবান পরিচ্ছদ। কিছু দুর্লভ ছবি। সব এলোমেলো ছড়ানো-ছিটানো।

মেঝেতে ধুলো। দেয়ালে, সিলিংয়ে, র‌্যাকে মাকড়সার ফাঁদ…। আর তেমনই একখানা ঘরের দেয়াল-ঘেঁষে পাতা সোফাটির ওপর ঝকঝকে, উপচেপড়া ধীরা মিত্রের কোলে ঢুলু-ঢুলু ঋষিণ।

ধীরা ওর মাথার কোঁকড়ানো চুলে নিঃশব্দে বিলি কাটছিল। আরামে-আয়েসে চোখ বুজে গুনগুনিয়ে সুর ভাজছিল ঋষিণ।
আধো-আধো গলায় জড়তা ছিল। জুতোসুদ্ধ পা-দুটো ঝুলছিল সোফা থেকে।

ওই মুহূর্তে ধীরার চাঁপার কলির মতো আঙুলগুলোকে ঠিক নৌকোর দাঁড়ের মতো লাগছিল।

ধীরা অল্প ঝুঁকে পড়ে দেখছিল ঋষিণকে। ঋষিণের মুখ। ওর পুঁতির মালা বারবার লাট খাচ্ছিল ঋষিণের কপালের ওপর।

ঋষিণও ধীরাকে দেখার চেষ্টা করছিল বারবার। কিন্তু ঝাপসা চোখে এবং শিথিল প্রত্যঙ্গ দিয়ে ধীরাকে বেশিক্ষণ ধরে রাখা যাচ্ছিল না চোখের ফ্রেমে।

একটু বাদে কোল থেকে মাথা তোলে ঋষিণ। ওইটুকু পরিশ্রমে ওর কপালের সব শিরা কেঁপে-কেঁপে প্রকট হয়ে ওঠে। রক্ত জমে সারামুখে।

– কী হলা? ধীরা ব্যাকুল গলায় শুধোয়।

– একটিবার টয়লেটে যাব। অস্ফুট গলায় বায়না ধরে ঋষিণ।

– না -। প্রায় আর্তনাদ করে ওঠে ধীরা। ঋষিণের মাথাটা কোলের ওপর চেপে ধরে আবেগে। – আজ আর টয়লেটে যাবে না তুমি।

এখন ঋষিণের গায়ে কোনো শক্তি নেই। মনেও না। অসহায় ভঙ্গিতে সে চোখ মুদে পড়ে থাকে ধীরার কোলে।

ঋষিণের চুলে বিলি কাটতে-কাটতে ধীরার ভীষণ অস্থিরতাটা এক সময় শান্ত হয়ে আসে।

ভেজা গলায় বলে, কত বড়ো ডাক্তার তুমি! কতো ব্রিলিয়্যান্ট! এ তুমি কোন পথে চলেছ দিন-দিন?

ঋষিণের ঠোঁটের কোণে একচিলতে মিহি হাসি উঁকি মারে এবং তাই দেখে অভিমানে ভারি হয়ে আসে ধীরার গলা।

চাপা গলায় বলে, তোমার কা-কারখানা দেখলে ভীষণ ভয় করে আজকাল। কোনদিন যে কী করে বসো!

ঋষিণের ঠোঁটের কোনায় হাসিটা আরো গাঢ় ও স্থায়ী হয়।

আধবোজা চোখে ধীরার দিকে তাকিয়ে বলে, আমারও সেই ভয় ছিল।

– এখন নেই কেন?

– বা রে! এখন পাশে আমার ধীরা রয়েছে যে। ভয় কী? এখন আমি নিশ্চিমেত্ম বিষ অবধি পান করতে পারি চুমুকে-চুমুকে।

বলতে-বলতে পুনরায় অস্থির হয়ে ওঠে ঋষিণ, দেবু শালা এতক্ষণ কী করছে বাইরে? শালার কোনো কা-জ্ঞান নেই।

ধীরা ঋষিণের মুখে হাত-চাপা দেয় আলতো।

কাঁপা-কাঁপা আঙুল দিয়ে ধীরার হাতখানা সরিয়ে দেয় ঋষিণ, গল্পটা শেষ করি।

– কোন গল্প?

– ওই যে, নাবিক ম্যাজেলানের গল্পটা। খুব কাঁপা-কাঁপা গলায় শুরম্ন করে ঋষিণ।

তাই তো! ধীরার মনে পড়ে যায়। যেন এতক্ষণ ঋষিণকে নিয়ে, ওর বেয়াড়া আবদারটা নিয়ে কী এক ঘোরের মধ্যে ছিল সে। এইমাত্র হুঁশে ফিরল। তাই তো! ধীরার কোলে মাথা রেখে এতক্ষণ তো ম্যাজেলানের গল্পই শোনাচ্ছিল ঋষিণ!

ধীরা আলতো গলায় শুধোয়, তারপর?

– তারপর যেতে যে-তে যে-তে… ম্যাজেলান একদিন দেখলেন সমুদ্রের বুকে একটি কালো বিন্দু!

ধীরে-ধীরে বিন্দুটা আকারে বাড়তে লাগল এবং খানিক বাদে নৌকোর সবাই বুঝল, বিন্দু নয়, ডাঙা!

চতুর্দিকে কেবল রাশি-রাশি, সীমাহীন জল দেখে-দেখে বিরক্ত, ভীত, হতাশ নাবিকরা কতকাল বাদে দেখল, দশদিক জুড়ে অতলান্ত জলের রাশির মধ্যে একটি বিন্দুর মতো ডাঙা! আহ্ ডাঙা!! নাবিকের দল রোমাঞ্চিত হলো। উত্তেজিত, উচ্ছ্বসিত, উন্মত্ত। সেই উচ্ছ্বাসে, উন্মত্ততায় নৌকো কাত হয়ে ডুবে যায় আর কি!

ডুবন্ত মানুষ খড়কুটো আঁকড়ে ধরে। ম্যাজেলান নৌকো নিয়ে এগিয়ে গেলেন বিন্দুটার দিকে।

একটা ধূসর রঙের ন্যাড়া মাঠ। গাছপালা কিছুই নেই। বহু কালের শ্যাওলাজমা একটা বিশাল ব্যাসল্টের চাঙড় যেন। তাই সই। মন্দের ভালো। এতকাল বাদে একচিলতে ডাঙা তো!

তরতরিয়ে ওই ডাঙায় নেবে পড়ে মাঝি-মালস্না-নাবিকেরা।

আহ্! ডাঙা!

দেড় মাস অবিরাম অবিশ্রান্ত জল দেখে ক্লান্ত ম্যাজেলানও একখানা ছোট্ট ডাঙা পেয়ে শিশুর মতো পাগল হয়ে উঠলেন। মাঝি-মালস্নারাও পাগলের মতো ছোটাছুটি জুড়ে দিলো।

ম্যাজেলান তখন দ্বীপটার জন্য একটা জুতসই নাম খুঁজছিলেন। মনের আয়নায় বারবার ফুটে উঠছিল নিজের প্রিয়তমার নাম। অনেক

লক্ষ্যহীন, উদ্ভ্রান্ত, অনিশ্চিত যাত্রাপথের ক্লামিত্মর শেষে ম্যাজেলানের স্নিগ্ধ নিশ্চিন্ত আশ্রয়!

ঠিক সেই মুহূর্তে অল্প নড়ে চলে উঠল দ্বীপটা। ম্যাজেলান চমকে উঠলেন। পায়ের তলায় দুরম্ন-দুরম্ন, গুরম্ন-গুরম্ন আওয়াজ।

মাঝি-মালস্নারা চটপট উঠে পড়ল নৌকোয়। পরমুহূর্তেই দ্বীপখানা টুপ করে ডুবে গেল জলের তলায়।

বলতে-বলতে ঋষিণ হাসে। ফাঁকা, ফাঁপা গোছের হাসি। কোনো গভীরতা নেই ওই হাসিতে।

ধীরা অবাক-বিস্ময়ে শুনছিল। শুনতে-শুনতে বুঁদ হয়ে গিয়েছিল সে। সহসা গল্পটা দুম করে শেষ করে দিলো ঋষিণ। একটা কাচের আয়না যেন হাতুড়ির একটি নির্মম আঘাতে ঝনঝনিয়ে ভেঙে পড়ল। কাচগুলো ছড়িয়ে পড়ল মেঝেতে।

আর তাতে করে ধীরার মধ্যেকার ঘোরটাও ঝনঝনিয়ে ভেঙে যায় বুঝি।

ঋষিণের প্রতি ক্ষোভে ফেটে পড়ে সে। প্রায় ঝগড়া করার ভঙ্গিতে কলকলিয়ে বলে ওঠে, যাহ্। কী যে বল! আসত্ম একটা দ্বীপ, চোখের পলকে টুপ করে ডুবে গেল? তাই কখনো হয়? ডুবে গেলেই হলো?

ধীরার মুখের দিকে ত্যারচা তাকিয়ে মৃদু হাসছিল ঋষিণ। ঢুলুঢুলু চোখে বলে, দ্বীপ নয়। তিমির পিঠ ছিল ওটা।

ঋষিণের শেষ কথাটায় বেজায় চমকে ওঠে ধীরা। বলো কি! একটা তিমি মাছের পিঠ! ওটাকেই একটা দ্বীপ বলে ভুল করেছিল ম্যাজেলান? নৌকোর সববাই? যাহ্, তাই আবার হয়? তিমির পিঠ কখনো -।

বলতে-বলতে একসময় নিজের অজামেত্মই থেমে যায় ধীরা। ঋষিণের মুখম-লে পাহাড়প্রমাণ প্রত্যয় দেখে থেমে যেতে বাধ্য হয়। না, ঋষিণের চোখমুখ দেখে মনে হচ্ছে, তিমির পিঠই ছিল ওটা।

ততক্ষণে ধীরার মুখম-ল জুড়ে রাজ্যের আশঙ্কা জমেছে। হতাশ গলায় বলে, এ – মা – ! তিমির পিঠ ছিল ওটা? ইস, ওই পিঠে আর একটুক্ষণ থিতু হলেই তো নৌকোর সববাইয়ের সলিল-সমাধি হতো! ইস্!

বলতে-বলতে কতকিছু ভাবতে থাকে ধীরা। ভাবতে-ভাবতে উদাস হয়ে যায়। প্রায় বাহ্যজ্ঞান হারিয়ে ফেলে। সমসত্ম ঘরটা, ঘরের মধ্যেকার তাবৎ আসবাব, মাথার ওপর ঘুরন্ত পাখা, কোলে শুয়ে থাকা ঋষিণ… সবকিছুই তার চেতনার অগোচরে চলে যায়।

একসময় ঋষিণের মাথাটা সাবধানে কোল থেকে নামিয়ে রেখে দেয় সোফার ওপর।

– ইস্, ঘরটাকে কী করে রেখেছে দেবুদা! বলতে-বলতে দেবুর অবিন্যসত্ম ফ্ল্যাটটাকে গোছাতে শুরম্ন করে ধীরা।

সোফায় শুয়ে দৃশ্যটা ফ্যালফ্যাল চোখে দেখতে থাকে ঋষিণ।

 

দুই

দেবু বোস ফিরল।

সাদা মাখনজিনের বেলবটস। গায়ে সোনালি কালোয় জংলা প্রিন্টের পাঞ্জাবি। বাঁ-হাতে জ্বলন্ত ডানহিল। ডান হাতে ঝকঝকে টিফিন ক্যারিয়ার।

ওকে দেখে ধীরা লজ্জা পায়। হাতের ডাস্টারটি যথাস্থানে রেখে ধীরে-ধীরে ফিরে আসে সোফার কাছে। ঋষিণের মাথাটা পুনরায় তুলে নেয় কোলে।

ঋষিণ অসহিষ্ণু গলায় বলে ওঠে, কী রে শালা, এই তোর ফাইভ মিনিটস?

দেবু প্রশ্রয়ের হাসি হাসে, কষা চিকেন ছিল না। বানিয়ে নিয়ে এলাম।

– বেশ করলে। এবার একটা সিগারেট ছাড়ো।

টিফিন ক্যারিয়ারটা টেবিলের ওপর রেখে ঋষিণের দিকে এগিয়ে যায় দেবু। আসতে-আসতে ধীরার চোখের দিকে তাকায়।

ধীরার চোখে প্রচুর মমতা ছিল। দেবু দেখতে পায়।

হাঁটু গেড়ে সোফার সামনে বসে একটা ডানহিল ঋষিণের মুখে গুঁজে দেয় দেবু। লাইটার জ্বালিয়ে সাবধানে এগিয়ে দেয়।

ঋষিণ সিগারেটটা ধরাচ্ছিল। দেবু সেই ফাঁকে ঋষিণের মাথাসহ চারপাশের সাদা শাড়ির মোড়কে ঢাকা জমিটার ওপর আলতো চোখ চারিয়ে নেয়। সাদা ধবধবে টাঙ্গাইলের আড়ালে ধীরার পুষ্ট জানু,… ভারী নিতম্ব… শাড়ির ভাঁজে-ভাঁজে ঠাসবুনোট ভুঁই। ফিনফিনে শাড়ির ওপাশে মোহময় মায়াবী নাভি,… পেট…। ঋষিণের কপালের ওপর সরম্ন তুলতুলে পাঁচটি আঙুল। কমনীয় হাতের পাতা। পুষ্ট কবজি। নিটোল হাত।

ঝপ করে লাইটার নিভিয়ে উঠে দাঁড়ায় দেবু। ডিস্কে একখানা চোখা মিউজিক চালায়। তারপর উলটো দিকের সিঙ্গল সোফায় ধপ করে বসে পড়ে।

বসে-বসে সারাঘরে নজর চালিয়ে একসময় দেবুর দৃষ্টি আবার ধীরার ওপর এসে আটকে যায়।

ধীরা মুচকি-মুচকি হাসছিল। বলে, বাববা! কী করে রেখেছিলেন ঘরখানা! এখন দেখুন তো, কেমন লাগছে! যেমন সাজিয়ে দিলাম, তেমনি যেন থাকে।

ধীরার কোলে শুয়ে-শুয়ে বোকা-বোকা হাসছিল ঋষিণ।

দেবু দু-চোখে ঈর্ষা ফুটিয়ে বলে, শালা কপাল করে এসেছিলি বটে!

সে-কথায় কাচের মতো ঝনঝনিয়ে হাসতে থাকে ধীরা। দাঁতের ফাঁকে ঠোঁট চেপে বলে, আপনার কপালখানাও কি এমন ছোট দেবুদা? বেশ বড়োসড়ো মোলায়েম কপাল তো। কেবল ইচ্ছেটা করলেই হয়।

দেবু একটু প্রগলভ হয়। বলে, হয় কি? সবাই কি আর কেবল ইচ্ছে করলেই এমনি একখানা কোল পায়?

ধীরা ভীষণ লজ্জা পায়। শিরশিরিয়ে ওঠে ওর সারাশরীর। কথা ঘোরায় সে। বলে, না, না, সত্যি করে বলুন না, রাজি? দেখবেন, আমি অল্প সময়ের মধ্যেই আপনার জন্য ঠিক জোগাড় করে ফেলব এমন একটি মেয়ে, যাকে দেখামাত্র আপনার মনে হবে, সারাজীবন ওর কোলে মাথা রেখে শুয়ে থাকি।

ধীরার কথাগুলো শুনতে-শুনতে সহসা অন্যমনস্ক হয়ে যায় দেবু। বিড়বিড় করে বলে, আপনিও যেমন! দুনিয়ার সব কোলেই কি অতখানি আরাম থাকে? কিংবা সব হাতের আঙুলে-আঙুলে কি অতখানি রস চোয়ায়?

ধীরার সারাশরীর পুনরায় শিরশিরিয়ে ওঠে। আবার কথা ঘোরায় সে। বলে, ম্যাজেলানের গল্প জানেন দেবুদা? শুনেছেন ওর কথা? ওই যে, মাঝসমুদ্রে ডাঙা ভেবে একটা আসত্ম তিমির পিঠের ওপর নেমে পড়েছিল!

সে-কথার জবাব দেয় না দেবু। বলে, তোমার ওই উপসর্গটা গেছে?

কিছুদিন যাবৎ ধীরার মাথাটা যখন-তখন ধরছিল। ওই সময়টায় মাথা তুলতেই পারছিল না ও। দেখেশুনে দেবু ওকে একটা ওষুধ প্রেসক্রাইব করেছিল মাসখানেক আগে।

উপস্থিত দেবুর কথার জবাব না দিয়ে ওকে পালটা চার্জ করে বসে ধীরা, আপনি কেমন ডাক্তার, মশাই? কী প্রেসক্রিপসন করলেন? অসুখ তো সারলই না।

দেবু অল্প সিরিয়াস হলো, সারেনি?

লম্বা করে মাথা দোলায় ধীরা, উঁহুঁ। একটুও নয়। বরং ইদানীং ওটা বেড়েছে।

দেবু চিমত্মায় পড়ে যায়, ওষুধটা ফুল কোর্স খেয়েছিলে?

দেবুর মুখের দিকে অল্পক্ষণ ভারি রহস্যময় ভঙ্গিতে তাকিয়ে থাকে ধীরা। তারপর আবার মাথা দোলায়, উঁহুঁ।

 

– সে কী? খাওনি? দেবুর চোখ বড়-বড় হলো।

ধীরা খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে।

তাই দেখে দেবুর ফর্সা মুখ লাল হয়ে ওঠে অকারণে। চোখেমুখে কপট রাগ। বলে, আমি যদি আর লাইফে কিছু প্রেসক্রাইব করি তোমায়।

সে-কথায় হা-হা করে হেসে ওঠে ঋষিণ। হাসির দমকে কাঁপতে-কাঁপতে উঠে বসতে চায় সোফার ওপর।

– সবের্বানাশ। চোখেমুখে কপট আশঙ্কা ফুটিয়ে দু-কানের ওপর আলতো হাত ছোঁয়ায় ধীরা, তাহলে আমার কী হবে?

– ডোন্ট ও’রি। ধীরে-ধীরে উঠে বসে ঋষিণ, আমিই চিকিৎসা করব তোমার। ও শালা কী জানে? এমবিবিএসে আমার চেয়ে পঞ্চাশ নম্বর কম পেয়েছিল। আজ না হয় খুব জমিয়েছে পসার। আর, আমি না হয় -।

বলতে-বলতে একসময় মেঝের ওপর দাঁড়ায় ঋষিণ। পরমুহূর্তে, ধীরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই টলোমলো পায়ে এগিয়ে যায় টয়লেটের দিকে। ধীরা বাধা দেওয়ার অবধি সময় পায় না। তার আগেই টুক করে টয়লেটে ঢুকে পড়ে দরজাটা ঝপ করে বন্ধ করে দেয় ঋষিণ। বাকরম্নদ্ধ ধীরা দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে অসহায় চোখে বন্ধ দরজার গায়ে আঁকা ডিজাইনগুলি দেখতে থাকে।

ধীরার ইচ্ছা করছিল টয়লেটের দরজায় ধাক্কা মেরে-মেরে অস্থির করে তোলে ঋষিণকে। কিন্তু দেবুর সামনে ওই অসহায় আর্তিটুকু প্রকাশ করতে ভীষণ সংকোচ হয়।

একসময় ধীরা পুনরায় সোফায় ফিরে আসে। সোফার ওপর দু-পা মুড়ে বসে। বসে-বসে, ডানদিকে অল্প হেলে, শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে টয়লেটের দরজাটার দিকে।

দেবুর মুখও থমথমে। মনের উদ্বেগটাকে যথাসম্ভব চেপে রেখে মৃদু গলায় শুধোয়, হ্যাবিটটা ইদানীং কমেছে, না বেড়েছে?

– বেড়েছে। বলতে-বলতে স্পষ্টতই কেঁপে ওঠে ধীরার গলার স্বর।

উঠে দাঁড়ায় দেবু। পায়ে-পায়ে এগিয়ে যায় জানালার দিকে। চুপটি করে দাঁড়িয়ে থাকে জানালার গ্রিলে হাত ছুঁইয়ে। শূন্যদৃষ্টি বিঁধিয়ে দেয় বাইরের অন্ধকারের বুকে।

একটু বাদে বিড়বিড় করে বলে, টয়লেটে ঢোকার দরকার কী? এখানেই তো নিতে পারে।

– সবার সামনে কী যেন ওর হয়। নির্জন জায়গা খোঁজে।

– কিন্তু কেন অমন করে ও? ওর দুঃখটা কী?

এমন প্রশ্নের উত্তর জানা নেই ধীরার। একটা সুস্থ মানুষ কোন রহস্যময় কারণে তিলে-তিলে বিষের কবলে পড়ে, সে এক জটিল মনসত্মত্ত্ব। হাজার শুধিয়েও একটা দুর্বোধ্য হাসি ছাড়া কিছুই মেলেনি ঋষিণের কাছ থেকে।

দেবু ফিসফিসিয়ে বলে, জানো তো, মরফিয়ার নেশা বড় ভয়ংকর। একটা সুস্থ মানুষকে তিলে-তিলে গিলে ফেলে। একেবারে পঙ্গু করে দেয়।

সে-কথায় ধীরার পায়ের তলার মাটি সড়সড় করে কেঁপে ওঠে।

ছেলেবেলায় ভীষণ ডানপিটে ছিল ধীরা। চোখেমুখে খই ফুটত অবিরাম। চঞ্চল পায়ে ঘুরে বেড়াত সারা বকুলতলা এলাকা। বন্ধুদের সঙ্গে কিংবা একা-একা।

গাঙ্গুলী বাঁধের ওপর ঘুরতে-ঘুরতে একদিন বাঁধের তলায় একটা ছোট্ট সুড়ঙ্গ আবিষ্কার করেছিল ধীরা। ক্যানেলের জল ঝিরঝির করে বইছিল ওই সুড়ঙ্গ দিয়ে। গল্পের বইতে পড়া সেই ছোট্ট ছেলেটির কথা চকিতে মনে হয়েছিল ধীরার। সারারাত সুড়ঙ্গে হাত চেপে দাঁড়িয়েছিল ছেলেটা।

ধীরা কিন্তু ওসব না করে দাঁড়িয়ে ছিল বাঁধের ওপর। ধীরে-ধীরে তার পায়ের তলায় সুড়ঙ্গটা আকারে বাড়তে লাগল…। ধীরা কল্পনা করল, সুড়ঙ্গটা আকারে বেড়ে-বেড়ে একটা জলস্রোত হবে। ওপরটা তখন ঠিক একটা সাঁকোর মতো।

কল্পনায় একটা সাঁকোর ছবি ধীরার মনে তোলপাড় তুলেছিল সেই কিশোরী বয়সে। সাঁকোটা ভেঙে পড়ার আগে এক লাফে বাঁধের অন্যপ্রামেত্ম চলে যাওয়ার কথা ভেবেছিল সে।

আজ এতদিন বাদে আবার একটা সাঁকোর ওপর দাঁড়িয়ে সে গভীর ভাবনায় মগ্ন।

তিন

বকুলতলা যাওয়ার শেষ বাসে চড়ে কোণের দিকের একখানা সিটে বসেছে ধীরা। ছুটন্ত বাসের জানালা দিয়ে দামাল হাওয়া আছড়ে পড়ছে ওর সারামুখে।

খানিক আগে ঋষিণের টলোমলো শরীরখানা ওর ফ্ল্যাটে শুইয়ে দিয়ে এসেছে। দেবু এসেছিল বাসস্ট্যান্ড অবধি। দুজনে অনেকক্ষণ পাশাপাশি হেঁটেছিল চুপচাপ। দেবুর সোনালি জংলা প্রিন্টের পাঞ্জাবি রাতের অনুজ্জ্বল আলোয় মায়াময় লাগছিল।

বাইরে কালচে রাত। আঁধারে ডুবে থাকা গাঁ-গঞ্জ, মাঠঘাট, গাছ-গাছালি,… এখানে-ওখানে মিটিমিটি আলোর ফুটকি…। আকাশে অসংখ্য তারার খই। তার তলায় পৃথিবী শুয়ে রয়েছে ঋষিণের মতো চওড়া ছাতি বিছিয়ে।

বাসের মধ্যে চোখ বুজে বসে থাকতে-থাকতে সহসা ধীরার মনে হলো, পায়ের কাছে শক্ত জমিটার তলায় একখানা সুড়ঙ্গ হয়েছে। পলকে-পলকে আকারে বেড়ে যাচ্ছে ওটা।

ধীরা পায়ের তলা থেকে চোখ সরিয়ে চোখ বুজল। দেখতে পেল, ওর পায়ের তলায় কালো ঘোমটায় মুখ ঢেকে শুয়ে রয়েছে একটা মাঠ। ধীরার অতীতের মতোই ঝাপসা টলোমলো।

বিতৃষ্ণা। এক গভীর বিতৃষ্ণা সেই মাঠের খাঁজে-খাঁজে।

সামনে একটা শক্তপোক্ত মাঠ। সোনালি জংলা প্রিন্টের জমিন বিসত্মৃত। উজ্জ্বল।

পায়ের তলায় সুড়ঙ্গটা বেড়ে এখন একটা সাঁকো।

ওই সাঁকোর ওপর দাঁড়িয়ে আপাতত দম নিচ্ছে ধীরা। হাঁফাচ্ছে। হাঁফাতে-হাঁফাতে একটা সোনালি জংলা প্রিন্টের জমি দেখতে পাচ্ছে সামনে। জমিটা এস্কেলেটরের মতো এগিয়ে আসছে ওর দিকে। এগিয়ে আসছে…।

সাঁকোটাও ছবির মতো নিখুঁত হচ্ছে আকারে। ধসে পড়তে এখনো খানিক দেরি।

একটা অস্থায়ী সাঁকোর ওপর দাঁড়িয়ে আকাশ-পাতাল ভাবতে থাকে ধীরা।

সাঁকোটা যে-কোনো মুহূর্তে ধসে পড়বে। তার আগে, আর তিলমাত্র দেরি না করে, এক লাফে ওই সোনালি ডাঙায় চলে যাওয়ার কথাটা নিমেষের তরে উঁকি মারে ধীরার মনে।