সাহিত্যের মহোৎসব

লেখক:

সুমনকুমার দাশ

 

উপমহাদেশের প্রখ্যাত গণসংগীতশিল্পী হেমাঙ্গ বিশ^াস (১৯১২-৮৭) তাঁর আত্মজীবনী উজান গাঙ বাইয়া বইয়ে সিলেটে অনুষ্ঠিত একটি সাহিত্য সম্মেলনের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে : ‘১৯৪৩-৪৬ সালের মধ্যে প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘের আমন্ত্রণে পরপর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় সিলেটে আসেন। তাঁদের কেন্দ্র করে প্রগতি সাহিত্য সম্মেলনগুলিতে সিলেট শহরে যে বিরাট সমাবেশ ঘটেছিল তাতে তাঁরা প্রচ- উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত হয়ে কলকাতায় ফিরে যান।’ তবে এ-ধরনের বড়মাপের গুণী লেখকের উপস্থিতিতে এরপর সিলেটে আর কোনো সাহিত্য সম্মেলন হয়নি।

সাত দশক পর ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দে এসে সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতিবিষয়ক পত্রিকা কালি ও কলমের উদ্যোগে প্রগতি সাহিত্য সম্মেলনের মতোই প্রকৃতপক্ষে স্মৃতিচারণযোগ্য আরেকটি বড় সাহিত্য সম্মেলন হয়ে গেল সিলেটে, যেখানে বাংলাদেশ, ভারত ও নেপাল – এই তিন দেশের প্রখ্যাত লেখকরা অংশ নিয়েছেন। গত ২৪ থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত তিন দিনব্যাপী এ-আয়োজনে লেখকরা অংশ নিয়ে চিত্রকলা, নাটক, কথাসাহিত্য, চলচ্চিত্র, কবিতা, লোকসাহিত্য এবং সমকালীন বাংলা সাহিত্যের বিবর্তনসহ নানা বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ মতামত রাখেন।

সিলেট  নগারীর মাছিমপুর এলাকার আবুল মাল আবদুল মুহিত ক্রীড়া কমপ্লেক্সে গত ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩ মার্চ পর্যন্ত বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ‘মানবিক সাধনায় বেঙ্গল সংস্কৃতি উৎসব’ অনুষ্ঠিত হয়, সেখানেই তিন দিনব্যাপী ‘কালি ও কলম সাহিত্য সম্মেলন’ অনুষ্ঠিত হয়। আয়োজকদের উদ্যোগে সিলেটেরই কৃতী সন্তান সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলীর নামে ক্রীড়া কমপ্লেক্সের ভেতর অস্থায়ীভাবে একটি মঞ্চ তৈরি করা হয়। সে-মঞ্চে ২৪ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ১০টায় ছিল সাহিত্য সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। এ-পর্বে সভাপতিত্ব করেন প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। সৃজন ও স্বরূপের সন্ধানে – এই দৃষ্টিভঙ্গি ও চেতনার আলোকে শুরু হয় সাহিত্য সম্মেলন।

উদ্বোধনী পর্বে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন বাংলাসাহিত্যের বরেণ্য কথাসাহিত্যিক ও ছোটগল্পকার হাসান আজিজুল হক, ভারতের প্রাবন্ধিক অমিয় দেব, বিশিষ্ট মঞ্চ-অভিনেত্রী ও নাট্যকার শাঁওলী মিত্র এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক প্রাবন্ধিক-গবেষক বেগম আকতার কামাল। সবশেষে ধন্যবাদ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে বক্তব্য রাখেন কালি ও কলম-সম্পাদক আবুল হাসনাত। উদ্বোধনী পর্বে বক্তারা ঢাকার বাইরে আন্তর্জাতিক মানের এরকম বড় পরিসরে একটি সাহিত্য সম্মেলন করায় আয়োজকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, এ সাহিত্য সম্মেলনের মাধ্যমে তিন দেশের সমকালীন সাহিত্যের রূপ-রূপান্তর সম্পর্কে লেখক-শ্রোতারা ভালো একটি ধারণা পাবেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পরপর ‘সমকালীন বাংলা সাহিত্যের রূপরেখা ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। বিশিষ্ট কবি আসাদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে এ-অধিবেশনে প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক মূল বক্তার বক্তব্য রাখেন। এ-পর্বে আলোচক ছিলেন লেখক-অনুবাদক সুরেশরঞ্জন বসাক ও কলকাতার লেখক অনিতা অগ্নিহোত্রী। এরপরই ‘সমাজবাস্তবতা ও বাংলাদেশের সাহিত্য’ শীর্ষক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এ-পর্বে মূল বক্তা ছিলেন বিশিষ্ট গবেষক-প্রাবন্ধিক বেগম আকতার কামাল। ভারতের বিশিষ্ট

সাহিত্যিক অমিয় দেব এতে সভাপতিত্ব করেন। আলোচক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গবেষক-প্রাবন্ধিক বিশ্বজিৎ ঘোষ ও কথাসাহিত্যিক আহমাদ মোস্তফা কামাল।

প্রথম দিনের সাহিত্য সম্মেলনের তৃতীয় অধিবেশনটি ছিল ‘সাহিত্যে ঐতিহ্যচেতনা ও স্বরূপসন্ধান’ শীর্ষক। এ-অধিবেশনে মূল বক্তা ছিলেন ভারতের আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য, বিশিষ্ট কবি-প্রাবন্ধিক-তাত্ত্বিক ড. তপোধীর ভট্টাচার্য। সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক সনৎকুমার সাহা। আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট কবি-অনুবাদক-প্রাবন্ধিক সাজ্জাদ শরিফ, কথাসাহিত্যিক স্বকৃত নোমান ও ভারতের গবেষক সৌমেন ভারতীয়া। প্রথম দিনের চতুর্থ এবং শেষ অধিবেশন ছিল ‘সাহিত্যে নারীজীবন’ শীর্ষক। এ-অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক ওয়াসি আহমেদ। মূল বক্তা ছিলেন কবি রুবী রহমান। আলোচক ছিলেন কলকাতার কবি মন্দাক্রান্তা সেন, লেখক অশোক মুখোপাধ্যায় ও কথাসাহিত্যিক শাহীন আখতার।

দ্বিতীয় দিন সম্মেলন শুরু হয় যথারীতি সকাল সাড়ে ১০টায়। প্রথম দিনের সম্মেলনে বাংলাদেশ ও ভারতের কবি-কথাসাহিত্যিক-প্রাবন্ধিকেরা উপস্থিত ছিলেন, দ্বিতীয় দিনে এসে সে-তালিকায় সংযুক্ত হন নেপালের কবি-সাহিত্যিকেরাও। সাহিত্যের এ-আয়োজনে তিন দেশের লেখকদের মিলনমেলা উপভোগ করার পাশাপাশি তাঁদের বক্তব্য শুনতে ওইদিন হাজারো সাহিত্যানুরাগীর ভিড় ছিল লক্ষণীয়। তিন দেশের সাহিত্যিকদের অংশগ্রহণে প্রাণবন্ত এক সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

দ্বিতীয় দিনের শুরুতেই ছিল সৈয়দ শামসুল হক স্মারক অধিবেশন। এ-অধিবেশনের শিরোনাম ছিল ‘ষাটের দশক : তখনকার গল্প এখনকার স্মৃতি’। এটি ছিল সম্মেলনের ষষ্ঠ অধিবেশন। সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং দেশের জনপ্রিয় লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবালের সভাপতিত্বে এতে মূল বক্তা ছিলেন ষাটের দশকের অন্যতম প্রধান কথাসাহিত্যিক জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত। আলোচকের বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট লেখক সুব্রত বড়–য়া, প্রাবন্ধিক-কলাম লেখক আবুল মোমেন ও কথাসাহিত্যিক প্রশান্ত মৃধা। এ-পর্বে কথাসাহিত্যিক জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত ষাটের দশকের লেখকদের লেখালেখির শুরুর ইতিহাস থেকে শুরু করে তাঁদের সৃষ্টিকর্ম সম্পর্কে বিস্তৃত আলোচনা করেন। আলোচকরাও ষাটের দশকের লেখকদের সম্পর্কে নতুন নতুন তথ্য উপস্থাপন করে অধিবেশনটিকে প্রাণবন্ত করে রেখেছিলেন।

‘কবিতার ভুবনে বিরোধাভাস’ শীর্ষক সপ্তম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন সাহিত্য-সমালোচক ও অনুবাদক কায়সার হক। আলোচক ছিলেন প্রাবন্ধিক আবুল মোমেন, ভারতের বিশিষ্ট গবেষক গঙ্গাপ্রসাদ বিমল ও কলকাতার পাঠকপ্রিয় কবি মন্দাক্রান্তা সেন। এরপর ‘অন্য দেশে অন্য জীবন প্রবাসচিত্র’ শীর্ষক অধিবেশনে অনুবাদক কায়সার হকের সভাপতিত্বে মূল বক্তার বক্তব্য রাখেন ভারতের বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক অমিয় দেব। আলোচকের বক্তব্য রাখেন ভারতের বিশিষ্ট লেখক আশিস সান্যাল, কবি শতরূপা সান্যাল ও নেপালের বিশিষ্ট গল্পকার মহেশ পদওয়াল।

দ্বিতীয় দিনের অষ্টম অধিবেশন ছিল ‘আজকের শিল্পভাষা – আর্ট, পারফরম্যান্স ও কবিতার নির্মাণ’ শীর্ষক। এ-অধিবেশনে সমকালীন ভারতীয় চিত্রকলাজগতের বিশিষ্ট শিল্পী গণেশ হালুই সভাপতিত্ব করেন। মূল বক্তার বক্তব্য রাখেন ভারতের চিত্রকলাবিষয়ক লেখক সুশোভন অধিকারী। আলোচকের বক্তব্য রাখেন চিত্রশিল্পী রফিকুন নবী, ঢালী আল মামুন ও শিল্পতাত্ত্বিক আবুল মনসুর।

নবম অধিবেশনটি ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয়। ‘সাহিত্য থেকে মঞ্চ ও চলচ্চিত্রে সংযোজন এবং পরিক্রমা’ শীর্ষক এ-অধিবেশনে মূল বক্তব্য রাখেন পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির সভাপতি বিশিষ্ট মঞ্চঅভিনেত্রী ও নাট্যকার-নির্দেশক শাঁওলী মিত্র। প্রখ্যাত নাট্যাভিনেতা মামুনুর রশীদের সভাপতিত্বে আলোচকের বক্তব্য রাখেন জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক, কলাম লেখক ও কবি আনিসুল হক, লেখিকা ফৌজিয়া খান, লেখক জাকির হোসেন রাজু এবং ভারতের নাট্যসমালোচক অংশুমান ভৌমিক।

দ্বিতীয় দিনের সমাপনী অধিবেশনের শিরোনাম ছিল ‘লোকসাহিত্য’। এ-পর্বে মূল বক্তার বক্তব্য রাখেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফোকলোরবিদ শামসুজ্জামান খান। কবি আসাদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে আলোচকের বক্তব্য রাখেন লোকসংস্কৃতি গবেষক আবুল ফতেহ ফাত্তাহ, লোকসংস্কৃতি গবেষক-নাট্যকার সাইমন জাকারিয়া ও সুমনকুমার দাশ। এ-অধিবেশনের মূল বক্তা শামসুজ্জামান খান দক্ষিণ এশিয়ার ফোকলোর চর্চার ইতিহাস এবং সাম্প্রতিক চালচিত্র নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মতামত উপস্থাপন করার পাশাপাশি বাংলাদেশের লোকসাহিত্যচর্চার সংকট ও সম্ভাবনাগুলো চিহ্নিত করেন।

তিন দিনব্যাপী সাহিত্য সম্মেলনের তৃতীয় দিনে মোট তিনটি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। তিনটি অধিবেশনেই ছিল কবিতাপাঠ। এসব অধিবেশনে বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের নবীন-প্রবীণ বিশিষ্ট ৩০ জন কবি কবিতাপাঠে অংশ নেন। তৃতীয় দিনের প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন কবি রবিউল হুসাইন। এ-অধিবেশনে কবি মুহাম্মদ সামাদ, হাবীবুল্লাহ সিরাজী, তারিক সুজাত, রাতুল দেববর্মণ, মন্দাক্রান্তা সেন, ইকবাল হাসান, বীথি চট্টোপাধ্যায়, পিয়াস মজিদ ও সাকিরা পারভীন কবিতাপাঠ করেন। দ্বিতীয় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন কবি রুবী রহমান। এ-অধিবেশনে কবি আসাদ চৌধুরী, আনিসুল হক, আবুল মোমেন, আশিস সান্যাল, মারুফুল ইসলাম, শতরূপা সান্যাল, কৃষ্ণ প্রাসাই, হেনরী স্বপন, জফির সেতু ও মোস্তাক আহমাদ দীন কবিতাপাঠ করেন।

সাহিত্য সম্মেলনের শেষ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন কবি আশিস সান্যাল। এ-অধিবেশনে কবিতাপাঠে অংশ নেন কবি রুবী রহমান, আলতাফ হোসেন, শিহাব সরকার, টোকন ঠাকুর, ওবায়েদ আকাশ, শাহনাজ নাসরীন, আহমেদ মুনির, আসমা বীথি ও ফজলুর রহমান বাবলু। তিন দিনব্যাপী পুরো সাহিত্য অধিবেশন সঞ্চালন করেন নাট্যসংগঠক মু. আনোয়ার হোসেন রনি ও ফারজানা জাহান শারমিন। সবশেষে সমাপনী বক্তব্যে কালি ও কলম-সম্পাদক আবুল হাসনাত বলেন, ‘সৃজন ও স্বরূপের সন্ধানের প্রত্যয় সামনে রেখে এই তিনদিনে সাহিত্যের বিভিন্ন বিষয়ে আমরা আলোচনা ও ভাববিনিময় করেছি। আমি বিশ্বাস করি, এই ভাববিনিময় ও সম্মিলন আমাদের ভাবনার বৃত্ত ও মননকে সম্প্রসারিত করেছে। যাঁরা এই সম্মেলনে সাহিত্যের নানা দিক নিয়ে যে প্রাণবন্ত আলোচনা করেছেন তাঁদের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ।

আবুল হাসনাতের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিন দিনব্যাপী সাহিত্য সম্মেলনের সমাপ্তি হলেও সিলেটবাসী কালি ও কলমের সৌজন্যে সাহিত্যের যে-জমজমাট মহোৎসব দেখলেন, সে রকম সম্মেলন এ-মাটিতে আদৌ আর হবে কি-না কিংবা হলেও সেটা কত দিন পর, এ নিয়ে সাহিত্যানুরাগীদের তার্কিক-আড্ডা যেন শেষই হতে চাইছে না। ঘরের দুয়ারে দেশি-বিদেশি প্রখ্যাত সাহিত্যিকদের মহাসম্মেলন তো আর চাট্টিখানি কথা নয়! সেই সুখকর স্মৃতি রোমন্থন করে সিলেটবাসী পুনরায় আরেকটি সাহিত্য সম্মেলনের জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনছেন। দেখার বিষয়, সেই-অপেক্ষা সিলেটবাসীকে কত দিন করতে হবে? সাত দশক, নাকি আরো কম, অথবা বেশি?

– ছবি : বেঙ্গল ফাউন্ডেশন আর্কাইভস