সিক্স-বি

লেখক: মোহাম্মদ কামরুজ্জামান

বাড়িঅলা যখন দেখলেন, গ্রাম থেকে আমার বাসায় যত বার আমার ভাইবোন-ভাস্তেভাস্তিরা বেড়াতে আসে, তত বার খেজুরের পাটালি, তালের পিঠা, মটরশুঁটির শাক, বেতের আগা, তালশাঁস, মেটে আলু তার ঘরে চলে যায়‒তিনি জুনের এক তারিখ থেকে ভাড়া ৩০০ টাকা বাড়িয়ে দিলেন, আর গ্যাস ওনার ভেতরে ছিল, আমার ভেতরে দিয়ে দিলেন, বললেন, ‘কেডায় কইব, বাজেটের আলোচনা হুইনা ইলিশের ব্যাপারি থিকা পটলের আড়ৎদার, টিভির শোরুম থিকা দাঁতনের ক্যানভাসার‒সবাই হঠাৎ ক্ষেইপা উঠব? বিপদ আফনেরও, বিপদ আমারও। এখুন তো আর কইতে পারি না, ‘মনির ভাই, যান গিয়া, আফনের কষ্ট অইব এইহানে। কষ্ট করলে দুই ভাই একলগেই করুম। কী কন্?’ আমি বলতে চাচ্ছিলাম, ‘গ্যাসটা আপাতত আপনার ভেতরেই থাক।’ কথাটা মুখ দিয়ে বেরিয়েছিল কি না নিশ্চিত করে বলতে পারব না‒বাড়িঅলার হঠাৎ আর্তনাদে আমার কান বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, অথবা তিন সেকেন্ড স্মৃতিলিখন হয়নি। উনি ডান হাত দিয়ে দুই চোখ ঢেকে আর্তনাদ করে উঠলেন, ‘ওরে, মাইচ্চে রে, মাইচ্চে!..আইচ্চা থাউক, আফনের কষ্ট অইলে আমার এক টেকাও লাগত না। আমি এক বেলা নাহয় খামু না; মিনিকেট খাইতাম, পাইজাম খামু। তবু নিজের ভাইরে কষ্ট দিমু না।’ সে মাসে বাড়িঅলা দুই বার ভাড়া চাইতে এলেন‒দুই বার ভাড়া চাওয়ার পর দুই বার ভুল স্বীকার করলেন, দুই বার ভুল স্বীকার করে দুই বার মাফ চাইলেন। অথচ উনি জানেন, আমি মাসের প্রথম বৃহষ্পতিবার সন্ধ্যায় আগের মাসের ভাড়া দেই। সাত বছর আগের কথা বলছিলাম। দীপের বয়স তখন ছয় বছর। অক্ষর জোড়া দিয়ে শব্দ লিখতে শিখেছে কেবল, সেই বিদ্যা দিয়েই ক্লাশের বইয়ের পাশাপাশি কমিক্স পড়ে ফেলত।

সাত বছর আগে এই ছোট্ট এপার্টমেন্টটায় ওঠার আগে, মতি, জয়গুন, রাফেজা, সালামত ভাই, মজিদ চাচাদের সাথে শেওড়াপাড়ায় একটা টিনশেড বাড়ির দুই রুম নিয়ে থাকতাম। সকালে মজিদ চাচা সামনের প্যাসেজে হেঁটে হেঁটে দাঁতন করত, খক খক করে কফ ফেলত, দুপুরে আওয়াজ দিত রাফেজা-সালামতরা, আর রাতে হিস্ হিস্ করত মতি-জয়গুনরা। ছেলেকে নিয়ে এপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ে থাকব বলে অফিস বন্ধের দিনগুলোতে বাসা খুঁজতে শুরু করলাম। প্রতি বন্ধের দিনে ঘর থেকে বেরুতে দেখে দীপ একদিন জানতে চাইল, ‘ফ্রাইডেতে তুমি কোথায় যাও, বাবা?’
‘বাসা খুঁজতে যাই।’
‘আমাকেও নিয়ে যাও।’
‘রোদের ভেতর ঘুরে ঘুরে তোর জ্বর হবে।’
‘হোক। জ্বর হলে ভালোই হবে। ঘরে শুয়ে থাকতে পারব।’
‘ঘরে শুয়ে শুয়ে কী করবি?’
‘হিটলু বিটলু পড়ব।’
‘আচ্ছা, তাহলে শুয়ে শুয়ে হিটলু বিটলু পড়্, আমি বাসা খুঁজে আসি।’

আরেকদিন ও আমাকে আটকে ফেলল‒দুই হাত দুই দিকে মেলে ধরে পথের উপর দাঁড়াল, বলল, ‘আজ আমাকে নিয়ে যাও, বাবা।’ আমি বললাম, ‘ঘরে শুয়ে শুয়ে হিটলু বিটলু পড়্। কাল থেকে তো আবার স্কুলে যেতে হবে।’ ও দুই পা নাচাতে নাচাতে বলল, ‘হিটলু বিটলু সব শেষ করে ফেলেছি।’
‘তাহলে এখন রিভাইজ দে।’
‘রিভাইজ দিয়ে রেখেছি।’
ও দৌড় দিয়ে ওঘরে চলে গেল, ডেস্ক থেকে একটা হিটলু বিটলু নিয়ে এল। পাতা খুলে একটা ডায়লগ বক্সের উপর আঙুল রেখে একটা ইংরেজি শব্দ দেখাল, ‘ফাইট‒ফাইট মানে লড়াই করা।’ তারপর বই বন্ধ করে দৌড়ে গিয়ে ডেস্কে রেখে এল। কমিকসের কোনো নতুন বই পেলে, এক বসায় পড়ে ফেলে, প্রথম বার পড়ার সময় মাথা তোলে না, কারোর সাথে কথাও বলে না। দ্বিতীয় বার পড়ার আগে মারুফার কাছ থেকে অজানা শব্দগুলোর মানে জেনে নেয়।

ওর হিটলু বিটলু সব পড়া শেষ। অগত্যা ওকে সাথে করে নিয়ে বেরুতে হলো সেদিন। কাজিপাড়া বাসস্ট্যান্ড থেকে বেশ ভেতরে, যেখানে বাড়িগুলো বাড়ির গায়ে গা লেগে উঠেছে, ড্রইং রুমের জানালা খুলে প্রতিবেশীদের বেডরুমে পাওয়া যায়, বেডরুমের জানালা খুলে হাত বাড়িয়ে বেলকনির তারে কাপড় নাড়তে হয়‒দরজা দিয়ে ঢুকে বেলকনিতে দাঁড়ানো যায় না, পানের পিক মুখে নিয়ে ঘোরার পরামর্শ যেখানে দেওয়া হয় না‒সিঁড়িতে খালাস করে শান্তি লাভের সুযোগ দেওয়া হয়‒তেমন একটি এলাকার তেমন একটি বাসায় টু-লেট দেখে ঢুকেছিলাম।

শীতল কালো বর্ণের মাঝবয়েসি এক লোক চাবি হাতে নিয়ে ছয়তলা দালানের ছয় তলার দক্ষিণ-পশ্চিম পাশের খালি হওয়া ফ্ল্যাটটা খুলে দিয়েছিলেন। ঢোকার সময় চোখ পড়ল দরজার চৌকাঠে সাঁটা টিনের নম্বর প্লেটের উপর‒সিক্স-বি‒মাঝ বরাবর একটিমাত্র পেরেক ঠোকা।  এপার্টমেন্টের নম্বর থাকে। ভদ্রলোক পেছনে নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে দেখছিলেন, আমি ঠিকমতো দেখেশুনে নিচ্ছি কি না, আর তিন তলায় এনে তার দীর্ঘকাল বন্ধ থাকা ড্রইং রুমের ঠান্ডা সোফায় বসে আমাকে দেখেশুনে নিচ্ছিলেন‒দেখেশুনে তিনি বুঝেছিলেন, বাসা পছন্দ হয়েছে, আর আমি বুঝেছিলাম, আমার পোষাবে। লেবুর সরবত দেখিয়ে দীপকে বললেন ‘খাও, মিস্টি লাগব।’ তারপর দীপের কাছে ওর স্কুলের গল্প শুনলেন।

এ চেহারার মানুষ আমি এর আগেও দেখেছি। এদের মুখণ্ডল একটি চ্যাপ্টা পান পাতার মতো। পান পাতার যে জায়গাটাতে পত্রশীর্ষ সরু হয়ে নেমে গেছে, সে জায়গায় এদের একগুচ্ছ দাড়ি মোচড় দিয়ে থুতনির নিচে নেমে গেছে, থুতনি ধরে ঝুলে পড়েনি, ঝুলে পড়ার ভয়ে মাঝে মাঝে হাত দিয়ে ডলে নিচে পরিপাটি করে রেখে দেয় এরা‒এ ধরণের লোকরা খুব বাকসংযত হয়‒কথার তাৎক্ষণিক অর্থ, স্বল্পমেয়াদি অর্থ আর দীর্ঘমেয়াদি অর্থ‒তিনটাই আলাদা করে জানে। মুখের চামড়া অভিজ্ঞতার আঁচে পুড়িয়ে পাকা করা‒মনের ভাব বোঝা যায় না। ভাবশূন্য একজন মানুষের সাথে আমার ভাব হওয়ার কথা না, কিন্তু হয়ে গেল, রীতিমতো ভালোবাসাই হয়ে গেল, উনি যখন বললেন, ‘আপনার ছেলেটারে খুবই ভালা লাগল, ম্যাথমেটিক্যাল ব্রেইন।’ আমি একটু চমকে উঠেছিলাম। উনি ‘ম্যাথ’ শব্দটা জানেন।

এপার্টমেন্টে থাকব বলে বাসাটা নিয়ে নিয়েছিলাম। সাত বছর ধরে দীপকে নিয়ে সেখানেই আছি। সাত বছরে বাসার দেয়ালের সিমেন্ট-চুনকাম খসে পাতলা হয়ে গেছে, বাথরুমে শাওয়ার বিকল হয়ে ঝুলে পড়ে আছে সেই কবে থেকে, বেসিনের কল ঘুরাতে গেলে সহজে হাতের ভেতরে আসে না‒দুই পাশে মাথা নাড়িয়ে না বলে দেয়‒ম্যালা টাকার কাজ জমে গেছে‒আর বাসাভাড়া নিয়মিত-অনিয়মিতভাবে বেড়ে দ্বিগুনে ঠেকেছে। এত টাকার কাজ একসাথে জমানোর জন্য আমিই দায়ী। ভালোবাসার কারণেই সময়ে-অসময়ে বিরক্ত করিনি। ফলে যেদিন একটু বিরক্ত করতে গেলাম, অনেক দিনের ভালোবাসার বিপরীতে জমানো অনেক বিরক্তি সালেক ভাই একসাথে ঝেড়ে ফেললেন, আমি ঝড়ের মতো উড়ে গেলাম, বিশ্বাস আর আত্মবিশ্বাসের সবগুলো ভিত নড়ে উঠল, কটাদিন দীপকে ডাকতে গেলেও গলা ছেড়ে আওয়াজ করতে পারতাম না। গেল মাসে আমি শুধু বলেছিলাম, ‘পানির একটা ব্যবস্থা করেন, সালেক ভাই, বালতিতে পানি ধরে আর কয়দিন? দীপের টাইফয়েড। ছাদে সিক্স-বি-এর চাবিটা মোচড় দিয়ে রাখা হয়েছে, আমি তা জানি, দীপও জানে‒সাত বছরে ওর এটা জেনে ফেলা স্বাভাবিক। কিন্তু হাশেম চাচা নিচে মোটর ছাড়লে ছাদে উঠে ঘুরিয়ে দেয়নি ও কখনও‒চাপ খেয়ে যতটুকু পানি আসে, তা-ই বালতিতে ধরে রাখে, হাশেম চাচা ছাদে উঠে মোচড় দিয়ে বাকিটা বন্ধ করে দেওয়ার আগ পর্যন্ত। সালেক ভাই একদিন সুবিচারের কথা বলছিলেন, ‘পানি কম আসে লাইনে। যা আসে সবাইরে সমান ভাগ কইরা নিতে হইব। কেউ বেশি খাইব, কেউ পাইবই না‒এইটা কোনো বিচার হইল?’ তার কথা আমি মেনেছিলাম। কিন্তু আরেক দিন যখন দীপের অসুখের কথা বারবার বললাম, তিনি বুঝলেন, তার কথা আমি বিশ্বাস করিনি, সহে নিয়েছিলাম মাত্র। আমার মনোভাব প্রকাশিত হলে সালেক ভাই যারপর নাই বিরক্ত হলেন, শুকনো চোখে তাকিয়ে শুধু বললেন,  ‘দেখি।’

আমি ভালো ব্যবহার সম্পর্কে অনেক আগেই একবার বলেছিলাম, এটা অন্যের কাছ থেকে সুবিধা বের করে আনার কৌশল, একবার তা বেরিয়ে আসলে কৌশলের আর দরকার পড়ে না‒মাছ ধরা পড়লে বড়শি তুলে ফেলা হয়‒পানিতে ফেলে রেখে বসে থাকে না কেউ।

দীপের জ্বর বাড়ছে। মহল্লার ডাক্তারের কাছে সন্ধ্যায় কয়েক দিন বসে থেকেছি। ডাক্তার বলেছে প্রচুর পানি খেতে। ওকে মারুফার কাছে একা ফেলে রেখে অফিসের কাজে মনোযোগ দিতে পারছি না। মারুফা রান্নায়-কান্নায়-ভালো গোছের মেয়ে, একটা রুটিনমাফিক কাজ আর অন্যটা মর্জিমাফিক। কান্নার মর্জি হলে কাঁদে, না হলে অস্থির হয়ে ওঠে‒খানিক্ষণ চোখের সামনে বই ধরে চোখ ভিজিয়ে নেয়। এর বাইরেও অনেক কিছু আছে‒ও জানে না, ওর হাজবেন্ড জানত, তাই বেচারা বাইরে বাইরে ঘুরত; কিন্তু কতকাল আর বাইরে বাইরে ঘুরবে? একদিন ঘরে এসে ওকেই বাইরে বের করে দিল।

জিএম স্যার সেদিন ডাকলেন। খুব সংক্ষেপে ধমকালেন, ‘আমার আগেই বোঝা উচিত ছিল, আপনার মতো একজন লোককে একাউন্টসের দায়িত্ব দেওয়া ঠিক হয়নি। ঘরে সমস্যা করে রাখলে, অফিসের হিসাব মিলাবেন কী করে? এমডি স্যারের কাছে যান, উনি বোধহয় আপনাকে কিছু বলবেন।’ এমডি স্যারের চেম্বারে গেলাম। ‘মনির সাহেব, আমি আপনার বড়ভাই হিসাবে বলছি‒কথাগুলো অন্যভাবে নেবেন না‒মানুষ সোশ্যল জীব, তাছাড়া ফিজিক্যাল নিড বলে একটা বিষয় আছে। আপনার কাজে অমনোযোগের বিষয়টা নতুন নয়‒অনেক দিন ধরেই বলব বলব করে বলিনি‒আপনি আবার কীভাবে নেন‒লাইফে অনেক কিছুই হয়‒তাই বলে সব থেমে থাকে না‒আবার একবার চেষ্টা করে দেখেন। আমরা আপনাকে হারাতে চাই না,’ এমডি স্যার তার বিশাল শরীর নিয়ে চেয়ারের ভেতরে গেড়ে বসে চিবিয়ে চিবিয়ে কথাগুলো বললেন। আমি বললাম, ‘স্যার, আমি কি এখন যাব?’ স্যার বললেন, ‘যান, কাজগুলো মোসাব্বিরকে বুঝিয়ে দেন। অর্ডারটা কিছুক্ষণের ভেতরে হাতে পাবেন। আমরা আর আপনাকে একাউন্টসের কাজ দেখতে দিচ্ছি না‒ম্যানেজমেন্টের সিদ্ধান্ত। আপনি বরং লজিস্টিক্স এন্ড সেনিটেশনটা দেখেন। মকবুল সাহেবের কাছে যান, উনি সব বুঝিয়ে দেবেন।…বেচারা মকবুল সাহেবের বয়স হয়েছে। কুড়ি বছর একই ডেস্কে একই পোস্টে থাকতে থাকতে লেথার্জিক হয়ে গেছেন। ভাবছি ওনাকে এজিএম করে রিটায়ারমেন্টে পাঠাব‒ম্যানেজমেন্টের তেমনই মত।’ আমি ডেস্কে এসে কিউবিকলের সেল্ফ থেকে লুকা প্যাসিওলির প্ল্যাস্টার-অব-প্যারিসের আবক্ষ মূর্তিটা তুলে নিয়ে ড্রয়ারে ঢুকিয়ে রাখলাম। মোসাব্বির আশেপাশের ডেস্কে ঘোরাঘুরি করছে, এর ওর সামনে গিয়ে বসছে, অসংলগ্নভাবে কথা বলছে‒ডাকলেই এদিকে চলে আসবে। একাউন্টসের কাজে ওর খুব কৌতূহল। সময় পেলেই পাশে এসে বসে, জিজ্ঞাসা করে, কী করছি। একদিন অবসরে ম্যানেজমেন্ট একাউন্টিং বোঝাচ্ছিলাম ওকে। সবশুনে দাঁত-দুপাটি বের করে বলল, ‘ওসব ফালতু হিসেব নিকেশ, ওভাবে প্রোফিট-লস ক্যালকুলেট করা যায় না।’ তারপর ডেস্কের উপর থেকে টিএ-ডিএর ভাউচারগুলো হাতে নিয়ে বিড়বিড় করে খানিক্ষণ পড়ল, তারপর ধন্যবাদ দিয়ে চলে গেল।

অনেক দিন স্কুলে যায় না দেখে, দীপের বন্ধুরা স্কুল থেকে ফেরার পথে ওকে দেখতে এসেছিল। আমি ছিলাম না। দীপ চাবি হাতে করে ছয়তলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে ওদের সাথে দেখা করে গেছে। দারোয়ান হাশেম চাচার দিবানিদ্রায় ব্যাঘাত হওয়ায়, পাশ ফিরতে ফিরতে হাক দিয়েছিল, ‘সাবধান! সাবধান! দেখতাছি কইলাম।’ দীপের খুব লেগেছিল কথাটা। এ মাসে ভাড়া দেবার সময়, দীপের অসুখের বিষয়টা আবার বললাম। সালেক ভাই সেদিনের মতো শুকনো চোখে একবার তাকালেন। বেরিয়ে আসার সময় শুনি সালেক ভাই বিড়বিড় করছেন, ‘বন্ধুগো নিয়া বাসার সামনে খাড়াইয়া গপ করে দেখি!…আবার কয় জ্বর!’

শুক্রবার সকালে গ্যারেজে চ্যাঁচামেচি দেখে সিঁড়ি বেয়ে নেমে দেখি পুরো বিলডিংয়ের পুরুষ মানুষরা সবাই নিচে, আর দোতলার সাবু ভাইয়ের বাসার পুরুষ মহিলা শিশুরা সবাই। হাশেম চাচাকে পিঠমোড়া করে বেঁধে রেখেছে। আমি বললাম, ‘কী হয়েছে?’ সাবু ভাই কড়া দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন। তারপর দারোয়ানের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে ধমকের সুরে বললেন, ‘কী হইব আর!’ চারতলার ভাড়াটিয়া আশিক ভাইয়ের দিকে তাকালাম। উনি বললেন, ‘রাতে দোতলার সাবু ভাইয়ের মোটর সাইকেল বের করে নিয়ে গেছে।’ সাবু ভাই বাইং হাউজে আছেন। মাঝে মাঝে অনেক রাতে ফিরতে হয় বলে মোটর সাইকেল কিনে নিয়েছেন। আমি বললাম, ‘হাশেম চাচা ছিলেন না?’ জিপারঅলা গোলাপি পায়জামার পকেটে দুই হাত গুঁজে দিয়ে পাঁচতলার মতি ভাই রসিয়ে রসিয়ে জবাব দিলেন, ‘দারোয়ান আবার থাকে নাকি? একরাতে থাকে ভাসানট্যাক বস্তিতে, অন্য রাতে শান্তির ছাপড়ায়। আরেক রাতে…।’ আশিক ভাই আর বলতে দিলেন না, কথার মাঝখানে মন্তব্যের গোঁজ ঢুকিয়ে দিলেন, ‘কিন্তু ফজরের ওয়াক্তে তো পানির মোটর ছাড়তে শুনি।’ মতি ভাই বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘আহা বুঝেন না! ফজরের আগ দিয়া আইসা পড়ে।’

সালেক ভাই সব দেখে হতভম্ব হয়ে গেছেন। তার ট্যান পড়া চামড়ায়ও বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। হাশেম চাচার বুকের উপর নারিকেলের ছোবড়ার দড়ি শক্ত করে বসে ছিল, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। সালেক ভাই হাশেম চাচার সামনে গিয়ে বসলেন। দুই হাত দিয়ে দড়িটা টেনেটুনে একটু আলগা করে দিয়ে উঠে এলেন। বাড়িঅলা নতুন ভাড়াটিয়া সাবু ভাইয়ের কোনো সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন না, কোনো কথায় দ্বিমত করেন না, আবার ‘ঠিক আছে’-ও বলেন না।

বেচারি সাবু ভাবির সাথে আজ দুবার চোখাচুখি হলো‒উনি নির্লিপ্ত চোখে আমার দিকে তাকালেন। এই বিল্ডিংয়ে নতুন এলেও ওই ভাবিকে আমি চিনি। মতি ভাই একদিন দোতলার সিঁড়িতে আমাকে পেয়ে গলা চড়িয়ে বলছিলেন, ‘এইখানে আর থাকন যাইব না।’ আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘কেন?’
‘কেন‒বুঝেন না?’
‘সালেক মিঞা নতুন ভাড়াটিয়া তুলব।’
‘আমরা কি ভাড়া দিচ্ছি না?’
‘দিতাছেন, নতুন ভাড়া দিতাছেন না, পুরান ভাড়া দিতাছেন।’
‘পুরান-ভাড়া নতুন ভাড়া‒এসব কী বলছেন?’
‘ভাড়াটিয়া রাখলে পুরান ভাড়া, ভাড়াটিয়া নামাইলে নতুন ভাড়া।’
‘কই, উনি তো কিছু বললেন না।’
‘কয় নাই‒কইব। আর কইলেও আফনে বুঝেন নাই। যাগো বুঝনের হ্যারা ঠিকই বুঝছে।’
‘আপনার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না।’
‘দোতলার কাদের ভাই…’
‘কাদের ভাই! কাদের ভাই তো তিন মাস আগেই চলে গেছেন।’
‘বুঝছে দেইখা চইলা গেছে।’

আমি বুঝব না দেখে মতি ভাই আমার সাথে আর কথা বাড়ালেন না। মনে হলো বাকি কথাগুলো নিজের সাথে বললেন‒গলা আরেকটু চড়ালেন‒সামনে দাঁড়ানো মানুষের সাথে এত জোরে কথা বলে না কেউ। মতি ভাই চ্যাঁচাচ্ছিলেন, ‘দ্যাখতাছেন না, দোতলার বাইং-হাউজ ভাই পরিবেশ নষ্ট করতাছে! এডভান্স সিস্টেম আছিল না‒তিনি আইসা চালু কইরা দিলেন‒ছয় মাসের এডভান্স দিয়ালাইছেন। দেয়াল ঘইষা একটুন চুন লাগাইয়া দিছে, কলের নাট বল্টু দুই খান প্যাঁচাইয়া দিছে, ভাইজানের মন গইলা পানি হইয়া গ্যাছে‒দুইগুন ভাড়া চাইছে, দুইগুনেই সই।’ মতি ভাই সিঁড়ি বেয়ে ধুপধাপ উপরে উঠে গেলেন। সিঁড়ির উপর ধুপধাপ পায়ের আওয়াজ আর কর্কশ হাকাহাকি শুনে, দোতলার নতুন ভাড়াটিয়া সাবু ভাইয়ের মিসেস আস্তে করে ড্রইং রুমের দরজা খুলে দেখে নিলেন। আমি ওনার দিকে একবার তাকিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেলাম।

সালেক ভাই সবার দিকে একবার চোখ ঘুরিয়ে নিয়ে বললেন, ‘আফনেরা যান। আফনেগো এহেনে কী কাম? আফনেগো তো কিছু চুরি অয় নাই।’ ‘হইতে কতক্ষণ!’ মতি ভাই অন্য দিকে তাকিয়ে বললেন। সালেক ভাই সেদিকে কান দিলেন না, সাবু ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘মেয়েছেলেরা যান। পুলিশ আসতাছে।’ মতি ভাই স্পিরিংয়ের মতো পা ফেলে সিঁড়ি বেয়ে এক নিমিষে উধাও হয়ে গেলেন। সাবু ভাবি এক হাতে সিঁড়ির রেলিং আর অন্যহাতে ছেলের হাত ধরে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলেন। একে একে অন্যরাও সিঁড়ির পথ ধরলেন। সাবু ভাই দারোয়ানের দিকে শ্যেন দৃষ্টি হেনে দাঁড়িয়ে থাকলেন। আমি উপরে উঠলাম না, এগিয়ে গিয়ে সালেক ভাইয়ের পাশে দাঁড়ালাম। আমি সবচেয়ে পুরোনো ভাড়াটিয়া। সালেক ভাই আমার দিকে তাকালেন‒দুদিন আগের সেই শুকনো চাহনি। দুদিন চোখের পাতা ফেলেও যে চোখ ভেজেনি, দুরাত ঘুমিয়ে যে চাহনি মিলায়নি, সে চাহনি অনেক শক্তিশালী‒যে কাউকে ঠেলে সরিয়ে দিতে পারে। আমি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে, সিঁড়ির রেলিং ধরে ধীর পায়ে উঠে এলাম।

সাবু ভাইয়ের মোটর সাইকেল পাওয়া গেছে কি না, জানি না। দীপের টাইফয়েড বাড়ছে। সারা দিন অফিস করি, সন্ধ্যায় মহল্লার ডাক্তারের চেম্বারে লাইনে বসে থাকি; না হলে প্যাথলজিকার টেস্টের জন্য ঢাকা প্যাথের রুমে রুমে দৌড়োই, নয়তো দীপের মাথাটা কাঁধের পরে নিয়ে লবিতে বসে অপেক্ষা করি। বাড়িঅলার সাথে কদিন আর দেখা হয় না। মতি ভাইয়ের সাথে একদিন গ্যারেজে দেখা। উনি বললেন, ‘সালেক মিঞার সাথে কথা হয়েছে?’ আমি বললাম, ‘না!’ উনি বললেন, ‘পুলিশের লোকজন কিছু জিগাইছে?’ আমি বললাম, ‘না!’ উনি বললেন, ‘পোলা ক্যামুন আছে?’ আমি বললাম, ‘ভালো না।’ উনি আর কিছু বললেন না, গেট খুলে বাইরে চলে গেলেন। পকেট গেট দিয়ে মাথা নিচু করে বেরুবার আগে, আমার দিকে আরেক বার তাকালেন।

ডাক্তার ওষুধ দিচ্ছে। মারুফা জলপট্টি দিচ্ছে। দীপ জ¦রের ভেতরে প্রলাপ বকছে, ‘এফেকশন‒এফেকশন মানে ভালোবাসা… এফেকশন‒এফেকশন মানে ভালোবাসা…।’ আমি অফিস বন্ধ করে দিয়েছি। ডাক্তার বলেছে, টাইফয়েড এমনিতেই সেরে যায়, একটু সেবা শুশ্রুষা করলে। তবে শরীরে র‌্যাশ উঠলে একটু সাবধান থাকতে হবে। সকাল থেকে ওর র‌্যাশ উঠতে শুরু করেছে।

ওইদিনই সন্ধ্যায় সালেক ভাই এলেন। হাতে এক জোড়া সবুজ ডাব, কিন্তু মুখ নারকেলের ছোবড়ার মতো শুকনো। বসতে বসতে বললেন, ‘ছেলের অবস্থা কী?’
আমি বললাম, ‘ভালো না। জ¦র কমছে না।’
‘ডাক্তার কী বলে?’
‘ওষুধ দেয়।’
‘কিছু বলে না?’
‘বলে।’
‘কী বলে?’
‘প্রচুর পানি খেতে।’
সালেক ভাই উত্তর শুনে মুখ কালো করে ফেললেন, ‘সে কথা না।’
আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ওনার চোখের দিকে তাকালাম। উনি জবাব দিলেন, ‘সারতে আর কয়দিন লাগবে‒সেই কথা।’ মারুফা লেবুর শরবত নিয়ে ড্রইং রুমে ঢুকল, ‘স্লামালাইকুম ভাইয়া।’ সালেক ভাই মাথা নেড়ে সালাম গ্রহণ করলেন, তারপর  আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমি মহল্লার সিক্যুরিটিগুলারে ধমকাইছি। ব্যাটা, কারে দেখতে কারে দেখছস্‒উল্টাপাল্টা কথা কবি না!’ আমি বুঝলাম, উনি সেদিনের মোটর সাইকেল চুরির কথা বলছেন। এ বিষয়ে আলাপ করার বিন্দুমাত্র আগ্রহ আমার নাই। তবুও কথা চালাবার জন্য বললাম, ‘ওরা কী বলছে?’
‘ওরা তো কয়, ওই রাতে দীপরে দ্যাখা গেছে, গেট খুইলা দ্ইু বন্ধুরে নিয়া বাড়ির ভিতরে হান্দাইছে।’

Leave a Reply

%d bloggers like this: