সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্ব নক্ষত্র

লেখক:

সুজয়েন্দ্র দাস

বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কথা মনে পড়লে আমরা অনুভব করি, তিনি আমাদের মধ্যে, বিশেষ করে সাহিত্যপিপাসু মানুষের মনে, চিরবিরাজমান। বাংলা সাহিত্যের ভা-ারে তিনি যে অমূল্য সম্পদ রেখে গেছেন তা আমরা কেমন করে বিস্মৃত হতে পারি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে অনবদ্য যেসব সৃষ্টি করে গেছেন, তা ভারত ও বাংলাদেশের সাহিত্যপিপাসু মানুষ কোনোদিন ভুলতে পারবে না। দীর্ঘ ৭৮ বছরের জীবনে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় দুশোটির অধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। এর মধ্যে উপন্যাস, ছোটগল্প, কবিতা ও ভ্রমণকাহিনি অন্তর্ভুক্ত। তাঁর প্রতিটি সৃষ্টি অনবদ্য এবং কোনোটার সঙ্গে অন্যের একদম মিল পাওয়া যায় না।

শ্রদ্ধেয় সাহিত্যিক তাঁর অনবদ্য সৃষ্টির মাধ্যমে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছাতে পেরেছেন। শিশুদের কাছে তিনি সমান জনপ্রিয় তাঁর ঐতিহাসিক কাকাবাবুর জন্য। সবুজ দ্বীপের রাজা মিশর রহস্য কাকাবাবু সিরিজের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয়।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক হলেও তাঁর প্রিয় বিষয় ছিল কবিতা। বিভিন্ন ধরনের কাব্য সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি মানুষের অনেক কাছে পৌঁছতে সফল হয়েছেন। বাংলা কবিতার উন্নতির জন্য কৃত্তিবাস পত্রিকা তিনি প্রকাশ করেন ১৯৫৩ সালে। আজ অবধি এ-পত্রিকা এক অনবদ্য ভূমিকা পালন করে আসছে বাংলা কবিতা ও অনুবাদ কবিতার ক্ষেত্রে।

উপন্যাস রচনার ক্ষেত্রে শ্রদ্ধেয় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় অসাধারণ প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। তাঁর কোন উপন্যাস নিয়ে যে আলোচনা করব আর কোনটা বাদ দেব তা ভেবে কূলকিনারা পাওয়া যায় না।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রাথমিক প্রণয় ছিল কবিতার সঙ্গে। তাই কবিতা দিয়ে আলোচনা শুরু করা আমার শ্রেয় বলে মনে হয়।

যেমন ধরা যাক ‘উত্তরাধিকার’ কবিতা। পরবর্তী পর্যায়ে তিনি উত্তরাধিকার নামক উপন্যাস রচনা করেছেন। ‘উত্তরাধিকার’ কবিতায় কবি গরিব পরিবার ও রাস্তায় বাস করা অসহায় শিশুদের প্রতি তাঁর অপার স্নেহ ব্যক্ত করেছেন। যেমন,

 

এ-সবই আমার পুরোনো পোষাক,

বড় প্রিয় ছিল, এখন শরীরে

আঁট হয়ে বসে, মানায় না আর

তোমাকে দিলাম, নবীন কিশোর,

ইচ্ছে হয় তো অঙ্গে জড়াও

অথবা ঘৃণায় দূরে ফেলে দাও,

যা খুশি তোমার

তোমাকে আমার তোমার বয়সী

সব কিছু দিতে বড় সাধ হয়।

 

‘মিনতি’ কবিতায় কবি ‘প্রেমিক’ ও ‘প্রেমিকা’র সম্পর্ককে অমলিন রাখার জন্য আহবান জানিয়েছেন। ‘প্রেমিকা’ যখন তাঁর ‘প্রেমিকে’র জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে আছেন, তখন ঝড়-বৃষ্টির আগমনে পরিবেশ যেন কলুষিত না হয়।

 

ঝড় দিসনে, আকাশ। তবু

বিরহিণীর ঘরে

আঁচল পেতে মাটির বুক চেপে থাকে

সে শুয়ে,

ঝিকমিকিয়ে উঠুক কেঁপে ভীরু দীপের শিখা

প্রেমিক যেন নিভায় এসে একটি দ্রম্নত ফুঁয়ে।

 

‘নীরার জন্য’ কবিতায় কবি ‘নীরা’ নামে কাকে যে উলেস্নখ করেছেন তা বোঝা খুবই কঠিন। ‘নীরা’ কাব্যের মাধ্যমে কবি যে তাঁর অত্যন্ত কোনো কাছের মানুষকে অনুভব করছেন তা মোটামুটি উপলব্ধি করা গেছে। কবি বলছেন :

 

তুমি ভয় পেয়ো না, তুমি ঘুমোও,

আমি বহু দূরে আছি

আমার ভয়ংকর হাত তোমাকে ছোঁবে না

এই মধ্যরাত্রে

আমার অসম্ভব জেগে ওঠা,

উষ্ণতা তীব্র আকাঙক্ষা ও

চাপা আর্তরব তোমাকে

ভয় দেখাবে না

আমার সম্পূর্ণ আবেগ…

 

একটা বিষয় পরিষ্কার, কবির মানবতাবোধ কী প্রগাঢ় ছিল। কারণ কোনো আঘাত লাগলে কবি ভয়ানক অস্থির হয়ে যেতেন যতক্ষণ না মানুষ সুস্থ-স্বাভাবিক পর্যায়ে ফেরত আসে।

এবার সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়-রচিত উপন্যাস ও ছোটগল্পের যে বিশাল ব্যাপ্তি সে-বিষয়ে আলোকপাত করা যাক।

সেই সময় অবিভক্ত ভারতবর্ষের কলকাতা শহরের এক অনবদ্য দর্পণ। এই সৃষ্টির মাধ্যমে লেখক উনিশ শতকের কলকাতার সমাজব্যবস্থা ও বনেদি বাবু সংস্কৃতিকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। লেখক উলেস্নখ করেছেন যে, তাঁর এই কাহিনির পটভূমিকা ১৮৪০ থেকে ১৮৭০ অবধি। ‘নায়ক’ হয়তো প্রতীকী সময়, এই প্রতীক চরিত্র হচ্ছেন নবীনকুমার। সে-সময়ের বাংলার মানুষের মানসিকতা এবং গুণিজনের প্রভাবে সমাজ-উন্নয়ন কীভাবে ত্বরান্বিত হয়েছিল সে-বিষয়ে গভীর উপলব্ধি করার প্রচেষ্টা করেছেন।

উপন্যাস পূর্ব পশ্চিমের মাধ্যমে লেখক দেশবিভাগের জ্বালাযন্ত্রণা সম্বন্ধে গভীর রেখাপাত করেছেন। সেই সময় বাঙালির যে নিদারুণ দুর্বিপাক হয়েছিল তা আজ ভাবলে গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে।

প্রথম আলো উপন্যাসে ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর বিবর্তনকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন লেখক। এই উপন্যাস পুরোপুরি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে রচিত। এতে রবীন্দ্রনাথ, ত্রিপুরা-রাজপরিবার এবং ঊনবিংশ ও বিংশ শতকের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ও জ্ঞানীগুণী মানুষের প্রসঙ্গ বিসত্মৃতভাবে উলেস্নখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া তিনি ভ্রমণকাহিনি ও আত্মচরিত রচনা করেছেন। অন্যান্য উলেস্নখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে সরল সত্য, গভীর গোপন, জীবন যে রকম, জয়াপীড়, পুরুষ প্রভৃতি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অনবদ্য রচনা হিসেবে চিহ্নিত থাকবে।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর দীর্ঘ লেখক জীবনে মানুষের ব্যথা ও দুর্দশাকে গভীরভাবে অনুভব করার চেষ্টা করেছেন। যেমন সরল সত্য উপন্যাসের মাধ্যমে প্রকৃত সরলতা ও সত্যবাদিতার দ্বারা অনেক সময় যে ভয়ংকর প্রতিকূলতার মধ্যে পড়তে হয় সে-বিষয়ে তাঁর অন্তরের ভাব ব্যক্ত করেছেন। ওই অভিব্যক্তি কতটা সত্য তা বোঝা যায় যারা সরলতা বজায় রাখেন তারা যখন বেশিরভাগ সময়ে বিশ্রী রকমের বিপদে পড়েন। এ আরো এক দুঃখ যার কোনো হিসাব করা যায় না।

জীবন যে রকম এক বিশাল প্রেক্ষাপটে গড়া উপন্যাস। নিজস্ব শহরের বাইরে অন্য এক শহরে বসবাস করতে আরম্ভ করলে যে অন্য ধরনের মানসিকতার সৃষ্টি করে সেটাই এই উপন্যাসের প্রতিপাদ্য বিষয়।

ঔপন্যাসিক, কবি, ছোটগল্পকার ও ভ্রমণকাহিনিকার ছাড়া সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মহৎ প্রতিভার আরো একটা গুণের কথা উলেস্নখ করা প্রয়োজন। তিনি বাংলা সাংবাদিকতার উন্নয়নকল্পে এক বিশিষ্ট ভূমিকা পালন করেছেন। প্রতি বুধবার একটি সম্পাদকীয় পাতায় তাঁর রচিত নিবন্ধ আমরা ভুলতে পারব না।

ভারত ও বাংলাদেশের সাহিত্যিকদের মধ্যে আজো অবাধ আক্ষেপ রয়ে গেছে যে, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ক্ষুরধার লেখনী যেন অকস্মাৎ থেমে গেল। তিনি যেখানেই থাকুন সদাশান্তিপূর্ণ জীবনযাপন করুন। পরিশেষে তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করি। r