সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় নামটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে বাংলা চলচ্চিত্রের একঝাঁক চরিত্রের মুখচ্ছবি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে বাঙালিমাত্রেরই। চলচ্চিত্রের অভিনয়ের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন অসামান্য কৃত্যে প্রায় ষাট বছরেরও বেশি। স্বনামধন্য স্মরণীয়-বরণীয় পরিচালকদের সঙ্গে তাঁর অভিনয় বাঙালি দর্শকের হৃদয় জয় করে নিয়েছে দু-তিন প্রজন্ম ধরে। 

চলচ্চিত্র-নাটক ছাড়া এক নিভৃতচারী মগ্ন চিন্তাশীল অন্তরের সুপ্ত অনুভবে নিজের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন কবি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। 

এ-পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে দশটি কবিতার বই, খলিল জিব্রানের The Prophet-এর অনুবাদ, আরেকটি ছড়া সংগ্রহ।

কবিতা লিখতেন কৈশোর থেকেই, তবে এই চর্চা কখনো যে প্রকাশিত হতে পারে এমন আস্থা ছিল না, আর সেসব কবিতা প্রকাশযোগ্য ছিল বলেও তিনি মনে করেননি। ক্রমে বন্ধুবর কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় প্রকাশক সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন –    জানিয়েছেন তিনি নিজেই। –

এমনই ছিল শক্তি চট্টোপাধ্যায়, ও আমাকে কবিতা শোনাত, আমিও শোনাতাম। ও তো তখনই কত বড় কবি, বিরাট নামডাক। বাংলা সাহিত্যে এক-একটা ল্যান্ডমার্ক তাঁর কবিতা। ও ইচ্ছে করলেই আমার কবিতা অগ্রাহ্য করতে পারত, গুরুত্ব না দিতে পারত। কিন্তু ও সেটা কখনও করেনি। বরং আমার কবিতা শুনে বলত, ‘পুলু এটা একটু রবীন্দ্রনাথ হয়ে গেল না?’ অর্থাৎ বাংলা কবিতাকে যেমন রবীন্দ্রনাথের প্রভাব থেকে বেরোতে প্রবল চেষ্টা করতে হয়েছে, আমাকেও সেটা করতে হয়েছে। কী করে রবীন্দ্রনাথের মতো লিখব না, সেই চেষ্টা করেছি অনেকদিন ধরে। আস্তে আস্তে পথ খুঁজে পেয়েছি। তবে বই বের করার মতো হয়েছে কিনা বুঝতে পারতাম না। শক্তিই বলল, এবার বই বের করো। এমন কী প্রকাশকও ও-ই ঠিক করে দিয়েছিল। প্রথম কবিতার বই বেরোল ১৯৭৫ সালে।

কবিতা লেখার শুরুর কথা সৌমিত্র বলেছেন। কৈশোর নতুন জন্মানো প্রেমের আনন্দ-বেদনা-ব্যর্থতাই এর উৎস। কবির ধারণা, প্রেমের এই উপকরণগুলিই তাঁর কবিতাভুবনের দীর্ঘস্থায়ী স্রোত।

প্রেমের কবিতা সৌমিত্র লিখেছেন অনেক-ই, অথবা বলা যায় তাঁর অনেক কবিতাই রোমান্টিক স্মৃতিময় অথবা বিরহ-বিষাদের। কিন্তু কবি যখন বলেন,

বেইমানি কোরো না – ঠিক ফিরবে তো?

আমি কিন্তু ছায়াছবির টিকিট হাতে নিয়ে

বসে থাকব

এখনও আসন্ন কাশবন চোখ ভ’রে দেখা হয়নি

তোমার আমার মাঝখানে

বহু নিসর্গ থাকার কথা ছিল।

তুমি ফিরে এলেই বেরিয়ে পড়ব

অনেক উঁচুতে ভারা বেঁধে যে ছেলেটা কাজ করছে

এখনও তার সাহসকে অভিনন্দন

জানানো হয়নি

দোহাই তোমার এসো।

কবিতাটি প্রেমের কিন্তু শুধুই কি নর-নারীর প্রণয়? ভিন্ন মাত্রাযুক্ত হয়ে যায় যখন তিনি সাধারণ, অতিসাধারণ মানুষদের কথা বলেন তাঁর ভাবনায়।

কবির সমগ্র জীবনব্যাপী সমাজের শ্রমজীবী মানুষ তাঁদের পরিবার-পরিজন, যাপনচিত্র ভাবিয়েছে, উঠে এসেছে কবিতার ভুবনে বারবার।

প্রকৃতপক্ষে মানুষের মধ্যে অপরিসীম বৈশিষ্ট্যে তিনি ছিলেন বিস্মিত। এমনও বলেছেন যে, তাঁর Hobby হলো মানুষ দেখা। জীবনের আদর্শে-দর্শনেও গ্রাম-শহর দেশ-বিদেশ সর্বত্রই তিনি সাধারণ মানুষের অনুসন্ধানী ছিলেন।

সৌমিত্রের কাব্যভাবনার প্রেক্ষাপটে পৈতৃক শহর কৃষ্ণনগর, বাবার কর্মসূত্রে বারাসত, দার্জিলিং, হাওড়া প্রভৃতি মফস্বল শহরের মানুষজন, ঘরবাড়ি, প্রকৃতি, পরিবেশ, বন্ধুসঙ্গ নানাসূত্রে ছাপ ফেলেছে। কলকাতায় কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে শুরু করে তাঁর কাছে খুলে গিয়েছিল বাংলা কবিতার জগৎ, দেশ-বিদেশের সাহিত্য, ন্যাশনাল লাইব্রেরির দরজা। কলকাতা তাঁকে দিয়েছে মহানগরের প্রশস্তি।

তিনি তো শুধু অভিনেতা নন, রূপে-গুণে নায়ক, মুগ্ধদর্শক। তিনি যেন স্বপ্নজগতের অধিবাসী। অথচ কবিতায় এর কোনোটিরই তেমন উপস্থিতি নেই। কবিতায় তিনি একক চরিত্র, তিনি কবি। কবি কোনো অলৌকিকতার অনুসন্ধানী নন –    প্রেম-ভালোবাসা জড়ানো ইহজীবন-প্রেমিক। বেদনা-অপ্রাপ্তি, অপ্রেম যাই থাক – ইট-কাঠ-পাথর ঘেরা নাগরিক পরিবেশেই তিনি তৈরি করতে পারেন দণ্ডকবন। 

এই লেখার পঙক্তিনিচয়ের মধ্যে

আমি যে স্বাধীনতা খুঁজে পাই

সেখানে আমি

মহাকাব্যের অনুষঙ্গ রচনা করতে পারি

সিমেন্ট ইটকাঠ কাচের শহরের মধ্যেই

আমি আবিন্ধ্য দণ্ডকবন তৈরি ক’রে নিতে পারি

সেতুবন্ধ সত্য ক’রে

পৌঁছতে পারি অশোক কাননে

সেখানে তোমার বিরামহীন আত্মা

আজও রোরুদ্যমানা হয়ে থাকবে

তোমাকে জয় করার পরেও

এই পঙক্তিনিচয়ের মধ্যেও শুধু

তোমাকে আমি অবিশ্বাস করতে পারি

সে অগ্নি হায়, পোড়ায় আমাকেই শুধু

তুমি দীপ্ত থাকো, দহনে থাকো না।

কবিতার অন্তমুর্খিন এক মানুষ, যে হেঁটে যায় ফুটপাথে আপনমনে, মহাকাব্যের ভেতর অনুসন্ধান করে অন্যতর পাঠ, আশ্বিনের আলোতে যে মুগ্ধ হয়ে অলৌকিক হাসি নিয়ে আসে।

জীবনানন্দ পাঠের মুগ্ধতা কাটে না সারাজীবন, তাঁর তুমুল প্রভাব থেকে চেষ্টা করেন মুক্ত হওয়ার –   

‘অন্ধকারে চুপ ক’রে বসে থাকার সময় ঘাই হরিণের ডাক শোনা গেল আবার।’

‘কার্তিকের বেলা শেষ হয়ে এল আহা দ্যাখো দ্যাখো আহ্লাদ সেই পথেই চলে

যাচ্ছে এখন থেকে শীত মাঠের সমস্ত আলো যেখানে ম্লান হয়ে আসবে।’

আবার যখন বলেন,

‘যারা একখানা কমলালেবু হাতে করলে সমস্ত মনকে অমনি স্পষ্ট দ্যাখে আমি

তাদের চিনি না।’ – সচেতন ভিন্নতায় তৈরি করেন নিজস্ব ধরন।

সেই জলাঙ্গির পাড়ে ভোর

ওই তো হাঁস নামছে নদীর প্রথম রৌদ্রকে ছোঁবে ব’লে

তার আগে ঠিক তিনবার

পাখনার নিচে খুঁটে খুঁটে কিছু পরিষ্কার করে এবং খেলে,

এই মৌজার প্রভূত শিশিরের স্বত্বভোগী হ’তে

এই মুহূর্তে কোনো বাধা নেই

এই সমস্ত ফুল পাতা উদ্ভিদের মতো

বাঘাডাঙার গোয়ালাদের ফাটা ফাটা পায়েও

                          শিশির লেগে থাকে

এই তো ওরা ফেরিঘাটে এসে বাঁক নামিয়ে রাখল,

এদের হাত ধরে আমি ডুব দিচ্ছি ইথারের মধ্যে।

বন্ধু শক্তি ঠিকই বলেছিলেন, বই প্রকাশিত হলে তবেই আবার নতুন বাঁক নেওয়া যায়, বদল আসে। 

তৈরি হয়ে যায় চমৎকার চিত্রকল্প –   

যে সমস্ত কাতর বিকেল এবং পৌষে উজ্জ্বল মাঠ এখনও তুলি না তারা আর কতদিন? …

টেপাকলে পা ধুয়ে এসে বসতেই সন্ধ্যাকে দেখলাম চুপ ক’রে একদিকে

তাকিয়ে। সেখানে একটু আগেও আলো ছিল গরুমোষ বাথানে উঠেছে

মঙ্গলের কোলঘেঁষা গ্রাম বাঁশ কেটে কাঠুরিয়া সেই পথে গিয়েছে –

কোনো অতিরেক নয়, ঘর-গেরস্থালি প্রেম-ভালোবাসা জড়ানো জীবন তাঁকে দিয়েছিল কবিতার পরিসর।

ভালোবাসতেন পালামৌ, সাঁওতাল পরগনা, মধুপুর, গিরিডি, কোডার্মার জঙ্গলঘেরা গ্রাম, আদিবাসী জনপদ, হাটবাজার আর গড়ে ওঠা স্বাভাবিক জল-জঙ্গল। ভারতবর্ষের নানা প্রদেশের গ্রামের প্রতি ছিল বিশেষ টান। এই বৃহত্তর ভারতকেই তিনি যেমন হৃদয়ে আবেগে গ্রহণ করেছিলেন তেমনই ‘স্টার’ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় কোনো উপলক্ষে কৃষ্ণনগর গেলে ডেকে নিতেন বন্ধুদের, হয়ে যেতেন ‘পুলু’। প্রিয় শিল্পী মান্না দে শুধু বৈচিত্র্যময় অসামান্য গানের জন্যই প্রিয় ছিলেন না, দীর্ঘ প্রবাসী সত্ত্বেও চাল-চলনে, আড্ডায়, বন্ধুবৃত্তে বাঙালিয়ানার জন্যই কবির প্রিয় ছিলেন। কবি ভালোবেসেছেন এই বাঙালিয়ানাকেই। জীবনের প্রবাহে যে-কোনো মূল্যেই একে বজায় রেখেছিলেন ব্যক্তিগত যাপনে, পারিবারিক পরিবেশে, উত্তর-প্রজন্মের প্রতি শিক্ষা-রুচিতেও। মিশেছেন সাধারণ মানুষের সঙ্গে, হেঁটেছেন মিছিল-মিটিংয়ে। বিশ্বাস করতেন যে যার কাজ করে তার যোগ্যতা, রুচি ও সুযোগ অনুযায়ী; কিন্তু প্রত্যেকের স্বতন্ত্র মর্যাদা বা স্থান আছে এই সমাজে। তাই বিস্মিত হন রাজমিস্ত্রির দক্ষতায় যিনি বাড়ি তৈরি করেন – যার ভেতর-বার মিলিয়ে অন্যের আবেগ, কল্পনা, ভালোবাসা-বিচ্ছেদ মিলেমিশে থাকে। জেলেদের জলে ঘাঁটা সাঁতারু চেহারার সৌন্দর্য অবলোকন করেন আবার অপেক্ষারত শ্রমজীবী মানুষের কাজের জন্য শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে অবস্থান দেখে ব্যথিত হন। সহমর্মী হয়ে ওঠেন, এসবই তাঁর কবিতার উপকরণ হয়ে কথা বলে।

পরম মমতায় লিখেছেন –

সাবওয়ে থেকে বের হয়ে স্ট্রিট কার

ছায়াগুলো ছুটছে টেলিভিশনের খোঁজে

ওয়াটারফ্রন্টে টেলিভিশনের বাজার

যুবকদের বুটিকে যুবতীরা কেনাকাটা করে

উজ্জ্বল যুবক যুবতী

তাদের কোনো ছায়া নেই

দুঃখী মানুষের ছায়া

মানুষটা দশাসই, কালো – নাকি সাদা – নাকি বাদামি

খুব ভারী ওর ছায়া আরও ভারী।

মনে পড়ে যায় কৃষ্ণনগরের পথঘাট, ছুটে চলে যাওয়া নদীপথে নৌকো খুলে উজানপথে পাড়ি দেওয়া, নদী পেরোলেই ধানক্ষেত, গ্রাম আর গ্রামের মানুষ, সাধারণ গৃহস্থী সাদা-কালো-বাদামি।

যদিও বৃদ্ধ বকুল এখন আর বসন্তকে মনে করতে পারে না তবু যে আছে বলে পুরনো দিনগুলো তার সঙ্গেই আছে জলাঙ্গির কূলে আমার পুরনো দেশ অনেক ভালোবাসা।

স্মৃতির সরণিতে শৈশব বারবার ফিরে আসে, ফিরে আসে ফেলে আসা দিন। জীবনপ্রেমিক কবির দীর্ঘশ্বাসের মতো কবিতাটি –

সাধ চলে যায়

সাধের আসনখানি পড়ে থাকে

এসে বসে কেউ নাই

সাধও নাই কেউ এসে বসুক সেখানে

আসনের নকশাগুলি

অপরিস্ফুট হতে হতে এতদূর অচেনা দ্যাখাবে

কেউ দেখে বুঝবে না

কত সাধে এ আসন ছিল বর্ণময়

আসনের থেকে উঠে প’ড়ে

মাঠ একদিন

কোনদিকে চলে যায়

সাধের আসন পড়ে থাকে

         অপ্রয়োজনে মূল্যহীন

‘সাধের আসন’-এর বিহারীলাল-কাদম্বরীর মিথটিও ভেঙে করেছেন নতুন নির্মাণ।

কবিতায় জীবনকে শুষে নিয়েছেন ব্লটিংয়ের মতো। সেইসব ভালোবাসা, বিষাদ, শোক অসামান্য মুহূর্ত তৈরি করেছে। আরোপিত নয় কোনোটিই, খুব সহজ, খুব সাধারণ। গভীর বিশ্বাসে পাঠক তাকে গ্রহণ করেছেন।

নব্য তরুণদের চাল-চলনের ছটফটানি দেখে বলতে চেয়েছেন এই চঞ্চলতাই জীবন নয় – গভীর কোনো অনুভবই জীবনের উদ্দেশ্য, যৌবন পার হয়ে কবি বুঝেছেন। আবার সেই চঞ্চলতাই যে ভবিষ্যতের কাণ্ডারি বা দূত তাকে সাদরে বরণ করেছেন –

তোমার বয়স অল্প বলেই

পুরাবৃত্তের একটি লাইনও তোমার পড়া হয়নি

অথচ তুমি যখন

কলেজ থেকে সদর্পে বাড়ি ফেরো

তখন আমি কেন তীর্থপথিকদের পায়ের আওয়াজ শুনি।

সৌমিত্র-র লেখালেখি, সাক্ষাৎকারে আমরা জেনেছি ছাত্রজীবনে বিশেষভাবে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে সিনেমা-নাটকের প্রতি যেমন অপ্রতিরোধ্য টান, দুর্বার আকর্ষণে টাকা-পয়সা জুটিয়ে সেইসব দেখেছেন, আবার ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে বইয়ে মুখ ডুবিয়ে, তুমুল তর্কে, আলাপ-আলোচনায় সিলেবাসের বাইরে জানা শুধু জানা আর  জিজ্ঞাসার তাগিদে ছুটে গিয়েছেন নিয়মিত।

এরই উত্তরপর্বে প্রতিদিন তাঁর তীর্থস্থান ছিল ‘গুরু’ শিশির ভাদুড়ির সঙ্গ। বই দেওয়া-নেওয়া ছিল প্রাত্যহিক।  আর যা পড়লেন তার ওপরেই তার বিনিময়। এই ঋণ অপরিশোধ্য। এই সঙ্গ তাঁর কাছে ছিল সারাজীবনের সমৃদ্ধির অন্যতম সোপান। চলচ্চিত্রের অনুপ্রবেশে শিখেছেন সত্যজিৎ রায়ের কাছে; কিন্তু শিক্ষাগুরু তাঁর শিশির ভাদুড়ি। সহঅভিনেতা-অভিনেত্রীদের অকুণ্ঠ স্বীকৃতি জানিয়েছেন তাঁকে প্রতিনিয়ত আরো ‘কিছু’ করার তাগিদটি তৈরি করার জন্যে। আর কলকাতার প্রতি তাঁর অমোঘ টান। কলকাতাই তাঁকে দিয়েছে সব। তাই পুব-পশ্চিমে ভ্রমণ করলেও ‘এমন করে কেউ তো টানে না।’

কত যত্ন কত বুক পেতে নেওয়া শব্দগুলি কবিতায় অবয়বপ্রাপ্ত হয়েছে, এসব কলকাতার জন্য।

কলকাতা কিছুতেই ফুরোতে চায় না

কোনো রাস্তা ফুরোতে চায় না

কখনও তুমি মিনিবাস ধরে নেবে

আমি ঝংকার দেওয়া ট্রাম

এক চিলতে গলি তারই

তারই অন্ধকারে

আমি স্পর্শ করেছিলাম তোমার দিব্য চিবুক

… … …

ভালোবাসা মানে কেবলই যাওয়া

কলকাতা রোল করা গালিচার মতো কেবলেই খুলে

                                       যাচ্ছে কেবলই।

ভালোবাসার-বিরহের, পাওয়া-না পাওয়া – সবই এই কলকাতায়। মান-অভিমান, গভীর দুঃখবোধের মাঝেও এই শহর। দুঃখের কলকাতা কবিকে আহত করে উত্তেজিত করে কিন্তু এর ঐশ্বর্যই তিনি খুঁজে পেয়েছেন –

ভ্রাম্যমাণ ব্রিফকেসের হাত ধরে

আমি অনেকদিন দূরে দূরে থাকব

একদিন প্রবাসে

এই শহর খবর পাঠাবে খুব সংক্ষেপে

বসন্ত প্রত্যাহৃত পার্কের বৃদ্ধ বকুলে।

তোমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে

আমি ব্রিফকেসটা আছড়ে ভেঙে ফেলব

সব ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যাবে

মহার্ঘ দৃশ্যের পর দৃশ্য

স্বপ্ন গল্প মর্মার্থ অনেক অনেকগুলো

নদীর খবর শস্যক্ষেত্র রূপবান পাহাড়

সব ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যাবে –

তখনও কি তোমার আমার মাঝখানে

এই শহর

দীর্ঘজীবী দুঃখের এ তমসুকখানি

হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে?

কবির ভালোবাসামথিত প্রিয় শহর সুখে-দুঃখে তাঁকে সঙ্গ দেয়। এই শহরেই তিনি সাক্ষী অনেক সম্ভাবনার অনেক বিপ্লবের অনেক আশা-আকাঙ্ক্ষার, স্বপ্নের স্বঙ্গভঙ্গের।

বসন্তে

সিনেমার পোস্টার থেকে রং

          ফেরত আসছে বনে

এরই নাম ফ্লোরসেন্ট সবুজ

বসন্তে বার বার ফিরে আসে।

এই জনপদকে নতুন করে দেবারা

                      কিছু শ্লোগান

ফিরে আসছে দেখতে পাচ্ছি

বিপ্লবী বন্ধুরা ফিরবে কি?

মানুষের মধ্যে অনন্তবৈচিত্র্য দেখে কবি বিস্মিত। জীবনের যা কিছু অনুভব সবই তো মানুষকে ঘিরেই। আনন্দ-দুঃখ, হাসি-কান্না,  শোক-তাপ, চাওয়া-পাওয়া – সবই তো মানুষের জন্যই আবার মানুষের থেকেই। হৃদয়, উত্তাপ, প্রেম, বিরহ সবই তো মানুষকেন্দ্রিক। তাই কবিতায় মানুষের জন্য মানুষের কাছেই তাঁর সব নিবেদন। সংবেদনশীল চিত্ত মানুষের বহু রূপ দেখেছে। অন্তর যেমন তার স্পর্শে ঈশ্বর্যবান হয়েছে, তেমনই আঘাতে রিক্তও হয়েছে।

কবির বোধে মানুষ নিজেই নিজের আশ্রয় হতে পারে। জীবনের উপলব্ধিতে উচ্চারণ করেন –

তোমার আশ্রয় শুধু তুমি হতে পারো

আর কেউ নয় কিছু নয়।

জীবনের চলার পথে অগণিত মানুষ তাঁর স্পর্শ অনুভব উত্তাপ-শীতলতা নিয়ে আমাদের ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায় – কিছু রেশ থাকে কিছু হারিয়ে যায় বিস্মৃতির অতলে। কোনো বিশেষ মুহূর্তে যা অপরিহার্য মনে হয় কালের নিয়মে তাও পরিত্যজ্য হয় অথবা হতে বাধ্য হয়। তবু মানুষ মানুষের মধ্যেই উত্তাপ খোঁজে, মানুষই দিতে পারে সেই আশ্রয়।

কেউ কারো নয় যদি

তবে এত ঝড় তোলা কেন

কেন এত ঢেউ ছল ছল

শালবনে জ্যোৎস্নার ভিতর হেঁটে যাওয়া

এই জীবনের সঙ্গে অনিবার্যভাবে যুক্ত থাকে মৃত্যু। তাই জীবনকে এত গভীরভাবে ভালোবেসেও মৃত্যুচেতনায় কোনো বিষাদ তাঁকে স্পর্শ করেনি।

একটি ভালোবাসা

সব ভালোবাসাকে ডেকে তোলে

আর স্বপ্ন নয়

কুসুম কানন নয়

এবার যে যেতে হবে

সব পথ একটি পথকেই ডেকে আনে

পথেই সব ভালোবাসা

আর কুসুম কানন নয়

আর স্বপ্ন নয়

এবার যে যেতে হবে!

আত্মহত্যাকারীর মনস্তত্ত্বও বুঝতে চেয়েছেন – কয়েকটি কবিতায় – ‘জলমগ্নের প্রতি’ কবিতায় জলে ডুবে আত্মহত্যাকারীর কাছে তাঁর মৃদু উচ্চারণ –

হয়তো জলেরও কিছু কিছু দাবি আছে

পরাজিত হয়ে তুমি মানুষের কাছে

জলের নিকটে গিয়ে চেয়ে নিয়ে ছিলে

শীতলতাঃ …

হ্যাঁ, ঠিকই অংশত জীবনানন্দীয় পঙক্তি স্মৃতিতে এলেও প্রশ্নগুলো অমোঘ। ‘হ্যাপি সুইসাইড’ কবিতাটিতে কবি প্রশ্ন করেছেন বারবার কতখানি দূরত্ব তৈরি হলে প্রিয় মুখগুলির কাছ থেকে মানুষ চলে যেতে চায় –

হ্যাপি সুইসাইড লেখা হয়নি তো

নিজ হতে এতখানি দূরে যেতে পারিনি তো

যতদূরে গেলে

নিজেকেই মৃত্যুকামী অন্য কেউ বলে মনে হবে। –

…  …  …

কারও কারও আঘাত

কটু কথা এমন কী ব্ল্যাকমেল

ছিল নাকি?

– কবিতাটি এত বেশি সামাজিক যে পাঠকের মনও স্পন্দন স্তব্ধ হয়ে আসে। কবিতাটির শেষ পঙক্তিটি – ‘যখন সে পায়ের নিচের টুলটা ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল’ – কবিতাটিতে কবির সঙ্গে পাঠকেরও হাহাকার শোনা যায়। আমরা দেখেছি, কবি মৃত্যুকে স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে গ্রহণ করার চেষ্টা করেছেন কোনো কোনো কবিতায়। জীবনপথের সব পথিকেরই পরিক্রমণ শেষ হয়। কিন্তু এ জন্য কি কোনো অভিমান বহন করে না মানুষ? একটাই তো জীবন, তাই শেষ শয়ানের আপাত শান্তি কি সত্যিই শম-এর?

শেষ শয়ানে সবই শান্ত মনে হয়

জীবনে কতখানি প্রবঞ্চিত হয়ে

            সে ঘুমাতে গেছে

মৃত্যুর মুখোশে তা আঁকা থাকে না

– মৃত্যুপথযাত্রীর অন্তর্লীন বেদনাটি কবিতায় নরম করে কবি তুলে ধরেছেন। এইসব জীবনবোধ তাঁর অভিনয়ে নাটকে ছায়া ফেলেনি কি? ফেলেছে কি?

কবি-অভিনেতা-নাট্যকার-চিত্রশিল্পী সৌমিত্র-র জীবনানুভবের কেন্দ্রে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথ আমাদের জীবনে ব্যথার উপশম করেন, সন্তাপ দূর করে ফিরিয়ে দেন সুস্থতায় – এমনই আমাদের অর্জন বা বিশ্বাস। রবীন্দ্রনাথের জীবন আমাদের শোকের ক্ষতে প্রলেপ দেয় – এমনভাবেই তাঁকে আমরা পেতে চাই। আর কবি সৌমিত্র কী বলেন?

শান্তিনিকেতন ছেড়ে শেষদিন চলে যাবার সময়

তাঁর চোখে ছিল সানগ্লাস

শ্রাবণের সেই দিনে

কী এমন উজ্জ্বল প্রহর থেকে

সানগ্লাসে চোখ ঢেকে

চলে যাও তুমি

রবীন্দ্রনাথ

– রবীন্দ্রনাথের আবেগ কি ছিল যেদিন অনিয়ন্ত্রিত? কবি কি প্রিয়ভূমির বিচ্ছেদে কাতর ছিলেন? এমন করে তো কবি সৌমিত্রর আগে আমরা ভাবিনি।

জীবনের সব আশ্বাস কেমন ওলট-পালট হয়ে যায়।

সব হিসেব ওলট পালট হয়ে যায়

অন্ধকারে গানের শান্ত ছায়া স্থির হয়ে থাকে।

রবীন্দ্রনাথই তো আবার বুঝিয়েছেন ‘জীর্ণতার বক্ষ ভেদি আপনারে করো উন্মোচন’ –    তাই এক জন্মেই জন্মান্তর। সুখ-দুঃখকে ধীরভাবে গ্রহণ করে ডুব দিলে হয়তো, হয়তো কিছুটা ভার লাঘব হয়। কবি চেষ্টা করেন রবীন্দ্রনাথের এই দর্শনকে আত্মস্থ করার। সৌমিত্র বলেছেন, ‘… তখন রবীন্দ্রনাথ শয্যাশায়ী, রানী চন্দকে বলেছিলেন, আমার এই যে এত প্রতাপ, প্রতিপত্তি, নাম-যশ, এসব থেকে আমি পালাতে চাই। এসব আমার ভালো লগে না। এটা আমার একটা ভার। বলে একটু চুপ করে থেকে আবার বলেছিলেন, তবে এই যে কথাটা বললাম, এটা বোধহয় সত্যি নয়। আমায় যদি এখন কেউ এসে বলে, তোমার দণ্ডমুণ্ড খসিয়ে আমি তোমাকে একটা অজানিত মানুষ করে দেব, তাই কি আমার ভালো লাগবে?

রবীন্দ্রনাথের এই সততাটা বিস্ময়কর। এবং শিক্ষণীয়। … একটি গানে তিনি নিজের আত্মপরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘এই আমি যে, ওই আমি নই …’ –

সৌমিত্র জীবনে এটি আত্মস্থ করার চেষ্টা করেছিলেন। এবং উপলব্ধিও করেছিলেন জীবনসায়াহ্নে। তাঁর শিল্পীসত্তার বহুমুখী প্রকাশে রবীন্দ্রনাথ থেকেই প্রেরণা অনুভব করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের মতো গভীর অনুভবী সৃজনশীল সত্তাটি কীভাবে দেশের দশের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বৃহত্তর মানবকল্যাণে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছিলেন এ-সম্পর্কে সৌমিত্রের বিশ্বাসের কথাটি আমরা লক্ষ করতে পারি –

জমিদারি করতে গিয়ে তিনি পল্লী বাংলাকে দেখেছেন। পদ্মায় বোটে করে তিনি ঘুরতেন, নদীতীরে, নদীর ঘাটে। কীভাবে বয়ে চলেছে জীবন, শুধু তাতেই কিন্তু তাঁর পল্লী দর্শন ফুরোয়নি। সত্যটা হচ্ছে, তিনি জমিদারির কাজটাকে খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখতেন। গ্রাম ব্যবস্থা, গ্রাম গঠন, গ্রামের অধঃপতন, গ্রাম পুনর্গঠন সমস্ত তিনি জমিদারির কাজকর্ম সামলাতে গিয়ে দেখেছেন। পর্যবেক্ষণ করেছেন নিবিড়ভাবে। ওই যে জমিদারির ষোলো-আঠারো বছর, ওই সময়টাই হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের সত্যিকার এবং চূড়ান্ত উত্তরণ। ওঁর স্পন্দিত আসে, ওঁর দেশভক্তি, সেইসব অনুভূতি সেই সময়ই একটা নির্দিষ্ট আকার পায়। তিনি দেশকে চিনেছেন, দেশের মানুষকে চিনেছেন। সেই জন্যই ওঁর সাহিত্য এত সমদ্ধ। পল্লী বাংলাকে চেনাটা ওঁর কাছে খুব দরকারি ছিল। তা না হলে ওঁর প্রতিজ্ঞাটা ব্যর্থ যেতে পারত। সখের কবি, সুখের কবি হয়ে থাকতে পারতেন। এই খানেতে সাদায় কালোয় মিলে গেছে আঁধার আলোয়, একথা তাঁর জীবনবোধও বটে। এই হচ্ছে সত্যদ্রষ্টার ভূমিকা। এই রবীন্দ্রনাথকেই আমি সারাজীবন খুঁজি।’

– তাই চলচ্চিত্রে, চিত্রে, নাটকে, কবিতায় অনন্য সৌমিত্র মুখোপাধ্যায়ের সত্তার মধ্যে নিহিত ছিল এই বৃহত্তর গভীর অনুভবটি যা রবীন্দ্র অন্বেষণের স্বরূপটি চিনিয়ে দেয়। তাই তিনি নক্ষত্র হয়েও নক্ষত্রলোকের বাসিন্দা ছিলেন না, বা হতে চাননি।

আপামর বাঙালি তাঁর অভিনয়কে যেমন বিস্ময়ের দৃষ্টিতে দেখতেন, তেমনই তাঁকে আপন ভাবতেন। বাঙালির মেধা, মনন, শিল্পবোধের সঙ্গে যেমন থাকে বিজ্ঞান-সাহিত্য-শ্রমজীবী মানুষ-বাংলার মাঠঘাট-প্রকৃতি-খেলাগুলো, আড্ডা, পত্র-পত্রিকা –    এই পরিচয়টা তিনি সর্বার্থে গ্রহণ ও বহন করেছিলেন। নির্মাল্য আচার্যের সঙ্গে এক্ষণ পত্রিকা সম্পাদনা, প্রুফ দেখা, রচনা সংগ্রহ, প্রকাশ যেভাবে করেছেন সেটি আরেক অধ্যায়।

চিত্রকর সৌমিত্র-র পরিচয়ের অন্তরালেও এই কবিমন। তিনি বলেছেন, কোনো চরিত্রে অভিনয় করার আগে তিনি সেই চরিত্রটির মুখ কী রকম হতে পারে সেটি ভাবতেন। আর কাল্পনিক আঁকিবুকি চলত এ নিয়ে। এ-উৎসটিও বলাই বাহুল্য রবীন্দ্রনাথ –    ‘রবীন্দ্রনাথের নানা ছবিতে যেমন কাটাকুটির ভেতর থেকে একটি মুখাবয়ব জেগে ওঠে, রেখার আপাত অর্থে হিজিবিজি চলন আসলে সেই মুখের গায়ে কখনো আলো তৈরি করে, কখনো আঁধার –  আমি সেই পথে অনেক সময় হাঁটতে চেয়েছি।’

এই বহুমাত্রিক রবীন্দ্র চিন্তন, দর্শন তাঁকে অভিনেতা, কবি আর চিত্রকর হয়ে উঠতে নিঃসন্দেহে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে।

অবিরত জিজ্ঞাসু দৃষ্টি, এই পৃথিবী পারিপার্শ্ব, সমাজ ও সাধারণ মানুষ বিষয়ে তাঁর অনিঃশেষ আগ্রহ তাঁকে পিপাসার্ত করে রেখেছিল। তাই কলেজজীবনে যেমন খুশি বই পড়ার আবহটি শেষ অবধি শুধু নানান বিষয়ে জানার আগ্রহেই পড়বেন, জানবেন – এই তাগিদটি বজায় ছিল। তাঁর শেষ পড়া বইটি ছিল ১৬০৬ : উইলিয়াম শেক্সপিয়র অ্যান্ড দ্য ইয়ার অফ লিয়ার – জেমস স্যাপিরো। শেষ কবিতার বই – শুধু কবিতার জন্য। পুত্র সৌগত চট্টোপাধ্যায় ও তাঁর দুই বন্ধু মিলে প্রকাশিত একটি কবিতা সংকলন, – বলেছেন পুত্র সৌগত।

বিচিত্র বিষয়ের পাঠে আগ্রহী সজীব মন কবিতার পরিসরটিকেও করেছে সমৃদ্ধ।

আবার নাগরিক কবির অনুভবে গ্রামজীবন প্রকৃতি বারবার ফিরে এসেছে। কৃষ্ণনগরের গাছপালা, এক ছুটে নাগাল পাওয়া নদী, ঘরোয়া-মধ্যবিত্ত জীবনযাপন শৈশব-কৈশোরকে ভরিয়ে তুলেছিল। ছেলেবেলা বেড়াতে গিয়ে দার্জিলিংয়ের অপরূপ প্রকৃতি তাঁর মনে স্থায়ী আসন লাভ করেছিল। স্মৃতি থেকে উঠে এসেছে কবিতায়। এসেছে বারো মাসের মধ্যে বিশেষভাবে আশ্বিনের কথা। গ্রামবাংলায় মফস্বলে আশ্বিন উৎসবের, মিলনের, অর্থাৎ বাঙালির সংস্কৃতির এক অসামান্য পরিচয় রচনা করে –

অবশেষে দিন চলে যাবে জোছনার কাছে

চিরায়ুর রহস্য খুঁজিতে এই আশ্বিনেই।

দিনে শর্বরী সুবিশাল স্মৃতিও তো আনে আশ্বিন

জীবনের, জীবন্ত ইচ্ছার স্মৃতি নিয়ে আশ্বিনই এল

এই প্রিয় মাস আশ্বিনেই হয় লিপি বিনিময়, অজ্ঞাতবাস শেষে দেখা হয়, এই সেই সময় যখন নদী হয় উত্তরবাহিনী, রিক্ত গ্রাম হয়ে ওঠে তীর্থভূমি – দুঃসহ নির্জনতার হয় অবসান। অসামান্য এই কবিতাটি হলো ‘একটি বার আশ্বিনে’

… স্বর্গ থেকে বিদায়ের শাপ রক্তমাখা পদচিহ্নগুলি

সর্বনাশা শোকে পথ অন্ধ থাকে সমস্ত বৎসর

আশ্বিনের চুক্তিতে তার সঙ্গে স্থলপদ্মগুলি

অজ্ঞাতবাসের শেষে শমী থেকে খুশি ধনুঃশর

দুঃসহ নির্জনতা এই দেশে গ্রামে মেঘের দুপুরে

একটিবার আশ্বিন আবেগ পাপবিদ্ধ

এ হৃদয় জুড়ে।

চৈত্রের রোদ এসে শরীরকে ভরে দেয় অথবা নীলাকাশে নতুন ছন্দে শরতের অভিলাষ ভ্রমণপিপাসু চিত্তকে করে উতরোল।

কিন্তু এ-কবি প্রকৃতিকে অন্যতর এক অনুসন্ধানে ব্রতী হন। অরণ্যের স্তব্ধ কুসুমহারে অন্য এক সংগীত শোনা যায় যা কবিকে বিস্মিত করে। এ আশ্বিনের মিলন উৎসব অথবা চৈত্রের ঝাঁঝানো রোদ্দুর না এ হলো হৃদয়ের গভীর গোপনের অনাস্বাদিত-অ-পূর্ব  এক অনুভব যা উপলব্ধি হয়, ব্যাখ্যাত হয় না। তবু কবিকে জানাতে নয় লিখতে হয়, না হলে মুক্তি নেই; নিজের কথা নিজে বলে যান কবি – নিজের মুখোমুখি দাঁড়ানো কবিতার আয়নায় নিজেকে দেখা। 

তাই প্রকৃতির উন্মুক্ত সম্পদ হ্রদ, জল, পাহাড়, বনস্থলী, পাখির মতো যাদের কোনো বাঁধন নেই, বাধ্যবাধকতা নেই, তাদের মতো হতে চান নির্ভার। কোনো অনুশোচনা, ভুল-ঠিক – এ হিসেব যাদের করতে হয় না – যেই সেই জীবন খুঁজে বেড়ান কবি –

আপশোসগুলি ফেলে নিয়ে

এইবার সঙ্গে নেব

তুষার জলের নীল হ্রদ …।

শিশুরা কবির বড় প্রিয় ছিল। কবিতায় আসছে শিশুর দল। – অসামান্য চিত্রকল্পও রচিত হয়েছে এই কবিতাটিতে – ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’ –

জল পড়ে পাতা নড়ে

শিশুরা রয়েছে এ শহরে

তারাই পরেছে পায়ে

বৃষ্টির ফেলে যাওয়া জলের নূপুর

স্মরণীয় কয়েকটি কবিতা কবিকে চিনিয়ে দেয়। তাঁর স্বতন্ত্র স্বরটি পাঠকের কাছে আবেদন রাখে – ‘নিসর্গের কাছেই’ –

অজয়ের ওপারেই সূর্য থাকে

বৈকালে ডুবে যায়

জলের ভিতর সোনা থাকে অঢেল তখন

অজয়ের এপারেই জ্যোৎস্না থাকে

ধাতব প্রান্তরে

দেখলাম

চন্দ্রালোকে মন্থর শামুক থাকে প্রান্তরে

এ পৃথিবী কোনদিন সসাগরা ছিল

                স্মরণ করিয়ে দিতে,

রাতের অলৌকিক জ্যোৎস্নার ভিতর

অনিন্দ্য নিসর্গের খুব কাছাকাছি

ঝুপড়িতে গরিবেরা থাকে।

– কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের সম্পদ হয়ে ওঠে।

অনুবাদ করেছেন (১৯৯৮) খলিল জিব্রানের The Prophet। খলিল জিব্রান লেবানিজ-মার্কিন দার্শনিক-কবি। জন্ম ১৮৮৩ সালে। বেঁচেছিলেন মাত্র ৪৮ বছর। তাঁর জনপ্রিয় ইংরেজি বইটি হলো The Prophet। খলিল জিব্রানের কাব্যদর্শনে যতই মার্কিনি ভাব-ভাবনার উপকরণ থাক তবু মূল আস্বাদনটি ছিল ‘সিরিয়া’ বা ‘ভূমধ্যসাগরের সন্নিকট প্রাচ্যের ধূসরতা।’ ভাগ্যান্বেষণে মায়ের সঙ্গে বস্টনে এলেন ভাইবোনেরাসহ। ‘আরবি শিখে এসেছিলেন আগে – এখন শিখছেন ইংরেজি। কিন্তু তাঁর মন পড়ে আছে দেশে। নদীতে ঝরনায় পাহাড়ে উপত্যকায় আপন মনে ঘুরে বেড়াবার ছবিতে। নির্জন আর নিঃশব্দের ডাকে ভরে আছে তাঁর মন।’ বছর তিনেক পরই ফিরে এলেন লেবাননে। শুরু হলো তাঁর নতুন পাঠ। আর সেইসঙ্গে খোলা হাওয়ায় পাহাড়ে, ঝরনায় আর আঙুরবাগানে কারা যেন সেখানে কথা বলে তার সঙ্গে।

কবি সৌমিত্র নিজের গভীর সত্তাকে খুঁড়ে তুলে এনেছেন। শিল্পীর অতৃপ্তি আর জানার অদম্য গূঢ় কৌতূহলে অন্তরের অন্তরে তাঁর আলো ফেলা। মরমি হৃদয়ের খলিল জিব্রানের কবিতায় সেই দর্শন সেই গভীর গোপন কথাগুলি মুক্তো হয়ে ঝরেছে সৌমিত্রের অনুবাদে। আমরাও থিতু হই, দু-দণ্ড নিজের অন্যসব কেজো পরিচয়গুলি সরিয়ে রেখে জীবনের অর্থ কী, মানুষের জীবনের পারিপার্শ্বিক সম্পর্কসূত্র উদ্ধারের চেষ্টা করতে পারি।

অনুবাদের মুখবন্ধে কবির বন্ধু মরমি হৃদয়ের অধিকারী শঙ্খ ঘোষ বলেছেন – ‘সৌমিত্র নিজে যে দীর্ঘকাল ধরে অন্তর্নিবিষ্টভাবে কবিতা লিখে চলেছেন, তাঁর অভিনয় ক্ষমতার আড়ালে সে-কথাটা অনেকখানি চাপা পড়ে গেছে। … কবিতার সেই নিজস্ব অভিজ্ঞতা না থাকলে এ-বইটি তার যথার্থ ভাষা পেত না, সে-কথা বোঝা যায়। অনুবাদের অর্থ পৃষ্ঠাকটি পড়তে পড়তে, খলিল জিব্রানের কবিতার দিকেই নয় শুধু, হয়তো সৌমিত্রের নিজেরও কবিতার দিকে কোনো কোনো পাঠকের দৃষ্টি পৌঁছতে পারে নতুন করে।’ (২২ জানুয়ারি, ১৯৯৮)।

অনুবাদে আগ্রহ ছিল প্রথমাবধি। তাঁর রচিত নাটকগুলি বিদেশি নাটক বা গল্পের অনুকরণে দেশীয় প্রেক্ষাপটে নবরূপ লাভ করেছে। ব্রেখট্ নিয়ে বিগত কিছু বছরের যে আগ্রহ-উৎসাহ আমরা এখানে  লক্ষ করেছি তার অনেক আগেই ব্রেখটের কবিতা অনুবাদ করেছিলেন।

খলিল জিব্রানের ‘The Prophet’ সমাজের বিভিন্ন পেশার বিভিন্ন স্তরের মানুষের জিজ্ঞাসার উত্তরের বয়ানে রচিত।

স্বাধীনতা সম্পর্কে এক দেশসেবিকাকে বলছেন – ‘… হ্যাঁ, মন্দিরের কাননকুঞ্জে কি দুর্গের ছায়াচ্ছন্নতায় তোমাদের মধ্যে যারা সব থেকে বেশি স্বাধিকার প্রমত্ত তারা দেখেছি তাদের স্বাধীনতা শৃঙ্খল আর বেড়ির মতো ধারণ করে আছে।’

এমনও বলেছেন প্রেম সম্পর্কে – ‘যখন ভালোবাসবে তখন বোলো না ঈশ্বরে রয়েছেন আমার হৃদয়ে বরং বোলো আমিই ঈশ্বরের হৃদিস্থিত।’

The Prophet’-এ আছে সাধারণ মানুষের কথাও –   

‘চলো আমাদের সঙ্গে শস্যক্ষেত্রে, কিংবা আমাদের মাল্লাভাইদের সঙ্গে সমুদ্রে গিয়ে জাল ফেলো …

… তোমাদের মধ্যে যে সামান্যতম তার প্রয়োজন যদি না মেটে তাহলে বাতাসের স্পর্শেও বিশ্ববিধাতার চোখে ঘুম নেবে আসবে না’

কেবল অধ্যাত্মবাদ নয়, খলিল জিব্রানের চমৎকার অনুবাদে কবি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় লিখছেন – 

তোমাদের প্রাত্যহিক জীবনই তোমাদের মন্দির এবং ধর্ম।

যখনই সেখানে প্রবেশ করবে সবকিছু নিয়ে যাবে,

শাবল নেবে, হাপর নেবে, হাতুড়ি নেবে, বীণাটিও নেবে

যা যা তুমি তৈরি করেছ, তোমার প্রয়োজন কিংবা আমাদের জন্য।’

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের চলচ্চিত্রে অভিনয় বা কাব্যস্তরের নির্মিতি কখনোই চড়া সুরে বাঁধা ছিল না, বলতে গেলে অভিনয়ের ÔUnder acting’ আর  কাব্যনির্মিতি এই আধুনিক মেলবন্ধন উভয় শিল্পমাধ্যমকেই চূড়ান্ত সার্থকতায় পৌঁছে দিয়েছিল। বাংলা কবিতার জগতে এই কবির পাঠ ও নবমূল্যায়ন আজ পাঠকের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।   

গ্রন্থঋণ

১. কবিতা সমগ্র, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সিগনেট প্রেস কলকাতা, দ্বিতীয় মুদ্রণ, ২০১৮।

২. আত্মপরিচয় আমার ভাবনা : আমার স্মৃতি, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, পত্রভারতী, নভেম্বর ২০২০।

৩. কবিতার প্রতিলিপি, সৌজন্যে সৌগত চট্টোপাধ্যায় ও পৌলমী বসু। ৎ    অরণ্যের স্তব্ধ কুসুমহারে অন্য এক সংগীত শোনা যায় যা কবিকে বিস্মিত করে। এ আশ্বিনের মিলন উৎসব অথবা চৈত্রের ঝাঁঝানো রোদ্দুর না এ হলো হৃদয়ের গভীর গোপনের অনাস্বাদিত-অ-পূর্ব  এক অনুভব যা উপলব্ধি হয়, ব্যাখ্যাত হয় না। তবু কবিকে জানাতে নয় লিখতে হয়, না হলে মুক্তি নেই; নিজের কথা নিজে বলে যান কবি – নিজের মুখোমুখি দাঁড়ানো কবিতার আয়নায় নিজেকে দেখা। 

তাই প্রকৃতির উন্মুক্ত সম্পদ হ্রদ, জল, পাহাড়, বনস্থলী, পাখির মতো যাদের কোনো বাঁধন নেই, বাধ্যবাধকতা নেই, তাদের মতো হতে চান নির্ভার। কোনো অনুশোচনা, ভুল-ঠিক – এ হিসেব যাদের করতে হয় না – যেই সেই জীবন খুঁজে বেড়ান কবি –

আপশোসগুলি ফেলে নিয়ে

এইবার সঙ্গে নেব

তুষার জলের নীল হ্রদ …।

শিশুরা কবির বড় প্রিয় ছিল। কবিতায় আসছে শিশুর দল। – অসামান্য চিত্রকল্পও রচিত হয়েছে এই কবিতাটিতে – ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’ –

জল পড়ে পাতা নড়ে

শিশুরা রয়েছে এ শহরে

তারাই পরেছে পায়ে

বৃষ্টির ফেলে যাওয়া জলের নূপুর

স্মরণীয় কয়েকটি কবিতা কবিকে চিনিয়ে দেয়। তাঁর স্বতন্ত্র স্বরটি পাঠকের কাছে আবেদন রাখে – ‘নিসর্গের কাছেই’ –

অজয়ের ওপারেই সূর্য থাকে

বৈকালে ডুবে যায়

জলের ভিতর সোনা থাকে অঢেল তখন

অজয়ের এপারেই জ্যোৎস্না থাকে

ধাতব প্রান্তরে

দেখলাম

চন্দ্রালোকে মন্থর শামুক থাকে প্রান্তরে

এ পৃথিবী কোনদিন সসাগরা ছিল

                স্মরণ করিয়ে দিতে,

রাতের অলৌকিক জ্যোৎস্নার ভিতর

অনিন্দ্য নিসর্গের খুব কাছাকাছি

ঝুপড়িতে গরিবেরা থাকে।

– কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের সম্পদ হয়ে ওঠে।

অনুবাদ করেছেন (১৯৯৮) খলিল জিব্রানের ঞযব চৎড়ঢ়যবঃ। খলিল জিব্রান লেবানিজ-মার্কিন দার্শনিক-কবি। জন্ম ১৮৮৩ সালে। বেঁচেছিলেন মাত্র ৪৮ বছর। তাঁর জনপ্রিয় ইংরেজি বইটি হলো ঞযব চৎড়ঢ়যবঃ। খলিল জিব্রানের কাব্যদর্শনে যতই মার্কিনি ভাব-ভাবনার উপকরণ থাক তবু মূল আস্বাদনটি ছিল ‘সিরিয়া’ বা ‘ভূমধ্যসাগরের সন্নিকট প্রাচ্যের ধূসরতা।’ ভাগ্যান্বেষণে মায়ের সঙ্গে বস্টনে এলেন ভাইবোনেরাসহ। ‘আরবি শিখে এসেছিলেন আগে – এখন শিখছেন ইংরেজি। কিন্তু তাঁর মন পড়ে আছে দেশে। নদীতে ঝরনায় পাহাড়ে উপত্যকায় আপন মনে ঘুরে বেড়াবার ছবিতে। নির্জন আর নিঃশব্দের ডাকে ভরে আছে তাঁর মন।’ বছর তিনেক পরই ফিরে এলেন লেবাননে। শুরু হলো তাঁর নতুন পাঠ। আর সেইসঙ্গে খোলা হাওয়ায় পাহাড়ে, ঝরনায় আর আঙুরবাগানে কারা যেন সেখানে কথা বলে তার সঙ্গে।

কবি সৌমিত্র নিজের গভীর সত্তাকে খুঁড়ে তুলে এনেছেন। শিল্পীর অতৃপ্তি আর জানার অদম্য গূঢ় কৌতূহলে অন্তরের অন্তরে তাঁর আলো ফেলা। মরমি হৃদয়ের খলিল জিব্রানের কবিতায় সেই দর্শন সেই গভীর গোপন কথাগুলি মুক্তো হয়ে ঝরেছে সৌমিত্রের অনুবাদে। আমরাও থিতু হই, দু-দণ্ড নিজের অন্যসব কেজো পরিচয়গুলি সরিয়ে রেখে জীবনের অর্থ কী, মানুষের জীবনের পারিপার্শ্বিক সম্পর্কসূত্র উদ্ধারের চেষ্টা করতে পারি।

অনুবাদের মুখবন্ধে কবির বন্ধু মরমি হৃদয়ের অধিকারী শঙ্খ ঘোষ বলেছেন – ‘সৌমিত্র নিজে যে দীর্ঘকাল ধরে অন্তর্নিবিষ্টভাবে কবিতা লিখে চলেছেন, তাঁর অভিনয় ক্ষমতার আড়ালে সে-কথাটা অনেকখানি চাপা পড়ে গেছে। … কবিতার সেই নিজস্ব অভিজ্ঞতা না থাকলে এ-বইটি তার যথার্থ ভাষা পেত না, সে-কথা বোঝা যায়। অনুবাদের অর্থ পৃষ্ঠাকটি পড়তে পড়তে, খলিল জিব্রানের কবিতার দিকেই নয় শুধু, হয়তো সৌমিত্রের নিজেরও কবিতার দিকে কোনো কোনো পাঠকের দৃষ্টি পৌঁছতে পারে নতুন করে।’ (২২ জানুয়ারি, ১৯৯৮)।

অনুবাদে আগ্রহ ছিল প্রথমাবধি। তাঁর রচিত নাটকগুলি বিদেশি নাটক বা গল্পের অনুকরণে দেশীয় প্রেক্ষাপটে নবরূপ লাভ করেছে। ব্রেখট্ নিয়ে বিগত কিছু বছরের যে আগ্রহ-উৎসাহ আমরা এখানে  লক্ষ করেছি তার অনেক আগেই ব্রেখটের কবিতা অনুবাদ করেছিলেন।

খলিল জিব্রানের ÔThe Prophet’ সমাজের বিভিন্ন পেশার বিভিন্ন স্তরের মানুষের জিজ্ঞাসার উত্তরের বয়ানে রচিত।

স্বাধীনতা সম্পর্কে এক দেশসেবিকাকে বলছেন – ‘… হ্যাঁ, মন্দিরের কাননকুঞ্জে কি দুর্গের ছায়াচ্ছন্নতায় তোমাদের মধ্যে যারা সব থেকে বেশি স্বাধিকার প্রমত্ত তারা দেখেছি তাদের স্বাধীনতা শৃঙ্খল আর বেড়ির মতো ধারণ করে আছে।’

এমনও বলেছেন প্রেম সম্পর্কে – ‘যখন ভালোবাসবে তখন বোলো না ঈশ্বরে রয়েছেন আমার হৃদয়ে বরং বোলো আমিই ঈশ্বরের হৃদিস্থিত।’

ÔThe Prophet’-এ আছে সাধারণ মানুষের কথাও –   

‘চলো আমাদের সঙ্গে শস্যক্ষেত্রে, কিংবা আমাদের মাল্লাভাইদের সঙ্গে সমুদ্রে গিয়ে জাল ফেলো …

… তোমাদের মধ্যে যে সামান্যতম তার প্রয়োজন যদি না মেটে তাহলে বাতাসের স্পর্শেও বিশ্ববিধাতার চোখে ঘুম নেবে আসবে না’

কেবল অধ্যাত্মবাদ নয়, খলিল জিব্রানের চমৎকার অনুবাদে কবি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় লিখছেন  – 

তোমাদের প্রাত্যহিক জীবনই তোমাদের মন্দির এবং ধর্ম।

যখনই সেখানে প্রবেশ করবে সবকিছু নিয়ে যাবে,

শাবল নেবে, হাপর নেবে, হাতুড়ি নেবে, বীণাটিও নেবে

যা যা তুমি তৈরি করেছ, তোমার প্রয়োজন কিংবা আমাদের জন্য।’

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের চলচ্চিত্রে অভিনয় বা কাব্যস্তরের নির্মিতি কখনোই চড়া সুরে বাঁধা ছিল না, বলতে গেলে অভিনয়ের ÔUnder acting’ আর  কাব্যনির্মিতি এই আধুনিক মেলবন্ধন উভয় শিল্পমাধ্যমকেই চূড়ান্ত সার্থকতায় পৌঁছে দিয়েছিল। বাংলা কবিতার জগতে এই কবির পাঠ ও নবমূল্যায়ন আজ পাঠকের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।   

গ্রন্থঋণ

১.      কবিতা সমগ্র, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সিগনেট প্রেস কলকাতা, দ্বিতীয় মুদ্রণ, ২০১৮।

২.      আত্মপরিচয় আমার ভাবনা : আমার স্মৃতি, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, পত্রভারতী, নভেম্বর ২০২০। ৩.      কবিতার প্রতিলিপি, সৌজন্যে সৌগত চট্টোপাধ্যায় ও পৌলমী বসু।

Leave a Reply