সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র অনুবাদ-নিবন্ধ : উজবেকিস্তানের লেখক

পূর্বলেখা : ভূঁইয়া ইকবাল

সাজ্জাদ শরিফ-সম্পাদিত অগ্রন্থিত রচনা, সৈয়দ আকরম হোসেন-সম্পাদিত সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্-রচনাবলী (২ খ-) কিংবা সৈয়দ আবুল মকসুদের সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্/ জীবন ও সাহিত্যকর্মে (২ খ-) ওয়ালীউল্লাহ্র ইংরেজি থেকে বাংলায় অনূদিত কোনো রচনা সংগ্রথিত হয়নি।
ওয়ালীউল্লাহ্র একটি অনুবাদ-নিবন্ধ পাওয়া গেছে। ইন্টারন্যাশনাল লিটারেচার পত্রিকায় প্রকাশিত (অষ্টম সংখ্যা ১৯৪৩) রুশ লেখিকা লিডি[দ]য়া বাতোভার একটি নিবন্ধ ইংরেজি থেকে বাংলায় তরজমা করেছিলেন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ ‘উজবেকিস্তানের লেখক’ নামে।
সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার-সম্পাদিত কলকাতার সাপ্তাহিক অরণি (প্রথম প্রকাশ ২২ আগস্ট ১৯৪১) পত্রিকায় লেখাটি প্রকাশ পায় (২৮ জুলাই ১৯৪৪)। একই বছর পূবর্বাশা-সম্পাদক সঞ্জয় ভট্টাচার্য প্রকাশ করেছিলেন ওয়ালীউল্লাহ্র প্রথম গল্পগ্রন্থ নয়নচারা।
অরণিতে প্রবন্ধ-অনুবাদকদের মধ্যে ছিলেন অরুণ মিত্র, বিষ্ণু দে, দেবপ্রসাদ চক্রবর্তী ও দীপ্তি কল্যাণ চৌধুরী।
অরণির লেখক-তালিকা আজকের পরিপ্রেক্ষেতেও ঈর্ষণীয়; অচ্যুৎ গোস্বামী, অরুণ মিত্র, গোপাল হালদার, গোলাম কুদ্দুস, ননী ভৌমিক, বিনয় ঘোষ, বিষ্ণু দে, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, আবুল মনসুর আহমদ, শওকত ওসমান, শামসুদ্দীন আবুল কালাম, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সোমেন চন্দ, নরেন্দ্রনাথ মিত্র, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, শম্ভু মিত্র, সুকান্ত ভট্টাচার্য, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ প্রমুখ।
ওয়ালীউল্লাহ্র অন্তত দুটি গল্প প্রকাশ পায় অরণিতে : ‘নীলাকাশ’ ও ‘খেয়াঘাট’। (কার্তিক লাহিড়ী, অরণি/ একটি আন্দোলন একটি পত্রিকা, এক্ষণ শারদীয় সংখ্যা ১৩৮৮)
‘উজবেকিস্তানের লেখক’ নিবন্ধের মধ্যে উজবেক কবি শেখ জেদের WHEREFORE THE STRUGGLE কবিতার (সম্ভবত অংশ) তরজমা করেন ওয়ালীউল্লাহ্।
ওয়ালীউল্লাহ্র দুটি কবিতা (‘প্রকল্প’ ও ‘তুমি’) পাওয়া গেলেও তাঁর কাব্যপ্রয়াসের আর কোনো নমুনা পাওয়া যায়নি। এ পর্যন্ত ওয়ালীউল্লাহ্-কৃত ইংরেজি থেকে বাংলায় কোনো অনূদিত রচনার সন্ধানও পাওয়া যায়নি।
এই লেখাটির প্রতিলিপি পেয়েছি কলকাতার জাতীয় গ্রন্থাগারের সৌজন্যে।

উজবেকিস্তানের লেখক
একদিন উজবেকের কবি গফুর গুল্ইয়াম আমাকে তাঁর সেখানে যেতে আমন্ত্রণ করলেন। তিনি তাঁর ঠিকানা দিলেন না, শুধু বললেন : ‘‘পুরোনো শহরটায় যাবেন, গিয়ে যে কোন লোককে জিজ্ঞেস করবেন, আমি কোথায় থাকি এবং আপনাকে সে আমার দোর পর্য্যন্ত পৌঁছে দেবে।’’
তাশকন্দ-এর অধিবাসী এক লক্ষর ওপরে, এবং তার প্রায় অর্ধেক বাস করে ‘‘পুরোনো শহরে’’। তবু গফুর গুল্ইয়ামের ঘর চেনে প্রত্যেকে, কারণ উজবেকিস্তানের চিরকেলে প্রথা হ’লো কবিদের শ্রদ্ধা করা, ভালোবাসা। কবির কথা মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে, পুনরাবৃত হয়, মুখস্থ করা হয়।
শতাব্দীগুলো পেরিয়ে উজবেক-কবিতা যে-পথে এসেচে সে-পথ বড় সোজা নয়। এক-এক সময়ে তা অনেক উঁচুতে উঠেছে, এক-এক সময় ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েচে। কিন্তু সোভিয়েতের কালে এ আবার নোতুন করে প্রস্ফুটিত হয়ে উঠেছে এবং এ-কথা বিশেষভাবে গত বছরের জন্যে সত্যি। বর্তমানে মৌলিকতা ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ পাকা ও ওস্তাদ লিখিয়ে অনেক রয়েচেন উজবেকিস্তানে, তাঁদের ধরণও যেমন বিভিন্ন, ক্ষেত্রও তেমন প্রশস্ত। এবং যুদ্ধ প্রচারের তীক্ষনতা ও উদ্দেশ্য দিয়েচে তাদের আর্টে।
গফুর গুল্ইয়াম – যাঁর পূর্বপুরুষদের অনেক গোষ্ঠীতেই কবি ছিলেন – তাঁর সম্বন্ধে সত্যি এ-কথা বলা যেতে পারে যে,
মাতৃ-দুগ্ধের সঙ্গে তিনি কবিতা-পান করেচেন। জীবনের সত্য তাঁর লেখায়-লেখায় স্পন্দিত হয়। জনগণের কবি হয়ে তিনি সমগ্র মানবজাতির সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ বোধ করেন। বিষয় যা-কিছু হোক না কেন, গফুর গুল্ইয়াম তা উঁচুতে, কাব্যিক সামান্যীকরণের স্তরে নিয়ে যাবেন। মেয়েদের সম্বন্ধে এবং জগতে তাদের মূল্য সম্বন্ধে বলতে গিয়ে তিনি বলেন :
তোমরা – সকল মানবজাতির চিরন্তন মাতা,
তোমরা – সমাপ্তিহীন পার্থিব জীবনের বন্ধক!
এবং কবি এমন একটা সুন্দর বিরাট প্রতিরূপ হাঁকলেন যেখানে মা, বোন ও সাথী এক হয়ে মিলে গেলো। উজবেকিস্তানে – সেখানে যুগ যুগ ধরে নারী ছিলো ক্রীতদাসী, জাইগাদ্, পুরুষের ক্রীড়নক – সেখানে তাঁর বাইবেলের মত সহজ-সরল ও জোরালো লেখা যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে।
গফুর গুল্ইয়ামকে কঠিন শিক্ষালাভ করতে হয়েছিল। ছেলেবেলায় কাগজ বিক্রী করেচেন, মুচির শিক্ষানবীশ হয়েচেন, তামাকের কারখানার শ্রমিক হয়েচেন, এবং আফিমের আড্ডায় পরিচারক-ও হয়েচেন। রাস্তার লোভ ও কলুষের মধ্যে দিয়ে এসে সোভিয়েত ব্যবস্থায় তিনি ডুবে গেলেন শিশু-মনস্তাত্ত্বিক শিক্ষকরূপে। তার পরে হলেন শক্তিশালী সাংবাদিক এবং অবশেষে বৃত্তোপজীবী কবি।
বিদেশী ও রুশ-সাহিত্যে তিনি গভীরভাবে কৌতূহলী ও প–ত। পুশকিন, টলস্টয় এবং শেক্সপীয়রের চমৎকার অনুবাদ করেচেন তিনি। গফুর গুল্ইয়ামের উজবেকে ভাষান্তরিত ‘ওথেলো’ উজবেকিস্তানের ‘‘খামজা’’ নাট্যালয়ের ভান্ডারে ছিল বহু বছর এবং তিনিই ভাদিমির মায়াকভ্স্কির ‘At the Top of My Voice’ কবিতাটির অনুবাদ করেন। রসিক অনুবাদক গফুর গুল্ইয়াম গদ্যও লিখে থাকেন। কতগুলো ছোটগল্প এবং ‘‘অপকারক ছেলেটি’’ নামক একটি আত্মজীবনী-মূলক উপন্যাসের লেখক তিনি। জন-গীতির ধর্মের ছাপ তাঁর লেখায়-লেখায়।
উজবেকের লোকদের দান সোনার এক পানপাত্র জেনেরাল রোকোসোভ্স্কিকে উপহার দিয়ে কবি খামিদ আলিমজান বললেন : ‘‘প্রেমের নিদর্শন এই পানপাত্র যেন জয়ের সুরায় পূর্ণ হয়ে ওঠে।’’ এ-ভাবে এই রূপক – যা প্রাচ্যের কবিতার চিরন্তন অবলম্বন – আজকের ভাব ব্যক্ত করচে। এই হলো আধুনিক উজবেক-কবিতার বৈশিষ্ট্য। প্রাচীন ধারাগুলিরও জন-গীতি সঙ্গে যে নিবিড় মিল আছে উজবেকিস্তানের অধিকাংশ কবিদের লেখায়, তা বেশ স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে। আলিমজান অতি নিপুণভাবে আধুনিক কঠিন তীব্র বিষয়গুলো আবৃত করেন ক্লাসিকাল ধারায়। বোধহয় খামিদ আলিমজানই কবিতায় সাম্প্রতিকতা এনেচেন যাতে রাজনীতিক প্রসঙ্গগুলো Lyrico-romantic ধরণে লেখা হয়েছে। শেষ দলের হলো ‘‘জয়নাব’’ ও ‘‘আমান’’। এ হলো তরুণ, চিরন্তন সব-আবৃত-করা প্রেমের কবিতা – রোমিও ও জুলিয়েট এবং ট্রিষ্টান ও আইসোল্ড-এর স্মৃতি, কিন্তু শেষটি হলো আনন্দময়। ‘‘বন্ধুত্ব ও আনুগত্যের কাহিনী হলো এটি,’’ কবি বলেন। তাদের সুখের জন্যে প্রেমিকরা দেশের কাছে ঋণী – যে দেশে ভেঙ্গে গেছে মোসলেম মধ্যযুগীয় নিগড় – যা নারীকে যাদুমন্ত্রে যেন ক্রীতদাসী করে তুলেছিল।
কবির সমস্ত সৃষ্টির তলে রয়েচে দেশের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ।
আপন মৃত্তিকার ওপর দিয়ে
যখন আমি চলি,
একটি পূর্ণ ভাব জাগ্রত হয়ে ওঠে আমার মাঝে
এবং পুষ্পিত মালঞ্চের মাটিতে
প্রতি পদক্ষেপে আমি চুমো দিতে রাজি।’’
এবং দেশের প্রতি এই অনুরাগ তাঁর যুদ্ধকালীন কবিতায় আরো বিশেষভাবে তীব্র হয়ে উঠেচে। Moscow, Trick-riders Go to the Front, We Will Conquer, Mother, এবং আরো অনেক কবিতায়। খামিদ আলিমজান তাঁর ঐতিহাসিক নাটক ‘‘মুকান্না’’য় যে বিষয় হতে প্রেরণা পেয়েছেন, তা হলো : মাতৃভূমির প্রতি ঐকামিত্মকতা, স্বাধীনতার প্রতি অনুরাগ এবং এ সবের জন্য মানুষের সংগ্রাম।
আট শতকের জাতীয় বীরকে নিয়ে লেখা এই নাটক কবিতায় রচিত। এটা একটা বীরোচিত-ট্রাজেডি। চরিত্র-অংকনে ও মানুষিক আবেগ-উচ্ছ্বাসে ধরণটা হয়েছে শেক্সপীয়রীয় এবং এটি উজবেকিস্তানীদের আরবদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের নামে উৎসর্গীত হয়েচে। আরবরা সাত ও আট শতকে এদেশ পরাধীন করেছিল। আট শতকের শেষ অর্ধেকে দেশের আরবদের বিরুদ্ধে একটা জন-আন্দোলন হলো এবং এর নেতা হলেন হাশিম ওরফে মুকান্না – যাঁর শক্তি ছিল অপর্যাপ্ত, মন ছিল তীব্র ও সূক্ষ্ম, আর আত্মা ছিল মহান।
নাটকে অংকিত মুকান্না গভীরভাবে মানবীয় ও বহুমুখী স্বভাবের। তাঁর স্ত্রী গুলায়েনকে পূর্বের জীন দ্য আর্ক-রূপে আঁকা হয়েচে। মানসিক শক্তি ও সাহসিকতা, নারীদের কোমলতা তাঁর চরিত্রকে প্রশংসনীয় ও আকর্ষণীয় করেচে।
‘‘উজবেক-কাব্যের তীব্র রোমান্টিক রঙ-জৌলুষ কিন্তু বাস্তববাদকে জয়ী হতে বাধা দেয় না।’’ – কবি শেখ-জেদ তাঁর দেশের কাব্যের প্রধান ধারাগুলো বর্ণনা করতে গিয়ে বলেচেন।
শেখ-জেদ হলো নিজস্ব ধাঁচে গঠিত কবি। আজারবাইজানে বিখ্যাত নিজামীর১ জন্মস্থান গানজা’র (এখন কিরোবাবাদ) কাছে তাঁর জন্ম। এবং পূর্ব ও পশ্চিমের দু’ধারার সংস্কৃতি তিনি আয়ত্ত করেছেন। স্কুল দিন থেকেই তিনি পৃথিবীর সর্বোৎকৃষ্ট সাহিত্যগুলোর সঙ্গে পরিচিত ছিলেন, যথা : শেক্সপীয়র ও বায়রন, পুশকিন ও লারমন-তভ্, রেসিনি ও হুগো, নাভোয়২ এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর তুরস্কের লেখকরা।
কবি, জ্ঞানী, ঐতিহাসিক ও সাহিত্যপ–ত শেখ-জেদ রুস্ত-হাভেলি, গ্যেটে, পুশকিন, লারমন-তভ, মায়াকভস্কি, নাভোয় এবং বাবর প্রভৃতি দুনিয়ার ক্লাসিক-সাহিত্যের প্রকরণ-গ্রন্থের (mono-graphs) লেখক।
শেখ-জেদের কবিতা দার্শনিক। বর্তমানে যুদ্ধ-সম্বন্ধীয় তাঁর একটি কবিতায় (Wherefore the Struggle) শেখ-জেদ স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, মর্যাদা ও প্রাণ রক্ষার জন্যে যুদ্ধ করা উচিত :
শিশুকাল, যৌবন, বার্ধক্য, রক্ত ও
প্রতিহিংসার জন্যে,
আমাদের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও সম্মানের জন্যে,
স্নেহপরায়ণ মায়েদের গানের জন্যে,
মেয়ে ও বোন – যারা পরান্জার৩
লজ্জা জানে না – তাদের জন্যে;
আমাদের দেশ ও দেশের সীমারেখার জন্যে,
তুলো, রুটি ও আকতাশ মধুর জন্যে,
প্রত্যেকটি ফলোদ্যানের মিষ্টতম ফলের জন্যে,
আমাদের চমৎকার কারখানা মালের জন্যে,
প্রাচীন প্রাসাদ ও সমরকন্দের জন্যে,
উলুক-বেগের৪ কবরের জন্যে,
এবং বিজ্ঞানের নিয়তির জন্যে আমরা চালাচ্ছি
এ-সংগ্রাম।
শেখ-জেদের অন্যতম চমৎকার রচনা হলো তাঁর বিরাট কবিতা : যোসেফ স্টালিন। এ-কবিতায় নেতা, শ্রমিকের বন্ধু ও রক্ষাকর্ত্তা স্টালিনের জীবন্ত ছবি এঁকেছেন কবি।
শেখ-জেদের লেখায় তাঁর প্রিয় কবি নাভোয়, ফুটে ওঠেন। শেখ-জেদ ছাড়া আরো কয়েকজন কবি আলিশের নাভোয় থেকে প্রেরণা পেয়ে থাকেন। প্রখ্যাত উজবেক কবি ও গদ্যলেখক আইবেক তাঁর একটি উপন্যাসের নায়ক করেছেন তাঁকে। আইবেক – যিনি তাঁর সাহিত্য-জীবন শুরু করেন গীতি-কবি হিসেবে প্রতীকী ও রোমামিত্মক কবিতা লিখে – গত কয়েক বছরের মধ্যে গদ্যে তিনি স্থূল-কঠিন বাস্তবতা আনতে সক্ষম হয়েছেন।
আইবেকের একটা কথা বলা অভ্যাস যে, তাঁর প্রিয় লেখক বালজাক থেকে তিনি শিখেছেন অনেক কিছু। তাঁর প্রথম উপন্যাস Sacred Blood-এ তিনি প্রাক্-বিপস্নব জার-উপনিবেশ উজবেকিস্তানের জীবন এঁকেছেন। সমসাময়িকতা, দৃশ্য এবং জীবনের ধরণ ইত্যাদি অংকনে খাঁটি বাস্তববাদিতার প্রমাণ মেলে। Sacred Blood-এ টাইপের পূর্ণতা রয়েছে : বণিক, কারিগর, চাকর, ইন্টেলেক্চুয়াল, এবং গাঁয়ের সরল ছেলে য়ুলচি – (যে হ’লো নায়ক) – প্রমুখ এর টাইপ।
বাপের মৃত্যুর পর জীবিকা উপায়ের সন্ধানে য়ুল্চি শহরে গেল, সেখানে তারই চাচা ধনী তাশকেণ্ট-বণিক তাকে ভাড়া নিল। মির্জা করিম বয় লোভী মানুষ, ভাইপোকে exploit করল তো করলই, তার ওপর তার প্রেমিকা গুল্নার – করিম বয়েরই কাজে অন্য আরেক শ্রমিকের মেয়ে – তাকেও ছিনিয়ে নিল তার কাছ থেকে। গুল্নারকে দেখে বণিকের পছন্দ হলো, তাকে কিনে বিয়ে করে ফেলল, এবং শ্রমের পাওনা না দিয়ে সে য়ুলচিকে দিল তার ঘর থেকে তাড়িয়ে।
আইবেক স্বদেশহিতৈষী যুদ্ধে (patriotic-war) গিয়েছিলেন। তিনি ভাবুকের ধ্যানী দৃষ্টিতে চেয়ে চেয়ে দেখেছেন আগাগোড়া ফাশিস্তদের ধ্বংস-লীলা। তিনি দেখলেন, রক্ত, রিক্ত মাটি, এতিম ছেলেমেয়ে। তিনি বীর দেখলেন, দেখলেন সাধারণ সাহসী গ্রাম্য লোক। ইউ.এস.এস. আর-এ সমগ্র মানবের সৌভ্রাত্রের দৃঢ়বন্ধন তিনি দেখলেন এবং তাদের মধ্যে তাঁর নিজেদেরই লোক দেখলেন যারা পৃথিবীকে দিয়েছে কুচকার টুর-ডিয়েভ্, যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত সিরাজুদ্দিন ভালিয়েভ্ প্রভৃতির মত অনেক কাহিনী-উদ্দীপক বীর। যুদ্ধ এবং দেশের রক্ষাকর্তারা তাঁর সবর্বশেষ উপন্যাসের বিষয়। তার আর্টে তিনি সেই শিল্পীর উৎকর্ষতা লাভ করেছেন যে-শিল্পীর কাছে এটা পরিষ্কার ব্যাপার যে, যতদিন একটি শত্রম্নও সোবিয়েত ভূমি পদদলিত করবে ততদিন পর্যন্ত শান্ত জীবন যাপন অসম্ভব।
আলিমজান, গফুর গুলইয়াম, শেখ-জেদ এবং আইবেক – এঁরা সাহিত্যের একই আমলের এবং একই দলের। অধুনা কয়েকজন নবীন কবি নাম করেছেন। প্রাক্-যুদ্ধ সময়ে লিখিত তাঁদের লেখা আনন্দময় ও আশাবাদী। যুদ্ধ তাঁদের সুর বদলে দিয়েছে তীব্র রাগ ও ক্রোধে। তাঁরা যে সোবিয়েত ইউনিয়নের লোক একথা তাঁরা তীব্র ও গভীরভাবে বুঝতে পেরেছেন এ-যুদ্ধে। তাঁদের বাপ-দাদারা সোবিয়েত শক্তি প্রতিষ্ঠা করবার জন্যে রক্ত দান করেছে। সুতরাং যুবক ও বুড়ো – দু’জনেরই সোবিয়েত মাতৃভূমি রক্ষা করতে হবে। এ-সব নবীন লেখকদের অনেকেই যুদ্ধক্ষেত্রে; এবং প্রত্যেকেই ষোড়শ শতকের কবি-যোদ্ধা সুলতান বাবরের কথায় বলতে পারে : ‘‘যখন প্রয়োজন হয় তখন তলোয়ার নিই, যখন সুবিধা হয় তখন কলম নিই।’’
কবি দাবরোনের কাছে মস্কো দেশ-মাতার প্রতীক। ‘‘মস্কো, তুমি আমাদের মা।’’ মস্কোর প্রতি এ-মনোভাব অত্যন্ত টিপিক্যাল; এমন কোন উজবেক-কবি নেই যিনি মস্কো সম্বন্ধে কবিতা লেখেন নি।
তাইমুর ফাত্তাহ্ একবার বলেছিলেন : স্বদেশ-হিতৈষী যুদ্ধের বীরগণের কথা এবং সোবিয়েত-যোদ্ধাদের কথা যুগে-যুগে গীত হবে। তাঁর ছোট কবিতাগুলোতে (দশ্ তন-এ) তিনি বীরদের বীরত্বের গান গেয়েছেন। তাঁর একটি কবিতায় – যে-কবিতার নাম দু’তার (উজবেক জাতীয় তারযন্ত্রের নাম) – বলা হয়েছে সুদূর অতীতের কথা। গৌরবের রব যত স্থায়ী দুতারের সুরও তত স্থায়ী। বখ্শিদের অর্থাৎ গল্পকথক ও মিন্স্ট্রেলদের বন্ধু হলো দুতার। দূর-দূর পাহাড়ী গাঁয়ে, রৌদ্র-দগ্ধ মালভূমিতে যে কোন অধ্যুষিত স্থানে এরা যায় এবং কোন উৎসব এদের ছাড়া পূর্ণাঙ্গ হয় না।
বাঁকা সাজের৫ মত নত দেহ তার,
আর ধূসর হাওয়ায় পোড়া গাল
সমস্ত কবিত্বের যাতনা তার হৃদয়ে
বর্ষিত হয়ে, দেখ, প্রভাতের সাথে সাথে
গায়কের তরে গানের হলো জন্ম।

  • শেখ জেদ এভাবে বর্ণনা করেছেন বখশিদের। এ-সব গল্প-কথকদের সম্বন্ধে বলা হয় যে, আকাশের তারার চেয়েও বেশী কবিতার লাইন তাদের মুখস্থ। বহুকাল থেকে প্রাচ্যের লোকরা দাবী করে যে, কবির মস্তিষ্ক অন্য কবির চল্লিশ হাজার লাইন (নিজেরটা ভালোভাবেই জানা থাকা দরকার), চল্লিশটী দীর্ঘ-কবিতা, চার শ’ গল্প, চার হাজার উপাখ্যান এবং চার হাজার কথা, ধারণ করতে পারে।
    উজবেকের অলিখিত এপিক কাব্য (epos) বহুদিন হতে বেঁচে আছে এবং সাময়িক কবিরা সে-মূল্যবান তোয়াধার থেকে আহরণ করে। মৌল কাব্যিক রীতিতে লিখিত সে সাহিত্যে জনগীতি জীবন্ত হয়ে ফুটেছে। কোনটায় উজবেকের লোক দ্বারা স্টালিনকে উদ্দেশ করা হয়েছে, কোনটায় লাল-বাহিনীকে, কোনটায় যৌথ-কৃষককে ইত্যাদি।
    যুদ্ধের সময় উজবেকের লোকদের এসব কবিতার বিশিষ্ট অর্থ রয়েছে। এগুলো জানায় যে সোবিয়েত ইউনিয়নের সূর্য-করোজ্জ্বল উজবেকিস্তান যুদ্ধক্ষেত্রের জন্যে আপ্রাণ কাজ করছে। উজবেকিস্তানের শুষ্ক প্রান্তর নতুন জল-সরবরাহ খালের জলে সিক্ত এবং সহস্র সহস্র একর জমি যা আগে ছিল মরু, তাতে এখন ফসল হচ্ছে বহুল পরিমাণে। উজবেক যুবক গেছে যুদ্ধে। অনেক পরিবারে পাঁচ-ছ’টি ছেলেই সৈন্য। নারী, ছেলেমেয়ে এবং বুড়োরা নিঃস্বার্থ ভাবে কাজ করছে home front-এ।
    ওদের বহুদিনকার প্রথা হলো দিনামেত্ম কাজের শেষে স্থানীয় ‘‘চৈ-খানা’’য় অর্থাৎ চায়ের ঘরে জড়ো হয়ে আসেত্ম আসেত্ম চা পান করা। ‘‘পিয়ালা’’ নামক জাঁকালো চা পাত্র থেকে তারা চা পান করে আর যুদ্ধ নিয়ে সর্বশেষ খবর নিয়ে আলাপ-আলোচনা করে এবং যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পাঠানো প্রিয়জনদের চিঠি পড়ে।
    এ সব মজলিশে কখনো-কখনো বখ্শিরা আসে। এদের মধ্যে অনেক নামজাদা গল্প-কথক আছে, যেমন ফজিল ওলাম-শায়ের এরা এই চায়ের আসরে দিনের জ্বলন্ত বিষয়গুলোর সঙ্গে ঘনিষ্টভাবে পরিচিত হন এবং উপস্থিত মত নতুন গান রচনা করেন। এ সব রচনা জাতীয় কাব্যকোষে নতুন শক্তি-স্রোত প্রবাহিত করে।
    শেখ-জেদ লেখেন :
    দেখ দেখ, নতুন কাল নিয়ে নতুন বীরদের নিয়ে
    গীত হলো একটি নতুন দশতান।
    এবং আজকার উজবেক কাব্য নতুন সময় দিয়ে ও নতুন বীরদের দিয়ে পরিপুষ্ট। *
  • লিডিয়া বাতোভা

পাদটীকা
১. দ্বাদশ শতাব্দীর বিখ্যাত আজারবাইজান কবি। লাইলা-মজনু, খোশরো-শিরিণ ইত্যাদির লেখক।
২. প্রাচীন উজবেক সাহিত্য।
৩. প্রাচ্যে মেয়েদের দ্বারা পরিহিত ঘোড়ার কালো চুলের মুখপর্দা; নারী জাতির দাসত্বের প্রতীক।
৪. সমরকন্দের শাসন-কর্তা (১৩৯৪-১৪৪৯); বিখ্যাত জ্যোতিষ্কবিদ ও অঙ্কবিদ।
৫. তারের বাদ্যযন্ত্র।

  • সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ কর্তৃক International Literature (No. 8, 1943) হইতে অনূদিত।

Leave a Reply

%d bloggers like this: