স্বপ্ন পাখির ডানা

লেখক: সেলিনা হোসেন

বিয়ের ভাবনা ঠিকমতো বুঝে ওঠার আগেই বিয়ের প্রস্তাব আসে হোসনার। সেদিন স্কুল থেকে ফিরে মায়ের সঙ্গে ভাত খেতে বসেছিল। খিদে ছিল খুব। মা শুঁটকি ভর্তা করেছিল আর কুমড়ো ভাজি। দুটোই ওর প্রিয়। থালাভর্তি ভাত নিয়ে পিঁড়িতে বসে খেতে শুরু করলে শুনতে পেয়েছিল বাড়ির দরজার কাছে কেউ একজন এসে বাঁশের দরজা ধরে ঝাঁকাচ্ছে। ও এক লোকমা ভাত মুখে পুরে নিজে নিজে বলে, ভাত খাওয়া শ্যাষ করি। হেরপর দরজা খুলুম।

দুপুরে ভাত খেয়ে ওর বাবা ভাতঘুম ঘুমোনোর জন্য শুয়েছে। চোখের পাতা এক হয়নি তখনো। মা রান্নাঘর থেকে বের হয়নি। ও নিজেও মায়ের সঙ্গে কাজ করেছে। রোজই ও মাকে সাহায্য করে। মায়ের কাজে সাহায্য করলে মা খুব খুশি হয়। সবাই শুনতে পায় গাঁয়ের করিম মিয়া এসে হাঁক দিচ্ছে।

– আবদুল্লাহ্ ভাই, বাড়ি আছেন?

বিছানা ছেড়ে উঠে আসে ওর বাবা। কিছুটা অবাক হয়। আকস্মিক ডাকে খানিকটুকু হতবিহবল থাকে।

– আবদুল্লাহ্ ভাই, আপনার মাইয়ার বিয়ার খবর লইয়া আসছি।

– হোসনার বিয়া? আল্লাহ মাবুদ, এর চাইতে খুশির খবর আর কী আছে!

রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে হোসনেআরাও বিয়ের প্রস্তাবের কথা শোনে। ওরা পাঁচ বোন, চার ভাই। চার বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। ঘরে ও একা। চার ভাই এখনো বিয়ে করেনি। নিজের বিয়ের খবরে মনে মনে খুশিই হয়।

করিম মিয়া বলে, পোলার বাড়ি রূপসা। জমিজমা আছে। পোলাডা দেখতেও সোন্দর। হোসনার পছন্দ হইব।

পছন্দ! ওর পছন্দের কি কোনো দাম আছে? চার বোনের বিয়ে তো দেখেছে। মেয়েদের পছন্দের কোনো দাম নাই। বিয়াটা এক্কাদোক্কা খেলা। যতক্ষণ কুতকুত শব্দ, ততক্ষণই বিয়ার আয়ু। হোসনেআরা শুনতে পায় ওর বাবা বলছে, আপনে পাত্র লইয়া আসেন। আপনের কথা শুইনাই আমার পাত্র পছন্দ অইছে।

যেমন কথা, তেমন কাজই হলো। ওর মায়ের কাছেও কিছু জিজ্ঞেস করলো না ওর বাবা। রান্নাঘরে চাল বাছতে বাছতে মা ওকে বললো, পোলার রূপ ধুইয়া পানি খাওন লাগবো না। দেইখতে হইবে ঘরে অভাব আছে কিনা। প্যাডে ভাত থাকলে সব ঠিক, নইলে কিছু ঠিক থাহে না।

মায়ের কথা শুনে ও কিছু বলে না। শুধু ভাবে, রূপও লাগে। সুন্দর স্বামী পেলে ও নিজেও খুশি হবে। মনে মনে বলে, সোন্দর স্বামী কাছে থাইকলে একবেলা না খাইয়াও থাকতে পারুম।

হোসনেআরার নিজের খুশির সীমা থাকে না। এক্কাদোক্কা খেলার মতোই বিয়েটা হলো। ও ভেবে দেখল আসলে খেলাই। বিয়ে নামের অদ্ভুত খেলা। বাসররাতে স্বামীকে দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায়। ভাবে, এবার ওর দুঃখের দিন শেষ হয়ে যাবে। বাবার সংসারে অনেক কষ্ট করেছে। বাবার জীবন তো রূপকথার গল্পের মতো। মুহূর্তে পুরো ছবিটা ওর চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

ওর বাবা আবদুল্লাহ্। তার ছিল তিন ভাই, দুই বোন। আবদুল্লাহ্র কিশোর বয়সে বাবা মারা যায়। সংসারের হাল ধরতে হয় তাকে। সামান্য রোজগার। জমিজমা যেটুকু আছে তা দিয়ে কোনোরকমে দুই ভাইকে পড়ালেখা শেখায়। নিজের আর পড়ালেখা হয় না। দুই বোনকে প্রাইমারি পর্যন্ত পড়িয়ে বিয়ে দেয়। চাচারা পড়ালেখা শিখে সরকারি চাকরি পায়। বিয়ে করে সংসার আলাদা করে নেয়।

তারা বড়ভাই আবদুল্লাহ্র আর কোনো খোঁজ নেয় না। দুঃখের এই কাহিনিটুকু হোসনেআরার মনে গেঁথে আছে। ও সবার ছোট হওয়ায় দেখেছে অনেক বেশি। অভাবের আগুনে পুড়েছে বেশি।

আবদুল্লাহ্র সংসার বড়। তার ওপর গ্যাস্ট্রিকের রোগী। মাঝে মাঝে ব্যথায় চিৎকার করত। ক্ষেতে কাজ করতে পারত না। ব্যথার কষ্ট নিয়ে ছোটভাইদের কাছে গিয়ে বলত, কিছু টাকা দাও সোনা ভাইয়েরা।

দুই চাচার এক কথা, জমি লেইখা দ্যান, টেকা দিমু।

জমি!

মেজো চাচা খেঁকিয়ে বলে, বাজান আপনের নামে জমি রাখছে। আমাগো নামে রাখে নাই। আপনে আমাগোরে জমি দ্যান।

জমি! আবদুল্লাহ্র মুখ থেকে উচ্চারিত হয় আবার সেই নির্বোধ ধ্বনি, জমি!

ভাইদের ধমকে হাঁ হয়ে যায় আবদুল্লাহ্। মুখে কথা আসে না।

– হ, জমি জমি। টাকা নিবেন জমি দিবেন। আর কনু কথা নাই।

– আইচ্ছা, জমি লেইখা দিমু। এক শতক জমি লেইখা দিমু। তোমরা আমারে চিকিৎসার জন্যি টেকা দাও। আগে তো পরানে বাঁচি।

আবদুল্লাহ্র দুই ভাই বড়ভাইয়ের প্রতি কোনো কৃতজ্ঞতা তো জানালই না, উপরন্তু তাকে প্রতারণা করলো। এক শতকের জায়গায় পাঁচ শতক জমি লিখে নিল। আবদুল্লাহ্র আর কোনো জমি থাকল না। শুধু ভিটেটুকু সম্বল।

যেদিন ব্যাপারটি জানতে পারলো সেদিন রাগে-দুঃখে মাথার চুল ছিঁড়ল আবদুল্লাহ্। কান্নার মাতমে পেটের ব্যথা বাড়লো। চিকিৎসার জন্য আর শহরে যাওয়া হলো না। সংসারের এ-ছবিটিও হোসনেআরার মনে খুব স্পষ্ট হয়ে আছে। অভাবের ছবি ছাড়াও কষ্টের ধরন যে কত রকম হয় তা ও খুব কাছ থেকে দেখেছে। একজীবনে এসব দেখার শেষ ও এখন দেখতে চায়। সুন্দর স্বামী পেয়েছে, এবার সুন্দর একটি সংসার পেলে ওর আর কিছু চাওয়ার নেই।

একদিন বড় ধরনের কোনো আয়োজন ছাড়া বিয়ে হলো। বাসররাত হলো নিজের বাড়িতে। শ্বশুরবাড়ি যাওয়া হবে না এটা ও জানতো। পাত্রপক্ষ বলেছিল, মেয়েকে আমরা পরে লইয়া যামু। কয়েকদিন বাপের বাড়িতে থাকুক।

এ-কথা শুনে মন খারাপ করেনি হোসনেআরা। ভেবেছিল, শ্বশুরবাড়িতে তো যেতেই হবে। কিছুদিন বাবার বাড়িতে থাকলে ক্ষতি কী! একদিন ঘুমানোর আগে বরকত ওকে বলেছিল, তোমারে আমার খুব পছন্দ হইছে। তুমি আমার সাদ-আল্লাদ। আমার পরান সখী। দুইজনে মিলা সংসারের সুখ-দুঃখের ছালা টানুম।

– সুখ-দুঃখ কি ছালায় ভরা থাহে?

– এই ছালা তো চটের ছালা না। এইডা মনের ছালা।

বরকতের কথা শুনে শব্দ করে হেসেছিল হোসনেআরা।

বরকত জিজ্ঞেস করেছিল, হাসলা ক্যান?

– তোমার কথা শুইনা আমার মন ভইরা গেল। ভাত না পাইলে আমার দুঃখু নাই। তুমি আমারে শুদু ভালোবাসা দিও। তাইলে আমি মাথায় তুইলা ছালা টানুম।

– দিমু, দিমু। হাজার হাজার বছর ধইরা ভালোবাসা দিমু। তোমারে আমি হাসু কইয়া ডাকুম। ক্যামন?

– ডাইকো। তোমার মনে যে-নাম আসে হেইডাই ডাইকো। নতুন নতুন নাম পাইলে আমার ছালায় খুশির পাল্লা বেশি হইব।

– তুমি আমারে কী নামে ডাকবা? আমিও নতুন নতুন নাম চামু।

হোসনেআরা লাজুক ভঙ্গিতে বলেছিল, জানি না। আমি এত নাম বানাইতে পারুম না।

– কও না, কও একটা কিছু।

বরকত জোরাজুরি করলে ও একই ভঙ্গিতে বলেছিল, পারুম না।

তারপর আর কথা বাড়ায়নি। এখন এই মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে গেলে অন্ধকারে তাকায় হোসনেআরা। মনে হয় অন্ধকারে আশার ফুলকুড়ি জ্বলছে। জীবনটা সুন্দরই হবে, ভালো কাটবে। প্রাণপণে নিজের আশার বাতি জ্বালিয়ে রাখতে চায় ও। কিছুতেই সেই শিখা নিভতে দেবে না। আলতো করে বরকতের পিঠে হাত রাখে। ওর ঘুম ভাঙাতে চায় না; কিন্তু ঘুম ভাঙে বরকতের। আবার বিছানাটা হোসনেআরার আনন্দের বিছানা হয়ে ওঠে। ওর বুকের ভেতরে স্বপ্ন গাঢ় হতে থাকে। গড়িয়ে যায় সময় – আসতে থাকে সোনালি ভোর।

বিয়ের পরে বেশ কিছুদিন চলে যায়। কিন্তু বরকত ওকে ওর নিজের বাড়িতে নিয়ে যায় না। হোসনেআরার বুকের ভেতর ভয় জমতে শুরু করে। বরকত কি ঘরজামাই হতে চায়? জিজ্ঞেস করলে বলে, কি যে কও না, ঘরজামাই হমু ক্যান? ছি ছি ঘরজামাই হইতে আমার ঘিন্না লাগে।

– আমি শ্বশুরবাড়ি যামু না?

– যাইবা, যাইবা। যাইবা না ক্যান? ধৈয্য ধরো হাসু।

– আমি তো আর ধৈয্য ধইরতে পারি না। আমার শরম করতাছে বাপের বাড়ি থাইকতে।

– কয়দিন পর একডা নতুন ঘর বানাইয়া তোমারে লইয়া যামু। তোমারে পুরান ঘরে তুইলতে আমার মন চায় না হাসু।

– ঠিক তো? নতুন ঘর তুলবা তো?

– একদম ঠিক। আমি তোমার লগে মিছা কথা কই না হাসু।

দ্বিধা কাটিয়ে বরকতের কথায় বিশ্বাস করে ও। ভাবে, বরকত নিশ্চয় ওর স্বপ্ন ভেঙে দেবে না। জীবনটা ভালোই কাটবে ওর। ও কিছুতেই খারাপ কিছু মনে জয়গা দিতে চায় না। আশা নিয়ে ঘুরে বেড়ায় বাড়িতে।

মা বলে, হোসনা জামাই কী কয়?

ও মুখ উদ্ভাসিত করে বলে, তোমার জামাই আমার লাইগা নতুন ঘর বানাইতাছে।

– নতুন ঘর? কী কস?

– হ মা, ও কইছে আমারে পুরান ঘরে তুলব না।

– আল্লাহই জানে অর মনে কী আছে!

মায়ের আশংকায় ভয় পায় হোসনেআরা। মাকে জড়িয়ে ধরে বলে, মা গো তুমি এমুন কইরা ভাইবো না।

হোসনেআরা কেঁদে ফেলে। দুদিন ধরে শরীর খারাপ লাগছে। মাথা ঘোরায়। মাসিকও বন্ধ। বোধহয় গর্ভ হয়েছে। হোসনেআরা নানাকিছু একা একা বোঝার চেষ্টা করে। একদিন ঠিকঠিক বুঝে যায় যে গর্ভে সন্তান এসেছে।

খবরটা শুনে মুখ কালো হয়ে যায় বরকতের। হোসনেআরা বুঝতে পারে যে, ওর স্বামী এই খবরে খুশি হয়নি। ওকে জিজ্ঞেস করে, তুমি খুশি হও নাই?

– ঝামেলা। ঝামেলা সইতে ভালা লাগে না।

– তাইলে বড়ি খাইতে দিতা। সেইডাও তো করো নাই?

ও খেঁকিয়ে উঠে বলে, সব আমি করুম নাকি? তুমি বড়ি খাইতে পারলা না? একডা প্যাড বাঁধাইয়া মহাখবর দিতে আছ।

এই প্রথম বরকতের অন্যরকম চেহারা দেখে ও প্রবলভাবে নাড়া খায়। ওর মনে হয় স্বপ্ন দেখার দিন বুঝি শেষ হয়ে আসছে। মানুষটাকে একটা দানবের মতো লাগছে। ও দু-হাতে মুখ ঢাকে। মনে মনে ভাবে, ওর মায়ের আশংকাই বুঝি সত্যি হবে!

একদিন কাউকে কিছু না বলে বরকত বাড়ি থেকে উধাও হয়ে যায়। ওর ফেরার প্রতীক্ষা করে হোসনেআরা। চিন্তায় অস্থির হয়। কোথায় খোঁজ করবে জানে না। ওর বাবাও কিছু বলতে পারে না। মুখের কথায় বিয়ে দিয়ে দায় সেরেছে। এখন কোথায় খুঁজবে মেয়ের জামাইকে?

হোসনেআরা করিম মিয়ার কাছে যায়। বলে, চাচা আপনেগো জামাইর তো খোঁজ নাই।

– আমি কী কমু মা। গাঁয়ের ঠিকানায় তোমার ভাই একডারে পাডাইতে কও তোমার বাজানরে।

হোসনেআরা কথা বাড়াতে পারে না। করিম মিয়ার দায় কী? সে পাত্র এনে দিয়েছে, বাবা বিয়ে দিয়েছে। এখন ছেলে পালিয়ে গেলে তার দায় কে নেবে? উলটো পাড়া-প্রতিবেশীর কেউ কেউ ওর ভাগ্যকে দোষারোপ করে। কুলক্ষণা মেয়ে বলে আড়ালে গাল দেয়।

উনিশ দিনের মাথায় কে একজন এসে ওর কাছে একটি চিঠি দিয়ে চলে যায়। হোসনেআরা খুশিতে উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। নিশ্চয়ই ওর জন্য কোনো ভালো খবর আছে। পুকুরপাড়ের সজনে গাছটার নিরিবিলি ছায়ায় ও চিঠিটা খোলে। বরকত লিখেছে, তোমার গর্ভের জাউরাডারে নষ্ট করো। অহনই কইরা ফ্যালো। নইলে ভালা হইবো না, কইয়া দিলাম। যদি নষ্ট না করো তাইলে তোমার সন্তানের বাপের পরিচয় আমি দিমু না।

হোসনেআরার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। মাথা এলিয়ে পড়ে গাছের কা–। কয়েক মিনিট সময় মাত্র। আবার সোজা হয়ে বসে ও। পুকুরঘাটে নেমে চোখমুখে পানির ঝাপটা দেয়। খানিকটা স্বস্তি ফিরে এলে ভাবে, পেটের মধ্যে যে দিনে দিনে বাড়ছে তাকে নিয়ে ওর শরীরে আনন্দের শিহরণ বয়ে যায়। এখন ওকে নষ্ট করতে হবে? অসম্ভব। প্রতিবাদে হোসনেআরার শরীর শক্ত হয়ে যায়। এ-কাজ ও কিছুতেই করবে না। চিঠিটা টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে পুকুরে ভাসিয়ে দেয়। তারপর সোজা উঠোনে এসে দাঁড়ায়।

মা জিজ্ঞেস করে, কী হইছে হোসনা? জামাইর কনু খবর আছে?

– না, মা। ভালো কোনো খবর নাই।

– তোর বাপে যে কী কইরা তোরে বিয়া দিলো। পোলাডার একডা খোঁজও নিল না।

– থাক মা, ওর কথা ছাড়ান দাও।

– প্যাডেরডার কী হইবে?

– কী আর হইবে? আমি ওরে পালতে পারুম।

মা একটু অবাক হয়। বুঝতে পারে যে মেয়েটা দমে গেছে। এত তাড়াতাড়ি ওর আশা নিরাশায় ভরে গেল? ওর মায়ের মনও খারাপ হয়ে যায়। রান্নাঘরে ঢুকে চুলার আগুনের দিকে তাকালে দেখতে পায় আগুন নিভুনিভু। চুলোয় শুকনো খড়ি গুঁজতে থাকে হোসনেআরার মা। ভাবে, আগুন নিভে যাবে না। দাউদাউ করে জ্বলতে দেখলে ভবিষ্যতে অন্ধকার নামতে দেখবে না। হোসনেআরা আগুনের মতো আলো ছড়িয়ে জ্বলুক। আলোয় ভরে থাকুক মেয়েটার সারাজীবন।

নির্দিষ্ট সময়ে হোসনেআরার একটি মেয়ে হয়। সেই চিঠি পাঠানোর পর থেকে বরকত হোসনেআরার কোনো খোঁজ নেয়নি। কিছুদিন পরে ও জানতে পারে বরকত আর একটি বিয়ে করেছে। যে-লোকটি চিঠি এনেছিল সে এসেই খবরটা দেয়। বরকত ওকে পাঠায়নি। ও নিজের গরজেই খবর দিতে এসেছে। এসেই বলে, কপাল পুইড়ছে আপনার, বেডা আর একডা বিয়া করছে।

– বিয়া? বিয়া করছে? প্রবল বিস্ময়ে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে হোসনেআরা।

– কী হইল চুপ কইরা গেলেন যে?

– ভাবতাছি।

– ভাবেন। আমি গেলাম।

– এমন একডা খবর আপনে আমারে দিলেন ক্যান? কতদূর হাঁইটা আসছেন? পানির পিয়াস লাগছে?

লোকটা একনজর ওর দিকে তাকিয়ে হনহন করে হেঁটে চলে যায়। পেছন ফিরে তাকায় না। হোসনেআরা ভাবে, ভালোই হয়েছে। সংসারের জ্বালা জুড়িয়েছে। এখন মেয়েকে নিয়ে দিন কেটে যাবে। দিন কেটেই যাচ্ছিল।

কয়েক মাসের মধ্যে বরকত এসে হাজির হয়।

– তুমি আমারে বাঁচাও হাসু। আমারে মাফ কইরা দাও। তুমি মাফ না করলে আমি মইরেও শান্তি পামু না।

– মাইয়াডারে আগে দ্যাহো। কোলে নেও।

– কোলে তো নিমুই। আমার সোনার মাইয়া। কিন্তু তুমি কও তুমি আমারে মাফ কইরা দিছ।

– কিন্তু কির লাইগা মাফ করুম? তার তো কিছু কইলা না।

– আমি আবার বিয়া করছিলাম। আমি হেই বউরে কই নাই যে, আমি আগে তোমারে বিয়া করছি। এইডা জানতে পাইরা হেই বেডি আমার বিরুদ্দে কেস কইরা দিছে। তুমি পারো আমারে এই বিপদ থাইকা বাঁচাইতে।

হোসনেআরা স্বামীর কাকুতি-মিনতিতে বিগলিত হয়ে যায়। যেখানে যা করার দরকার তার সবটুকু করে বরকতকে রক্ষা করে। ভুলে যায় বরকতের পালিয়ে যাওয়ার আচরণ, কন্যা-ভ্রম্নণটি নষ্ট করার নির্দেশ। দু-চার মাস বরকত বেশ ভালো মানুষের মতো থাকে। মেয়েকে কোলে নেয়, আদর করে। হোসনেআরা আশায় বুক বাঁধে। ভাবে, এবার বুঝি লোকটি ভালো থাকবে। একদিন বরকত বলে, আমারে একডা মোবাইল কিন্যা দাও। ব্যবসা করি।

হোসনেআরা টাকা ধার করে একটা মোবাইল কিনে দেয়। ভাবে, ব্যবসা করে কিছু উপার্জন করতে পারলে তো ভালোই হয়। ও আবার আশায় বুক বাঁধে। মেয়েটা বাবার ভালোবাসা পাক, এটা ও চায়। একটি শিশু বাবার ভালোবাসা ছাড়া বড় হবে কেন, এটা ওর প্রথম চিন্তা। সংসার টিকিয়ে রাখার জন্য সব ধরনের চেষ্টা করতেই ও এখন তৈরি।

কিন্তু আবার সেই স্বপ্নভঙ্গের কষ্ট।

হোসনেআরা টের পায় বরকত রাতভর নানা জায়গায় মেয়েদের সঙ্গে কথা বলে। একদিন যায়, পাঁচদিন যায়। চোখের সামনে এসব তো সহ্য হয় না। বেধে যায় ঝগড়া।

– কার সাতে কথা কও?

– যার সাতে খুশি তার সাতে। তোর কি হারামজাদি!

– কী কইলা?

– ঠিকই কইলাম।

– লুচ্চা একডা।

– কি কইলি খানকি মাগি!

শুরু হয়ে যায় চড়-লাথি। মার খেয়েও ধৈর্য ধরে হোসনেআরা। কিন্তু কয়দিনের মাথায় একটি মেয়েকে নিয়ে উধাও হয়ে যায় বরকত। শূন্যে তাকিয়ে দাওয়ায় বসে থাকে হোসনেআরা। ভরসা মেয়েটি। আনন্দ আর কষ্টের মধ্যে মেয়েটি হাঁটতে শিখেছে। দৌড়ে বেড়ায়। মা বলে কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে। গলা জড়িয়ে ধরে গালে চুমু দিলে অপার আনন্দে বিশ্বসংসারের সবাইকে মাফ করে দিতে ইচ্ছে হয় হোসনেআরার। ওর চেয়ে বেশি কে বুঝেছে যে বিয়ে এক অবাক খেলা। ছোটবেলার খেলা এক্কাদোক্কার চেয়েও অনেক বেশি -। কি অনেক বেশি? হোসনেআরা ভেবে কুলিয়ে উঠতে পারে না। দম ফেলে নিজেই নিজেকে দমন করে। পরক্ষণে মনে হয় দমন করার খেলা।

কয়েক মাস পরে বরকত ফিরে এসে আবার ওর কাছে মাফ চায়। পায়ে ধরে গড়িয়ে পড়ে। বলে, এমন আর করুম না। এইবার মাফ কইরে দাও হাসু। আমি তোমার বান্ধা গোলাম হইয়া থাকুম।

মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আবার মাফ করে দেয় ও। আবার আশায় বুক বাঁধে। ভাবে, ভালো হয়ে গেলে সংসারটা টিকে যাবে। সংসার টিকিয়ে রাখার তৃষ্ণা ফুরোয় না ওর।

এর মধ্যে বাবা মারা যায়। মা অসুস্থ হয়ে পড়ে। বরকত কিছুদিন ভালো আচরণ করে। কিন্তু একদিন আবার আর একটি মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে যায়। আবার কিছুকাল পরে ফিরে আসে। মাফ চায়। হাতে-পায়ে ধরে। আবার হোসনেআরা আশায় বুক বাঁধে। আবার বরকতের সঙ্গে দিনযাপন শুরু হয়।

মেয়ের নাম রেখেছে মাধুরী। ও বেশ বড় হয়েছে। দেখতে সুন্দর হয়েছে। স্কুলে যায়। লেখাপড়ায় আগ্রহ আছে। মাঝে মাঝে বাবার আচরণ দেখে বলে, মা তুমি বাজানরে ঘরে ঢুইকতে দিও না। মেয়ের কথায় চমকে ওঠে হোসনেআরা। যে-সিদ্ধান্ত ও এত বছরে নিতে পারেনি, সে-সিদ্ধান্ত মেয়েটা এক লহমায় নিতে পারছে। ভালোমন্দ বোঝার বয়স হয়েছে ওর। ওকে আর কিছুই আড়াল করা যাবে না।

আবার উধাও হয় বরকত। হোসনেআরা ভাবে, আর না। ওর সহ্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। মেয়ে বুঝতে শিখেছে। ছোটবেলা থেকে বাবার এমন আচরণ দেখতে দেখতেই বড় হলো মেয়েটি। এখন ওর মুখ খুলে গেছে। হোসনেআরার মনে হয় মেয়েটির কাছে ও একটি  ছোট খুকি।

এর মধ্যে একদিন বরকত একটি মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে বাড়িতে হাজির হয়। বেশ সাজগোজ করা মেয়েটিকে দেখে আঁতকে ওঠে ও। ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে থাকলে বরকত বলে, ও আমার মামাতো বোন। তোমারে দেইখতে আসছে।

মেয়েটি এসে ওর হাত ধরে বলে, বিয়ার পর থাইকা আপনেরে তো দেহি নাই। কেমুন আছেন ভাবিজান?

হোসনেআরা ওর হাত ছাড়িয়ে নেয়। বলে, বসেন।

বরকত তড়িঘড়ি বলে, শুনো আমরা কিন্তু বেশিক্ষণ বইসতে পারুম না। তাড়াতাড়ি চাইরডা ভাত খাওয়ায়ে দাও। ওরে বাড়িতে থুইয়া আসতে যামু।

– অহনও তো রান্ধা শ্যাষ হয় নাই।

– যা আছে তাই দাও।

শেষ পর্যন্ত মুগের ডাল আর পুঁটি মাছের তরকারি দিয়ে ওদেরকে ভাত খেতে দেয় হোসনেআরা। মাধুরী তখনো স্কুলে। ওর ভয় করে এই ভেবে যে, মেয়েটা বাড়িতে এসে একটা কিছু কা- না ঘটায়। বেঁচে যায় যে মাধুরী আসার আগেই বরকত ওর মামাতো বোনকে নিয়ে চলে যায়। হোসনেআরার মনে হয়নি, ওটি ওর মামাতো বোন। বাজারের মেয়েদের মতো সাজপোশাক। কথাবার্তার ঢংও বিদ্ঘুটে। বরকতের সঙ্গে যেভাবে কথা বলছিল তা কোনো বোনের কথা বলার মতো নয়। তারপরও ও বিষয়টি হজম করে। বরাবরের মতো সংসার টিকিয়ে রাখার আশায় বুক বাঁধে।

সেই যাওয়ার পর বেশ কয়েকদিন বাড়িতে আসে না বরকত। একদিন ফিরে এসে আগের মতো একই ভঙ্গিতে মাফ চায়। পায়ে ধরে। কয়েকদিন পরে আবার সাজগোজ করা একটি মেয়েকে নিয়ে বাড়িতে আসে। বলে, আমার সুজনভাইয়ের বউ। তোমারে দেইখতে আসছে হাসু।

– আমি তো তোমার সুজনভাইরে দেহি নাই।

মেয়েটি আগ বাড়িয়ে বলে, দেইখবেন ক্যামনে, আমার স্বামী তো ঢাকা শহরে থাকে। গাড়ির মেকানিক।

– আমাগোরে তাড়াতাড়ি ভাত দাও হাসু। আমরা যাই গিয়া।

– ভাত রানতে হইবো।

– তাইলে তুমি ভাত রান্ধো। আমরা বসি।

বরকত নিজেই ঘর থেকে মাদুর এনে বারান্দায় বিছিয়ে দেয়। দুজনে বসে গল্প করে। ওদের হাসাহাসির শব্দ রান্নাঘরে বসে শুনতে পায় হোসনেআরা। ওর বুক ভেঙে কান্না আসে। সে-সময়ে বাড়ি ফেরে মাধুরী। বারান্দায় অন্য মেয়ের সঙ্গে বাবার বসে থাকার দৃশ্য ওর একটুও ভালো লাগে না। ও রান্নাঘরে এসে বলে, ওইডা কে মা?

– তোমার চাচি।

– চাচি? কেমুন চাচি? খাড়াও দেহি।

ও রান্নাঘর থেকে একটি শুকনো কাঠ নিয়ে বারান্দার দিকে এগোতে থাকলে বরকত দ্রুত উঠোনো এসে বলে, কী হইছে তোর?

– তোমার মাথা আমি ভাইঙ্গা ফালামু। বাইর হও, বাইর হও বাড়ি থাইকা। ও মামা, মামা –

মাধুরীর চিৎকারে এদিক-ওদিক থেকে লোকজন আসতে দেখে বরকত তার বান্ধবীকে নিয়ে দ্রুত চলে যায়। মাধুরী চিৎকার করে বলে, এমুন বাপ আমার লাগবে না। বাপের আদর কি হেইডাই তো জানতে পারলাম না।

চিৎকার করতে করতে মাধুরী উঠোনে পাক খায়। চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই বিস্ময়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে।

হোসনেআরা আঙুলে বছর গুনে বের করে যে মাধুরীর বয়স এখন তেরো।

নিজের আচরণের জন্য ওর নিজের লজ্জা হয়। এত বছর ধরে ও শুধু সংসার টেকানোর চেষ্টা করেছে। একটা খারাপ লোককে প্রশ্রয় দিয়েছে কেবল। বিনিময়ে কিছুই পায়নি। ও আর কিছু করবে না। ওর জীবনে আর পুরুষ মানুষের দরকার নেই। মাধুরীকে নিয়ে একাই থাকবে।

মাস-দুই আগে নৈহাটির ফসল প্রকল্পের মাধ্যমে নারীদের সংগঠনে যুক্ত হয়েছে। সেলাই প্রশিক্ষণ নিয়ে দর্জির কাজ শুরু করেছে। শাক-সবজি আবাদের প্রশিক্ষণ নিয়ে বাড়ির আশেপাশে সবজি চাষ করছে। ওর আর ভয় কী? কেন একটা লম্পট লোককে ঘিরে ও সংসারের জন্য এমন ব্যাকুল হয়ে ছিল? আজ মেয়েটা ওর চোখ খুলে দিয়েছে। ও দৌড়ে গিয়ে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলে, মাগো আয়।

রাতের বেলা ঘুমানোর আগে মাধুরী মাকে বলে, বাজানরে আর কুনুদিন ঘরে ঢুইকতে দিবা না। আমি পড়ালেহা শ্যাষ কইরা চাকরি করমু। তোমার আর দুঃখু থাকব না। দেইখবা রাইতগুলা জ্যোৎস্নার মতো ফকফকা থাকবো।

হোসনেআরা মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে। ভাবে, মেয়েটা অনেক বড় হয়ে গেছে। ওর নিজেকেও ওর মতো সাহসী হতে হবে। বেঁচে থাকার জন্য সাহস খুব দরকার।

মাধুরী লেখাপড়া শিখে বড় হবে এই আশায় ও বুক বাঁধে। প্রতিদিনের কাজের মাঝে সেলাই মেশিনের মতো জোর গতিতে ঘুরতে থাকে ওর আশার স্বপ্ন। ও এখন বোঝে যে মেয়েটাকে তৈরি করলে ওর ভবিষ্যৎ ও গড়বে। ওর জন্য কোনো অমানুষ বাবার দরকার নেই।

মাধুরী বরাবরই ক্লাসে প্রথম হয়। এ-বছরে ও অষ্টম শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণিতে উঠল। রেজাল্টের খবর নিয়ে মায়ের সামনে এসে দাঁড়ায়। দুহাত সেলাই মেশিনের ওপর রেখে বলে, আইজ আমি তোমারে পোলাও রাইন্দা খাওয়ামু। মামাগোরে দাওয়াত দিমু।

হোসনেআরা মুখ উজ্জ্বল করে বলে, ফাস্টো হইছস?

মাথা ঝাঁকিয়ে মাধুরী হ্যাঁ বলে। ওর কপালে চুলের গুচ্ছ লুটিয়ে পড়ে। যেন আকাশ নেমে এসেছে ওর মুখের ওপর। হোসনেআরা মুগ্ধ চোখে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।

মাধুরী হাসতে হাসতে বলে, আমি তোমার মতো বোকার স্বর্গে থাকুম না।

Leave a Reply

%d bloggers like this: