অন্ধ নিশানা

সুহাসের সঙ্গে সুমালার দেখা হয়েছিল রজতদার কোচিংয়ের ফরম তুলতে গিয়ে।

শুনলে মনে হয় ‘রজতদার কোচিং’ মানে একফালি ঘর, একটি লম্বাটে টেবিল নিয়ে চারখানি বেঞ্চ, তাতে ঠাসাঠাসি বসে আছে ছাত্রছাত্রীরা। লিখতে লিখতে এর কাঁধ ঘষে যাচ্ছে ওর কাঁধে, এর কনুই তাকে গুঁতিয়ে দিচ্ছে, এর হাঁটু লেগে যাচ্ছে তার জানুসন্ধিতে। উঠতি বয়সের পক্ষে ভারি মজাদার, পরস্পরকে ঘনিষ্ঠ করে তোলে, আরো গভীর বন্ধুত্ব, গাঢ়তর টান।১

কিন্তু রজতদার কোচিং একফালি ঘর নয়। তাহলে কি গৃহাংশ? আধুনিক বাংলায় বলে অ্যাপার্টমেন্ট। আগেকার কালে ছিল শরিকি বাড়ি। বৃহৎ বংশ ক্রমে শাখায়-প্রশাখায় বিস্তার লাভ করত আর বেচারা অট্টালিকা, যা একদা কোনো ধনী ব্যক্তির গর্বিত কীর্তি হিসেবে শোভিত ছিল, বংশবিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে তার অন্তর্ভাগ গৃহের স্বাভাবিক রূপ হারিয়ে ভাগাভাগির চাপে যেনবা মধুমাছির পরিত্যক্ত মৌচাক। কার বা গোয়াল, কে বা দেয় ধোঁয়া। অট্টালিকার প্রলেপ খসে পড়ে, অঙ্গে রং ওঠে না, পরিবার যত বাড়ে শৌচালয় তত সংখ্যায় নির্মিত হয় না বলে এজমালি শৌচাগারে শ্যাওলা ও হলদে ছোপ, পূতিগন্ধ, মাকড়সার জালে লম্বা মালার মতো ঝুলে থাকে সাদাটে ডিম। অধিবাসীরা পরস্পর রক্তসম্বন্ধে সম্পর্কিত কিন্তু ঈর্ষাকাতর ও বিবাদপরায়ণ। অপরিষ্কার শৌচালয়ে শুদ্ধ হতে যায় এবং মনের মধ্যে ময়লা জমিয়ে তোলে। হায় সেইসব প্রাসাদোপম অট্টালিকা! হায় সেইসব শরিকি বাসস্থান! হায় সেই অট্টালিকার আদি পিতা যাঁর একখানি গম্ভীর ছবি, স্যাঁতা-পড়া, ঘুণ-লাগা, হয়তো দেয়ালের কোনো কোণে অবহেলায় লটকে থাকত। হয়তো বেঁকে থাকা প্রতিকৃতি, কেউ সোজা করে দেওয়ার কথা ভাবে না। মানুষ গত হলে তার প্রতাপ অন্তর্হিত হয়।

এমনসব শরিকি বাড়ি অদ্যাবধি বর্তমান। অযত্নে ক্ষয়াটে, পারিপাট্যহীন, ময়লা। তাদের জায়গায় শরিকি অ্যাপার্টমেন্ট ভাগাভাগি সংক্রান্ত প্রগতিশীল নির্মাণ বটে। দশ ভূতেই এই ইমারতগুলি ব্যবহার করে, কিন্তু প্রতি ইঞ্চি মেঝের দাম দিতে হয় বলে, খাজনা প্রদেয় বলে, দায় এড়াতে পারে না।

বহু কোচিং অ্যাপার্টমেন্টে গড়ে উঠছে আজকাল। প্রায় তপোবনে গুরুগৃহের মতো। শিষ্যকুল এত বেশি যে চেয়ারে, বেঞ্চে কুলোয় না। সাবেক বৈঠকখানার আধুনিক নাম হলো গিয়ে ড্রয়িংরুম। সেখানে সস্তার কার্পেট পাতা। না হোক, পলিয়েস্টারের অাঁশ দিয়ে তৈরি মাদুর, তার ওপর গায়ে গা লাগিয়ে ছাত্রছাত্রীরা। গুরুমহাশয়, অমুকদা কিংবা তমুকস্যার বসেন বেতের মোড়ায়। হাতের কাছে সাদা জাদুবোর্ড। প্রয়োজনে লিখে বোঝান।

রজতদার কোচিং তেমনই হতে পারত। এক-এক দল দুঘণ্টা। সেরকমই প্রত্যাশা ছিল সুহাস ও সুমালার। কিন্তু নির্দিষ্ট ঠিকানায় পৌঁছে তাদের চোখ ধাঁধিয়ে গেল। একে বলে কোচিং!

সুমালার চেয়ে সুহাসের চমক লাগল বেশি। অজ্ঞাত আতঙ্কে তার বুকের মধ্যে শিরশির করে উঠল। এই শিরশিরানি তার অতিপরিচিত। উদ্বেগ, আতঙ্ক তাকে এই অনুভূতিতে জড়িয়ে ফেলে। কিন্তু এই মুহূর্তে তার আতঙ্কের কারণ কী? অপেক্ষার দীর্ঘ সারির একজন হয়ে, আপাত উদাসী মুখে সে কারণ অনুসন্ধানে আত্মমগ্ন হলো।

ভারি সুন্দর এই অট্টালিকা। ত্রিতল বটে। কিন্তু পরিসর বিশাল। বিশাল কাচের দরজা। তার হালকা বাদামি স্বচ্ছতার মধ্যে দিয়ে ভেতরের আয়োজন দেখতে পাওয়া যায়। একেবারে ঝকঝকে, অত্যাধুনিক কেতায় সুসজ্জিত দপ্তরখানা। সেখানেই ভর্তির কাজ চলছে। সুষ্ঠু ও শৃঙ্খলাবদ্ধ। একজন আবেদনপত্র এবং বিভিন্ন পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বরের নথি যাচাই করে নিচ্ছে। একজন টাকা জমা নিচ্ছে। অপর একজন নির্দিষ্ট বিভাগের পরিচয়পত্র দিচ্ছে। দোতলা ও তিনতলা জুড়ে পাঠকক্ষ। কোচিং সংক্রান্ত যে-পুস্তিকাটি একটু আগেই হতে পেয়েছে সুহাস, তাতে পাঠকক্ষের ছবি আছে। সেখানে দামি পর্দা ঝোলানো, মনোরম অন্দরসজ্জা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ। বিলাসবহুল। ছোটখাটো সভা করার পক্ষেও অনুপযুক্ত নয়। এত বৈভব! হবে না-ই বা কেন! সুহাস তার প্লাস্টিক ফোল্ডারে রাখা ড্রাফটি একবার দেখে নিল। পঁয়ষট্টি হাজার টাকা। তিন মাসের জন্য। এরা যে পরীক্ষা নেবে, তাতে ভালো ফল করলে আরো একমাসের বিশেষ প্রশিক্ষণ। বিনামূল্যে। মুফ্ত মুফ্ত মুফ্ত। একটি বহুল প্রচারিত অন্তর্বাসের বিজ্ঞাপন সুহাসের মনে পড়ে গেল। ‘নবাব কিনলে আরাম ফ্রি!’

সে জানে, ওই এক মাসের ফাউ কোচিং সে পেয়ে যাবে। কিন্তু যার জন্য আজ এই দীর্ঘ সারিতে সে অপেক্ষমাণ, যার জন্য তার জেদ হয়ে ওঠে অদম্য আর বুকের মধ্যে শিরশিরিয়ে ওঠে… কেন? কেন? আত্মমগ্ন সুহাস এই সন্ধানই করে চলেছিল প্রতীক্ষার সারিতে দন্ডায়মান।

প্রতীক্ষা প্রতীক্ষা! প্রত্যাশা প্রত্যাশা!

তার লক্ষ্য সে ভারতের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কৃত্যক হয়ে উঠবে। আইএএস। সে মেধাবী। বুদ্ধিদীপ্ত। পরিশ্রমী। এবং সে বড় সুদর্শন। ভালো করে খেতে-পরতে পায়নি, তবু তার শরীর সযত্ন লালিত পুঁইডাঁটার মতো। বই কেনার পয়সা জোটেনি, শিক্ষকদের দান, বন্ধুদের সহৃদয়তা এবং পাঠাগারের সহায়তায় স্নাতক স্তর পর্যন্ত সে অতিউত্তম ফল করেছে। এবার সে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় বসতে চায়। করণিক নয়, মধ্যমমানের আধিকারিক নয়, সে হতে চায় উচ্চতম শিখরজয়ী, কিন্তু একটি বছর আপন মেধাবৃত্তির প্রতি আস্থা রেখে আইএএস প্রাথমিক পর্বের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পরবর্তী পর্যায়ে সে অকৃতকার্য হয়। জীবনে এই প্রথম সে কোনো পরীক্ষায় ব্যর্থ হলো। কেন হলো? নিজেকে তার অচেনা লাগছিল। আপন পরাজিত অবয়ব থেকে সে পালাতে চাইছিল। ভেঙে তুবড়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাস তার – তাকে কোঁকড়ানো, দলা পাকানো ভীত জন্তুর মতো করে ফেলেছিল। সারাক্ষণ তার বুকের মধ্যে শিরশির করত। মনে হতো, লোকে তাকে দেখে হাসছে হাঃ হাঃ হোঃ হোঃ!…২

সেই সময় ‘রজতদার কোচিং’য়ের বিজ্ঞাপনসমেত একটি খবরের কাগজ হাতে করে তার বাবা শ্রী সুভাষচন্দ্র বারিক তার সামনে এসে দাঁড়ালেন। ছেলের গ্লানিময় অন্তরের কান্না, পরাজয়ের অপমান তিনি উপলব্ধি করেছিলেন। তিনি চিরসংগ্রামী, দরিদ্র মানুষ। ইস্কুলের শেষ পরীক্ষা দেওয়ার আগেই জীবন বোঝা হয়ে নেমেছিল। সেই ভার বইতে বইতে অবশেষে শহরে তিনি একজন ভাড়াটে মালি। চার চাকাওয়ালা মালবাহক রিকশায় কয়েকটি ফুলের টব চাপিয়ে ফিরি করেন। রেললাইনের ধার বরাবর জবরদখলি জমি এক চিলতে। গায়ে গায়ে লাগানো ছিন্নমূল মানুষের কুঁড়ে। তারই একটিতে শ্রী সুভাষচন্দ্র বারিকের মাথা গোঁজার ঠাঁই একখানি ঘর আর চার হাত আঙিনায় ফুলের টব। সুভাষচন্দ্রের হাতে গাছ হয় ভালো। ওই ফুল কি লঙ্কার গাছ বিক্রি ছাড়াও ফ্ল্যাটবাড়ির চিলতে ঝুলবারান্দায় শখের বাগানে মালিগিরি করেও তিনি কিছু উপার্জন করেন। চলে যায় কষ্টে-সৃষ্টে। চলে যাচ্ছে। দুঃখ এই যে, ঈশ্বর মেধাবী সন্তান দিয়েছেন, কিন্তু তার উপযুক্ত পালনপোষণের অধিকার দেননি! এত কষ্ট, এত বঞ্চনার মধ্যেও যে ছেলে নিজের ক্ষমতা প্রমাণ করে চলেছে, সে যদি আর পাঁচজন সম্পন্ন বাড়ির         সন্তানের মতো সহায়তা পেত, সারা দেশের মধ্যে সেরা হতে পারত, এ নিয়ে সুভাষচন্দ্রের এতটুকু সন্দেহ নেই। তাই পুত্রের সেই ব্যর্থতার বেদনালিপ্ত, আশাভঙ্গের কালিমাবিজড়িত মুখ দেখে তাঁর বুক ফেটে যাচ্ছিল। ভারি দুঃখের সঙ্গে তিনি সুহাসের মা লীনাদেবীকে বলেছিলেন, ‘কেন এমন হলো বলো তো? ও তো ফাঁকি দেয়নি! প্রাণপণ চেষ্টা করেছে। তা হলে? ভগবান কেন আমাদের কৃপা করলেন না?’ লীনাদেবী ভক্তিমতী। তদুপরি, সংসারে সাহায্য হবে বলে তিনি বস্তির অদূরে হেনা অগ্রবাল নামে এক মহিলার শাড়ি কারখানায় জরি ও চুমকির নকশা বসানোর কাজ করেন। পাঁচ রকম মানুষের সঙ্গে কথা হয়। চোখ-কান খোলা। ছেলের হতাশায়  ভেঙে-পড়া ভাব আর বাপের হতবুদ্ধি দশা তাঁর পছন্দ হয়নি। তবে আগ বাড়িয়ে বেশি কথা বলার মানুষও তিনি নন। তাঁর জীবনের শিক্ষাই হলো, মেয়েমানুষ – তায় আবার নিতান্ত দরিদ্র, কেউ জানতে না চাইলে মতামত দেওয়ার অধিকার তাঁর নেই। ঘরে না। বাইরে না।

কিন্তু সেদিন শ্রী সুভাষচন্দ্রের জিজ্ঞাসায় লীনাদেবীর কথা বলার সুযোগ ঘটেছিল। তিনি শান্তভাবে বলেছিলেন, ‘দেখো, মানুষ কোনো বিদ্যার খানিকটা নিজে নিজেই শিখে নিতে পারে। দেখে দেখেই শেখা হয়ে যায়। কিন্তু সেই বিদ্যার বিশেষ দিক জানতে বুঝতে আলাদা সমঝদারি লাগে। দক্ষ লোকের সাহায্য লাগে, নইলে এগোনো যায় না।’

‘যেমন?’

‘আমার যখন সাত-আট বছর বয়স, তখন মা আয়ার কাজ করতে মনিববাড়ি যেত। আমি ভাত-রুটি করতাম। বাবাকে চা করে দিতাম। ওমনিই শিখে গিয়েছিলাম। কিন্তু একবার পৌষপার্বণে পিঠে বানাতে বসে কিচ্ছু পারলাম না। সব কেমন দলা পাকিয়ে গেল। মা তখন যত্ন করে শেখালো আমাকে। এই যে জরির কাজ, এ কি শুরুতেই পারতাম? হেম করা, বখেয়া, চেন ফোঁড়, কাঁথা সেলাই – এই বিদ্যে ছিল। সে তো মেয়েরা এমনিই শিখে নেয়। কিন্তু জরি-চুমকির কাজ, ফসফসে ফিনফিনে জর্জেটে শিফনে কেমন নিখুঁত করতে হয়, শিখতে হলো না কারিগরের কাছে? এই তোমার কথাই ধরো। একটা গাছের চারা কি বীজ পুঁতে দিলাম, গাছ হলো, ফল-ফুল ধরল, এতে তো মুন্শিয়ানা নেই। বিদ্যে হলো, ছোট ছোট টবে অমন ঝাপড়া গাছ করা। চার ইঞ্চি টবে বড় ডালিয়া, আট ইঞ্চি টবে গন্ধরাজ লেবু… পারবে যে কেউ? এই বিদ্যে তোমায় আয়ত্ত করতে হয়নি?’

‘তা হয়েছে। সে ছিল ওস্তাদ ইদ্রিসচাচা। একমুঠো মাটি পেলেই সোনা ফলিয়ে দিত। ছ-ইঞ্চি টবে লাউয়ের মাপে বেগুন ফলিয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। মজিলপুরের কৃষিমেলায় শ্রেষ্ঠ পুরস্কার বাঁধা ছিল তার কাছে। ইদ্রিসচাচার বিদ্যে দিয়েই তো করে খাচ্ছি আজ।’

‘সেই কথাই তো বলছিলাম। দেখো, সুহাস আমাদের ভালো ছেলে। বুদ্ধি আছে। কোথাও ঠেকেনি। কিন্তু এইসব পরীক্ষা ভারি কঠিন। সারা দেশের সেরা ছেলেমেয়েরা সব পরীক্ষায় বসে। তার জন্য কিছু বিশেষ শিক্ষা লাগে না? তুমি জানো, গাছে সার দিতে হয়। কোন গাছে, কী সার, কতখানি লাগে তোমায় বুঝতে হয়নি? মালকিন ম্যাডাম বলছিল, আজকাল সবকিছুর জন্যই কোচিং লাগে। সরকারি চাকরি, ইস্কুলের চাকরি, ডাক্তারির ভর্তি – সবকিছু। তুমি দেখেশুনে সুহাসকে ভালো আইএএস পরীক্ষার কোচিংয়ে ভর্তি করে দাও।’

লীনাদেবীর বুদ্ধিতে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন শ্রী সুভাষচন্দ্র বারিক! তিনি খোঁজখবর শুরু করেছিলেন। দেখেশুনে ‘রজতদার কোচিং’ তাঁর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মনে হয়েছিল। বহুল প্রচারিত খবরের কাগজের পাতাজোড়া বিজ্ঞাপন নিয়ে তিনি সুহাসের কাছে এসেছিলেন।

একফালি ঘরে বাবা-মা-ছেলের বাস। প্রয়োজনীয় আড়াল-আবডাল রক্ষা করা দায়। টাইমকলে গা ভিজিয়ে স্নান সেরে ভিজে শাড়ি পরে মা ঘরে ফিরলে ছেলে বেরিয়ে একফালি আঙিনায় বাপের সৃজিত ফুলগাছগুলির কাছে দাঁড়ায়। এইসব তাকে আকর্ষণ করে না তেমন। সে ধরে নিয়েছিল জেলাশাসক হয়ে উঠবে অচিরেই। সুবিশাল সুসজ্জিত বাংলোয় ফুটে থাকবে অজস্র রঙিন ফুল। মালি ফোটাবে। ধবধবে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরে আরামকেদারায় গা এলিয়ে মালিকে নির্দেশ দেবেন সুভাষচন্দ্র। ঠাকুরঘরে শ্বেতপাথরের সিংহাসনে মায়ের ঠাকুর। লাল পাড় মটকা শাড়ি পরে লীনাদেবী পঞ্চপ্রদীপ জ্বেলে সন্ধ্যা-সকাল পূজার্চনা করবেন, খানসামা নমস্কার করে জিজ্ঞেস করবে – মা, আজ কী রান্না হবে?… মূল ফটকের পাশে খুপরি ঘরে বন্দুকধারী আরক্ষাকর্মী সদাসতর্ক প্রহরায়।

হায়! ওই ফটক পর্যন্ত পৌঁছানো হলো না। হায় তার ব্যর্থ স্বপ্নরা! এই বস্তির ঘরে তারা তার গলা টিপে ধরে। টব ফিরি করা মালির ছেলে, শাড়িতে চুমকি বসানো মায়ের ছেলে, বখে যাওয়ার কত হাতছানি ছিল তার এই বস্তিতে, রেললাইনের পারে, অন্ধকারে। নেশা ছিল। মেয়ে ছিল। ডাকাতি, গুন্ডামি, চোরাকারবার ছিল। সে কোনো ফাঁদে পা দেয়নি।৩ সে উত্তম নিশ্চিন্তে থেকেছে অধমের দলে, উচ্চশ্রেণির কেরানি বা ইস্কুলমাস্টার হওয়ার জন্য নয়, নয়। আইএএস হওয়ার মহিমান্বিত স্বপ্ন তাকে সমস্ত প্রতিকূলতার সঙ্গে যুঝতে শিখিয়েছে। কিন্তু এ কী হলো! কেন সে পারল না!               এক-একবার তাঁর মনে হতে লাগল, সে যদি মেধাবী না হতো, স্বপ্নময় না হতো, বস্তির ছেলে, গরিবের সন্তান – বড়জোর স্থানীয় কোনো নেতার অনুচর হয়ে একটি পান-বিড়ির গুমটি দোকান বাগাত কিংবা বিদ্যুতের মিস্ত্রি হয়ে জীবনযাপন করত – সেই হতো তার পক্ষে মানানসই!

কিন্তু সুভাষচন্দ্র ও লীনাদেবী তাঁদের একমাত্র সন্তান, যে কিনা বিদ্বান, বুদ্ধিমান, তাঁদের আশা-আকাঙ্ক্ষা ভবিষ্যতের অবলম্বন, তাকে ব্যর্থতার গ্লানি ও হতাশায় নিমজ্জমান দশা থেকে উদ্ধার করতে বদ্ধপরিকর ছিলেন। শুভবুদ্ধি বাবা-মায়ের এমনই দস্ত্তর।

শ্রীসুভাষচন্দ্র বললেন, ‘সুহাস, এটা দ্যাখ তো বাবা।’

‘কী?’

‘অনেক খোঁজ নিলাম। এটাই সবচেয়ে ভালো, বুঝলি।’

‘আমি জানি।’

‘তুই ভর্তি হয়ে যা।’

‘কোনো ধারণা আছে তোমার?’

‘কীসের?’

‘কত টাকা লাগে এখানে?’

‘কত লাগে?’

‘ওসব ছাড়ো বাবা। কোচিংয়ে ভর্তি হতে পারলে তো আমি ডাক্তারি-ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে চেষ্টা করতাম। ওসব আমাদের জন্য নয়।’

‘কত টাকা লাগে, বল না।’

‘আমিও জানি না ঠিক। আমার এক বন্ধু মাসে সাত হাজার টাকা দিয়ে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সির কোচিং নিচ্ছে। ওদের অনেক টাকা।’

‘মাসে সা-ত হা-জা-র!’

বাবা-ছেলের কথালাপ এখানেই শেষ হতে পারত, কিন্তু লীনাদেবী কেরোসিন স্টোভে ডাল রাঁধতে রাঁধতে নিচু স্বরে বললেন – ‘একবার ফোন করে খোঁজ নিতে ক্ষতি কী!’

সেদিনও বুকের মধ্যে শিরশির করে উঠেছিল সুহাসের। কেন, সে বোঝেনি। সেই মুহূর্তে কোনো আতঙ্ক ছিল না। স্কুলে যখন পড়ত, পরীক্ষার ফল বেরুনোর আগে, ভালো ফল সম্পর্কে নিশ্চয়তা সত্ত্বেও আত্মবিশ্বাসের অভাবজনিত অনিশ্চয়তার বিপুল উদ্বেগে ওই শিরশিরানির পীড়ন তাকে পেয়ে বসত। সে ভাবে, সম্ভবত এ তার অসুখ, তার অনুকম্পা-লালিত জীবনের, তার দারিদ্র্য ও অসহায়তা সম্বল জীবনের প্রদত্ত অসুখ। তার সহপাঠী বন্ধুরা কেউ তার দশায় ছিল না। কিন্তু সেজন্য কেউ তাকে অপমান অবহেলা করেনি সম্ভবত তার মেধার কারণে। কিন্তু আশেপাশে মানুষ যে স্বাচ্ছন্দ্য পায়, তার সিকিভাগও আপন জীবনে না থাকলে করুণ অপমান আপনি এসে লাগে। তার অভিঘাত অস্বীকার করার শক্তি সব মানুষের থাকে না। সেই বঞ্চনাকাতরতার বহিঃপ্রকাশ একেকজনের একেকরকম। যেমন সুহাসের শিরশিরানি।

সেদিন, লীনাদেবীর কথার ভেতর যে আশা জাগানোর লেশমাত্র ছিল, সুহাসের সাফল্যকাঙাল হৃদয় তাকেই অবলম্বন করতে চেয়েছিল বলেই সে উদ্বেজিত হয়েছিল। সেই শিরশিরানি-সমেত সে খোঁজখবর নিতে শুরু করে এবং তিন মাসের প্রশিক্ষামূল্য পঁয়ষট্টি হাজার টাকা শুনেও, বিস্ময়করভাবে সে হতোদ্যম হয়নি। তাদের একফালি ঘরে কোনো কথাই কারো কাছে গোপন থাকে না, একজন ক্ষুধার্ত হলে অপর দুজনের কানে তার উদরের আর্তরব পৌঁছোয়, এমতাবস্থায় বাপ-মায়ের রোজগার সম্পর্কে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ধারণা থাকা সত্ত্বেও সুহাস, এই বিশ্বাস অাঁকড়াতে চাইছিল যে, লীনাদেবী যখন খোঁজ নিতে বলছেন তখন কোনো ব্যবস্থা করা সম্ভব বলেই বলেছেন। মায়ের টাকা না থাক, তাঁর মালকিন হেনা অগ্রবালের অনেক টাকা। সেখান থেকে কি কোনো ব্যবস্থা হতে পারে না? চাহিদা মানুষকে সমস্ত রকম জোগানের সম্ভাব্যতার প্রতি প্রলুব্ধ করে।

‘এইখানে পড়লে চাকরি হবেই, না?’ সরলভাবে প্রশ্ন করলেন সুভাষচন্দ্র।

সুহাস বলেছিল, ‘আইএএস পাব বলো। এটা আইএএসের পড়ানো। কেরানির চাকরি তো আমি পরীক্ষা দিলেই পাব।’

‘অতই সোজা না-ও হতে পারে রে বাবা।’ লীনাদেবী অল্প হেসে বলেছিলেন, ‘বিএ-এমএ পাশ, সব ফার্স্ট ক্লাস, অথচ চাকরির পরীক্ষায় বসে বসে হদ্দ হয়ে গেল। আকছাড় হচ্ছে।’

‘সে যাদের হয় তাদের। এত তো ডাক্তার প্রতি বছর পাশ করে বেরোয়, সবার কি সমান পসার জমে? মা, আমি কিন্তু নিজে পড়েই এতকাল পাশ করেছি। নিজে পড়েই এবারের আইএএসে প্রাথমিক বিভাগ পাশ করেছিলাম, তুমিই বললে, বিশেষ পরীক্ষার জন্য বিশেষ তরবেতর দক্ষতা আয়ত্ত করতে হয়।’

‘তা তো বটেই। বলেছিই তো। তবে আরো একটা কথা            বলি বাবা, সবচেয়ে ভালো চাকরিটা পাওয়ার আগে ছোট-বড়            যে-কাজই পাস, নিয়ে নিলে সংসারের সুরাহা হয়। তোরও আত্মবিশ্বাস বাড়ে। তোর বয়স তো কিছুই হয়নি। একটা জোর থাকলে মন শান্তি করে আইএএসের তোড়জোড় করতে পারবি। যদি পেয়ে যাস, পুরনো চাকরি ছেড়ে দিলি, আর না পেলেও অমন জলে ডোবা দশা হবে না।’

সুহাসের মুখে হতমান দশার কালিমা ছেয়ে গিয়েছিল। সে জানে, তার মা প্রয়োজনাতিরিক্ত কথা বলার মানুষ নন। তবু যে আজ পঁয়ষট্টি হাজার টাকার সংস্থান কীভাবে হয় তার আলোচনায় বসে, এক বস্তিবাসী পরিবারের নগণ্যতম ব্যক্তিটি পর্যন্ত সরব, এই           বাস্তবতা সুহাসের প্রতি চরম অনাস্থা বলেই তার মনে হয়েছিল। একটু পরপর তাদের ঘর কাঁপিয়ে চলে যাচ্ছিল ট্রেন। সেই কাঁপন সুহাসের নিজের মনেও লাগছিল। সে কি এত কষ্ট করেছে কেবল মধ্যমমানের সরকারি কর্মী হবে বলে? কোনোক্রমে মাথা গুঁজে থাকবে, বাসে-ট্রামের ভিড়ে ঘেমো গায়ে গা সেঁকতে সেঁকতে আপিস যাবে, ব্রিটিশ আমলে তৈরি প্রাচীন চেয়ার-টেবিলে বসে, ধুলো          আস্তরণ পড়া বিবর্ণ কাগজপত্র ঘাঁটবে আর যৌবনেই আধবুড়ো খিটখিটে ঘুষখোর হয়ে গিয়ে লুকনো রুটি আর ঢেঁড়সভাজা দিয়ে মধ্যাহ্নভোজন করতে করতে ভাববে, মালির ছেলের পক্ষে এই ঢের?

না। অসম্ভব। তাহলে এই মেধার প্রয়োজন ছিল না। তিন চাকার ভ্যান-রিকশায় ফুলের টব বিক্রি করাই তার উপযুক্ত পেশা হতে পারত। শৈশব থেকে এ-পর্যন্ত, এই পরিবেশে, এই দারিদ্রে্য, এই স্বল্পশিক্ষিত পিতামাতার তত্ত্বাবধানে, নিজের ব্যতিক্রমী মেধা এবং পারঙ্গমতা সম্পর্কে যে আত্মগরিমা তার মনে বিপুলাকার এবং অক্ষত ছিল, সরকারি সর্বোচ্চ কৃত্যক পরীক্ষার ব্যর্থতায় তাতে আঘাত লেগেছিল বড়রকম, যেন বা প্রাচীন পাথরের গায়ে আকস্মিক ফাটল এবং মা লীনাদেবী, সেই ফাটল ধরা যে অসম্ভব নয়, শক্তিমানের পক্ষেও ভেঙে শতখান হওয়া যে স্বাভাবিকতা, এই কথাটি মনে করিয়ে দিয়ে সুহাসের অহঙ্কারকে অবমানিত করলেন। সুহাসের তা সহ্য হয়নি, সে চিড়বিড়িয়ে উঠেছিল, এমনকি তার ক্ষমতাদৃপ্ত পৌরুষে আঘাত লেগেছিল প্রাচীন কুসংস্কারাচ্ছন্নতায়, যা গোপন থাকে মানবের মনের তলাকার অন্ধকারে, এই বলে যে, লীনাদেবী একজন মেয়েমানুষ, মা তো কী, একজন মেয়েমানুষ, সংসারে যার মত দেওয়ার সর্বনিম্ন অধিকার, তিনি পর্যন্ত সুহাসের জীবনের প্রথম ব্যর্থতাকে লাঞ্ছনা করার সাহস পেয়ে যাচ্ছেন।

সে চোখ লাল করে বলেছিল, ‘আমি কী করব, সেটা আমাকেই ভাবতে দেওয়া উচিত ছিল মা। আমি তো কোনো দিন কিছু চাইনি। কোচিংয়ের খরচ খোঁজ নিতে তোমরাই আমাকে বলেছ! সংসারে টাকা চাই তো? সেটা সরাসরি বললেই হয়।’

‘তুই শুধু শুধু রাগ করছিস। সংসারে টাকার জন্য বলিনি। বলেছি তোরই জন্য। হাতের পাঁচ বলে একটা কথা আছে সুহাস। আমাদের জীবন তো কেটেই গেল, এবার যা চিন্তা, সবই তোর জন্য।’

‘তুমি থামো তো।’ ধমকে উঠেছিলেন শ্রী সুভাষচন্দ্র। বলেছিলেন, ‘যা বোঝো না তা নিয়ে কথা বলো না। এসব বড় পরীক্ষার পড়া হলো সারাদিনের কাজ। চাকরিতে একবার ঢুকে গেলে আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে ও? এতদিন ও যা করেছে একলা করেছে। এখন আমাদের উচিত ওর স্বপ্ন সফল করার জন্য ওর পাশে আমাদের সর্বস্ব নিয়ে দাঁড়ানো। ওই যে শরাফজি, কোটিপতি লোক, বিরাট ছাতে ফুটবল খেলা যায়। আমি গাছ করি বলে, শরাফজির ছেলে নির্মল আমাকে ডাকে গার্ডনার আঙ্কেল।           ও-ও এইরকম পরীক্ষা দিয়েছিল। বিদেশে কাজ পাবে। হয়ে গেছে। ও-ই তো আমাকে এই কোচিংয়ের কথা জোর দিয়ে বলল। বলল, গার্ডনার আঙ্কেল, আপনার ছেলে আইএএস দেবে! তাজ্জব কি বাত! কেউ বিশ্বাস করে না। করবে কেন? অনেক বড় ঘরেও সুহাসের মতো ছেলে জন্মায় না। তবু তো নির্মল বিশ্বাস করেছে।’

সুভাষচন্দ্র আরো কিছু বলতেন। শরাফদের বৈভবের গল্প করতে তিনি পছন্দ করেন, সুহাস জানে। তবে নির্মল শরাফ ভারতীয় বিদেশমন্ত্রক কৃত্যক পরীক্ষা উত্তীর্ণ হয়েছে, তা জানত না। তার গর্ব আরো স্ফীত হলো। আইএএস হয়ে গেলে তার বস্তিজন্ম নিয়ে উপকথা রচিত হবে। সে অসহিষ্ণুভাবে বলেছিল, ‘ঠিক কী বলতে চাইছ তুমি বাবা!’

সুভাষচন্দ্র বলেছিলেন, ‘তোর মাকে বোঝাতে চাইছি। নির্মল বলেছিল, আইএএস, আইপিএস হওয়া সবচেয়ে কঠিন। সে সারাদিন পড়ত। তিন জায়গায় কোচিং নিয়েছিল। তবু তৃতীয়বারের চেষ্টায় সফল হয়। ওকে এখনই চাকরির কথা বলো না।’

লীনাদেবী তাঁর নিত্যব্যবহার্য বিবর্ণ ঝুলি থেকে একটি চাবির গোছা নিয়েছিলেন। হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকে পড়েছিলেন চৌকির তলায়। টেনে-হিঁচড়ে বার করে এনেছিলেন একটি টিনের তোরঙ্গ। ফুল অাঁকা। মাঝে মাঝে জং পড়ে রং খসে গেছে। তোরঙ্গের তালাটিও মরচে পড়ে কমলরঙা হয়ে উঠেছে। কী আছে ওই তোরঙ্গে? গরিবের ঘরের কোনো সম্পদ?

সুহাস যখন ছোট ছিল, তোরঙ্গ খুলে দেখার জন্য বায়না করত। লীনাদেবী বলতেন, ‘দেখবি, বড় হলে দেখবি। সবই তো তোর।’

তারই বস্ত্ত যখন, কেন তাকে বড় হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে একটুখানি অবলোকন করার জন্য, শিশু সুহাস তা বুঝতে পারত না। কিন্তু বায়না নিয়ে পড়ে থাকতে শৈশবাবস্থাতেও সে পছন্দ করেনি। একসময় টিনের তোরঙ্গ সম্পর্কে তার সব আকর্ষণ চলে যায়। বস্ত্তত সে ভুলেই গিয়েছিল এইরকম একটা কিছু তাদের আছে। সেইদিন, বহু বর্ষ পর, মাকে তোরঙ্গখানি বার করতে দেখে সে কৌতূহল বোধ করতে লাগল।

সুভাষচন্দ্র বললেন, ‘ওটা আবার খুলছ কেন?’ তাঁর স্বর সামান্য কম্পিত, প্রশ্রয়ে গদগদ বটে। তিনি জানেন, ওই তোরঙ্গ স্বপ্ন সম্ভব করলেও করতে পারে।

লীনাদেবী স্বামীর কথার জবাব দিলেন না। চাবি ঘুরিয়ে তালা খুলে, কিছু কাপড়-চোপড়, কাঁসার কটি বাসন হাতড়ে, কোন কোনা থেকে বার করে আনলেন ছ-ইঞ্চি আন্দাজ লম্বা, ইঞ্চি চারেক প্রস্থ ও গভীরতার পেতলের বাক্স। একসময় হয়তো বা এটি ছিল পানের বাটা। এখন কী আছে এতে?

একটি শালু কাপাড়ের পুঁটলি। লালশালু। কালের মলিনতায় টকটকে ঔজ্জ্বল্য কালচে আবরণে প্রলিপ্ত। লীনাদেবী তার ভাঁজ খুলছেন। অতি সাবধানে। পরম মমতায় এক ভাঁজ, দু-ভাঁজ…! সুভাষচন্দ্র বলছেন, ‘এসব আবার বার করছ কেন? ওইটুকুই তো সম্বল।’ বলছেন, কিন্তু দৃষ্টি ফেরাচ্ছেন না। সুহাসও দেখছিল           শান্তভাবে। সহসা, সকল মলিনতা, সমস্ত গরিবি নস্যাৎ করে, চুরি করা বিদ্যুতের আলোয় জ্বলা একটিমাত্র টিউববাতির বিকিরণে ঝিকমিক করে উঠেছিল একজোড়া সোনার বাউটি। হিরের কুচি বসানো। আসল হিরের কুচি বসানো, আসল সোনার বাউটি।

মেয়েদের কোন অলঙ্কারের কী নাম, জানত না সুহাস। আজো জানে না। জানে কেবল গলার হার, হাতের চুড়ি, বালা, কানের দুল। আর জানে বাউটি। যা দেখে সেদিন তার মনে হয়েছিল, খুব ছোটবেলায় পড়া, ‘রাজার ঘরে যে-ধন আছে, টুনির ঘরেও সে-ধন আছে।’

কত ঝড়-ঝাপটা, কত কষ্ট ও দারিদ্রে্যও মা ওই অলঙ্কার হাতছাড়া করেননি। আজ, পঁয়ষট্টি হাজার টাকার ড্রাফট নিয়ে, নিশ্চিত স্বপ্নপূরণের আশায় মেধাবী উচ্চাকাঙ্ক্ষী সুহাস ‘রজতদার কোচিং’য়ে ভর্তি হওয়ার জন্য অপেক্ষমাণের সারিতে যে দাঁড়িয়ে আছে, তা ওই একজোড়া বাউটির আশীর্বাদে। তার মায়ের আশীর্বাদে।

সুহাস, প্লাস্টিক আবরণের ওপর দিয়ে ড্রাফটে হাত বুলিয়ে দিলো। আত্মপ্রতিষ্ঠার পর তার প্রথম কাজ ওই বাউটি উদ্ধার করা।

সেদিন, সুভাষচন্দ্রের প্রশ্নের উত্তরে লীনাদেবী বলেছিলেন, ‘আমাদের সম্বল আমাদের ছেলে। এ তো ওরই জিনিস। ওর বউকে দিয়ে মুখ দেখতাম।’

সুভাষচন্দ্র কম্পিত স্বরে বলেছিলেন, ‘ক-কত হ-হবে এর            বা-বাজারদর?’

‘এ অমূল্য। অ্যান্টিক যে! আমাদের বাড়িতে নাকি সাত পুরুষ ধরে আছে। বেচলে লাখখানেক তো হবেই।’

হেনা অগ্রবালের কারখানায় ‘অ্যান্টিক’ বস্ত্তর সম্পর্কে ধারণা পেয়েছেন লীনা। ঐতিহ্যসমৃদ্ধ বস্ত্তগুলি অমূল্য। কিন্তু মানুষ অমূল্যের মূল্যও বাণিজ্যিক পরিমাপে বাঁধে। সেই অঙ্ক সম্পর্কে স্পষ্ট জ্ঞান লীনাদেবীর ছিল না। তাঁর কাছে এক লাখ টাকা স্পর্শাতীত সম্পদ।

সুভাষচন্দ্র বলেছিলেন, ‘একেবারে বেচে দেবে?’

সুহাসের বুকের মধ্যে প্রবল শিরশির করছিল। আনন্দে উত্তেজনায় বিহবল হয়ে গিয়েছিল সে। এমন দামি জিনিস তাদের ঘরে আছে! এমন চটজলদি সমাধান! কতকাল ধরে কত যত্নে আগলে রেখেছেন মা! তার ইচ্ছে করছিল মাকে জড়িয়ে ধরে আদর করে। কিন্তু সে বড় আবেগ-প্রকাশী নয়।

লীনাদেবী বাউটিজোড়া হেনা অগ্রবালের কাছে বাঁধা রেখে সত্তর হাজার টাকা নিয়েছেন। এ-গহনা যে লীনারই সে নিয়ে হেনার কোনো সন্দেহ ছিল না। এত সংগ্রামের মধ্যেও লীনার সৌন্দর্য এবং সদাচার তাঁদের উচ্চবংশমর্যাদা সম্পর্কে ধারণা দেয়। সুহাস পেয়েছে মায়ের ধারা। তার উচ্চতা, গড়ন, মুখশ্রী, মেধা ও সৌভদ্র আচরণ তাকে যে-বৈশিষ্ট্য দিয়েছে, যে লালিত্য ও সৌষ্ঠব, যে আকর্ষণী ক্ষমতা – তার সবটাই মাতুলবংশসূত্রে। আজ যে সে এখানে দাঁড়িয়ে আছে, তার দুটি মাত্র ভালো পরিধেয়র একখানি, এই নীল শার্ট, হালকা নীল জিন্স, হাতে হালফ্যাশানের প্লাস্টিক খাম, যাকে বলে ফোল্ডার, সব মিলিয়ে, আরো যারা অপেক্ষারত, সে বাজি ধরতে পারে, তাদের মধ্যে একজনও তার মতো পরিস্থিতির নয়, তবু, এই উচ্চ বা মধ্যবিত্তের দঙ্গলে, শরাফজির মতো ধনী মানুষের ছেলেমেয়ের দঙ্গলে, সে, সুহাস বারিক, সে জানে, তাকে এতটুকু বেমানান লাগছে না।

তার মাতুলবংশ ছিন্নমূল উদ্ধাস্ত্ত ছিল। সর্বহারা ছিল। রাতারাতি ঐতিহ্য ও মর্যাদার শিখর থেকে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল ধূলিধূসর মানহীনতায়।

কিন্তু সর্বহারারও রক্ষা করার মতো কিছু থাকতে পারে। জিনের মধ্যে প্রোটিন তন্তুর ভাঁজে ভাঁজে পরতে পরতে ধরা থাকে আহরিত রূপ, রুচি, সততা, মেধা ও আত্মমর্যাদাবোধ।

লীনাদেবী কখনো আত্মমর্যাদাবোধ থেকে ভ্রষ্ট হননি। প্রয়োজনে হেনা অগ্রবালের কাছ থেকে টাকা ধার করেছেন, উদয়াস্ত পরিশ্রম করে পরিশোধও করেছেন। হেনা দেবী বন্ধকি কারবার করেন না। বাউটিজোড়া হাতে নিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘এ-জিনিস বিক্রি কোরো না। টাকা যা লাগে নাও। পরে সুবিধে মতো ছাড়িয়ে নিও।’

দেওয়া-নেওয়া সংক্রান্ত কোনো নথি নেই। সাক্ষী, সই-সাবুদ কিছুই নেই। শুধু বিশ্বাস। দুই নারী পরস্পরকে চেনেন। একজন ব্যবসায়ী, খাটিয়ে নেন, ন্যূনতম মজুরিতে সমধিক কাজ আদায় করে লাভের কারবার করেন। কিন্তু ঠগবাজ তাঁকে বলা চলে না। কর্মচারীদের বিপদে-আপদে তিনি পাশে থাকেন। অপরজন সেই কর্মচারীদের একজন। মালকিনের বিরুদ্ধে অন্য সবার মতো তাঁরও অভিযোগ কম নয়। বেতন, বোনাস, বাড়তি শ্রমের মজুরি নিয়ে সদা অসন্তোষ। তবু তাঁকেই অবলম্বন করে বাঁচতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছেন লীনাদেবী। বাউটিজোড়া রেখে, বিনিময়ে ন্যায্যমূল্য পাবার আশায়, গহনার দোকানে না গিয়ে ওই হেনা অগ্রবালের কাছেই গিয়েছিলেন।

মায়ের মালকিন, ওই হেনা অগ্রবালের কাছে কি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত তার? সুহাস ভাবছিল। বাউটিজোড়া কোথাও বাঁধা দিলে প্রদত্ত ঋণের জন্য চড়া সুদ হাঁকত, আর বেচলে, অমন সাতপুরুষের অ্যান্টিক চিরকালের জন্য হাতছাড়া হয়ে যেত! তার মনে পড়ল, মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক থেকে একেবারে মাস্টার পর্যন্ত প্রতিটি পরীক্ষায় সে যখন ভালো ভালো ফল করত, হেনা অগ্রবাল সেই খবর শুনে এক বাক্স মিষ্টি পাঠাতেন, সঙ্গে কিছু টাকা। সুহাস কখনো তাঁকে দেখেনি। অথচ তার জীবনের সঙ্গে ওই দূরবর্তিনী কীরকম জড়িয়ে আছেন! তার মনে হতে লাগল, কবেকার কোন পূর্বনারীরা, যাঁরা ওই বাউটিজোড়া ব্যবহার করতেন, যাদের বিবিধ বিচিত্র বৈশিষ্ট্য বংশধারা অনুযায়ী সঞ্চারিত হয়ে গেছে তার মধ্যে, তাঁদের সঙ্গে, হেনা অগ্রবালের সঙ্গে, এই ঝাঁ-চকচকে কলেজের মতো সুসংগঠিত ‘রজতদার কোচিং’য়ের সঙ্গে অদৃশ্য গ্রন্থিতে যুক্ত তার জীবন, এখানে তার কিছু করার নেই!

ভাবতে ভাবতেই পিছনপানে তাকাল সে। দেখল মেয়েটিকে। কখন থেকে আছে, খেয়াল করেনি। ধীরে ধীরে সারির সামনের দিকে এসে দাঁড়িয়েছে সে এখন। মেয়েটির চোখে তার চোখ পড়ল। মেয়েটি হাসল। হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘হাই, আমি সুমালা।’ তার হাতে মুঠোভাস যন্ত্রখানি। সুহাস কীভাবে করমর্দন করে? সে নিজের ফোল্ডার সামলে সুমালার মুঠোফোনসহ হাতখানিতে অল্প চাপ দিয়ে বলল, ‘আমি সুহাস। কোন কোর্স?’ সুমালা বলল, ‘আই অ্যাস।’

‘আই অ্যাস!’ আধ সেকেন্ড সময় লাগল বুঝতে। তারপর         হো-হো করে হেসে উঠল সে। শেষ কবে এমন হেসেছে, মনে করতে পারল না। হাসি, মজা, ক্ষ্যাপামির মধ্যে দিয়ে জীবনকে দেখার অবকাশই মেলেনি তার। রেললাইনের ধারে ওই বস্তির, ঘরখানি সে সারাক্ষণ বয়ে বেড়ায়। এই মুহূর্তের হেসে ওঠার মধ্যে তার প্রাণ যে নিরাময় পেল, তার স্বাদ বুঝি আগে সে আর পায়নি। সে, না জেনে, না বুঝে, মেয়েটি সুন্দর না অসুন্দর, অমল না অহঙ্কারী, একাকিনী না প্রেমিকা – কিছুই ভাবার অবকাশ পর্যন্ত না নিয়ে তাকে আপন হৃদয়ে চিরকালের মতো স্থাপন করে বসল। সুহাস জীবনে প্রথম প্রেমে পড়ল।

মেয়েটি জানল না। জানল না কিছুই। সুহাসের খোলা হাসির দিকে মুগ্ধ চেয়ে থেকে হাসতে হাসতেই বলল, ‘নয়? বলো? গাধা না হলে, বিশ্বে এত কিছু থাকতে কেউ আইএএস হতে চায়?’

দুই

তিন মাসের পাঠক্রমের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে শিক্ষকদের নজর কেড়ে নিয়েছিল সুহাস। প্রতিটি পরীক্ষায় সে সেরা ফল করল। কিন্তু সে ভারি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছিল। কারণ বিজ্ঞাপনে সব কথা বলা থাকে না। তথ্য সরবরাহ করার জন্য যে মেয়েটি সুমধুর ভঙ্গিমায় বিবিধ পাঠক্রমের ব্যাখ্যা করে, তার পরিবেশনায়ও আপাত সম্পূর্ণতার কৃত্রিম আশ্বাস থাকে। হ্যাঁ, এই কোর্স করলেই আপনি যে উদ্দেশ্যে এসেছেন, তা সফল হবে। আমরা আপনাকে পঞ্চাশ শতাংশ তৈরি করে দেব। বাকি আপনার পরিশ্রম ও ভাগ্য। তবে এই একটা পাঠক্রমের মধ্যে দিয়ে আপনি যে-কোনো প্রথম শ্রেণির সরকারি চাকরির পরীক্ষার জন্য তৈরি হয়ে যাবেন।

আসলে, বিজ্ঞাপনে যা বলা হয় না, এমনকি সহজে প্রচারও করা হয় না যা, সে হলো, আইএএসের বিশেষ কোচিং। পঁয়ষট্টি হাজার টাকায় যা খরিদ করা হলো তা একরকম সার্বিক প্রস্ত্ততি। যথেষ্ট কঠিন, আয়াসসাধ্য এবং মেধানির্ভর। একে তো স্নাতক স্তরে যথেষ্ট ভালো ফল না হলে এই কোচিংয়ে ভর্তি হওয়াই যায় না, তদুপরি, এখানকার কড়া ব্যবস্থা এবং কঠিন প্রশিক্ষণ শেষে অনেকেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। নানাবিধ চাকরি পেয়ে যায় বহুজন। আইএএস হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে আসে, মধ্যম মানের আধিকারিক পদ লাভ করে। সেই বা কী কম! এই চূড়ান্ত বেকারত্বের দেশে, কর্মসংস্থান অপ্রতুল, সেখানে মান্যগণ্য সরকারি চাকরি পাওয়া রীতিমতো সাফল্যগর্বী করে তোলে কোচিংয়ের প্রশিক্ষিত ছেলেমেয়েদের। খবরের কাগজে ফলাও করে তাদের ছবিসহ বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। কোনো অজ্ঞাত কারণে সফল আইএএস পরীক্ষার্থী বা তৎসমতুল্যদের ছবিসহ নাম ছাপা হয় না। সুহাস সেই অজ্ঞাত কারণসম্পন্ন দলভুক্ত হতে চায়। কিন্তু তার জন্য পাঁচ লাখ টাকা দরকার। এর মাধ্যমেই নিশ্চিতভাবে খরিদ করা যাবে ভারতীয় প্রশাসনিক কৃত্যকের নিশ্চিত প্রশিক্ষণ! লিখিত পরীক্ষায় একশ শতাংশ সাফল্য। কিন্তু এই দক্ষিণার কোনো রসিদ মিলবে না। ছ-মাস ক্লাস চলবে। এর মধ্যে কেউ যদি ছেড়ে যেতে চায়, তাকে দশ শতাংশ অর্থ ফেরত দেওয়া হবে। অবশ্য, সেক্ষেত্রে তিন মাস পার হয়ে গেলে সে প্রশ্ন উঠবে না।

তাহলে সুহাসের কী লাভ হলো?

কোচিং কেন্দ্রের সমীপবর্তী একটি কফিবিপণিতে বসে ছিল সুহাস ও সুমালা। সুহাস গম্ভীর ম্লান, স্পষ্টতই হতাশ। সুমালা বিব্রত। সে বলল, ‘এত ভেঙে পড়ছ কেন? তোমার তো আত্মবিশ্বাস আছে সুহাস। এতদিন নিজের জোরেই তুমি যা কিছু করেছ। আমাদের মধ্যে সেরা ফল করেছ তুমি। এবার তুমি পাবেই।’

সুহাস ও সুমালার প্রথম দিনের আলাপ বন্ধুত্বের যে নিবিড় স্তরে পৌঁছেছে, তাকে প্রেম বলা চলে অনায়াসে। তারা এই প্রেম গোপন করেনি, অস্বীকারও করেনি। এ এক আশ্চর্য সম্পর্ক। চার মাস আগেও কেউ কাউকে দেখেনি পর্যন্ত। আজ, কেউ কাউকে ছাড়া থাকতে পারে না। একজনের বিষাদ আরেকজনের চোখে জল ঘনিয়ে তোলে। বাকি জীবনে, বিচ্ছেদের তিলমাত্র সম্ভাবনা এলে মনে হয় এ-জীবনের আর কোনো মানে রইল না।

কদিন আগে সুমালার জন্য বিবাহের প্রস্তাব এসেছিল। প্রতিষ্ঠিত উদার পাত্র, প্রগতিশীল পরিবার। সুমালা যে আত্মপ্রতিষ্ঠায় আগ্রহী, তাতে তাঁদের কিছুমাত্র আপত্তি ছিল না। তাঁরা শুধু ‘বধূ’ খুঁজছিলেন না, পুত্রের পক্ষে উপযুক্ত জীবনসঙ্গিনী সন্ধান করছিলেন। এমন সম্বন্ধ সচরাচর জোটে না। সুমালার বাবা-মা এই বিবাহে অত্যুৎসাহী হয়ে উঠলেন। তার ছোটবোন শর্মিলা পর্যন্ত চোখেমুখে খুশি মেখে বলল, ‘দিদি, রাজি হয়ে যা। শুভব্রতদার সঙ্গে অনেকক্ষণ আড্ডা মেরেছি। আমার দারুণ ভালো লেগেছে। জানিস, ও নিজে গান লেখে, সুর দেয়। খুব ভালো গলা।’

শুভব্রত নামে সেই প্রস্তাবিত পাত্র একটি হীরকখন্ড, সে-বিষয়ে সুমালার দ্বিমত ছিল না। সেই পাত্র যদি অসুন্দর হতো, নির্গুণ হতো, তার ভদ্রতাবোধ সম্পর্কে একটু সন্দিহান হওয়া যেত যদি, সুমালার পক্ষে প্রত্যাখ্যানের যুক্তি সাজানো সহজ হতো। শর্মিলা তার ছোটবোন, বয়স মাত্র এগারো, বোনকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে সে; কিন্তু বোনের উচ্ছ্বাসে, আগ্রহে সে প্রচন্ড ক্রুদ্ধ হয়েছিল। সে জানে, এই ক্রোধ আসলে তার অসহায়তা। সে সুহাসকে ভালোবেসে ফেলেছে। সুহাস তার প্রথম প্রেম, প্রথম মুগ্ধতা, প্রথম পুরুষ – যাকে দেখলে তার বুকের মধ্যে ঢিপঢিপ করে, সে স্বেদাপ্লুত হয়, যার হাত ধরলে তার শরীর-মন অপূর্ব পুলকে শিহরিত হতে থাকে। এই কথা সে কাউকে বলেনি। দশ বছরের ছোট, প্রাণপ্রিয় বোনটিকেও বলেনি। বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত দেখাসাক্ষাৎ হয় না যে নিজেকে প্রকাশ করবে। সবচেয়ে বড় কথা, সে আর সুহাস, পরস্পরকে অতলপরশ প্রেমে জড়িয়েছে, কিন্তু সে নিয়ে একটিও কথা বিনিময় তারা করেনি। মন মানুষের সর্বস্ব। কিন্তু মনের অনুভবকে কথার উচ্চারণের আনুষ্ঠানিকতায় না বাঁধা পর্যন্ত সামাজিক মানুষের স্বস্তি হয় না। বিশ্বাস পূর্ণ হয় না। সুমালার সেই দশা তখন। সেই অসহায়তা। সে কী করে! কী বলে! সুহাসকে তখনো পুরো জানেনি।৪ সে দারুণ রাগে বোনকে বলেছিল, ‘এক চড় মারব!’

বিস্ময়ে চেয়েছিল শর্মিলা। কী ভুল করল সে! দিদিকে এতখানি অসহিষ্ণু হতে সে কখনো দেখেনি। সুমালাও এই রুক্ষতায় আপনাতে আপনি আহত হয়েছিল। এ কী নিষ্ঠুরতা তার! বোন অন্যায় কিছু বলেনি। অসহায়তাবোধ ও অনিশ্চয়তায় ছিন্নভিন্ন হতে হতে সে হঠাৎ কেঁদে ফেলেছিল।

যে-মেয়ে আইএএস হওয়ার কঠিন আরোহণ পর্ব সম্পূর্ণ অভিনিবেশে আয়ত্ত করার প্রয়াসী, সে নির্বুদ্ধি নয়, কান্ডজ্ঞানহীন নয়, ছিঁচকাঁদুনিও নয়। বরং তার সরসতা ও ব্যক্তিত্বের মাধুর্য এই পরিবারের দীপশিখার মতো। আর এগারো বছরের শর্মিলাও যথেষ্ট পরিণত এবং মেধাবিনী। দিদির এই অসহিষ্ণুতা, এই কাঁদনবিজড়িত বিস্ফোরণ যে তার বিচলিতচিত্তের বহিঃপ্রকাশ, তা অনুভব করে সে বলেছিল, ‘দিদি, তুই কি প্রেম করছিস?’

সুমালা ধমকে ছিল, ‘পাকামি করিস না।’

‘সেদিনই তুই আমাকে বলেছিলি আমি যথেষ্ট বড় হয়েছি। পাকামিতে আমার অধিকার জন্মায়। দিদি, বাবা-মাকে সব বলে দিচ্ছিস না কেন? লুকোচ্ছিস কেন? তুই তো বলিস, মনে অপরাধবোধ থাকলে তবেই মানুষ সবচেয়ে কাছের লোককে মিথ্যে বলে।’

‘আমি কোনো মিথ্যে বলেছি কি?’

‘লুকোচ্ছিস।’

‘লুকোনো আর মিথ্যে বলা সম্পূর্ণ আলাদা মিলা। খুব কাছের জনের মনে যাতে আঘাত না লাগে, তার জন্যও অনেক সময় অনেক কিছু গোপন করতে হয়, মিথ্যে বলতে হয়। আসলে পৃথিবীতে কোনো কাজেরই সরল ব্যাখ্যা হয় না। এটার জন্য ওটা বা ওটার জন্য এটা নয়।’

‘আমি অতশত বুঝি না। আমার কথা হলো, যেটা আমাকে স্বস্তি দিচ্ছে না, আমাকে কষ্টে রাখছে, সেটা আগে সমাধান করো। যে অঙ্কগুলো আমি কিছুতেই বুঝতে পারি না সেগুলোই আগে হরেনস্যারকে দেখাই। আর আমি তোকে বলছি দিদি, হরেনস্যার ইংলিশে ভালো, ফিজিক্সে ভালো, ভূগোল ইতিহাস – সবকিছুতে ঝক্কাস, কিন্তু অঙ্কে? এই আমি তোকে বলে রাখলাম দিদি, ওই বুড়োর কাছে আর এক বছর অঙ্ক করলে আমি চিরকালের মতো অঙ্কান্ধ হয়ে যাব।’

‘অঙ্কান্ধ?’

‘জন্মান্ধর অনুপ্রাস।’

সুমালা হেসে ফেলেছিল। নরম চোখে বোনের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, ‘একজনের কাছে অঙ্ক করবি? একদম তৈরি করে দেবে।’

‘কে রে?’

‘আছে একজন।’

‘যার জন্য শুভদা একশয় একশ পেয়েও ফক্কা?’

‘আবার ওস্তাদি করছিস?’

‘হরেনকে হটানো যাবে না। তোকে কীরকম চৌকস বানিয়েছেন উনি বল। অঙ্কে পঁয়তাল্লিশ পেয়ে পেয়েই আমাকে সারাজীবন কাটাতে হবে।’

মুখখানা ছদ্মকরুণ করে কান্নার ভান করছিল শর্মিলা। সুমালা বলেছিল, ‘সুহাসের ব্যাপারে আমি বাবার সঙ্গে কথা বলব।’

‘তো তার নাম সুহাস?’

‘হু।’

‘ঠিক আছে। আমি রাজি। দেখতে ভালো?’

‘হুঁ।’

‘স্মার্ট?’

‘হু।’

‘তোর জন্য জান দিতে পারে?’

‘জানি না।’

‘কথা হয়নি?

‘ফাজিল কোথাকার! কী বলব আমি? তুমি আমাকে ভালোবাসো? আমার জন্য প্রাণ দিতে পারো?… ওসব ফিল্মে হয়।’

‘মানে এখনো কোনো কথাই হয়নি তোদের?’

‘মিলা…।’

‘কী হলো? পাকামি করছি, এটাই বলবি তো?’

‘তুই এত পরিণত হয়ে গেলি কবে?’

‘দুনিয়া দ্রুত এগোচ্ছে দিদি। আমি তোর পরের প্রজন্ম। আমাদের ক্লাসে অনেক বন্ধু রীতিমতো প্রেম করে। দিদি, যার জন্য শুভদার মতো ছেলেকে তুই ফিরিয়ে দিচ্ছিস, তার সঙ্গে আগে কথা বলে নেওয়া দরকার ছিল না?’

‘হুঁ! দেহি!… শুভব্রত ছেলেটিকে তোর এত ভালো লেগেছে?’

‘হ্যাঁ। খুব। অনেক বড়, না হলে প্রেম করতাম। কিন্তু শুভদা আমাকে বাচ্চা মেয়ের মতো দেখে। তাতে বয়েই গেল। আমরা বন্ধু হয়ে গেছি।’

‘এরই মধ্যে।’

‘ফেসবুক ফ্রেন্ড। সেটা কথা নয়, কথা হলো সুহাস কি শুধু আমার অঙ্কশিক্ষক হয়েই আসবেন, নাকি বাবা-মা আরো কিছু জানতে পারবেন?’

সেই রাতে সুমালার ঘুম হয়নি। জীবনে প্রথমবার, নিজের পড়া, চাকরি, উন্নতি, প্রতিষ্ঠা – ইত্যাদির বাইরে সে জীবনের কিছু মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছিল। সেসবের উত্তর তার জানা ছিল না। কাকে বলে প্রেম? এই যে অনুভবসমূহ, এই যে একজন প্রায় অজ্ঞাতকুলশীল যুবকের প্রতি তীব্র টান, যাকে ছাড়া তার আগামী দিনগুলি সে কল্পনাও করতে পারে না, এই অভিনব এবং অত্যাশ্চর্য বোধ তাকে কোথায়, কতদূরে নিয়ে যাবে? সে কি তার বাবা-মাকে অসুখী করে তুলবে? সে তা চায় না। কী এসে যায় যদি সে এমন বিয়ে না করে, আদৌ বিয়ে না করে? এমনকি সুহাস – তার সঙ্গেও যদি শেষ পর্যন্ত জীবন যুক্ত না হয়? তবু এই মুহূর্তে এ-ই সত্য, সে সুহাসকে ভালোবেসেছে। ভালোবাসে। এর বাইরে অন্য কেউ তার সহনাতীত।

ভোরের বেলা, যখন শহরের পাখিরা আড় ভেঙে ঘুমবিজড়িত কণ্ঠে ডাকাডাকি শুরু করে, সুমালা তাদের সুবিশাল বৈঠকখানার পুবমুখী জানালার কাছে এসে দাঁড়াল। তখনো সূর্য দেখা দেয়নি। ঊষার লালিমা রাঙা কিরণরঞ্জিত করছে শেষরজনীর কালচে নীল দিগন্ত। সুমালা চুপচাপ চেয়েছিল সেইদিকে। যেদিকে তাকায়, সুহাসের চোখ দুটি, তার হাসি, কথা, বিভঙ্গ, অভ্যাস – সমস্তই আকাশের প্রেক্ষাপটে অাঁকা হতে থাকে। মুছে যায়। ফের অাঁকা হয়। সেই মুহূর্তে, জীবনের স্বতঃস্ফূর্ত প্রবহমানতার কাছে নিজেকে সমর্পণ করে দিয়েছিল সুমালা।

সেদিন সে সুহাসকে বলেছিল, ‘বাবা পাত্র দেখছেন। তিনি চান আমি বিয়ে করি।’

সুহাস বলল, ‘তোমার পড়া? তোমার আই অ্যাসের প্রস্ত্ততি?’

‘সব থাকবে।’

‘তুমি কী চাও?’

‘এই মুহূর্তে তোমার মুখ থেকে কিছু শুনতে চাই।’

‘তুমি কি আমাকে বোঝোনি?’

‘বুঝি। তবুও।’

‘তুমি অন্য কারো হয়ে গেলে আমি পাগল হয়ে যাব সুমালা। কিন্তু এখন বিয়ে করার কথা আমি ভাবতেও পারি না।’

‘এখন বিয়ে করতে বলিনি তো। সুহাস, আমি বাড়িতে তোমার কথা জানাতে চাই। আমি কখনো বাবা-মায়ের কাছে কিছু লুকোইনি। তোমার কথা বলতে না পেরে আমার নিজেকে অপরাধী লাগছে।’

‘কিন্তু আমি তো তোমাকে এই মুহূর্তে বাড়িতে… মানে, সুমালা, তুমি আমার সম্পর্কে তো কিছুই জানো না।’

‘আমাকে জানাও।’

‘আমাদের অবস্থা, মানে… ইয়ে… আমার বাবা ফুলগাছের ব্যবসা করেন। দারিদ্রে্যর মধ্যে বড় হয়েছি। আমার মা একটি পোশাকের কারখানায় উদয়াস্ত পরিশ্রম করেন। ছোট বাসা। তোমাকে নিয়ে যাওয়ার মতো… সুমালা, তোমাকে প্রথম দিন থেকে ভালোবেসেছি, কিন্তু আমার জীবন যে সহজ নয়। এই পরীক্ষার ওপর আমার অনেক কিছু নির্ভর করছে। বলা ভালো, গোটা জীবন।’

‘আমার বোন মিলার একজন ভালো অঙ্কশিক্ষক দরকার। তুমি ওকে পড়াবে? আমাদের বাড়ির সঙ্গে একটা যোগাযোগ হয়ে যাবে তোমার। তারপর জীবন যেদিকে নিয়ে যায়! দেখাই যাক না।’

সুহাস গিয়েছিল সুমালার বাড়িতে। আজো যায়। শর্মিলাকে অঙ্ক পড়ায় নিয়মিত। সুমালার পরিবার তাকে পছন্দ করেছে। আর সুহাস, নিত্য যাওয়া-আসার মধ্যে, সুমালাদের বৈভব-বিত্ত ও সম্পন্নতার আন্দাজ পেয়ে গোপন দীর্ঘশ্বাস ফেলছে প্রতিদিন। হায়! এর সিকিভাগও কি তার জীবনে থাকতে পারত না। তার বাবার? তার একদাসম্পন্ন বাড়ির অধুনা প্রজন্ম, অ্যান্টিক বাউটিবাহিনী তার মায়ের?

তিন

ইদানীং সুহাস বড় গম্ভীর। উদাসী। পাঁচ লাখ টাকা নগদ, যার কোনো প্রমাণপত্র থাকবে না, রসিদ থাকবে না, সুমালা সেই অর্থের বিনিময়ে ‘রজতদার বিশেষ কোচিং’ খরিদ করবে।

সুহাস জানে, পৃথিবীতে, এই মুহূর্তে তাদের সর্বস্ব উজাড় করেও এই অর্থ সংগ্রহ অসম্ভব। এমনকি চিন্তা পর্যন্ত অবাস্তব। এর কথা বাবা-মাকে জানানো বাতুলতা মনে করেছে সে। সম্পূর্ণ হতাশার বহিঃপ্রকাশের মধ্যেও মনের অতলান্ত তমিস্রায় একটি ভাবনা সুগোপনে লালন করতে তার ভালো লাগছে যে, পৃথিবীতে,            আত্যন্তিক চেষ্টা, অসম্ভবকে সম্ভবপর করে তুলতে পারে।

কোন সে প্রয়াস? তার মেধামন্ডপে বিবিধ উপায় উঁকি দিয়ে যায়।

সুমালার বাবার কাছে ঋণ চাইবে?

সুমালাকে বলবে, টাকাটা আমায় দাও। আমি তো পাবই তা হলে! আমার জন্য তুমি সব করতে পারো। সব দিতে পারো। বলোনি?

নিজের একটি অঙ্গ বিক্রি করে দেবে? শুনেছে একটি সুস্থ বৃক্কের জন্য সাত লাখ টাকা পর্যন্ত পাওয়া যায়। তাদের বস্তিতে সবরকমের লোক আছে। মেয়েপাচার চক্রের পান্ডা, কিডনি বেচার দালাল, মড়া বিক্রির কারবারি, চোর, পকেটমার, ডাকাত…

সে কি ডাকাতি করবে?

একবার? জীবনে একবার? একবার আইএএস হয়ে যেতে পারলেই আর কখনো, কোনো দিন, কোনো অন্যায় করবে না, লোভ করবে না, পাপ করবে না…

নাকি, ব্যাংক ডাকাতি নয়? অন্য কিছু! আর কোথায় কোথায়?

দুই তরুণ-তরুণী, পরস্পর ভালোবাসে। কফি টেবিলের স্বল্প পরিসরে বসে আছে মুখোমুখি। চোখে রাখা চোখ। হাতে রাখা হাত। একজনের হাতে উদ্বেগ ও হতাশার স্বেদ, অপরজনের করতলে আশ্বাসের উষ্ণতা। সে বলছে, ‘তুমি পারবে। তুমি এমনিই পারবে। যা যা পড়াবে এখানে, যেমন যেমন পঠনীয় বিষয় দেবে, শেখাবে যা কিছু, সব আমি তোমাকে দেব। এভাবে ভেঙে পড়ো না সোনা আমার। রজতদার কোচিং সাফল্যের শেষ কথা নয়। দেশের সমস্ত আইএএস, আইপিএস, আইআরএস, আইএফএস কোনো না কোনো কোচিংয়ের সাহায্য নেয় – এমন কোনো কথা নেই।’

সুহাস মৃদু হাসল। অল্প চাপ দিলো সুমালার হাতে। তার চোখে শান্ত চোখ রেখে বলল, ‘ঠিক। ঠিকই বলেছ তুমি সুমালা। শুধু শুধু এত ভাবছি। চলো, লড়ে যাব।’

সে কফিতে চুমুক দিলো। কফি বা খাবারের দাম সুমালাই মেটায়। সুহাসকে তার দরিদ্র বাপ-মা রোজগার করতে দেয়নি। এমনকি হাতখরচের জন্য ছাত্র পড়াতেও দেয়নি। শর্মিলাকে পড়ানোর জন্য যে পরিমাণ দক্ষিণা সুহাসকে দিতে চাওয়া হয়েছিল, তা কম আকর্ষণীয় ছিল না। কিন্তু সুহাস তা প্রত্যাখ্যান করে। সে দরিদ্র হলেও লোভী বা আত্মসম্মানবোধহীন নয়।

এই মুহূর্তে সুমালার পাত্র হিসেবে শুভব্রত অতুলনীয় ছিল। কিন্তু সুহাসকে সুমালা ভালোবাসে। তাই তার মা-বাবাও সুহাসকে সসম্মানে গ্রহণ করেছেন। ভালোবাসার চেষ্টা করছেন। সুমালার মা বলেন, ‘ছেলেটা ভালো। শান্ত ভদ্র। দেখতেও কী সুন্দর। চোখ দুটি বড় উদাসী। সন্ন্যাসীর মতো। মিলাকে খুব যত্ন নিয়ে পড়ায়।’

সুমালার বাবা বলেন, ‘হ্যাঁ। নিষ্ঠাবান ছেলে। মেধাবী। আগাগোড়া খুবই ভালো ফল। জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবে। শুধু আইএএস নিয়ে পড়ে না থাকলেও ওর চলবে।’

‘হ্যাঁ। বাপের টাকা থাকল কি না থাকল, তা দিয়ে কী এসে যায়। ছেলে সদাচারী, উদ্যমী, প্রতিষ্ঠিত হলেই আর সব তুচ্ছ হয়ে যাবে। তখন একবার ওর বাবা-মায়ের সঙ্গে আলাপ করতে হবে।’

‘সেসব পরে হবে। আগে আমাদের সুমালার স্বপ্ন পূরণ হোক। ওদের সম্পর্ক পাকা হোক। আজকাল ছেলেমেয়েরা অন্যরকম।’

শর্মিলা ততখানি বন্ধু হয়নি সুহাসের। শুভব্রতের সঙ্গে তার উচ্ছলতার তরঙ্গ সহজে মিলতে পেরেছিল। কিন্তু শান্ত, মিতবাক সুহাসের মধ্যে উষ্ণতার বড় অভাব মনে হয় শর্মিলার। সে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বুঝতে চায়, দিদি সুহাসকে এত ভালোবাসে! কেন?

সেদিন পাঁচ লাখ টাকা দিয়ে ‘রজতদার বিশেষ কোচিং’য়ে ভর্তি হবে সুমালা, তার আগের সন্ধ্যায় দুবোন গিয়েছিল মাসির বাড়ি, মাসতুতো বোনের জন্মদিন উপলক্ষে। সঙ্গে তাদের মা। বিশেষ কাজে বাবা শহরের বাইরে আছেন দুদিন হলো। আগামী কাল তাঁর ফেরার কথা।

রাত প্রায় সাড়ে ১০টা। মা নিজেই গাড়ির চালিয়ে ফিরছেন। চালককে ১০টার মধ্যে ছেড়ে দেওয়া হয় কারণ সে শহর ছাড়িয়ে দূরের দিকে থাকে। বাড়ি পৌঁছে গাড়িশালে গাড়ি রাখলেন তিনি। ঝাঁপ বন্ধ করে তালা দিলেন। দুই মেয়েকে নিয়ে মূল দরজার তালা খুলে প্রবেশ করছেন –

হঠাৎ মনে হলো, বাগানের গাছের আড়ালে কাউকে দেখলেন।

‘কে?’ ডাকলেন একবার বাগানে হালকা আলো জ্বলে সারারাত।

সুমালা বলল, ‘কী মা?’

‘মন হলো লোক।’

‘কোথায় লোক?’

শর্মিলা বলল, ‘বাবা না থাকলেই মা প্রচন্ড ভয় পায়। সেবার মনে আছে, একটা বেড়াল নিয়ে কী কান্ড হলো?’

দুই বোন হাসতে লাগল। মা হাসতে পারছেন না। তিনি স্পষ্ট কাউকে সরে যেতে দেখেছেন। হয়তো ছিঁচকে চোর। এবারে রাতের পাহারা না রাখলেই নয়। তিনি তাড়াতাড়ি মেয়েদের নিয়ে ভেতরে চলে এলেন। খাওয়া-দাওয়ার পর্ব বোনের বাড়িতে সমাধা হয়েছে। স্বামীর সঙ্গে কথা সেরে, শয়নের প্রস্ত্ততি নিয়ে, নিজের ঘরে চলে গেলেন মা। দুই বোনও যার যার কক্ষে ঢুকে পড়ল। অনেক রাত অবধি পড়াশোনা করবে সুমালা এখন। সে তার কম্পিউটার চালু করল। পর্দায় সুহাসের মুখ। মৃদু হাসছে। নিজের মুঠোভাস যন্ত্রের ক্যামেরায় তুলেছিল সুমালা। কী গভীর চাউনি! সুমালা অনিমেষে চেয়ে রইল সেদিকে। তারপর পড়ায় মন দেওয়ার চেষ্টা করল। কী রকম অপরাধবোধ হচ্ছিল তার। সে যেন সুহাসের প্রাপ্য কেড়ে নিচ্ছে। যেন সুহাসের আর্থিক অপারঙ্গমতার জন্য সে-ই দায়ী। সে দুহাতে মুখ ঢাকল। সে বুঝতে পারছিল প্রেম তাকে দুর্বল করছে। সুহাসকে তার নিজের পরিস্থিতির সঙ্গে লড়তে হবে। আইএএস না হয়েও জীবনে উচ্চপ্রতিষ্ঠিত হওয়া যায়। সুহাসের ওপর সুমালার পূর্ণ আস্থা। দাক্ষিণ্য বা করুণা দিয়ে সে সুহাসকে কেন ছোট করবে?

রাত্রি দুটো নাগাদ তার ভারি ঘুম পেল। তিনতলায় দক্ষিণখোলা ঝুলবারান্দা সংলগ্ন তার ঘরখানি। তার অতিপ্রিয় বাসস্থান। দেয়াল জোড়া কাচের পাল্লা। বাইরে অতিরিক্ত সুরক্ষার জন্য সংকোচনশীল লৌহ ফটক। সপরিবারে বাড়ি ছেড়ে কোথাও গেলে এই ফটকে তালা পড়ে।

শীত গিয়ে বসন্ত আসছে। বহুদূরে কোকিল ডাকছে। মৃদুমন্দ বায়ু এসে দোল দিয়ে যাচ্ছে সুমালার কালো চুলের গুচ্ছে। বিছানায় শুয়ে, খোলা দক্ষিণে দৃশ্যমান রাতের আকাশে ঝিকিমিকি তারা দেখতে দেখতে, সুহাসের কথা ভাবতে ভাবতে সুমালা ঘুমিয়ে পড়ল। জানল না, তার ঘুমের প্রগাঢ়তা স্বাভাবিক নয়। জানল না, তার প্রিয় দক্ষিণের খোলা ঝুলবারান্দা দিয়ে কেবল কোকিলের কূজন নয়, মলয় বায়ু নয়, বসন্তের আভাস মাত্র নয়, প্রবেশ করল লুটেরা। জানল না, তারা এগারো বছরের বোনকে ধর্ষণ করেছে, চুয়াল্লিশ বছরের মাকে ধর্ষণ করেছে, আলমারি থেকে লুট করে নিয়ে গিয়েছে টাকা, গয়না যা ছিল সব। তারা ধ্বংস করে গেছে একটি পরিবার।

এই নিয়ে সাতবার জেরা করা হলো সুমালাকে। তদন্তের ভারপ্রাপ্ত পুলিশ অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করছেন। শর্মিলা হাসপাতালে। তার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল। কিন্তু অপমান ও মানসিক যন্ত্রণায় সে মূক হয়ে গেছে।

তদন্তভারে একনিষ্ঠ তমাল দত্ত বলছেন, বাড়ির কেউ, কিংবা অত্যন্ত পরিচিত কারো সাহায্য ছাড়া এত নিখুঁত কাজ সম্ভব নয়। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সুমালাকে তিনি একই প্রশ্ন করছেন। একদিন দুদিন তিনদিন। একবার চারবার সাতবার।

পুলিশ : তো, আপনার ঘরের লাগোয়া ব্যালকনি রাতে               খোলা ছিল।

সুমালা : হ্যাঁ।

পুলিশ : কেন?

সুমালা : শীতকাল ছাড়া খোলাই রাখি।

পুলিশ : কেন?

সুমালা : ভালো লাগে।

পুলিশ : ভয় করে না?

সুমালা : না। এতকাল করেনি।

[সে কেঁদে উঠছিল]

পুলিশ : বাড়িতে ডাকাত পড়ল, আপনার বারান্দা দিয়ে, আপনার ঘর দিয়ে ভেতরে এলো, এতকিছু করল, কোনো শব্দ, কোনো ডাক, কোনো চিৎকার আপনি শুনলেন না।

সুমালা : না। শুনিনি।

পুলিশ : আপনার ছোটবোনকে আপনি ভালোবাসেন।

সুমালা : প্রাণের চেয়েও বেশি। কেন এসব বলছেন। আমি কী করেছি! আমি কিছুই জানি না। কিচ্ছু জানি না।

পুলিশ : ওরা আপনাকে ছুঁলো না পর্যন্ত। অথচ আপনার              মা-বোনকে… খুব আশ্চর্য নয়?

সুমালা : কী বলছেন? এসব আপনারা কী বলছেন?

[সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিল]

পুলিশ : আপনার কোচিংয়ে পাঁচ লাখ টাকা দেওয়ার কথা ছিল। অথচ আপনার প্রেমিক তা দিতে পারছিল না।

সুমালা : হ্যাঁ। ওর সে অবস্থা নয়।

পুলিশ : সে কী এরকম কিছু করতে পারে?

সুমালা : অসম্ভব!

পুলিশ : কী করে বুঝলেন!

সুমালা : সুহাস ওরকম নয়। কখনো নয়। তা ছাড়া… তা ছাড়া… মিলাকে ও নিজের বোনের মতো দেখে।

পুলিশ : বোনের মতো। বোন তো নয়।

সুমালা : আমি জানি না। আমি কিছু জানি না।

পুলিশ : আপনি সুহাসকে সাহায্য করতে চাননি?

সুমালা : না।

পুলিশ : কেন?

সুমালা : এ তো অনেক টাকার ব্যাপার!

পুলিশ : অনেক টাকাই তো গেল আপনাদের। পনেরো লাখ ছিল। চলে গেল। গয়না গেল। মানসম্মান। মা বোনের ইজ্জত… সত্যি করে বলুন তো আপনি ব্যালকনির দরজা খোলা রেখেছিলেন কেন? বিশেষত, আপনার মা যখন বাগানে কোনো লোকের উপস্থিতি টের পেয়েছিলেন – তার পরেও!

সুমালা : আপনারা কী বলছেন আমি বুঝতে পারছি না। আমিই আমার বোনকে… আমার মাকে… ওঃ ভগবান! আমি কিছু জানি না। কিচ্ছু জানি না। মা, আমাকে তুমি সন্দেহ করো? মা গো? বাবা? তুমিও? তোমরা কিছু বলছ না কেন? কেন বলছ না আমি এসব কিছুই করতে পারি না। সুহাস গরিব। কিন্তু ও তো কত ভালো বাবা! ও বাবা!

পুলিশ : আপনার বন্ধু সুহাস সে-রাতে নিজের বাড়িতেই ছিলেন। তবু প্রশ্ন থেকেই যায় সুমালা… সত্য নির্মম। অসত্য নিষ্ঠুর। সন্দেহ ক্রূরতম। সহনাতীত। সন্দেহ স্নেহ মানে না, প্রেম মানে না, আজন্মলালিত বিশ্বাস ভুলিয়ে দেয়।

ঘটনার পর, দশম দিনে, ডাকাতির বখরা মেটাতে শহর থেকে দূরে, এক নির্জন পল্লির নির্জন মাঠে দেখা করল তিনজন। দীনেশ, হারুন আর ভবিষ্যতের আইএএস হওয়ার স্বপ্ন দেখা এক তরুণ।

কথা ছিল পাঁচ লাখ তার। বাকি যা পাবে, দীনেশ আর           হারুনের ভাগ।

হাজার টাকার নোটে পাঁচ লাখ খুব বড় খাম নয়। এ লাইনে চৌকষ হারুন, লুটের টাকাগুলি নানা জায়গা থেকে বদলে এনেছে যাতে নোটের নম্বর ধরে পুলিশ সহজে অনুসরণ করতে না পারে।

সুহাস এসব কিছুই ভাবছে না। টাকাভর্তি খাম নিয়ে সে চুপ করে বসে আছে। এ তার কোন কাজে লাগবে! সে তো এমন চায়নি। তার মনে শান্তি নেই। বিবেক তাকে তাড়িয়ে মারছে। অবশেষে রাগত স্বরে সে বলল, ‘কেন তোরা নোংরা কাজ করতে গেলি! একটা বাচ্চা মেয়ে… একজন মায়ের মতো…!’

‘দ্যাখ সুহাস,’ দীনেশ ধমকে উঠল, ‘তুই তো বে ধোয়া তুলসীপাতা থেকে গেলি! শালার ভালো ছেলে! তোর মালটাকে তো কিছু করিনি।’

হারুন বলল, ‘মায়ের মতো! থুঃ! নরম গদিতে স্বচ্ছ নাইটি পরে শুয়ে ছিল মাগিটা। এরা মালদার লোক! ফাউ মেরে হেভ্ভি আরাম!’

‘কচিটার নথ তো কেউ ভাঙতই। আমিই দিলাম! বা রে! ভালো ছেলে! ভালো হয়ে থাক। বেশি কথা বলতে আসিস না। আমরা লোক ভালো না।’

সুহাস উঠে পড়ল। ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগল স্টেশনের দিকে। তার সস্তার মুঠোভাস যন্ত্রে সুমালাকে পাওয়ার চেষ্টা করল। পেল না। মাত্র একদিন দেখা হয়েছিল তাদের। সুমালাকে প্রেতিনীর মতো লাগছিল। সুমালার বাবা তাকে এখন ও-বাড়ি থেকে নিষেধ করেছেন। সুমালা বোবা চোখে তাকিয়েছিল তার দিকে। তার দৃষ্টিতে অভিযোগ ছিল না। প্রশ্ন ছিল না। ভয় ছিল না। সে যেন এই জগৎ থেকে বহুদূর চলে গিয়েছিল। কতদূর? সুহাস ওই দৃষ্টি সহ্য করতে পারছিল না। সে চাইছিল, সুমালাকে সর্বশক্তিতে বুকে চেপে ধরতে। সে চাইছিল, গলা ফাটিয়ে ক্ষমা চাইতে। সে চাইছিল, কোনো মন্ত্রে আবার সবকিছু আগের মতো করে দিতে!

শর্মিলার হাসপাতালে গিয়ে সে দু-ঘণ্টা বসেছিল চুপচাপ। একেবারে বাইরের দিকে। যেখানে অপেক্ষমাণের জন্য পেতে রাখা সারি সারি স্টিলের চেয়ার। শর্মিলার সামনে যেতে চাওয়ার সাহসও তার হয়নি।

সুহাস বুঝতে পারছে, সে মরে যাচ্ছে। মরণের দিকে হেঁটে যাচ্ছে ক্রমশ। একদিন তার সব ছিল। রূপ, গুণ, বুদ্ধি, মেধা, প্রেম, স্নেহ, সম্মান। আজ তার কিছুই নেই। সে ফাঁপা। সে শূন্য। সে মলিন।

তখন, সুমালা এসে দাঁড়াল শর্মিলার শয্যার পাশে। গতকাল থেকে কথা বলছে শর্মিলা। মা, বাবা, ডাক্তার, পুলিশ – সবার সঙ্গে বলেছে। আজ সুমালাকে দেখে সে মুখ ফিরিয়ে নিল। সুমালার শেষ আশ্রয় ছিল ছোট বোন। সে শুধু বলতে পারল, ‘মিলা, তুইও…!’ লোভ অন্ধ। লোভ বধির। লোভ হৃদয়হীন। লোভ জটিল। পঙ্কিল। পূতিগন্ধময়। নির্মম। সত্য নির্মম। অসত্য নিষ্ঠুর। সন্দেহ ক্রূরতম। সহনাতীত। সন্দেহ ও লোভ স্নেহ মানে না, প্রেম মানে না, আজন্মলালিত বিশ্বাস ভুলিয়ে দেয়।

সুমালা হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে এলো। ফিরল তার প্রিয় কক্ষটিতে। সমস্ত দরজা বন্ধ করে দিলো। একটি কাগজ টেনে লিখল – বিশ্বাস করো। আমি কিছুই জানি না। তোমরা আমাকে বিশ্বাস করো।… সুহাস এর মধ্যে থাকতে পারে না। ও পবিত্র। ও সুন্দর।

আমার বুক ভেঙে গেছে। আমি চলে যাচ্ছি।

সুমালা আত্মহত্যা করল।

রেললাইনের ধারে পড়ে ছিল যুবকের মৃতদেহ। পেটের ওপর দিয়ে চলে গেছে ট্রেন। আধখানা লাইনের এধারে, আধখানা ওধারে। মুখখানা অটুট। পাশে একটি ব্যাগ। তাতে পাঁচ লাখ টাকা। বাদামি কাগজের খামে মোড়া এক হাজার টাকার নোট। খামের গায়ে লেখা – সুমালা। ক্ষমা করো।

বসন্তের উথাল হাওয়ায় লাল টকটকে দুটি শিমুল ফুল, সম্পূর্ণ প্রস্ফুটিত হওয়ার আগেই ঝরে পড়ল মাটিতে। কেউ ফিরেও তাকাল না।

১. ছাত্র বয়সে বন্ধুত্বের বহুরকম বৃত্ত থাকে। কখনো এক বৃত্ত অপরটির সঙ্গে আংশিকভাবে মিশে যায়, কখনো একে অপরকে ছেদ করে, কখনো সম্পূর্ণ পৃথক হয়ে থাকে। প্রত্যেকটি বৃত্তে হয়তো একটিই সাধারণ মুখ। স্কুলে নিচু ক্লাসে একরকম বন্ধুদল, উঁচু ক্লাসে আবার অন্য বৃত্ত, কোচিংয়ের বান্ধববলয় – সে-ও হতে পারে একেকটি বিষয়ের জন্য একেকরকম! সুমালার এমন পৃথক বলয় বেশ কয়েকটি। আজকাল সময়াভাবে দেখাসাক্ষাৎ আড্ডা গল্প কমে গেছে, তাই বলে যোগাযোগ ছিন্ন হয়নি। নিজস্ব সত্তার পূর্ণ সামাজিকীকরণের জন্য ‘ফেসবুক’ ইত্যাদি আন্তর্জাতিক বৈঠকে ব্যবস্থা মজুত। যদিও সুহাস এসবের মধ্যে নেই। তার কোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধুবৃত্ত নেই। কখনো ছিল না। ঘনিষ্ঠতা তার আসে না। তার           শান্ত, মিতবাক, মিষ্টি ব্যববহারের জন্য সহপাঠীরা তাকে পছন্দ করত। তাকেই বন্ধুত্বের ক্ষেত্র বলা যেতে পারে। একত্রে পড়া, বই কিংবা কোনো বিশেষ প্রশ্নোত্তর দেওয়া-নেওয়া করার মধ্যেই তা সীমিত ছিল। তাই, রজতদার কোচিংয়ে ভর্তির জন্য সুহাস একা অপেক্ষমাণ ছিল। অন্যদের মধ্যে কেউ কেউ সদলে এসেছিল, কেউ একা, কিন্তু তারা পরস্পর আলাপ-পরিচয় করে দলবদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। সুহাসের মুখচ্ছবিতে, পরিচয়ে অনাগ্রহী বিজ্ঞপ্তি এত স্পষ্ট ছিল যে, কেউ তার প্রতি অগ্রসর হয়নি। যারা এসেছে, অধিকাংশই সুবেশ, কেতাদুরস্ত, বেশির ভাগ ইংরেজি বা হিন্দিতে কথা বলছে। নানারকম পরীক্ষার প্রস্ত্ততি হয় যেহেতু, ভর্তির সরঞ্জাম হাতে ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠাপ্রত্যাশীদের সংখ্যা কম নয়। কোনো একফালি কোচিং কেন্দ্রে এত ছাত্র ধরে কি?

২. সে যে তার মেধার কারণে, সমস্ত প্রতিকূলতা উপেক্ষা করতে পারছিল, জয়ী হয়ে উঠছিল বছরের পর বছর – তাতে, নিজেকে অপ্রতিরোধ্য ধরে নিয়েছিল সে। তার বিশ্বাস ছিল, সে অমিত শক্তিমান। এর দ্বারা নিজের স্বপ্ন এবং জীবনকে সে একাকার করে ফেলবে!

আইএএস মূল পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে ওঠা তাকে হিংস্রভাবে অভিমানী করে তুলল কার বিরুদ্ধে, সে নিজেও সম্যক বুঝতে পারছিল না। যে-ভাগ্য তাকে অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত করেও এমন অনেক দিয়েছিল, যার দ্বারা তার অহং মেরুদাঁড়া সোজা রেখে চলতে পারে, সম্ভবত তারই কাছে ছিল তার অভিমান।

কিন্তু হায়! ভাগ্য এক বিশ্বাস মাত্র। স্বীকার এবং অস্বীকারের মধ্যে সে বিরাজ করে অথবা করে না। আমার কর্মই আমার ভাগ্য, আমার নিজস্ব জীবনের নিয়ন্তা – এমনটি যারা ভাবে, তাদের ব্যর্থতার গ্লানি বোঝা বাড়ায় না। ব্যর্থতার কারণগুলি অনুধাবন করে নতুনতর উদ্যম তাদের পাথেয়। যারা মনে করে, অহো, আমি কী দুর্ভাগা, জীবন এই রেখেছিল, ভাগ্য এই দিলো আমায়! এই ব্যর্থতা, এই গ্লানি, এই পরাজয়। অহো! বিনা দোষে নষ্ট জীবন!… সুহাস সেই দলভুক্ত কিনা স্পষ্ট নয়, তবে অসাফল্য তাকে এতখানি বিচলিত করে দিলো যে সে হয়ে উঠল বিমূঢ়, শোকগ্রস্ত, হতোদ্যম। সে অসফল হতে পারে না। সে প্রভূত পরিশ্রম করেছিল। ভালো পরীক্ষা দিয়েছিল। আইএএস ঘিরে নানাবিধ চক্র চলে বলে সে শুনেছিল।

তার মধ্যে এই ধারণা দৃঢ়মূল হচ্ছিল যে, সে হয় চক্রান্তের শিকার, নয় দুর্ভাগ্যতাড়িত। স্কুল-কলেজের পরীক্ষা এক জিনিস, আর রাষ্ট্রীয় পদাধিকারী হওয়া অন্য। সেখানে ‘ব্যাকিং’ লাগে।

‘ব্যাকিং’। ঠেলে দেওয়ার মতো আত্মীয়, পরিচিত কিংবা আর্থিক পারিতোষিক। ব্যাকিং। যা থাকলে মানুষ যা চায়, তাই পায়। জগৎসংসার এই নিয়মে চলছে – এই বিবৃতি কখনো সত্য কখনো মিথ্যা। এমনকি তা যুগপৎ সত্য ও মিথ্যা হলেও হতে পারে। প্রয়াস, প্রতিভা, মেধা, বুদ্ধি, একনিষ্ঠ অনুশীলন মানুষকে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত করে দেয় আজো। কিন্তু ব্যর্থতার বেদনা যার দুঃসহ, সে তা ভুলে যায়। এমনকি বিশ্বাস পর্যন্ত করতে চায় না। সুহাসের হলো গিয়ে সেই দশা। সে ভালো করে খায় না, স্বস্তিতে ঘুমোয় না, পড়ার বইগুলি স্পর্শ করে না, কেবল শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে সিলিংয়ের দিকে। সস্তা টিনের চালের তলায় হোগলার চাটাই-টাঙানো সিলিং। গরমে তাপ বিকিরণ প্রতিহত করে, শীতে ঠান্ডা। সুহাস, চূড়ান্ত  ক্ষয়-লাগা মনে হোগলার চাটাইয়ের মতো অর্থহীন হতাশার নকশা বুনছিল কেবল।

৩. তার বাল্যে, বস্তিতে তার সমবয়সীর দল, ওই হারুন, দীনেশ, রবি, সন্তোষ, রফিক স্কুলে যেত এবং স্কুল পালাত। স্টেশনে বাজারে ভিক্ষে করত নিখুঁত ক্ষুধার্তের ভূমিকায়। বস্ত্তত, তারা কেউ অভুক্ত ছিল না। কিন্তু তারা পয়সা চিনেছিল। চকচকে রুপোলি ধাতুখন্ড। হাতে পেলে মন যা চায় তাই পাওয়া যায়। ভিক্ষের পয়সায় তারা খেত আইসক্রিম, ঘটিগরম, কিনত রকমারি রঙিন প্লাস্টিকের খেলনা। সিনেমা দেখা, ভিডিও দর্শন, আর দেখতে দেখতে, চাইতে চাইতে, বালকবেলার মেলার ছলে অভ্যাস করা ভিক্ষাবৃত্তি পালটে গেল ধান্ধায়। তার মধ্যে চুরি, ডাকাতি, মাদক পাচার, জাল নোট ছাপা – বিবিধ অপরাধমূলক কাজ। যা যখন জোটে। আইন পরোয়া নেই, ন্যায়-অন্যায় বোধ নেই, শিক্ষা-সংস্কার নেই, কেবল চায় টাকা, কেবল চায় ভোগ, কেবল চায় যৌনতা। জীবন পেয়েও জীবন বোঝে না হায়!

এ-সুহাস, চল ভিক্ষা মাঙবি, হেভ্ভি পয়সা মিলবে।

আমি যাব না। তোরা যা রে।

এ-সুহাস, চল বে, সাট্টা খেলবি? মাল কামাবি। আরে চল না বে। আচ্ছা আচ্ছা বাবুরা আসে খেলতে।

না রে। আমার ক্লাস আছে, পড়া আছে।

চল বে সুহাস, খালি পড়লে হবে? শালা মেয়েছেলে মাল ঘাঁটবি না তো লাইফ বেলাইন হয়ে যাবে রে বুদ্ধু।

না রে…!

আ বে সুহাস, তুই শালা পাঁকে পদ্ম মাইরি। তুই কি আমাদের গর্ব, নাকি ঈর্ষা? শালা, তোকে দেখলে মনে হয় আমরা সব পোকামাকড় হয়ে বেঁচে আছি। ফোট বে শালা! তোর মুখ দেখতে চাই না! জীবনে হতাশা এসে যায় মাইরি!

সুহাস, সে আপনাতে আপনি সুরভিত। তার পিতা সৎ ও পরিশ্রমী, খবরের কাগজ পড়েন। তার মা সৎ, নির্লোভ, কর্মনিষ্ঠ, স্নেহপরায়ণ, সদাচারী। অল্প মূল্যে পুরনো বইপত্র কিনে পড়া তাঁর অভ্যাস। সুহাস স্বগৃহে শান্তি ও শৃঙ্খলায় সুরক্ষিত জীবন পেয়েছিল।

৪. পৃথিবীতে আবহমানকাল ধরে ঘটে চলা প্রেমের এক প্রকৃতি, তারও জীবনে ঘটে গেছে অজ্ঞাতসারে। সুহাসকে ভালোবেসেছে কোন লগ্নে! প্রথম দিন ওই হাসি দেখে? ভালোবেসেছে, কিন্তু মুখে বলা হয়নি ভালোবাসি। সুহাসের দৃষ্টিতে দেখেছে টলটলে প্রেম, কিন্তু শোনা হয়নি সেই চিরনূতন চিরপুরাতন অমোঘ শব্দ – ভালোবাসি, ভালোবাসি। হাতে হাত রেখে গভীরতম চাহনিতে ডুবে ছিল কত পল, কিন্তু উচ্চারণ করা হয়নি – ছেড়ো না, ছাড়ব না। তুমি আমার, আমি তোমার!

হঠাৎ সে অনুভব করেছিল এক নির্মম সত্য। সুহাসকে ভালোবাসা হয়েছে, জানা হয়নি। সুহাসকে বিশ্বাস করা হয়েছে, বোঝা হয়নি। আপন বিমূঢ়তা ও কান্ডজ্ঞানহীনতায় সে ক্রুব্ধ হলো, অসহায় বোধ করল।