উঠোনটা সামনে নিয়ে বসে থাকে খেদের দাদা। ঘরে আর ওঠে না। ঘর মানে বাড়িটার চার ভাগের এক ভাগ, তিন ভাগ পুড়ে ছাই।
কাঠবিড়ালি-খাওয়া পাকা পেঁপের গোড়ার দিকটা যেমন বোটা আটকে গাছের সঙ্গে লেগে থাকে, তেমনি আগুনে খাওয়া এঁটো বাড়িটার শেষ অংশটুকু জিদ ধরে টিকে আছে কিছুটা ছাই, কিছুটা স্মৃতি নিয়ে। পেছন ফিরে সেদিকে একবার তাকায়ও না। উঠোনে খোলা রান্নাঘর, চুলোটা আছে তেমনই, মনে হয় যেন একটু পরেই এসে রান্না চড়াবে দাদি। দাদার দুই মেয়ে কুটনা কুটতে বসবে পাশেই। ছেলেটা গরু নিয়ে মাঠে যাওয়ার আগে বোনদুটোকে একটু নেড়ে যাবে। হাসির খিলখিল শব্দ পায়রার ডাকের মতো ঝনঝন করে বেজে উঠবে। রোজকার দৃশ্যটা চোখের সামনে ভাসে। এই দৃশ্যের যন্ত্রণা ছাড়া খেদের দাদার আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।
দাদা বসে থাকে। আশেপাশের বাড়ি থেকে আমরা পালা করে খাবার দিয়ে আসি। তিনবার খাবার দেওয়ার মতো অবস্থা কারোরই নেই। একটা যুদ্ধ জিতিয়ে দিয়ে গেছে বটে, কিন্তু বিনিময়ে উদযাপন করার সামর্থ্যটুকু চেটেপুটে নিয়ে গেছে। কোনোদিন দুবেলা, কোনোদিন তিনবেলা, কোনোদিন হয়তো একবেলা খাবার জোটে দাদার। না দিলে চেয়েচিন্তে খায় না। মরে যেতে পারলেই যেন বাঁচে।
উঠোনের গাছগুলো একটার পর একটা শুকিয়ে যাচ্ছে। বাবা বলল, আগুনের আঁচ লেগেছিল। মা বলল, শোকে। দাদা উঠোনের সর্বশেষ নারিকেলগাছটার মতো বেঁচে থেকেও শুকিয়ে যেতে থাকল। চোখের সামনে প্রতিদিন একটা মানুষকে শুকিয়ে যেতে দেখি আমরা।
– দাদা, চলো, গা ধুয়ে আসি। আমি গামছাটা মাথার ওপর দিয়ে বলি। দাদা কোনো কথা বলে না। একবার আমার দিকে তাকায়। চোখদুটো প্লাস্টিকের পাখির মতো জমাটবাঁধা মনে হয়। উঠে গিয়ে কবুতরের খাঁচাটার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ত্রিশটার মতো কবুতর ছিল কালুর। দাদার ছেলে। যেদিন রাতে আগুন দেয় ঘরটাতে, গ্রামের লোকজন আতঙ্কে বাড়িঘর ছেড়ে সীমান্তের ওপাশে চলে যায় নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে, সেদিন কেউ আর মনে করে কবুতরের খাঁচাটা খুলে যায়নি। ভেতরেই মরে সব কবুতর শুকিয়ে গেছে। খাঁচাটা আর খুলে কী হবে! কেউ খোলে না। সেভাবেই আটকানো। দাদা খাঁচাটার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। কোনোদিন একটা জায়গায় দাঁড়ালে, সেখান থেকে সেদিন আর সরে না। আগের দিন পেয়ারাগাছটার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। একটা দিন শুধু পেয়ারাগাছের দিকে তাকিয়ে কাটিয়ে দিয়েছে।
আজ তেইশ দিন হয়ে গেল আসার, গোসল করেনি। আমি পিঠে গামছাটা দিয়ে বের হয়ে আসি। পরদিন গিয়ে দেখি, দাদা গামছাটা ভিজিয়ে কলের পাড়ে বসে আছে। দাদি এখানে থালাবাসন মাজত। মেয়েদুটো পাশে
চাটাই-ঘেরার মধ্যে পানি টেনে গোসল করত। দাদা সেদিকে তাকিয়ে বসে আছে নির্জীব। মায়ের ইশারায় আমি টিউবওয়েল চেপে বদনায় পানি নিয়ে দাদার মাথায় ঢালি। দাদা নড়ে না। মা বাড়ি থেকে সাবানটা এনে দাদার পিঠ ডলে দেয়। হাতে-গলায় সাবান মাখায় আর মুখে আঁচল কামড়ে কাঁদে।
– ক্যান বেঁচে আসলা চাচা? মা বিড়বিড় করে বলে। এই পোড়ার জীবন লইয়া ক্যান আসলা ফিরে? কতজন তো যুদ্ধে মরল! মায়ের কথা শুনে আমি চোখ রাঙাই। এসব কথা বলে নাকি কেউ!
– মানুষটা কান্দে না ক্যান? বলে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে ছুটে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায় মা। দাদার গা,
হাত-পা মুছিয়ে বাবার লুঙ্গি এনে পরিয়ে দিই। সুবোধ শিশুর মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে।
– দাদা, ছোট ফুফুকে ওরা এইখানে মারেনি। স্কুলের ক্যাম্পে নির্যাতন করে মারছে। লাশটা আমরা কেউ দেখিনি। কিন্তু বাগানের গর্ত থেকে মরার গন্ধ এ-পর্যন্ত এসেছে। বুঝতে পারি, মায়ের মতো আমিও দাদাকে কাঁদানোর চেষ্টা করছি। ছোট ফুফুকে না দেখতে পেলেও বড় ফুফু আর দাদিকে দেখছি। ঘরে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে তালা ঝুলিয়ে আগুন দিয়েছিল। বলছিল, তুমি আর চাচা যুদ্ধে গেলা ক্যান? কোথায় আছ তোমরা – জানতে চেয়েছিল। দাদি কোনো কথা বলেনি, তোমার মতো এরকম মুখ এঁটে দাঁড়িয়ে ছিল। বড় ফুফু কথা বলবে ক্যামনে? ঘরের মধ্যে নির্যাতন করার সময় চিক্কুর পাড়ছিল বলে জিবটা চাকু দিয়ে কেটে নিয়েছিল। পরদিনও জিবটা পড়ে থাকতে দেখেছি উঠানে। কাপড় বদলে দিতে দিতে কথাগুলো বলি, দাদা টিউবওয়েলের পাশে দাদির পায়ের ছেঁড়া স্যান্ডেলের দিকে তাকিয়ে থাকে। আগুন যখন দিলো, আমরা কোনো শব্দ শুনিনি। দাদির শব্দ না, ফুফুর শব্দও না। শুধু ঘর পোড়ার শব্দ হচ্ছিল। আগুনের শব্দ। দাদা আমার কথা শোনে কি না বোঝা যায় না। নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে একটা স্যান্ডেলের দিকে। তাও পুরো স্যান্ডেল নয়, স্যান্ডেলের কঙ্কাল। এ-বাড়িতে কোনো কিছুই আর আস্ত নেই। সবকিছু কেমন মরা মরা, খাওয়া খাওয়া। আমি লুঙ্গি বদলে দিয়ে চলে যাই, দাদা তেমন করেই দাঁড়িয়ে থাকে।
সন্ধ্যায় আব্বা আসে আরো দুজন লোক নিয়ে। হাবু চাচা আর মফিদুল ভাই।
– চাচা কি আমাদের কারো কথা শুনতে পান? প্রশ্নটা করে হাবু চাচা আব্বাকে বলে, হতেও পারে যুদ্ধে কানের কাছে গুলি লেগে বা বোমা ফেটে কালা হয়ে গেছে! হতে পারে কোনো স্মৃতি নেই। বিকট কোনো শব্দে সব হারিয়ে ফেলেছে।
– মিয়া ভাইয়ের কি কিছু মনে নাই? আমাদের কি চিনতে পারো ভাইজান? কাঁধে হাত রেখে মফিদুল ভাই জিজ্ঞাসা করে।
কোনো কথা বলে না দাদা। অন্ধকার উঠোনের দিকে তাকিয়ে থাকে। সারারাত এভাবে বসে থেকে কাটিয়ে দেবে। কখন ঘুমাবে, কখন উঠবে, আমরা কিছুই টের পাবো না। একদিন অনেক রাতে আমি আর মা হারিকেন হাতে উঠে এসে দেখি, বসে আছে নিজের ছায়ার দিকে তাকিয়ে। চাঁদের আলোতে নিজের ছায়া কিছুটা বাঁক নিয়ে বৃত্তাকার হতে হতে অন্ধকারে মিলিয়ে গেছে। দাদা তাকিয়ে আছে পাথরের চোখ নিয়ে। হারিকেনের আলোয় ছায়াটা উবে গেল। দাদার চাহনির এতটুকু পরিবর্তন হলো না। সেভাবেই ছায়া দেখার মতো করে মাটির দিকে তাকিয়ে রইল। আসল ছায়া তো নয়, কতগুলো ছায়ার স্মৃতি আটকে ছিল তার দৃষ্টিতে।
হাবু চাচা আর মফিদুলভাই অনেকক্ষণ চেষ্টা করে কথা বলাতে। একটা মানুষ এতদিন হয়ে গেল, একবারও কথা বলে না। যুদ্ধ শ্যাষ, স্বাধীন দ্যাশ, নিজের বাড়ি ফিরে আসছেন, কথা বলবে না ক্যান? বিষয়টি সবাইকে খুব হয়রান করে তোলে।
– চাচা, কালুর কী হয়েছিল জানেন? আপনি তো যুদ্ধে, আমরা ভেবেছিলাম কালুও যুদ্ধে আছে আপনার সঙ্গে। আব্বা বলে। ভেবেছিল কালুর কী হয়েছিল শোনার জন্য মুখ তুলবে কিংবা কান খাড়া করবে। কিন্তু তেমন কিছুই করে না। আব্বা হতাশ হয়ে দমে যায়।
– আপনার ছোট মেয়েকে তুলে নিয়ে গেছে শুনে কালু কোথা থেকে যেন হাতবোমা এনে ক্যাম্পের মধ্যে ঢুকে পড়েছিল। আমরা কিছুই জানতাম না, চাচা। জানলে কালুকে ওভাবে মরতে দিতাম না। ওর মরা আমাদের সবাইকে মারছে চাচা। বলে হাবু চাচা।
– বেচারাকে গাড়ির পেছনে দড়ি দিয়ে বেঁধে পুরো পাড়া টানছে। আমরা এখন যে-রাস্তাতেই হাঁটি, সে-রাস্তাতেই আমাদের কালুর রক্ত লেগে আছে। বলতে বলতে বলতে কেঁদে ফেলে মফিদুলভাই।
– তখনো বেঁচে ছিল। উঠোনে এনে দাদির সামনে যখন আগুন ধরিয়ে দেয় – নড়ছিল, চামড়া-ছেলা শরীরে কেরোসিন ঢাললে ডাঙায় তোলা কইমাছের মতো ছটফট করছিল। এরপর আগুন জ্বলে উঠলে কেমন শান্ত হয়ে গেল। আর নড়েনি। দূরে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখা ছাড়া কিছুই করার ছিল না চাচা। বলতে বলতে চোখ মোছে আব্বা।
দাদা বসে থাকে তেমনি। আধো আলোতে, আধো অন্ধকারে কতগুলো ছায়া এ-পাশ থেকে ও-পাশ হয়। নারিকেলগাছের ছায়া, কলাগাছের ছায়া, সজনেগাছের ছায়া, পেঁপেগাছের ছায়া, গোলাঘরের ছায়া। কিন্তু কোনো গাছ নেই উঠোনে। গোলাঘরটাও নেই। ছিল একসময়।
পুড়ে গেছে। গাছগুলো জ্বলে গেলে, মরে গেছে। ছায়াগুলো থেকে গেছে নিঃসঙ্গ, শরীর ছাড়া কোনো অচেতন মায়া নিয়ে। দাদা ছায়াগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। একটা কবুতর উড়ে যাওয়ার শব্দ হয় পতপত। আমরা কেউ শুনতে পাই না, দাদা চোখ তোলে দৃশ্যহীন শব্দে, বোঝা যায়। কবুতরগুলো নেই। কিন্তু তাদের ওড়ার শব্দ কোথাও বাধা পেয়ে পতপত করে পাখাতে বাড়ি মারার মতো, দাদার চোখের পলক ফেলা দেখে টের পাই। আমরা আর কেউ কথা বলি না। দাদার মতোই দাঁড়িয়ে থাকি, বাকশূন্য। অনেক দূর থেকে দেখি, একটা খোলা উঠোনে সমর্পণের ভঙ্গি করে বসে আছেন যুদ্ধফেরত এক সৈনিক।
কোনো এক রাতে ঘুম ভাঙে আগুনের শব্দে। বাড়ির যে অংশটা পোড়েনি সেদিন, কিন্তু পোড়ার অপেক্ষায় থেকে গেছে, রয়ে গেছে ভস্ম হওয়ার স্মৃতি নিয়ে, সেই অংশটা দাউদাউ করে জ্বলছে। ভেতর থেকে কোনো শব্দ আসে না, কারো চিৎকার কিংবা দীর্ঘশ্বাসের। শুধু আগুনে আগুন পোড়ার শব্দ।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.