আত্মসম্প্রদান

আমি জন্মেছিলাম ভীষণ এক ঝড়ের রাতে। দাই বলেছিল, জলের মেয়ে, জলেই ভাসবে। পরে বুঝেছি, ভাসা আর সাঁতার কাটা এক কথা নয়। ভাসে লাশ আর সাঁতার কাটে যে বাঁচতে চায়। সেই রাতে মা নাকি ব্যাকুল হয়ে কেঁদেছিলেন। কীসের কান্না তা বোধহয় তিনি নিজেও জানতেন না। তাঁর মেয়ে হয়েছে বলে, না মেয়ে হয়ে জন্মানোর অর্থ কী, তা বুঝে ফেলেছেন বলে।

চরের মাটিতে বড় হয়েছি। চর মানে যা জানি তা হলো – আজ আছে, কাল নেই। সর্বনাশা নদী রাতের অন্ধকারে যা গড়ে, ভোরের আলোয় তা ভেঙে নেয়। বাবা বলতেন, নদীর কোনো স্মৃতি নেই। আমি ভাবতাম, স্মৃতিহীন বলেই নদী এত নির্মম, এত মুক্ত, এত সংগ্রামী আর এত প্রবল স্বাধীন! বাবা হরিমোহন মাঝি সারাজীবন জাল বুনেছেন। জাল বোনা আর বন্দি করা – এই দুটো কাজে সম্ভবত কোনো পার্থক্য নেই, শুধু ফারাক হলো কাকে ধরা হচ্ছে। মাছ ধরলে জেলে বলে, মেয়েকে ধরলে বিয়ে বলে।

চরের মেয়েদের জীবন আমি দেখেছি। ভোরে উঠে পানি আনা, গরু খোঁজা, বাচ্চা সামলানো, বিকেলে ধান ঝাড়া, রাতে শরীর দেওয়া। মাঝখানে নিজের জন্য একটুকরো সময় নেই, একটুকরো ইচ্ছা নেই, একটুকরো স্বপ্ন নেই। মেয়েরা মাঝে মাঝে নদীর পাড়ে বসত, নির্নিমেষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত জলের দিকে। আমি ভাবতাম, ওরা কী দেখে? হয়তো দেখে, ওইপারে আরেকটা জীবন আছে কি না।

আমার তেরো বছর বয়সে বাবা বলেছিলেন, ‘ফুলু, তোর লাইগা পাত্র আইছে।’ পাত্র মানে যা বুঝেছিলাম, একটা বাটি, যেখানে খাবার রাখা হয়। আজ বুঝি, বোঝাটা ভুল ছিল না। পাত্রে খাবারই রাখা হয়েছিল, সেই খাবারটা হলাম আমি। শিশির চন্দ, পঞ্চাশছোঁয়া বয়স। আলাউদ্দিন মুন্সি মহাজনের হিসাবরক্ষক। প্রথম বউ মরেছে, দ্বিতীয় বউটা পালিয়েছে। পালিয়ে যাওয়া বউটার কথা ভাবতাম মাঝে মাঝে, সে কোথায় গেছে? কীভাবে সাহস পেয়েছিল? সে কি জানত, পালানোও একটা ভাষা, যে-ভাষায় ‘না’ বলা যায়। আমি সেদিন ‘না’ বলিনি। না বলার ভাষা তখনো শেখা হয়নি।

বিয়ের আগের রাতে মা আমার মাথায় তেল দিতে দিতে বললেন, ‘মাইয়া, সংসার করতে গেলে মাথা নোয়াইতে হয়। গাছ বাঁইচা থাকে ঝড়ে মাথা নোয়াইয়া। খাড়া থাকলে ভাইঙ্গা পড়ে।’ আমি কিছু বলিনি। কিন্তু ভাবলাম, গাছ মাথা নোয়ায় বাঁচতে, আর মেয়েরা মাথা নোয়ায় মরতে। তফাৎটা মা বোঝেননি, নাকি না বোঝার ভান করেছিলেন – কে জানে!

বিয়ের রাতে নতুন ঘরের খাটে বসে দেখছিলাম দেয়ালে একটা টিকটিকি নিশ্চল দাঁড়িয়ে। মনে হলো, সে-ও দেখছে। দুজনই চুপ। দুজনই জানি, পালানোর পথ নেই। শুধু ফারাক হলো, টিকটিকির কোনো প্রভু নেই। ইচ্ছার বিরুদ্ধে ওকে ওর মনপ্রাণ বিলিয়ে দিতে হয় না।

সংসার মানে শিখলাম একটা নতুন ব্যাকরণ, যেখানে আমি সর্বদা কর্মকারক, কখনো কর্তা নই। ক্ষমতা মানুষকে ওপর থেকে চাপায় না, ভেতর থেকে গড়ে। আমি তখনো অত পড়াশোনা করিনি; কিন্তু ক্ষমতার গঠন কাঠামোর চক্র বাস্তব জীবন থেকেই বুঝে ফেলেছিলাম। শিশির চন্দ আমাকে চাপায়নি, তবে আমাকে ভীরু বানিয়েছিল, শাসন দিয়ে, কথা না বলতে দিয়ে, প্রতিদিনের অপমানের মাটি দিয়ে। শূদ্রের মেয়ে, বেশরম, বেহায়া, ছোটলোক – এই শব্দগুলো শুনতে শুনতে একদিন নিজেকেই সেভাবে দেখতে শুরু করেছিলাম। এটাই ছিল আমার সবচেয়ে বড় পরাজয়। কিন্তু রাতে যখন কাপুরুষটা ঘুমিয়ে পড়ত, আমি শুনতে পেতাম যমুনার ডাক। জলের সঙ্গে ভেসে আসা আয় … আয় … অবিরল ধ্বনি!

নদী কথা বলে, এ-কথা বললে মানুষ বলে পাগল, না হয় কবি। আমি পাগল নই, কবিতাও লিখিনি। তবু শুনতাম। হয়তো চরের মেয়েরা নদীর ভাষা একটু বেশি বোঝে, কারণ তারা জানে, নদী আর নারীর সংগ্রাম একই রকম। ভাঙতে ভাঙতে গড়ে উঠতে হয়। দুজনকেই বলা হয় তোমার কোনো তীর নেই, তোমার কোনো স্থায়িত্ব নেই। একদিন সত্যিই গেলাম নদীর কাছে।

নদীর ধারে বসে জলে হাত ডোবালাম। জল ঠান্ডা নয়, গরমও নয়, যেন নিজের রক্তের মতো চেনা, যেন ভেতরের কোনো কণ্ঠস্বর বাইরে এসে হাত ধরল। সেই মুহূর্তেই বুঝলাম, আমার ভেতরে একটা কিছু দীর্ঘকাল ঘুমিয়ে আছে, মাটির তলার বীজের মতো সুপ্ত অথচ প্রকাশের তাড়নায় ব্যাকুল।

ফেরার পথে একটা বড়সড় নুড়ি পাথর কুড়িয়ে নিলাম। কারণ নেই, তবু নিলাম, কেন নিলাম জানি না। মুঠোর ভেতর পাথরের ওজন টের পেলাম; শক্ত, অনমনীয় আর ভারী, যার অস্তিত্ব অস্বীকার করা যায় না।

সেই নুড়ি পাথরটাই ছিল আমার প্রথম ভাষা। আমার স্বামীর মনিব আলাউদ্দিন মুন্সির ছেলে নাসির খাজনা তুলতে এসেছিল। শুনেছিল আমার স্বামীর মুখে আমার কথা। জোয়ান মেয়েছেলে … আমার স্বামী তার চাকরির সুবিধার জন্য আমাকে বিলিয়ে দিতে কৃপণতা করার মতো অতটা বুদ্ধিহীন মানুষ নন। মুন্সির ছেলে মানে মুন্সির মতোই – তেলতেলে মুখ, চোখে সেই প্রাচীন লোভ, যা পুরুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম বহন করে আসছে, কখনো লজ্জা না পেয়ে।

আমার স্বামী শিশির চন্দ মাঠে। আমি একা। নাসির ঢুকেছিল হাসতে হাসতে। বেরিয়েছিল দৌড়ে। কারণ আমার হাতে ছিল সেই নুড়ি পাথরের ওজন এবং সেটা ছুড়েছিলাম, সরাসরি কোনো দ্বিধা ছাড়া। যেন হাতটা আমার কথা না শুনে নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

নাসির কপালে হাত দিয়ে বলল, মাগি, দেখবি তোর কী হাল করি!

আমি বললাম, দেইখা নিস …

নিজের গলা শুনে চমকে গেলাম। এই কণ্ঠস্বর আমারই, কিন্তু চিনতে পারছিলাম না। বছরের পর বছর চুপ থেকে থেকে নিজের কণ্ঠ ভুলে গিয়েছিলাম। এখন মনে হলো, মাটি ফুঁড়ে ঘাস উঠছে, জোর করেও আর তাকে থামানো যাচ্ছে না।

সেই সন্ধ্যায় শিশির চন্দ যা করেছিল, তার কথা বলব না। পরের দিন ভোরে উঠেছিলাম মুখের রক্ত নিয়ে। বারবার আঁচল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে আঁচল ছাড়িয়ে শাড়ির জমিনেও ছড়িয়ে পড়ছিল রক্ত। তারপর দরজা খুলে বেরিয়ে গিয়েছিলাম। আর ফিরিনি। না বাপের ঘরে, না পরের ঘরে। ঘর থেকে বেরিয়ে পড়াটা আমার জীবনের এক বিদ্রোহের বিবৃতি; দীর্ঘতম আর নিঃশব্দ আখ্যান।

চরে চরে হেঁটেছি। কোথায় যাবো জানি না। শুধু জানতাম পেছনে ফেরা অসম্ভব।

নদীর পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে দেখলাম, একটা ভাঙা নৌকায় কয়েকজন নারী বসে। তাদের চোখে সেই পরিচিত ভাষা, যে-ভাষায় সুখের কথা নেই, আছে শুধু টিকে থাকার দীর্ঘ আখ্যান। রহিমা পালিয়েছে স্বামীর ঘর থেকে, সোনাবানু মালিকের গোলাঘর থেকে, বিমলা মহাজনের কাছারি থেকে। চর এলাকায় প্রায়শ নারীর পালিয়ে বাঁচার গল্প বোধহয় বাংলাদেশের সকলেরই জানা। তিনটে ভিন্ন গল্প, কিন্তু মূল সুর একটাই; যখন আর সহ্য হয়নি, তখন পা বাড়িয়েছে।

রহিমা জিজ্ঞেস করল, ক্যান বাইন্ন আইলা? স্বামী খেদাইয়া দিছে?

বললাম, স্বামী খেদায় নাই, আমি চইলা আইছি।

রহিমা অবাক হয়ে তাকাল। বলল, নিজে থেইকা আইছ? কেউ তাড়াইয়া দেয় নাই?

– না।

– তাইলে যাইবা কই?

– জানি না। কিন্তু যেইখান থেইকা আইছি, সেইখানে না।

রহিমা একটু চুপ থাকল। তারপর নৌকার পাটাতনে একটু সরে বসল, জায়গা করে দিলো।

সোনাবানু বলল, বহো তাইলে। একলা মাইয়াছেলে চরে কই যাইব!

সেদিন থেকে আমরা একসঙ্গে। সেই রাতে চরের খোলা আকাশের নিচে শুয়ে দেখলাম, তারাগুলো পানির ওপর পড়েছে। ঢেউ উঠলে তারা কাঁপে। মনে হলো, আলোও ভয় পায়; তবু ভাসে, তবু জ্বলে।

কখন যে ওদের মধ্যমণি হয়ে উঠলাম, তা বলতে পারব না। হয়তো মধ্যমণি শব্দটা ঠিক নয়। আমি শুধু শিখেছিলাম, অন্যায়ের বিরুদ্ধে জোর গলায় ‘না’ বলতে হয়। সেদিন রহিমার কষ্টে গড়া ঝুপড়িখানা ভাঙতে এসেছিল ওর স্বামীর লেলিয়ে দেওয়া গুণ্ডারা। আমি সামনে দাঁড়ালাম। বললাম, ঘর ছুঁলে ভাঙলে হাত কেটে দেব। আমাদের চারজনের হাতেই বড় মাছ কাটার দা। কথাটা বলার সময় জানতাম না কোথা থেকে এত সাহস আসছে। পরে বুঝেছি, যে-মানুষের হারানোর কিছু নেই, তার ভয়ের কিছু নেই। শূন্যতাও একটা শক্তি।

লোকজন চলে গেল। সেদিন রাতে রহিমা আমার হাত ধরে কেঁদেছিল। বলেছিল, ফুলন দিদি, তুমি না থাকলে!

বললাম, থাকমু। যতদিন পারি।

আরেকদিন মহাজনের গোলাঘরের সামনে রাতের অন্ধকারে গিয়ে দাঁড়ালাম। বললাম, মেয়েগুলিরে ছাইড়া দাও।

মহাজন জিজ্ঞেস করল, কে তুই?

বললাম, নদীর কইন্যা।

মহাজন প্রথমে হেসেছিল। পরে ছেড়ে দিয়েছিল। লোকে পরে বলেছিল, ফুলনের চোখে সেদিন মহাজন আগুন দেখেছিল। কেউ বলেছিল, রাতের বাতাসে তার পেছনে দাঁড়িয়েছিল নদীমাতা নিজে। আমি এসব শুনে চুপ থাকতাম। শুধু ভাবতাম, মিথ তৈরি হয় যখন সত্য আর শক্তি কেউ বিশ্বাস করতে চায় না। একটা গরিব মেয়ে মহাজনের বিরুদ্ধে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়িয়েছিল, এটা মানুষ মানতে পারে না। তাই পেছনে দেবী খোঁজে। কিন্তু দেবীর দরকার নেই। প্রবল স্রোতের তোড়ে শক্ত পোড়ামাটিও নরম হয়, এটুকুই যথেষ্ট। বিনয়কে প্রথম দেখেছিলাম বর্ষার এক ভোরবেলায়। চরের কাদামাটিতে হোঁচট খেতে খেতে আসছিল। কাঁধে ঝোলা, ঘুমকাতর চোখ, পরনে সাধারণ পোশাক, কিন্তু মুখে অদ্ভুত একটা জেদ। বোঝা যাচ্ছিল শহরের ছেলে, কিন্তু হাঁটায় চরের মাটির চেনা ছন্দ আছে। যে-মানুষ ছোটবেলায় এই মাটিতে খেলেছে, তার পায়ে সেই স্মৃতি থেকে যায়। পরে জেনেছিলাম, বিনয়ের বাবা এই চরেরই মানুষ। নাম হরেন বিশ্বাস, গরিব কৃষক, সারাজীবন মহাজনের জমিতে ভাগ চাষ করেছেন। বন্যার বছর মহাজনের কাছে দেনায় পড়ে জমি হারিয়েছিলেন, তারপর একটু একটু করে শহরে সরে গিয়েছিলেন ছেলেমেয়ে নিয়ে। বিনয় শহরে পড়েছে, আইন শিখেছে, কিন্তু বাপের হারানো জমির গল্প ঘুমের মধ্যেও ছাড়েনি তাকে। সেই গল্পই তাকে ফিরিয়ে এনেছে চরে, নিজের বাপের মতো আরো যারা জমি হারিয়েছে, তাদের জন্য।

রমজান মিয়া বিনয়কে চিনলেন। বললেন, তুমি হরেন বিশ্বাসের পোলা না? তোমার বাপ এই চরেই বড় হইছে।

বিনয় বললো, হ্যাঁ, চাচা। বাপের ভিটা এই চরে। বাপ হারাইছে, আমি ফিরত আইছি।

বৃদ্ধ রমজান মিয়া বললেন, শহরের পোলা আইছে আমাগো জমি বাঁচাইতে? আরে বাজান, মহাজনের লগে পারবা তুমি? মহাজনের হাত জেলা পর্যন্ত।

বিনয় বলল, হাত জেলা পর্যন্ত হইলে আমার কথা কোর্ট পর্যন্ত যাইবো। আইন আছে, দলিল আছে। শুধু লড়াইটা জানতে হইবো।

রমজান মিয়া মাথা নাড়লেন, তুমি বুঝো না বাজান, আইন গরিবের জন্য না।

বিনয় বলল, আইন কারো একজনের জন্য না, সবার জন্য। যে জানে সে ব্যবহার করতে পারে, যে জানে না সে পারে না। আমি এইটুকু শিখাইতে আইছি।

সন্ধ্যায় আমরা মুখোমুখি হলাম। বিনয় বলল, তুমিই ফুলন? এই চরে তোমার নাম শুনেছি।

বললাম, ভালো না মন্দ শুনছ?

সে বলল, সত্যি শুনেছি। সত্যের কোনো বিভাগ নেই।

প্রথমবার এমন কথা শুনলাম, যে-কথায় আমাকে মাপা নেই, শুধু অনুভব করা আছে। বললাম, তুমি তো শহরের পোলা। কদিন পরে ফিরা যাইবা, তাই না?

বিনয় বলল, গাছ যেখানে শিকড় ধরে, সেখানেই থাকে। আমি শিকড় খুঁজছি।

আমি আর কিছু বললাম না। কিন্তু বুঝলাম, এই মানুষ অন্যরকম।

বিনয় থাকল।

মাসের পর মাস সে চরের মানুষের পাশে দাঁড়াল, কখনো কাগজে কলম ধরে, কখনো আদালতে গলা তুলে, কখনো শুধু পাশে বসে শুনে। আমি দেখতাম দূর থেকে। একদিন সন্ধ্যায় বিনয় একটা বই এগিয়ে দিলো। বলল, পড়বে?

বললাম, অক্ষর চিনি, কিন্তু এর বেশি পড়ি নাই কখনো। চরের মাইয়াগো বেশি পড়ার সুযোগ হয় না।

– সুযোগ এখন আছে। তোমাকে আমি পড়া শেখাবো।

বিনয় ধৈর্যসহকারে আমায় পড়তে আর লিখতে শেখাল।

বিনয়ের প্রথম দেওয়া সে-বইটার নাম মনে নেই। কিন্তু মনে আছে, প্রথমবার পড়লাম একজন নারী তাঁর নিজের ভাষায় নিজের কথা লিখেছে। লজ্জা নেই, ভয় নেই। শুধু সত্য উচ্চারণ।

কিছুদিন পর বিনয়কে বললাম, এই মাইয়াডা এত সাহস পাইল কীভাবে?

বিনয় বলল, লিখতে পারলে মানুষ সাহস পায়। কারণ লেখার সময় নিজের সঙ্গে কথা বলতে হয়। নিজের কাছে সৎ থাকতে হয়।

– আমিও কি লিখতে পারমু?

– কেন পারবে না?

বিনয় আমাকে শেখাল শুধু অক্ষর না, ভাষার পেছনের

কথা। শব্দ কীভাবে ক্ষমতা তৈরি করে, কীভাবে মানুষকে ছোট করে, কীভাবে মুক্তও করে। শেখাল মহাজন কেন মহাজন,

কৃষক কেন কৃষক, এই বিভাজন কে তৈরি করেছে, কোনো

প্রাকৃতিক নিয়মে নয়, মানুষে মানুষে।

আমি শুনতাম, প্রশ্ন করতাম। ততদিনে বিনয় শিখিয়েছে আমায় প্রমিত ভাষা। শর্ত দিলো, ওর সঙ্গে কথা বললে প্রমিত ভাষায় বলতে হবে।

একদিন বললাম, তুমি যা বলছ, এটা তো আমি আগে থেকেই বুঝতাম। শুধু ভাষা জানতাম না।

বিনয় হাসল, এটাই! শোষিত মানুষ সত্য জানে, কিন্তু ভাষা পায় না। ভাষা পেলে লড়াই শুরু হয়।

ধীরে ধীরে অনেক কিছু জানলাম। জানলাম, নারীর অধিকার কী, আইনে কী লেখা আছে, কোথায় অভিযোগ করা যায়, কে শুনতে বাধ্য। জানলাম, মহাজনের জমি দখলের বিরুদ্ধে

কোথায় যেতে হয়, কী কাগজ লাগে। জানলাম, একা মানুষ কাঁদে, দল বাঁধলে লড়ে।

রহিমা একদিন বলল, ফুলন দিদি, তুমি এ্যাহন অনেক কথা কও। আগে তো এত কইতা না।

বললাম, আগে শব্দ জানতাম না রহিমা। এ্যাহন জানি।

রহিমা হাসল, শব্দ শিখলা কই থেইকা?

– নদী থেইকা একটু, বই থেইকা একটু, আর বিনয়ের কাছ থেইকা একটু।

রহিমা চোখ সরু করে বলল, বিনয়ের কাছ থেইকা? হুমমম।

বললাম, হুমমম মানে কী?

রহিমা মুখ টিপে হাসল।

একদিন সন্ধ্যায় বিনয় একটা প্রশ্ন করল – ফুলন, তুমি কীভাবে শিখলে এই সাহস?

বললাম, সাহস তো শেখার জিনিস নয়। অর্জনের বিষয়। পিঠ দেওয়ালে ঠেকলে সামনে তাকানো ছাড়া উপায় থাকে না। মানুষ সেটাকে সাহস বলে। আমি বলি বাঁচার তাগিদ।

বিনয় চুপ করে রইল অনেকক্ষণ। তারপর বলল, তুমি জানো, তুমি কতটা অসাধারণ?

হাসলাম। বললাম, অসাধারণ শব্দটা দিয়ে মানুষকে আলাদা করে রাখা হয়। আমি সাধারণ হতে চাই। মুক্ত, অবাধ আর সাধারণ।

বিনয় হাসল। সেই হাসিতে পুরুষের দাবি নেই, শুধু

স্বীকৃতি। এই হাসি আমি আগে দেখিনি।

একটু পরে বলল, ফুলন, তোমাকে একটা কথা বলব।

– বলো।

– তুমি যদি রাজি থাকো, আমি তোমার পাশে থাকতে চাই। স্বামী হিসেবে নয়, বন্ধু হিসেবে। যে-বন্ধু পাশে থাকে, পেছনে বা সামনে নয়। যে নেতৃত্ব দেয় না, সঙ্গ দেয়।

নদীর দিকে তাকিয়ে রইলাম। যমুনা তখন শান্ত। মনে হলো নদী বলছে, সিদ্ধান্ত তোমার। সবসময় তোমার। বললাম, বিনয়, আমি আর কারো ঘরে ঢুকব না। কিন্তু যদি দুটো মানুষ একসঙ্গে হাঁটে সেটা ঘর নয়, পথ। পথে আমার আপত্তি নেই।

ততদিনে জেনে গেছি, শিশির চন্দ আরেকটা বিয়ে করেছে। মহাজনের প্রশ্রয়ে, মহাজনের পছন্দের মেয়ে।

কেউ কেউ এসে বলল, এ্যাহন তোর কী হইব ফুলন? মুখ দেখাইবা কীভাবে?

বললাম, মুখ লুকাইনি কখনো। এ্যাহনো লুকামু না।

বিয়ে হলো এক ভোরবেলায়, নদীর পাড়ে।

কোনো জ্ঞাতিসম্পর্কীয় কেউ নেই। শুধু ছিল রহিমা, সোনাবানু, বিমলা আর চরের সেই মেয়েরা, যারা আমার পথের সঙ্গী।

কন্যাসম্প্রদানের সময় হলো। বিমলা বলল, কে দিবো তোমারে দিদি? বাপ নাই এইখানে।

আমি বললাম, আমি নিজেই দিবো নিজেরে।

চারদিকে নিস্তব্ধতা।

তারপর আমি বিনয়ের হাত ধরলাম; নিজের হাতে, নিজের ইচ্ছায়। বললাম, এই হলো আত্মসম্প্রদান। পিতা দেননি, সমাজ দেয়নি, বিধি দেয়নি। আমি দিলাম আমায় তোমাকে; নিজের সাক্ষী হয়ে, নিজের অনুমতিতে।

সোনাবানুর চোখ ভিজে উঠল। রহিমা নিচু গলায় বলল, আল্লাহ! এমন বিয়া আগে দেহি নাই।

বিমলা বললো, এমন বিয়াই আসল বিয়া।

বিনয়ের চোখও ভিজল।

সে বলল, এই সম্প্রদান আমি সারাজীবন বহন করবো; ভার হিসেবে নয়, দায়িত্ব হিসেবে নয়, সম্মান হিসেবে।

যমুনায় সেদিন বোধহয় একটু বেশি স্রোত ছিল। ঢেউ এসেছিল পাড়ে বারবার, যেন কপাল চুমে আশীর্বাদ করছে।

সমাজ অবশ্য চুপ থাকেনি। মহাজনের কাছারিতে বৈঠক বসল। মুরুব্বিরা জড়ো হলেন। চরের চায়ের দোকানে, হাটে, নৌকার ঘাটে কথা উঠল।

কাশেম মাতব্বর বললেন, এই মাইয়া স্বামীর ঘর ছাইড়া পালাইছে, অহন আরেকজনের লগে সংসার পাতছে। এইটা কী অগো বিধানে আছে? এইটা কী সমাজে মানা যায়?

মহাজনের দালাল করিম বলল, আর ওই পোলাডা? সে আইছে মানুষের মাথা গরম করতে। এই চরে থেইকা অগো একঘরে করা ফরজ।

পরদিন বিনয় মাতব্বরের বাড়ি গেল। বলল, কাশেমভাই, আইনে কি আছে জানেন? শিশির চন্দ দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন প্রথম স্ত্রীকে তালাক না দিয়ে। এটা আইনের লঙ্ঘন।

কাশেম মাতব্বর চোখ পাকালেন, আইন! আইন কই থাকে? ঢাকায়! আমাগো চরে আইন আসে না।

আমি সামনে এলাম। বললাম, কাশেম চাচা, আপনে কইলেন শাস্ত্র বিধানের কথা। বিধানে কি নারীর ওপর জুলুম করা ন্যায়সংগত? বউয়ের সম্ভ্রম বিক্রি করা পবিত্র?

কাশেম মাতব্বর গলা খাঁকারি দিলেন। সরাসরি উত্তর দিলেন না।

করিম বলল, মাইয়ামানুষ বেশি কথা কইলে সংসার থাকে না।

বললাম, আমার সংসার নষ্ট করছে শিশির চন্দ নিজে। আমি শুধু নিজের ইজ্জত আর নিজেরে বাঁচাইছি।

কুৎসা রটল, থামল না।

বিনয় বলল, কুৎসার জবাব কথায় নয়, কাজে। মানুষ দেখুক আমরা কী করি।

আমরা করলাম। চরের শিশুদের জন্য একটা ছোট পাঠশালা গড়লাম। ছেলেমেয়েরা পড়বে, লিখবে, নিজের অধিকার নিজে বুঝবে, কোথায় অভিযোগ করতে হয় জানবে। বিনয় পড়াল আইন, আমি পড়ালাম সাহস।

প্রথমদিন পাঁচজন এলো। বাচ্চাগুলির মা-বাবা বলেছিল, এত পড়াইয়া কী হইবো! বিনয় তাদের বলল, আপনার সন্তান যদি জমির দলিল পড়তে পারে, মহাজন ঠকাইতে পারবো না। তাতে আপনারই লাভ।

কথাটা কাজ করল। পরের সপ্তাহে পনেরোজন।

একবার আমাকে পুলিশ ধরল। থানায় নিয়ে গেল। দারোগা সাহেব বড় টেবিলে হাত রেখে জিজ্ঞেস করলেন, কী কী করেছিস তুই?

বললাম, কিছু করিনি তো, শুধু বাঁচার মতো বেঁচে আছি।

তিনি বললেন, ওসব কথা রাখ। মহাজনের বিরুদ্ধে কুৎসা, স্বামীর ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসা, স্বামী বেঁচে থাকতে নিজে নিজে বিয়ে, অন্য মেয়েদের নিয়ে দল পাকানো …

বললাম, স্বামী যখন মানুষ খায়, মেয়েদের সম্মান খায়, তখন সেটার প্রতিবাদকে কুৎসা বলে? আর নীরব থাকলে বলে শান্তি? এই যে নামকরণের রাজনীতি; এটাই তো আসল ষড়যন্ত্র।

দারোগা অবাক হয়ে তাকালেন। বুঝলাম, তিনি ভেবেছিলেন চরের মেয়ে কথা বলতে জানে না। এই ভুলটাই তাদের সবচেয়ে বড় ভুল, নীরবতাকে অজ্ঞতা ভাবা। নীরবতা অনেক সময় জমে-থাকা কথার গুদামঘর।

সেই রাতে থানার অন্ধকার ঘরে শুনলাম যমুনার গর্জন। নদী বলছিল, ধৈর্য ধরো মেয়ে। জল থামে না, ঘুরে যায়।

পরের ভোরে থানার সামনে চরের পঞ্চাশটা মেয়ে এসে দাঁড়িয়েছিল। কোনো মিছিল নয়, কোনো সেøাগান নয়। শুধু দাঁড়িয়ে থাকা। নিশ্চল, পাথরের মতো, শিলালিপির মতো।

দারোগা বেরিয়ে দেখলেন, নারীদের মৌন প্রতিবাদ। সেসব মেয়ে আর নারী যারা প্রতিনিয়ত ক্ষতবিক্ষত হয় স্বামী, ভাই, মনিব, মহাজন কিংবা পরম পিতার হাতেও। ওদের হাতে কিছু নেই, মুখে কিছু নেই। শুধু চোখ। সেই চোখে শতাব্দীর জমে-থাকা কথা, যা এখন আর চুপ থাকতে পারছে না। সমাজের নিচুতলার ওই মেয়েগুলোর ভাষা শব্দে নয়, উপস্থিতিতে। দারোগা ভেতরে ফিরে গেলেন। বিকেলে আমাকে ছেড়ে দেওয়া হলো।

আমাকে দেখে রহিমা দৌড়ে এলো।

বলল, আইছো! আল্লাহ শুকরিয়া।

বিমলা বলল, ফুলন দিদি, তুমি একলা না। এইটা মনে রাইখো যেন।

আমার গলায় কিছু একটা আটকে গেল। কথা বেরোল না।

বছর পাঁচেক পরের কথা।

আমার নাম জেলার মানুষ জানে। কেউ বলে সাহসী, কেউ বলে পাগলি, কেউ বলে ডাইনি। ডাইনি শুনলে হাসি। যে মেয়েকে সমাজ ভয় পায়, তাকে ডাইনি বলে, এ তো পুরনো অভ্যাস। মধ্যযুগে যখন নারী নিজের মতামত দিয়েছে, তখনো ডাইনি বলেছে। যুগ বদলায়, শব্দ বদলায় না।

শহরের কাগজে একবার লিখেছিল, ‘ফুলন, চরের বিদ্রোহী এক নারীর গল্প।’ বিনয় সেই কাগজটা রেখে দিয়েছিল। আমি দেখে হেসেছিলাম।

বললাম, বিদ্রোহ তো নয়। শুধু ন্যায্য দাবি।

বিনয় বলল, ন্যায্য দাবি যখন অন্যায় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যায়, তখন তাকে বিদ্রোহ বলে। ভয় পেয়ো না শব্দটাকে।

একদিন বছর বারোর একটা মেয়ে এলো একা। বাবা বিয়ে দিতে চায়, গোঁফ-সাদা লোকের সঙ্গে। মেয়েটার মুখের দিকে তাকালাম। নিজের ছেলেবেলা দেখলাম। সেই ভয়, সেই ‘না’ বলতে না পারার দীর্ঘ যন্ত্রণা।

বললাম, না বলতে শিখেছো মা?

মাথা নাড়ল, না।

বললাম, শেখো। প্রথমে গলা কাঁপবে, হাত কাঁপবে, মনে হবে ভুল করছো। তবু বলো। কারণ না বলাও একটা ভাষা, সবচেয়ে সৎ ভাষা। আর সততা কখনো ভুল হয় না, ভয় পায় শুধু।

মেয়েটা চলে গেলে নদীর দিকে তাকিয়ে বসে রইলাম। শুনেছি সিমোন দ্য বোভোয়ার নামে এক নারী মনীষী বলেছিলেন, নারী হয়ে কেউ জন্মায় না, নারী হয়ে ওঠে। আমিও নারী হয়েছি, কিন্তু ওদের বানানো নারী নয়, নিজের বানানো নারী।

আমাদের ঘরে কর্তা আর গৃহিণীর বিভাজন নেই। রান্না বিনয়ও করে, মাঠে আমিও যাই। রাতে মুখোমুখি বসে কথা বলি, পরদিনের পরিকল্পনা, চরের সমস্যা, কোনো বইয়ের কথা, কোনো মানুষের গল্প।

একবার রহিমা জিজ্ঞেস করেছিল, ফুলন দিদি, তুমি কি সুখী?

একটু ভাবলাম। বললাম, সুখ মানে কী রহিমা? যদি সুখের মানে এই হয় যে, প্রতিদিন ভোরে উঠে নিজেকে নিজের মতো করে চেনা যায়, তাহলে হ্যাঁ। যদি সুখ মানে হয় পাশের মানুষ তোমাকে ছোট করে না, তাহলে হ্যাঁ। যদি সুখ মানে হয় রাতে ঘুমানোর আগে মনে হয় আজকের দিনটা বৃথা যায়নি, তাহলে হ্যাঁ, আমি সুখী।

রহিমা হাসল।

শিশির চন্দ মরেছে দুই বছর আগে।

রহিমা জিজ্ঞেস করেছিল, যাইবা না?

– কই?

– ওই বাড়িতে।

– ওই বাড়ি তো আমার ছিল না কোনোদিন। শুধু ছিলাম, বন্দিশালায় বন্দিরা থাকে যেভাবে।

কিছু মানুষ মরে না, শুধু একটা ভার সরে যায়। সেই ভারটা এতদিন বুকে নিয়ে হাঁটছিলাম, খেয়াল করিনি।

সেই রাতে একা নদীর পাড়ে গেলাম। জলে হাত ডোবালাম। দাইয়ের সেই পুরনো কথা মনে পড়ল, জলের মেয়ে, জলেই ভাসবে।

না।

জলের মেয়ে জলে ভাসে না, সাঁতারও কাটে। তফাৎটা এখন জানি।

যমুনা সেদিন অনেকক্ষণ কথা বলেছিল। আমি শুনেছিলাম। কী বলেছিল জানি না, নদীর ভাষা কাগজে লেখা যায় না, শুধু বুকের ভেতরে অনুবাদ হয়।

কিন্তু পরেরদিন ভোরে উঠে দেখলাম, বুকের ভেতরের সেই পুরনো পাথরটা নেই। নদী নিয়ে গেছে। নদী সব নেয়; মাটি, ভিটে, দুঃখ, পাথর। বদলে দেয় না, শুধু সরিয়ে দেয়, যাতে নতুন মাটি জমতে পারে।

সোনাবানু ডাকছে, রহিমা ডাকছে।

পাশের চরে একটা মেয়েকে মেরে আটকে রেখেছে শ্বশুরবাড়ির লোকজন।

শাড়ি ঠিক করলাম। পায়ে স্যান্ডেল গলালাম।

চললাম।

নমনীয় পায়ে, অনেকটা যেন মাটিকে ব্যথা না দেওয়ার সতর্কতায়। কিন্তু দৃঢ়, ঠিক যমুনার মতো, যা ঠিকই বাঁক নেয়, কিন্তু থামে না। যা ভাঙে, তারপর আবার গড়ে।

সূর্য উঠছিল। চরের ধুলো লাল হয়ে আসছিল। পায়ের ছাপ পড়ছিল মাটিতে গভীর আর স্পষ্ট।

আমি জানি, এই ছাপ মুছে যাবে, বৃষ্টিতে কিংবা বন্যায়। কিন্তু ততক্ষণ আছে, যতক্ষণ হাঁটছি।

এটুকুই যথেষ্ট।

Published :


Comments

Leave a Reply