আঠারো
ঘুমের ভিতর থেকে দোলন শুনতে পায় তার ঘরের দরজায় টুকটুক করে শব্দ হচ্ছে। এই ঘরের দরজায় এরকম রাতদুপুরে কখনো শব্দ হয়নি। কমলরানি সংসারে আসার আগে দোলন তো থাকতো ঠাকুরের ঘরেই। এই ঘরে ঠাকুর সেভাবে কখনো আসেন না, দিনের বেলায় যদিও দুয়েকবার এসে থাকেন, তাও চট করেই কোনো জরুরি কথা সেরে নেওয়ার জন্য, রাতে ওরকম কোনো কারণেও কখনো আসেননি। কমলরানি আসার আগে রাতগুলো দোলনের তো ঠাকুরের ঘরেই কেটেছে। আজ তাহলে শব্দ করছে কে? এই বাড়িতে তো তারা তিনজন ছাড়া কেউ নেই!
তাহলে? তাহলে কি ঠাকুরই শব্দ করছেন দোলনের দরজায়? তাই বা কী করে সম্ভব! ঘরে তাঁর বউ আছে না? আজই তো মাত্র কথা হলো বউকে তিনি মাসদুয়েকের জন্য বাপের বাড়িতে পাঠিয়ে দেবেন। কমলরানি বাপের বাড়ি চলে গেলে তখন আবার তার দেবুঠাকুরকে দোলন নিজের মতো করে পাবে, ঠাকুর পাবেন তাঁর দোলনকে। আদর ভালোবাসা আর সঙ্গমে কাটতে থাকবে রাতগুলো।
দোলনের এইসব ভাবনা চলছে আর দরজায় অবিরাম চলছে টুকটুক শব্দ। এই বাড়িতে দোলনের কোনো ভয়ভীতি নেই। ঠাকুরের ক্ষমতা সে জানে। যুবতী মেয়ে একা ঘরে থাকে, এই সুযোগে অন্য কেউ যে বাড়িতে এসে ঢুকবে, দোলনের দরজায় রাতদুপুরে শব্দ করবে, এই সাহস কিংবা ক্ষমতা অন্য কারো হবে না।
তাহলে কি কমলরানি শব্দ করছে দোলনের দরজায়? এমন কী কারণ ঘটতে পারে, যে-কারণে রাতদুপুরে দোলনকে জাগিয়ে তুলে সে-কথা তার বলতে হবে?
না, কমলরানি নয়। এলে দেবুঠাকুরই আসবেন।
দোলন বিছানা ছেড়ে দরজায় এসে কান পাতল। অনুচ্চস্বরে বলল, ‘কে?’
বাইরে থেকে দোলনের মতো ওরকম স্বরেই দেবুঠাকুর বললেন, ‘দরজা খোল। আমি।’
দোলন ব্যস্ত ভঙ্গিতে দরজা খুলল। হারিকেন পুরোপুরি নিভিয়ে ঘুমায় না সে। হারিকেন ঝোলানো থাকে দরজার অদূরের একটা আংটার সঙ্গে। সেই আলোয় দেখা গেল খালি গায়ে ধুতিপরা দেবুঠাকুর দোলনের ঘরে ঢুকেছেন। নিজ হাতে দরজা বন্ধ করতে করতে বিরক্তমাখা স্বরে বললেন, ‘এত দেরি করলি কেন? কতক্ষণ ধরে দরজায় শব্দ করছি! এত ঘুম তোর!’
নিজের প্রিয় মানুষটিকে এতদিন পর রাতদুপুরে তার ঘরে পেয়ে দোলন ততক্ষণে একেবারেই দিশেহারা হয়ে গেছে। কী রেখে কী করবে, বুঝতে পারছিল না। কিছুক্ষণ যেন তার বিশ্বাসই হলো না, এ তার দেবুঠাকুর, শরীর ও মনের মানুষ, প্রেম ও কামনার মানুষ। মনে হলো সে স্বপ্ন দেখছে, অথবা পুরো ব্যাপারটাই তার কল্পনা। সে ফ্যালফ্যাল করে ঠাকুরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো।
ঠাকুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দু-হাত রাখলেন দোলনের কাঁধে। গভীর কামার্তস্বরে বললেন, ‘কী রে, এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন? আমিই এসেছি। তোর দেবুঠাকুরই এসেছে তোর কাছে।’
দোলন কোনো রকমে বলল, ‘কী করে সম্ভব? তোমার বউ যদি জেগে যায়, যদি দেখে তুমি ঘরে নেই, যদি এই ঘরে এসে আমাদের হাতেনাতে ধরে। না না, এটা তুমি ঠিক করোনি, একদমই ঠিক করোনি। আজই তোমার সঙ্গে কথা হলো, আর আজই তুমি আমার কাছে চলে এলে? দু-চারটা দিন অপেক্ষা করতে পারলে না? বউ বাপের বাড়ি পাঠাতে পারলেই তো আমরা দুজন মুক্ত স্বাধীন। তুমি চলে যাও। বউ এর মধ্যে জেগে উঠলে নিশ্চয় বুঝবে তুমি কাজ সারতে বাইরে গিয়েছিলে।’
ঠাকুর হাসলেন। ‘আমি তো কাজ সারতেই এসেছি। তোকে ছাড়া আমি আর থাকতে পারছি না দোলন। তোর জন্য আমার শরীর জুড়ে কাম, মন জুড়ে কাম। আমি আর পারছি না। কমলকে আমার ছুঁতে ইচ্ছে করে না, আমি পাগল হয়ে আছি তোর জন্য। আজ দুপুরে বাঁশঝাড়তলায় তোর সঙ্গে দেখা হওয়ার পর থেকে শরীরের যন্ত্রণায় আমি পাগল হয়ে আছি। আমার একবার ইচ্ছা হয়েছিল বাঁশঝাড়তলার ঝোপঝাড়ের আড়ালে তোকে নিয়ে শুয়ে পড়ি। তারপর থেকে এই এতগুলো ঘণ্টা আমি যে কী যন্ত্রণার মধ্যে কাটিয়েছি, আমি ছাড়া কেউ তা জানে না। আজ আমার বারবারই মনে হচ্ছিল, বিয়ে করাটা আমার একদমই ঠিক হয়নি, ওটা ছিল আমার ভুল সিদ্ধান্ত। দেশগ্রামের লোকের কথা তোয়াক্কা করা আমার ঠিক হয়নি।’
দোলন দু-হাতে জড়িয়ে ধরল ঠাকুরকে। তার বুকে মুখ ঘষে দিয়ে বলল, ‘আমার অবস্থাও তোমার মতো। দুপুরবেলা বাঁশঝাড়তলায় আমারও ঠিক ওরকমই মনে হয়েছিল। তখনই শুয়ে পড়তে ইচ্ছা করছিল ঝোপঝাড়ের আড়ালে। কিন্তু আমাদের সহ্য করতে হবে, বিয়ে করে বউ যখন বাড়িতে এনেছই, তার কদর তোমাকে করতে হবে। অশান্তি কোরো না, সংসারের অশান্তি বড় জ্বালাময়। নাড়ার আগুনের মতো ধিকিধিকি পোড়াবে তোমাকে। এসব আমি বই পড়ে জেনেছি। তুমি ফিরে যাও। কাল সব ব্যবস্থা করো, পরশুই বউকে মালখানগরে পাঠিয়ে দাও। পরশু রাত থেকে আমরা আগের মতো কাটাবো আমাদের দিনগুলি, রাতগুলি।’
ঠাকুর হাসলেন। ‘তুই একেবারে বইয়ের ভাষায় কথা বলছিস। চারদিক ভেবে, সব বিবেচনা করেই আমি তোর কাছে এসেছি। কমল কিছুই টের পাবে না। ভোরের আগে হয়তো তার ঘুমই ভাঙবে না। আর যদি ভাঙেও, সে কিছু বুঝতেই পারবে না।’
দোলন তাকালো ঠাকুরের চোখের দিকে। বলল, ‘ঘুমের মধ্যেও তো মানুষ অনেক সময়ই বুঝে যায়, স্বামী বিছানায় নেই। ওরকম হলে নিশ্চয় তার ঘুম ভাঙবে। তখন কী হবে? হয়তো সে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করবে, হয়তো ভাববে তুমি কাজ সারতে বাইরে গিয়েছ, পাঁচ-দশ মিনিটের মধ্যেই ফিরবে। যদি দেখে ঘণ্টা কেটে যায়, তুমি ফিরছ না, তাহলে নিশ্চয় সে বিছানা ছাড়বে। দোতলা থেকে নেমে এসে তোমাকে ডাকবে বা হারিকেন হাতে বাইরে এসে তোমাকে খোঁজাখুঁজি করবে, তোমার কোনো বিপদ হলো কি না বোঝার চেষ্টা করবে।’
দোলনকে বিছানার কাছে টেনে আনতে আনতে ঠাকুর বললেন, ‘তুই বোধহয় এখনো আমাকে পুরোপুরি চিনে উঠতে পারিসনি। আমার ক্ষমতা সম্পর্কে তোর তেমন কোনো ধারণাই নেই। আমি আরেকজন আমাকে আমার ঘরেই রেখে এসেছি। না না, আমার বিছানায় তাকে রাখিনি, কমলের পাশে রাখিনি। সে ওই ঘরেই আছে। অর্থাৎ আরেকজন আমি ওই ঘরেই আছি। এত কথা এখন আর বলতে পারব না। তুই আমাকে আদর কর, আমাকে তৃপ্ত কর, আমি আর পারছি না।’
দোলনকে আর কোনো কথা বলার সুযোগই দেননি দেবুঠাকুর। তাঁর নিজের শরীর আগে থেকেই অনেকখানি জেগে আছে, এখন তিনি দোলনকে জাগাতে লাগলেন। নানাবিধ কামকলায় অসমবয়সী একজোড়া নারী-পুরুষ তারপর প্রায় উন্মাদ হয়ে গেল। যেন তাদের দেহে লুকিয়ে ছিল অনন্তকালের কামক্ষুধা। উন্মাদের মতো তারা সেই ক্ষুধা মেটাতে লাগল।
দেবুঠাকুরের ঘরের দোতলায় আবছায়া অন্ধকার জমে আছে। চারদিককার চারটি জানালাই খোলা। বাইরে গাছপালার নিবিড় অন্ধকার। নিচতলায় ঠাকুরের লেখাপড়ার টেবিলে মাঝারি আলো নিয়ে সারারাত জ্বলে একটা হারিকেন। কাঠের পাটাতনের সরু ফাঁক দিয়ে সেই আলো চলে আসে দোতলায়। সিঁড়ি দিয়েও আসে আলোর আভাস। সেই আভাসের ফলে দোতলা ভরে থাকে আলো-আঁধারির মিশেলে তৈরি হওয়া অদ্ভুত এক আবছায়ায়।
কয়েকদিন ধরে রাতের বেলায় হঠাৎ হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায় কমলরানির। ঠাকুর পাশ ফিরে শুয়ে থাকেন, কমলও কখনো কখনো থাকে পাশ ফিরে, আবার কখনো কখনো ঠাকুরের পিঠের দিকে মুখ করেও শোয়। ঘুম ভেঙে কিছুদিন ধরে বেশিরভাগ রাতেই সে দেখে ঠাকুর তার দিকে পিঠ দিয়ে শুয়ে আছে। আজ দেখলো ঠাকুর নেই, বিছানা শূন্য। এই বাড়িতে বউ হয়ে আসার পর এক-দুই রাত প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে ঠাকুরকে সে ঘরের বাইরে যেতে দেখেছে। সব মিলিয়ে পাঁচ-সাত মিনিট, তারপরই ফিরে এসেছেন। বেশিরভাগ রাতই এক ঘুমে পার করে সে, বাইরে বেরোবার দরকার হয় না। সহবাসের পরও বিছানা ছাড়ে না, ক্লান্ত ভঙ্গিতে কিছুক্ষণ হাঁপায়, তারপর ঘুমিয়ে পড়ে। কমলেরও হয় সেই একই অবস্থা। সে ক্লান্ত হয় আরো বেশি। ক্লান্তি-অবসাদে ঘুমের অতলে তলিয়ে যেতে দু-চার মিনিটও লাগে না তার।
আজ রাতে ঘুম ভাঙার পর, বিছানায় ঠাকুরকে না দেখে, অতি স্বাভাবিক কারণেই কমলরানির মনে হলো, ঠাকুর যে-কাজে বাইরে গেছেন, এখনই সে-কাজ সেরে ফিরে আসবেন। আধাঘণ্টা পৌনে একঘণ্টা পেরিয়ে যায়, ঠাকুর ফেরেন না দেখে সে চিন্তিত হয়। চিত্তচাঞ্চল্য দেখা দেয় তার। কোনো বিপদ হলো মানুষটার? শরীর খারাপ হলো? পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হলেন?
কমলরানি দিশেহারা ভঙ্গিতে বিছানা ছাড়ল, দ্রুতপায়ে সিঁড়ি ভাঙতে লাগল। সিঁড়ির মাঝামাঝি এসে দেখে ঠাকুর বসে আছেন তাঁর লেখাপড়ার টেবিলে। হারিকেনের আলো কিছুটা উসকে দেওয়া হয়েছে। টেবিলে খোলা, পোকায় কাটা বই। ঠাকুরের চোখে চশমা। তিনি জগৎ সংসার ভুলে তাকিয়ে আছেন খোলা বইয়ের দিকে। খালি গায়ের মানুষটিকে দেখে দোলনের মনে হলো, এই অবস্থায় তাকে ডাকা ঠিক হবে না বা তার পিছনে গিয়ে দাঁড়ানো ঠিক হবে না, তিনি থাকুন তাঁর বই পড়া নিয়ে।
কমলরানি বিছানায় ফিরে আসবে। বাকি রাত একটুও ঘুম হবে না তার। ঠাকুর ফিরে আসবেন ভোররাতে। এসে নিজস্ব ভঙ্গিতে শুয়ে পড়বেন বিছানায়। দেখে কমলরানির একটা দীর্ঘশ্বাস পড়বে।
বাপের বাড়ি যাওয়ার কথা শুনে কমলরানি খুবই উৎফুল্ল হলো। কয়েকদিন ধরে মনের মধ্যে চাপ ধরেছিল যে দুঃখ-বেদনা ও অস্বস্তি, সেই অস্বস্তি যেন মুহূর্তেই কেটে গেল। স্বামীর সঙ্গে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, কেমন করে সেই দূরত্ব কাটাবে, ওই নিয়ে প্রথমে একা একা কেঁদেছে, তারপর দোলনকে বলতে বলতেও কেঁদেছে। কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিল না কোন পথে এগোলে মানুষটির সঙ্গে দূরত্বটা সে কমিয়ে আনতে পারবে। নিজের বুদ্ধিতে যতটা কুলায় সেই ভাবে চেষ্টাও করেছে। মেয়েদের স্বভাবগত কায়দায় স্বামীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করেছে, অন্যপক্ষের কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তাঁর সঙ্গে কথা যে দু-চারটা হয়, তা খুব স্বাভাবিকভাবেই হয়েছে। রাতের শয্যায় ঘনিষ্ঠ হতে গিয়েছে। ঠাকুর শুয়ে থেকেছেন তার দিকে পিঠ দিয়ে, পিছন থেকে সে তাকে জড়িয়ে ধরেছে। কাঁধের কাছে মুখ রেখে বুকে হাত বুলিয়ে দিয়েছে। পুরুষ মানুষের শরীর জাগ্রত করার অল্পবিস্তর যেটুকু কায়দা জন্মগতভাবে নারীদের রপ্ত করা থাকে, সেটুকু প্রয়োগ করেছে। কাজ হয়নি। ঠাকুর নির্দ্বিধায় তলিয়ে গেছেন ঘুমের অতলে। ব্যর্থতার গ্লানিতে চোখের জলে ভেসেছে কমল, তারপর নিজেও ঘুমিয়ে পড়েছে।
মানুষের মনের ছায়া বহন করে তার চোখ-মুখ। দোলন বুদ্ধিমতি মেয়ে। তার কাছে কমলরানি ধরা পড়ে গেছে। পুকুরঘাটে সে তাকে কাঁদতেও দেখেছে। শেষ পর্যন্ত দোলনকে সে নিজেই সব কথা বলে দিয়েছে। মেয়েটি কিছু পরামর্শ দিয়েছে, কিছু বিষয় বুঝিয়ে দিয়েছে। ওসব যে কমলরানি বোঝে না, তাও নয়। তবু দোলনের কথা মন দিয়ে শুনেছে। নিজের সহজ-সরল গ্রাম্যমন নিয়ে সারাক্ষণই ভেবেছে, যেমন করে হোক স্বামীর সঙ্গে এই দূরত্ব তাকে অতিক্রম করতেই হবে। আড়ষ্ঠতা কাটিয়ে যতটা স্বাভাবিক হওয়া যায় মানুষটির কাছে, সেই চেষ্টা সে যত রকমভাবে সম্ভব করে যাবে।
আজ রাতে সেই প্রস্তুতি ছিল কমলের।
ঠাকুর আধশোয়া আছেন বিছানায়। নিচতলার হারিকেনের আলো সিঁড়ি ভেঙে চলে এসেছে ওপরে, তাতে ঠাকুরের মুখ আবছায়ামতো দেখা যায়। কমল বিছানায় আসতেই তিনি কোমল কণ্ঠে বললেন, ‘দুই মাস হইলো আমগো বিয়া হইছে, দুই মাস কম সময় না। বাপের বাড়ি ছাইড়া এতদিন তুমি কোনো দিন আত্মীয়বাড়িতেও থাকো নাই। আত্মীয়র বাড়ি আর স্বামীর বাড়ি এক না। তারপরও মাইয়ারা মনের কষ্ট চাইপা স্বামীর বাড়িতে থাইকা যায়।
মা-বাপ ভাই-বইন সব ছাইড়া থাকার অভ্যাস কইরা ফালায়। পয়লা পয়লা কষ্ট হয়, বাপের বাড়ির লাইগা মন ছুইটা যায়, তোমারও সেই রকম হওনের কথা। তোমগো একটা বড়বাড়ি। বহুত মানুষজন এক বাড়িতে। আমার বাড়িতে খালি দুইজন মানুষ। এতবড় বাড়ি, থাকি আমি আর দোলন। চদরি দেশে আইলে থাকে। থাকে নিজের ঘরে। প্রিয়নাথ থাকে দিনের বেলায়। এই বাড়িতে তোমার মন টিকনের কথা না। কয়দিন ধইরা তোমার মুখটা আমি খেয়াল করতাছি, মুখ দেখলে বুঝা যায় বাপের বাড়ি যাওনের লেইগা তুমি অস্থির হইয়া আছ …’
ঠাকুরের কথা শেষ হওয়ার আগেই কমল দিশেহারা স্বরে বলল, ‘না না, আমি বাপের বাড়ি যাওনের লেইগা অস্থির হই নাই। আমার মন অন্য কারণে খারাপ।’
হাত তুলে ঠাকুর তাকে থামালেন। কমলের মন খারাপের আসল কারণ তো তিনি জানেনই! নিজে যতটা অনুভব করেছেন, তার সঙ্গে দোলনের কিছু কথাবার্তা মিলিয়ে ব্যাপারটা তাঁর কাছে পরিষ্কার। কমল যতটা সহজ-সরল আর বোকা ধরনের হয়ে থাকুক না কেন, স্বামী যে তাকে অবজ্ঞা করছে, এইটুকু তার বোঝার কথা। তা সে বুঝেছেও। দোলন তো তাঁকে বলেছেই। তিনি অন্যপথ অবলম্বন করেন, তাঁর আটজনের একজনকে লেখাপড়ার টেবিলে বসিয়ে দোলনের ঘরে গিয়ে ছিলেন রাত কাটাতে। প্রথমবার শারীরিক মিলন শেষ করে অনেক কথা বলেছেন দুজনে। ঠাকুরের ইচ্ছা ছিল, যেহেতু রাতের বেলা দোলনের ঘরে আসার পথ একটা পাওয়া গেছে, এইভাবে চলুক কিছুদিন। তারপর কমলকে না হয় মালখানগরে পাঠানো যাবে। দোলন দেরি করতে নারাজ। ঠাকুরকে বলেছে, ‘না, দেরি করবার দরকার নেই। দুয়েক দিনের মধ্যেই বউকে বাপের বাড়িতে পাঠাও। দু-মাস থেকে আসুক। তুমি রাতে আমার কাছে আসবে বুঝলাম, তারপর তো ওই ঘরেই ফিরে যাবে। শোয়ার আগে তোমার বউ ঘরের দরজায় খিল তুলবে, সেই শব্দ আমি সহ্য করতে পারি না। শব্দটা আমার বুকে এসে লাগে। তুমি তাকে বাপের বাড়িতে পাঠাও।’
শুনে ঠাকুর হেসেছিলেন। ‘দু-মাস পর তো আবার একই ঘটনা ঘটবে। তখন কী করবি?’
‘কষ্ট করে কিছুদিন সহ্য করবো। তারপর আবার তাকে বাপের বাড়িতে পাঠাবে। আবার আমি আমার মতো করে চব্বিশ ঘণ্টাই তোমাকে কাছে পাব।’
ঠাকুর বলেছেন, ‘তারপর?’
দোলন বলেছে, ‘এইভাবেই চলবো যতদিন চলা যায়। আপাতত তুমি তাকে পাঠাও।’
এই কারণেই কমলের সঙ্গে আজ ওসব নিয়ে কথা বলছেন ঠাকুর। তাঁর কথা শুনে, বাপের বাড়ি যাবে শুনে মন উৎফুল্ল হয়েছে কমলের, তারপরও স্বামীর বুকে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, ‘আমারে ছাইড়া থাকতে আপনের অসুবিধা হইবো না?’
ঠাকুর স্নিগ্ধ স্বরে বললেন, ‘ইকটু তো হইবোই, সেইটা তোমারও হইবো। তয় এইসব কিছু না। মানুষের উচিত
যে-কোনো পরিস্থিতি মাইনা চলা।’
কমল আর কথা বলেনি। ঠাকুর তাঁর চাতুর্য দিয়ে মিষ্টিস্বরে কথা বলে কমলের মনের ভিতর জমে থাকা
দুঃখ-বেদনা তাড়িয়ে দিলেন। কমল অতি সরল প্রকৃতির নারী। স্বামীর কথায় সে গলে গেল। একদিন পর মালখানগরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে লাগল মনে মনে।
ঠাকুর বললেন, ‘তুমি তৈরি হইয়া থাইকো। আমি পালকি ঠিক কইরা রাখুম নে, পিয়নাথরেও দিমু নে তোমার লগে। সে তোমারে বাপের বাড়িতে পৌঁছাইয়া দিয়া আসবো। যতদিন ইচ্ছা থাকো। কবে আসবা খবর পাঠাইলে পিয়নাথ পালকি লইয়া যাইবো নে, তোমারে লইয়া আইবো নে। এখন খরালিকাল। দুই মাস পর বাইষ্যাকাল আইয়া পড়বো।
বিষ্টি-বাদলা শুরু হওনের আগে আগেই আইয়া পইড়ো। দেড়-দুই মাস এই বাড়িতে থাইকা বাইষ্যাকালে আবার যাইয়ো বাপের বাড়িতে। তহন তো কেরায়া নৌকা লইয়াই যাইতে পারবা।’
আহ্লাদে তখন গদগদ হয়ে গেছে কমল। স্বামীর বাহুর কাছে মুখ রেখে বলল, ‘বাইষ্যাকালে পিয়নাথের লগে আমি যামু না। ওই দিনে আপনে আমারে দিয়া আইবেন। নৌকায় যাইতে যাইতে অনেক গল্প করুম আমরা।’
রাত বাড়ছে, ঠাকুরের শরীর জেগে উঠতে চাইছে দোলনকে পাওয়ার জন্য। কিন্তু দোলন তাঁকে আজ রাতে যেতে মানা করেছে। কমলকে মালখানগর পাঠাবার পর থেকে তাঁর আর দোলনের ঘরে যেতে হবে না, দোলনই আগের মতো এসে থাকবে তাঁর ঘরে।
অতি কামুক দেবুঠাকুর সেই রাতে কমলের সঙ্গেই মিলিত হয়েছিলেন। [চলবে]


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.