উত্তরায় নতুন গ্যালারি

অতি সম্প্রতি নতুন আরেকটি গ্যালারির দ্বার উন্মোচিত হলো উত্তরায়। গ্যালারিটির স্বত্বাধিকারী একজন তরুণ চিত্রকর গৌতম চক্রবর্তী। নিজস্ব বসতবাড়ির একতলায় চৌদ্দশ বর্গফুট জায়গা জুড়ে এই গ্যালারি। উদ্বোধন-উপলক্ষে যে-ব্রোশিওর ছাপানো হয়েছে তাতে আরো তথ্য পাওয়া গেল। যেমন, প্রদর্শনীতে ব্যবহারযোগ্য জায়গা হচ্ছে সর্বমোট আটশ দশ বর্গফুট এবং দেয়াল এক    হাজার আটশ পঁয়তাল্লিশ বর্গফুট। গ্যালারি হিসেবে অত্যন্ত সুপরিসর নিঃসন্দেহে।

আমাদের দেশে গ্যালারির ভূমিকা হচ্ছে কেবলই শিল্পী ও ক্রেতার যোগাযোগের মধ্যবর্তী পর্যায়। শুরু থেকেই এরকম একটি অবস্থা আজ অবধি চলে আসছে। কিছু কিছু গ্যালারি যদিও ইদানীং চিত্রকর্ম ছাড়াও অন্যান্য মাধ্যমের সৃষ্টিশীল ক্রিয়াকর্মকে উৎসাহিত করার চেষ্টা করছে, কিন্তু উন্নত দেশগুলোর মতো কোনো নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতিশীল শিল্পীকে প্রমোট করার ভূমিকা রাখতে দেখা যায় না। যে-কারণে উন্নত দেশগুলোতে শিল্পী এবং শিল্পকর্ম-সৃষ্টির ক্ষেত্রে গ্যালারির ভূমিকা অনস্বীকার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। মূল পেশা চিত্রকর এবং বয়সে তরুণ, অতএব গৌতম চক্রবর্তীর তাঁর গ্যালারি সম্পর্কে চিন্তাভাবনায় আমরা অবশ্যই নতুন কিছুই আশা করি।

‘কায়া’র অবস্থান উত্তরার ৪নং সেক্টরে। ঢাকার মূল শহর থেকে খুব দূরে না হলেও যানজটের কল্যাণে দূরত্ব ক্রমশ দীর্ঘতর হচ্ছে। এ-কারণে সাধারণ দর্শকদের ‘কায়া’ কতটুকু আকৃষ্ট করবে তা ভাববার বিষয়। তাছাড়া, লোকেশন নির্ণয় করতেও বেশ খানিকটা বেগ পেতে হয়। তবে হ্যাঁ, যদি দর্শক এবং ক্রেতা হিসেবে গুলশান-বারিধারাবাসীদের টার্গেট করা হয়ে থাকে তাহলে খুব কাছেই বলা যায়।

ছোট্ট একটা খোলা জায়গা পেরিয়ে এগোলেই মূল দরজা। সুন্দর কারুকার্যময় বর্গাকৃতি ডিজাইন করা কাচ বসিয়ে তৈরি। ঢুকতেই অত্যন্ত প্রশস্ত একটি হল। এছাড়াও আছে আরো তিনটি তুলনামূলক ছোট কামরা। অত্যন্ত সুপরিসর গ্যালারি নিঃসন্দেহে। আলোক-বিন্যাস এবং দেয়ালের রং প্রয়োজনোপযোগী এবং রুচিশীল। লোকেশনের কথা বাদ দিলে সব মিলিয়ে অত্যন্ত মানসম্পন্ন একটি গ্যালারি।

দুই

‘কায়া’র দ্বার-উন্মোচন উপলক্ষে আয়োজন করা হয়েছে একটি প্রদর্শনীর। নাম ‘উদ্বোধন’। নবীন ও প্রবীণ হিসেবে সুনামধারী প্রায় সব শিল্পীর ছবিই কমবেশি স্থান পেয়েছে এ-প্রদর্শনীতে। শিল্পকর্মগুলো সবই সাম্প্রতিক তা বোধহয় বলা যাবে না, তবে নতুন-পুরনো মিলিয়ে খুব সুন্দর আয়োজন। শিল্পীদের মধ্যে আছেন আমিনুল ইসলাম, মুর্তজা বশীর, মোহাম্মদ কিবরিয়া, কাইয়ুম চৌধুরী, মনিরুল ইসলাম, শহীদ কবির, চন্দ্রশেখর দে, কালিদাস কর্মকার, শাহাবুদ্দিন এবং আরো অনেকে। আমিনুল ইসলামের চিত্রকর্মটি বেশ পুরনো। মুর্তজা বশীরের নীল পটভূমির সামনে হঠাৎ মুখ ঘুরিয়ে তাকানো ফুল হাতে রমণী তাঁর অতি সাম্প্রতিককালের চিত্রকর্ম। চন্দ্রশেখর দে-র ছবিটি একেবারেই ভিন্ন ধরনের। ক্যানভাসের পরিবর্তে কাঠের দরজাকে ব্যবহার করেছেন। নীল কারুকার্যময় কাঠের দরজার নিচের অংশে বিন্যস্ত করেছেন তাঁর মূল চিত্রকর্মকে। বিগত কয়েক দশক ধরেই চন্দ্রশেখর দে তাঁর শিল্পকর্মে ক্রমাগত নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন। পঞ্চাশোর্ধ এই শিল্পীর নিরীক্ষার গতি-পরিবর্তন এত দ্রুত যে, প্রতিটি প্রদর্শনীতে তাঁকে নতুন করে আবিষ্কার করতে হয়।

শিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদের শিল্পকর্ম ‘মহাত্মা গান্ধী’ তাঁর পুরনো ঢংয়েই আঁকা। প্যারিস-প্রবাসী অন্য আর এক শিল্পী সাদাত হোসেনের ছবি দেখার সৌভাগ্য হলো বহুদিন পর। লম্বাটেভাবে তিনভাগে বিভক্ত ক্যানভাসে প্রায় সমপরিমাণ জায়গা জুড়ে আছে তিনটি বলিষ্ঠ কর্ম। তাঁর আগেকার শিল্পকর্মের সঙ্গে তুলনা করলে ফর্মের সুপরিমিত ব্যবহার লক্ষণীয়। নাজলী লায়লা মনসুরের চিত্রকর্ম অবগুণ্ঠিতা তিন রমণী খোলা আকাশের নিচে গুটিসুটি দাঁড়িয়ে আছে। পেছনে ব্যান্ডেজ বাঁধা অবস্থায় এক ব্যক্তি। এতদিনকার পরিচিত নাজলী লায়লা মনসুরের চিত্রকর্ম থেকে বেশ ব্যতিক্রমি উপস্থাপনা। যদিও চিত্রকর্মটি প্রায় দুবছর আগে আঁকা। দিলারা বেগম জলির শিল্পকর্মের পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। তাঁর ছবিটি খুব সাম্প্রতিক কালে আঁকা বলা যাবে না।

এছাড়াও আছে শিল্পী আবদুস শাকুর শাহ, ফরিদা জামান, কে. এম. এ. কাইয়ূম, নাসরিন বেগম, জামাল আহমেদ, মোহাম্মদ ইউনুস এবং আরো অনেকের ছবি। শিল্পী আবদুস শাকুর শাহের ময়মনসিংহ গীতিকা ভিত্তিক চিত্রকর্ম ‘ফেস এন্ড পোয়েট্রি’। লোকজ বিষয়ের উপস্থাপনায় চিত্রিত শিল্পীর চিত্রকর্মগুলো বিগত কয়েক বছর ধরে অত্যন্ত প্রশংসিত হলেও বর্তমানে পুনরাবৃত্তির আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। শিল্পী ফরিদা জামানের শিল্পকর্মের ব্যাপারেও একই কথা বলা যায়। আশির দশকের প্রারম্ভ থেকে মাছ ও জালের ছবি আঁকছেন শিল্পী, এখনো জাল থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি।

শিল্পী কে. এম. এ. কাইয়ূমের ছবিতে বিষয় এবং আঙ্গিকগত পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। জামাল আহমেদের পায়রারা ক্রেতাদের আকৃষ্ট করে সহজেই তবে তাঁর ছবিতেও খুব একটা পরিবর্তন চোখে পড়ে না। নাসরিন বেগমের সুচারু ক্যাকটাস ও মোহাম্মদ ইউনুসের চিত্রকর্ম খুব সাম্প্রতিক নয় বলেই মনে হলো।

ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর ভাস্কর্য সবসময়েই নিজস্বতা দাবি করে। কুড়িয়ে আনা গাছ-পালার কাণ্ড ইত্যাদি ব্যবহার করে নির্মিত শিল্পকর্মটি অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন। প্রদর্শনীর ঔজ্জ্বল্য বৃদ্ধি করেছে বেশ কজন বরেণ্য শিল্পীর শিল্পকর্ম। অনেক পুরনো হলেও শিল্পী দেবদাস চক্রবর্তীর একটি শিল্পকর্মও স্থান পেয়েছে প্রদর্শনীতে।

এছাড়া আছে মোহাম্মদ কিবরিয়া, কাইয়ুম চৌধুরীর চিত্রকর্ম। এছাড়াও শিল্পী শফিউদ্দিন আহমেদের একটি স্কেচও স্থান     পেয়েছে। শিল্পী রফিকুন নবীর কাঠখোদাই চিত্র নিসর্গ বেশ বড় আকারের ছবি।

এছাড়াও আরো অনেক শিল্পী যাঁদের চিত্রকর্ম আছে এই প্রদর্শনীতে তাঁরা হলেন, সমরজিৎ রায় চৌধুরী, আবদুর রাজ্জাক, সৈদয় জাহাঙ্গীর, স্বপন চৌধুরী, হাসি চক্রবর্তী, ওয়াকিলুর রহমান, নিসার হোসেন, অলকেশ ঘোষ, শহীদ কবির, আবুল বারক আলভী, আবু তাহের, মনিরুল ইসলাম, কালিদাস কর্মকার, শামসুদ্দোহা, নাইমা হক এবং আরো অনেকে। সব মিলিয়ে প্রদর্শনীটি বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত শিল্পীদের শিল্পকর্ম-সম্পর্কে একটি মোটামুটি ধারণা দিতে সক্ষম হবে। আবারো বলতে চাই যে, প্রদর্শনীর সবগুলো ছবিই শিল্পীদের অতি সাম্প্রতিক কালের শিল্পকর্ম নয়। আর তাই এর ওপর নির্ভর করে তাঁদের শিল্পসৃষ্টির বিবর্তনকে যাচাই না করাটাই সমীচীন। বরং এটুকু বলা যায়, গৌতম চক্রবর্তী তাঁর সংগ্রহে বাংলাদেশের স্বনামধন্য চিত্রশিল্পীদের শিল্পকর্মের সুনিপুণ সমারোহ ঘটিয়েছেন।