আইয়ার মায়েদের তিন বোনের ভেতর মা মেজো ছিল। মা তো মায়ের বড় বোন বা বড় ওবাসানের (মায়ের বোন) মতোই শান্ত-শিষ্ট ছিল বলেই সোবো (মাতামহী) আমায়া তার বড় ও মেজো – দুই মেয়েরই খুব প্রশংসা করতেন। সব চিন্তা ছিল ছোট ওবাসান কিমোরাকে নিয়ে। অথচ তিন মেয়েরই কি না নাম রাখা হয়েছিল অনেক যত্ন করে। কিয়ারা, কাইয়া ও কিমোরা। কিয়ারা অর্থ যে আদৃতা। কাইয়া অর্থ সমুদ্রের ক্ষমাশীলতা। আর ছোট মেয়ের কিমোরা নামের অর্থ কে না জানে – ‘কি’ অর্থ গাছ আর ‘মোরা’ অর্থ অরণ্য। অরণ্যের গাছ। এজন্যই কি ওবাসান কিমোরা গাছপালার ছবি আঁকা কিমোনো পরতে খুব ভালোবাসতেন বলে মা মৃত্যুর আগেও মনে করতো? মা অবশ্য কিমোনো আর পরতো না। খ্রিষ্টান হওয়ার পর থেকে মায়ের কিমোনো সেভাবে পরা হয়নি। খ্রিষ্টান মায়ের মেয়ে হিসেবে আইয়ারও পরা হয়নি। এছাড়া আইয়া অলসও বটে। কিমোনো পরা অনেক সময় আর ধৈর্য্যরে কাজ।
‘কিমোরা কী করে এমন বদলে গেল, তাই ভাবি! কেউ বলতে পারবে না এই আমায়া জীবনে কোনো মন্দ কাজ করেছে। আমি তোমাদের পেটে ধরিনি বটে – তোমাদের মা তো খুব অল্প বয়সেই মরেছিল। কিন্তু কেউ বলতে পারবে না যে, গর্ভধারিণী মায়ের চেয়ে কম যত্ন করেছি তোমাদের। তারপর তোমাদের বাবাও চলে গেলেন! কত অল্প বয়সে বিধবা হয়েছি। তখনো আজকের মতো মেয়েরা অফিস-আদালতে এত কাজ করে না! বয়ে যাইতে চাইলে বয়ে যাওয়াই যেত – শহরের যে-জায়গাটায় আমরা থাকতাম, তার অল্প দূরেই ছিল এক গেইশাবাড়ি। বয়ে যাওয়া যেত না? অন্য কোনো পুরুষের দিকেও তাকাইনি – দ্বিতীয়বার বিয়ে করার কথাও ভাবিনি। নিজের পেটের না হলেও তোমাদের তিন বোনকেই কত কষ্ট করে মানুষ করেছি! সেই আমায়ার ছোট মেয়ে কি না -’
সোবো (মাতামহী) আমায়া থেকে থেকে হা-পিত্যেশ করতেন।
‘তাতে কী হয়েছে মা? তোমার ছোট মেয়েই তো বিখ্যাত। দেশের বড় সব পত্রিকায় তার হাইকু ছাপা হয়!’
‘থাম্ দেখি – পোড়ার হাইকু। কোনো ভদ্রঘরের মেয়ে হাইকু লেখে? আর ওর সব হাইকুতে মন্দির কই – চেরি ফুল কই? ওই এক নিলাজ প্রেমের কথা!’
সোবো আমায়া গজগজ করতো।
আইয়ার বয়স তখন সবে সাত। তার মা বিয়ের কিছুদিন পর বাবা কেন যেন শিন্তো থেকে খ্রিষ্টান হলেও তাদের শিন্তো মাতামহী আমায়া মাঝে মাঝেই তাদের বাসায় আসতেন। আসা মানে কিছুক্ষণ ছোট মেয়ের মুণ্ডুপাত করে, মেজো মেয়ে খ্রিষ্টান হলেও তার সুখের সংসার দেখে সুখী হয়ে এবং ছোট মেয়ের যে উড়নচণ্ডী জীবন হলো – সেটা নিয়ে আরো কিছু গজগজ করে চলে যাওয়া।
‘সোবো (মাতামহী) – আমিও তো ছোট আমাদের তিন বোনের ভেতর’ – ভয় পেয়ে মাঝে মাঝে বলতো আইয়া, ‘আমাকে তুমি ভালোবাসবে না?’
হালকা লজ্জা পেত তখন বুড়ি।
‘না না – তুমি আমার কত লক্ষ্মী মেয়ে! সব ছোট কী আর এক হয়?’
‘কিমোরার আসলে ভাগ্যটা খারাপ’, আইয়ার মা কাইয়া বোনের পক্ষ নিয়ে মৃদু প্রতিবাদ জানাতেন, ‘ওর প্রথম বিয়েতে বরটা ছিল দুনিয়ার খরুচে। মদের পেছনে টাকা ওড়াতে ওড়াতে একদিন বিস্তর ধারদেনা করে চিরদিনের মতো সেই যে নিরুদ্দেশ হলো, আর কোনোদিন ফেরেনি। তোমরা আগের যুগের মেয়েরা – মা – তোমরা তো অত লেখাপড়া শিখতে পারোনি। বাবার ব্যবসা কিয়ারাই দেখতো, যেহেতু বাড়ির বড় মেয়ে। ওর বরও ভালোমানুষ ছিল। আমাদের ব্যবসা দেখে-শুনে রাখতো -’
‘সেজন্যই তো কিয়ারাকে অত অল্প বয়সে বিয়ে দিয়েছিলাম। আমি একা মুখ্যুসুখ্যু মেয়েমানুষ। তোমাদের বাবার ব্যবসা দেখেশুনে আর পারছিলাম না।’
‘হ্যাঁ – সেই কিয়ারাও হুট করে মরে গেল। তোমার কথাতেই বড় বোনের বরকে কিমোরার বিয়ে করতে হয়েছে – এটাও তো অস্বীকার করা যাবে না মা! কিয়ারার বরের সঙ্গে দ্বিতীয় বিয়েতে ওর বোঝাপড়া হয়নি। প্রথম স্বামীর সঙ্গে একমাত্র মেয়েকে তোমার কথাতেই শ্বশুরবাড়িতে পাঠিয়ে, বড় বোন আর তার বরের বাচ্চাদের মানুষ করতে হলো জীবনভর। এখন পঞ্চাশ বছর বয়সে টোকিও শহরে গিয়ে ও যদি নিজের মতো একটা ব্যবসা শুরু করে আর কবিতা লেখে, তাতে ওকে খুব কী দোষ দেওয়ার আছে?’ মা বলতো ভীরু গলায়।
সোবো এতে দ্বিগুণ রেগে যেত, ‘তোমাদের আজকালকের মেয়েদের আর বাহানার শেষ নাই। আমাদের সময়ে কী হতো? বর মদ্যপ হোক, ধারদেনা করুক, পাগল হোক আর নিরুদ্দেশ হোক, সংসার মানে সংসার। আর তোমাদের বড় বোন মরে যাওয়ার পর তার বাচ্চাগুলোকে কিমোরা ওবাসান (খালা/ মাসি/ মায়ের বোন) বলে না মানুষ করে তুললো! অন্য ঘরের মেয়ে হলে কোথায় ভেসে যেত বাচ্চাগুলো! আমরা কী আমেরিকার মেয়ে নাকি? জাপানে ভালো মেয়েদের এমন তো সংসারের প্রতি
দায়িত্ব-কর্তব্য করতেই হয়। যত কষ্ট হোক, তাই বলে এখন পঞ্চাশ বছরে এসে, সব ফেলে টোকিও শহরে গিয়ে একা থাকা শুরু করবে? নিজেই একটা ব্যবসা খুলবে?’ এটুকু বলে সোবো চোখ কোনা করে মা কাইয়া বা আইয়া ও তার দুই বোনের গায়ের পশ্চিমা কেতার পোশাকের দিকে তাকাতেন।
‘মা – না হয় দু/ দুটো বিয়ের চক্করে পড়ে শেষ জীবনে এসে ও কিছু অস্থির কাজ করেছে। তাই বলে সারা দিন ওকে গালমন্দ করাই কী আমাদের ঠিক?’ ভীরু গলায় মা কাইয়া প্রতিবাদ করেই যেত।
‘আমি এখন মরে যেতে পারলে বাঁচি। টোকিও শহরে গিয়ে’ – সোবো তখন গলার স্বর খাদে নামিয়ে আনতেন, ‘শুনছি কার সঙ্গে নাকি প্রেম হয়েছে! সে নাকি আবার বিবাহিত। ছিঃ ছিঃ, ভালো লাগে না আমার। আমার সঙ্গে যখন তোমাদের বাবার বিয়ে হয়, তাঁর ততদিনে বয়স হয়েছে। আমি তোমাদের নিজের সন্তানের মতোই মানুষ করেছি! কিমোরার এই লজ্জা আমারও লজ্জা! যাই – কাল বছর পয়লার চেরি অনুষ্ঠান আছে। তোমরা তো আবার খ্রিষ্টান হয়েছো – কিমোনো পরো না! মন্দিরের সামনে চেরি ফুল ফোটা দেখতে যাও না। কিন্তু আমার তো বুড়ো হাড়েও এসব করতে হবে।’
‘এসো মা – খ্রিষ্টানদের আসলেই চেরি ফুলের অনুষ্ঠান দেখতে যাওয়া বা কিমোনা পরা মানা। এছাড়া -’
’এছাড়া?’
‘কিমোনো পরা খুব ঝকমারি কাজও তো মা! সেই ওবি নামের একটি উত্তরীয় দিয়ে পিঠের পেছনে কোশিহিমো বা কোমর বন্ধনি বাঁধা, পিঠে আবার মুসুবি নামে গিঁট দিয়ে আর একটি বাঁধনী দাও। এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে জোরি বা গেটা জুতা এবং তাবি মোজা পরো – আজকালকার দিনে এসব পরতেই ভারি কষ্ট হয়।’
‘শোন মেয়ের কথা একবার! হাজার বছর ধরে আগে যে জাপানে শুধু মেয়েরা নয়, পুরুষেরাও কিমোনো পরতো – তাদের কষ্ট হতো না? এই কিমোনো পরেই সামুরাইরা
যুদ্ধ করেছে, সুমো কুস্তিগীরেরা আজো কুস্তি করে, গেইশাদের নাচ-গান হোক আর কাবুকি নাটকের অভিনেতারা – তারা তো পুরুষ হয়েও মেয়েদের কিমোনো পরে, মেয়েদের মেকাপ নিয়েই কাজ করে! আর আজ দুদিনের আধুনিক নারী হয়ে কি না তোমরা কিমোনো ছেড়ে মার্কিনি পোশাক পরছো সবাই?’
‘আমি তো বাচ্চাদের স্কুলে পড়াই, মা! সকালে উঠে চাকরিতে যাই, তার আগে সবার দেখাশোনা – এত কাজ করে আর পারি না!’
মা কৈফিয়ত দিতেন। তবে আইয়ার বড় বোন আবার কিমোনো ভালোবাসতো। খ্রিষ্টানরা জাপানে অত কিমোনো না পরলে কলেজে যে-কোনো ছুতোনাতায় – ঘুড়ি ওড়ানোর অনুষ্ঠান হোক কি চা-পানের অনুষ্ঠান হোক, সে অবিবাহিত মেয়েদের ‘ফুরিসোদে’ কিমোনো পরে বের হতেই হবে!
‘নাহ্, আমার এই নাতনিটার তবু কিমোনোর প্রতি একটু টান আছে। আরে জাপানি মেয়েদের কিমোনো না পরলে ভালো লাগে?’
‘কিন্তু তুমি বলো মা, সকালবেলা যখন সবার জন্য দু’বেলার খাবার বানিয়ে স্কুলে যাওয়ার জন্য ছুটি, তখন কিমোনোর ওই লম্বা আস্তিন দুই হাতে – যাই বলো মা – ও বড়জোর বিয়ের আগে হবু বর কী তার মা-বাবার সামনে চা বানাতে লম্বা আস্তিনের কিমোনো পরে, চুল উঁচু করে বেঁধে আর চা বানিয়ে পরিবেশন করার জন্যই ভালো। এই বাচ্চা-কাচ্চা, চাকরি নিয়ে কিমোনো পরা খুব কঠিন।’
সোবো আমায়ার চোখের কোণে তখন জল দেখা দিত, ‘আমার খারাপ মেয়েটা অবশ্য কিমোনো পরে। সে কিমোনো ভালোবাসে।’
‘মা কী কিমোনো নিয়ে কথা বলছেন নাকি?’ বাবা অফিস থেকে ফিরে কখনো কখনো শাশুড়ি-স্ত্রী-কন্যাদের সঙ্গে খাবার টেবিলের আলোচনায় যোগ দিতেন, ‘সবই সময়ের হাওয়া, বুঝলেন মা! আমার বাবা বলতেন যে, সম্রাট মেইজির সময়ে পুলিশ বাহিনীর একটি ফরমানের পর রেল কর্মকর্তা আর স্কুলশিক্ষকদের জন্য পশ্চিমা শার্ট-প্যান্ট পরার নিয়ম হয়। মোটামুটি ১৮৭০ সাল থেকেই ছেলেদের স্কুলে ওই শার্ট-প্যান্ট – আমি তো কিমোনো পরার কথা মনেই করতে পারি না!’
‘সেটা ঠিক। আর আরো বড় ক্ষতি করে দিয়েছে ওই ১৯২৩ সালের ভূমিকম্পের পর থেকে!’
‘কান্তো ভূমিকম্পের কথা বলছেন?’
’হ্যাঁ, ভূমিকম্পের পর কী যে ক্ষয়ক্ষতি হলো! আর ডাকাতরা ঘোড়ায় চড়ে মানুষের ওই অসহায় অবস্থার ভেতর যখন ডাকাতি করতে আসতো, তখন লম্বা কিমোনো আর কাঠের জুতা পায়ে মানুষ দৌড়ে ঠিকমতো পালাতেও পারতো না। এভাবেই এই মার্কিনি শার্ট-প্যান্ট-স্কার্টেরই এখন জয়জয়কার!’
‘এছাড়া কিমোনো বানাতে অনেক খরচও তো পড়ে, মা! সেটা দেখবেন না?’
‘হ্যাঁ’ – সোবো আমায়া দীর্ঘশ্বাস ছাড়তেন, ‘এখন তবে উঠি? এই আমরা, বুড়ো-বুড়িরা যত দিন বেঁচে আছি, তখনো কিছু মানুষ কিমোনো পরবে, তারপর সব হারিয়ে যাবে!’
‘না না, আপনার বিখ্যাত মেয়ে – কবি মেয়ে কিন্তু কিমোনো পরে! পত্রিকায় তার সব ছবিই তো কিমোনো পরে ছাপা হয় দেখি!’
বাবার গলায় ঠাট্টা। ছোট ওবাসান কিমোরাকে বাবা পছন্দ করতেন না একদমই। ভ্রষ্টা নারী মনে করতেন।
‘ওর কথা আর বলো না। পুরো পরিবারের মুখে চুন-কালি দিয়েছে’ – এসব বলতে বলতে বিড়বিড় করে উঠে দাঁড়াতেন সোবো আমায়া, ‘এই হালের মেয়েরা কিচ্ছু মানতে চায় না। আমার তো বয়সে কত বরের সঙ্গে বিয়ে হলো – তাঁর সঙ্গে যখন বিয়ে হলো, তখন তাঁর আগের ঘরের তিন মেয়ে। তাঁর আর সন্তান হলো না। আমি তো সব মেনে – কোনো দিন মনেও হয়নি এই মেয়েরা অন্য কারো। আর কিমোরা কি না বড় বোনের বাচ্চাদের মানুষ করতে হয়েছে বলে এত জেদ?’
‘মা – তোমরা সব চির দিন মেনেছো বলেই সবাইকে মানতে হবে?’
‘আচ্ছা – আচ্ছা, এসব প্রসঙ্গ থাক। চলুন, মা আপনাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসি!’
বাবা বলতেন, ‘সোবো আমায়া অবশ্য কিছুতেই আইয়াদের বাসায় থাকেনি, বা থেকে যায়নি। একই শহরে এবং পাশের পাড়ায় বাসা হলেও বুড়ি একাই থেকেছে – মৃত্যু পর্যন্ত।’
দুই
এবার শীতে ঢাকা যাবে আইয়া। কুড়ি বছর বয়সে প্রথম একটি ‘ইয়াং স্টুডেন্টস এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে’ ঢাকা যাওয়া হয় আইয়ার। আর আজ আইয়ার বয়স তেপান্ন। নিঃসন্তান হলেও স্বামী আছে। দুজনে মিলেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে নিঃসন্তান থাকার। বিয়ে করলোই সে প্রায় পঁয়তাল্লিশে এসে। বাংলাদেশ ভালো লাগে আইয়ার। জাইকার হয়ে তিন বছর সে ঢাকায় চাকরিও করেছে। কোথাও অদ্ভুত একটি মায়া আছে দেশটির। পথে-ঘাটে এত মানুষ, রাস্তাঘাট টোকিও কী কিয়োটোর মতো ঝকঝকে-তকতকে নয়, অনেক গরিব মানুষও আছে। তবু কেমন এক অদ্ভুত প্রাণশক্তিতে গমগম করে দেশটা। খানিকটা বাংলা ভাষাটার মতোই। হ্যাঁ, বাংলা ভালো জানে ও বলতে পারে আইয়া। বাঙালি খাবার থেকে শুরু করে বাঙালি মেয়েদের শাড়ি – সব ভালো লাগে আইয়ার। বাঙালি মেয়েদের কাছ থেকে বহু কসরত করে শাড়ি পরা শিখেছে সে। দিনের পর দিন ইউটিউব দেখে শাড়ি পরা চর্চা করেছে। যদিও এখন বাংলাদেশেই অনেক মেয়ে শাড়ি পরতে পারে না। জাপানে যেমন অনেক মেয়ে কিমোনো পরতে পারে না। আইয়া নিজেই পারে না। কিমোনো এখন আর কে পরে? সোবো বা মাতামহী-পিতামহীদের প্রজন্মে সবাই পরতো। মা বা ওবাসানদের (খালা/ মাসি) সময়েই দেখতে দেখতে কিমোনোর চল কমে এলো। আইয়াদের প্রজন্মে বলতে গেলে ওই বছরে একবার চেরি ফেস্টিভ্যাল বা কারো বিয়ে কী মৃত্যুর পর শেষকৃত্যের আয়োজনে কিমোনো পরা হয়। আজকালকার মেয়েরা কিমোনো পরতে পারেই না। তাতে আইয়ার মা-বাবা জন্মসূত্রে শিন্তো হলেও পরে কী ভেবে খ্রিষ্টান হয়ে গেছে। ফলে কিমোনো পরে চেরি অনুষ্ঠানে ওই শিন্তো বা বৌদ্ধ মন্দিরের সামনে তার আর যাওয়া হয় না। আইয়ার বান্ধবীরা যারা শিন্তো বা বৌদ্ধ, তারা বছরে এক-আধবার কিমোনো পরলেও নিজেরা পরতে পারে না। পার্লারে গিয়ে পরে। বিউটিশিয়ানরা পরিয়ে দেয়। কিমোনো পরা খুব জটিল। আগের যুগে মেয়েরা কীভাবে যে পারতো!
‘তুমি জাপানি হয়েও কিমোনো পরতে পারো না?’ গত শীতে ঢাকায় তার এক পরিচিত বাঙালি ভদ্রমহিলার বাসায় বেড়াতে গেলে ভদ্রমহিলার ছোট বোন খুব অবাক হয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করে, ‘কিন্তু তুমি আমাদের বাসায় শাড়ি পরে এসেছো! শাড়ি তো আমিই পরতে পারি না। পরতে হলে পার্লারে গিয়ে পরি।’
শুনে হেসে ফেলেছিল আইয়া, ‘আর কিমোনো পরা শাড়ি পরার চেয়েও অনেক কঠিন। তাই এখন আমাদের জেনারেশনের মেয়েরা বছরে এক-আধবার শাড়ি পরতে হলে পার্লারে গিয়ে পরে।’
‘বলে কী? আমি তো জানতাম এখন আমাদের জেনারেশনে বাঙালি মেয়েরা অনেকেই শাড়ি পরতে পারে না বলে পার্লারে গিয়ে পরে। তা তোমরা এখন আর কিমোনো পরতে পারো না কেন?’
‘যে কারণে তোমরা অনেকে শাড়ি পরতে পারছো না। মেয়েদের ঘরের বাইরে বের হওয়া, কাজের চাপ, ব্যস্ততা, বিশ্বায়ন -’
‘হুম।’
অথচ ওবাসান কিমোরার বেশ কিছু হাইকুই আছে কিমোনো নিয়ে। যে ওবাসান ‘ভ্রষ্টা’ নারী বলে বিখ্যাত কবি হয়েও তার সঙ্গে আর তার পরিবারের কারো আর কোনো যোগাযোগ ছিল না? ওবাসান কিমোরা কিন্তু কিমোনো পরতে ভালোবাসতেন – যেমন আইয়ার মা কাইয়াও ভালোবাসতেন।
কিমোনোর অনেক গহনে
লুকিয়ে রেখেছি তোমার প্রেমপত্র
সূর্যস্নানরতা
কার প্রেমপত্র লুকিয়ে রাখতেন ওবাসান কিমোরা? সারা জাপান যার নাম জানে, অথচ তারই আপন বোনের সন্তান হয়ে যে পরিচয় আজো আইকাকে লুকিয়ে রাখতে হয়? মায়ের কিন্তু দুঃখ ছিল ছোট বোনকে নিয়ে।
‘সারা জীবন আমরা ওকে দোষই দিলাম। কিন্তু আমার বর তো ওর বরের মতো অনেক দেনা করে চিরদিনের মতো নিরুদ্দেশ হয়ে যায়নি। বর হারিয়ে যাওয়ার পরই হুট করে সবার বড় বোন মরে গেলে, বাসার কথায় তার বরকে বিয়ে করতে হয়নি। নিজের মেয়েকে শ্বশুরবাড়িতে পাঠিয়ে মৃত বোন আর বোনের স্বামীর সন্তানদের মানুষ করতে হয়নি। ক্রমাগত সহ্য করতে করতে ওর ক্লান্ত মন অন্য কাউকে ভালোবেসেছিল – সেই লোকটিও ওকে প্রতারণা করেছিল। বলেনি যে সে বিবাহিত, সন্তানের পিতা। পরে যখন জানতে পারলো, তখন জানলেও প্রেম আর ভেঙে দেয়নি। দুটো বিয়ের কোনো বিয়েতেই যেহেতু শান্তি পায়নি, বিয়ের প্রতিই বোধহয় ওর আর ভরসা ছিল না।’ খ্রিষ্টান হয়ে যাওয়ার পর চেরি ফুল দেখতে শিন্তো মন্দিরে আর না গেলেও মা বাসায় এই পর্বের সময় চালের গুঁড়োর পিঠেটা ঠিকই বানাতো। পিঠা বানাতে গিয়ে মায়ের যেন মাঝে মাঝে হাত আর চলতো না। ঘুরেফিরে ছোট বোনের কথাই বলতো।
‘সবাই আমরা ওকেই দোষী করি। ওর মন্দই বলি। অথচ জীবনে এক তিল সুখ পেল না। দুটো বিয়েতে এত কষ্টের পর সমাজ-সংসার সব ভুলে যাকে ভালোবাসলো –
ঘর-সংসারের প্রত্যাশা না করেই ভালোবাসলো, সে বিবাহিত বলেই তার সঙ্গে ওর নিয়মিত দেখা করারও অধিকার ছিল না। মাঝে মাঝে একটু দেখা করতে পেলেও কত খুশি হতো! এরই ভেতর একদিন ওর দ্বিতীয় বর, যে আমার দুই বোনের স্বামী – ওকে খুব কড়া কথা বললে কী যে হলো ওর – গায়ের কয়েকটি জামা নিয়ে চিরদিনের মতো চলে গেল টোকিও। তার আগে পর্যন্ত তো আমাদের সঙ্গে এই শহরেই থাকতো।’
‘কী কথায় চিরদিনের মতো ওবাসান সংসার ছেড়ে টোকিও চলে গেছিলেন, মা?’
‘আর বলিস না – দোষের ভেতর ও ওর আগের ঘরের বা নিজের গর্ভের মেয়ে একটি নাটকে অভিনয় করলে, থিয়েটারে সেই অভিনয় দেখতে গেছিল। এতেই ওর দ্বিতীয় স্বামী রেগে গেল। বললো, আগের ঘরের সন্তানের কথা ভুলে শুধু তার সেবাই করতে হবে। অথচ, বাবার রেখে যাওয়া হোটেলের ব্যবসা থেকে কিয়ারার বাচ্চাগুলোও ও-ই দেখেছে। বাবার হোটেলেও আগুন লেগে পুড়ে গেছিল। সেটাও তিল তিল করে তোমাদের ওবাসান কিমোরাই আবার দাঁড় করিয়েছিল। ব্যবসার জন্য খাটতো কিমোরা আর টাকা-পয়সা ওড়াতো তার দ্বিতীয় স্বামী বা তোমার বড় ওবাসান – ওবাসান কিয়ারার স্বামী। জনমভর এত দুঃখ সইবার পরে টোকিও গিয়ে নিজের সঞ্চয় থেকে ও যদি একটি ব্যবসা দাঁড় করায়, নিজের মতো কবিতা লিখে বাঁচতে চায়, তাতে কী দোষ?’
‘কিন্তু আমরা কেন ওবাসান কিমোরার পরিচয় দেই না, মা?’
‘তোমার সোবোর (মাতামহী) নিষেধ। তোমাদের বাবাও পছন্দ করেন না। তাই, অথচ কিমোরা, ওর কবিতায় তো অনুতাপও আছে। ঘরের চৌকাঠের বাইরে পা রাখা আর নারীর জন্য সমাজের বেঁধে দেওয়া নীতির বাইরে পা রাখার জন্য ওর কী দুঃখ কম ছিল?’
‘তবে কেন আমরা ওবাসান কিমোরার সঙ্গে দেখা করি না, মা? অথচ সারা জাপান তার কবিতা পড়ে।’
‘ও এখন একটা রেস্তোরাঁ চালায়। নিজের হাতে বিশিষ্ট অতিথিদের গ্লাসে মদ ঢেলে দেয়।’
‘জানি মা, আর সেটা নিয়েই তো ওবাসান কিমোরার সেই বিখ্যাত হাইকু –
একে অন্যকে বিয়ার ঢেলে দিই,
এই পুরুষেরা যাদের সঙ্গে
কোনদিন আমার প্রেম হবে না।’
‘ছোটবেলা থেকে দুঃখ পেতে পেতে শেষ জীবনে এসে সমাজের সঙ্গে ও বিদ্রোহ করলো ঠিকই, কিন্তু সেজন্য অনুতাপ কী কম করেছে?’
‘জানি মা, ওবাসান কিমোরার ওই হাইকুটা?
জোনাকি জ্বলা রাত
নারীর সতী ধর্ম
থেকে আমি পা সরিয়ে ফেলি।’
‘আর বলিস না – আর বলিস না – কী ভাগ্য ওর!’ মা ছটফট করতেন, ‘পৃথিবীটা মেয়েদের জন্য বড় নিষ্ঠুর রে – আইয়া! পুরুষ মানুষ শুঁড়িখানায় যাবে – গেইশাবাড়িতে পড়ে থাকবে – এন্তার টাকা খরচ করবে মদ আর গেইশার পেছনে। তবু সমাজে তাদের এতটুকু দুর্নাম নেই। দিনের আলোয় সবাই গৃহস্থ, সজ্জন। আর মেয়েদের? যেন গাছের পাতায় জমা শরতের শিশির। একটু টোকাতেই সব ধুলায় লুটাবে।’
‘মাগো, এত যদি মন খারাপ করো, চলো না – আমরা একবার গিয়ে ওবাসান কিমোরার সঙ্গে দেখা করি?’
‘না, সে নিজেই মানা করে দেখা করতে যেতে। সমাজের সব কলঙ্ক আর দুর্নাম নিয়ে ও একা মরবে। কিন্তু আমাদের কাউকে এক তিল ভোগাবে না।’
‘সত্যি মা, ওবাসান কিমোরার জীবন এত কষ্টের কেন?’
‘আমার চির দুঃখী বোন – আমি তো সুখের সংসার পেয়েছি। সেই সংসারেই ব্যস্ত থেকেছি। আমার ছোট হয়ে আমার আগে মারা গেল। মৃত্যুর সময়েও দেখতে যেতে পারিনি। সারা জীবন তোদের বাবা আমাকে কাজ করতে দেয়নি। অথচ, আমি বুড়ি হয়ে যাওয়ার পরেও পারলে প্রতি মাসে একটা নতুন ড্রেস কিনে দেয়। আর ও?
দু-দুটো বিয়েই ভেঙে গেল। কিন্তু টোকিও গিয়ে নিজের ব্যবসা দাঁড় করিয়ে – ও না খুব কিমোনো ভালোবাসতো! আমার যেমন কিমোনো পরতে গেলে সারাজীবনই হাঁপিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হতো, ও কিমোনো সংগ্রহ করতে ভালোবাসতো। নিজের রোজগারে কেনা কিমোনো নিয়ে ওর কবিতা এখন কত নারীবাদীদের চক্রে পড়া হয়!’
‘জানি মা –
আমার শ্রমের ফল
এই চেরি ফোটা দেখা
কিমোনো।’
‘কোথাও এতটুকু সুখ পেল না – না কাগজে-কলমে যে দুজন স্বামী হয়েছিল তাদের কাছে, না সমাজ-সংসার সব অগ্রাহ্য করে শেষ যাকে হৃদয় দিয়ে ভালোবেসেছিল তার কাছেও।’
হাসপাতালের সাদা চাদরের উপর মায়ের ফ্যাকাশে, নিথর হাতে কেমোথেরাপির স্যালাইনের নল ঝুলছে। আর মায়ের দুচোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছিল।
‘আমার বোকা বোনটি লিখেছিল -’
‘জানি মা –
এপ্রিল ফুল
চুড়ো করে চুল বেঁধেছি
এবং কোথাও যাবার নেই।’
‘ওর প্রেমিকের সংসার ছিল। রোজ তো দেখা করতে পারত না। মরার পর লোকটির সমাধি হলো তার কাগজ-কলমের বউয়ের সঙ্গে। সেটা নিয়েও দুঃখ ছিল।’
‘আমাদের হাইকু লেখা ওবাসানের সঙ্গে শেষে আমরা আর কোনো সম্পর্ক রাখিনি। খ্রিষ্টান হয়ে গিয়ে আমরা আর চেরি ফেস্টিভ্যালে যাই না – কিমোনো পরি না। কিন্তু ওবাসান কিমোরা চেরি আর কিমোনো দুটোই খুব ভালোবাসতেন, তাই না মা?’
‘হ্যাঁ, ওর প্রথম স্বামী চলে যাওয়ার পর – না না, দ্বিতীয় বিয়েটায় ডিভোর্সের পর ও লিখেছিল
ড্রেসিং টেবিলের উপর
আমার আঙুল থেকে খুলে রাখা আংটি
চেরি ফুল ঝরছে বৃষ্টির মতো।
চেরি ফুল আঁকা কিমোনো পরতে তোদের ওবাসান কিমোরা কী যে ভালোবাসতো!’
[গল্পটি বিখ্যাত জাপানি নারী কবি মাসাজো সুজুকির জীবনের ছায়াবলম্বনে লেখা]


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.