রান্নাঘরে সাইড করে রাখা টেবিলটার একটা চেয়ার টেনে বসল ইঞ্জিনিয়ার নিদিমোরু মলুয়া। ঘরের মেঝেতে সবে দুপুরের অলস রোদ ঝাঁজ মজিয়ে কোমল স্নিগ্ধতা বিকেলের কোলে ছড়িয়ে দিয়েছে। দুপুরে অতিথিসেবার পর রাতের ডিনারে নতুন কী খাওয়ানো যায় তা নিয়ে ভাবছিল।
পৃথক রান্না করে খাওয়ার কারণে ছাত্রজীবনে থেকেই শখের পাচক হিসেবে বন্ধু ও পরিচিতমহলে খানিকটা সুনাম কুড়িয়েছে। খেতে বসে ফুলকির বর মকবুল ঠাট্টা করে বলে বসলো, আগ্রার তাজমহলের মুমতাজ স্বয়ং আমাদের টেবিলে। কাবুলি পোলাওকে তো মোতি পোলাও নামকরণ করা উচিত। কেননা সফেদ চালের মধ্যে গাঢ় কফিরঙা গোলাকার কিমার পিণ্ডটা মুখে পড়েই মেল্ট হয়ে গেল, যেন অমৃত খেলাম। মুখে স্বাদ নিয়ে এই রান্নার গোপন সূত্র জানতে গিয়ে অবাক হতে হলো ত্রিচাকে। সে অবাক চোখে নিদিমোরুর দিকে তাকিয়ে বৃদ্ধাঙ্গুলি আর শাহাদত আঙুলের অগ্রভাগ এক করে ইশারায় দেখাল – যার অর্থ ‘লা জওয়াব’। রান্নাঘরের বাসনকোসন ধোয়ার জায়গা লাগোয়া ছোট টব থেকে তুলে এনেছিল লেবু-পুদিনা। শেষপাতে গোলাকার রেকাবিতে ফুলেল টিস্যু পেপারের ওপর চাপা দেওয়া চৌকো গ্লাসে রকসল্ট, গোলমরিচসমেত পুদিনা, তেঁতুল, আদা ও লেবুর পানীয় রাখল সামসু।
দুপুরের পাতে মাটন মুমতাজ আর কোপ্তা পোলাও পরিবেশন করে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল অতিথিদের। আন্তর্জাতিক কুইজিন থেকে সরাৎ করে নয়, ধীরেসুস্থে এসেছে বাঙালির পাতে নতুন যেসব খাবার, তেমনই দক্ষিণ ও উত্তর কোরিয়ার প্রধান ঐতিহ্যবাহী খাবার ‘কিমচি’। চীনেও এ-খাবারের প্রচলন দেখা যায়। প্রতিদিনের খাবারে যে-কোনো সবজির কিমচি এই দু-দেশের মানুষের দৈনিক খাদ্যতালিকায় থাকবেই। নানা কারণে বিশ্বে বেশ পরিচিত হয়ে উঠছে এটি। নিদিমোরু এসব খাবার নিজেই তৈরি করে বইপত্র ঘেঁটে। এ-বিষয়ে ভীষণ খুঁতখুঁতে, ঠিকঠাক উপকরণ না হলে রান্নায় জুত পায় না বলে তাকে নিয়ে ঠাট্টাও চলে প্রচুর। কিমচি বানাতে নানা সবজি ব্যবহার করলেও কিছুতেই বাদ যাবে না গোচুগারু; কোরিয়ানদের ব্যবহৃত মরিচের গুঁড়া, মাছের সস, রসুনসহ নানা কিছু। নিদিমোরু দেশি উপকরণ দিয়ে এটি বানিয়ে রাখে। এটি খেলে হজমশক্তি বৃদ্ধি পায়।
একটা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় নিজ সম্প্রদায়ের হয়ে কাজ করছে শুনে আনন্দে বুক কেঁপে উঠেছিল। সেই সূত্রে মকবুলের সঙ্গে পরিচয়-পরিণয়। স্কুলপড়ুয়া ফুলকির যা সামাজিক উন্নয়ন তার সব গড়ে উঠেছিল সে-সূত্রেই।
লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়ে চাকরিতে এসে অভাবনীয় সচ্ছলতার মুখ দেখতেই নিজের স্বপ্নপূরণে মনস্থির করলে ফুলকির প্রেম প্রত্যাখ্যান যেন তার গালে চপেটাঘাত করেছিল। নতুন স্বপ্নচোখে নিদিমোরুর এক আকাশ তারা ভূপতিত হয়েছিল। সেই যে সম্প্রদায়বিমুখ – পরবর্তীকালে জন্মদাতা-জন্মদাত্রীর সঙ্গে জনমের দূরত্ব বেড়েছিল, স্বজনহীন মানুষের ভিড়ে নিজেই যেন নিজের প্রতিচ্ছায়া – এক নিঃসঙ্গ বাজ।
সপ্রতিভ ফুলকিকে দেখে তার পুরনো স্মৃতি মনে পড়ল। দীর্ঘদিনের পুষে রাখা অক্ষম রাগ উগড়ে দিলে দৃঢ় কণ্ঠে বলতে পেরেছিল, একটি দেশের মানুষের মধ্যে জাতি-ধর্ম-শিক্ষার ভেদাভেদ থাকলে সে-জাতি এগোতে পারে না সমানতালে। উচ্চকিত হয়ে উঠলেও কিছু বলতে সাহস পায়নি ফুলকি।
মুণ্ডা সম্প্রদায়ে বেড়ে ওঠা নিদিমোরু শিশুকাল থেকে তাদের জীবনধারণের পদ্ধতিতেই নিজেকে উজ্জীবিত রাখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেছে সবসময়। মেধাবী হিসেবে পরিচিত ছিল বলে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে এসে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেও সে নিজের সম্প্রদায়কে ধারণ করে। এখন মুণ্ডা জনগোষ্ঠীর ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া শিখছে, নিজ যোগ্যতায় চাকরি করছে। কিন্তু যখন নিদিমোরু দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে অদম্য ইচ্ছেশক্তিতে ভর করে সামনের দিকে এগোনোর লক্ষ্য স্থির করেছিল, সে-সময়
এ-সম্প্রদায়ের দু-একজন কলেজে পড়ার দুঃসাহস রেখেছিল। প্রাইমারি স্কুলের লেখাপড়ার বাইরে গিয়ে, সে স্বপ্ন দেখতে পেয়েছিল শিক্ষকের অনুপ্রেরণায়। ভারতীয় আর্যভাষা থেকেও প্রাচীন মুণ্ডা ভাষা কালের বিবর্তনে হারিয়ে গিয়েছিল। মুণ্ডাদের নিজস্ব ভাষা বলতে চর্চা ছিল দৈনন্দিন জীবনধারায়। উল্টোদিকে অপ্রতুল স্কুলব্যবস্থায় বাংলা ভাষায় লেখাপড়া হতো। নিজস্ব ভাষায় লেখাপড়া করার বিধান না থাকায় ভয়ে-আতঙ্কে অনেক মুণ্ডা দম্পতি সন্তানকে বিদ্যালয়ে পাঠাত না। সে-সময় দুঃসহ আর অনিশ্চয়তার জীবনে চড়াই-উতরাই পার হয়ে আকাশকুসুম স্বপ্নকে সফল করেছিল নিদিমোরু।
ক্লান্ত বোধ করলেও এমন অপ্রত্যাশিত অতিথিদের কদরে খামতি রাখতে চায় না বলে আগের রাত থেকেই নিদিমোরু খাতিরযত্নের তালিকা করেছিল। দীর্ঘ সেই তালিকা। দেশ-বিদেশের কুইজিনের ওপর নিদির দখল রয়েছে, তেমনি প্রায় হারিয়ে যাওয়া দেশীয় রান্না নিয়ে গবেষণা ও রান্না করার শখও ছিল।
ফুলকি সরলচোখে নিদিমোরুর দিকে তাকিয়ে কিছু দেখতে পেল না। নিষ্প্রভ তার চাহনি। মনে পড়ল, নিজেদের ঝুপরিঘরে প্রথম যেদিন ফুলকিকে দুপুরে খাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিল, তখন এই দুটি পদ রান্না করেছিল নিদিমোরু।
ফুলকি ওয়াক থু-থু করে ভয়ে আর আতঙ্কে চারদিকে তাকাতে তাকাতে বলেছিল, ‘তু জাত গিলে লিলিরে মলুয়া, হামাগের লাইরে তু – তুকে সমাজছাড়া করবে রে।’
মলুয়ার পূর্বপুরুষরা বন্যপ্রাণীর বাঘের গর্জন ও বিষাক্ত সাপের তোলা ফণাকে তোয়াক্কা না করে বৈরী পরিবেশে প্রতিকূলতার মাঝে সুন্দরবনের গভীর জঙ্গল থেকে খাবার আহরণ করেছে। টিকে থেকেছে বংশপরম্পরায়। তার রক্তে বয়ে চলা তেজ উসকে উঠলেও দ্রুত দমন করে নিদিমোরুর ঘৃণামিশ্রিত চোখের ফুলকিকে দেখে করুণা হয়েছিল, নিজের জন্যও।
সে গভীর পর্যবেক্ষণ করে দেখেছে, কোয়ার্টারে আসার পর থেকে তুলনামূলক ছটফট করা চঞ্চল ফুলকিটা কেমন যেন মিইয়ে গেছে। ওরা দুজন একসঙ্গে বেড়ে উঠেছে খুলনার কয়রায়। মাছ ধরা, সুন্দরবনে যাওয়া এসব। জীবনে বড়দের সঙ্গে তাদের কঠিন যুদ্ধ করে টিকে থাকা। কখনো এক হাঁড়ি পানিভাত পাতে পড়তো একবেলা, অন্য বেলা উপোস। সেই দিনগুলো নিদিমোরুকে আর্দ্র করে তোলে। তার মা-বাবা আর তাদের জনগোষ্ঠীর জীবনযাপনের লড়াই কত প্রতিকূলতার মধ্যে অতিবাহিত হয়েছিল। তার মায়ের বেজার মুখ চোখে পড়েনি কখনোই নিদিমোরুর। হাড়ভাঙা খাটুনি ছিল ঘরে-বাইরে। রোদেপোড়া বয়সের আগে রোগশোকে ভোগা মায়ের উজ্জ্বল চেহারাটাই ভাসে তার চোখে। অন্যদের সঙ্গে ক্ষেতে কাজ করার সময় তাদের সমবেত কণ্ঠের কিছু গানের সুর এমন ভালো খাবার রান্নার সময় তাকে আবিষ্ট করে রাখে। ‘ধান রুপিলা, জোন খাটিলা, মানুষ করিলা ছোয়াল পোতা … হা ভগবান জাগা-জমি, সব মোর ভিটে হায় লে লিলা।’
গরু-শুয়োর চড়াতে গিয়ে চড়া দুপুরে নিদিমোরু ভাবত – এই-ই তাদের আনন্দের আর আশার জীবন! এই-ই পৃথিবী! সময়ের পরিক্রমায় যত তাদের জীবনমানের উন্নয়ন হয়েছে; পৃথিবীর বিশালতায় নিজেকে ততই অপাঙ্ক্তেয় আর জনারণ্যের সাধারণ একজন মনে করেছে।
ছোট্ট টিপাইয়ের থেকে কলম-রাইটিং প্যাড নিয়ে চেখে দেখা খাবারগুলোর রন্ধনপ্রণালির বর্ণনা শুনতে ড্রয়িংরুমের এক সোফায় দুই পা মুড়ে বেশ আয়েশ করে বসল ফুলকির ননদ ত্রিচা।
নিদিমোরু বলেছিল, মাটন মুমতাজ প্রাচীন একটি পদ। এর সঙ্গে মাটন কোরমার সাদৃশ্য থাকলেও স্বাদ ভিন্ন। এটি খেতে প্রথম পর্যায়ে পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ এবং পরিমাণ অনুযায়ী কাঠবাদাম সিদ্ধ করতে হবে মিনিট দশেক। তারপর তা মিক্সিতে পিষে নেওয়া; গুঁড়ো করে নিতে হবে ধনিয়া, জিরা, গোলমরিচ, আদা-রসুন বাটা, টকদই, টেবিল চামচ ঘি, মৌরি এসব। মূল কথা হলো, সব ধরনের রান্নায় মোটামুটি একই রকম উপকরণ থাকে, কৌশলটা হলো রাঁধুনির, যিনি রাঁধেন তার যত্নে মনোযোগ আর আন্তরিকতায় যে-কোনো রান্নাই ভিন্ন ভিন্ন মাত্রা পায়।
গত আটচল্লিশ ঘণ্টা ধরে নিদিমোরু মলুয়ার বরাদ্দকৃত কোয়ার্টারে রয়েছে। তার ছেলেবেলার প্রেম, তার স্বামী, ননদাই আর ননদের সঙ্গে নির্দ্বিধায় কোয়ার্টারের সময়গুলো বাটোয়ারা করে নিয়েছে। মলুয়া আর ফুলকির ভালো লাগার বিষয়টি ছাইচাপা আগুনের ফুলকি হয়ে উঠেছে নিদিমোরুর কাছে। তবে পরিমিতিবোধ ছাপিয়ে নয়।
কোয়ার্টারের সামনের দিককার চত্বরে নিদিমোরুকে দেখে থমকে গিয়েছিল ফুলকি। তার হৃৎপিণ্ডটা অকারণেই জোরে শব্দ করে লাফাচ্ছিল। মনে হলো, পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই বুঝি সেটা টের পেয়েছে।
অসময়ে বন্যার কারণে বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে যাচ্ছিল। বিগত বছরগুলোর রেকর্ড ব্রেক করে তুমুল বৃষ্টি আর বানের পানিতে রাস্তাঘাট, ফসলি জমি, গ্রামের পর গ্রাম ভেসে গেছে। সøুইসগেট ও এর পাশের জমির চারপাশে পানি আছড়ে পড়ছিল। এখানে এমনটা বহুকাল দেখেনি গ্রামবাসী।
কোয়ার্টারের চারপাশটা এমনিতেই জংলা ও নিচু ভূমি হওয়ায় অল্প বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা হয়। অ্যাসিস্ট্যান্ট সামসুকে বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করার কথা বলে নিদিমোরু বসার ঘরের সোফায় মাথা এলিয়ে অভ্যাসবশত চোখ বন্ধ করেছে সবে, অমনি সামসুর উত্তেজিত কণ্ঠস্বরে চমকে দাঁড়িয়ে জানালা দিয়ে দেখতে পেল, চারজন আগন্তুক নিয়ে সামসু পাইক দাঁড়িয়ে। কেতাদুরস্ত দুজন অসম বয়সী পুরুষ, ফুল-পাতার ছাপানো বেজরঙা সালোয়ার-কামিজের বছর বিশেকের তরুণী আর একজন খয়েরিরঙা কোড়া জমিনের ওপর মেরুন পাড় হাতেবোনা তাঁতশালার তৈরি করা শাড়ি পরিহিতা। কালো মৈরাং, সাদা বন্দেজের ব্লাউজ শাড়ির সঙ্গে ম্যাচিং। হাতে রেশমি চুড়ি একগাছা করে। চমকে উঠলেও স্থির কপালে ভাঁজ, সামসু জানে ঊর্ধ্বতনের সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হয়। তা নিয়ে রীতিমতো ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে। তবু সৌজন্য কিছুর ঘাটতি রয়ে গেছে।
বিরক্ত ও গম্ভীর গলায় জানতে চায় নিদিমোরু, ‘কী হয়েছে সামসু?’
– এনাদের গাড়ি রোড অ্যাক্সিডেন্টে চুরমার। শহর তো দূরে, তাই কোথাও রাতটা থাকতে পারবে – এমন জায়গা খুঁজছিলেন। কোয়ার্টার দেখে উনারা আলাপ করতে এলেন।
সামসুর কিছু নেগেটিভ বিষয়ের মধ্যে এই অস্থির হয়ে কথা বলাটাও বিরক্তিকর। নিদিমোরুর কানে তার স্বর খনখনে হয়ে বাজে।
বিনয়ের সঙ্গে খুব সংক্ষিপ্ত করে সালাম দিয়ে মকবুল জানতে চায়, ‘এখানে একটা রাতের জন্য কি কোনো উপায় হতে পারে? গাড়ি কাল বিকেল নাগাদ ঠিক হয়ে যাবে, আমাদের ড্রাইভার তেমনটাই জানিয়েছেন।’
তাদের উদ্দেশ্যের কথা জানাল।
নিদিমোরু কিছু না ভেবেই নিজের বেডরুমটা তাদের জন্য ঠিক করে ফেলল মনে মনে।
কুচিয়ামোড়া গ্রামটি এমনিতেই সুনসান, সকাল হলেই পাখিদের কলরবে মুখর থাকে। নিজেদের কাজ নিয়ে তারা ব্যস্ত থাকে। এবার লাগাতার কয়েকদিন বন্যা হওয়ায় এর প্রভাব পড়েছে এ-অঞ্চলেও। ভিড়ভাট্টা ভালো লাগে না নিদিমোরুর। একা নিরিবিলি থাকতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে সে। স্মৃতিতে উঠে এলো, ফুলকির সেই বাঙালি আটপৌরে সাজ। কপালে কালচে খয়েরি মখমলি টিপ আর ঠোঁটে লিপবাম। সেই বছর পাঁচেক আগের স্টাইল-স্টেটমেন্ট আগের মতো। জানা গেল, বৃষ্টির কারণে ভেজা সামনের সড়কে একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে বাস আর বিএমডব্লিউ প্রাইভেট কারের সংঘর্ষে। হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও দুপক্ষের সবাই কমবেশি আঘাত পেয়েছেন। বরাতজোরে বেঁচে গেছে সব – এমনটাই বলছিল স্থানীয়রা, তবে তাদের বিএমডব্লিউটা এমনভাবে ভচকেছে যে, ওটা রাতে কেন, দিনের বেলায়ও চালানো দুষ্কর। গাড়িটা সামনের দিকে এমনভাবে ধাক্কা খেয়েছে যে, তার কপালের ডানদিকের খানিকটা কেটেছে উইন্ড গ্লাসের ভাঙা কাচ ছিটকে এসে। হাতের মুঠোয় ধরা টিস্যুটা চেপে কোনোমতে গাড়ি থেকে বেরুতে পেরেছিল। বাকিরা যে যার মতো উপস্থিত পথচারীদের সহযোগিতায় বের হতে পেরেছিল।
কোয়ার্টারের বারান্দায় বসে চারপাশের গ্রামের ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সবুজের সমারোহ বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হওয়ার দৃশ্য দেখা যায়। সে-দৃশ্য শহরে বেড়ে ওঠা বিদেশি দাতা সংস্থার বড় কর্মকর্তা ফুলকির বর মকবুলকে কৌতূহলী করে তুলল।
নিদিমোরু মনে মনে ভাবছিল, এভাবেই কেন মকবুলের সঙ্গে দেখাটা হলো? ছেড়ে যাওয়ার পর নিদিমোরু সবসময়ই মনে মনে চেয়েছে, এ-জীবনের কোথাও যেন তাদের মুখোমুখি হতে না হয়।
ফুলকি ক্লান্ত। বিছানা লাগোয়া জানালা দিয়ে সকাল থেকে অবিরাম ঝিরঝির ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি দেখছিল আর ভাবছিল, বর অফিসিয়াল ট্যুরে যাবে শুনে বায়না ধরেছিল বলেই এসেছিল নতুন এ-জায়গায়।
নিদিমোরু চায়ের ধূমায়িত কাপ নিয়ে বসেছে বারান্দায় একটা চেয়ারে। আকাশের দিকে তাকিয়ে মনটানা মানুষের কাছ থেকে যে জীবনটাকে সরিয়ে আনতে চেয়েছিল, তার জন্য মন খারাপ হলো নিদিমোরুর। যে-কয়েকটা কারণে শহর আর আত্মীয়-পরিজন ছেড়ে এখানে এলো – তা থেকে কি বাঁচল!
সন্ধ্যার কিছু আগে সবাই এক চায়ের টেবিলে বসলে ময়দা, ইস্ট, জলপাই তেল, ড্রাই ফুড আর ঘি দিয়ে প্রস্তুত গরমাগরম ব্রেড ও লেমনমিন্ট চা এলো।
ত্রিচা বলে উঠল, কোনো কোনো সময়ে কিছু বিষয় শাপেবর হয়ে আসে। গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট না হলে এখানে উঠতে হতো না, আর এমন করে একটা গ্রামীণ পটভূমি দেখা ও এমন আতিথেয়তা জুটত না।
মকবুল বললেন, ‘ঠিকই বলেছো – অবসর তো মেলেই না। এই সুযোগে একটু জিরিয়ে নেওয়া হলো, মন আর শরীরকে চাঙা করার সুযোগ পেলাম।’
কথাগুলো শুনছিল ফুলকি, বলল – ‘আমার তো দম বন্ধ হয়ে আসছিল, অস্থির লাগছে, সবকিছু ফেলে দৌড়ে পালাতে ইচ্ছে হচ্ছিল।’
কথার ধরন দেখে ঘরের সবাই হো-হো করে হেসে উঠল।
ফুলকি কাঁপা গলায় বলল, ‘বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমাদের এক সহপাঠী ছিল, বাতাসের সঙ্গেও অভিমান করত; কিছুতেই স্থির থাকতে পারত না; তাই ওর নাম দিয়েছিলাম বিভ্রান্ত। তোমাদের আচরণে তাই মনে হচ্ছে আমার। পরে অবশ্য শান্ত হয়ে গিয়েছিল ছেলেটি, পদবিটা আর ফিরিয়ে নেওয়া হয়নি।’ স্থানটা মুখে না আনলেও প্রেক্ষাপট ভিন্ন – যাকে নিয়ে উদ্ধৃত করল – সেই নিদিমোরু শুধু মুখে কিছু না বলে আড়চোখে চেয়ে থাকল।
চেয়ারের কাছে এগিয়ে ফেসিয়াল টিস্যুতে লেখা একটা চিরকুট গছিয়ে চোখ ইশারায় তা দেখতে বলেছিল ফুলকি – ‘কথা বলা যাবে?’ সামসুর চোখ বাঁচিয়ে পাল্টা লেখা হলো নিজের মোবাইল নম্বর, টেক্সট করার অনুরোধ।
বিকেলের দিকে কোয়ার্টারের চারদিক বন্যার পানিতে টইটম্বুর হয়ে ডুবে ছিল। ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতেই সবাই দেখল পথটাকে আলাদা করে দূর থেকে চেনা যাচ্ছে না। একটা বড়সড় সরকারি অফিস দেখে ফুলকি চেঁচিয়ে বলল, ‘দেখো দেখো দেশের পানিকোঠা বা ডি মার ফোর্ট। দেখতে কিন্তু বেশ লাগছে।’
– বাহ্ নামটি তো বেশ! সত্যিই কি কোনো জায়গার নাম এটা?
ত্রিচার প্রশ্নের জবাব এলো নিদিমোরুর কাছ থেকে, ‘পানিকোঠা – পাশের দেশ ভারতের আরব সাগরে এর অবস্থান; ছোট্ট একটা দ্বীপভূমি। পড়ন্ত বেলায় যখন আলো-অন্ধকারের খেলা চলে তখন শান্ত, নিরিবিলি সৌন্দর্যের আধার। ইতিহাস বলছে, পর্তুগিজরা এখানে এই ফোর্ট ডি মার বা পানিকোঠায় জাহাজ নোঙর করত। এই স্থাপত্যকলা দেখতে নানা দেশের দর্শনার্থী ভিড় করেন। তবে আমাদের দেশে এর চেয়ে সুন্দর ও নান্দনিক এমন একটা স্থাপত্য নিদর্শন রয়েছে, তা কি কেউ চেনেন?’
সবাই প্রায় সমস্বরে বলে উঠল – ‘কোথায়?’
– বাংলাদেশে এমন অনেক ঐতিহাসিক নিদর্শন আছে। ঘর হইতে দুই পা ফেলিয়া … আমরা এসব দেখি না। আরে নিজের দেশটাকে মন দিয়ে প্রাণ দিয়ে দেখা আর হৃদয়ঙ্গম করা জরুরি। ইদ্রাকপুর দুর্গ – মুন্সীগঞ্জ জেলা শহরের ঠিক মধ্যখানে মোঘল স্থাপত্যকলা। বাংলার সুবেদার মীর জুমলার নির্দেশে ১৬৬০ খ্রিষ্টাব্দে পর্তুগিজ ও মগ জলদস্যুদের আক্রমণ এবং ঢাকাকে রক্ষা করতে জল-দুর্গ নির্মাণ করা হয়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অনেক উঁচুতে বিশাল দেয়ালঘেরা। দেখে আসতে পারেন এই পুরাকীর্তি, যা ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে।
নিদিমোরু ভাবছিল, পৃথিবীটা কত বদলে গেছে। কত আধুনিকতার নিরিখে এসব ঐতিহাসিক স্থানের খুব একটা পরিবর্তন হয়নি।
নিদিমোরুর মনটা খারাপ। বিগত শোককে এভাবে ভালোলাগায় রূপান্তরিত হতে যদি দিত হয়তোবা আজকের অনুভব শিরদাঁড়া খাড়া করে একাকিত্ব আর নির্জনতার মাঝে নিজের দিকে প্রশ্ন তুলত না।
কুচিয়ামোড়া আন্ডারপাস পার হয়ে হাঁটতে হাঁটতে এসব কথাই ভাবছিল নিদিমোরু। কত বছর পর ফুলকিকে দেখল! একেই কি বলে টুয়ার্ডস লাইফ! কোটি কোটি লিটার জলের ধারা ঝরে যে-জীবন, তাতে চোখ বুলিয়ে ভবিষ্যতের দিকে তাকায়!
গর্জনের মতো শোনাচ্ছিল কুচিয়ামোড়া আন্ডারপাসের নিচ দিয়ে বয়ে যাওয়া জলরাশি। মন তার সায় দিচ্ছিল না কিছু দ্বিধা ও আশঙ্কায়, তবু এগুলো ফুলেফেঁপে ওঠা পানির অস্থির বয়ে চলার শব্দ টের পাচ্ছিল। অনতিদূর কারো অস্ফুট কথা শোনা যাচ্ছে। চমকে কেউ একজন চেঁচিয়ে কিছু বলছিল। ‘স্যার স্যার’ ডেকে কেউ একজন এগোতে থাকে – কাছেই কোথাও থেকে, স্পষ্ট আর জোরালো। কাছাকাছি এলে বুঝতে পারে সামসু।
‘অ্যানি আপডেট? কোনো কিছুর ব্যবস্থা হলো?’ বিরক্তি নিয়ে জানতে চায় নিদিমোরু।
– জি স্যার, খবর এনেছি, সাড়ে দুইয়ে বাইশ হয়্যা গেছে স্যার … সড়কের পানি সরতে আরো দুদিন সময় লাগতে পারে।
‘ড্যাম’ বলে এগোয় নিদিমোরু। কপালে তার চিন্তার রেখা ফুটে ওঠে।
সামসু বলে, ‘একটা নৌকা আনলে প্রায় তিন কিলো নৌকা পথে রেলস্টেশনতক মেহমানদের পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।’
– দেখছি, তুমি যাও, কথা হবে।
সামসু এগোতেই কথা শুরু করে। নিদিমোরুই শুরু করে, ঢাকা ফিরে যাওয়ার সমস্যা আর সংকটের কথা বলে চুপ সে।
প্রসঙ্গ প্লাটাতে ফুলকি বলে, ‘তোমার মনে আছে বৃষ্টির দিনে তুমি দৌড়ে খইচালা এনে কই মাছ ধরতে বানের পানিতে? আবার গামছা ধরে দুজনে ছোট ছোট মাছ ধরতাম। সেদিন আমাদের খুশির দিন থাকত। ঘরের সবাই পেটভরে মাছ খেতাম!’
নিদিমোরুর মনে পড়ে বহুকাল তারা এমন করে মুখোমুখি বসে দু-দণ্ড কথা বলা বা শোনার পরিবেশ পায়নি। হয়তো কুচিয়ামোড়ায় হুট করে দেখা না হলে এত কথার ফুলঝাঁপা থেকে বেরোত না। কাউল নেক ব্লাউজে, নুডল স্ট্রিপের শিয়ার ফেব্রিকের লাল শাড়িটায় অদ্ভুত লাগছিল ফুলকিকে।
কিছু একটা সুবাস বাতাসে ভর করে চলছিল। নাকে ম-ম গন্ধ পেতেই নিদিমোরু বললো, ‘কেতকী ফুটেছে ফুলকি, ওই পাশের জলাশয়ের পারে; সাদা কেতকী তোমার প্রিয় ফুল। তোমার কি জানা আছে, সাদা কেতকী পুরুষ, স্ত্রী কেতকীর রং সোনালি।’ এরপর নিদিমোরু মনে মনে বলে – ফুলকি আমি তোমার কেতকী হতে চেয়েছিলাম। ফুলকি আমি তোমার মরুময় জীবনে সঙ্গী হয়ে থাকতে পারতাম। হায় জাত্যাভিমান! ফুলকি সমগোত্রীয় কাউকে জীবনে চায়নি কেন? সেটা তারচেয়ে কে বেশি আর জানে …।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.