আহমদ রফিক
খবরটা ভুল ছিল না। আমার এক নিকটজন জানাল, ‘হাসনাতভাই নেই।’ দারুণ দুঃসংবাদ একাধিক অঙ্গনের মানুষের জন্যে। ভাবতে পারছি না, আমার একান্ত প্রিয়জন হাসনাত নেই। মাত্র ৭৫ বছরে অকালপ্রয়াণ। আজকালকার গড় আয়ুসীমা বৃদ্ধির সময় এ বিপত্তি! এত চটজলদি বিদায় নেওয়া!
এই তো কদিন আগে লেখা নিয়ে কথা – তড়িঘড়ি বক্তব্য : ‘না, চাপ নেবেন না। আমি প্রকাশিত লেখাটাই ছাপব কালি ও কলমে।’ স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়েই আনিসুজ্জামানের মৃত্যুতে একটি কলাম লিখি, কারো অনুরোধের অপেক্ষা না করে, যেমন লিখি কামাল লোহানী সম্পর্কে, দায়িত্বের টানে। হাসনাতের জন্যে শেষ লেখা বিদ্যাসাগরকে নিয়ে। তখন কি ভাবতে পেরেছি, কদিন পর তাকে নিয়ে লেখার মতো অঘটন ঘটবে?
স্বভাবে নম্র, বিনয়ী, স্বল্পভাষী আর মেধা, মননশীলতা ও অনুসন্ধিৎসার মতো একাধিক গুণের আধার হাসনাতকে বাইরে থেকে দেখে তার মনোগহনের দীপ্তির পরিচয় পাওয়া সহজ ছিল না। পাঞ্জাবি-পাজামা বা প্যান্ট পরিহিত সাদামাটা চলাচলের অভিব্যক্তি মুখে, তাকে একান্তে না জানলে বোঝা কঠিন একাধিক ধারায় তার বিচিত্রবর্ণের শ্রমনিষ্ঠ, আদর্শবাদী চরিত্রটি।
বারকয়েক বাংলা একাডেমির মাঠে দাঁড়িয়ে তাকে দেখেছি, অনতিদূরে নিঃশব্দে একা হেঁটে যাচ্ছে, মনে হচ্ছে – কিছু একটা ভাবছে, কিঞ্চিৎ অন্যমনস্ক আপন ভাবনায় – মনে হয় সাদামাটা এক নাগরিক। কে ভাববে এ-মানুষটিই সেই আবুল হাসনাত – দৈনিক সংবাদের অসাধারণ সাহিত্য সম্পাদক – যার লেখা সংগ্রহ ও সম্পাদনার এবং নিজ রচনার গুণে দৈনিক সংবাদের খ্যাতি ও স্থিতি।
মাঝে মাঝে অবাক হয়ে ভেবেছি, সংবাদের পরবর্তী বিতিকিচ্ছি অবস্থায় কীভাবে দীর্ঘ দুই যুগ সেখানে টিকে ছিল হাসনাত! কোনোদিন শুনিনি তার মুখে সংবাদ-সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য। এক পর্যায়ে কাউকে কাউকে বলতে শুনেছি, পাঠক সংবাদ কেনে এর সাহিত্যপাতা ও বিশেষ সংখ্যার জন্যে। একজন সাহিত্য সম্পাদকের জন্য কথাকটি যে কত বড় অভিনন্দনের টিপ, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। জানি না, হাসনাত নিজে এ-সম্পর্কে কতটা সচেতন ছিল। বহুমাত্রিক কর্মী হাসনাতকে দেখে তা বোঝা যেত না।
হাসনাতের জীবন ও জীবিকা পেশাগত দিক থেকে বরাবর আবর্তিত হয়েছে সংবাদ-সাহিত্য ও সাহিত্য পত্রিকার সুদক্ষ সম্পাদনা ঘিরে, অন্য সমদর্শী বন্ধুদের থেকে কিছুটা ভিন্ন ধারায়। মনে হয় এ-পথেই তার মেধা ও মননশীলতা তৃপ্তি খুঁজে পেতে চেয়েছে, হয়তোবা পেয়েছেও। তার জীবনকথা তেমনই সাক্ষ্য দেয়। সেই সঙ্গে সাহিত্য-সংস্কৃতি ও রাজনীতির ধারা তাকে সমভাবে আকর্ষণ ও সক্রিয় করেছে, যা পর্যায়ক্রমে বিবৃত। সেগুলোও মোটেই কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।
তবু বিস্ময়কর যে, আমাদের বহুমাত্রিক মননশীল সমাজে আবুল হাসনাতের অবস্থান ও প্রধান পরিচয় হয়ে থাকল মেধাবী সাহিত্য সম্পাদকরূপে – দৈনিক সংবাদ থেকে মাসিক সাহিত্য পত্রিকা কালি ও কলমের। সেই সঙ্গে কদাচিৎ উচ্চারিত একাধিক পত্রিকা সম্পাদনার কথা যেমন গণসাহিত্য কিংবা শিল্প ও শিল্পী।
দুই
পঞ্চাশের দশকে পূর্ববঙ্গের ঢাকায় মাতৃভাষা বাংলাকে উপলক্ষ করে জাতি-জাতীয়তা এবং সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক প্রগতিবাদের যে-উদ্ভাস ঘটে তা ক্রমে দ্বিবিধ ধারায় বিকশিত হয় জাতীয়তাবাদ ও বামপন্থী প্রগতিশীলতায়। সে-সময়ের অভাবিত ঘটনা প্রতিকূল পরিবেশে বড়সড় একগুচ্ছ তরুণ ও যুবার আবির্ভাব সেক্যুলার প্রগতিশীল ভূমিকা নিয়ে। এরা সমকালীন সংস্কৃতি তো বটেই, স্থানীয় রাজনীতিকেও প্রভাবিত করেছিল।
আফ্রো-এশীয় বিশ্বে তখন আধুনিক প্রগতিবাদী রাজনীতি ও সাহিত্য-সাংস্কৃতির উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ। পূর্ববঙ্গের পূর্বোক্ত বলয় এর বাইরে ছিল না। আর সেই ধারাবাহিকতায় গত ষাটের দশকে, বিশেষভাবে এর শেষার্ধেও তুলনীয় মেধাবী ও মননশীল কয়েক গুচ্ছ আদর্শবাদী তরুণ ও যুবার আবির্ভাব ও সক্রিয় বিকাশ ঘটেছিল প্রগতিশীল বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে। এদের কর্মশীলতা ছিল পঞ্চাশের অগ্রজদের তুলনায় ব্যাপক ও বৈশ্বিক ধারায় সংশ্লিষ্ট।
এদের মধ্যে আমার চেনা হাসনাতসহ মফিদুল, সারোয়ার, ওয়াজেদ প্রমুখ এই বলয়ের উল্লেখযোগ্য সদস্য। এরা এবং ভিন্ন ধারার সদস্যরা ষাটের দশকের শেষার্ধের, বিশেষভাবে ঊনসত্তর থেকে একাত্তরের সাহসী যাত্রী। বিশ্বে তখন প্রগতিশীল মুক্তিসংগ্রামের জোয়ার। আর বিশেষভাবে সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার। আফ্রো-এশিয়ার এই নবজাগরণ পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব কিছুটা বিস্ময়ের দৃষ্টিতে লক্ষ করেছে। সংগ্রামীদের লক্ষ্য ছিল যতটা নব্য জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক মুক্তি ও নতুন সমাজ, তার চেয়ে বেশি প্রগতিশীল সাহিত্য-সাংস্কৃতিক চর্চা ও বিশ্বশান্তির আদর্শ। উল্লিখিত পূর্ব ও নব্য বাংলাদেশ এই বৃহৎ ও মহৎ সংস্কৃতিযজ্ঞের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হতে পেরেছিল সক্রিয়ভাবে। আমাদের আলোচ্য আবুল হাসনাত স্থানীয়ভাবে এই ধারায় বিশেষ সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিল, যা কচিৎ উল্লিখিত।
সদ্য স্বাধীন দেশে নবসৃষ্টির যে উৎসাহ-উদ্দীপনা তার মূল উৎস ছিল তরুণ ও যুব সমাজ। সাহিত্যপত্রের ক্ষেত্রে তার একটি নমুনা ১৯৭৩-এ হাসনাতের সম্পাদনায় গণসাহিত্য প্রকাশ, সঙ্গী মফিদুল হক প্রমুখ বন্ধু। এর লক্ষ্য, বিশ্বের প্রগতিসাহিত্যের ধারায় স্বদেশি সমাজ-সাহিত্য-সংস্কৃতির বলিষ্ঠ প্রগতিশীল রূপায়ণ। এ-চেষ্টা চলেছে এক দশক জুড়ে। শেষার্ধে প্রধান কাণ্ডারী মফিদুল হক। সঙ্গে অন্যরা। কিন্তু লক্ষ্য বা স্বপ্ন অর্জিত হয়নি। কাজেই পরিণামে হতাশা, দিকভ্রষ্ট হওয়ার আশঙ্কা।
আর কালি ও কলম? রঙে বা শোভন চেহারাই শুধু নয়, এর অন্তর্গত রচনাদি ও প্রকাশশৈলী এবং অঙ্গসৌষ্ঠবের গুণে প্রশংসিত এ-পত্রিকাটির নেপথ্য কারিগর দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সম্পাদক আবুল হাসনাত। বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের প্রকাশনা এই পত্রিকাটির আমৃত্যু সম্পাদনায় আবুল হাসনাত।
ব্যক্তি ও কর্মী হাসনাত সম্পর্কে আমার সীমিত জ্ঞানে এই রচনা, যদিও প্রীতি ও শ্রদ্ধার একটি পারস্পরিক সম্পর্ক বরাবর বজায় ছিল। বেশ কিছুদিন আগে আমার একটি বই তাকে উৎসর্গ করার কথা জানানোর পর হাসনাতের স্বভাবসুলভ প্রতিক্রিয়া অনাবেগ স্বীকৃতিতে। আমি তাকে চিনি ও জানি বলে কিছু মনে করিনি। কিন্তু স্বল্পভাষী, কর্মমগ্ন, বিনয়নম্র হাসনাতের ফোনালাপ-বিলাসে অনাগ্রহ অনেককে মনঃক্ষুণ্ন করেছে। হাসনাতের এই নেতিবাচক আচরণ সম্পর্কে তাদের কাউকে কাউকে বলেছি : মানুষ কি তার সহজাত স্বভাব-বৈশিষ্ট্য সহজে বদলাতে পারে? হাসনাত হয়তো পারেনি। এ-আচরণ অশ্রদ্ধার নয়। আমিও এ-ব্যাপারে ব্যতিক্রম নই। অথচ কী বিনম্র শ্রদ্ধা প্রকাশে হাসনাত সর্বদা আমার কাছ থেকে লেখা নিয়েছে। আমার বড় দুঃখ পূর্বোক্ত বইটি আমি ওর হাতে তুলে দিতে পারিনি। প্রসঙ্গত একটি কথা, আমার এ-লেখাটি আমার চেনাজানা হাসনাতবিষয়ক সীমিত তথ্যের স্মৃতিচারণ, তার পেশা, কর্ম, আদর্শ, সৃজনশীলতা সম্পর্কে বিশদ বিশ্লেষণাত্মক প্রবন্ধ নয়।
তার সঙ্গে আমার পরিচয় দীর্ঘদিনের, দিন-তারিখ-সন মনে নেই। যতদূর মনে পড়ে, সংবাদে লেখা উপলক্ষে, গণসাহিত্য পত্রিকায় লেখার সূত্রে – এ-উপলক্ষেই সম্ভবত অনুজপ্রতিম মফিদুল হকের সঙ্গেও পরিচয় যা এখনো অটুট, নানা উপলক্ষে সজীব। সেই থেকে রবীন্দ্রসংগীতবিষয়ক বা অনুষ্ঠানে বিশেষ অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানানোর মূল ব্যক্তিটি হাসনাত, কখনো মফিদুল। গত বছরও একই ঘটনা। শেষ পর্যন্ত হাসনাতের দাবি সম্মেলনের জন্য একটি লিখিত শুভেচ্ছা বার্তা। আমার অসুস্থতার কারণে এসব ঝামেলা। শুভেচ্ছা বাণীটি হাসনাতেরই পড়া সম্মেলন উদ্বোধনে আর আমাকে তা পরে জানাতে ভোলেনি হাসনাত, সেই সঙ্গে লেখাটি তার ভালো লাগার কথা।
এমন মানুষকে কি তার বিশেষ আচরণের জন্য ভুল কখনো বোঝা যায়? না, আমি তাকে ভুল বুঝিনি, কখনো তার কোনো অনুরোধ, অসুবিধার মধ্যেও প্রত্যাখ্যান করিনি, করতে পারিনি। হাসনাতের আন্তরিকতা ও মেধা-মননশীলতা, তার আদর্শ-নিষ্ঠা ও কর্মদক্ষতা কখনো ভুলবার নয়। এতটা শ্রম, এতটা সময় একাধিক দিকে দেওয়া কেমন করে তার পক্ষে সম্ভব হতো ভেবে অবাক হয়েছি ও এখনো তা ভাবি।
তার অকালপ্রয়াণে সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সম্পাদনা জগতে যে অপূরণীয় ক্ষতি হলো তা বলাই বাহুল্য – সেইসঙ্গে প্রথাসিদ্ধ ভাষ্যে বলতে হয় শূন্যতা। প্রকৃতি ও বিজ্ঞানের নিয়মে কোনো শূন্যস্থান অপূর্ণ থাকে না। শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি অঙ্গন সম্পর্কেও একই নিয়ম, একই কথা খাটে। তবু আমার কথা – সেই শূন্যতা কি সেই চরিত্রে পূর্ণ হয় পরবর্তীর উপস্থিতিতে?
পশ্চিমা বিশ্বের কথা বাদ দিয়ে আমাদের নিজস্ব ভুবনের কথাই যদি ধরি, তাহলে বলা যায়, দীর্ঘ সময় পরিসরে এ যাবৎ কি জন্ম নিয়েছেন কোনো বিদ্যাসাগর – বা রবীন্দ্রনাথ, তাদের সমকালীন কৃতিত্বের স্থানটিও পরিমাপে পূরণ করতে? না, জন্মায়নি। তুলনাটা খুব বড় হয়ে গেল। কিন্তু এটা উদাহরণের নিয়ম রক্ষার নীতিগত দিকটি বোঝাতে বলা। হাসনাতের সবকিছু মিলিয়ে তার স্থানটি হয়তো সেই বৈশিষ্ট্যে পূরণ হবে না, এটাই আসলে আমার বক্তব্য, আর সেটা বোঝাতেই মহারথীদের উদাহরণ টানা।
তিন
আবুল হাসনাতের কর্মজীবন বহুধাবিভক্ত – জাগতিক ও নান্দনিক, সৃজনশীল ও বস্তুগত – বহু দিক নিয়ে। এক বাক্যে সাংবাদিক-সম্পাদক, কবি, প্রাবন্ধিক, চিত্র-সমালোচক, দক্ষ অনুষ্ঠান সংগঠক, শিল্পকলার সংগ্রাহক এবং রাজনৈতিক ভুবনের নেতৃস্থানীয় কর্মী। কাব্য, সংগীত, শিল্পকলা তার অতি প্রিয় বিষয়। এক হাতে কীভাবে এত দিক সামাল দিয়েছেন হাসনাত, তা বিস্ময়ের বিষয়। তার সাদামাটা চলাফেরা দেখে বাইরে থেকে তা বোঝা কঠিন।
আমার একটি ধারণা ভুল প্রতিপন্ন করা তথ্যটি হলো তার জন্ম পুরনো ঢাকায় ১৯৪৫ সালে। বর্তমান প্রযুক্তির উচ্চমাত্রার যুগে তার এই শেষ যাত্রা অকালপ্রয়াণ বলে মনে হয়। হাসনাতের সাংবাদিক-সম্পাদক সত্তা এবং সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক সত্তার পরিচয়টাই আমি বিশেষভাবে জানি। আর এ দুই দিকেই তার পরিচিতি ও খ্যাতি সর্বাধিক।
বলতে দ্বিধা নেই, তার কাব্যসত্তার সৃজনশীলতা সম্পর্কে আমার খুব একটা জানা ছিল না। এর বড় কারণ হয়তো হাসনাতের প্রচারবিমুখ, অন্তর্মুখী প্রকৃতি এবং আমার সীমিত বলয়ে বিচরণ। এখন দেখছি একদিকে তার তারুণ্যের-যৌবনের রোমান্টিকতা (যা বাঙালি সন্তানে বহুল দৃষ্ট), অন্যদিকে সমাজসচেতন প্রগতিবাদী প্রতিবাদী চেতনা – এই দুইয়ে মিলে তার কাব্যের সৃজনশীলতা।
বিশেষ সূত্র সহায়তায় দেখছি, তার কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা খুব একটা কম নয়। জ্যোৎস্না ও দুর্বিপাক, কোনো একদিন ভুবনভাঙায়, ভুবনভাঙার মেঘ ও নধর কালো বেড়াল, নির্বাচিত কবিতা ইত্যাদি। প্রবন্ধগ্রন্থের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সতীনাথ মানিক, রবিশঙ্কর ও অন্যান্য এবং জয়নুল কামরুল সফিউদ্দীন ও অন্যান্য, প্রত্যয়ী স্মৃতি ও অন্যান্য। পাশাপাশি তাৎপর্যপূর্ণ একটি আত্মজীবনীমূলক রচনা হারানো সিঁড়ির চাবির খোঁজে। শিরোনামগুলো খুব চমকপ্রদ ও আকর্ষণীয়।
এছাড়া শিশু ও কিশোরদের জন্য লিখেছে বিস্তর নানামাত্রিক বই, দেশি-বিদেশি খ্যাতিমানদের নিয়ে বিস্তর গল্পগ্রন্থ। এমনকি টুকু ও সমুদ্রের গল্প গ্রন্থের জন্য পেয়েছে ‘অগ্রণী ব্যাংক শিশু সাহিত্য পুরস্কার’। সম্পাদনা করেছে চিত্রকলাবিষয়ক ত্রৈমাসিক পত্রিকা শিল্প ও শিল্পী।
সাহিত্য সৃষ্টির এই যে শ্রমসাধ্য চালচিত্র – এর পরিমাণ কি খুব কম, বিশেষ করে কিছু রচনার উৎকর্ষ ও মূল্যমান? সে তুলনায় কতটুকু নান্দনিক স্বীকৃতি ও পুরস্কার পেয়েছে আবুল হাসনাত তার মেধা ও যোগ্যতার পরিমাপে? সান্ত্বনাসূচক বাংলা একাডেমির সম্মানসূচক ফেলোশিপের পরিবর্তে বাংলা একাডেমির নিয়মতান্ত্রিক পুরস্কার কি তার প্রাপ্য ছিল না (সেটাও ফেলোশিপতুল্য)?
কিন্তু তার সৃজনশীল ও মননশীল কর্মতৎপরতা এবং আনুষঙ্গিক শৈল্পিক ভূমিকার জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার প্রাপ্য ছিল বলে মনে করি। এ যাবৎ বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্তদের তালিকার নিরপেক্ষ যাচাই এ-দাবির সত্যতা প্রমাণ করবে। প্রসঙ্গটি অপ্রিয় হলেও অস্বীকারের জো নেই। কারণ হাসনাতের সৃজনশীলতা গুণমানে এবং সার্বিক শৈল্পিক তৎপরতা পরিমাপে উৎকর্ষের রেখা স্পর্শ করেছে বলে আমার বিশ্বাস।
বলতে হয়, এদিক থেকে বাংলা একাডেমি সৃজনশীল-মননশীল আবুল হাসনাতের প্রতি সুবিচার করেনি, স্বীকৃতির প্রশ্নে। অথচ একাডেমির সঙ্গে তার যথেষ্ট সুসম্পর্ক ছিল। এ-জাতীয় অপ্রাপ্তিতে হাসনাতের কোনো মাথাব্যথা ছিল না। সে তার যাপিত জীবনে তার চিন্তাভাবনা ও মতাদর্শ-মাফিক করণীয় নির্বিকার চিত্তে করে গেছে। এটুকু অন্তত আমার তাকে দেখার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি। তাই মনে হয়, প্রচারবিমুখ, আত্মনিবিষ্ট কর্মীদের ভাগ্যে এমনটাই জোটে, বিশেষ করে যারা আদায় করে নিতে জানে না, বা পারে না।
চার
এ পর্যন্ত হাসনাতের সাহিত্যচর্চা নিয়ে সূত্রাকারে কথা বলেছি। কিন্তু তার সর্বাধিক পরিচয় ও খ্যাতি একজন মননশীল সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে। প্রশ্ন উঠতে পারে তার কোন পরিচয়টি উৎকর্ষে সাফল্যে বড়। এ-প্রশ্নের জবাবে বোধহয় সবাই না হলেও অধিকাংশ সাংস্কৃতিক বুদ্ধিজীবী এক বিন্দুতে একমত হবেন। তবু আমার একটি বিনীত প্রশ্ন : তার কবিতার নান্দনিক বিচার-বিশ্লেষণ কি খুব একটা হয়েছে? এবং তার আত্মজৈবনিক রচনার?
হলে অধিক স্বীকৃতির নিদর্শন তার ঝুলিতে ঠাঁই নিত। বিশেষ করে শিল্পকলা-চিত্রকলার প্রতি তার অনুরাগ, চর্চা-অনুশীলন, নিদর্শন সংগ্রহ ও তৎসংক্রান্ত পত্রিকা সম্পাদনা ইত্যাদির এবং সংগীতবিষয়ক অনুরাগ ও তৎপরতার হিসাব নেওয়া হলে। যতদূর জানি, শেষোক্ত ক্ষেত্রে হাসনাত একজন সফল সংগঠক, নীরব নিঃস্বার্থ কর্মী। মনে হয় আমার প্রীতিভাজন অনুজ, হাসনাতের বন্ধু মফিদুল হক কিংবা সফল সম্পাদক মতিউর রহমান – এ-ব্যাপারে ভালো বলতে পারবেন, যাকে বলে আলোকপাত করা।
আবুল হাসনাত চিন্তায়, কর্মে, মতাদর্শে একজন প্রগতিশীল ব্যক্তি – সমাজ-সাহিত্য-সংস্কৃতি-শিল্প ও রাজনীতির বিবেচনায়। এ-বিষয়ে কেউ দ্বিমত পোষণ করবেন বলে মনে হয় না। সমস্যা হলো, আমার ধারণায় তার সাহিত্য সম্পাদকের খ্যাতির দীপ্তিতে তার আর সব পরিচয় চাপা পড়ে যাওয়ায় স্বীকৃতির উল্লিখিত হাল-হকিকত। এরপরও রয়েছে পূর্বোক্ত তার প্রচারবিমুখ স্বভাব, নীরবে কাজ করে যাওয়ার প্রবণতা, সজোরে নিজেকে পাদপ্রদীপের আলোয় তুলে ধরায় উদাসীনতা, যা তার বহুমুখী মেধার উজ্জ্বলতা সাহিত্য-সংস্কৃতি স্তরের অভিভাবকদের কাছে তার অবস্থান ম্লান করে দিয়েছে। বয়স পঁচাত্তরে প্রয়াণ, এর এ-যাবৎ তার সার্বিক কৃতিত্ব নিয়ে, সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনে তার অবস্থান নিয়ে নিরপেক্ষ নির্ভরযোগ্য মূল্যায়ন হয়েছে বলে আমার জানা নেই। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি ভুবনে, বিশ্ব-মানচিত্রে এমন ঘটনা মাঝেমধ্যে ঘটে থাকে, এ-বিষয়ক ইতিহাসে তার প্রমাণ রয়েছে।
পাঁচ
হাসনাতের রাজনৈতিক চিন্তা ও কর্মবিষয়ক কিছু কথা না বললে তার প্রতি অবিচার করা হবে। আমাদের অভিজ্ঞতা বলে মেধাবীর সৃজনশীলতা ও কর্মের লাগাতার শ্রমনিষ্ঠা সবসময় একসঙ্গে চলে না, যদি বা চলে তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। যুক্ত বঙ্গে ও বিভক্ত বঙ্গের সাহিত্য-সংস্কৃতি-রাজনীতির ভুবনে এমন উদাহরণ কম নেই – এমনকি খ্যাতিমানদের ক্ষেত্রেও। পরিণত বয়সে একটি দিক বেছে নেওয়াই যেন রীতি, ব্যতিক্রম সামান্যসংখ্যক।
আশ্চর্য, হাসনাত এই বঙ্গে উঁচু কেতার রাজনৈতিক নেতা না হয়েও দুটো কর্মধারাকে, যতদূর জানি, পাশাপাশি সমান্তরালভাবে সচল রেখেছিলেন পাল্লার ভার কম-বেশি হলেও। এক্ষেত্রে আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা কম বিধায় এ-বক্তব্যে ভুল থাকলে পাঠক বা সমালোচক তা শুধরে নেবেন।
বিভিন্ন সূত্রে যতদূর জেনেছি, তাতে হাসনাত ঢাকা কলেজ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী পরে প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতির কর্মী ও নেতা। পরে এই বামপন্থী রাজনীতিরই জাতীয় পর্যায়ের নেতৃস্থানীয় কর্মী। বিভাগোত্তর পূর্ববঙ্গের কমিউনিস্ট পার্টির নীতি ও কৌশলগত ভুলভ্রান্তির মধ্যে গুটিকয় সুকীর্তির অন্যতম উদারপন্থী ছাত্র সংগঠন ‘ছাত্র ইউনিয়ন’ গঠন, যা সূচনালগ্ন থেকেই দেশব্যাপী জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এখনো বহু সমস্যা, বিভাজন ও সীমাবদ্ধতার মধ্যে ছাত্র ইউনিয়ন সংগঠন হিসেবে দেশব্যাপী সক্রিয়। সবচেয়ে বড় কথা, ছাত্র ইউনিয়ন এ-ধারায় অনেক জাতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক নেতার জন্ম দিয়েছে।
প্রাসঙ্গিক কথা এড়িয়ে যেটা বলার তা হলো, গত শতাব্দীর ষাটের দশকের শেষার্ধে ছাত্র ইউনিয়নের ছাত্রকর্মীনেতা আবুল হাসনাত আন্তরিকতার সঙ্গে তার দায়িত্ব পালন করেছে। আদর্শনিষ্ঠা এবং শ্রমনিষ্ঠা – দুই-ই ছিল তার পাথেয়। ছাত্রজীবনশেষে পার্টিকর্মেও তার নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার অভাব ছিল না বহুকর্মের ব্যস্ততার মধ্যে। এ নয়া পরিবেশেও সংস্কৃতি ক্ষেত্রটি ছিল তার চেতনায় অগ্রাধিকারের মধ্যে। যেজন্য সমধর্মী সহযাত্রী সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে এতই তার গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে – পার্টি রাজনীতির তুলনায় সাংস্কৃতিক রাজনীতি হাসনাতের জীবনে বরাবর প্রাধান্য পেয়েছে।
আর্থ-সামাজিক বৈষম্য (পূর্ব-পশ্চিমে) যে রাজনৈতিক বাস্তবতার সৃষ্টি করে তার প্রবল টানাপড়েনে ঊনসত্তরের উত্তাল গণজাগরণ ও একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধ, উভয় ক্ষেত্রে প্রতিবাদী ধারায় নম্রপ্রকৃতির হাসনাত যুক্ত। যুক্ত নানামুখী কর্মতৎপরতায়। এ-পর্বে জাতীয়তাবাদী ও প্রগতিবাদীরা সমান্তরাল ধারায় সক্রিয় নানা ফ্রন্টে।
স্বাধীন বাংলাদেশের সামাজিক-রাজনৈতিক নৈরাজ্য, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির দুর্নীতি ও অনৈতিকতা হাসনাতের সংবেদনশীল চেতনায় অস্থির-অশান্তি সৃষ্টি করে, আমার ধারণা সেই প্রতিক্রিয়ার টানে রাজনীতির চেয়ে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির ভুবনটি হাসনাতের কর্মজীবনে, আদর্শিক ক্ষেত্রে অধিক প্রাধান্য পায়। রাজনীতি একেবারে বর্জন নয়, তবে তুলনায় গৌণ হয়ে ওঠে – ঘটনাক্রম ও তার কর্মাদর্শে তার প্রমাণ মেলে। আধুনিক প্রগতি সাহিত্য-সংস্কৃতির ধারাটি সমৃদ্ধ হয়েছে বলে মনে হয়। হাসনাত এই পরিবর্তিত ধারার একজন সক্রিয় কারিগর। পেশাগত জীবনের সঙ্গে সংগতি রেখেই জীবিকাসহ তাঁর এই পার্শ্বপরিবর্তন। এই ধারাতেই তার শেষযাত্রা।
ছয়
সংক্ষিপ্ত রেখাচিত্রে সম্পাদক-সাংবাদিক, কবি-কথাসাহিত্যিক-সংস্কৃতিসেবী ও রাজনৈতিক কর্মী আবুল হাসনাতকে আমি কীভাবে দেখি? এ-প্রশ্নের জবাবে কিছু অনিবার্য পুনরুক্তিসহ বলতে হয় – হাসনাত ওপরে উল্লিখিত ধারায় একজন আদর্শনিষ্ঠ প্রগতিবাদী তরুণ, যে তার সমগ্রজীবনে স্বার্থের টানে তার অবস্থান পরিবর্তন করেনি। স্বাধীনতা-উত্তরকালে দেশের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়া সামঞ্জস্য বিধানে তার রাজনৈতিক অবস্থানটির কিছু রদবদল করেছে আদর্শচ্যুতি না ঘটিয়ে। গোত্রান্তর নয়, অবস্থানগত স্থানান্তর। তাতে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
অনুপুঙ্খ বিচারে এখানে পক্ষপাত নেই। অন্বিষ্টের অপ্রাপ্তিতে অবস্থান্তর হয়তো গ্রহণযোগ্য যখন তাতে স্বার্থের দূষণ জড়িত না থাকে। স্বাধীনতার পরপরই গণসাহিত্য পত্রিকার সম্পাদনা গণস্বার্থের চেতনার পক্ষেই আভাস-ইঙ্গিত আনে। কিন্তু হাওয়া তখন আকস্মিক সমাজবদলের অনুকূল নয়, আদর্শবাদী ব্যক্তির পক্ষে সিদ্ধান্ত নেওয়া খুবই কঠিন। সেই কঠিন পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক পর্বের সময়টিকে যারা আজো স্মরণে রেখেছেন তারাই পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পারবেন। হাসনাত এই অবস্থার শিকার। তাই কিছু আপস তো থাকবেই তত্ত্বগতভাবে হলেও।
আর সেটা হলো হতাশা, লক্ষ্য অর্জনের ব্যর্থতার পরিণাম। হতে পারে হাসনাত বুঝে গিয়েছিল সমকালীন রাজনীতি দিয়ে কোনো অর্জন সম্ভব হবে না। তাই নিজের হিসাবমতো চলা। পেশা তথা জীবিকার ক্ষেত্রে নিজেকে বাঁচিয়ে চলা। আমার স্পষ্ট মনে আছে, কালি ও কলমপর্বে হাসনাত নিয়মিত আমার কাছে লেখা চেয়েছে, কখনো দিতে পেরেছি, কখনো পারিনি। মজার বিষয় হলো, হাসনাত আমার কাছে সুস্পষ্ট ভাষায় সাহিত্য-সংস্কৃতি ও শিল্পবিষয়ক লেখা চেয়েছে, রাজনীতিবিষয়ক লেখা নয়। তার সমস্যা বুঝতে আমার অসুবিধা হয়নি।
তাই আজ প্রয়াত হাসনাত স্মরণে কিছু লিখতে গিয়ে তার আনমনা ভাব, ছায়াচ্ছন্ন অভিব্যক্তির মুখচ্ছবিটাই মনে আসছে। সেটা পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়াজাত, নাকি তার সহজাত প্রকৃতিসুলভ, সে-সম্বন্ধে এখনো আমি নিশ্চিত হতে পারিনি; পারবো বলেও মনে হয় না। ওটা তার নিকটতম বন্ধুদের ব্যাখ্যার অপেক্ষায় রইল। তার বন্ধুরা এ-সম্বন্ধে সার্বিক তথ্য দিলে হয়তো ব্যাখ্যায় কিছুটা অবকাশ থাকবে। অন্যদিকে তার নিকট-বন্ধুরা তার সম্বন্ধে আমার সত্যকে, জানার ও বোঝার চেষ্টাকে হাস্যকর বলে উড়িয়েও দিতে পারেন।
তাতে আমার অসুবিধে নেই। আমি যে হাসনাতকে যতটুকু চিনেছি, জেনেছি, সেই পরিপ্রেক্ষিতে তাকে পর্বান্তরে সঠিকভাবে জেনে-বুঝে সিদ্ধান্তে আসাই আমার জন্য বড় দায়িত্ব। যাই হোক হাসনাতের জন্য মনের কষ্টটা চেপে রেখেই লেখায় ইতি টানছি। ভালো লাগছে যে, তার সহকর্মীরা তার স্মরণে কালি ও কলমের একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছেন। সবশেষে আমার কথা, হাসনাতের সৃজনশীলতা, মননশীলতা ও কর্মতৎপরতার বিশদ বিশ্লেষণে খুব একটা লেখা হয়েছে বলে জানি না, যদিও আমার এই জানার সীমা খুবই ছোট। তবু বলি, আমাদের নামী লেখকদের কেউ কেউ তার সোনার কলমে (ভুল বললাম, এখন তো আর কলমে লেখা নয়, সোনার আঙুলে ক্লিক ক্লিক করে) তার সম্বন্ধে বিশদ রচনায় ইতিহাসের পাতা সমৃদ্ধ করলে আমার প্রত্যাশা পূরণ হবে। আমার জানামতে তার দু-একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু এ-দায়িত্বটি পালন করতে সমর্থ।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.