বালাভাইয়ের অভিনয়

ট্রেন থেকে নেমে, স্টেশনের মূল ফটক পেরুলে, যে-রাস্তাটা সাপের মতো এঁকেবেঁকে পুবদিকে চলে গেছে, সেই রাস্তার মুখে বালাভাইয়ের ঝলমলে স্টেশনারি দোকান। মূল ফটকের বাইরে এলে বালাভাইয়ের দোকান সকলের নজর কাড়ে।

স্টেশনটা ছোট। এখানে মেইল ট্রেন থামে না। তারপরও এই স্টেশনের গুরুত্ব অনেক। প্রতিদিন শত শত মানুষ এই ট্রেনে যাতায়াত করে। এই এলাকার বিশাল অংশের মানুষের শহরে যাতায়াতের একমাত্র বাহন এই রেল। সলপের জমিদাররা রেল কোম্পানিতে গিয়ে অনেক ধরপাকড় করে এখানে এই ভদ্রকোল গ্রামের পাশে একটি স্টেশন স্থাপনের বন্দোবস্ত করেন। রেল কোম্পানি অনেকখানি জায়গা কিনে স্টেশন স্থাপন ও স্টেশনের কর্মচারীদের বাসস্থানের ব্যবস্থা করে। স্টেশনের নাম সলপ রেলওয়ে স্টেশন।

রেলের সেই জায়গা বেলিরভাগই বেহাত হয়ে গেছে। বালাভাইয়ের দোকানও রেলের জায়গায়। এলাকায় তার ভীষণ প্রভাব। স্টেশনের পাশে সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গাটা বালাভাইয়ের দখলে। এটা নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা নেই। রেল কোম্পানির লোকজন আগে মাঝে-মধ্যে উচ্ছেদের ভয়ভীতি দেখাতো। এখন তারাও ক্লান্ত হয়ে আর এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না।

বালাভাই দোকানে আসেন দুপুরের পর। থাকেন রাত ১২টার লাস্ট ট্রেন পার হওয়া পর্যন্ত। তার বেরিভাগ কাস্টমারই মহিলা। এই দোকানে চুড়ি-ফিতা ছাড়াও কসমেটিক্সের নানা পদের পসরা সাজানো। ক্রেতার ভিড় মোটামুটি। প্রতি সপ্তাহে বিকেলের ট্রেনে আমি সিরাজগঞ্জ শহরে যাই সিনেমা দেখেতে। বালাভাইকে আমি দূর থেকে দেখি। তার সঙ্গে কথা হয় না। কেমন ভয় ভয় লাগে। গুণী মানুষদের নাকি বেজায় অহংকার। আমার চোখে বালাভাই অসাধারণ গুণী। সে সুদর্শন। এলাকার নামকরা মঞ্চাভিনেতা। ভালো বংশীবাদক। চমৎকার গান গান। পরস্পর জানা গেছে, তিনি নাকি সিনেমায় চান্স পেয়েছেন। আমাদের এলাকায় একজন বিখ্যাত মানুষ আছেন। সিনেমার পরিচালক। নাম দেওয়ান নজরুল। তিনি সিনেমায় গান লেখেন, কাহিনি লেখেন আবার পরিচালনাও করেন। তিনি নাকি কথা দিয়েছেন বালাভাইকে সিনেমায় চান্স দেবেন। আমরা তাই শুনে ভীষণ অবাক এবং ভীষণ খুশি। সিনেমায় চান্স পাওয়া কি যা-তা কথা! 

আকস্মিকভাবে সিরাজগঞ্জ মমতাজ সিনেমা হলে বালাভাইয়ের সঙ্গে আমার দেখা। তিনিও সিনেমা দেখতে এসেছেন, আমিও। তিনি সহজেই টিকেট পেয়েছেন। এখানেও তার অনেক ভক্ত। তারাই টিকেট ম্যানেজ করে দিয়েছে। আমার টিকেট পেতে অনেক যুদ্ধ করতে হলো। হিট সিনেমা। নতুন মুক্তি পেয়েছে। সিনেমার নাম ময়নামতি। ব্ল্যাকে ডাবল দামে টিকেট কিনতে হলো আমাকে। যে করেই হোক, এই সিনেমা দেখতে হবে। না হলে জীবন বৃথা।

একবার দেখে মন ভরল না। আবার দেখতে হবে। কিন্তু সেদিন আর সম্ভব না। সেকেন্ড শোতে সিনেমা দেখেছি আমরা। আজ আর কোনো শো নেই। আবার দেখতে চাইলে আগামীকাল। তাহলে রাতটা শহরেই যাপন করতে হবে। সেটা কি সম্ভব? না, কিছুতেই না। যে করেই হোক রাতেই বাড়ি ফিরতে হবে।

সিরাজগঞ্জ স্টেশনে এসে আবার দেখা হয়ে গেল বালাভাইয়ের সঙ্গে। খেয়াল করলাম বালাভাইয়ের চেহারার সঙ্গে ময়নামতি সিনেমার নায়ক রাজ্জাকের চেহারার অদ্ভুত রকমের মিল। তার মতোই বালাভাইয়ের চুল ব্যাকব্রাশ করা। ধবধবে ফর্সা মুখখানা যেন সিরাজগঞ্জ স্টেশন আলোকিত করে রেখেছে। যাকে আমি অহংকারী বলে এড়িয়ে চলেছি বাস্তবে অত্যন্ত নরম মনের মানুষ। স্টেশনে আমাকে দেখেই বললেন, ‘তোমার বাড়ি কোন গাঁয়ে যেন?’

আমি আড়ষ্ট ভঙ্গিতে বললাম, ‘আমার গাঁয়ের নাম কানসোনা।’

‘আক্তারভাইকে চেনো?’

‘জি চিনি।’

‘তোমার কী হয়?’

‘চাচা।’

‘ওহ্, তুমি আক্তারভাইয়ের ভাইস্তা?’

বললাম, ‘জি।’

আক্তার চাচা নামী ফুটবলার। আশেপাশের দশ গাঁয়ের মানুষ তাকে একনামে চেনে। আমার ছোটচাচা। খেলার জন্য নানা জায়গায় তাকে হায়ার করে নিয়ে যেত। খেলোয়াড় হিসেবে তার খুব নামডাক। আর সেই ফুটবল খেলতে গিয়ে সাপের কামড়ে অকালে প্রাণ হারান।

কারো সম্পর্কে না জেনে তার সম্পর্কে উটকো ধারণা করা মস্ত ভুল। বালাভাই আমার উটকো ধারণা ভেঙে দিলেন। খুবই সহজ এবং সাধারণ মানুষ তিনি। নিজে থেকে অনেক গল্প করলেন। সাহস পেয়ে আমিও সুযোগমতো প্রশ্ন ছুড়ে দিলাম। যেহেতু সিনেমা আমার প্রিয় বিষয়, তাই সিনেমা নিয়েই আমার জিজ্ঞাসা, ‘আপনি নাকি সিনেমায় নায়ক হচ্ছেন?’     

শব্দ করে হাসলেন। তার হাসিটাও সুন্দর। নায়কের হাসির মতো। বললেন, ‘দেওয়ান স্যার বলছেন, চান্স দেবেন। কিন্তু আমি তো ভীষণ ভয়ে ভয়ে আছি।’

‘কেন?’

আমার অবাক প্রশ্নে বালাভাই আবার হাসলেন। বললেন, বুঝতাছ না, সিনেমার পাট কি চাট্টিখানি কথা। তুমি কও, আজ যে সিনেমাটা দেখলাম, নায়ক রাজ্জাক যে পাট করল, সেই পাট কি আমাকে দিয়া সম্ভব? তুমি কও, সম্ভব?’

আমি জোর দিয়ে বললাম, ‘কেন সম্ভব না? আপনি তো অনেক যাত্রা-নাটকে পাট করছেন। ফিটেস্টের দিক থেকে আমার বিচারে রাজ্জাকের চেয়ে আপনি বেশি ফিটেস্ট। পারলে এই সিনেমাটা আপনি আবার দেখেন, রাজ্জাক যেভাবে-যেভাবে অভিনয় করেছেন, আপনি সেভাবে চেষ্টা করতে থাকেন। আমার বিশ্বাস, আপনি পারবেন।’

আমার কথায় বালাভাই ভেতর থেকে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন যেন। ‘তাইলে তুমি কইতাছ, আমি পারমু?’

‘অবশ্যই পারবেন।’ আমি আবার জোর দিলাম। বালাভাই খুশি হলেন। প্রশংসা শুনে সবাই বিগলিত হয়। কারোটা বোঝা যায়, কারোটা বোঝা যায় না। আমি খুশি বালাভাইয়ের মতো ভবিষ্যৎ নায়কের সঙ্গে আপন মানুষের মতো কথা বলতে পারছি। বিরাট প্রাপ্তি আমার।

হঠাৎ কী ভেবে তিনি আমার দিকে মনোযোগ দিলেন। বললেন, ‘তুমি বোধহয় সিনেমাটা একটু বেশি দেখ।’

আমি মাথা নামিয়ে স্বীকার করলাম। সহজভাবে বললাম, ‘জি।’

তিনি খুব অবাক, ‘কেন?’

‘আমার ভালো লাগে।’

‘শুধুই ভালো লাগে?’

‘আমি অন্য কিছুও ভাবি।’

‘কী ভাবো?’

‘ভাবি, এই কাহিনি আমিও লিখতে পারবো।’ আমি সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলে দিলাম কথাটা। বালাভাইয়ের মুখে মৃদু হাসির রেখা দেখা গেল। বললেন, ‘তোমার লেখার অভ্যাস আছে?’

বললাম, ‘একটু একটু।’

‘কী লেখ?’ তার বলার মধ্যে সিরিয়াস ভাব।

বললাম, ‘নাটক।’  

বালাভাই বিস্ময়ে শব্দ করে হেসে উঠলেন। আমি তেমন গায়ে মাখলাম না। ‘লেখো নাটক, দেখো সিনেমা। কেমন উল্টা হয়ে গেল না? তুমি নাটক লেখো তুমি দেখবা নাটক।’

‘আমাদের এই অঞ্চলে তো তেমন নাটক হয় না। কোথায় দেখবো?’ আমার পাল্টা জবাব শুনে তিনি থামলেন। তারপর বললেন, ‘তোমাকে তো বলা হয়নি, আমরা একটা পালা করতাছি। পালার নাম নদের চাঁদ। পয়লা বৈশাখ মঞ্চস্থ হবে।’

‘কোথায় হবে?’ পাল্টা প্রশ্ন ছুড়তে আমার দেরি হলো না।

‘স্টেশনের ঢালে। খোলা জায়গাটা আছে না, সেইখানে। নাটোর থেকে মহিলাশিল্পীরা আসবে। টিকেট কেটে ঢুকতে হবে, হ্যাঁ – সেই রকম আয়োজন।’ টিকেটের কথা শুনে আমার শরীরের সামান্য ঝাঁকুনির দোলটা বালাভাই ঠিকই বুঝে ফেলেছেন। সঙ্গে-সঙ্গে বললেন, ‘তুমি চিন্তা কইরো না। তোমার জন্য দুইটা পাস রাখমু। তোমার আর তোমার কোনো ইয়ার দোস্তের নামে। নাটক শেষে এত রাইতে একলা যাইবা কেমনে?’ তাই তোমার একজন পেয়ারের দোস্তকে তুমি সঙ্গে কইরা নিয়া আসবা।’

‘জি ঠিক আছে।’ অতি উৎসাহে আমি বলে ফেললাম, ‘বালাভাই, আমি কিন্তু এখন থেকে দিন গুনতে থাকবো। পয়লা বৈশাখ কবে?’

আমাদের কথার মাঝে রাতের শেষ লোকাল ট্রেন এসে থামল। আমরা একসঙ্গে একটি কামরায় উঠে পড়লাম। বসার আসন বেশিরভাগই ফাঁকা। আমরা পাশাপাশি বসলাম। লোকটার চারপাশে খেয়াল। বসেই তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘এত রাইতে একলা তুমি বাড়ি যাইবা কেমনে?’

‘যাইতে পারবো বালাভাই।’

‘অন্ধকার রাইতে একলা যাইবা, ভয় করবে না?’

‘কীসের ভয়?’ আমি তার প্রশ্ন উড়িয়ে দিয়ে বিশেষ ভঙ্গিতে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিলাম।

বললেন, ‘কতরকম ভয়ই তো আছে।’

বললাম, ‘গান গাইতে-গাইতে চলে যাব।’

বালাভাই আবার শব্দ করে হাসলেন। তার হাসিটা নায়ক রাজ্জাকের মতো দারুণ আকর্ষণীয়। অবাক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, ‘গান গাইলে ভয় থাকে না?’

‘না। আপনি খেয়াল করে দেখবেন, ভয়ের জায়গা এলেই মানুষের অন্তরে গানের কলি জেগে ওঠে। আপনা-আপনি তখন গলা দিয়ে গান বের হয়ে আসে।’

‘কথাটা তো মন্দ কও নাই। ব্যাপারটা আমিও অনেকবার খেয়াল করছি। বেতকান্দি যাইতে একটা সরাগাছ আছে। লোকে বলে ওই সরাগাছে ভূত থাকে। আমি একদিন রাইতে ওই পথ দিয়ে যাইতে মনের মধ্যে ভূতের ভয় ঢুইকা গেল। গা ঝাঁকি দিয়ে উঠল। কিন্তু তখন কীভাবে যে আমার কণ্ঠে গান শুরু হইছে আমি নিজেই খেয়াল করি নাই। তুমি আমাকে চমকে দিয়েছ। আমি অবাক হয়েছি তোমার বুদ্ধি দেখে।’

দুই

দেওয়ান নজরুল আমাদের দূরসম্পর্কের আত্মীয়। তিনি বাড়ি এলে কৃষকগঞ্জ বাজারে আসেন। তাকে ঘিরে উৎসুক জনতার ভিড় লেগে যায়। সিনেমার প্রতি সাধারণ মানুষের যে এত কৌতূহল তাকে ঘিরে থাকা ভিড় দেখলে বোঝা যায়। সুযোগ পেয়ে আমি কথাটা পাড়লাম, ‘ভাই, আপনি নাকি বালাভাইকে নায়ক বানাবেন? আপনি নাকি কথা দিয়েছেন?’

‘কোন বালা?’ দেওয়ানভাইয়ের অবাক হওয়া দেখে আমার গলা-বুক শুকিয়ে এল। বললাম, ‘সলপ স্টেশনের বালাভাই। স্টেশন লগোয়া তার স্টেশনারি দোকান আছে। খুব সুন্দর নায়ক নায়ক চেহারা।’

‘ওহ্ চিনেছি। আমি তো তার কথা ভুলেই গেছিলাম। কথা দিয়েছি কে বললো? বালা বলেছে নাকি?’

‘না। লোকজনের মুখে শুনলাম।’

‘আরে না। গতবছর স্টেশনে গিয়েছিলাম কাজে। হঠাৎ তার সঙ্গে দেখা। সে চেপে ধরল, তাকে সিনেমায় চান্স দিতে হবে। আমি বললাম, আচ্ছা ভেবে দেখি। তারপরও সে নাছোরবান্দার মতো চাপাচাপি করতে থাকে। অগত্যা বললাম, ‘তেমন চরিত্র পেলে একটা ব্যবস্থা করা যাবে। এই তো কথা। সে কি কিছু বলেছে তোমাকে?’

বললাম, ‘সে কিন্তু বিরাট আশা নিয়ে অপেক্ষা করছে।’

দেওয়ানভাই কথা একটু বেশি বলেন। তবে তার কথা শুনতে মজা লাগে। তিনি বললেন, ‘তোমার কি ধারণা সে সিনেমায় অভিনয় করলে সেই সিনেমা মানুষ টিকেট কেটে হলে গিয়ে দেখবে?’

আমি বললাম, ‘নায়ক হিসেবে সে কিন্তু খুব ফিটেস্ট।’

দেওয়ানভাই জোর দিয়ে বললেন, ‘শুধু ফিটেস্ট হলে সিনেমায় চলে? অভিনয় জানতে হবে না?’

‘তা তো জানতেই হবে।’ আমি মিনমিন করে বললাম।

দেওয়ানভাই তার মতো বলে যাচ্ছেন। কিছুটা বিরক্ত মনে হলো আমার ওপর। বললেন, ‘নায়ক জসীমের চেহারা কি নায়ক হিসেবে খুব ফিটেস্ট? সে শুধু অভিনয়ের জোরে তার আসন ধরে রেখেছে। তোমাদের বালার কি সে ক্ষমতা আছে?’

বললাম, ‘আমি তার অভিনয় দেখি নাই। লোকমুখে শুনছি সে নাকি ভালো অভিনয় করে।’

‘লোকমুখের কথা দিয়ে ফিল্ম চলে না। ফিল্মে প্র্যাকটিক্যালি অভিনয় করে মানুষের মন জয় করতে হয়।’   

আমি বললাম, ‘আপনি কি পয়লা বৈশাখ পর্যন্ত থাকবেন?’

‘কেন?’

‘পয়লা বৈশাখে বালাভাইরা নদের চাঁদ নামে একটা পালা করবে। তার অভিনয় কেমন স্বচোখে দেখলেন।’

‘দেখি ততদিন থাকতে পারি কি না। আমার পরবর্তী সিনেমার চিত্রনাট্য লিখতে হবে। হাতে সময় কম।’

পয়লা বৈশাখে বন্ধু মটু রাজ্জাককে সঙ্গে নিয়ে সলপ স্টেশনের দিকে রওনা হলাম। দেওয়ানভাই ঢাকা চলে গেছেন। বালাভাইকে নিয়ে ভাবার সময় নেই তার। এই কথাটা বালাভাইকে বলা যাবে না। ভীষণ কষ্ট পাবে। তারচেয়ে সে বরং আশায় থাক। একদিন হয়তো কপাল খুলে যেতে পারে।

প্যান্ডেলের গেটে গিয়ে বালাভাইয়ের নাম বললাম; বললাম, ‘তিনি আমাদের আসতে বলেছেন। আমাদের জন্য তিনি পাস রাখবেন।’

গেটের কর্মীরা ভীষণ ব্যস্ত। আমাদের কথা শোনার টাইম নেই তাদের। লোকজন ঢুকছে। গেটে ভিড় করা বারণ। আমাদের সাইডে দাঁড়াতে বলল। আমরা খানিকটা বিব্রত। কিছুক্ষণ দূরে দাঁড়িয়ে রইলাম। রাজ্জাক বলল, ‘চল টিকেট কাটি। পরের ভরসায় কতক্ষণ থাকবি?’

বললাম, ‘আর একটু দেখি।’ একটু পর আবার এগিয়ে গেলাম, বললাম, ‘ভাই, প্লিজ একটু খবর পাঠান না।’

গেটের স্বেচ্ছাসেবক কঠিন ঝাড়ি দিয়ে উঠল। রেগেমেগে বললো, ‘একবার কইলাম না, ব্যস্ত আছি। তাও ঝামেলা করতাছেন। যান, ফাঁকে দাঁড়ান।’

এ-সময় আমাকে চমকে দিয়ে রাজ্জাক গর্জে উঠল, ‘বারবার ফাঁকে যান – ফাঁকে যান করতাছেন ক্যা? আমরা মানুষ না? আমরা কি ইয়ার্কি মারতে আইছি?’

গেটের লোকগুলো ক্ষেপে গিয়ে হট্টগোল বাধিয়ে বসলো। রাজ্জাকও চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে গলা ফাটাতে লাগল। মটু রাজ্জাক খুব ঠান্ডা স্বভাবের মানুষ। কিন্তু একবার রেগে গেলে তাকে থামানো খুব মুশকিল। রাজ্জাকের চিৎকার-চেঁচামেচি খুব কাজে দিল। খবরটা গ্রিনরুমে মেকআপরত বালাভাইয়ের কানে পৌঁছালো। তিনি নাম শুনে বলে দিলেন, ‘ওদের ভেতরে ঢুকতে দাও।’

ভেতরে ঢুকে আমরা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে গ্রিনরুমের দিকে এগিয়ে গেলাম। বালাভাই মেকআপ নিচ্ছিলেন। আমাকে দেখে হাসলেন, বললেন, ‘আইসা পড়ছো।’

‘জি। আইসা পড়ছি ভাই।’

বালাভাই একজনকে বললেন, ‘যাও, ওদের বেঞ্চে বসিয়ে দাও।’

দর্শকদের বসার তিন ভাগ। এক ভাগ মাটিতে বিছানো ত্রিপলে। আরেক ভাগ বেঞ্চে। আরেক ভাগ চেয়ারে। আমাদের জন্য বেঞ্চ বরাদ্দ হলো। আমরা তাতেই খুশি। বিনা টিকেটে ঢুকে বেঞ্চে বসার সুযোগ পেয়েছি – এটা কি কম কথা! পালা শুরু হতে হতে মধ্যরাত হয়ে গেল। দর্শকরা বারদুই হইচই করে গোলমাল শুরু করলে মাইকে সবাইকে শান্ত হওয়ার আহ্বান জানানো হলো। বলা হলো, আর একটু পরেই পালা শুরু হবে।

হলোও তাই। তার আগে একজন নর্তকী এসে নাচলো শরীর দুলিয়ে। বেসুরো কণ্ঠে গানও গাইল। তারপর শরীরে ঢেউ তুলে দর্শকদের দিকে রসালো ইঙ্গিত করে হাসতে হাসতে চলে গেল। ত্রিপলে বসা দর্শকের ভেতর থেকে একজন বলে উঠল, ‘আপাতত চা-নাস্তার ব্যবস্থা হলো। আসল খানা পরে আসতেছে।’ দর্শকদের মধ্যে হাসির রোল উঠল। দেরিতে পালা শুরু করায় তারা বিরক্ত।

মূল পালা শুরু হলো। শুরুতেই বালাভাই এলেন মঞ্চে। তিনি জমিদারের ছেলে নদের চাঁদ। তার পোশাকও সেইরকম, ঝলমলে। দারুণ মানিয়েছে তাকে। সত্যি সত্যি জমিদারের ছেলে মনে হচ্ছিল তাকে। তার নায়িকা বেদে পরিবারের মেয়ে। জমিদারনন্দন তার সঙ্গে প্রেম করতে চায়। কিন্তু বেদের মেয়ে তাকে পাত্তা দেয় না। নদের চাঁদ তার পথ আটকে দাঁড়ায়। তাদের মধ্যে প্রেমের কথা হয়। নাটোর থেকে আনা নায়িকা দারুণ অভিনয় করছে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বালাভাই কুলিয়ে উঠতে পারছেন না। মঞ্চে এসে বালাভাই কেমন সিঁটকে থাকে। শক্ত হয়ে ঘাড় বাঁকিয়ে দাঁড়ায়। স্বাভাবিক হতে পারে না। বড়ই বেখাপ্পা লাগছিল বালাভাইয়ের অভিনয়।

কিছুক্ষণ পর মটু রাজ্জাক বলে, ‘চল যাই। ভালো লাগছে না।’

আমি তাকে থামিয়ে বললাম, ‘আর একটু দেখি।’

ভালো আমারও লাগছিল না। কিন্তু পুরোটা না দেখলে বালাভাই শুনলে কী ভাববেন।

পালা অর্ধেকও হয়নি। মটু রাজ্জাক এবার উঠে দাঁড়াল। আমাদের পেছনে বসা একজন দর্শক খেঁকিয়ে উঠল, ‘সামনে পাহাড় খাড়াইলে নায়িকারে দেখবো কেমনে?’

আরেকজন বলল, ‘ভাই বসেন, বসেন। নায়িকা আইসা গেছে।’

দর্শকদের রসিকতায় রাজ্জাক আবার বসে পড়ল। কিন্তু রাগে সে ফুঁসছে। রাজ্জাক বেশ স্বাস্থ্যবান। পরিচিতরা বলে মটু রাজ্জাক। আমাদের গ্রামে আরো একজন রাজ্জাক আছে। নামের বিভ্রাট এড়াতে আমার ক্লাসমেট রাজ্জাককে সবাই মটু রাজ্জাক বলে ডাকে।

রাজ্জাকের অস্বস্তির কারণে আর বসে থাকা গেল না। উঠে পড়তে হলো। রাস্তায় এসে রাজ্জাক বলল, ‘এই লোক নাকি সিনেমায় নামবে। ও তো অভিনয়ের কিচ্ছু জানে না।’

রাজ্জাক মিথ্যা বলেনি। তারপরও আমি তাকে সমর্থন না করে বললাম, ‘সবাই কি সবকিছু একদিনে শেখে? আস্তে আস্তে শিখবে। বালাভাইও আস্তে আস্তে শিখবেন।’

রাজ্জাক বললো, ‘তার লক্ষণ আগে থেকে বোঝা যায়। বালা মিয়া তো সোজা হয়ে মঞ্চে খাড়াইতে পারে না। আর শিখবে কবে?’

রাজ্জাক বিরক্তি ঝেড়ে বলে, ‘শুধু শুধু ঘুমটা কামাই করলাম। আগে জানলে আমি আসতাম না।’

আমি মনে মনে বললাম, ‘আমিও আসতাম না। কথাটা জোর দিয়ে বললাম না। বালাভাইয়ের প্রতি আমার আস্থা ছিল। তিনি পারবেন। কিন্তু এতটা পানি ঘোলা করবেন, আমি ভাবতেও পারিনি।

মাসখানেক পর সিরাজগঞ্জ শহরে যাচ্ছি সিনেমা দেখতে। স্টেশনে এসে বালাভাইয়ের দোকানে তাকে খুঁজলাম। যদি তিনি যান তাহলে একসঙ্গে সিনেমা দেখা যাবে। মনে মনে ঠিক করে রেখেছি বালাভাইয়ের অভিনয়ের প্রশংসা করবো। খারাপ বলবো না। তাহলে তিনি কষ্ট পাবেন। আবার ভাবলাম, মিথ্যা আশা দেওয়া কি ভালো?

গিয়ে দেখি বালাভাইয়ের দোকান বন্ধ। ব্যাপার কী? পাশের দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘বালাভাই কোথায়? দোকান বন্ধ কেন?’

তার জবাব শুনে আমি হতভম্ব। সে বলল, ‘সপ্তাহখানেক ধরে তিনি আর দোকানে আসেন না। পরস্পর শুনছি দোকান নাকি বেইচা দিছেন।’

‘কেন?’

পাশের দোকানদার বিরক্তি নিয়ে বলল, ‘তার ইচ্ছা। ব্যবসা করলে মন দিয়ে করতে হয়। ব্যবসা অতো সহজ না। নাটক-যাত্রা করবা আবার ব্যবসাও করবা – দুইটা একসঙ্গে হবে না। যেকোনো একটা করতে হবে।’

আমার মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। ভাবলাম, সিনেমা হলে হয়তো দেখা হয়ে যেতে পারে। সেখানেও পেলাম না।

খবর পেলাম দোকান বিক্রি করে বউ-পোলাপান ফেলে বালাভাই ঢাকা চলে গেছেন। মোট কথা ভাগ্য পরীক্ষায় তিনি যুদ্ধে নেমেছেন। সিনেমা তিনি করেই ছাড়বেন। দেখিয়ে দেবেন তিনিও পারেন। কষ্ট না করলে কেষ্ট মেলে না। তিনি শুনেছেন, সিনেমার জন্য দেওয়ান নজরুল অনেক কষ্ট করেছেন। থাকার জায়গার অভাবে এফডিসির ফ্লোরে ঘুমিয়েছেন। আজ তার দিন ফিরেছে। তিনি এখন বিখ্যাত পরিচালক। বালাভাইও সবাইকে দেখিয়ে দেবেন।

তিন

বেশ কয়েক বছর পর সলপ স্টেশনে এসে স্টেশনের জরাজীর্ণ অবস্থা দেখে মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। ওয়েটিংরুমে ঢুকে দ্রুত বেরিয়ে আসতে হলো নাক চেপে। সুন্দর ওয়েটিংরুমটা এখন। বালাভাইয়ের দোকানটা অন্য লোকের দখলে। তারা দোকান আরো জমকালো করে সাজিয়েছে। আমি আব্দুলভাইয়ের দোকানে চা খেয়ে তার সঙ্গে কিছুক্ষণ বালাভাইকে নিয়ে গল্প করলাম। তারপর স্টেশন ধরে ফিরে আসতে স্টেশনের দক্ষিণ প্রান্তে বড় কড়ই গাছের নিচে দেখলাম একজন হুজুর মাইকে ওয়াজ করেছেন। তার সামনে একটি টেবিলে মাইকের মেশিন। তিনি চেয়ারে বসে খুব সুন্দর করে ওয়াজ করছেন। পথিকরা যাওয়া-আসার পথে তার টেবিলে টাকা দিয়ে যাচ্ছে। মসজিদে সাহায্য করলে অনন্তকাল নেকি পাওয়া যায়।

লোকটাকে আমার চেনা চেনা লাগছিল। আমি খানিক গিয়ে আবার ফিরে এসে তার পেছনে দাঁড়ালাম। মুখে দাড়ি, মাথায় টুপি – এই গেটআপে তাকে অচেনা মনে হলেও কণ্ঠস্বর আমার বিভ্রান্তি দূর করে দিলো। এ তো আমার সেই প্রিয় বালাভাই। ওয়াজ শেষ করে একটু দম নিলেন। হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে সঙ্গে সঙ্গে মুখটা ফিরিয়ে নিলেন। আব্দুলভাই বলেছেন, দিনের পর দিন বালাভাইয়ের কোনো খবর না পেয়ে ছেলেমেয়ে নিয়ে অভাবের জ¦ালা সহ্য করতে না পেরে তার বউ, বড় ছেলেটা কোথায় চলে গেছে কেউ বলতে পারে না। বালাভাই জীবনযুদ্ধে পরাজিত হয়ে অবশেষে বাড়িতে ফিরে এসে পরিবারের নাজুক পরিস্থিতি দেখে আমূল বদলে গেছেন।

আমি কাছে গিয়ে সালাম দিলাম। বললাম, ‘বালাভাই কেমন আছেন?’

খুবই মোলায়েম স্বরে সালামের জবাব দিয়ে বললেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ।’

‘আমাকে চিনতে পেরেছেন?’

কোনো জবাব দিলেন না। বুঝতে পারলাম, তিনি আমাকে চিনতে চাইছেন না। যেন অতীত তার কাছে দুর্বিষহ যন্ত্রণা। সব মুছে ফেলতে পারলে যেন বাঁচেন।

একসময় আমাদের কত গল্প হতো। আর এখন নীরবতা আমাদের পরস্পরের সঙ্গী। আমাদের তেমন কথা হচ্ছে না। বালাভাই বলতে চাচ্ছেন না। আমি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বললাম, ‘বালাভাই আসি। এখন দিনকাল কেমন কাটছে? খুব সহজভাবে বললেন, ‘খুব ভালো। আত্মার শান্তি পাই। কাজটা অভিনয় মনে হয় না।’