‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলনের শতবর্ষে আবদুল কাদির

উনিশ শতকে নবযুগের নতুন সূর্যের নতুন আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে আড়মোড়া ভেঙে জেগে ওঠে মহানগর কলকাতা, সূচিত হয় এক নতুন যুগের, ঐতিহাসিকরা যার নাম দেন বেঙ্গল রেনেসাঁস বা নবজাগৃতি। নতুন যুগের ভোরে রামমোহন, দ্বারকানাথ, দেবেন্দ্রনাথ, কেশব সেন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র প্রমুখের মননচর্চার হাত ধরে হিন্দুসমাজের যখন ঘুম ভাঙছে, বাঙালি মুসলমান সমাজে তখন গভীর রাত। এরা তখনো উনিশ শতকের মানুষ হয়ে উঠতে পারেনি, যেন কোনো প্রাচীন কৌমের সদস্য। তখনো তারা পাশ্চাত্য শিক্ষা, মননচর্চা ও সিভিল সমাজ থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছে। সংগত কারণেই বাঙালি মুসলমান সমাজে উনিশ শতকীয় রেনেসাঁসের আলো ঢুকতে পারেনি, যেমন ঢুকেছিল ওপরতলার শিক্ষিত বর্ণহিন্দু ও ব্রাহ্ম সমাজে। উনিশ শতকের প্রথমদিকেই রাজা রামমোহন বাঙালির ভাবজগতে ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে যুক্তিবাদের মেলবন্ধন রচনা করে এক নতুন ধারা প্রবর্তনে সচেষ্ট হন। হিন্দু ধর্ম, ক্রিশ্চিয়ানিটি ও ইসলামের শ্রেষ্ঠ ঐতিহ্য ও সুকৃতিসমূহ আত্মস্থ করে হিন্দুধর্মকে তিনি নতুনভাবে নির্মাণ করতে ব্রতী হলেন। বাইবেল, কোরআন ও শঙ্করের অদ্বৈতবাদের পাঠ গ্রহণ করে ভারতবাসী তথা বাঙালি সমাজকে জানিয়ে দিলেন, বিশ্বের প্রতিটি ধর্মের লক্ষ্য অভিন্ন। মানবজাতির নৈতিক উৎকর্ষ সাধন এবং মানুষের ভেতর শ্রেয়োবোধ জাগাতে যুগের প্রয়োজনে প্রতিটি ধর্মের পুনর্মূল্যায়ন ও পুনর্ব্যাখ্যা হওয়া আবশ্যক। তিনি বললেন, আত্মিক মুক্তির জন্য স্বধর্ম বা স্ব-সম্প্রদায় ত্যাগের কোনো প্রয়োজন নেই। বরং অন্ধত্ব, গোঁড়ামি, কূপমণ্ডূকতা ও কুসংস্কার ত্যাগ করে প্রতিটি ধর্মের ভিতর যে মানবিক ও নৈতিক দিকগুলো রয়েছে সেইগুলো গ্রহণ করা জরুরি। ধর্ম সম্পর্কে রামমোহনের মতামত ভারতীয় হিন্দু সমাজকে দারুণভাবে নাড়া দিয়ে যায়, যদিও সমকালে তাঁর মতামত সেইভাবে গৃহীত হয়নি, আবার খাটো করার স্পর্ধাও কেউ দেখাতে পারেনি। রামমোহনের সমসময়ে বাঙালি মুসলিম সমাজের চিন্তাজগতে পরিবর্তনের তেমন কোনো উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয় না। কোনো চিন্তক যুক্তির সঙ্গে ধর্মবিশ্বাসের মিলন রচনার চেষ্টা করেছিলেন কি না, তারও সন্ধান পাওয়া যায় না। বাঙালি মুসলমানের চিন্তাজগতে অগ্রগামী ও মিলনধর্মী চিন্তার আভাস পাওয়া যায় অনেক পরে, আজ থেকে একশ বছর আগে (১৯২৬) ঢাকার মুসলিম সাহিত্য সমাজ তথা শিখাগোষ্ঠীর চিন্তানায়কদের মাধ্যমে। শিখাগোষ্ঠীর অভ্যুদয়কালে বিদ্রোহী কবি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর কবিতা-গান-গজল বাংলার তরুণচিত্তে উন্মাদনা সঞ্চার করেছে, প্রেম ও দ্রোহের এক অমোঘ আবর্তনে দলে দলে মানুষ, বিশেষত তরুণ সমাজ নজরুলকে ঘিরে অনুপ্রাণিত ও ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। কিন্তু বাঙালি মুসলমান প্রভাবশালীরা তাকে আন্তরিক আবেগে সেইভাবে বরণ করে নিতে পারেননি। সেই দ্বন্দ্বমুখর সময়ে শিখাগোষ্ঠীর তরুণ চিন্তক-সংগঠকরা বাঙালি মুসলমান সমাজের জ্ঞানের দীপশিখা জ্বালাতে চেয়েছিলেন। তরুণ তুর্কিদের ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এর শিখার আলো জ্বলেছিল ক্ষণকালের তরে, মাত্র পাঁচ বছর। ফলে চারদিকের প্রগাঢ় অন্ধকার দূর করা সম্ভব হয়নি। যুগের প্রয়োজনে ধর্ম, সাহিত্য ও সাহিত্য-ব্যক্তিত্বদের তাঁরা পুনর্মূল্যায়ন করতে চেয়েছিলেন। আবুল হুসেন (১৮৯৭-১৯৩৮), কাজী আব্দুল ওদুদ (১৮৯৪-১৯৭০), কাজী আনোয়ারুল কাদির (১৮৮৭-১৯৪৮), কাজী মোতাহার হোসেন (১৮৯৭-১৯৮১), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক শ্রেণির ছাত্র আবুল ফজল (১৯০৩-৮৩), ঢাকা কলেজের ইন্টারমিডিয়েট শ্রেণির ছাত্র আবদুল কাদির (১৯০৬-৮৪) প্রমুখ তরুণ চিন্তক ১৯২৬ সালে ঢাকা শহরে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ নামে যে 
 সাহিত্য-সংগঠনটি গড়ে তোলেন, তার মূলমন্ত্র ছিল বুদ্ধির মুক্তি। সংগঠনের মুখপত্র শিখার প্রথম সংখ্যায় প্রকাশকের নিবেদনে বলা হয় : ‘শিখার প্রধান উদ্দেশ্য বর্তমান মুসলমান সমাজের জীবন ও চিন্তাধারার গতির পরিবর্তন সাধন।’ শিখা ও মুসলিম সাহিত্য সমাজের সংগঠকরা বিশ্বাস করতেন, বুদ্ধির মুক্তি ভিন্ন বাঙালি মুসলমান সমাজের চলার পথ রুদ্ধ হয়ে পড়তে পারে। এ-প্রসঙ্গে শিখাগোষ্ঠীর প্রাণপুরুষ আবুল হুসেনের মন্তব্য : ‘মুসলমান জগৎ বুদ্ধির ঘরে তালা লাগিয়ে কেবল শাস্ত্রের দোহাই দিয়ে মুসলমানের চলার পথে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে।’ আবদুল কাদির ছিলেন ঢাকার বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের নেতৃস্থানীয় উদ্যোগী ও অগ্রণী ব্যক্তিত্ব; অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্ব। শিখা গোষ্ঠী কিংবা মুসলিম সাহিত্য সমাজের চিন্তাচর্চা তৎকালীন বাঙালি মুসলমান সমাজে কী ধরনের প্রভাব বিস্তার করেছিল, কোন ভাবকল্প নিয়ে শিখাগোষ্ঠী আবির্ভূত হয়েছিল, তাদের বৌদ্ধিক তৎপরতার অনুগামী কারা ছিলেন – আজ শতবর্ষ পরে সেসব জিজ্ঞাসার উত্তর পাওয়ার জন্য আবদুল কাদিরকে মূল্যায়ন খুবই জরুরি। 

দুই

নানা সীমাবদ্ধতা ও প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও শিখা সমকালে বাঙালি মুসলমান শিক্ষিত সমাজে বিপুল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল, যদিও সাধারণ জনমানুষের সঙ্গে পত্রিকাটির কোনো সম্পর্ক ছিল না। ডিরোজিওর ইয়ং বেঙ্গল মুভমেন্টের সঙ্গে তুলনা করে শিবনারায়ণ রায় শিখাগোষ্ঠীর তৎপরতাকে চিহ্নিত করেন ‘আ নিউ রেনেসাঁস’ হিসেবে। শিখার যে প্রথম সংখ্যা (চৈত্র, ১৩৩৩) প্রকাশিত হয় তার সম্পাদক ছিলেন অধ্যাপক আবুল হুসেন আর প্রকাশকের দায়িত্ব পালন করেন আবদুল কাদির। কাদির ছিলেন একাধারে কবি, ছান্দসিক, প্রাবন্ধিক, গবেষক, সাহিত্য-সমালোচক ও 

সাময়িকপত্র-সম্পাদক। শতবর্ষ পরও মুসলিম সাহিত্য সমাজ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পক ও শিখার প্রকাশক হিসেবে আবদুল কাদিরের নাম আবুল হুসেন ও কাজী আবদুল ওদুদের সঙ্গে শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হচ্ছে। মেধা-মননে দীপ্তিমান কাদির ঢাকা কলেজে ছাত্রাবস্থায় সান্নিধ্য লাভ করেন বাংলা ও ইংরেজির শিক্ষক মনস্বী চিন্তক আবদুল ওদুদ ও পরিমলকুমার ঘোষের (১৮৮৮-১৯৬০)। পরবর্তীকালে কাদির হয়ে ওঠেন আবদুল ওদুদের অকৃত্রিম অনুরাগী ও বুদ্ধিবৃত্তিক-সাহিত্যিক অভিযাত্রার সহযাত্রী। গভীর সাহিত্য-অনুরাগ, কাব্যচর্চা, পত্রিকা প্রকাশনায় জড়িয়ে পড়ার কারণে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পরিসমাপ্তি ঘটে বিএ পাশ করার আগেই।

কর্মজীবনের সূচনায় আবদুল কাদির সাহিত্যচর্চাকে বেছে নেন জীবন-জীবিকার একমাত্র অবলম্বন হিসেবে। কবিতাচর্চার পাশাপাশি সাহিত্য সাময়িকপত্র সম্পাদনায় যুক্ত হন। ‘ছাত্রজীবনেই তাঁর বহু কবিতা দীপিকা, কোহিনূর, ইসলাম-দর্শন, নকীব, মোহাম্মদী, কল্লোল, উত্তরা, উপাসনা, প্রগতি, মানসী ও মর্মবাণী, সওগাত, নওরোজ, আত্মশক্তি, নবশক্তি, নবশক্তি, যুগের আলো প্রভৃতি সাময়িকপত্রে প্রকাশ লাভ করে।’ আবদুল কাদিরের সাংবাদিক জীবনের সূচনা হয় ১৯২৬ সালে কলকাতার বিখ্যাত সওগাত পত্রিকার সম্পাদনা বিভাগে চাকরিলাভের মাধ্যমে। কাদির ছিলেন কৈশোর থেকে সাহিত্যপ্রাণিত। বসুমতী, প্রবাসীতে প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথের গান ও কবিতা পড়ে তাঁর মধ্যে কবিতা লেখার প্রেরণা জাগে। ঢাকা কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়ার কালে প্রথম কবিতা ‘হযরত মোহাম্মদ (সা.)’ প্রকাশিত হয় মওলানা আকরাম খাঁ-পরিচালিত মোহাম্মদী পত্রিকায়। নিতান্ত আন্তর প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজ উদ্যোগ ও অর্থায়নে বাংলা ১৩৩৭ সনে বের করেন মাসিক পত্রিকা জয়তী। একই সঙ্গে সাপ্তাহিক নবশক্তির সম্পাদনা বিভাগেও দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। জয়তীর মাধ্যমে সাহিত্যিক হিসেবে যশ ও খ্যাতি অর্জন করেন, যদিও পত্রিকাটি মাত্র দুই বছর টিকে ছিল; কিন্তু স্বল্পসময়ের মধ্যে বাঙালি বিদ্বৎ সমাজে বিপুল সমাদরলাভে সমর্থ হয়। শিখাগোষ্ঠীর ভাবযোগী কাজী আবদুল ওদুদ পত্রিকাটির প্রশংসা করেছেন বিভিন্ন সময়ে। আবুল ফজল পত্রিকাটি সম্পর্কে এক প্রবন্ধে লেখেন :

জয়তী বের হল বৈশাখ ১৩৩৭ থেকে অর্থাৎ কল্লোল বন্ধ হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই। কাজেই কল্লোলের কিছুটা সুর জয়তীতেও প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো। এমন কি কল্লোল গোষ্ঠীর কারো কারো যেমন অচিন্ত্য সেনগুপ্ত, প্রেমেন্দ্র মিত্র, প্রবোধ সান্ন্যাল প্রভৃতির লেখাও জয়তীতেই স্থান পেতে লাগলো। প্রবীণদের মধ্যে জয়তীতে লেখা দিয়েছেন প্রমথ চৌধুরী, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মোহিতলাল মজুমদার, ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, দিলীপকুমার রায় প্রভৃতি। আর ঢাকা সাহিত্য সমাজকে কেন্দ্র করে যারা বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন চালিয়ে ছিলেন – যেমন, কাজী আব্দুল ওদুদ, আবুল হুসেন, কাজী মোতাহার হোসেন, আনওয়ারুল কাদির প্রভৃতিও লিখতে লাগলেন জয়তীতে নিয়মিত। আর স্বয়ং নজরুল তো আছেন প্রতি সংখ্যায়। 

জয়তীর প্রকাশনা বন্ধ হওয়ার পর (শেষ সংখ্যা বৈশাখ ১৩৩৯) আবদুল কাদির কলকাতার দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার বার্তা বিভাগে যোগ দেন। ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি কাজী নজরুল ইসলাম-সম্পাদিত দৈনিক নবযুগ পত্রিকায় বার্তা সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষদিকে তিনি কলকাতা করপোরেশন স্কুল থেকে ছুটি নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রচার সংস্থার অনুবাদক হিসেবে যোগদান করেন। বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তির পর কিছুদিনের জন্য বাংলা সরকারের প্রচার বিভাগে সহকারী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পরেও পাঁচ বছর তিনি কলকাতায় অবস্থান করেন। ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি সাপ্তাহিক মোহাম্মদীতে সম্পাদকীয় বিভাগে ও সাপ্তাহিক পয়গাম-এ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতার করপোরেশন স্কুলের চাকরি ছেড়ে ঢাকায় এসে জুলাই মাসে তিনি পূর্ববঙ্গ স্ট্যাটিসটিক্যাল বোর্ড অফিসে ইন্সপেক্টর হিসেবে যোগদান করেন। আড়াই মাস কাজ করার পর তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয়ের অধীনে আঞ্চলিক পাবলিসিটি অফিসার পদে নিযুক্ত হয়ে সরকারের মুখপত্র মাহে নও পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব নেন। পরবর্তীকালে ১৯৬৪ সালে তিনি কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ডে প্রকাশন অফিসার হিসেবে যোগদান করেন। 

তিন

আবদুল কাদির সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় কাজ করেছেন; কিন্তু কবি হিসেবেই তিনি সর্বাধিক পরিচিত। ‘সৌন্দর্য ও আনন্দ’ তাঁর ‘অন্তরে সঞ্চারিত করেছিল কবিতা প্রণয়নের প্রেরণা’; কিন্তু ‘স্বদেশের ও স্ব-সমাজের মূঢ় ও নির্যাতিত মানুষের জীবন ও মন কিরূপে মুক্ত ও বিকশিত হতে পারে – এই ভাবনা আমাকে করে অধিকতর ব্যাকুল;’ তারপরও ত্রিশের দশক থেকে তিনি একজন প্রতিষ্ঠিত কবি, বহুবিধ সাহিত্যিক-বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতার মধ্যেও তাঁর কবি অভিধাটি আমৃত্যু বুকের ভেতর আগলে রেখেছিলেন। প্রথম কাব্যগ্রন্থ দিলরুবা (১৯৩৩) কবি হিসেবে তাঁকে প্রতিষ্ঠা এনে দেয়। মানুষের যাপিত জীবনের নানা দিক নিপুণভাবে প্রতিফলিত হয়েছে এ-কাব্যে, তাই প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কবিতানুরাগী পাঠকসমাজের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণে সমর্থ হয়। শিখাগোষ্ঠীর অন্যান্য লেখক-চিন্তকের মতো আবদুল কাদির ছিলেন রবীন্দ্রপ্রেমী; রবীন্দ্রনাথের বৈভবমণ্ডিত কাব্যভুবনের দিকে তাকিয়েই সূচিত হয় তাঁর সাহিত্যযাত্রা। সাহিত্যযাত্রার সূচনাতেই কাদির ধন্য হন রবীন্দ্রনাথের সপ্রশংস অভিনন্দন লাভ করে, দিলরুবা কাব্যগ্রন্থটি পাঠ করে ১৯৩৮ সালের ১০ই জানুয়ারি রবীন্দ্রনাথ পত্র মারফত আশীর্বাদ জানিয়ে লিখেছিলেন :

তোমার দিলরুবা বইখানি পড়ে খুশি হলুম। ভাষা ও ছন্দে তোমার প্রভাব অপ্রতিহত। তোমার বলিষ্ঠ লেখনীর গতিবেগ কোথাও ক্লান্ত হয় না। বাংলার কবি সভায় তোমার আসনের অধিকার অসংশয়িত, বিষয় অনুসারে যে কবিতায় তুমি মাঝে মাঝে আরবি পারসি শব্দ ব্যবহার করেছ আমার কানে তা অসঙ্গত বোধ হয়নি। 

নজরুলও দিলরুবা সম্পর্কে সপ্রশংস মন্তব্য করেন। দিলরুবাতে ফুটে ওঠে কাদিরের সত্যিকারের কবিমানসটি, তিনি হয়ে ওঠেন দিলরুবার কবি। এই কাব্যে এমন কিছু আরবি ফারসি শব্দ আছে যা নজরুলের কাব্যে নেই, এমন কিছু প্রাকৃতিক শব্দ আছে যা রবীন্দ্রনাথের রচনাতেও খুঁজে পাওয়া যায় না। দিলরুবায় এমন এক ঐতিহ্যপ্রেমী নিবেদিতপ্রাণ কবি ও সাহিত্যশিল্পীকে পাওয়া যায়, যিনি বাঙালি মুসলমান সমাজের দৈন্য-দুরবস্থায় ব্যাকুল। সাহিত্যচর্চা করতে এসে কাদির চিনতে পারেন সমস্যাদীর্ণ দুর্দশাগ্রস্ত বাঙালি মুসলমান সমাজকে। প্রথম যৌবনে ভেবেছিলেন বিশুদ্ধ সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করবেন, কিন্তু বাঙালি মুসলমান সমাজের মানসিক দৈন্য ও হীনম্মন্যতা সেই চর্চার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তিনি বেশ বুঝতে পারেন, যে-সমাজ থেকে তিনি এসেছিলেন, সেই সমাজ ছিল বড়ই অকরুণ, বন্ধ্যা এবং শিল্পচর্চায় অনাগ্রহী ও মুক্ত জ্ঞানচর্চায় বাধাদানে তৎপর। এমন বিরূপ-বিরুদ্ধ পরিবেশের মধ্যে দাঁড়িয়েও তিনিও তাঁর বুদ্ধির মুক্তিপন্থী অগ্রজ সহযাত্রীদের নিয়ে বিশুদ্ধ সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি বাঙালি মুসলমান সমাজের মানসিক দৈন্য ঘোচাতে সংস্কারমুক্তির তৎপরতা অব্যাহত রেখেছিলেন। প্রথম কাব্যযাত্রাতেই স্বসমাজের সর্বাঙ্গীণ মুক্তির প্রাণপণ সাধনার আকাক্সক্ষা পরিলক্ষিত হয় : ‘মোস্লেম আজি নব ভাগ্য বিবর্তন।/ শতাব্দীর তন্দ্রা ভাঙি জাগি সেই দুরন্তেরা করিছে নর্তন/ প্রভাতের আলোর উল্লাসে;/ সম্মুখের যাত্রাপথে চলি’ তারা রক্ত-রাঙা বসে/ গাহিছে নির্ভয় -/ শিরায় শিরায় নাচে যৌবন দুর্জ্জয়!’ কবিতাটি পড়লে এক অপরিমেয় শক্তি ভেতর থেকে জেগে ওঠে। জাতির জন্য একটি সুন্দর পথ নির্মাণে কেউ যেন আমাদের সাহসী করে তোলে। কবিতা লিখতে গিয়ে কবি উপলব্ধি করেন, তাঁর সমাজ নানা কারণেই স্থবির, বদ্ধ, পশ্চাৎমুখী। বাংলার মুসলমান সমাজে উল্লেখ করার মতো শিল্প-সাহিত্য ও মননচর্চা নেই। যে-সমাজে সাহিত্যচর্চা নেই, মননচর্চা হয় না,
 সে-সমাজ গৌরবের আসন লাভ করতে পারে না। তিনি আরো বুঝতে পারেন, বাঙালি মুসলমান সমাজের সামগ্রিক মুক্তির জন্য প্রয়োজন মনুষ্যত্বের বিকাশ ও চর্চা, আর তা সম্ভব নতুন নতুন সাহিত্য সৃজনের মাধ্যমে। একটি উৎপীড়িত, বঞ্চিত, শোষিত ও পশ্চাৎপদ সম্প্রদায়ের মানবিক বিপর্যয় রোধ ও ভাগ্যোন্নয়নের জন্য কেবল ঐতিহ্যপ্রীতি ও অতীতাশ্রয়ী দৃষ্টিভঙ্গি যথেষ্ট নয়, পরিবর্তনশীল বাস্তবতা ও রূঢ় পারিপার্শ্বিকতা অনুধাবন করে যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণও জরুরি। মুজফ্ফর আহমদ, নজরুল ও কাদিরের জীবন কলকাতায় এসে এক রেখায় মিলিত হয়। মুজফ্ফর আহমদ, নজরুল ইসলাম ও বামপন্থীদের সান্নিধ্য তাঁকে সাম্যবাদী ভাবাদর্শের প্রতি আগ্রহী করে তোলে। রাশিয়া থেকে ভেসে আসা মানবমুক্তির নহবত ও সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের বিপুল তরঙ্গ তাঁর কবিতাতেও আছড়ে পড়ে। তিনি লিখেছেন : ‘ধূলি কাদা-মাখা মানুষের শিশু দলে দলে আজ করিছে ভিড়।/ আপন প্রাপ্য অধিকার চায় – তার লাগি দিবে লাল রুধির।/ বঞ্চিত আর রহিবে না তারা, সহিবে না বসি অত্যাচার;/ উৎপীড়কের উত্তর দিবে, এসেছে সহসা প্রাণে জোয়ার।’ 

শিল্প-সচেতন কবি হিসেবে কাদিরের কাব্যযাত্রার অভিমুখ ছিল প্রেম ও সৌন্দর্যের দিকে। তাঁর কবিতায় প্রেমের জন্য হাহাকার নেই, আবার বেসামাল উচ্ছ্বাসও নেই। তাঁর কবিতা রোমান্টিক উচ্ছ্বাসে টলটলায়মান, সেখানে হৃদয় সংবেদের চেয়ে চেতনার অনুরণন বেশি। রবীন্দ্রনাথের রোমান্টিকতা ও সৌন্দর্যবোধ তাঁর কাব্যভাবনাকে সমৃদ্ধ করলেও তীব্র আবেগ, মর্ত্যপ্রীতি, ইহজাগতিক ভোগবাদ, জৈব আকুতি, শরীরী সংরাগ তাঁর কাব্যভুবনকে স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত করে তুলেছে। তাঁর কাব্যপ্রয়াসে মোহিতলাল মজুমদারের ধ্রুপদ সংগঠন, ঐতিহ্যপ্রেম, ছন্দোমনস্কতা এবং নজরুলের বাঁধভাঙা আবেগের অপূর্ব সমন্বয় লক্ষ করা যায়। কাদিরের অন্তর্জগৎ বিনির্মাণে রবীন্দ্রনাথ, দেবেন্দ্রনাথ সেন, মোহিতলাল, নজরুল প্রমুখের প্রভাব অস্বীকার করা যায় না, তবে তিনি কাউকে অন্ধভাবে অনুকরণ করেননি। ফলে দিলরুবা প্রকাশের পর বিপুলসংখ্যক পাঠক-সমাদর লাভ করে। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, মোহিতলাল, জসীম উদ্দীন, কাজী আবদুল ওদুদ প্রমুখ কবি-সাহিত্যিক দিলরুবার অন্তর্গত কবিতাগুলো পড়ে আবদুল কাদিরকে অভিনন্দন জ্ঞাপন করে স্বীকার করেন যে, এই কাব্যগ্রন্থ তাঁকে বাংলা কাব্যভুবনে স্থায়ী ও শক্তিশালী আসন করে দেবে। 

আবদুল কাদিরের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ উত্তরবসন্ত প্রকাশিত হয় দিলরুবা প্রকাশের ত্রিশ বছর পরে। উত্তর বসন্ত পুষ্পগন্ধী এক অনবদ্য প্রেমের আখ্যান। এতে কয়েকটি সনেটও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। অব্যাহত চর্চা ও সাধনার মধ্য দিয়ে কাদির নিজেকে পরিণত করেছিলেন বিরলপ্রজ কবি ও সাহিত্যিক ব্যক্তিত্বে। কিন্তু একপর্যায়ে তিনি কবিতা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। কেন তিনি নিজেকে বাংলার কাব্যভুবন থেকে সরিয়ে রেখেছিলেন, তা কবি তাঁর নিজের জবানিতে জানান দিয়েছেন। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন : ‘সৌন্দর্য ও আনন্দ আমার অন্তরে সঞ্চার করেছিল কবিতা প্রণয়নের প্রেরণা, কিন্তু স্বদেশ ও স্ব-সমাজের মূঢ় ও নির্যাতিত মানুষের জীবন ও মন কিরূপে মুক্ত ও বিকশিত হতে পারে এই ভাবনা ক্রমশ আমাকে করে অধিকতর ব্যাকুল; ফলে আমাদের রাষ্ট্রনীতিক আর্থনীতিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও তৎপরতার ইতিহাস সন্ধানের দিকে আমার মনোনিবেশ বৃদ্ধি পায়; আমার বিবিধ প্রবন্ধে আছে তার বিচিত্র পরিচয়। আমার জীবনে কবিতার অনুশীলন অপেক্ষা সাহিত্যের গবেষণা ও সম্পাদনার পরিমাণ এই কারণেই হয়েছে তুলনায় অধিক।’

কাজী আবদুল ওদুদের একটি জীবনী রচনা করেছিলেন তিনি। এ-জীবনীগ্রন্থে ওদুদের সাহিত্য-সাধনার পাশাপাশি রয়েছে মুক্তবুদ্ধিচর্চার আন্দোলন ও বাঙালি মুসলমানের মানসযাত্রার বিবরণ। আবদুল ওদুদ ও আবুল হুসেন বাঙালি মুসলমান সমাজকে শাস্ত্রানুগত্য ও যুক্তিহীনতার অন্ধগলি থেকে প্রশস্ত রাজপথে আনতে চেয়েছিলেন। আবদুল কাদিরও চেয়েছিলেন বাঙালি মুসলমানের চিত্তের মুক্তি।

চার

বাংলা কবিতায় আবদুল কাদিরের অবদান অসামান্য; কিন্তু গবেষক, সাময়িকপত্র-সম্পাদক, প্রবন্ধিক ও ছান্দসিক হিসেবেও ছিলেন অতুলনীয়। বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী এই বিরলপ্রজ মানুষটির অনবদ্য মননকর্ম ছন্দ সমীক্ষণ ১৯৭৯) – এ-গ্রন্থে তিনি বাংলা ছন্দ সম্পর্কে মৌলিক ধারণা ব্যক্ত করেছেন। ছন্দ সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান ছিল অতুলনীয়, বাংলা ছন্দ নিয়ে কাজ করেছেন প্রায় চার দশক। রবীন্দ্রনাথ, প্রবোধ সেন (১৮৯৭-১৯৮৬), দিলীপকুমার রায় (১৮৯৭-১৯৮০), অমূল্যধন মুখোপাধ্যায় (১৯০২-৮৪) ছন্দ-আলোচনায় যে বিজ্ঞানসম্মত ধারা প্রবর্তন করেন, সেই ধারা সুদৃঢ় ভিত্তি পায় কাদিরের হাতে। একজন ছান্দসিক কবি হিসেবে তিনি তাঁর কবিতায় যেমন ছন্দনৈপুণ্যের কৃতিত্ব দেখিয়েছেন, তেমনি ছন্দবিষয়ে বহু নিবন্ধ রচনা করেছেন। তাঁর ছন্দবিষয়ক প্রথম প্রবন্ধ ‘ছন্দ জিজ্ঞাসা’ প্রকাশিত হয় ছায়াবীথি (ফাল্গুন ১৩৩৮) পত্রিকায়। ছন্দবিষয়ে প্রবন্ধ-নিবন্ধ ও গ্রন্থ রচনার জন্য তিনি ছন্দবিজ্ঞানী প্রবোধ সেনেরও প্রশংসা লাভ করেন। একজন ছান্দসিক কবি ও ছন্দ বিশারদ হিসেবে এখানেই তাঁর কৃতিত্ব ও সাফল্য। সাহিত্য-সম্পাদক হিসেবেও তিনি ছিলেন মেধাবী, সৃজনশীল ও শ্রমী। তিনি সম্পাদনা করেন কাব্যসংকলন কাব্যমালঞ্চ (১৯৪৫), মুসলিম সাহিত্যের সেরা গল্প, নজরুল রচনাবলী, রোকেয়া রচনাবলী, সিরাজী রচনাবলী, লুৎফর রহমান রচনাবলী, ইয়াকুব আলী চৌধুরী রচনাবলী, আবুল হুসেন রচনাবলী, কাব্যবীথি ইত্যাদি। শিকড়সন্ধানী, ঐতিহ্যপ্রেমী বিদ্যাজীবী বলতে যা বোঝায় কবি কাদির ছিলেন আক্ষরিক অর্থে তা-ই। সম্ভবত 
 এ-কারণে জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় পার করেছেন বাঙালির জাতীয় ইতিহাসের উপাদান সংগ্রহের নিমিত্তে। কাব্যমালঞ্চ সেই ভাবনার সোনালি ফসল। বাঙালি মুসলমান সমাজের কাব্যসাধনার প্রথম আকরগ্রন্থ হিসেবে বিবেচনা করা যায় সংকলনটিকে। এতে ষোড়শ শতকের কবি শেখ ফয়জুল্লাহ থেকে বিশ শতকের কবি সৈয়দ আলী আহসান (১৯২২-২০০২) পর্যন্ত মোট ১১৭ জন মুসলমান কবির ১৭৪টি কবিতা সংকলিত হয়েছে। কাব্যসংকলনের ভূমিকায় বলা হয় :

সংকলনের কবিতাগুলি বাংলাদেশের মুসলিম সংস্কৃতির অবদান স্বরূপ। মধ্যযুগ হইতে বর্তমান যুগ পর্যন্ত কাব্যালোচনা দ্বারা বাঙলা সাহিত্য ও ভাষার উপর মুসলিম মানসিকতার যে একটা স্থায়ী ছাপ দিতে পারিয়াছেন, এই কবিতাগুলি তাহার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। আমরা আশা করি, হিন্দু-মুসলিম সংস্কৃতি সমন্বয়ের সাধকগণ মুসলিম কবি ও সাহিত্যিকগণের এই অমর অবদানের কথা অগ্রাহ্য করিবেন না। 

উদ্ধৃত বক্তব্য থেকে প্রতীয়মান হয় যে, কোনো সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি বা সম্প্রদায়গত ভাবনা থেকে কাব্যমালঞ্চ সম্পাদনা বা প্রকাশনার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। বাঙালির সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাস-ঐতিহ্যকে অখণ্ডরূপে তুলে ধরতেই এই মহৎ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। গবেষক রেজাউল করীমের অবদান স্বীকার করে নিয়েও বলা যায় যে, এই সংকলনের প্রায় সব দায়িত্ব পালন করেছেন সম্পাদক আবদুল কাদির। তিনি কেবল বাঙালি মুসলমান কবিদের কবিতার নমুনা সংগ্রহ করেই ক্ষান্ত হননি, সঙ্গে সঙ্গে সংকলনে অন্তর্ভুক্ত করেছেন ৫২ পৃষ্ঠার এক দীর্ঘ ইতিহাসনিষ্ঠ ভূমিকা, যেখানে বিধৃত হয়েছে বাঙালি মুসলমান কবি ও তাঁদের কবিতার ইতিহাস। এই মননধর্মী ও তথ্যনিষ্ঠ রচনাটি সাহিত্য-সমালোচক ও গবেষক হিসেবে তাঁকে বাংলা সাহিত্যে স্থায়ী আসন পাইয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে অনেক সাহিত্য-সমালোচক মনে করেন। তিনি এই উঁচুমানের রচনায় মুসলমান কবিদের কবিতাগুলি সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করে দেখান যে, বাঙালি মুসলমান সমাজ শিল্প-সাহিত্য বিকাশের জন্য কোনোকালেই তেমন অনুকূল ছিল না। এই সমাজ সৃজনশীল কর্মপ্রয়াসকে সেইভাবে অনুপ্রাণিত করেনি বা করতে চায়নি। বিরূপ-বৈরী পরিবেশের কারণে প্রতিভাধর বলতে যা বোঝায় সে রকম কবি-সাহিত্যিক বা সৃষ্টিশীল ব্যক্তি এই সমাজে জন্মগ্রহণ করেননি। স্পষ্টভাবেই তিনি জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, বাঙালি মুসলমান তার প্রতিবেশ, পুরাণ, ঐতিহ্য কিংবা চারদিকের বহমান বিচিত্র জীবনধারা থেকে প্রাণরস সংগ্রহ করতে পারেনি, তাই তার পক্ষে সন্ধান পাওয়া সম্ভব হয়নি অমৃত, অমরত্ব, আনন্দ কিংবা জীবনের চরিতার্থতার। অতিরিক্ত ভাববিহ্বলতা, অন্ধ অনুবর্তিতা, সম্মোহিত দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বড়মাপের বা মানের কিছু যে হওয়া যায় না, তা তিনি নিজে মেনেছেন এবং অপরকে মানতে বলেছেন। তাঁর মনে হয়েছে, ‘সবল মনুষ্য-প্রকৃতি আর উদার বিচার-বুদ্ধির’ অভাবে বাঙালি মুসলমান সম্প্রদায় বুদ্ধি-বিচার-আত্ম-আনন্দ – এই সবকিছুর আস্বাদ থেকে বঞ্চিত। সে-কারণে বোধ হয়, শেখ ফয়জুল্লাহ থেকে ফররুখ আহমদ পর্যন্ত আমাদের মুসলমান সমাজের যে কাব্যজগৎ সেখানে আলাদা বা স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত কিছু পাওয়া যায় না। কাদিরের মনে হয়েছে, মাটি-মানুষ-প্রকৃতির সঙ্গে সহজ ও সুনিবিড় সম্পর্কের অভাবে বাঙালি মুসলমান পূর্ণরূপে বিকশিত হতে পারেনি। জীবন রূপায়ণের জন্য যে অশেষ আত্মবিশ্বাস ও আত্মিক শক্তির প্রাখর্য দরকার, তার কোনো কিছুই মুসলমান কবিদের মধ্যে ছিল না। সত্যি বলতে কি,
 কাচ-রোদ্দুর, ছায়া অরণ্য, পুকুর, ছোট নদী, সবজি বাগান, নিকিয়ে-নেওয়া উঠোন, তেঁতুলের ডাল থেকে উড়ে আসা মাছরাঙা, মাদারের ডালে বসা শঙ্খচিলের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছাড়া কেউ মহৎ কবি হয়ে উঠতে পারে না। এটা অন্য কবিদের ক্ষেত্রে যেমন সত্য, মুসলমান কবিদের ক্ষেত্রেও সত্য। এই সত্য তখনকার মুসলমান কবিরা কী অনুধাবন করতে পেরেছিলেন? এক কথায়, পারেননি। তবে, বিষয়টি কাদির অনুধাবন করেছিলেন। তাঁর সম্পাদিত কাব্যমালঞ্চের মাধ্যমে বাঙালি সারস্বত সমাজকে বোঝালেন যে, হিন্দু-মুসলমানের মিলিত সাধনার মাধ্যমে বাংলা ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির বুনিয়াদটি নির্মিত হয়েছে। বাংলা সাহিত্যে হিন্দুর যেমন দান রয়েছে, তেমনি মুসলমানের অবদানও কম নেই। কিন্তু বিভেদের রাজনীতি মুসলমান সমাজকে সৃজন-মনন চর্চার সর্বক্ষেত্রে পিছিয়ে দিয়েছে, আর সে-কারণে ‘বাংলার মুসলমানের জীবনায়োজন মারাত্মক ত্রুটিতে পরিপূর্ণ’ হয়ে ওঠে; তার ছায়া সাহিত্য ক্ষেত্রেও পড়ে। এ-প্রসঙ্গে সংস্কৃতিতাত্ত্বিক গোপাল হালদারের মন্তব্য পাঠ করা যেতে পারে। তিনি বলেছেন :

বাঙালি জাতি মোটের উপর এক; বাঙলার প্রাচীন সংস্কৃতিও মোটের উপর হিন্দু মুসলমানের দানে এক হয়ে উঠেছে, বাঙলার বর্তমান সংস্কৃতিতে মুসলমানের দানে যে ঘাটতি পড়েছে তার কারণ ঐতিহাসিক, সে ঘাটতি পূরণে নতুন মুসলমান কবিরা উদগ্রীব হয়ে উঠেছেন, কিন্তু সমসাময়িক নানা বিক্ষোভে এদিকে তারা সুস্থ ও সবল আত্মবিকাশের সুযোগ লাভ করছে না, আর না করাতে বাঙলার বর্তমান সংস্কৃতিও সুস্থ ও সবল হয়ে উঠতে পারছে না। 

আবদুল কাদিরের কাব্যসংকলন কাব্যবীথি প্রকাশিত হয় কাব্যমালঞ্চ প্রকাশের নয় বছর পরে। তিনি মুসলমান কবিদের কবিতায় যে দেশপ্রেম, মানবপ্রেম, নিসর্গপ্রীতি, সৌন্দর্য ও মানবিকতার প্রতি নিবিড় অনুরাগ, সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষা, সত্যজ্ঞান ও শ্রেয়োচেতনা, স্বাধীনতা লাভের বাসনা, নতুন সৃষ্টির স্বতোৎসারিত আবেগ ও উন্মাদনা লক্ষ করেছেন, সেসব কবিতা এ কবিতা-সংকলনে অন্তর্ভুক্ত করেছেন।

পাঁচ

কাদিরের সাহিত্যিক উদ্যমের একটি বড় অংশ ব্যয়িত হয়েছে নজরুলচর্চায়। কলকাতায় আবদুল ওদুদের স্নেহচ্ছায়ায় তাঁর নজরুলচর্চার সূচনা; কিন্তু দেশভাগের পর ঢাকায় তা পরিণত রূপ লাভ করে। বাঙলা উন্নয়ন বোর্ড (১৯৬৪-৬৫) থেকে ১৯৬৬ সালে প্রথম প্রকাশিত হয় আবদুল কাদির-সম্পাদিত নজরুল রচনাবলী। তিন খণ্ডে প্রকাশিত নজরুল রচনাবলী নজরুলচর্চার ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনা। স্বাধীনতার পর এর আরো এক খণ্ড প্রকাশিত হয়। নজরুল রচনাবলী সম্পাদনার মধ্য দিয়ে কবি, প্রাবন্ধিক আবদুল কাদির নজরুল গবেষক, সম্পাদক ও বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠেন। তিনি নজরুলের সাহিত্যকর্মকে সময়কাল অনুযায়ী কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করে প্রত্যেক যুগের সৃজনসম্ভারকে ভিন্ন ভিন্ন খণ্ডে বিন্যস্ত করে প্রকাশ করেন। এই গ্রন্থের ‘সম্পাদকের নিবেদন’ পাঠ করে নজরুলের সাহিত্যিকজীবনের এমনসব অনালোকিত দিক জানা যায়, যা সত্যিকার অর্থে বিস্ময়কর। প্রথম খণ্ডে সংকলিত হয়েছে নজরুলের সাহিত্যিকজীবনের প্রথম যুগের রচনাবলি। নজরুলের দেশপ্রেমবিষয়ক রচনাবলি এই খণ্ডে স্থান পেয়েছে। সাহিত্যিকজীবনের প্রথম পর্বে তিনি স্বদেশপ্রেমের অগ্নিমন্ত্রে উজ্জীবিত ও অনুপ্রাণিত হয়ে মহাত্মা গান্ধীর চরকাতত্ত্ব, সি আর দাশের নিয়মতান্ত্রিকতা, দেশমাতৃকার জন্য ক্ষুদিরামের আত্মদান, কামাল আতাতুর্কের নিয়মতান্ত্রিক সংগ্রাম নিয়ে লিখেছেন অসংখ্য কালজয়ী কবিতা ও গান, যা প্রথম খণ্ডে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। নজরুল তাঁর সাহিত্যিকজীবনের দ্বিতীয় পর্বে গণতান্ত্রিক সমাজবাদের দিকে ঝুঁকে পড়েন, ‘ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিজমের প্রতি নজরুলের মনের প্রগাঢ় অনুরাগ তাঁর সাম্যবাদী, সর্বহারা, ফণি-মনসা’র বহু কবিতা গানে সুপরিস্ফুট।’ সাহিত্য-জীবনের তৃতীয় পর্বে কবি সংগীতকার ও সুরস্রষ্টা হিসেবে আবির্ভূত হন। এ-পর্বের সৃষ্টিসমূহ কাদির তৃতীয় খণ্ডে অন্তর্ভুক্ত করেন। নজরুল ইসলামের সাহিত্যিকজীবনের চতুর্থ যুগের সমুদয় রচনা আবদুল কাদির-সম্পাদিত নজরুল রচনাবলীর চতুর্থ খণ্ডে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কবি-জীবনের এই পর্বে তিনি ধর্মতত্ত্বাশ্রয়ী কবিতা ও মরমি গান রচনায় মনোনিবেশ করেন। 

আবদুল কাদির-সম্পাদিত নজরুল রচনাবলীতে নজরুল আবিষ্কৃত হয়েছেন নতুন রূপে, পাঠকের সামনে উদিত হন নতুন অবয়বে। কাদিরের নজরুলপাঠ যদিও ব্যক্তিক মুগ্ধতায় ভরা, তারপরও তিনি নজরুল-সাহিত্যের সাধারণভাবে অনালোচিত দিকগুলির ওপর আলো ফেলে দেখিয়েছেন নজরুলের সৃষ্টিসম্ভারের বৈচিত্র্য। আর সে-কারণে এই গ্রন্থ স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে নজরুলচর্চার দিগন্ত প্রসারিত করেছে। এ-সম্পাদনা গ্রন্থের মাধ্যমে আগ্রহী ও জিজ্ঞাসু পাঠক নজরুলের কবিমানসের গতিপ্রকৃতি ও ভাবধারার সঙ্গে পরিচিত হয়েছে নতুন করে। তিনি খানিকটা প্রত্নতাত্ত্বিকের মতোই আবিষ্কার করেছেন সমগ্র-নজরুলকে এবং তাঁর মণিকাঞ্চনের আভায় উদ্ভাসিত সাহিত্যের নানা দিক, যা পাঠ করতে গিয়ে বিস্ময়ের মুখোমুখি হতে হয় অ-বিশেষজ্ঞ পাঠককে।

আবদুল কাদির যে-প্রতিভাধর

সাহিত্য-ব্যক্তিত্ব ও চিন্তানায়ক ছিলেন, তা বলাই বাহুল্য। সাহিত্যের প্রায় সব শাখাতেই যে তাঁর ছিল সহজ ও অনায়াস বিচরণ, তাও সকলের জানা। তিনি জীবনভর স্বীয় কর্মক্ষেত্রে নিজ দায়িত্বটুকু পরম নিষ্ঠাসহকারে স্বচ্ছন্দ আনন্দে উদযাপন করে গেছেন। মুজফ্ফর আহমদ, আবুল হুসেন, আবদুল ওদুদের চিন্তা, রুচির ঘনিষ্ঠতম সহযাত্রী হিসেবে তিনি ছিলেন স্বচ্ছচিন্তার সৃষ্টিশীল মুক্তচিন্তক। ব্রাহ্মণ-মোল্লা নিয়ন্ত্রিত বাংলায় যখন রাষ্ট্রচিন্তা, সাহিত্যভাবনা, সমাজচিন্তন সাম্প্রদায়িক বিভাজন, প্রভাবশালীদের ‘মাত্রাহীন উন্মাদনা’ ও বিকারগ্রস্ততায় অস্থির হয়ে উঠেছিল তখনো কাদির মুক্ত আকাশের মুক্তবিহঙ্গের মতো স্বাধীনভাবে চিন্তা করেছেন, যুগের হুজুগ থেকে নিজেকে বিযুক্ত রেখেছেন। একজন সাহিত্যশিল্পী ও বড়মাপের সমাজভাবুক ও রাজনীতি-চিন্তক হিসেবে তিনি আজো ভীষণভাবে সমকালীন ও প্রাসঙ্গিক। আবদুল কাদিরের কবিতা, প্রবন্ধ, সাহিত্য-সমালোচনা তাঁর সমকালের 
 কবি-সাহিত্যিক-ভাবুক-চিন্তকদের ভাবিত, বিস্মিত ও আনন্দিত করেছে; ভাবীকালকেও যে করবে, তা দৃঢ়তার সঙ্গেই বলা যায়। কাদিরের মননবিশ্ব ছিল সর্ব অর্থেই স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত। তিনি যে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের সত্যিকারের ধারক-বাহক ছিলেন, তা শিখাগোষ্ঠী প্রতিষ্ঠার শতবর্ষ পরেও উচ্চকণ্ঠে বলা যায়। 

সহায়ক সূত্র

১। আবুল হুসেন, নির্বাচিত প্রবন্ধ, মোরশেদ শফিউল হাসান সংকলিত, ঢাকা, ১৯৯৭,

পৃ ৬৯।

২। ড. খোন্দকার সিরাজুল হক, মুসলিম সাহিত্য সমাজ: সমাজচিন্তা ও সাহিত্যকর্ম।

৩। কয়েকটি স্বল্পায়ু সাহিত্য পত্রিকা সম্পর্কে, সমকাল, শ্রাবণ ১৩৬৮।

৪। আবদুল কাদিরকে লেখা রবীন্দ্রনাথের পত্র, ১০ই জানুয়ারি ১৯৩৮।

৫। অভ্যুত্থান, পৃ ৩৩।

৬। আজাদ, পৃ ২৭।

৭। শামসুজ্জামান খান-কর্তৃক গৃহীত আবদুল কাদিরের সাক্ষাৎকার। চরিত্র, প্রথম সংকলন, বৈশাখ ১৩৮৬, পৃ ৪৯। 

৮। বাঙলা সাহিত্য ও মুসলমান, কাব্যমালঞ্চ। 

৯। পুস্তক-পরিচয় : কাব্যমালঞ্চ, পরিচয়, দশম সংখ্যা, বৈশাখ ১৩৫২।