কান্দাপাড়ার মেয়েরা আত্মহত্যা করে না …।
আমি দশ বছর ওই পাড়ায় ছিলাম, এই দশ বছরে এখানে কেউ আত্মহত্যা করেনি। পাড়ার বয়স নাকি দুইশো বছর। এই সুদীর্ঘদিনে পাড়ার কোনো না কোনো মেয়ে কোনো সময় আত্মহত্যা করে থাকতে পারে, অসম্ভব কিছু না! আমি যে বললাম, কান্দাপাড়ার মেয়েরা আত্মহত্যা করে না – আমার এ-কথা মিথ্যাও প্রমাণিত হতে পারে; প্রকৃত সত্য যে কী, আসলে সেসব আমার জানা নাই। কেউ জানে কি না তা-ও জানি না। পাড়ার খুঁটিনাটি জানে খালা-মাসিরা। তারা কদাচিৎ মেয়েদের সঙ্গে গল্পসল্প করে; তখন নানা ঘটনা, এই যেমন – কে খুব ভালো খদ্দের ছিল, দেদার টাকা ওড়াতো; পাড়ায় গানবাজনা আর মদের আসর বসাতো; কে ছিল খুব হাড়কিপ্টে খদ্দের, কোন খদ্দের ছিল খুব রাগী, শয়তানগোছের; কে টাকা না দিয়ে ‘তুমি আমার প্রিয়তমা, তুমি আমার জান’ – বলতে বলতে কেটে পড়তো – এইসব শোনা যেত! পাড়ার কোন মেয়ের সঙ্গে কোন খদ্দেরের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, কে কে খদ্দেরের সঙ্গে ঘর বাঁধতে পেরেছে, দাগা খেয়েছে কে কে – খালা-মাসিরা এসব গল্পও করতো কদাচিৎ। খালা-মাসিদের জীবনও কতটা দুঃখ-কষ্টে ভরা, কীভাবে এই ক্লেদাক্ত জীবন পার করে এলো, চোখের পানি মুছতে-মুছতে সেই গল্পও করতো কেউ-কেউ। বিমলামাসি আর বকুলখালার কাছে বসলে, এই দুজনের মেজাজই খুব কড়া, যেন ধানি লংকা, মুখে দেওয়ার আগেই যেন মুখ পুড়ে যাবে, সারাদিন চিল্লাপাল্লা করে পাড়া গরম করে রাখে; তবে মেজাজ ভালো থাকলে মেয়েদের সঙ্গে গল্প করে। এই দুজনের গল্প-বলার ক্ষেত্রে মজার একটা ব্যাপার আছে। দুজনে, গল্প শুরু করলে প্রতিদিনই একই গল্প শোনাবে। কিন্তু আশ্চর্য, একই গল্প শুনতাম, মনে হতো নতুন গল্প শুনছি …।
বিমলামাসি শোনাতো এক পুরোহিতের গল্প …।
বকুলখালা মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনাতো …।
বিমলামাসির ঘরে আসতো এক পুরোহিত। মাসির বয়স তখন ত্রিশ-বত্রিশ। পুরোহিত মধ্যবয়সী। সুদর্শন। দেখতে যেন শিবঠাকুর। মাথায় ছোট আকারের টিকি। ইস্ত্রি করা কড়কড়ে, বকের পাখনার মতো ধবধবে সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি পরে আসতো। সপ্তাহে একদিন। প্রতি শনিবার রাতে। রাত ১১টার দিকে আসতো। থাকতো সারারাত। খুব ভোরে, কান্দাপাড়া ঘুমিয়ে থাকতে-থাকতেই চলে যেত। কোথায় বাড়ি, কোথায় নিবাস – বিমলামাসি কিছুই জানতো না। মাসি দু-চারদিন পুরোহিত-লোকটির ঠিকুজি জিজ্ঞেস করেছে। লোকটি বলতো – তার কোনো ঘরবাড়ি নাই। সে পথের মানুষ। মন্দিরে-মন্দিরে পূজা-অর্চনা করে, ঈশ্বরের নাম স্মরণ করে তার দিবানিশি কাটে। একটি লোক পুরোহিত, মন্দিরে-মন্দিরে পূজা-অর্চনা করে, অহর্নিশি ঈশ^রের নাম জপে – অথচ সেই লোকটি কি না রাতে পাড়ায় আসে, নিয়ম করে সপ্তাহে একদিন; বিমলামাসি লোকটিকে চিনতে পারতো না, আসলে এ-ধরনের মানুষকে চেনাও কঠিন; একরাতে পুরোহিত মাসির ঘরে মারা গেল। বিষ খেয়ে এসেছিল …।
আহারে! কী তুচ্ছ মানুষের জীবন! কার মনে কতটা কষ্ট থাকলে সে আত্মহননের পথ বেছে নিতে পারে, কেউ জানে না …!
পুরোহিতের গল্প শুরু করতেই দরদর করে জল ঝরতো মাসির চোখে …।
বকুলখালা কান্দাপাড়ার সবচেয়ে বয়স্ক নারী। শরীর ভেঙে পড়েছে। চোখের জ্যোতি কম। ঠিকমতো হাঁটাচলা করতে পারে না। সুমি, বিন্দু, সুরমা, কুসুম – চারটি মেয়ে আছে খালার। ওরাই খালার দেখাশোনা করে। এই যে খালার ভাঙা শরীর, তাতে কী! তার গলার জোর, দিনভর ঘরের সামনে কামরাঙ্গাগাছের নিচে বসে চিৎকার-চেঁচামেচি, তীব্র রোদের মতো মেজাজ – এসব আগের সেই যুবতী-মধ্যবয়সী নারীর মতোই ধারালো। ফলে – পাড়ার মেয়েরা তার ধারেকাছে যায় কদাচিৎ। গেলেও পাত্তা পায় না। কিন্তু আমার কথা আলাদা। আমি খালার কাছে ওর মেয়েদের মতোই প্রশ্রয় পাই। কেন আমার প্রতি খালার সুনজর, কেন তার প্রশ্রয় পাই, কে জানে! আমিও খালার কাছে সময় পেলেই বসি, শুনতে চাই মুক্তিযুদ্ধের গল্প। তখন খালার বয়স তেইশ কি চব্বিশ। দেবদারুগাছের মতো একহারা গড়ন। হরিণের চোখের মতো বড়-বড় কালো চোখ। সুন্দরী, সুশ্রী। দেখলে মনে হয় – বয়স কোনোমতেই সতেরো-আঠারোর বেশি হবে না। তার ঘরে খদ্দেরের আছড়ে-পড়া লেগেই থাকে। তবে খালা একটা রীতি মেনে চলে। রাত বারোটার পর কিংবা সারারাতের জন্য ঘরে খদ্দের নেয় না। তখন খালার যে মাসি ছিল, শোভামাসি, সে মাঝেসাঝে জোর করতো, খালা বলতো – খদ্দের আমার সোয়ামি না, কেন সারারাতের জন্য তাকে ঘরে ঢোকাবো? যা হোক, দেশে তখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছে। শহরের মোড়ে-মোড়ে দিনরাত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর টহল, কান্দাপাড়ার সড়কেও হানাদাররা মধ্যরাত অবধি খোলা জিপ নিয়ে ঘোরাঘুরি করে, জীবন খোয়াতে কে আসে পাড়ায়? খদ্দের নাই বললেই চলে। বন্যায় দেশ তলিয়ে যাক, মহামারিতে ঘর থেকে বের হওয়া বন্ধ হোক কিংবা দেশে যুদ্ধ লাগুক, তবু বেঁচে থাকার জন্য সব প্রাণীকেই খেতে হয়। চাল-ডাল, লবণ-মরিচ, তেল-মশলা কেনার জন্য টাকা লাগে, কান্দাপাড়ার মেয়েদের টাকা রোজগারের জন্য খদ্দের পেতে হবে। সেই খদ্দেরের তখন ভীষণ আকাল পড়েছে। এই আকালের দিনে, একদিন অতিপ্রত্যুষে, তখনো থানার মসজিদে, কান্দাপাড়ার অদূরেই থানা, ফজরের আজান হয়নি, খালার ঘরের দরজায় ঘনঘন টোকা – ‘খালা, ও বকুলখালা, দরজা খোলো …।’
খুব পাতলা ঘুম বকুলখালার। দরজায় দু-তিনটা টোকা পড়তেই খালা উঠে বসল। বুঝতে পারলো লোক একাধিক। জিজ্ঞেস করল – ‘তোমরা কে? এইডা কি পাড়ায় আসার টাইম …?’
– খালা, আমরা খদ্দের না। আমাদের খুব বিপদ। তাড়াতাড়ি দরজা খোলো …।
খদ্দের না! তাহলে এই প্রত্যুষে লোকগুলো কারা? বিপদে পড়ে এসেছে! খুব বিপদ? এখন তো, এই যুদ্ধের বাজারে দেশের মানুষের বিপদ-আপদের শেষ নাই।
হানাদার-জানোয়ারদের সমুখে পড়লেও বিপদ, পেছনে থাকলেও বিপদ। এই লোকগুলো কী বিপদে পড়ে এই নিশিভোরে এখানে এসেছে, কে জানে! খালা জিজ্ঞেস করল – ‘তোমরা কে? তোমাদের পরিচয় …?’
– খালা, আমরা মুক্তিযোদ্ধা …।
মুক্তিযোদ্ধা! আহারে! খালা আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। চট করে দরজা খুলল। ওরা – আবিদ, কাশেম, মুন্না – চোখের পলকে ঘরে ঢুকে পড়ল। আবিদ ওদের কমান্ডার। ও ঘরে ঢুকেই দরজার খিল লাগিয়ে দিয়ে বলল – ‘খালা, ঘরে পানি আছে? প্রচণ্ড তৃষ্ণা পেয়েছে। গলা একেবারে শুকিয়ে কাঠ …।’
সেই থেকে ওরা তিনজন বকুলখালার ঘরেই থাকতো। খালার চকির নিচে বাংকার খুঁড়েছিল। সারাদিন বাংকারে থাকতো। বাংকারেই ঘুমিয়ে, তাস খেলে দিন কাটাতো। খাওয়ার সময় হলে, খালা বাংকারেই ওদের খাবার দিত। পাড়ায় খদ্দেরই আসে না, কদাচিৎ কারো ঘরে খদ্দেরের দেখা মেলে; বকুলখালার ঘরেও খদ্দেরের আকাল, তবু অসুখের নাম করে খালা ঘরে খদ্দের নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। ওরা রাত দশটার পর বেরুতো অপারেশনে। একরাতে অপারেশন শেষে পাড়ায় ফেরার পথে টহল হানাদারদের হাতে ধরা পড়ল আবিদ। পরদিন দুপুর ১২টার দিকে নিরালা মোড়ে, রমেশ হলের সামনের বকুলগাছে ঝুলিয়ে আবিদকে গুলি করে হত্যা করে হানাদাররা। হানাদার বাহিনী মুক্তিযোদ্ধা আবিদ হোসেনকে হত্যার এই দৃশ্য দেখতে শহরবাসীকে বাধ্য করেছিল। ভোরবেলা মাইকিং করেছিল – যেন সবাই বাঙালি ‘গাদ্দারের’ বিচার দেখতে আসে। বকুলখালা শেষবারের মতো আবিদকে দেখতে গিয়েছিল …।
খালার গল্প মানেই মুক্তিযোদ্ধা আবিদ, কাশেম, মুন্নার গল্প। গল্প করতে-করতেই ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কাঁদে – ‘আমার বাবারা কই? আমার আবিদ বাবা …?’
পাড়ায় এইসব গল্পও শোনা যায়, কিন্তু কোনো খালা-মাসি কোনো মেয়ের আত্মহত্যার গল্প বলে না। আমি ধরেই নিয়েছি – কান্দাপাড়ার মেয়েরা আত্মহত্যা করে না। এই যে, কান্দাপাড়ার মেয়েরা আত্মহত্যা করে না, প্রশ্ন কিন্তু জাগে, এরকম একটি পঙ্কিল জীবন যাদের, আত্মহত্যার প্রবণতা তো পাড়ার মেয়েদের মধ্যে থাকার কথা। কিন্তু এই প্রশ্ন এখানে অর্থহীন। প্রকৃত কারণটা তাহলে কী? আপনারা, যারা এই আখ্যানের ভেতর ঢুকেছেন তারা লেখাপড়া-জানা মানুষ, শিক্ষিতজন, আপনাদের অবশ্যই জানা থাকার কথা – দুর্বলচিত্তের মানুষই আত্মহত্যা করে। যাদের মনোবল সুদৃঢ়, শক্ত; নিজের জীবনের শত দুঃখ-কষ্টকে সিগারেটের ছাইয়ের মতো ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিতে পারে, তারা আত্মহত্যা করে না। আত্মহত্যার চিন্তাও করে না। পাড়ার মেয়েদের পঙ্কিল জীবন বলেই তাদের মনোবল লোহার মতো শক্ত, কঠিন। তাই তারা কখনোই ভেঙে পড়ে না, আত্মহত্যা করে না, কিংবা করার চিন্তাও করে না।
আমি মনে করতাম, মনেপ্রাণে বিশ^াসও করতাম, আমার মনোবলও খুব শক্ত। মনোবল শক্ত না-থাকলে পাড়ায় দশ বছর থাকলাম কী করে? কিন্তু এখন দেখছি, আমি দুর্বলচিত্তের মানুষ। গ্রামের দু-চারজন নোচ্চা-টাউটের উৎপাতই সহ্য করতে পারছি না। পাড়ার মেয়েদের এই যে শক্ত-সুদৃঢ় মনোবল, বেঁচে থাকার জন্য মানুষের মতো দেখতে শ^াপদকুলের সঙ্গে লড়াই করার সাহস – এটা বোধহয় কান্দাপাড়ার মাটির গুণ। এই মাটিতে যাদের পা পড়ে, তারাই শক্তসমর্থ ও সাহসী হয়ে ওঠে। আমিও যতদিন পাড়ায় ছিলাম, আমার সাহস ছিল, শক্ত ছিল মনোবল; গ্রামে এসে আমার মনোবল ভেঙে পড়েছে।
ভাদ্র মাস। দুপুর। এ-বছর আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে। নদী-নালা, খাল-বিল, আগার-পাগার-পুষ্করিণী পানিতে টইটম্বুর। ভাদ্রের শুরু থেকেই কড়া রোদ। বাতাস নাই। গাছগাছালির একটা পাতাও নড়ে না। প্রচণ্ড ভ্যাপসা গরম। লোকে বলে, ‘তালপাকা গরম’। এই রোদ ও গরম উপেক্ষা করে আমি সেনদের পোড়োবাড়ির পথে হাঁটছি। গ্রামের একেবারে একপাশে, বসতবাড়িগুলো থেকে খানিকটা দূরে এই পোড়োবাড়ি। আমি তো এই গ্রামেরই মেয়ে, গ্রামেই বড় হয়েছি, বারো বছর নাগাদ গ্রামেই ছিলাম, সেই ছোটবেলায় বাড়িটাকে যেমন দেখেছি – ঝোপজঙ্গলে ভরা, মাঝে অনেকগুলো বিশালাকারের আম-কাঁঠাল, কড়ই-অর্জুন, বহেড়া-গাব, মেহগিনি-সেগুন-অশোক ইত্যাদি গাছ, কোনো-কোনো গাছ মরে ভেঙে পড়ছে – এখনো তেমনই আছে। মা-বাবার মুখে শুনেছি, দেশ স্বাধীন হওয়ার বছর-দুয়েক পর বসন্ত সেন-অনন্ত সেন-সুশান্ত সেন; সেনেরা তিনভাই ঘরবাড়ি ফেলে রেখে কলকাতা চলে যায়। ফি মাসেই একবার বাড়িতে ডাকাত পড়লে সেখানে বাস করার উপায় কী? সেনেরা টাকাওয়ালা লোক। বাড়িতে পুলিশের পাহারা বসিয়েছিল, কিন্তু ডাকাতি বন্ধ হয়নি। লোকমুখে শোনা গেছে, পুলিশের সঙ্গে ডাকাতদের যোগাযোগ ছিল, পুলিশ ডাকাতির সোনা-দানা, টাকা-পয়সার ভাগ পেত। সেনরা চলে যাওয়ার পর রাজ্যের ভূত-প্রেত আর সাপ-খোপ ওই বাড়িতে বাসা বাঁধে। ভয়ে কেউ যায় না ও-বাড়িতে। ভূইয়াবাড়ির লোকজন, তালুকদারবাড়ির লোকজন বাড়িটি সাফসুতরো করে দখল করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু পারেনি। আলাউদ্দিন ভূইয়া মরেছে ভূতের হাতে! ভূতেরা নাকি তাকে গলা টিপে মেরেছে। ভূইয়ার গলায় নাকি ভূতের হাতের দাগ দেখা গেছে। নূরুল তালুকদার মরলো সাপের কামড়ে। সেই থেকে বাড়িটি পতিত। বাড়ির আধাপাকা ঘরগুলো ঝোপজঙ্গলের মধ্যে ভেঙে পড়ে আছে। আমি যাচ্ছি ওই বাড়িতে। কাপড়ের আঁচলের নিচে দড়ি নিয়েছি। পাটের দড়ি না, নাইলনের শক্ত ও মোটা দড়ি। পোড়োবাড়ির জঙ্গলের মধ্যে যে-কোনো একটা গাছে উঠে, দড়ির একপ্রান্ত গাছের ডালে বাঁধবো, অতঃপর দড়ির অপরপ্রান্ত আমার গলায় বেঁধে ঝুলে পড়বো। কিন্তু তার আগেই যদি ভূতেরা আমাকে গলা টিপে মারে, কিংবা সাপের কামড়ে যদি আমার মৃত্যু ঘটে, তাহলে তো আত্মহত্যা করার মহাপাপ থেকেই বেঁচে গেলাম …।
অবশ্য, এখানে বলে রাখি, কান্দাপাড়ার মেয়েরা আত্মহত্যা যেমন করে না, তেমনি পাপ-পুণ্যেরও ধার ধারে না …।
সেনেদের পোড়োবাড়িতে যেহেতু মানুষের যাতায়াত নাই, স্বাভাবিকভাবেই ওই বাড়িতে যাওয়ার পায়ে-হাঁটা রাস্তাটি লুপ্তপ্রায়, বিগত ছয় মাসের মধ্যে এই রাস্তায় কোনো জীবজন্তুর পা পড়েছে – এরকম কোনো চিহ্ন নাই। সরু রাস্তা, রাস্তার দু’পাশে ছোট-আকারের কাঁটা-ঝোপ। বিষকাটালি, ভাঁটফুলের সমাহার রাস্তার দু’পাশে। ঝোপের মধ্যে সাদা আর হালকা গোলাপি কীসব ফুল ফুটে আছে, চিনতে পারছি না। গোলমরিচের মতো সবুজ-লালচে ফলও ধরে আছে কোনো কোনো গাছে। ফুলে-ফুলে উড়ছে প্রজাপতি, ফড়িং – আরো নাম না-জানা কত কীটপতঙ্গ! রাস্তাটি ম-ম করছে ফুলের গন্ধে। অথচ কেউ এই রাস্তায় আসে না। ভূতের ভয়, সাপের ভয়। একটি কানাকোয়া একাকী এক ঝোপ থেকে আরেক ঝোপে লাফালাফি করছে। ঝোপঝাড়ের মাথায়-মাথায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে টুনটুনি আর বুলবুলি। নিরাক-পড়া দুপুর। সেনদের পোড়োবাড়িতে যাওয়ার সরু যে রাস্তায় আমি ধীরপায়ে বুনোফুলের গন্ধে মাতালমতো হয়ে হাঁটছি, এই রাস্তায়; কিংবা পৌলি যাওয়ার নদীর পার-ঘেঁষা রাস্তায় – কোথাও একটা জনমনুষ্যি নাই। আমি একা, একাকী। গা-টা কেমন ছমছম করে। কিছুক্ষণের জন্য থমকে দাঁড়াই। মাথার ওপর হঠাৎ কোত্থেকে যেন একটুকরো পেজা-তুলোর মতো হালকা মেঘ ভেসে আসে। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে আমার মাথার ওপর। এই মেঘের গন্তব্য কোথায় – এলেঙ্গা, কালিহাতী, ঘাটাইল, মধুপুর, মুক্তাগাছা – নাকি ময়মনসিংহের ওপার – গারো পাহাড়, কে জানে! আকাশটা আজ বড় মায়াবী। অদূরেই চকের পানিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে চামারাধান, বরণধান। ধানগাছের আড়ালে বসে সঙ্গীকে ডেকে ডেকে হয়রান একটা ডাহুক। কেমন মায়াময় পরিবেশ! নির্জন কিন্তু বন্ধুর মতো। অকৃত্রিম। মন যেন কেমন করে! আর সামান্য পথ, তারপরই সেনদের পোড়োবাড়ি। বাড়িতে বড় বড় গাছ। একটার ডালে ঝুলে পড়লেই ইহলীলা সাঙ্গ। বেঁচে থাকার সমস্ত দুঃখ-কষ্টের অবসান …।
আমি আনমনে হাঁটছি। করোটিতে ঘাই মারছে চামারাধান-ক্ষেতের শ্যাওলা-খাওয়া তরতাজা কালবাউস।
মাথায় এলোমেলো চিন্তা। কান্দাপাড়া থেকে গ্রামে, মায়ের কাছে ফিরে এসেছি, মা খুব খুশি। দশ বছর পর হারানো মেয়েকে ফিরে পেলে, হোক সে পাড়ার মেয়ে, পতিতা, বেশ্যা; কোন মা খুশি না হবে? মা আমাকে ফিরে পেয়ে যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছে।
করোনায় লকডাউন। প্রায় দেড় বছর গেল। আরো কতদিন লকডাউন থাকবে কে জানে! শহরে মানুষ নাই। পাড়ায় খদ্দের নাই। গাড়িঘোড়া বন্ধ, দোকানপাট বন্ধ। কিন্তু শহরের সব খবর কানে আসে। বাতাসে ভেসেই আসে। বাতাসকে তো আর লকডাউনের আওতায় ফেলার সুযোগ নাই। খবর আসে – প্রতিদিন গণ্ডায়-গণ্ডায় মৃত্যুর খবর। কবর খোঁড়ার বিরাম নাই। কান্দাপাড়ার অদূরেই, বেবিস্ট্যান্ডের পাশে শহরের কবরস্থান। বিশাল এলাকাজুড়ে শহরের মানুষের শেষ ঠিকানা। খবর আসে – কবর খোঁড়ার মানুষও নাকি এখন মেলে না। রাস্তাঘাটেও লাশ পড়ে থাকে। বকুলখালা বলতো – স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় রাস্তাঘাটে লাশ পড়ে থাকতো। লাশের সৎকার করার লোক ছিল না। এখন, করোনায় সেই পরিস্থিতি! শহরে শকুনও নাই যে, ওরা লাশ খেয়ে রাস্তাঘাট পরিষ্কার করবে, শহরবাসীর উপকার করবে। গরিব-মানুষের ঘরে-বাইরে সবখানেই বিপদ, সবখানেই মৃত্যু ওতপেতে থাকে। করোনাকালে গরিব তো বটেই, ধনী মানুষেরও জীবন নিয়ে টানাটানি। ঘরে টাকা আছে, কিন্তু বাইরে বেরুনো যায় না, বাজারঘাট বন্ধ, টাকা তো আর চিবিয়ে খাওয়া যায় না। এই যখন পরিস্থিতি, পাড়ায় খদ্দের আসবে কোত্থেকে? কান্দাপাড়ার শত-শত ঘর বন্ধ। তারপরও সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি মুখে রং মেখে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকি। আমি একা না, সম্পা, মুনিয়া, রত্না, রেখা – অনেকেই রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে দিনভর – বরাতজোরে যদি একটা খদ্দের মেলে! কেউ-কেউ পেয়েও যায়। আমিও হঠাৎ-হঠাৎ পেয়েছি। কিন্তু পেলে কী হবে? পয়সা সিকিভাগ। বলে কি না – দেখছিস না লকডাউন, কামাইপাতি বন্ধ, যা আছে তাই নে। আমরা খদ্দেরকে বোঝাতেই পারি না যে, আমাদেরও তো একই অবস্থা, আমাদের চলে কী করে? আমাদের কথার কোনো জবাব না দিয়েই ঘর থেকে বেরিয়ে যায় খদ্দের। তদুপরি ঘরভাড়া, মাসি-খালা, দালাল-গুণ্ডা, পুলিশ – আরো কত খরচ! আমি আর পারছিলাম না। দিনের পর দিন উপোস, শুধু পানি খেয়ে জীবনধারণ, বেঁচে থাকা। আমাদের দেখার কেউ নাই। খবর পাই – সরকার থেকে শহরের পাড়ায়-পাড়ায় চাল-ডাল, লবণ-তেল ইত্যাদি দেওয়া হয়।
কোনো-কোনো এনজিও নাকি ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করে। কিন্তু কেউ কান্দাপাড়া আসে না। এটা যে নোংরা জায়গা, নরক! পাড়ার অনেক মেয়েই পালিয়েছে। যে-সব মেয়ে পালিয়েছে, ওদের মাসিরা আগুনের মতো গরম। টাকা দিয়ে কেনা মাল, চড়ুইপাখির মতো ফুড়ুত করে চলে গেল? খাঁচার পাখি একবার ছাড়া পেলে আর ফিরে আসে না। আমিও পালাবো-পালাবো করছিলাম। এখানে থাকলে মৃত্যু অনিবার্য। না-খেয়েই যদি মরতে হয় – মায়ের কাছে গিয়ে মরি। কিন্তু পালাতেও মন সায় দিচ্ছিল না। আমার মাসি, কমলামাসি ভালো মানুষ। মোটা টাকা দিয়েই আমাকে কিনে রেখেছিল। টাকা দিয়ে কিনে রাখলেও মেয়ের মতোই দেখতো। কোনো ভুল-ত্রুটি পেলেও পিঠে চেলাকাঠ ভাঙতো না – অনেক খালা-মাসি যেমন করে। ভাবলাম – মাসিকে বলে দেখি, যদি ছুটি মেলে। ছুটি পাইতো ভালো, না-পেলে পরে পালাবো। কমলামাসিকে বলতেই আমাকে ছুটি দিয়ে দিলো – ‘বাড়িতে যেতে চাস, যা। এখানে থাকলে না-খেয়ে মরতে হবে …।’
আমি বাঁচার জন্য বাড়িতে এসেছিলাম …।
এখন করোনা কেটে গেছে। গ্রাম-শহর, সবখানে, সবকিছুই স্বাভাবিক। খবর পেয়েছি – কান্দাপাড়া আবার সরগরম হয়ে উঠেছে। কিন্তু আমি আর সেখানে ফিরে যাই নাই। কমলামাসিকে একদিন ফোন করেছিলাম। মাসি বললো, ‘না আসতে চাস, না এলি; কান্দাপাড়া তো একটা নরক, সবচেয়ে নিচুস্তরের নরক; এখানে যারা আসে, থাকে; পচে-গলে মরতে হয় …।’
আমি বারবাড়ি হরীতকীগাছের নিচে ছাপড়া তুলে মুদিদোকান দিয়েছি। বাড়ি আসার সময় কমলামাসি কিছু টাকা দিয়েছিল, সেই টাকারই ছোটখাটো দোকান। সঙ্গে চা, পান-বিড়ি-সিগারেট, সন্ধ্যায় চপ-পিঁয়াজু বানিয়ে বিক্রি করি। বেচাকেনা মন্দ না। আয়রোজগার যা হয় মা-মেয়ের ভালোই চলে যায়। মা হাঁস-মুরগি পালে। ডিম বিক্রি থেকেও কিছু আসে। আমি আরো ভালোভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখছিলাম। হয়তো দিনে-দিনে দোকানটা আরো বড় হতো। আমার স্বপ্নও পূরণ হতো। তাহলে আমি আত্মহত্যা করতে যাচ্ছি কেন?
কান্দাপাড়া আর গেলাম না, স্বাভাবিক জীবন বেছে নিয়েছিলাম; কিন্তু এতদিনে জেনে গেছি – বেশ্যার খাতায় একবার নাম উঠলে সে-নাম আর কোনোদিনই কাটা যায় না। গ্রামের কিছু ছেলে, লতিফ-কাদের-সিরাজ; লোকমান নেতার চেলাচামুণ্ডা, লোকটাকে আমি চাচা ডাকতাম, এই লোকটাই বারো বছর বয়সে আমাকে শহরে নিয়ে গিয়ে কান্দাপাড়া বিক্রি করেছিল; ওরা রাতে আমার ঘরে ঢুকতে চায়, লোকমান চাচাও। ভাবখানা এমন – কান্দাপাড়া আমি কত লোকের সঙ্গে শুয়েছি, গ্রামে ওদের সঙ্গে শুতে আপত্তি কেন?
বাড়িতে এলাম রাতে, সকালে ঘুম থেকে উঠে উঠানে এসেই দেখি লোকমান চাচা। টুলে বসে আছে। আমাকে দেখে যেন আকাশ থেকে তারা-খসার মতো ঝুপ করে পড়ল। ‘আরে, মহু তুই! কহন আইলি? সেই কতদিন আগে, শহরে ডাক্তার দেখাবার নিয়া তরে হারাইয়া ফালাইছিলাম। সারাদিন শহরের এইমাথা-ওইমাথা তরে খুঁইজা মরলাম, কোথাও পাইলাম না …।’
এবার বলি, এতক্ষণ বলি-বলি করেও বলি নাই – আমার নাম মহুয়া। মা কিংবা গ্রামের পরিচিত কেউ কেউ মহু বলেও ডাকে।
তখন তো আমি কিশোরী। বারো বছর বয়স। বুকে কেবল অড়বরইয়ের মতো স্তন উঠেছে। মা-ও তখন যুবতী নারী। আমি একা, আর কোনো ভাইবোন নাই। বাবাও নাই। বাবা শহরে রিকশা চালাতো। একদিন একটি দ্রুতগতির ট্রাক পেছন থেকে বাবার রিকশায় ধাক্কা মারে। রিকশায় যাত্রী ছিল একজন মহিলা। কোলে বাচ্চা। বাবা আর ওই যাত্রী রিকশা থেকে ছিটকে পড়েছিল রাস্তার ওপর। বাচ্চাটাও। সবাই ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে মারা গেল। সেই থেকে বাড়িতে মা আর আমি। আমি দেখতে-শুনতে সুশ্রী ছিলাম। ওই বয়সেই রাস্তাঘাটে আমাকে দেখলে ছেলেছোকরারা তো বটেই, জোয়ান-বুড়োরাও আমার মুখের দিকে লোলুপদৃষ্টিতে চেয়ে থাকতো। আমি কোনোমতে বুকে ভালো করে গামছা জড়িয়ে কেটে পড়তাম। একবার আমার পেটে ব্যথা। মা বাজারের সুবল ডাক্তারের দোকান থেকে বড়ি কিনে খাওয়ায়। দুদিন ভালো থাকি, তৃতীয় দিন আবার ব্যথা শুরু হয়। একদিন লোকমান চাচা মাকে বললো, ‘ভাবি, মহুরে শহরের ভালো ডাক্তার দেহানো দরকার।’
লোকমান চাচাই আমাকে দুদিন শহরে নিয়ে গেল। ডাক্তার দেখাল। শরীর ভালোর দিকে। পেটে এখন আর তেমন ব্যথা ওঠে না। উঠলেও অকুলান না। তৃতীয় দিন শহরে নিয়ে গিয়েই কান্দাপাড়া কমলামাসির কাছে পঁচিশ হাজার টাকায় আমাকে বিক্রি করে দিলো লোকমান চাচা। বাড়িতে এসে হয়তো লোকটি নাটক সাজিয়েছিল – মহুয়া হারিয়ে গেছে।
লোকটিকে দেখেই আমার মাথায় রক্ত উঠে গেল। ইচ্ছা করছিল রান্নাঘর থেকে বঁটি এনে লোকটির গলায় বসিয়ে দিই। কিন্তু দিলাম না। আমাদের উঠানে টুলে বসে। মা নিজেই হয়তো বসতে দিয়েছে। মা তো আর প্রকৃত ঘটনা জানে না।
লতিফরা তো বটেই, লোকমান চাচা, বয়স হয়তো পঞ্চাশ পার করেছে, এই লোকটিও আকারে-ইঙ্গিতে কথা বলে। কান্দাপাড়া যখন ছিলাম, কেউ এসব কথা আকারে-ইঙ্গিতে কেন, প্রকাশ্যে মুখের ওপর বললেও ঘেন্না লাগতো না, এখন গ্রামে কারো ইঙ্গিতপূর্ণ কথা শুনলে ঘেন্না লাগে। গা গুলিয়ে বমি আসে। একদিন লতিফকে পথে একা পেয়ে বললাম, ‘দ্যাখ লতিফ, তোরা গ্রামের ছেলে, ভালো ছেলে। আমার মতো নোংরা-পাঁকে কেন ডুব দিবি? নোংরা-পাঁকে তোরা নামিস না। তাছাড়া ওসব কাজ আর করবো না বলেই তো গ্রামে ফিরে এসেছি। ব্যবসা শুরু করেছি।’
সেদিন লতিফ চলে গেল। দুদিন পরই আবার বাজারের পথে, বাজারের গোলাম মিয়ার পাইকারি দোকান থেকে সদাইপাতি কিনি, সামনে দাঁড়াল। সেদিন লতিফ একা না। তিনজন – লতিফ, কাদের, সিরাজ। ছেলেগুলোর
দাড়ি-মোচই ভালো করে গজায়নি, জিহ্বা কত বড় – ভাদ্রমাসের কুকুরের মতো। ওরা আমাকে ঘিরে ধরলো। কান্দাপাড়া থাকতে একটা থ্রি-গিয়ারের চাকু কোমরে গুঁজে রাখতাম। পাড়ায় গুণ্ডা-বদমাইশের বেজায় উপদ্রব। ওদের সামাল দেওয়ার জন্যই চাকু সঙ্গে রাখতে হতো। চাকুটা কী মনে করে নিয়ে এসেছি। গ্রামে এসে দেখি – এখানেও উন্মত্ত কুত্তার ছড়াছড়ি। যাক, ভালোই হয়েছে, চাকুটা কাজে লাগবে। কোমরে গোঁজাই ছিল চাকুটা। বের করেই গিয়ার টিপলাম। কড়কড় করে বরফসাদা চাকুর ফলা বেরিয়ে এলো। কুত্তাগুলোর কল্পনায়ও ছিল না আমার কাছে এত বড় চাকু আছে। বললাম – ‘আর যদি এক পা আগাবি, তোদের সবার নুনু কেটে ফেলবো।’ ওরা তাড়া খাওয়া কুত্তার মতোই দৌড় শুরু করল।
লোকমান চাচার বাড়ির পেছনে বিশাল বাঁশঝাড়। এই বাঁশঝাড়ের মধ্য দিয়েই বাজারে যাওয়ার পথ। একদিন বাজারে যাচ্ছি, লোকটি পথে চেয়ার পেতে বসে ছিল। সেদিন খুব গরম, শরীর থেকে দরদর করে ঘাম ঝরছিল, তাই বোধহয় হাওয়া খাচ্ছিল বসে-বসে। আমাকে দেখে উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘মহু, ধারেকাছে মানুষজন কেউ নাই, না করিস না, চল, বাঁশঝাড়ে ঢুইকা পড়ি।’ বলেই লোকটি আমার হাত ধরল। আমাকে টানতে শুরু করল বাঁশঝাড়ের দিকে। আমি এক ঝটকায় আমার হাত ছাড়িয়ে নিলাম। কোমরে চাকু গোঁজা ছিল। কিন্তু চাকু বের করলাম না। একদলা থুথু ছুড়ে মারলাম ওর মুখে।
কামনা-উন্মত্ত লোকমান নেতা মুখের গ্রাস-হারানো বাঘের মতো গর্জন শুরু করল। ‘মাগি, সতীত্বপনা দেখাস? বেশ্যার আবার সতীত্ব! তর সতীত্ব যদি আমি কুত্তা দিয়া না-খাওয়াই তো…।’
লোকটির কুবাক্য শোনার ধৈর্য ছিল না আমার। আমি বাজারের পথে হাঁটতে শুরু করলাম।
সেদিন বিকালেই গ্রামের মসজিদের সামনে সালিশ। লোকমান নেতা সালিশ ডেকেছে, না এসে উপায় নাই। বয়স্ক লোক যারা গাঁইগুঁই করছিল, লোকমানের চরিত্র সম্পর্কে তো সবারই জানা, আড়ালে-আড়ালে কেউ-কেউ বলেও – ‘লোকমান নেতার চরিত্র, ফুলের মতো পবিত্র’ – লোকমান অযথাই মেয়েটার ওপর জুলুম করছে। সুতরাং সালিশটা কোনো উছিলায় ফাঁকি দেওয়া যায় কি না ভাবছিল, লতিফরা তাদের বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে এসেছে।
লোকমান নেতা বাজখাই গলায় বললো, ‘হাজিরান মজলিশ, আপনেরা সবাই জানেন, মহিরুদ্দির ম্যায়া মহু একটা বেশ্যা। দশ বছর শহরের বেশ্যাবাড়ি আছাল, এহন গেরামে ফিরা আইয়া গেরামটা নষ্ট কইরা ফালাইল। পাড়ার পোলাগো মাথা চাবাইয়া খাইতাছে। কী কন আপনেরা – কথা সত্য?’
হাজিরান মজলিশ নীরব। নিশ্চুপ।
নীরবতাই সম্মতির লক্ষণ! লোকমান নেতা বুঝে নিল, তার কথা সত্য। গ্রামবাসী মেনে নিয়েছে। সে ঘোষণা করলো, ‘তিনদিন সময় দিলাম, এর মধ্যেই গ্রাম ছাড়ন লাগবো – সোজা কথা।’
লোকমান নেতা ভেবেছিল গ্রাম-ছাড়ার ভয়ে, চাপে পড়ে মহুয়া তার কাছে আত্মসমর্পণ করবে। মহিরুদ্দির মেয়ে তার সঙ্গে জঙ্গলে ঢুকবে। কিন্তু মহুয়া অন্যধাতের মেয়ে। ভাঙবে, কিন্তু মচকাবে না। সে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সেনেদের পোড়োবাড়িতে ঢুকলাম। বড়-বড় গাছ ভেতরের দিকে। সর্বত্র অজস্র কাঁটাগাছ। দেখে-দেখে হাঁটতে হয়। গাছের নিচে ঘন ছায়া। বাইরে প্রচণ্ড ভ্যাপসা গরম, কিন্তু বাড়ির ভেতরটা, গাছের নিচে বেশ শীতল। গা জুড়িয়ে গেল আমার। আমি গাছের ওপরের দিকে তাকাই। সুন্দর দেখে একটা ডাল খুঁজি। চিন্তা আসে মাথায় – গাছে উঠতে পারবো তো? গাছের ডাল খুঁজতে-খুঁজতেই হঠাৎ, কেন, কে জানে বাদলের মুখটা মনে পড়ে। ওর মুখটা দেখতে কী যে চমৎকার! চোখ ফেরানো যায় না, গোলগাল, মায়াবী; টানাটানা দুটো চোখ ভুরুর নিচে সাঁটানো। সাত্তার স্যারের ছেলে আসাদুল ইসলাম বাদল। প্রাইমারি স্কুলে আমরা দুজন একসঙ্গে পড়তাম। সাত্তার স্যারের বাড়ি কুড়িগ্রাম। নদীভাঙা দেশ। এত দূরের স্কুলে স্যারের চাকরি! স্যার বউ-বাচ্চা নিয়ে হাজিবাড়ি জায়গির থাকতেন। মকবুল হাজি জোতদার মানুষ। বাইরের দু-চারজন লোকে খেলে তার সংসারে ঘাটতি পড়ে না। তদুপরি তিনি তো শিক্ষক। বউ-বাচ্চা নিয়ে থাকার জায়গা নাই। মকবুল হাজি তাদের বাড়িতে থাকতে দিয়েছিল। আমি আর বাদল রোজ একসঙ্গে স্কুলে যেতাম। হাজিবাড়ির অদূরেই আমাদের বাড়ি। আমাদের বাড়ির সমুখ দিয়েই স্কুলে যাওয়ার পথ। বাড়ির সমুখে দাঁড়িয়ে বাদল হাঁক ছাড়তো – মহুয়া। আমি তৈরিই থাকতাম। বাদলের ডাক শুনেই বেরিয়ে আসতাম। বাদল গাছবাওয়ায় খুব পটু ছিল। চোখের পলকেই বানরের মতো এডাল-ওডাল করতে পারতো। স্কুল থেকে ফেরার পথে অন্যের গাছের কুল, তেঁতুল, আমড়া, কতবেল, আতা – একেকদিন একেক ফল চুরি করে খাওয়াতো। সেবার ক্লাস ফাইভে পড়ি। একদিন জ্যৈষ্ঠের দুপুরে মাঠের ধারের গাছ থেকে আমড়া পাড়ার সময় ডাল ভেঙে, আমড়ার ডাল তো খুব নরম, বাদল পড়ে গেল। আমি অনেকক্ষণ ধরে ওর পা আর ঘাড় টেনে দিলাম। তারপর আমার কাঁধে ভর করে হাঁটল বাদল। আমাকে বেশ করে জড়িয়ে ধরেছিল। বরইয়ের মতো স্তনে বাদলের হাত লেগে ছিল। সেই কচি বয়সে, কিছুই না-বোঝা বয়সে কী সুখ যে পেয়েছিলাম!
কিন্তু আজ, এই আত্মহত্যা করার আগ-মুহূর্তে বাদলের মুখটা কেন মনে পড়ল! এই দশ বছরে কত পুরুষ যে আমার স্তন দলাইমলাই করেছে, চুমু খেয়েছে, চুষেছে; তার ইয়ত্তা নাই, কই – কারো স্তন-ছোঁয়ার সুখ তো মনে পড়ল না। মনে পড়ল, বাদলের হাতটা অসাবধানে একটু লেগে ছিল – সেই স্পর্শসুখ!
সাত্তার স্যারের বদলির চাকরি। আমরা ফাইভে
থাকতে-থাকতেই স্যার বদলি হয়ে কুড়িগ্রাম চলে গেলেন। তারপর আর কোনোদিন বাদলের সঙ্গে আমার দেখা হয় নাই। প্রথম প্রথম রাতে বাদলের কথা মনে পড়লে ঘুম আসতো না। বুকের মধ্যে একটা কষ্টের দলা বেশ ওঠানামা করতো। বাদল, তুই কেমন আছিস? যেখানেই আছিস ভালো থাকিস, সুখে থাকিস বাদল। আমি বিদায় নিলাম।
হঠাৎ টের পেলাম, বাঁ-পায়ের গোড়ালিতে কিসে যেন দাঁত বসাল। একটা, দুটো, তিনটা কামড়। অস্ফুটস্বরে ‘ও মাগো’ বলে চিৎকার করে উঠলাম। সাপ নাকি? না, সাপ না। বড়-বড় লালপিঁপড়া। বেখেয়ালে পিঁপড়ার আখড়ায় পা রেখেছিলাম। পিঁপড়ারা সন্ত্রস্ত হয়ে প্রতিরোধের জন্য আমার পায়ে কামড় দিয়েছে। ছোটবেলায় পিঁপড়ায় কামড় দিলে সেই পিঁপড়া ডলে-ডলে মেরে ফেলতাম। আজ আর মারতে ইচ্ছা করল না। পা থেকে ছাড়িয়ে দিলাম। ওরা অবলা প্রাণী, মেরে লাভ কী? বেঁচে থাকুক।
হাঁটতে-হাঁটতে পোড়োবাড়ির মাঝামাঝি এসে গেছি। আর সামনে যাওয়ার দরকার নাই। আমার চারপাশে বিশাল-বিশাল গাছ। একটায় উঠে ঝুলে পড়বো। তাহলেই আমার ইচ্ছাপূরণ হয়ে যাবে, পৃথিবী থেকে অতিক্রম করে যাবো আমার বেশ্যাজীবন।
অর্জুনগাছের একটা ডাল চোখে পড়ল, খুব সুন্দর, আমার পছন্দ হয়েছে, গলায় দড়ি বেঁধেছি শক্ত করে, গাছে উঠবো, তখনই একপশলা কান্নার শব্দ এলো আমার কানে। এই ভরদুপুরে, এই গহিন ঝোপজঙ্গলের মধ্যে কাঁদে কে? আমার গা ছমছম করে উঠল। কিছুটা ভয়ও পেলাম। ভূত-প্রেতের কান্নার শব্দ নয় তো? কিন্তু ভূত-প্রেতেরা কাঁদবে কেন? তাদেরও কি দুঃখ-কষ্ট আছে যে, তারা সুযোগ পেলে কান্নাকাটি করে মনের ভার দূর করবে? এই প্রশ্নের জবাব তো আমার জানা নাই। ভূত-প্রেতেরাও যদি সত্যিই কাঁদে, তাদের কান্নার শব্দ হবে নাকি-স্বরযুক্ত। কিন্তু আমার কানে যে কান্নার শব্দ আসছে, একটু খেয়াল করতেই বোঝা যাবে – কোনো মহিলার কান্নার শব্দ। ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কাঁদছে। হঠাৎ আমার মনে হলো ঝোপের মধ্যে মা কাঁদছে নাকি? আমি যেদিন বাড়িতে ফিরে এলাম, মা আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিল, অবিকল সেরকমই কান্নার আওয়াজ। কিন্তু এই ভরদুপুরে, এই পোড়োবাড়িতে মা এখানে আসবে কোন দুঃখে? ঘটনা কী? আমি ঝোপের আড়াল থেকে, কান্নার শব্দের যেখানে উৎস, সেখানে দেখার চেষ্টা করলাম – সত্যিই তো, আমার ধারণা সঠিক, কাপড়ের আঁচলে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে মা কাঁদছে। লোকমান চাচা তার পাশে বসে আয়েশ করে সিগারেট টানছে।
হায় খোদা! এই মানুষের জীবন! এই আমার মায়ের বেঁচে থাকা!
আমি কাঠবিড়ালির মতো দ্রুত গাছে উঠে পড়লাম। জীবিত মহুয়া যেন মায়ের চোখে না-পড়ে।
গাছে একটি পাখির বাসা। মা-পাখিটি চিৎকার করে কেঁদে উঠল – ‘বাবা, তুই আমাকে ছেড়ে কই গেলি, বাবা?’
এইমাত্র বাসা থেকে পড়ে মারা গেছে পাখির ছানাটি।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.