সাহিত্য-সংস্কৃতি : সন্জীদার মূল্যায়ন

সংস্কৃতি-কথা

সাহিত্য-কথা :

সন্জীদা খাতুন

জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশন

ঢাকা, ২০০৪

দাম : ১২০ টাকা

সন্জীদা খাতুন অতিপ্রজ লেখক নন। তাঁর গ্রন্থসংখ্যা হাতে গুনে বলা যায়। সে-সবও রচিত পরিণত বয়সে পা দিয়ে। কিন্তু এর অর্থ আবার এমনও নয় যে খুবই কম লিখে থাকেন। তাঁকে বিরলপ্রজ বললে সত্যের বিচ্যুতি ঘটানো হবে। আমি ধরে নিতে পারি, এদিকে-ওদিকে ছড়ানো তাঁর আরো অনেক লেখা রয়ে গেছে যে-সব কুড়িয়ে-কাড়িয়ে জড়ো করলে এক বা একাধিক প্রবন্ধগ্রন্থ তৈরি হয়ে যেতে পারে। তাঁর ধ্যানের বিষয় লেখা নয়, রুচিশীল সমাজ ও পরিশীলিত মানুষ তৈরির সাধনা। সে-কাজ এত কর্মাশ্রয়ী ও বহির্মুখী এবং এতটাই সাংগঠনিক যে, লেখার অবসর হিসেবে কোনো উচ্ছিষ্ট সময় তাঁর হাতে পড়ে থাকে না।

মোট সতেরোটি প্রবন্ধের মালা গাঁথা হয়েছে এই সংস্কৃতি-কথা সাহিত্য-কথা (১লা বৈশাখ ১৪১১/ এপ্রিল ২০০৪) বইটিতে। এদের মধ্যে পনেরোটি পূর্বেই নানা পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল, দুটি শুধু নতুন রচনা। যেহেতু কোনোখানে রচনার সময় উল্লিখিত হয়নি, তাই রচনাকালের ব্যাপ্তি ধরবার উপায় নেই। লেখাগুলো বিভিন্ন প্রসঙ্গ নিয়ে হলেও চিন্তাসূত্রের এক গোপন ফল্গুপ্রবাহ ভেতরে ভেতরে বয়ে গেছে, রচনার তারিখ জানা থাকলে তাই লেখকের ভাবনার সীমাচৌহদ্দির চেহারা স্পষ্ট হয়ে উঠত। এ-গ্রন্থের লক্ষ্যভূমি একটিই : আমাদের বাঙালি-সংস্কৃতিকে ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে বুঝতে চাওয়া এবং সেই সংস্কৃতি-নির্মাণে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যে-সকল কর্মপ্রণোদনা ও ব্যক্তিত্বের অবদান রয়েছে তার জরিপ ও মূল্যায়নের চেষ্টা নেওয়া। তিনি গ্রন্থারম্ভে বলেও দিয়েছেন : ‘প্রধানতঃ সংস্কৃতি, সাহিত্য আর প্রসঙ্গক্রমে ভাষা, শিক্ষা এবং সে ক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে বিভিন্ন সময়ের কিছু লেখা একত্র করে উপস্থিত গ্রন্থটি তৈরি হলো।’ ১৫৩ পৃষ্ঠার রচনাপরিধিতে ১৭টি প্রবন্ধের সংস্থান কোনো রচনাকেই দীর্ঘায়তন হতে দেয়নি, কিন্তু সে-আক্ষেপ ঘুচে যায় অন্তত দুটি লেখার কারণে। প্রথম রচনা ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতির চড়াই-উৎরাই’ আকারে দীর্ঘতম, চল্লিশ পৃষ্ঠার। আর তৃতীয় রচনা “গীতাম্বুধি’ শৈলজারঞ্জন” আট পৃষ্ঠার। অসামান্য এই রচনাদুটি যেন হীরকখণ্ড। সংস্কৃতির সীমানায় যা-কিছু আসে – সমাজের যৌথ মননচর্চা, সাহিত্য, সংগীত, সমাজদর্শনের গতি, একক মনীষার সাধনা, সবই আলোচনা করেছেন সন্জীদা খাতুন। এর ফলে এদেশের সাংস্কৃতিক-ইতিহাস যেমন তাঁর আলোচনায় জরুরি হয়ে উঠেছে, তেমনই রবীন্দ্রসংগীতের অন্তর্নিহিত নির্মিতি ও ভাবসম্পদ কিংবা শৈলজারঞ্জন মজুমদারের শেখানো রবীন্দ্রগীতির গায়নশিল্পও অপরিহার্য হিসেবে দেখা দিয়েছে। আব্বাসউদ্দীন আহমদ ও বারীণ মজুমদারের সংগীতসাধনা-বিষয়ে আলোকপাত যতখানি না তাঁদের শিল্পসিদ্ধির মূল্যায়ন, তার চেয়ে বেশি যে-যুগ তাঁদের তৈরি করেছে তার চরিত্র বুঝতে চাওয়া। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ কি প্রবোধচন্দ্র সেনও শুধু ব্যক্তিমানুষের নির্বিকল্প জ্ঞানসাধনার প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ নিবেদন

নয়, আমাদের সংস্কৃতির এক বিশেষ সময়ের ইতিহাস-রচনাও। আলোচনায় সাহিত্যরথীদের প্রসঙ্গ এসেছে, যেমন – কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, কাজী নজরুল ইসলাম ও জসীম উদ্দীন; ঔপন্যাসিক সত্যেন সেন; ভাবচিন্তক আবু সয়ীদ আইয়ুব ও কাজী মোতাহার হোসেন। এসেছে শিক্ষাগুরু প্রবোধচন্দ্র সেন ও ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র কথা। কিঞ্চিৎ দলছুট রচনা এ-বইতে দুটি মাত্র রয়েছে: ‘বিষাদঘন অন্তরের নিকুঞ্জছায়ার কবি’ আর ‘জন স্টুয়ার্ট মিলের জীবন-বৃত্ত’। প্রথম লেখাটি

কবি-অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ-সংকলিত এক সুবৃহৎ রবীন্দ্রকবিতা- সংকলনকে কেন্দ্র করে, আর দ্বিতীয়টি যোগেন্দ্রনাথ বিদ্যাভূষণকৃত ইংরেজ দার্শনিক মিলের জীবনী ও দর্শনচিন্তা নিয়ে। এর কোনোটিতে প্রত্যক্ষভাবে বাঙালি সমাজ বা সংস্কৃতি নেই বটে, তবে সমাজবাসী যে ব্যক্তিমানুষ শিল্পচিন্তা বা দর্শনচিন্তা করে থাকে তার স্বাধিকার, স্বাবলম্বিতা, নন্দনরুচি ইত্যাদির শ্রেয়তাকে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। ‘সংস্কৃতি-আন্দোলনের সুফিয়া কামাল’ নামের প্রবন্ধটি আমাদের সাংস্কৃতিক জগতের এমন এক দীপ্তিমান আলেখ্য যে, ভবিষ্যৎ-প্রজন্মের নিকট যেমন অতীত-মহিমার দর্পণ বলে বিবেচিত   হবে, তেমনি তাদেরকে আদর্শিক ও স্বপ্নচারী হওয়ারও প্রেরণা যোগাতে পারে।

      দুই

আমরা অনেকেই সন্জীদা খাতুনের রচনার অনুরাগী, অন্তত রচনাশৈলীর বিশেষ একটি গুণের কারণে। তিনি এদেশে সেই

বিরল প্রজাতির গদ্যলেখক যাঁরা ভাষায় শুদ্ধতাপন্থি, সুকঠিনরূপে ব্যাকরণমনস্ক, বক্তব্যে স্থিতলক্ষ্য এবং অপরিসীম মাত্রাবোধসম্পন্ন হওয়ায় অযথা বাগ্বিস্তারে অনীহ। তাঁর গদ্য স্বচ্ছ, স্পষ্ট ও নির্মেদ। সংস্কৃতি-কথা সাহিত্য-কথা এমন গদ্যেই রচিত।

‘বাংলাদেশের সংস্কৃতির চড়াই-উৎরাই’ ও শৈলজারঞ্জন মজুমদারকে অবলম্বন করে মূলত রবীন্দ্রসংগীতের উপর লেখাটি আমি অবশ্যপাঠ্য হিসেবে গণ্য করি। আমাদের সমাজের দোলাচলতা অর্থাৎ রাজনীতি ও সংস্কৃতিচিন্তার স্বরূপ-অন্বেষণে অস্থিরতা ও প্রত্যয়হীনতা বুঝে উঠতে দিক্দর্শিকারূপে প্রথম লেখাটি বিবেচিত হবে। আমাদের নিরন্তর পশ্চাৎপদতার পরিপ্রেক্ষিত, পূর্ববঙ্গীয় মুসলমানের মনের গড়ন ও তাকে নিয়ে রাজনীতির ক্রীড়াকুশলতা যেমন স্পষ্ট হবে, তেমনি এই ভূখণ্ডেই একাত্তরপূর্ব পাকিস্তানি যুগে কী অনমনীয় দেশপ্রেম, বাঙালিত্বের গর্ব এদেশের মানুষ বুকে লালন করে বেঁচে ছিল তা-ও হৃদয়ঙ্গম করা যাবে। স্বাধীনতাপূর্ব ও স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের সংস্কৃতিগতির টানাপড়েন ও তার উৎস-সন্ধানে সহায়তা করবে এ-লেখা।

‘বাংলাদেশের সংস্কৃতির চড়াই-উৎরাই’ প্রবন্ধটি, পূর্বেই বলেছি, আয়তনে দীর্ঘ। ন’টি উপশিরোনাম সংবলিত পরিচ্ছেদে বিন্যস্ত এ-লেখায় প্রকৃতপক্ষে ১৯৩০/৩২ থেকে ১৯৯৬ সাল অবধি মোটামুটি ষাট-সত্তর বছরের এক সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাস পাওয়া যাবে। দুই ধর্মসম্প্রদায়ের একই জাতিসত্তাগত পরিচয়ে বিভেদের বীজ বপন থেকে মহীরুহ-দশাপ্রাপ্তি অর্থাৎ বঙ্গবিভাজনের পরিপ্রেক্ষিত সংক্ষেপ অথচ স্পষ্ট ও স্বচ্ছভাবে এখানে তুলে ধরা হয়েছে। ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা থেকে ভাষা-সাম্প্রদায়িকতা থেকে সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা যে পরস্পরনির্ভর এক অবিচ্ছিন্ন ও অখণ্ড ভাবনাবলয়, তা বুঝে ওঠা সহজ হয়। বাঙালি জাতির সংস্কৃতির বিরুদ্ধে পশ্চিম পাকিস্তানি সংস্কৃতির আগ্রাসনে ধর্মীয় বাতাবরণের ছবিটিও সে-ইতিহাসে মেলে। এ-রচনাটির কোনোখানে যে-কথা বলা হয়নি, অথচ যে-জ্ঞান পাঠকের ভেতরে জন্মানোর জন্যই এর সার্থকতা তা হলো এক সামাজিক-সাংস্কৃতিক সত্য : এদেশের বাঙালির আত্মজ্ঞান ও বেঁচে থাকবার অবলম্বন হলো তার অখণ্ড চিরন্তনী বঙ্গসংস্কৃতি এবং সামাজিক-রাজনৈতিক নানান ঝড়ঝাপটা থেকে এই সংস্কৃতির চর্চাই বাঙালিকে বাঁচিয়ে রাখার ক্ষমতা রাখে। ‘স্বাধীন বাংলাদেশের সংস্কৃতির চড়াই-উৎরাই’ আর ‘সংগ্রাম নিরন্তর’ পরিচ্ছেদ দুটিকে এ-প্রবন্ধের উপসংহার হিসেবে গণ্য করা চলে। সেখানে দেশের বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে গভীর বেদনা, সংশয় ও ধিক্কার আছে। কিন্তু আশা ছাড়েন না এবং আমাদেরও ছাড়তে দেন না, ভরসা সেখানেই : ‘চড়াই-উৎরাই নিয়ে জীবনের যাত্রা। বাঙালি-সংস্কৃতির সমর্থকদের তাই পতন বাঁচিয়ে চলবার যোগ্য আচরণ করতে হবে। সংস্কৃতির সেবকরা সেই চেষ্টাতেই ভরসা নিয়ে পথ চলা অব্যাহত রাখেন। সন্তোষের স্থিতাবস্থায় পতনের পথ প্রশস্ত হয়, তাই নিত্যচলা এবং নিত্যসাধনাই একমাত্র গতি। বাংলাদেশের বাঙালি এখন বাংলা উচ্চারণ, বানান, সাহিত্য, ঐতিহ্যসম্মত সংগীত, চিত্রকলা, ভাস্কর্যের উৎকর্ষ সাধনে নিবেদিত। বাঙালি সংস্কৃতি-বিরুদ্ধ অনুকরণ-সর্বস্ব ‘বাংলাদেশি’ হট্টগোল ক্ষণিক উত্তেজনার তাপ সঞ্চার করে নিজে থেকেই ঝিমিয়ে পড়বে এই আমাদের দৃঢ় প্রতীতি।’

আর “গীতাম্বুধি’ শৈলজারঞ্জন” তো, আমি বলি, ‘দশাপ্রাপ্ত’ অবস্থায় নিশ্চয়ই লিখে ওঠা; নইলে এমন আবেগমথিত,

অন্তর্দৃষ্টিময় ও তীক্ষèধী রচনা কী

করে সম্ভব! রচনা আয়তনে ছোটই, অথচ কী-যে আন্তরমাধুরী। গানের বাণী ও সুরারোপের মেলবন্ধন কতখানি জটিল, কতদূর অন্যোন্যনির্ভর, বাণীর উচ্চারণ ও গায়কী ঢং সব মিলেমিশে যে-সংগীতস্থাপত্য নির্মিত হয়ে ওঠে তা আমি অন্তত প্রত্যক্ষ করেছি এই লেখাটি পড়ে। একাধিকবার পাঠ করেও আমার তৃপ্তি হয়নি। লোভ সামলানো যাচ্ছে না, তুলে দিচ্ছি; পাঠক-পাঠিকা ক্ষমা করবেন। জবানি শৈলজারঞ্জনের :

“‘চণ্ডালিকা’র গান শেখাতেন গুরুদেব – ‘কী যে ভাবিস তুই অন্যমনে – নিষ্কারণে – বেলা বহে যায়, বেলা বহে যায় যে।’- চণ্ডালিনী-মায়ের কোমরে একহাত রেখে বকবার ভঙ্গিটি পাওয়া যেত। ‘রাজবাড়িতে ওই বাজে ঘণ্টা’র শেষে সুরের টান থাকবে না – খট করে কেটে দিতে হবে। ‘ঢং ঢং ঢং, ঢং ঢং ঢং’ বেশ কাটা কাটা। ‘রৌদ্র হয়েছে অতি তিখ্নো’- তীক্ষèতে চাঁছাছোলা ভাবে লাগবে সুর। ‘তোলা হল না জল, পাড়া হল না ফল।/ কখন্ বা চুলো তুই ধরাবি।/ কখন্ ছাগল তুই চরাবি।’ ‘তোলা’ ‘পাড়া’ ‘কখন্’ ‘চুলো’ নিচের সুর থেকে ধমকের সুরে উঠছে। তারপর তাড়া লাগবে সুরে – ‘ত্বরা কর, ত্বরা র্ক, ত্বরা র্ক -। একেই বলে নাটক।”

রবীন্দ্রনাথের গানের প্রসঙ্গ নিয়েই আরেক রচনা ‘রবীন্দ্রসংগীত-স্বরলিপির কথা’ যাঁদের উদ্দেশে রচিত সে-দলে আমার ন্যায় অ-গায়ক কেউই পড়বেন না। বিষয়টি টেকনিক্যাল, রবীন্দ্রসংগীতের চর্চা না করলে কারো বুঝতে পারার কথা নয়। তবু একটু উপকার পাওয়া গেল; সেটি হচ্ছে – রবীন্দ্রসংগীতের গায়কী ও স্বরলিপিঘটিত সমস্যার ব্যাপারে কিছু ধারণা তৈরি হলো, সেইসঙ্গে পাশ্চাত্য স্বরলিপির সঙ্গে পার্থক্য বা বৈপরীত্য সম্পর্কেও এবং বাংলা গানের স্বরলিপির অসম্পূর্ণতা নিয়েও।

আব্বাসউদ্দীন ও কাজী মোতাহার হোসেন-বিষয়ে রচনাদুটি ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতির চড়াই-উৎরাই’য়ের ভাববলয়ে সংলগ্ন, অংশত জসীম উদ্দীন-বিষয়ে লেখাটিও। কারণ সাম্প্রদায়িকতা তথা মৌলবাদের অস্তিত্বহীনতা ও পরে জন্মলাভের সামাজিক ইতিবৃত্ত ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে এই তিন ব্যক্তিত্বের জীবনচর্চা, সমাজ-অভিজ্ঞতা ও শিল্পচিন্তা জড়িত।

‘বারীণ মজুমদার : তাঁর পূর্ণ রূপের সন্ধানে’ এ-বইয়ের আরো কয়েকটি লেখার মতো গ্রন্থসমালোচনা বা পরিচিতি হিসেবে লেখা হয়েছিল। শ্রুতিতে স্মৃতিতে নামের যে-স্মৃতিচারণিক গ্রন্থ স্বামীকে নিয়ে ইলা মজুমদার লিখেছেন তা আসলেই অসামান্য। ওই গ্রন্থের প্রস্তুতিপর্বে বর্তমান আলোচকের যৎকিঞ্চিৎ ভূমিকা ছিল, তখন ইলাদির পুরো বইটি পড়া হয়ে যায়। কী স্নিগ্ধ যে রচনা। আর আমার বয়সী যাঁরা গানবাজনার জগতের লোক নন অথচ সুরকানা বলাও যাবে না, তাঁরা সাক্ষ্য দেবেন অমন কণ্ঠ আর এদেশে তৈরি হলো না – কণ্ঠনিঃসৃত শব্দ মানেই যে সুর হয়, হতে পারে, তা তার গলা থেকে বেরুনো আওয়াজ আমাদের জানিয়ে দিত। এই লেখা পড়তে-পড়তে গুণী ও অসহায়, ভাগ্যের হাতে মার-খাওয়া মানুষটি যেন চোখের সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। সাভার বোর্ডিংয়ের সেই ছিমছাম

রেস্তোরাঁয় সেকালের বিখ্যাত চপ-সহযোগে চা খাচ্ছেন, বাফা-র দোতলার বিশাল হলঘরে বসে ভরদুপুরে একা তানপুরায় গলা মেলাচ্ছেন। এ-সব কথা মিনু আপা (সন্জীদা খাতুনকে আমরা, তাঁর বয়ঃকনিষ্ঠরা, এ-নামেই ডাকি) লেখেননি, ঠিক এমন ছবি ইলাদির বইয়েও নেই, শুধু আমার স্মৃতি পাতা খুলে দেখায়। দিন এভাবেই বদলায়, বদলাতে থাকে। কে জানে হয়তো খারাপের দিকেই বদলাতে থাকে। ভাবলে আর বাঁচতে ইচ্ছে করে না। সন্জীদা খাতুনের বই তো এক অর্থে সময়বদলের ইতিহাসও। এভাবে পাঠ করলে আমাদের নিজেদের ব্যক্তিগত হতাশার ইতিহাসও। লেখাগুলোর এ-ও এক বিশেষ গুণ বৈকি – লেখিকা প্রত্যক্ষভাবে সর্বত্র উপস্থিত। তাই, শুকনো, জ্ঞানের কচ্কচিভরা, প্রবন্ধগ্রন্থ এটি হলো না; হয়ে উঠল নিজের ব্যক্তিত্ব, অনুভব  ও মমতায় ভরা অন্যজাতের মননচর্চার দর্শন।