বেঙ্গল শিল্পালয়ে দলীয় প্রদর্শনী সমকালীন আধুনিক উত্তাপ

লেখক: মোবাশ্বির আলম মজুমদার


ফিনিক্সের গান
নগরের ড্রেনে ড্রেনে ছড়িয়ে পড়ছে
ব্যবহৃত নিরোধের সাথে।
দর্পণে বিম্বিত শেষ মুখ।
বাদুড়ে রূপান্তরিত ফুসফুস
নগর ছাড়িয়ে উড়ে যায়।

  • ‘প্রবহমান’, সৈয়দ তারিক

মানবের মানবীয় উন্মেষের পরিবর্তে পুঁজি যখন পৃথিবীকে গ্রাস করে চলেছে, সেখানে মানব শুধু উপলক্ষ। সময়ের চাকায় ঘুরে চলে মানুষ। শিল্পের প্রথাগত ড্রইংরুম বন্দি করার নিরন্তর প্রচেষ্টা ভেঙে দিয়ে এ-প্রদর্শনীর কাজ আমাদের পেছনে নিয়ে যায়। একদল শিল্পচিন্তক আলোকচিত্র, চলচ্চিত্র, ত্রিমাত্রিক, উলস্নম্ব গড়নের পস্নাস্টিক সামগ্রী, শব্দযন্ত্রের সাহায্যে দৃশ্যমান বাসত্মবতার হুবহু প্রতিরূপ তুলে এনেছেন।
সুবীর চৌধুরী প্রদর্শনশালায় প্রদর্শিত শিল্পকর্মের মোট সংখ্যা আটটি। আটজন শিল্পীর মাধ্যমে রয়েছে ভিন্নতা। এক শিল্পকর্মের চেয়ে অন্য শিল্পকর্মের মাধ্যম ভিন্ন। কথা হতে পারে মৌলিক শিল্পকর্ম ও নান্দনিকতা নিয়ে। অতীতের সঙ্গে বর্তমানের সংযোগ তৈরিতে যে-শিল্প আমাদের তাড়িয়ে বেড়ায়, সে-অভ্যাস থেকে বেরিয়ে নিউ মিডিয়া বা বিশ্ব শিল্পকলার সাম্প্রতিক প্রকাশমাধ্যম সাধারণ দর্শকের মধ্যে যোগাযোগে ভ্রান্তি তৈরি করে। প্রদর্শনীর কাজগুলোতে
সে-টানাপড়েন সহজেই অনুমান করা যায়।
‘সারাউন্ডিংস’ বা আমাদের চারপাশ বিষয়ে নিত্যব্যবহার্য সামগ্রী ব্যবহার করে শিল্পকর্ম গড়েছেন, সঙ্গে জলজ প্রাণী ও সাগরের জলে গড়ে ওঠা বুনট পাথরখ-কে রেখে। ইশিতা মিত্রের হাতে গড়া এ-স্থাপনাশিল্পের বিষয়ের সঙ্গে আমরা দ্রম্নত যোগাযোগ স্থাপন করতে পারি। পস্নাস্টিক বা মাটিতে পচনশীল নয় এমন সামগ্রী পৃথিবীর ভূমি, সাগরের ভেতরের পরিবেশ বাধাগ্রসত্ম করে। এটি বিপর্যয়ের অশনিসংকেত।
মানুষে-প্রাণীতে সম্পর্কের চেয়ে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে ক্রমশ। মানবদেহের পেশির আস্ফালন আমাদের ভাবায়। রাজিব দত্ত তাঁর শিল্পকর্মের শিরোনাম দিয়েছেন ‘আমি তোমাকে শেষ গল্পটি বলতে চাই’। এখানে মানুষের পেশিশক্তির সঙ্গে জুড়ে দেন মানবমুখের কংকাল। ভিডিও ইনস্টলেশন ‘মার্কড’ শব্দযন্ত্র বা মাইকের শব্দ প্রক্ষেপণ, পরিবেশ, মানুষ ও জড়বস্ত্তর প্রতি নেতিবাচক প্রভাবের কথা মনে করায়। মানুষের ব্যবহৃত অতি পুরনো আর প্রয়োজনীয়
যান্ত্রিক-অযান্ত্রিক বস্ত্তর সমাবেশ ‘দ্য হিউম্যানিসেশন প্রজেক্ট’। ফাহিম হাসিন শাহান হুইল চেয়ার, মাস্ক, পুরনো টাইপরাইটার, সিরামিক্সের তৈরি ইউরেনাল, হেডফোন ব্যবহার করে ভিডিও দৃশ্যশিল্প নির্মাণ করেন। দর্শক ভিডিওগ্রাফির সামনে এলে অতিচেনা-অল্পদেখা, দূরস্মৃতিতে থাকা বস্ত্তর অবয়ব নিয়ে আবার ভাবতে থাকেন।
মুনেম ওয়াসিফ ভিডিওগ্রাফিতে ক্লান্ত শ্রমিকের উৎপাদনহীন বিশাল কারখানা দৃশ্যায়িত করেছেন। শ্রমবাজারে শ্রমিকের মূল্যহীন শূন্য কারখানায় শ্রমিকের কর্মহীন সময় দেখতে পান দর্শক, সমাজ বিকাশের বিভিন্ন পর্যায়ে মানুষের আবেগ আর সে-সংশিস্নষ্ট অভিজ্ঞতা দুটোই দেখা যায় এ-কাজগুলোতে।
পরিবেশ, জলবায়ু, অতীত-বর্তমান, শহর-গ্রাম সবকিছু পুঁজি সম্প্রসারণের কুৎসিত প্রকোপে আক্রান্ত। বন্ধ্যা শহর আর গ্রামে নগরের ছায়া, সবুজ সুনিবিড় গ্রামের মাঠে দূষণের হাতছানি আমাদের ক্লান্ত করে। মানুষ আর মেশিনের সম্পর্ক চিরকাল বৈরী। ১৯৫৮ সালে প্রকাশিত বাংলা চলচ্চিত্র অযান্ত্রিক পরিচালনায় ছিলেন ঋত্বিক ঘটক, সুবোধ ঘোষের লেখায় উঠে এসেছে মানুষ আর যন্ত্রের গল্প। প্রদর্শনীর শিরোনাম এখানে ‘অযান্ত্রিক’ যথার্থই। জিহান করিমের সুবীর চৌধুরী একজিবিশন হলের দেয়াল ও মেঝে বিভাজন, আলোক প্রক্ষেপণে পরিমিতি বোধ দর্শকদের স্বস্তি দেয়।
কামরুল হাসান গ্যালারির প্রদর্শনীর শিরোনাম ‘আনসিন’ বা অদেখা। এক বছর আগে তিন দিনব্যাপী কর্মশালায় প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক ও সান্নিধ্য নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মাধ্যমে শিল্পকর্ম তৈরির পরিকল্পনা করেন তেরোজন শিল্পী। কিছু চিন্তা, প্রশ্নোত্তর খোঁজা হয়েছিল সে-কর্মশালায়, শিল্প কী? চিন্তা কী? শিল্পের বিষয় দেখা-অদেখা। ভাবনার ফল মিলেছে এভাবে – শিল্প হলো সময়ের ক্রম-অগ্রসরমান মুহূর্ত। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ দেখা-অদেখা বিষয়ের সঙ্গে চিন্তার প্রকাশ। এ-প্রদর্শনীতে তেরোটি শিল্পকর্ম তেরোজন শিল্পী ভিন্ন মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন।
‘দ্য আনটোল্ড স্টোরি অব থিংস’ অর্থাৎ বস্ত্তর না-বলা গল্প শিরোনাম নিয়ে মার্জিয়া ফারহানা পুরনো ঢেউটিনের শিট সংগ্রহ করে একটি আরেকটির ওপর রেখে বস্ত্তর ত্রিমাত্রিক গড়ন দেখান। ব্যবহৃত ফেলে দেওয়া পুরনো ঢেউটিনের গায়ে লেগে থাকা মরচে, জং নানা আঁকিবুকি তাঁর স্মৃতিকে নাড়া দেয়। পুরনো ফেলে দেওয়া ঢেউটিনের নিজস্ব গল্পকে তুলে আনেন। রোদ, বৃষ্টি, শীত থেকে আমাদের রক্ষা করা একসময়কার ছাউনি এখন পরিত্যক্ত। সে পরিত্যক্ত বস্ত্ত স্মৃতি উসকে দেয়।
ইয়াসমিন জাহান নূপুর সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সমাজ-মনোজাগতিক ভাবনা প্রকাশ করেন কাঁটাযুক্ত গাছের সঙ্গে নিজের চুল জড়িয়ে। মানুষের প্রতিবন্ধকতার রূপক ফর্ম ও আলোকচিত্র, নিজেকেই জড়িয়ে রাখেন গাছের সঙ্গে। নারীবাদ, জলবায়ু পরিবর্তন, আত্মপরিচয় সংকট, অভিবাসন, খাদ্য নিরাপত্তা, আর্থিক দৈন্যদশা, সমাজ কাঠামোর ভঙ্গুর দশা সব প্রকাশ করেন নিজেকে দিয়েই। নূপুরের শিল্পকর্মে প্রকাশ পেয়েছে বহুরৈখিক ভাবনা। প্রতিবাদ আর ক্ষক্ষাভ। জীবন এক বৃত্তের প্রতিবিম্ব; জ্যামিতি জীবনের অংশ,
প্রকৃতিরও। উলস্নম্ব ও আড়াআড়ি রেখা প্রকৃতি ও মানুষের মাঝে বহমান। ইমরান সোহেল ‘অ্যা সেভেন লাইন পোয়েম’ শিল্পকর্মের আলোকচিত্রে এমন ভাবনা তুলে আনেন।
আবদুস সালামের ‘দ্য রিফ্রেশ সাইন’ ভিডিওগ্রাফিতে শিল্পী নিজে প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত হন। আকাশ-সংস্কৃতির প্রভাবে মানুষের আবেগ আর প্রকৃতির সজীবতা ঝলমলে হয়ে উঠেছে। প্রকৃতির সবুজ উদ্যান দখল হয়ে যায় উন্নয়ন আর উৎপাদনকামী চিন্তার মাধ্যমে। নগরায়ণ, সবুজবিধ্বংসী ভাবনার বিরুদ্ধে নীরব প্রকাশ আবদুস সালামের শিল্পকর্ম।
আবীর সোমের ‘বস্নু জিরো জিরো টোয়েন্টি ফোর’ ভিডিও আর্টে নীলরঙা সারফেসে বারোটি চেয়ারের ঘূর্ণনগতি দেখা যায়। গাণিতিক সংখ্যা শূন্য থেকে দুই, পাঁচ, চার এভাবে ভেসে আসে। এর মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে মানুষের আবেগী সৌন্দর্য।
‘আনসিন’ প্রদর্শনীর শিল্পীসংখ্যা তেরো। প্রদর্শনীটির পরিকল্পক মোসত্মফা জামান ও শর্মিলী রহমান। বেঙ্গল গ্যালারি অব ফাইন আর্টসের দুটি প্রদর্শনী শুরু হয় ২২ জুন ও শেষ হয় ২ আগস্ট।

Leave a Reply

%d bloggers like this: