পাবলো নেরুদার কবিতায় মহাসমুদ্রের নিনাদ শোনা যায়, বলেছিলেন স্পেনিশ কবি মিগুয়েল হারনান্দেজ। আমরা ঐ মহাসমুদ্রকে স্থান এবং কাল উভয়ের রূপকই ভাবতে পারি। নেরুদা শুধু চিলির এবং মধ্য বিশ শতকের কবিমাত্র নন, তিনি হয়ে উঠেছিলেন উপনিবেশিক তৃতীয় বিশ্বের যুগ পরম্পরার শোষিত মানুষের কণ্ঠস্বর। একটা সময় ছিল যখন পাবলো নেরুদা সমাজতান্ত্রিক বিশ্বে মায়াকভস্কির প্রতিস্পর্ধী ছিলেন জনপ্রিয়তায়; আফ্রো-এশীয়-লাতিন আমেরিকি জনগণের সংগ্রামী চেতনারও হয়েছিলেন প্রতিনিধি। এক বৈনাশিকি ঝড়ে সেই কালের অবসান ঘটেছে হয়তো; হয়তো এখন মানুষের মুক্তির গান, শ্রমজীবী মানুষের উচ্ছল প্রাণগীতি রীতিমতো আনফ্যাশনেবল ও অতীত। কিন্তু নেরুদার মতো কবিরা তাদের যুগের সমস্ত উত্থান ও উন্মন্থনকে কণ্ঠে ধারণ করতে পেরেছিলেন; পৌঁছে দিতে পেরেছিলেন সেই সমুদ্রের কণ্ঠস্বর কালের সীমানা পেরিয়ে, সেই তাঁদের সার্থকতা। তবু পাবলো নেরুদা শুধুই সমাজতন্ত্রের কবি নন, তিনি আশ্চর্য সুন্দর এক লিরিক জগতেরও স্রষ্টা, হৃদয়হরণ প্রেমের কবিও।
পাবলো নেরুদা (১৯০৪-১৯৭৩) জন্মগ্রহণ করেন চিলির পারাল নামক স্থানে, যেখানে তাঁর বাবা রেলওয়েতে চাকরি করতেন। ১৯২৩ এবং ১৯২৬ সালের মধ্যে তিনি কবিতার বই প্রকাশ করেন পাঁচটি এবং অচিরেই চিলির সবচেয়ে সম্ভাবনাময় তরুণ কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান। ১৯২৭ থেকেই শুরু হয় তাঁর কূটনৈতিক জীবন। চিলির কূটনীতিক হিসেবে পরবর্তী ষোলো বছর প্রায় সারা পৃথিবীতে ঘুরে বেড়ান নেরুদা। ১৯৩৪ সালে, স্পেনে যখন রিপাবলিকানদের সঙ্গে ফাসিস্তদের বিরোধ তুঙ্গে, মাদ্রিদে নিয়োগ পান তিনি। পরিচয় হয় স্পেনের বিখ্যাত কবিকূল ও শিল্পীদের সাথে, যাঁদের মধ্যে ছিলেন গার্সিয়া লোর্কা ও রাফায়েল আলবার্তি। স্পেনে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে চিলি সরকার নেরুদাকে ডেকে পাঠান: ১৯৩৭ সালে সান্টিয়াগোতে ফিরে আসেন নেরুদা। চিলির কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়ে ১৯৪৩ সালে সিনেট সদস্য নির্বাচিত হন। কিন্তু চিলি সরকারের সাথে কমিউনিস্ট পার্টির বিবাদ যখন তুঙ্গে ওঠে, দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন নেরুদা। ১৯৫২ সালে দেশে
ফেরেন তিনি; পরের বছর স্টালিন পুরস্কারে (পরবর্তীকালের লেনিন পুরস্কার ভূষিত হন। ১৯৭০ সালে চিলির সাধারণ নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী করা হয়েছিল নেরুদাকে কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে। কিন্তু তিনি সালভাদর আয়েদের পক্ষে নিজের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেন। আয়েন্দে নেরুদাকে প্যারিসে চিলির রাষ্ট্রদূত করে পাঠান। ১৯৭২ সালে সাহিত্যের জন্য নোবেল পুরস্কার পান পাবলো নেরুদা। ইতোমধ্যে স্বদেশভূমিতে মর্মান্তিক পালাবদল ঘটে গেছে। জেনারেল পিনোশের রক্তাক্ত অভ্যুত্থানে নিহত হয়েছেন। প্রেসিডেন্ট সালভাদর আয়েদে। গভীর মর্মাহত নেরুদা দেশে ফিরে আসেন রাষ্ট্রদূতের পদে ইস্তফা দিয়ে। পরের বছর, ১৯৭৩-এ জীবনাবসান ঘটে পাবলো নেরুদার।
নেরুদার কবিজীবনে বেশ কয়েকটি পর্যায় লক্ষযোগ্য। তাঁর প্রথম বইয়ের নাম La Cancion de la Fiesta (১৯২১), যার বাংলা হবে ‘উৎসবের গান’। দ্বিতীয় গ্রন্থ Crepusculario (১৯২৩), যেখানে নেরুদার স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর শোনা যায় প্রথমবার, যদিও তাঁর পূর্বসূরিদের প্রভাবও অনপনেয়। প্রথম দিককার নেরুদার ওপর প্রভাব বিস্তার করে আছেন উরুগুয়ের কবি কার্লোস সাবাত একান্তি। দূরবর্তী প্রভাবক ওয়াল্ট হুইটম্যান, যার সন্তসুলভ, দীর্ঘ, অভিভাষণের স্বভাব নেরুদাতেও বর্তেছিল ভালোভাবেই। প্রাথমিক কবিতায় নেরুদা তারুণ্যে ভরপুর, উচ্ছল, দক্ষিণ আমেরিকার নিসর্গের প্রতি নমিত এবং রোমান্টিক। এরকম সময়েই তিনি বলেছিলেন নিজের সম্পর্কে : “আমার প্রাত্যহিক জীবনে আমি প্রশান্ত, কিন্তু আইন, নেতা এবং প্রতিষ্ঠিত বিধানের শত্রু। মধ্যবিত্তকে মনে হয় দুর্গন্ধযুক্ত, এবং আমি পছন্দ করি তাদের যারা অস্থির এবং অতৃপ্ত, তারা শিল্পীই হোক অথবা ক্রিমিনাল।’ তরুণ নেরুদার ওপর ফরাসি পরাবাস্তববাদের প্রভাবও পড়েছিল বেশ। কিন্তু লাতিন আমেরিকার কবিতার প্রথাবৃত্তটি প্রথম তিনি ভাঙেন তাঁর পরবর্তী গ্রন্থে (১৯২৪), যার দীর্ঘ হিস্পানি নামের বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘কুড়িটি প্রেমের কবিতা এবং একটি মরিয়া গীতি’। এর একটি কবিতা ‘বনে বনে বসন্ত জেগেছে) থেকে :
কতদিন ধরে, আহা কতদিন ধরে
তোমায় ঘনিষ্ঠ আর কাছের আপন বলে দেখে আসছি।
কীভাবে তার প্রতিদান দেবো?
কী দিয়ে দেবো?
রক্তের তেষ্টা নিয়ে বনে বনে
বসন্ত জেগেছে।
শেয়ালগুলো তাদের গর্ত থেকে বেরিয়ে পড়েছে
সাপ খাচ্ছে শিশির
আমি তোমায় নিয়ে সাপের গর্তে সেঁধিয়ে পড়ি
সেখানে দেবদারু-ঝাউবীথি আর সৌধের মধ্যিখানে
দাঁড়িয়ে নিজেকে শুধোই, কবে কীভাবে
আমার সৌভাগ্যের জন্যে প্রতিদান ধরে নিতে হবে?
আমি যা কিছু যতো কিছু দেখেছি তার মধ্যে
তুমি – তুমিই যাকে আমি সর্বক্ষণ দেখে যেতে চাই।
যা কিছু আমি স্পর্শ করেছি।
তার মধ্যে
তোমার কোমল অঙ্গই আমি
গোটা জীবন ধরে ছুঁয়ে থাকতে চাই।
আমি তোমার কমলা রঙের হাসি ভালোবাসি
আমি সত্যই বিমূঢ় তোমায় ঘুমঘোরে দেখি।
বিশের দশকের শেষভাগ থেকেই শুরু হয় পাবলো নেরুদার ভ্রামণিক জীবন; কূটনীতিক হিসেবে নানা দেশে ঘুরে বেড়ান তিনি। ১৯৩৩ সালে প্রকাশিত তাঁর কাব্যগ্রন্থের নাম Residencia en la tierra অর্থাৎ ‘ধরিত্রীর আবাস’— স্পষ্ট বোঝা যায় বিশ্বনাগরিক নেরুদার অভিষেক ঘটেছে তাঁর কবিতায়। সেই সাথে তৎকালীন বিশ্বকবিতার নানা অভিক্ষেপও স্পষ্ট হতে থাকে তাঁর লেখায়। বিশেষত ইউরোপীয় সুররিয়ালিজম ছায়া ফেলে তাঁর কবিতায়। সমাজবাদী চেতনার অগ্নিশলাকা স্পর্শে তখনো জাগেননি পয়গম্বরসুলভ অভিভাষী নেরুদা। তখনো তিনি পরাবাস্তব কুয়াশায় হাঁটছেন প্রতীকের হাত ধরে। ভগ্ন পৃথিবীর বিচূর্ণিত আকাশের নিচে মডার্নিস্ট কবির মতোই তাঁর পদচারণা। এখন যে কবিতাটির স্বীকৃত বঙ্গানুবাদ পেশ করছি তার নামই ‘পদচারণা’: বোঝা যাবে কীরকম তপ্ত, বিক্ষিপ্ত, মৃত্যুলাঞ্ছিত ভূগোলে হাঁটছেন এই কবি; এলিয়টিয় কবিতা সূত্রে কত পরিচিত এই নিসর্গ। যা যুক্ত তা হলো এর ভেতরকার এক্সপ্রেশনিস্ট চিৎকার, যন্ত্রণার আর্তি।
ঘটনা এমন যে আমি মানুষ হয়ে হয়ে ক্লান্ত,
এবং ঘটনা এমন যে, আমি দরজিখানায় আর সিনেমা হলে
ঢুকে পড়ি, বিশুষ্ক, ওয়াটারপ্রুফ,
যেন ফেল্টে তৈরি এক রাজহাঁস আমি
পথ কেটে এগিয়ে চলেছি জরায়ু এবং ভস্মের জলাধারে।
নাপিতখানার গন্ধে আমি ডুকরে কেঁদে উঠি।
একটি জিনিসই আমি চাই, তা হলো পাথর কিংবা পশমের স্থির শয়ন। একটি জিনিসই আমি চাই, তা হলো চাইনে দেখতে আর, না-কোনো দোকানপাট, বাগান, মালপত্র, না কোনো ঘড়ি কিংবা এলিভেটর।
ঘটনা এমন যে আমি আমার পদযুগল আর নখ নিয়ে পীড়িত,
আমার চুল, আমার ছায়া নিয়ে পীড়িত।
ঘটনা এমন যে আমি মানুষ হয়ে হয়ে পীড়িত।
তবু হতো কী চমৎকার যদি একটি কাটা লিলিফুল দিয়ে
ভড়কে দিতে পারতাম কোনো আইনজীবীর মুহুরিকে,
অথবা কোনো সন্ন্যাসিনীকে কানে ঘুসি মেরে খুন করতাম।
চমৎকার হতো যদি
হাতে নিয়ে সবুজ ছুরি চিৎকার করতে করতে হাঁটতাম পথে,
যতক্ষণ না ঠান্ডায় জমে মরে যাই।
এভাবে অন্ধকারে এক শিকড় হয়ে চলতে চাই না,
এরকম অরক্ষিত, প্রলম্বিত, ঘুমে-কাঁপতে-থাকা,
এভাবে নিচে গড়িয়ে চলা, পৃথিবীর ভেজা নাড়িভুঁড়ির ভেতর,
শ্বাস নেয়া, চিন্তা করা, আর খাওয়া, প্রতিদিন।
এত বেশি দুঃখ আমি চাই না।
আমি চাই না শিকড় কিংবা কবরের মতো একা-একা
মাটির গভীরে যেতে, মৃতদেহে ভরা ওয়্যারহাউসে,
আধজমাটবাঁধা, দুঃখযন্ত্রণায় মুমূর্ষু।
আর তাই সোমবার, যখন সে আমাকে দেখে
আমি আসছি কয়েদির মুখ নিয়ে, সে জ্বলে ওঠে গ্যাসোলিনের মতো,
আর গর্জন করতে করতে এগিয়ে চলে আহত চাকার মতো,
আর পেছনে রেখে যায় উষ্ণ রক্তের রেখা,
যা রাত্রির দিকে এগিয়ে চলেছে।
আর সে আমাকে ঠেলে দেয় বিশেষ খুঁজিতে, কিছু
ভেজা বাড়িঘরে, হাসপাতালে যেখানে জানলা দিয়ে উড়ে যায়
হাড়গোড়, এমন জুতোর দোকানে যাদের গায়ে ভিনেগারের গন্ধ,
এবং এমন বিশেষ রাস্তায় যারা চামড়ার ফাটার মতো কদর্য।
সেই ঘৃণ্য বাড়িগুলোর দরোজায় ঝুলে থাকে গন্ধক রঙের পাখি
আর কুৎসিত নাড়িভুঁড়ি,
একটি কফি-পটের ভেতর ভুলে-যাওয়া নকল দাঁতের পাটি।
আছে কিছু আয়না
যাদের উচিত ছিল লজ্জায় এবং ভয়ে কাঁদা,
চতুর্দিকে অনেক ছাতা, এবং বিষ, এবং ভ্রূণের নাভিতে-জোড়া নাড়ি।
আমি শান্তভাবে হাঁটি, আমার চোখ, আমার জুতো,
আমার ক্রোধ সাথে নিয়ে, ভুলে গিয়ে সব কিছু
আমি হেঁটে যাই অফিস বিল্ডিংগুলো আর অর্থোপিডিক শপ
এবং উঠোন পেরিয়ে, যেখানে দড়িতে শুকাচ্ছে কাপড়-চোপড়
আন্ডারওয়্যার, তোয়ালে এবং শার্ট,
যেখান থেকে ধীরগতিতে গড়িয়ে পড়ছে নোংরা অশ্রুজল।
(অনুবাদ: খোন্দকার আশরাফ হোসেন)
এই কবিতা থেকে বোঝা যায় সুররিয়ালিজম দ্বারা কতটা প্রভাবিত হয়েছিলেন নেরুদা। নেরুদার মানসিক ও কাব্যিক রূপান্তর ঘটে স্পেনে এসে। লোর্কা এবং আলবার্তির সঙ্গে বন্ধুত্ব তাঁর প্রকাশভঙ্গি ও চিন্তাধারা উভয়ই
পাল্টে দেয়। উপরের কবিতার সঙ্গে লোর্কার বিখ্যাত Poeta en Nueva York কবিতাটি মিলিয়ে পড়লে অনেক সাদৃশ্য ধরা পড়বে। বিশেষ করে ভায়োলেন্ট রূপক এবং উপমার ব্যবহার।
তিরিশের দশকটি ইউরোপের জন্য মহাসঙ্কট এবং শিল্পসাহিত্যের জন্য মহাসম্ভাবনার জন্মদাতা দশক। দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী এই দশকটিতে উদ্ভূত হয়েছিল সুররিয়ালিজম, ফিউচারিজম, কিউবিজমের মতো কর্মকাণ্ড, সূচনা হয়েছিল পিকাসো কিংবা সালভাদর দালি’র, আলবের্তি কিংবা লোকার। সিনেমায় চ্যাপলিন, নাটকে বার্টল্ট ব্রেশট। আর দুনিয়া কাঁপানো স্পেনের গৃহযুদ্ধ, নাৎসি জার্মানি ও হিটলারের উত্থান। স্পেনের গৃহযুদ্ধের সূচনাকালে মাদ্রিদে চিলির রাষ্ট্রদূত ছিলেন নেরুদা। তিনি মানসিকভাবে জড়িয়ে পড়েন রিপাবলিকানদের সাথে: পৃথিবীর তাবৎ প্রগতিশীল লেখক কবির মতো তিনিও স্পেনের গৃহযুদ্ধের মধ্যে আবিষ্কার করেন মানবমুক্তির প্রত্যাশা। কম্যুনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন নেরুদা। তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘ Espana en el Corazon’ (১৯৩৭) (হৃদয়ে স্পেন) ধারণ করে আছে নেরুদার প্রথম সংগ্রামী অনুভবের কবিতাগুলো। সম্ভবত সবচেয়ে বিখ্যাত দক্ষিণ আমেরিকার গণমানুষের রক্তাক্ত সংগ্রাম নিয়ে লেখা নেরুদার কবিতা- সংকলন Canto gensal (১৯৫০), যেটি ১৯৬৬ সালে ইংরেজিতে অনূদিত হয় ‘The Heights of Macchu Picchu’ নামে। মাতৃভূমি চিলির রক্তভেজা ইতিহাস নিনাদিত হয় এমন একটি কবিতায় যার নাম ‘সড়কের মোড়ে মৃত্যু ও মৃতেরা’: কিয়দংশ উদ্ধৃত করছি।
1.
আমি এখানে কাঁদতে আসিনি, যেখানে ওরা মুখ থুবড়ে পড়েছে।
তোমরা যারা বেঁচে আছো, আমি শুধু তাদের সঙ্গেই
কথা বলতে এসেছি:
আমি তোমাদের সঙ্গে কথা বলছি, কথা বলছি নিজের সঙ্গে।…
বৃক্ষহীন সমতল থেকে দ্বীপপুঞ্জ পর্যন্ত
অনেকানেক মানুষকে খুন করা হয়েছে
খুন করা হয়েছে তাদেরই, যাদের নাম ধর, আন্তোনিও,
ঠিক যেমন তোমার নাম, তেমনিই—
জেলেদের, কামারদের যারা ঠিক তোমার মতো কাজেকম্মে
জড়িয়ে থাকতো :
চিলির মানুষ, চিলির অস্থিমজ্জা: মুখগুলো
ঝাপটায় ঝাপটায় ক্ষতবিক্ষত,
বৃক্ষহারা সমতলের মতো উড়োপুড়ো, বেদনা-ব্যথার
চলচ্চিত্র গোটা অঙ্গে মাখা।
2.
আমাদের পিতৃভূমির র্যাম্পারট জুড়ে
কাচ-চকচকে বরফের চাঙড়ের ধারে উজ্জ্বল
সবুজ ডালপালার ছায়ায়-কাটা রহস্যের আড়ালে-আবডালে
নুনের নিচে কেটে-পড়া বীজের তলায়
আমি দেখলাম ঢালাও ছড়ানো আমার
মানুষগুলোর রক্তের ফোঁটা।
আর প্রত্যেকটি রক্তফোঁটা আগুনের মতো জ্বলছে।
7.
এইভাবে, ঠিক এইভাবেই আমাদের দেশের পতাকা তৈরি হয়েছিল:
দুঃখের ছেঁড়া কাঁথাখানি থেকে দেশবাসীরাই তা সেলাই করে নিয়েছে;
আর ধারে ভিতরে কারুকাজ করেছে তাদের ভালোবাসার সুতো;
তাদের পিরান থেকে কেটে নিয়েছিল, অথবা হয়তো আকাশের
কোনো একটি ভাঁজ থেকে
নীল পটভূমি, যার উপরে তার দেশের তারা জ্বলজ্বল করবে,
এবং সাগ্রহ হাতে তারা ঐ তারকা এঁটে দিয়েছে রত্নের মতো উজ্জ্বল।
ধাপে ধাপে এটা হয়ে উঠল আগুন রাঙা।
…
১0.
আমাদের এই মৃতদের নামে
আমি দাবি করছি শাস্তি।
আমাদের এই পিতৃভূমি যারা রক্তে জ্যাবজেবে করেছে
আমার দাবি হচ্ছে শাস্তি।
যার নির্দেশে এই অন্যায় খুন, তার জন্যে
আমি দাবি করছি শাস্তি।
বিশ্বাসঘাতক, যে এই মৃতদেহগুলোর উপর দাঁড়িয়ে ক্ষমতায়
আমার দাবি শাস্তি, শাস্তি।
যারা এই খুনিদের ক্ষমা করেছে, তাদের জন্যে
আমি দাবি করছি শান্তি।
আমি চতুর্দিকে করমর্দন করে ঘুরতে পারি না, ভুলে যেতে পারি না;
আমি ওদের রক্তমাখা হাত ছুঁতে চাই না;
আমি শাস্তি চাই
আমি চাই না ওদের এখানে-ওখানে রাষ্ট্রদূত করে পাঠিয়ে দেয়া হোক
আমি ওদের বিচার চাই
এখানেই, এই খোলা আকাশের নিচে, ঠিক এখানেই।
(অনুবাদ: শক্তি চট্টোপাধ্যায়)
বৈচিত্র্যময়, বর্ণাঢ্য জীবন ছিল পাবলো নেরুদার। বিশ শতকের কাব্য আন্দোলনগুলোর প্রায় সবগুলোকেই ধারণ করেছিলেন তিনি, যদিও সমাজবাদী কবি হিসেবে তাঁর খ্যাতি নিসর্গপ্রিয়, প্রেমমথিত কাব্যোচ্চারণগুলোকে। প্রায় ঢেকেই দিয়েছে। নেরুদার বিষয় ও ভাবনার ব্যাপ্তি বুঝতে হলে পড়া জরুরি ১৯৬৪ সালে প্রকাশিত তাঁর আত্মজৈবনিক কবিতাসংগ্রহ Memorial de la Isla Negra। প্রায় শতাধিক কবিতায় নেরুদা ধরতে চেয়েছেন তাঁর পরিপার্শ্ব ও নিসর্গ, তাঁর শেকড়, তাঁর অভিজ্ঞতারাজি, সমালোচকের ভাষায়, “in an attempt to gather within a single compass the various ‘lives’ or ‘selves’ he had left behind him in the huge span of his writing career” প্রশান্ত মহাসাগরের তীরে চিলির একটি ছোট্ট গ্রাম আইলা নেগ্রা, যেখানে বসে প্রৌঢ় প্রাজ্ঞ নেরুদা স্মৃতিচারণ করছেন তার পুরো কবিজীবনের। কোনো সময়ক্রম নয়, বরং চেতনার প্রবাহকে মান্য করে এগিয়েছে কথকতা – অনেকটা ছেঁড়াখোড়া নোটবুকের মতো। শৈশবের নবজাগৃতি, কৈশোর, প্রেম, ভ্রমণ, রাজনীতিচেতনার প্রথম উন্মেষ, স্পেনের উন্মথিত ঘটনাবলি, মাদ্রিদ, চিলির সংগ্রাম, আত্মসমালোচনা নানা স্ববিরোধের জন্য এক কথায় সমগ্র নেরুদার ছবি ধরা আছে এই কবিতাগুলোতে। বিষয়- কালি
সঙ্কেতসহ কয়েকটি কবিতার টুকরা-টাকরা নিচে দেওয়া যাক।
অনুবাদ প্রবন্ধকারের!
১.
জন্ম ও জননী সম্পর্কে
একটি মানুষের জন্ম হলো
অন্য অনেকের মধ্যে
যাদের জন্ম হয়েছিল।
সে বেঁচেছিল অন্য অনেকের মধ্যে
যারা বেঁচেছিল,
এবং শুধু সেটাই কোনো বড় ইতিহাস নয়
ধরিত্রীর মতোই,
চিলির মধ্যভাগে, যেখানে
আঙ্গুরলতা খোলে তাদের সবুজাভ চুল,
আঙুরগুলো আলো খায়,
মানুষের পদতল থেকে জন্ম নেয় মদ,
পারাল সেই জায়গাটার নাম,
যেখানে তার জন্ম হলো শীতে।
ল্যান্ডস্কেপ কিংবা সময় নিয়ে
আমার কোনো স্মৃতি নেই,
মুখাবয়ব বা চেহারা নিয়েও –
কেবল পলায়নপর ধুলো,
গ্রীষ্মের অবসান,
আর সেই গোরস্তান যেখানে
ওরা আমাকে নিয়ে গেল
আমার ঘুমন্ত মায়ের কবর দেখাতে।
কিন্তু যেহেতু আমি কখনো তার মুখ দেখিনি
আমি মৃতদের মাঝখানে চিৎকার করে
দেখতে চাইলাম মাকে।
কিন্তু অন্যসব মৃতের মতোই, যারা জানে না কিছু,
বোঝে না কিছু, উত্তর দিলেন না মা,
আর তিনি সেখানে রইলেন একা, পুত্রহীন,
গুটিয়ে-নেয়া, পালিয়ে যাওয়া,
প্রেতাত্মাদের ভেতর।
এবং আমি তো সেই জায়গা থেকেই এসেছি,
সেই কম্পমান ভূমির পারাল,
দ্রাক্ষাশোভিত যেই স্থান জীবন পেয়েছে
আমার মৃত মায়ের শরীর থেকে।
2.
পিতৃস্মৃতি
আমার কাঠখোট্টা বাবা ফিরে এলেন
ট্রেন থেকে।
অন্ধকারে আমরা চিনতে পারি ট্রেনের হুইসেল
ছিদ্র করে যায় বৃষ্টিকে
রাত্রির আর্তকান্নার ভেতর,
আর কিছুক্ষণ পর
কাপতে কাপতে খুলে যায় একটি দরোজা।
বাবার সাথে ঘরে ঢোকে
এক ঝাপটা বাতাস,
আর তার পদশব্দ এবং বাতাসের ঝাপটায়,
নড়ে ওঠে বাড়িটি
৩.
কবিতার আগমন
এবং সেই বয়সটাতে… কবিতা এসে উপস্থিত হলো
আমার খোঁজে। আমি জানি না, আমি জানি না
কোত্থেকে এল সে, শীত থেকে না কি নদী থেকে।…
কিন্তু রাস্তা থেকে সে ডাকল আমাকে,
রাত্রির শাখাপ্রশাখা থেকে ডাকল আমাকে,
আচমকা অন্যদের মাঝখান থেকে,
জ্বলন্ত আগুনের মধ্যে
অথবা একাকী ফিরেদেখি।
ঐ তো সে দাঁড়িয়ে, তার মুখ নেই,
আর সে স্পর্শ করল আমাকে।….
এবং আমি, ক্ষুদ্র সত্তা নিয়ে
বিশাল নক্ষত্রখচিত শূন্যতা পান করে মত্ত,
রহস্যের প্রতিমা পান করে নিজেই
গভীর শূন্যতার পবিত্র অংশভাক হয়ে গেছি।
আমি তারাদের সাথে ঘূর্ণিত হতে থাকলাম।
বাতাসের সাথে আগল ভেঙে বেরিয়ে পড়ল আমার হৃদয়।
4.
কৈশোরের পাঠাভ্যাস
বই পবিত্র ও জীর্ণ, বই
গ্রস্ত এবং আগ্রাসী,
গুপ্ত, পকেটে লুকোনো
নীটশে, নাশপাতির গন্ধযুক্ত,
এবং গোর্কি আমার সঙ্গী,
আন্ডারগ্রাউন্ড এবং সুগোপন
আহ সেই মারাত্মক মুহূর্ত
যখন ভিক্তর হুগোর মেষপালক
অক্টোপাসকে ধ্বংস করে এবং বিয়ে করে প্রেমিকাকে,
আর দ্য হাঞ্চব্যাক অব নরদাম
গথিক অ্যানাটমির শিরায় শিরায়
বয়ে চলে।…
বই বুনে চলে, পিছলে চলে তার কুণ্ডলি,
আর ধীরে ধীরে, বস্তুর মুখচ্ছবির পেছনে
জন্ম নিল, তিক্ত গন্ধের মতো, লবণের পরিশ্রুতি নিয়ে,
জানের বৃক্ষ।
5.
রেঙ্গুন ১৯২৭
দেরিতে পৌঁছেছিলাম রেঙ্গুনে।
সবকিছু আগে থেকেই ছিল সেখানে
এক রক্তের শহর
স্বপ্নের এবং সোনার,
বন্য অরণ্য থেকে বয়ে এসেছে যে নদী
শ্বাসরুদ্ধকর শহরে
আর তার কুষ্ঠগ্রস্ত রাস্তায় রাস্তায়,
যেখানে সাদাদের জন্য সাদা হোটেল,
আর সোনালি প্যাগোডা সোনালি লোকদের জন্য।…
ঠিক এরকমই ছিল। আমি তাকে পেলাম
লোহার জাহাজগুলোর পাশে,
মার্তাবানের নোংরা জলরাশির ধারে,
তার চোখ খুঁজছিল একজন পুরুষ।
তারও ছিল লোহার মতো শক্ত পায়ের নলি,
আর রোদ ঝলকাচ্ছিল তার চুলের লোহায়।
আমার প্রেমিকা, যাকে আমি চিনতাম না।
আমি তার পাশে বসলাম
তার দিকে না তাকিয়ে
কারণ আমি ছিলাম একা
আর আমি চাই-নি নদী কিংবা গোধূলি
কিংবা ভক্তকুল, কিংবা টাকা অথবা চাঁদ আমি,
একজন মেয়েমানুষ চাইছিলাম।
আমি চাইছিলাম একজন মেয়েমানুষকে জড়িয়ে ধরতে,
প্রেমের জন্য একজন মেয়েমানুষ, বিছানার জন্য একজন মেয়েমানু
রুপালি, কালো, বেশ্যা কি কুমারী,
মাংসাশী, নীল কী কমলা,
কিছু যায় আসে না।
আমি চেয়েছিলাম তাকে ভালোবাসতে এবং না বাসতে,
তাকে চেয়েছিলাম কাছে, এতটা কাছে
যেন চুম্বনের সময় তার দাঁতগুলো অনুভব করতে পারি,
চেয়েছিলাম তার নারী ।
চিন্তাহীন, আমি জ্বলছিলাম তার জন্য।
হয়তো সে চেয়েছিল
আমি যা চাই তাই। হয়তো নয়।
কিন্তু ঐ মারতাবানে, লোহার নদীর পাশে
যখন রাত্রি উঠে এল নদী থেকে
বড়-বড়-মাছে-ভর্তি জালের মতো,
আমরা দুজনে মিলে ডুবতে গেলাম, সে এবং আমি,
বেপরোয়া মানুষের তিক্ত আনন্দের স্রোতে।
6.
স্পেনের গৃহযুদ্ধের স্মৃতি, লোর্কার হত্যাকাণ্ড ইত্যাদি
ঐ মৃত্যুগুলো আমাকে দিয়েছে এত দুঃখ
এতটা দুঃখ যেন বা তারা পিটিয়েছে আমাকে
প্রতিটি অস্থি-সন্ধিতে,
ঐ ব্যক্তিগত মৃত্যুগুলো
যার মধ্যে আমরাও নিহত হই।
কেননা ওরা বাঁধলো ফেদরিকো আর মিগুয়েলকে
স্পেনের ক্রুশের সাথে
পেরেক ঢুকিয়ে দিল তাদের চোখ এবং জিহ্বার ভেতরে।
তাদের রক্ত ঝরাল, পোড়াল তাদের জীবন্ত,
তাদের বিরুদ্ধে কটূক্তি করল, অপমান করল,
তারপর তাদের বিধ্বস্ত শরীর ফেলে দিল খাদে,
এই কারণে, ঐ কারণে, কেননা ঘটনা ছিল সেরকম।
এভাবে তাদের নির্যাতন করা হলো,
ক্রুশবিদ্ধ করা হলো,
যতক্ষণ না তারা স্পেনের নিহতদের মধ্যে স্মৃত হয়,
তাদের আলখাল্লা ঘিরে মাছির ভনভন,
অস্ত্রশস্ত্রের মধ্যে ভ্রুকুটি আর থুথু,
নাইটিঙ্গেলের ছোট্ট কঙ্কালের মতো
ভয়াবহ অস্থিশালার দিকে যাত্রারত,
রক্তপাতরত মধুর ফোঁটা যেন
মৃতদের জগতে হারিয়ে যাওয়া।
আমি সাক্ষী,
আমি ছিলাম সেখানে,
আমি সেখানে ছিলাম
এবং আমি দুঃখভোগ করেছি এবং আমি
সাক্ষ্য দিচ্ছি
যদিও কেউ নেই স্মরণ করবার,
আমি একা
স্মরণ করছি,
যদিও পৃথিবীতে অবশিষ্ট নেই কোনো চোখ
আমি দেখে যাবো
আর সেই রক্তের রেকর্ড থাকবে এখানে,
সেই ভালোবাসা জ্বলতে থাকবে এখানে।
কোনো বিস্মরণ নেই, ভদ্রমহিলা ও মহোদয়গণ,
আমার আহত মুখ দিয়ে
তাদের মুখগুলো গান গেয়ে যাবে নিরন্তর।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.