নন্দন – পুত্রসন্তান। রঘুনন্দন – শ্রীরামচন্দ্র।
চট্টগ্রাম শহরে রিয়াজুদ্দিন বাজারের পাশে অবস্থিত ছিল – নন্দনকানন। মেয়েদের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও আছে ওই নামে।
স্বর্গের-উদ্যান যার অধিপতি দেবরাজ ইন্দ্র : নন্দনকানন।
নন্দনের সঙ্গে সুন্দরের একটা সংযুক্ততা আছে। আছে ভিন্ন অর্থও। সন্তানলাভ ভাবগত অর্থে আনন্দ-সংবাদ।
এসব উচ্চমানের জায়গা ছেড়ে আমরা মানুষের জীবনের যাত্রাবিন্দুতে পৌঁছতে চাই। সেখানে নন্দন ছিল না। ছিল টিকে থাকার সংগ্রাম। মানুষ তার ঐতিহাসিক ক্রমবিবর্তনের মধ্য দিয়ে ধীশক্তি লাভ করেছে। তাই মানুষকে যুক্তিবাদী জ্ঞানী আখ্যা দেওয়া হয়। এটা এক-দুদিনের ব্যাপার নয় – লাখ লাখ বছর অতিক্রম পরের অবস্থা আজকের মানুষ। দুটি হাত দিয়েই তাকে সবকিছু করতে হয়েছে। এমনকি ম্যামথের মতো বিশালাকায় জন্তুর সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকা। তখন তো হাতে ড্রোন ছিল না। শুধু হাতের কাছে পাওয়া প্রস্তরখণ্ড ও বৃক্ষের শাখা। মানুষ যূথবদ্ধ হয়েছে নিজেদের রক্ষার খাতিরে। আজকের সমাজ দেখে সেই সময়কে অনুমান করা যাবে না। আজকে মানবসমাজ একা থাকার ব্যবস্থাপনা নির্মাণ করেছে। বৃদ্ধ-বৃদ্ধাকে একা থাকার প্রতিষ্ঠান গড়ে দিয়েছে। মানুষের সেই ভয়াবহ জীবনচিত্র আমরা পাচ্ছি গুহার গায়ে আঁকা চিত্রে। এই চিত্র তাদের দিয়েছে উৎসাহ ও মনোবল। বাইসন বা বুনোগরু কোথায় পালাবে? বাছাধন, তোমাকে আমরা জাদুর ফাঁদে ঘিরে ধরেছি। এই গুহাচিত্র পাওয়া গেল ফ্রান্সে ও স্পেনে। আজকে ভারতবর্ষের মধ্য প্রদেশে আমরা পেয়েছি – ভীমবেটকা নামক গুহা। আমার দেশে শিল্পচর্চারত ব্যক্তিদের খুব সহজ দর্শনযোগ্য এই গুহা। ভীমবেটকা বা ভীমের বাড়ি দেখে তৎকালীন শিল্পীর মানস চেনা যাবে। প্রতিটি শিল্পের পশ্চাদভূমি বিশাল। শিশুচিত্র তাই মানুষের কাছে এত আনন্দদায়ক। কোথা থেকে ওরা সব বিষয় নিয়ে আসে? চারপাশ, কল্পনা ও নানান অনুষঙ্গ মাথায় ঘুরপাক খায়। তার প্রকাশ।
প্রাচীনতার দিক দিয়ে চিত্রকর্মের আগে নির্মিত নৃত্যকলা ও নাচ-গান। এই শিল্পকর্মের বা অর্কেস্ট্রার নমুনা মিলেছে মধ্য এশিয়ায়। এর ধারাবাহিকতা নিশ্চয় সারা মানবসমাজে ছিল। মরু অঞ্চল মিশরে বেলিডান্স সারাদিনের কষ্ট লাঘবের একটি ভালো উপাদান। যৌনতা জীবনকে উষ্ণ করে – শরীর সতেজ হয়। এটি প্রকৃতজ।
ভাস্কল উইর্জেনডর্ফের পেটমোটা মাতৃকামূর্তি মোটেই সুন্দর নয়। কিন্তু জীবনঘনিষ্ঠ প্রকাশ। গর্ভবতী নারীর চিত্র। নতুন জীবনকে আনতে যাচ্ছে।
চীনে তৈরি পোর্সেলিন ও মৃৎপাত্র অপূর্ব রং ও আকার শোভিত। চীনের প্রাচীর বিস্ময়কর। এগ্শেল বা ডিমের মতো পাতলা খোসার পোর্সেলিন এতো সূ²কর্ম যে অবাক হতে হয়। মানুষ নিজের মোটা দাগের চাহিদা মিটিয়ে তারপর নয়নশোভন – নয়নভোলন সব পাত্র গড়ে তুলেছে।
নন্দনতত্ত¡ যে শুধু সুন্দরের পূজার জগৎ, তা নয়। চীনের প্রাচীর সৌন্দর্যকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেনি। গড়ে উঠেছে বাঁচার প্রয়োজনে। বহির্শত্রুর হাত থেকে রাজ্যবাসীকে রক্ষার জন্য। এই বিশালতা বিস্ময় জাগায়। সৌন্দর্যবোধ এক্ষেত্রে হাবুডুবু খায়।
নন্দনতত্ত¡ সৃষ্টির মূল – প্রকৃতি ও মানুষের সামাজিক ও ব্যক্তি মানসের প্রকাশ। তাজমহলে হাজার হাজার শ্রমিকের অবদান আছে। নকশাকার নকশা করে ছেড়ে দিলে এটি সমাপ্ত হতো না। শ্রমিক, কারিগর ও নকশাবিদের সম্মিলিত ফল তাজমহল। পেছনে আছে মানুষ-সম্রাট শাহজাহানের অন্তরকান্না। বিরহ। এই সৌধটি প্রতিটি দর্শককে মুগ্ধ করে। অবাক বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে যায়। এই মনুমেন্টটি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ স্মৃতিসৌধ।
নন্দনতত্তে¡ টেকনোলজিনির্ভর অন্যতম শিল্প আলোকচিত্র ও পরিশেষে চলচ্চিত্র। ঊনবিংশ শতকে ক্যামেরা আবিষ্কার যুগান্তকারী বিষয়। এর সঙ্গে ঊনবিংশ শতকের শেষ দিকে আসে সিনেমা। চলচ্চিত্র প্রথমে ছিল বাকহীন বা নির্বাক। ১৯৩০-এর দিকে সবাক। যে-কারণে তখন এর নাম হয় টকিজ।
আজকে অনেক দামি অভিনেতারা বলে থাকেন, চলচ্চিত্র হলো : এন্টারটেইনমেন্ট, এন্টারটেইনমেন্ট অ্যান্ড এন্টারটেইনমেন্ট।
এই আপ্তবাক্যটি তোতাপাখির মতো আউড়ে যান খুদে অভিনেতারাও।
নন্দনতত্ত¡ মূলত শিল্পতত্ত¡। এর অনেক শাখা আছে।
সবচেয়ে বড় যে কোনটি, তা আজ বলা কঠিন। একসময় ছিল সাহিত্য সবার ওপরে। যার স্রোত ধরে
প্লেটো-অ্যারিস্টটল এগিয়েছেন। গুরু-শিষ্যে প্রভেদ ছিল। গুরুর কাছে শিল্প হলো আদর্শবাদ। শিষ্য অ্যারিস্টটল বলেন : শিল্প হলো অনুকরণ। সাহিত্য-কেন্দ্র করে বলে তাঁর রচনার শিরোনাম : পোয়েটিক্স বা কাব্যতত্ত্ব।
প্লেটো-অ্যারিস্টটলের অনেক আগে জন্মেছেন মহাকবি হোমার। তখন গ্রিক নাটকও ছিল সচল। নাট্যকার সফোক্লিসের ইডিপাস রেক্স জগৎমাতানো নাটক। নাট্যকার অ্যারিস্টফেন্সেও কম যান না। এভাবে গ্রিক সমাজে তখন সাহিত্যের জমজমাট অবস্থা।
ভারতীয় সমাজ নন্দনতত্ত্বের আলোচনায় পিছিয়ে ছিল না। কথায় কথায় আমরা বলি, ছয় রাগ ছত্রিশ রাগিণী। আর সবচেয়ে বড় কথা, এই দুটি ভাগের মধ্যে পাঁচটি স্বয়ং শিবসৃষ্ট। একটি তৈরি করেছেন পার্বতী।
আরো একটি কথা প্রচলিত ভারতীয় সমাজে যে, আদিতে ঈশ্বর সংগীতে ছিলেন। ওঁ-কার ওঙ্কার ধ্বনি ঈশ্বরের প্রতিশব্দ। যেজন্য ভারতীয় সমাজে তা ওম শব্দে রূপান্তরিত হয়েছে।
ভারতীয় নন্দনতত্তে¡ কলা ও শিল্প বিষয়ে চৌষট্টি কলার উদাহরণ দেওয়া হয়। এর পুরো তালিকা নির্ণয় না করে পাঠকের অনুসন্ধিৎসার ওপর অর্পণ করলাম।
চারুকলার ক্ষেত্রে ভারতীয় শিল্পে ষড়ঙ্গ বা ছয়টি নীতি বহুলকথিত – ১। রূপভেদ, ২। প্রমাণ, ৩। ভাব, ৪। লাবণ্যযোজন, ৫। সাদৃশ্য ও ৬। বর্ণিকাভঙ্গ।
চিনা শাস্ত্রেও এই কটি গুণ সংযুক্ত হয়। তবে আর একটি অতিরিক্ত গুণ আছে। তা হলো, তুলি ধরার ধারা বা কৌশল।
ভারতীয় শিল্পী তুলি ধরেন বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ, অনামিকা ও মধ্যমার সাহায্যে।
এদিকে চীনা শিল্পীরা তুলি ধারণ করছেন মুষ্টিবদ্ধ করে। যেমন করে আমরা শাবল অথবা কোদাল ধরি। অর্থাৎ তুলি ধারণের ধরনটি চীনা শিল্পশাস্ত্রে বা চিত্রশিল্পের ক্ষেত্রে এটিকেও একটি নীতিতে পর্যবসিত করেছে। বাকি সব নীতি একই।
ভারতীয় দর্শন-ধর্ম-জীবনধারা পার্বণনির্ভর। তাই সর্বক্ষেত্রে শিল্পধারার প্রয়োজন। যে-কোনো ধর্মীয় ক্রিয়া-কাণ্ডে মণ্ডনধর্মিতা সহগ। সেটা হোক দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক বা বার্ষিক অনুষ্ঠান। তাছাড়া ভারতীয় ধর্ম একেশ্বর ও বহু ঈশ্বরবাদের সমাহার, তাই এর চরিত্র পৃথিবীর অন্য সব ধর্মীয় দল থেকে আলাদা।
হিন্দুধর্মের সঙ্গে শিল্পকলা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। শিব একাই নৃত্য ও বাদ্যের জনক। তিনি বীণা বাজাচ্ছেন, বাজাচ্ছেন ডমরু, মৃদঙ্গ। তিনি নৃত্যের মাধ্যমে সমস্ত জগৎকে ছন্দে বেঁধেছেন।
নন্দনতত্ত্বের ব্যাখ্যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সবচেয়ে বড় শিব। তিনি সমস্ত শিল্পধারাকে চর্চা করে গেছেন।
কাজী নজরুল ইসলামের ক্ষেত্রেও বলা যায়, তিনি অনেক শিল্পধারাকে সঞ্জীবিত করে গিয়েছিলেন। এক হাতে বাঁশের বাঁশরি আর হাতে রণতূর্য …
কাব্য যেমন দোলনচাঁপা, তেমনি বিষের বাঁশী – দ্বন্দ্ববাদমূলক মানসের আর এমন নমুনা কোথায় পাওয়া যাবে। সৃষ্টির সঙ্গে ধ্বংস অনিবার্য। আজ গাজা স্ট্রিপের দিকে নজর দিন … চোখে পড়বে ধ্বংসস্তূপ … মোহেন-জো-দারো … আজকের সৃষ্টি। মানুষের অত্যাধুনিক মারণাস্ত্রের উদ্ভবের ফল। মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব : সেই মানুষ একদল যখন যুদ্ধবিরতি পালন করছে … অন্যদল তখন খালি মাঠে ধ্বংসলীলা চালিয়ে যাচ্ছে … হাসপাতাল-বিদ্যালয় কি নয়? অক্ষত ভবন যেন একটিও না থাকে। এথনিক ক্লিনজিং কথাটা খুব চালু ইদানীং। সুতরাং আমি নতুন করে আর ব্যবহার করছি না। কী হবে এক কথা বলে। কোনো কথারই আজ মূল্য নেই – পারলে টিকে থাক, না হয় ধ্বংস হও। প্রাণিকুলের ‘সার্ভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট’ ডারউইন উবাচ।
ভারতীয় নন্দনতত্ত¡ ও সমগ্র জ্ঞানভাণ্ডার হলো : বেদ। বেদ অর্থই জ্ঞান। এই বেদ আবার চার ভাগে বিভক্ত : ঋক, যজু, সাম, অথর্ব। এই বেদের আবার বিভাগ ছিল উপবেদ। তার মধ্যে পড়ে : ক. অর্থশাস্ত্র, খ. ধনুরবেদ। অর্থাৎ তৎকালীন ভারতবর্ষ লৌহযুগে অবস্থান করছিল। তাই ধনুকের ব্যবহার ছিল মারণাস্ত্রের প্রধান মন্ত্র।
ভারতীয় শিল্পে নৃত্যকলার স্থান ছিল যথেষ্ট ওপরে। প্রাচীনকাল থেকে মানুষ মনোরঞ্জনের জন্য নৃত্যকলাকে সব সময় উচ্চে আসন দান করেছে। ভারতবর্ষে তা উচ্চাঙ্গ শিল্পে রূপ লাভ করে, যা আজো ধ্রুপদী-ধারায় অনুশীলিত। এর মধ্যে পড়ে : কত্থক, ভরতনাট্যম, কথাকলি ও মণিপুরী। আজকাল ওডিশী নৃত্যশৈলীকেও আর একটি দ্রুপদী ধারায় স্থান দেওয়া হয়।
ভারতীয় নন্দনতত্ত্বে চৌষট্টি কলার সরাসরি উল্লেখ আছে। আমরা তার মধ্যে প্রধান কয়েকটির উল্লেখ করছি : সুতোর কাজ, ছোট ঢোল, প্রহেলিকা কেন্দ্র করে : ধাঁ ধাঁ, আবৃত্তি, মুখস্থ বলা, ছোট নাটক, বেতের কাজ, সূত্রধরের কাজ, প্রকৌশল ও স্থাপত্য, আঞ্চলিক ভাষাজ্ঞান, অক্ষরজ্ঞান, ইশারা বিদ্যা, পুতুল গড়া, জুয়াখেলা, শৃঙ্খলা সৃষ্টির কৌশল, শিক্ষককে গান ও বাজনা সহযোগে জাগানো, ঔষধবিদ্যা, কাব্য-রচনা, নাচনশিক্ষা, গহনা পরার বিদ্যা ইত্যাদি। ভবিষ্যতে পুরো ৬৪ কলা সম্বন্ধে বলার আশা রাখি।
আমরা সারাবিশ্বের পরিপ্রেক্ষিতে নন্দনতত্ত¡ বা এয়েসথেটিক্সের গোড়ার কথায় আসি।
ইংরেজিতে যা এয়েসথেটিক্স বা নন্দনতত্ত¡ বা অ্যায়েসথেটিক্স তা আবিভর্‚ত হয়েছে গ্রিক শব্দ Aesthetics থেকে – যার মর্মার্থ : অনুভবের অনুভূতি বা sense of perception। অর্থাৎ মৌলিক পঞ্চ-ইন্দ্রিয়প্রাপ্ত জ্ঞান। এর ভাবার্থে আসছে শিল্পকলা, সংস্কৃতি এবং প্রকৃতির বিচারবোধ সম্পর্কের প্রতিফলন। শিল্পকলার দর্শন হিসেবে। এর বিশেষত্ব হলো : সৌন্দর্যের বোধকে বিশ্লেষণ করা। অর্থাৎ গুণের বা শিল্পগুণের যথোচিত বিচার বা উপচয়। সুতরাং নন্দনতত্ত্ব মূলত দর্শনের একটি শাখা। যার মধ্যে মনোসতত্ত্ব একটি বড় ভ‚মিকা পালন করছে। শিল্পকলা যেহেতু ধাতব ও ভাবনাকে কেন্দ্র করে তাই এর মধ্যে বিজ্ঞানও প্রবিষ্ট হচ্ছে। স্থাপত্যবিদ্যায় বর্তমানে বিশেষ করে ধাতববিদ্যা বড় ভূমিকা পালন করছে। স্থপতি, ইঞ্জিনিয়ার ও বস্তুজ্ঞানসম্পন্ন বিদ্বজ্জনের মিলিত চিন্তা স্থাপত্য নির্মাণে কাজ করছে। তার সঙ্গে আসছে পরিবেশবিজ্ঞানী। রাষ্ট্রব্যবস্থার বড় বড় সব প্রতিষ্ঠান সংযুক্ত হয়ে পড়ছে। তার সঙ্গে আছেন মূল শিল্পী। যিনি সবদিক রক্ষা করে তাঁর ভবনের নকশা ও কার্যকর বিভাগকে বিন্যস্ত করবেন। স্থাপত্য তাই একটি দলগতবিদ্যা। যদিও একজন প্রধান স্থপতি থাকেন, যাঁকে সবাই তাঁদের বিষয় ধরে যথার্থ সাহায্য করে চলেন। নন্দনতত্তে¡র ক্ষেত্রটি আজ বিবিধজ্ঞানের সমাহারে পালন করা হয়।
‘পাখি সব করে রব রাতি পোহাইল’ – কাব্যের সঙ্গে ‘রাত পোহাল, ফর্সা হোলো,/ ফুটল কতো ফুল; …’ – এই দুই কাব্যধারায় অনেক পার্থক্য লক্ষণীয়।
এই কাজটি করেন কাব্যতত্ত্ববিদ – বৃহত্তর অর্থে নন্দনতত্ত্ববিদ। তাই নন্দনতত্ত্ব আজ বিভিন্ন শাখায় বিভক্ত।
ভিজুয়াল আর্ট বা চিত্রকলা জাতীয় শিল্পকলা ভিন্ন আঙ্গিকে আলোচিত হবে। যেমন মিউজিক বা সংগীত নিয়ে আলোচনা হবে ভিন্নধারায়। আজকের বিশেষায়িত যুগে একজনের পক্ষে সবকিছু জানা কষ্টসাধ্য।
বাংলা সংস্কৃতিতে সব দিক ছুঁয়ে গেছেন এমন শিল্পব্যক্তিত্ব বা কবি মাত্র একজনই। অদ্বিতীয়। কোনো কোনো ব্যক্তিকে সব্যসাচী বলা হয়, তা দলবাজি মাত্র।
নন্দনতত্ত্বকে এক কথায় বলা যায় শিল্প-সাহিত্যের দর্শন। অবশ্য লোকশিল্প বা লোকজীবনের লৌকিক উৎসব ও জীবনযাপন ধারাকেও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। অন্তর্ভুক্ত করতে লোকবিশ্বাস, ক্রীড়া, এমনকি রন্ধনপ্রণালি। জীবনধারায় যা কিছু অন্তর্ভুক্ত তার মধ্যে শিল্প বা সৌন্দর্যের অবস্থান অবধারিত। সুচারুরূপে পালন করার প্রচেষ্টার মধ্যে সৌন্দর্য ও নান্দনিকতা নিহিত। তাই হার্বার্ট রিড তার দ্য মিনিং অফ আর্ট পুস্তকে শিল্পকে সংজ্ঞায়িত করেছেন … ‘অ্যান অ্যাটেম্পট টু প্লিজিং ফর্ম।’ সুন্দর রূপদানের প্রচেষ্টা হলো শিল্প। তখনই প্রশ্ন আসে, সৌন্দর্য কী?
এ-বড় কঠিন প্রশ্ন। কারণ এই বোধ ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে পার্থক্য বিদ্যমান। সৌন্দর্য অঙ্কের সৌন্দর্য নয়। দশে দশ। বড় জটিল কুটিল।
ভারতীয় নন্দনতত্তে¡র আকর বাৎসায়নের কামসূত্র। এই সূত্র ধরে খাজুরহে ৮৬টি মন্দির নির্মিত হয়েছে, যা
নর-নারীর যৌনমিলনের ভাস্কর্যরূপ। ভারতীয় শিল্পের এ-এক জীবন্ত জাদুঘর। ইলোরা – পাথরখোদাই মন্দির হিসেবে প্রকৌশলশাস্ত্রের সর্বোচ্চ নিদর্শন। আর খাজুরহে ইলাসট্রেশন বা চিত্রনির্মাণ – ত্রিমাত্রায়।
রাজনৈতিক পটভূমির পরিবর্তন নন্দনতত্ত্বে বড় প্রভাব ফেলে। ভারতীয় শিল্পে মোগল যুগ এক নতুন শিল্পধারা স্থাপন করে। চিত্রে-স্থাপত্যে-নকশায়। এর অভিঘাত পূর্ববর্তী ধারার সঙ্গে অঙ্গীভূত হতে থাকে এবং নতুন ধারার প্রবর্তনও করে। তেমনি ব্রিটিশ আমলের অভিঘাত। এভাবে নন্দনতত্ত¡ নানা রূপ ধারণ করে চলতে থাকে।
নন্দনতত্ত¡ মৌলিক ও প্রধান দার্শনিক ধারা হিসেবে যারা এর প্রবক্তা হয়ে ওঠেন তাঁদের মধ্যে অষ্টাদশ শতকে আমরা পাই জার্মান দার্শনিক আলেকজান্ডার গটলিব বাউমগার্টেনের নাম। এরপর কয়েকজনের নাম আমরা করে যেতে পারি। যেমন : অ্যান্থনি অ্যাশলে কুপার, জোসেফ অ্যাডিশন, জ্যঁ ব্যাপটিস্টে দ্য বস এবং ফ্রান্সিস হাচিসন।
আধুনিক যুগে অস্কার ওয়াইল্ডকে নন্দনতত্ত্বের জনক বলা হয়ে থাকে। তবে ডাবলিন ব্রিফিল্ড (১৮৫৪-১৯০০) এই ফরাসি নন্দনতত্ত্ববিদকে বেশ উচ্চাসন দেওয়া হয় তাঁর নন্দনতত্ত্বের মৌলিক কিছু তত্ত্ব দান করার জন্য। তাঁর তত্ত্বের ধারা হলো –
ক. ইমিটেশন বা অনুকরণ, যা আমরা অ্যারিস্টটলের তত্ত্বে লাভ করেছি।
খ. ফর্মালিজম বা কাঠামো দান করা। একটি উপাদ্যকে কাঠামোর ওপর দাঁড় করান।
গ. আবেগবাদ – অর্থাৎ শিল্পকর্মে আবেগ তৈরি করা।
ঘ. বাস্তববাদ – অর্থাৎ বাস্তবতার সঙ্গে মিল রাখা।
ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত শিল্পসৃষ্টির অভিঘাত অনুসরণ করে তিনি এই তত্ত্ব দান করেছিলেন। সুতরাং বিংশ শতাব্দীর শিল্পধারায় যে-বিপ্লব ঘটে তার ওপর তিনি মন্তব্য করার সুযোগ পাননি।
ঊনবিংশ ও বিংশ শতকের নামি ইতালীয় নন্দনতত্ত্ববিদ বেনডেত্তো ক্রোশ (১৮৬৬-১৯৫২) নন্দনতত্ত্ববিদদের একজন মহাজন। তিনি বলছেন যে, নন্দনতাত্ত্বিক প্রকাশ কিন্তু চিন্তার প্রতিফলন নয়, বরং আবেগের প্রকাশ। অর্থাৎ শিল্পীর চিন্তা নয়, তিনি তাঁর আবেগ প্রকাশ করছেন শিল্পের মাধ্যমে। এই তত্ত্ব বিশ্ব নন্দনতত্ত্বে বেশ প্রভাব রেখে চলেছে।
এরপর অন্যতম নামি ফরাসি নন্দনতত্ত্ববিদ ইউজিন ভেরন (১৮২৫-৮১) বলেন ভিন্ন কথা। তাঁর মত অনেকটা ক্রোশের মতো, তবে পরিপূর্ণতা নিয়ে – অর্থাৎ শিল্পের বহিরঙ্গের সবকিছু অন্তর্ভুক্ত করে। শুধু আবেগ নয় –
চিন্তা-ভাবনা ও পরিপাশর্শ্বও অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যা বলা হচ্ছে বা প্রকাশ করা হচ্ছে। তিনি বলতে চাইছেন যে, রেখা, রং, ভঙ্গি, ধ্বনি, শব্দ এসব মাধ্যমে মানুষ তার আবেগ প্রকাশ করে। অর্থাৎ সব উপকরণকেও সংযুক্ত করতে হবে। শুধু আবেগের প্রকাশ বলা চলবে না। অর্থাৎ মূলত আবেগের প্রকাশ হলেও তার মাধ্যমগুলোকেও ধারণ করতে হবে। অর্থাৎ আবেগ কীভাবে প্রকাশ পাচ্ছে সেই উপাদানগুলোকেও পাঠ করতে হবে।
সাহিত্যক্ষেত্রে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব কাউন্ট লিও টলস্টয় শিল্প সম্বন্ধে বেশকিছু তত্ত্ব দান করে গেছেন, যা নন্দনতত্ত্বের অন্যতম দিগদর্শন।
টলস্টয় (১৮২৩-১৯১০) বেশ কয়েকটি উপপাদ্য দিয়ে গেছেন শিল্প সম্পর্কে। তা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে আরো বর্ধিত করে। তিনি যা বলেছেন তার মধ্যে নতুনত্ব যে-ধারণাটিতে তা হলো, মূল্যবোধ। এই ধারণাটি বিশ্লেষণ করার আগে আমরা তাঁর কাছ থেকে যা কিছু পেয়েছি তার উল্লেখ করতে চাই।
ক. শিল্পসম্মত – artistic
খ. রুচিকর – tasteful
গ. সুরুচিকর – in good taste
ঘ. কৃতজ্ঞ – grateful
ঙ. সুচারু – elegant
চ. আর্তচমৎকার – exquisite
ছ. সুন্দর – beautiful
জ. আকর্ষণীয় – attractive
ঝ. রমণীয় – pleasing
ঞ. নান্দনিক – esthetical
ট. অপূর্ব – awesome
টলস্টয়ের কাছে ভালো শিল্প হতে হলে তার মধ্যে নৈতিকতা থাকতে হবে। অর্থাৎ নৈতিক উদ্দেশ্য থাকবে অন্তর্নিহিত। যাকে বলা হবে ভালো শিল্প বা নৈতিকতা বহনকারী শিল্প।
ব্যক্তি টলস্টয় সন্তসুলভ জীবনধারণ করায় এটা তাঁর উপলব্ধি। সাধারণ মানুষ এমন করে ভাবতে খুব একটা সক্ষম নয়। ভালো-মন্দ এমনভাবে ওতপ্রোতভাবে জড়িত যে, এদের পৃথক পৃথক ধারা নির্মাণ দুরূহ। টলস্টয়ের নীতি ধরলে শিল্প স্বাভাবিকভাবে দুটি ধারায় বিভক্ত হয়ে যায় : ভালো শিল্প-মন্দ শিল্প। এভাবে দ্বিমাত্রিক শিল্প বিভাগকে মানা দুরূহকর্ম। শিল্পী ভালো-মন্দ হতে পারে, তাঁর শিল্প ভালো বা খারাপ বলার মধ্যে কুণ্ঠা এসে বাধা দেবে। তবে শিল্পের মাপকাঠিতে উচ্চাঙ্গ ও সাধারণ এই বিভাগ মানা গেলেও যেতে পারে।
উদাহরণ : গুহাচিত্রের অংকন ও রসায়ন বা পরিব্যাপ্তিকে আমরা বিচার করি না, বলে উঠি : কী চমৎকার কাজ!
ভালো-মন্দের মাপকাঠি সেথা থই পায় না।
পারসেপশন বা প্রত্যক্ষণের ধারাকে আমরা পাঁচটি পর্বে বিভক্ত করতে পারি :
ক. স্টিমুলেশন বা উজ্জীবিত করে তোলা
খ. অর্গানাইজেশন বা সংগঠনধারা অবলোকন
গ. ইন্টারপ্রিটেশন বা ব্যাখ্যা করা
ঘ. মেমোরি বা স্মৃতিলব্ধকরণ
ঙ. রিকল বা পুনরায় স্মরণ করতে পারা।
উপরিউক্ত ধারা ধরে আমাদের মস্তিষ্ক প্রত্যক্ষণ ব্যাপারটিকে সঞ্চালন করে। জার্মান দার্শনিক বা শিল্পতাত্ত্বিক ইমানুয়েল কান্ট একজন বড় মহাজন শিল্পতত্ত্বের বা নন্দনতত্ত্বের ক্ষেত্রে। তাঁর জীবতকাল (১৭২৬-১৮০৪) অষ্টাদশ শতক। কিন্তু আধুনিক নন্দনতত্ত্ব আলোচনা করতে গিয়ে তাঁকে বাদ দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। অধিবিদ্যক বা মেটাফিজিক্সের তিনি একজন বিশাল ব্যক্তিত্ব। আজকেও আমরা তাঁর শিল্পবিশ্লেষণের ধারা থেকে বাইরে যেতে পারি না।
লিবারেশন অব সেলফ বা আত্মবিলুপ্তি তাঁর অন্যতম তত্ত্ব তাঁকে আধুনিক নীতিতত্ত¡ বা এথিকসের পিতৃপুরুষ বলে বিবেচনা করা হয়। কি এই লিবারেশন অফ সেলফ অর্থাৎ দর্শক শিল্পের সঙ্গে একাত্ম হয়ে গিয়ে নিজের অস্তিত্ব বিস্মরিত হয়। এবং সাহিত্যে বা কাব্যে ব্যবহৃত চরিত্রের মধ্যে হারিয়ে যায়। নিজের অস্তিত্ব তখন বিলীন। নাটক দেখতে দেখতে দর্শক তাই হাসে-কাঁদে-ক্রোধিত হয়। তার মন তখন শিল্পে জারিত হয়। মানুষ শিল্পচরিত্রে বিচরণ করতে থাকে। শিল্পের এই এক মোহনীয় শক্তি।
কান্টের আর একটি আপ্তবাক্য – পার্পাসিভনেস উইদআউট পার্পাস – অর্থাৎ, উদ্দেশ্যহীন উদ্দেশ্যবাদ, অপ্রয়োজনের প্রয়োজন।
একটি পোস্টাল স্ট্যাম্পের দাম পাঁচ টাকা মূল্য থেকে সময় পার হয়ে গিয়ে পাঁচ লক্ষ মুদ্রায় দাঁড়ায়। তা-ও উঠতে পারে নিলামে। এবং সর্বোচ্চ ডাকধারী মালিকানা লাভ করেন।
এই প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক মতবাদের স্রষ্টা কার্ল মার্কসের (১৮১৮-৮৩) কথা বলা যায়। রাজনৈতিক দার্শনিক হলেও তিনি শিল্পতত্ত্ব সম্বন্ধে বলতে ছাড়েননি। তিনি বলেছেন যে, যে-ব্যক্তি দিনরাত মজুরি করে, কোনো বিশ্রাম পায় না, তার মিউজিক শোনার কান বা কবিতা বোঝার জান তৈরি হয় না। তিনি এদের বলেছেন উদয়াস্ত খেটে যাওয়া লুম্পেন প্রলেতারিয়েত – তাদের কাছে শিল্প ভালো কি মন্দ – উঁচুদরের না নিচুস্তরের – এসব বিচারবোধ তৈরি হয় না। তার কাছে পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটিতে পর্যবসিত হয়। কবিতা নয়, সংগীত নয়, সাহিত্য নয়, ক্ষুধাতুর শিশু চায় না স্বরাজ, চায় একমুঠো ভাত একটু নুন – বলেন কবি। গরিবের প্রয়োজন মিটিয়ে তবে শখ মেটান। চারুকলা উপভোগ করার মতো মন-মেধা ও দৃষ্টি।
কার্ল মার্কস সারাবিশ্বে সাম্যবাদী ধারার জনক। সেই সঙ্গে চিন্তাধারার ক্ষেত্রে আনেন বৈপ্লবিক পরিবর্তন। তিনি কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো শুরু করেন : ‘মানুষের ইতিহাস শ্রেণি-সংগ্রামের ইতিহাস।’ এই দৃষ্টিভঙ্গিকে কেন্দ্র করে তিনি বলেন যে, গণতন্ত্র আসলে ধনিকশ্রেণির শাসন। বর্তমান বিশ্বে এটি দিবালোকের মতো পরিষ্কার। রাষ্ট্রীয় নীতি ধনিক শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করে চলা। শ্রমিকের বেতন সেই সাবসিসটেন্স লেভেলই রয়ে গেছে।
তৃতীয় বিশ্বে আমরা এটা পরিষ্কার দেখতে পাই। গার্মেন্টস শিল্পে কারখানার শ্রমিক শুধু দেহটুকু ধারণের মাইনে পান। কাজী নজরুলের কবিতার পঙ্ক্তি – ‘কত পাই দিয়ে কত ক্রোড় পেলি বল’।
কার্ল মার্কস যে-দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ সৃষ্টি করেন তাকে ধরে বিশ্বের তাবত তত্ত্ব পুনর্বিবেচিত হতে থাকে। যার ফল ভাববাদ ও বস্তুবাদ। দ্বান্দ্বিক এই নীতি সিনথেসিসে বা সংশ্লেষণ পুনরায় থেসিস বা প্রতিপাদ্যে রূপান্তরিত হয়ে নতুন অ্যান্টিথেসিসের জন্ম দিচ্ছে এবং তা-ও একসময় সংশ্লেষণের মাধ্যমে নতুন ধারার সৃষ্টি দান করছে। এভাবে ধারা সময় ধরে বা কালনির্ভর হয়ে নতুন নতুন চিন্তার পটভূমি নির্মাণরত। এই বিবর্তন অনবরত ক্রিয়াশীল এবং কালে তা বিশাল বিবর্তিত জগৎ তৈরিতে সৃষ্টিরত। কোনো কিছু একদিনে হচ্ছে না। যুগান্তরে তা প্রকাশিত ও প্রস্ফুটিত এবং তার বিপরীত ধারা জন্মদান করে চলেছে।
ঘুমন্ত চীনা জাতিকে আফিমের আবেশ থেকে মুক্ত করেন মাও সে তুং। তিনি শিল্প সম্বন্ধে সচেতন ছিলেন। তাই উচ্চারণ করে গেছেন যে, সাহিত্য যেন খবরের কাগজে পর্যবসিত না হয়। অর্থাৎ শিল্পের সুষমাকে তিনি জোরদার করার পক্ষে ওকালতি করে গেছেন। অবশ্য মাও সে তুং-এর পর তাঁর স্ত্রীর হাতে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের নামে অনেক মূল্যবান শিল্প ধ্বংস হয়ে যায়। চৌ-এন লাই-এর সময় থেকে তা আবার সঠিক পথপরিক্রমা শুরু করে।
দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের প্রভাব বাংলায় বেশ বড় একটা প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে সাহিত্যে।
ভারতমাতাকে ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত করার জন্য অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতমাতার মুক্তির চিত্র অংকনের সঙ্গে ‘শাহজাহানের মৃত্যু’ দৃশ্যও আঁকছেন। তিনি আরবি ও ফরাসির লিপিশিল্প বা ক্যালিগ্রাফির ভক্ত ছিলেন। তাঁর রাজকাহিনী পুস্তকের প্রচ্ছদ দেখলে একথা সহজে বোধগম্য হয়।
বাংলায় নন্দলাল বসু, গোপাল ঘোষ প্রমুখ শিল্পী বাংলার মাঠঘাটকে কেন্দ্র করে প্রচুর স্কেচ ও চিত্রমালার জন্ম দেন। তাছাড়া জাপানি ও চীনা শিল্পের ধারারও তাঁরা বাহক ছিলেন।
শিল্পগুরু ও নন্দনতাত্ত্বিক হিসেবে তিনি বিশেষ জায়গা জুড়ে আছেন বাংলা ও ভারতের শিল্পাঙ্গনে। তাঁর সাহিত্য একটি বিশেষ ধারা সৃষ্টি করে। যেমন তিনি বৈঠকিচালকে আশ্রয় করেন – তেমনি আশ্রয় করেন বাংলার সব লোকগাথাকে বিষয় হিসেবে তুলে ধরতে। তাঁর বুড়ো আংলা, নালক, দেশ সবই রূপকথার চিত্রায়ণের মতো। বাংলার এমন ভালো ইলাসট্রেশন আর কার সাহিত্যে পাওয়া যাবে।
অবন ঠাকুর এক মহৎ শিল্পী ও শিল্পতাত্ত্বিক। তিনি একই সঙ্গে ভাববাদী ও নৃতত্ত্ববিদের দৃষ্টিসম্পন্ন শিল্পী-ব্যক্তিত্ব। তাঁর বাংলার ব্রত বইটি একটি আকর হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তিনি দেখিয়েছেন, মেক্সিকোর লোকবিশ্বাসের সঙ্গে বাংলার ব্রতের সমান্তরলতা। তাঁর বাগেশ্বরী প্রবন্ধাবলী বাংলায় নন্দনতত্ত্বের একটি আকর গ্রন্থ। এই লেকচার সংগ্রহটি তাঁর মনীষার সর্বশ্রেষ্ঠ প্রকাশ।
শিল্পতত্ত্বে তাঁর অন্যতম দর্শন সুন্দর নিয়ে যেসব উপমা ও উদাহরণ তুলে ধরেছেন, তা অতুলনীয়। এ-সম্বন্ধে বিদগ্ধজনদের পৃথক দৃষ্টিদানের আহ্বান জানাই।
তিনি সুন্দর এই ধারণার ক্ষেত্রে বলছেন যে, একটি নতুন নির্মিত দ্রব্য যেমন ঝকঝকে সুন্দর, তেমনি কালের বিবর্তনে তার যে সৌন্দর্য তা ‘ম্যাড়ম্যাড়ে সুন্দর’। আমরা চমকে যাই তাঁর এই উপলব্ধিতে। সুন্দরের অবস্থান
অণু-পরমাণু জুড়ে। তাই নতুন সুন্দর কালের গর্ভে ম্যাড়ম্যাড়ে সুন্দর হয়ে অস্তিত্ব বজায় রেখে চলে।
রবীন্দ্রনাথ শিল্পী হিসেবে বাংলায় অনন্য। তিনি অবন ঠাকুরের ভারতশিল্পকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে মজে গেছেন জার্মান প্রকাশবাদে। জার্মান প্রকাশবাদ বিংশ শতাব্দীর শুরুর সামান্য পরেই দুটি দল তৈরি করে। একটি ‘ডি ব্রæকে’ বা সেতু দল আর কিছুকাল পরেই তৈরি হয় ‘ডেয়ার ব্লাউ রাইটার’ অর্থাৎ দ্য ব্লু রাইডার বা নীল ঘোড়সওয়ার। সেতু দল জার্মান প্রাচীন-মধ্যযুগ ও পরবর্তী সব যুগকে আলিঙ্গন করে বেড়ে ওঠে। দ্বিতীয় ধারা বিশেষ করে নগরজীবনে ‘ঘোড়দৌড়’ মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ায়।
১৯৪০-এর দশকে বেঙ্গল স্কুল অব আর্টের পূর্বপুরুষের ধারা কেন্দ্রিক যে-আন্দোলন তাকে সম্পূর্ণ পাশ কাটিয়ে রবীন্দ্রনাথ ব্যক্তিমানসের প্রকাশকে বড় করে তোলেন। তাঁর স্ত্রী মুখাবয়বের সবই প্রায় বিমর্ষ ও ক্লান্ত। কোথাও কোনো মোহনকান্তির ছোঁয়া নেই। এমনকি তাঁর আত্মপ্রতিকৃতিটিও আমার কাছে মনে হয় যেন কন্যাদায়গ্রস্ত কোনো পিতার প্রতিমূর্তি বা ইমেজ।
রবীন্দ্রনাথ প্রচলিত শ্লীল-অশ্লীল ধারার বাইরে ছিলেন। তিনি সাহিত্যের চেয়ে তাঁর চিত্রে অনেক বেশি প্রকাশবাদী ও বস্তুতান্ত্রিক। সাহিত্যের চেয়ে চিত্রকলাকে বাহন হিসেবে উপযুক্ত মনে করেছেন।
তাঁর নন্দনতত্তে¡র কথা সব তাঁর কাব্যে উল্লেখ করে গেছেন। সেখান থেকে বের করে নেওয়ার কাজ কেউ গ্রহণ করতে পারেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ভাষা ও ছন্দে বলেছেন : কবি তব মনোভ‚মি রামের জন্মভূমি – এখানে কবিকে তিনি পরিপূর্ণ স্বাধীনতা দান করেছেন।
সোনার তরীতে – তীরে একা পড়ে থাকা শিল্পীর অসহায়ত্ব তুলে ধরেছেন। শিল্পকে ভালোবেসে গ্রহণ করে সমাজ চলে। শিল্পীর জীবন চলছে কি না তার খোঁজ কেউ নেয় না। না সমাজ, না ব্যক্তি, না রাষ্ট্র। নজরুল এর প্রতিধ্বনি তুলেছেন তাঁর গানে : ‘আমায় নহে গো,/ ভালোবাসো মোর গান -/ বনের পাখিরে কে মনে রাখে/ গান হলে অবসান।’
দর্শন-ক্ষেত্রে জার্মানি একটি মহান দেশ ও জাতি। তাই আমরা নন্দনতত্ত্বের আর একজন গুণী বিদ্যকের নাম নিতে চাই : তিনি আর্থার সোফেনহাউমারের (১৭৮০-১৮৬০)। নতুন করে পর্যালোচনা করার ক্ষেত্রটি আপাতত মুলতবি থাকল।
বাংলাদেশের শিল্পচর্চার ধারা শুরু হয় দেশভাগের (১৯৪৭) পর নতুন করে। একমাত্র কলকাতা আর্ট স্কুল ছাড়া সরকারি আর কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল না। জয়নুল আবেদিনের মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিভা গভর্নমন্টে স্কুল অফ আর্ট স্থাপন করতে সফল হন ১৯৪৮ সালের নভেম্বর মাসে। পুরনো শহরে ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজের দুটি কক্ষ সম্বল করে। জনসন রোডের এই স্থান থেকে কয়েক বছর পর সেগুনবাগিচায় একটি দোতলা ভবন বরাদ্দ লাভ করে। পরে ১৯৫৬ সালে শাহবাগে নিজ ভবনে স্থায়ী ঠিকানা পায়। স্থপতি মাজহারুল ইসলাম অত্যাধুনিক ভবনটি নির্মাণ করেন। ঢাকায় আধুনিক স্থাপত্যকলার যাত্রালগ্নের কারণে এটি ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজে স্থান লাভ করেছে।
শিল্পী জয়নুলের কাছ থেকে আমি সাক্ষাৎকার আকারে নন্দনতত্তে¡র কিছু জ্ঞান লাভ করি, যা আমাকে শিল্প বুঝতে অনেক সহায়তা দিয়েছে। এমনিতে তাঁর লিখিত তেমন তথ্যবহুল বয়ান পাওয়া যায়নি। জয়নুল আবেদিনের (১৯১৪-৭৬) কাছ থেকে তাঁর মুখ দিয়ে বের হওয়া কিছু কথার শিল্প সৃষ্টি প্রক্রিয়া ও তাঁর চিন্তার কিছু নমুনা পাই।
তাঁর কিছু কিছু কথা কোট করতে পারি। তিনি বলেন, শিল্পীর চোখে ময়ূরও সুন্দর – শকুনও সুন্দর।
তাঁর উক্তি আমাকে ভীষণভাবে তাড়িত করে। বুঝতে পারি, প্রকৃতি তাঁর প্রতিটি সৃষ্টিকে ভালোবেসে নির্মাণ করেছেন। প্রকৃতিতে অসুন্দরের কোনো স্থান নেই। সবই সুন্দর। সুন্দর – এই ধারণা মানুষের সৃষ্টি। এই সঙ্গে সৃষ্টি – অসুন্দর। সৌন্দর্য মানুষের বিচারভেদের তারতম্য। যেমন কারো কাছে লাল রং ভালো বা সুন্দর – আবার কারো কাছে হলুদ। সুতরাং মানুষের কাছে সর্বজনীন সুন্দর হলো প্রকৃতির নির্মাণ। যেমন : পাহাড়, নদী, বনাঞ্চল, সমুদ্র … প্রভাতকাল, সন্ধ্যা … মেঘলা আকাশ … উজ্জ্বল আকাশ … নীল আকাশ-সমুদ্র … এ-সবই প্রকৃতির সৃষ্টি, এর মধ্যে খারাপের কোনো স্থান নেই। অসুন্দরটা মানুষের মনে। কেউ পাহাড়ে বেড়াতে পছন্দ করে, কেউ সমুদ্রসৈকতে। সুতরাং সুন্দর-অসুন্দর এই ধারণা মানুষের মস্তিষ্কজাত। আর তা সৃষ্টি হয়েছে কর্মনির্ভর করে। মানুষের সৃষ্টির আমরা বিচার করি। প্রকৃতির সৃষ্টি আমাদের সুন্দর-অসুন্দরের ঊর্ধ্বে। এই কারণে অনেক নন্দনতত্ত্ববিদ প্রকৃতিকে পাঠ করতে চান না সুন্দর-অসুন্দর এই ধারণা কেন্দ্র করে। তাই নন্দনতত্ত্বের ক্ষেত্রটি মানুষের সব সৃষ্টিনির্ভর। তার মধ্যে একটি ক্ষেত্র শিল্প। আর শিল্পকলার সুন্দর-অসুন্দর নির্ভর করছে মাপকাঠি ধরে। উপযোগিতায় এক – অথচ একজনের পছন্দ কালো গাড়ি – একজনের খয়েরি। যে কারণে নন্দনতত্ত¡ বিজ্ঞানের অনেক সত্য মেনেও বিজ্ঞান হয়নি। এটি একটি পৃথক দার্শনিক ক্ষেত্র। আর সবটাই গড়ে উঠেছে মানুষের বিভিন্ন সৃষ্টির মাধ্যমে। আর সৃষ্টির মূলে চিন্তা ও শ্রম অবিচ্ছেদ্য। কর্মই জীবনের মূল কাম্য বিষয়।
জয়নুল যখন বলেন, ময়ূর ও শকুন দুই-ই সুন্দর – তখন মানুষ প্রকৃতির অভিজ্ঞান ধারণ করল।
এবার চিত্রকলা বা স্কেচ সম্বন্ধে তাঁর বক্তব্য : একজন লোক যখন নৌকা বেয়ে চলেছে, সেটিই যখন শিল্পীর দেখানোর ইচ্ছা হয়, তাহলে নদীর জল স্বচ্ছ না ঘোলাটে তা দেখানোর কোনো প্রয়োজন নেই।
তিনি বলেন, প্রকৃতির আনন্দ যদি পেতে হয় তাহলে প্রকৃতির মধ্যে বিচরণ করতে হবে। শুকনো পাতার মচমচ ধ্বনি বনে পা না বাড়ালে অনুভব করা যাবে না। তাই ড্রইংরুমে পাতা ফেলে মাড়ালে তা থেকে আনন্দ পাওয়া যাবে না।
আমি পিয়েট মনড্রিয়াকের চিত্রধারা মনে রেখে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনেকে বলি : আমি যদি উড়োজাহাজে করে কোথাও যাই, তাহলে ওপর থেকে তো সব চৌকো, আয়তাকার ভূমির ছোপ দেখতে পাবো।
তিনি বললেন, তা অবশ্যই ওরকম হবে। তবে সব সময় কি উড়োজাহাজেই বসে থাকবে? আমি তাঁর উষ্মাটা উপভোগ করি।
জয়নুল ছিলেন মানুষের সুখ-দুঃখের চিত্রকর। দুর্ভিক্ষের স্কেচসমূহ তাঁকে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দেয়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ চলাকালে (১৯৩৯-৪৫) কলকাতায় তিনি দেখেছেন কিভাবে সারা বাংলা থেকে লাখ লাখ মানুষ ফুটপাতে কঙ্কালসার দেহ নিয়ে পড়ে আছে। তাঁর বড় কাজগুলো মানুষের সংগ্রামের চিত্র তুলে ধরে। গুণটানা, সংগ্রাম, নবান্ন ও মনপুরা অমর কীর্তি।
জার্মান নন্দনতত্ত্ববিদের কথা নানাভাবে ঘুরে আসে। এই সূত্রে বাউহাউস নামক আন্দোলনটির উল্লেখ করতে হয়। বাউহাউস ১৯১৯ থেকে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত বেশ বড় একটা প্রভাব। এই আন্দোলনের মূল সূত্রটি হলো, প্রতিটি শিল্পকলাকে একসূত্রে বাঁধা। স্থাপত্য-ভাস্কর্য-চিত্রকলা-গ্রাফিক ডিজাইন ও অন্যান্য শিল্পকে এক ধারায় নিয়ে আসা। কোনো একটি নকশার উপাদান যেন বিনা প্রয়োজনে বা অন্য কোনো কারণে না আসে। সবকিছুর মধ্যে একটা ঐক্য থাকতে হবে। যদিও এই ধারার কাজে অনেক বিমূর্ত ধারারও উপস্থিতি ছিল। তবে পরিমাণে কম।
বিংশ শতাব্দীতে শিল্পধারায় বিপ্লব সাধিত হয়। একের পর এক শিল্পধারার উদ্ভব হতে থাকে। যার চূড়ান্ত বিকাশ ঘটে বিমূর্ত প্রকাশবাদে। কোনো রকম দৃশ্যগ্রাহ্য বস্তুহীন শিল্প। অনেকটা শুধু রঙের ধারা বা আকৃতির বিন্যাস।
চিত্রকলার সঙ্গে বাস্তুকলারও প্রভূত বিস্তৃতি ঘটে গত শতাব্দীতে। ভিনজ ভানডের রোহে, কাবুজিয়ে, লুই কান, কেনজো টাঙ্গে প্রমুখ স্থপতি শীর্ষস্থানীয়।
বাংলাদেশ বড় সৌভাগ্যবান যে লুই আই কানের মতো স্থপতির কর্ম লাভ করেছে শেরেবাংলা নগরে। পৃথিবীর স্থাপত্যের ইতিহাসে এই পার্লামেন্ট ভবনটির চিত্রের নিচে লেখা : ওয়ান অফ দ্য রিচেস্ট আর্কিচেকচার ইন ওয়ান অব দ্য পুওরেস্ট কান্ট্রি অব দ্য ওয়ার্ল্ড।
আমাদের কিছু স্থপতি, নগরবিদ ও শিল্পানুরাগীর সৌভাগ্য হয়েছিল তাঁর সঙ্গে বসে কিছু কথা শোনার।
একজন প্রশ্ন করেন যে, তিনি জানালার জায়গায় বৃত্তাকার ব্যবহার করেছেন, অথচ বাংলাদেশ মৌসুমি অঞ্চল, বৃষ্টিপ্রধান দেশ।
তিনি তিলমাত্র সময়ক্ষেপণ করলেন না। বললেন : আই ইনভাইট রেইন। শ্রোতাদের মধ্যে পিনপতন স্তব্ধতা।
লুই কান আমাদের প্রাচীন নির্মাণে লাল ইটের ব্যবহারকে নতুন করে আমাদের চিনিয়ে দিলেন তাঁর অন্যান্য নির্মাণের মধ্যে।
তাঁর এই ভবন ও নগর-পরিকল্পনা নিয়ে বিদেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাত্রছাত্রীরা আসেন এই কমপ্লেক্সটির ওপর পিএইচ.ডি করার জন্যে।
১৯৮০-র দশকে ঢাকায় বেশ কিছু লাল ইটের ব্যবহৃত সিরামিক্স ব্রিকসের ভবন নির্মাণ হয়। তার মধ্যে মধ্য ঢাকায় ‘সেগুনবাগিচা কমপ্লেক্স’ অন্যতম।
পরবর্তীকালে এই ধারায় খরচের কথা ভেবে আর অনুসৃত হয়নি। যদিও পৃথিবীখ্যাত স্থপতি এফ. আর. খান ঢাকায় এক বক্তৃতায় বলেছিলেন : আমরা এই লাল ইটের বাড়ি পঞ্চাশতলা পর্যন্ত করতে পারি।
তিনি মার্কিন মুল্লুকে একজন জনপ্রিয় স্থপতি ও প্রকৌশলী। শিকাগোর সিয়ার্স টাওয়ার তাঁর সৃষ্টি। তিনি একটি নতুন ধারণা দেন যে, একটি উঁচু বাড়ি না করে যদি চারটি করে বেঁধে দেওয়া হয় তা অনেক টেকসই হবে। এই তত্ত¡টি গৃহীত হয়। আর তিনি একটি যুগান্তকারী উদ্ভাবন মানবসমাজকে উপহার দিলেন।
বাংলার অনেক মনীষী বিশ্বকে অনেক কিছু দিয়ে গেছেন। যেমন বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকে বাংলার সন্তান ব্রজেন দাস ইংলিশ চ্যানেল রেকর্ড সময়ে অতিক্রম করেন।
আমরা ক্রিকেটার সাকিব-আল-হাসানকে নিয়েও গর্ব করতে পারি – বিশ্বে দীর্ঘদিন অলরাউন্ডারের পদটি ধরে রাখার জন্য।
নন্দনতত্ত¡ শুধু অধিবিদ্যক জ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা নয়, প্রাত্যহিক জীবনের ক্রিয়াকেও অন্তর্ভুক্ত করে।
বিংশ শতাব্দীতে অ্যাশকান স্কুল বলে একদল শিল্পী শুধু ঘরোয়া কাজকর্মকে প্রাধান্য দিয়ে চিত্রকর্ম করেছেন।
ডাচ শিল্পী ভার্মিয়ারকে দেখি তাঁর চিত্র সবই গার্হস্থ্য জীবনধারার। তাও আজ থেকে চারশো বছর আগে তিনি এ-ধারায় অভিষিক্ত ছিলেন।
জয়নুলেও দেখি গার্হস্থ্য-জীবনের সরস চিত্র। তাঁর ‘পাইন্যার মা’ চিত্রটি গৃহকর্মীকে নিয়ে অনন্য কাজ। মহিলাদের চুল আঁচড়ানোর দৃশ্য জায়গা পেয়েছে।
শিল্পী হেমেন্দ্র কুমার সিক্ত নারীদেহের সৌন্দর্যে মজে ছিলেন।
অবন ঠাকুরের কাটুম কাটামের কথাও বলা যায়। পরিত্যক্ত দ্রব্যাদি দিয়ে শিল্প-সৃষ্টির গুরু তিনি এই বাংলায়।
যেমন বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি শিল্পী আলবার্তো বুরি চটের ওপর চিত্রকলা করেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর সবকিছুই ছিল দুষ্প্রাপ্য। তাঁর এবং তাঁর অনুসারী বন্ধুদের নিয়ে একটি ধারাই গড়ে ওঠে : আর্ট পভেরা বা দারিদ্র্যাক্রান্ত শিল্পধারা।
শিল্পীর কাছে জীবনের কোনো কিছুই ছোট নয়। রবীন্দ্রনাথ তাই বক্তব্য দিয়েছেন : জীবনের ধন কিছুই যাবে না ফেলা।
ক্যানভাসে রঙিন কাগজ সেঁটে বা খবরের কাগজের টুকরো সংযোজিত করে নির্মিত হলো কোলাজ বা সাঁটচিত্র। এটা দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক দুটি ধারাকেই অন্তর্ভুক্ত করে।
সংগীতে পঞ্চ ধারা আসে জনগণের পিপাসাকে মেটাতে। তাকে সংগীতে অংশগ্রহণকারী হিসেবে নিতে। প্রযুক্তির উন্নতির জন্য আসে কম্পিউটার-সৃষ্ট প্রিন্ট। তা কোনো কোনো ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়নতৃপ্তিকর।
বিগত শতাব্দীতে সবচেয়ে অগ্রগামী শিল্প হলো স্থাপত্য। আজ ‘বুর্জ আল খলিফা’ মনে হয় আলাউদ্দিনের জিনের সৃষ্টি।
মাচুপিচু অবশ্য এর চেয়ে বেশি বিস্ময় উদ্রেককর। পিরামিড-স্ফিংস এসবের উল্লেখ আর না-ই করলাম। মধ্যযুগে নির্মিত তাজমহল আজো পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের একটি।
জয়নুলের দু-একটি কথা বলা এখনো বাকি রয়ে গেছে। তিনি তাঁর সৃষ্ট দুর্ভিক্ষের ছবিতে কাকের উপস্থিতিকে বলেছেন ক্যাপিটালিজমের প্রতীক। যদিও তিনি বলেছেন কৌতুক করে।
তাঁকে আর একটি বিষয় জিজ্ঞেস করেছিলাম : নকশা কিভাবে আসে? তাঁর জবাব : দেখো একটি পাত্র, ধরো মটকা, যাতে জল বা ধান-চাল রাখা হবে – এটা একটা সহজ-সরল পাত্র। শিল্পীর মনে হতে পারে খুব ফাঁকা ফাঁকা লাগছে – তখন তিনি এর ওপর আঁকিবুকি করেন। তখন থেকেই একটি নতুন মাত্রা সংযোজিত হলো।
তাঁর এই ব্যাখ্যা আমাকে চমৎকৃত করে। শিল্পী হলেন স্রষ্টা, তিনি যা অনুভব করেন ফুটিয়ে তোলেন – তা শিল্পধারা ধরে হোক, অতিক্রম করে হোক। শিল্পীর সত্তার প্রকাশ সর্বত্র। যদিও অনেক শিল্পে তা সীমাবদ্ধ।
আজকে টি-শার্ট বা টি-পোলো শার্ট বিশ্বকে এক করে দিয়েছে। অফিসিয়াল কোডের ক্ষেত্র ছাড়া সর্বত্র এর বিচরণ – বয়স নির্বিশেষে। পোশাকশিল্পে নকশার একটা বিপ্লব এসে গেছে। দরিদ্র বাংলাদেশের সবচেয়ে ডলার আহরণের ক্ষেত্রটি হলো : পোশাক-নির্মাণ-খাত। যদিও আমরা জানি, প্রতিটি পণ্যে দেশের দরিদ্র যুবক-যুবতীর রক্ত মাখা। কিন্তু ধনতন্ত্র এসব মানবতন্ত্র বিচার করে চলে না। মেদযুক্ত শব্দ ‘মুনাফা’ এর চালিকাশক্তি। বিশ্ববাজার জুড়ে।
জয়নুলের শিল্প ছিল এর বিপরীত মেরুর।
নকশা বা ভাব সৃষ্টির ক্ষেত্রে আর একটি উদাহরণ পাই এক পাল-শিল্পীর কাছ থেকে। যশোর বা ফরিদপুর হবে, দুর্গাপূজার সময় এক পালপাড়ায় গিয়েছি। একটি বড় দুর্গামূর্তি প্রায় শেষের পথে। চক্ষুদানও হয়ে গেছে। হাসিমাখা দুর্গামূর্তিটি বড় মায়াময়। মাতৃমূর্তি।
আমার মনে প্রশ্ন জাগে, আচ্ছা, দুর্গা তো অসুর বধ করছেন, তাহলে তার মুখে তো ক্রোধের প্রকাশ হওয়া উচিত ছিল; কিন্তু এমন ভুবন ভোলানে হাসি হাসছেন কি করে? বা শিল্পী এভাবে করলেন কেন?
শিল্পী ব্যাপারটা অনুভব করলেন। তারপর কালক্ষেপণ না করেই জবাবে বললেন : বাবু, দুর্গাপূজা তো একটা উৎসব – তাই মায়ের মুখে এই হাসি।
তখনি রবীন্দ্রনাথের কথা মনে পড়ল। কবি রামের জন্মভ‚মি তুমি যা রচনা করবে তা-ই হবে। পুরাতত্ত¡বিদ হতে হবে না।
শিল্পতত্ত¡ বা নন্দনতত্ত্বের আকর হলেন আমাদের সর্বস্তরের শিল্পীগণ। যে ক্ষেত্রের হোন। এমনকি কৃষকের কাছ থেকেও শিল্পতত্ত্ব পাওয়া যেতে পারে।
না হলে : এমন ধানের ওপর ঢেউ খেলে যায় – বাতাস কাহার দেশে – লেখা যেত না। কৃষকও সৌন্দর্যের উপকরণ সৃষ্টিতে সহায়তা করছেন। তাঁর কাছ থেকেও মাটি তৈরি থেকে ধান উঠানো – ঝাড়া – গোলাজাত করা – মহাজনকে দেওয়া কি বিরাট কর্মকাণ্ড … এর ভেতর শিল্পের কোনো তত্ত্ব বা নন্দনতত্ত্বের উপকরণ লুকিয়ে থাকবে না? এটা বের করার দায়িত্ব শিল্পতাত্ত্বিকের বা নন্দনতত্ত্ববিদের।
জয়নুল আবেদিন দীর্ঘজীবন লাভ করেননি। ১৯৭৬ সালে মৃত্যু তাঁকে মুক্তি দান করে। ফুসফুসের ক্যান্সারে ভুগছিলেন। বয়স হয়েছিল ৬২। আজকে কথার কথা হলো : লাইফ স্টার্ট অ্যাট সিক্সটি। তিনি সিক্সটি-পরবর্তী জীবন বেশিদিন পাননি।
এত যন্ত্রণার মধ্যে মুখ মলিন করতেন না, পরিবারের সবার কথা ভেবে। কী শক্তিধর মানস!
তাঁর ওপর বিটিভি একটি ডকুমেন্টারি করার উদ্যোগ নেয়। রোগশয্যায় শায়িত শান্তিনগরের বাসায়।
আলো-ক্যামেরা সব চলছে। শিল্পী মোস্তফা মনোয়ার নির্দেশনায়। আমি একপাশে দাঁড়িয়ে। একসময় আমার ওপর চোখ পড়ায় বললেন, ওই যে লেখক দাঁড়িয়ে। আমার জীবনী লিখবে। একসময় তাঁকে আমি এ-কথা বলেছিলাম। ঠিক মনে রেখে দিয়েছেন।
একটু দম নিয়ে বললেন, আমার জীবনী লিখতে গেলে কাদায় নামতে হবে।
আমি চাবুক খেলাম। কাদায় কেন শহরেও তো ভালো করে নামিনি।
আমি নীরবে হজম করে গেলাম। কোনো বাক্যালাপ নেই। শুধু ক্যামেরা চলছে।
রোগশয্যায় পড়ে যাওয়ার আগে তাঁকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম : স্যার, দেশের অবস্থা সম্বন্ধে আপনার ধারণা কিছু বলুন না?
তিনি বলেছিলেন : কি আর বলব, একসময় একেঁছিলাম মানুষের তৈরি খেতে না পাওয়ার দুর্ভিক্ষ। আর আজ সারা দেশজুড়ে চলছে রুচির দুর্ভিক্ষ।
তাঁর উক্তিটি থেকে আজো আমরা দেশকে মুক্ত করতে পারিনি।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.