দুই

কী ব্যাপার? দাদু দরজা খুলছে না কেন? এতবার টেলিফোন করল জয়িতা টেলিফোন ধরল না, এখন ডোরবেল বাজাচ্ছে, দরজা খুলছে না। বুড়োটার হয়েছে কী? বাথরুমে যদি ঢুকে থাকে চান ফান করতে কতক্ষণ লাগে! সে তো আর জয়িতার বয়সী যুবতী মেয়ে নয় যে চানে ঢুকলে ঘণ্টা দেড়ঘণ্টা লেগে যাবে!

তারপরই অন্য একটা ভাবনা মাথায় এলো জয়িতার। ভয়ে আতঙ্কে বুকটা কেঁপে উঠল। ভয়ংকর কিছু ঘটে যায়নি তো! দাদুর বয়স হয়েছে সাতাত্তোর আটাত্তোর। এই বয়সে নানারকম কা- ঘটতে পারে যখন তখন। হার্ট অ্যাটাক করতে পারে, আচমকা প্রেসার বেড়ে গিয়ে ব্রেন স্ট্রোক করতে পারে। যদিও প্রেসারটা দাদুর নেই, হার্টের অবস্থাও ভালো। সারাজীবন ভয়াবহ পরিশ্রম করেছে। শারীরিক পরিশ্রম করা মানুষদের আধুনিক রোগবালাই কম হয়। দাদু শারীরিক পরিশ্রম করা মানুষ। এখনও সকাল সন্ধ্যা এক দেড় ঘণ্টা করে হাঁটেন। এখনও অল্প বয়সী যুবকদের চে’ বেশি পরিশ্রম করতে পারেন।

তারপরও মানুষের শরীরের কথা কি বলা যায়? শরীর কখন বিট্রে করবে কে জানে!

তাছাড়া গত কয়েকদিন ধরে দাদু আছে দুরন্ত উত্তেজনায়। ছেচল্লিশ বছর পর দেশে ফিরছে। দেশে ফেরার উত্তেজনায় শিশুর মতো ছটফট করছিল, আনন্দে ফেটে পড়ছিল। অতিরিক্ত আনন্দ উত্তেজনায়ও হার্টের সমস্যা হতে পারে মানুষের।

এসব ভেবে হাত পা কাঁপতে লাগল জয়িতার। যদি সত্যি সে রকম কিছু হয়ে থাকে! কাল রাতে শুয়ে পড়ার পর হয়তো ঘুমই আসেনি দাদুর। আজ বিকেলে এত এত বছর পর গিয়ে পা রাখবে আপন মাটিতে, এই উত্তেজনায় ঘুম না-ও আসতে পারে তার। তার ওপর অত ভালো ভালো খাবার খাওয়া হয়েছে। সেই খাবার হয়তো হজম হয়নি। পেটে গ্যাস হয়েছে। গ্যাস থেকেও হার্টের চাপ পড়ে অনেক সময়। হয়তো সে রকমই কিছু হয়েছে। গ্যাস ট্যাস মিলিয়ে সিভিয়ার একটা অ্যাটাক হয়ে গেছে। এই বয়সে এক অ্যাটাকেই চলে যাওয়ার কথা। টিকে থাকার কথা না। কাল রাতের দাদু এখন হয়তো লাশ হয়ে আছে তার বিছানায়।

লাশের পক্ষে কি টেলিফোন ধরা সম্ভব! ডোরবেল বাজছে শুনে উঠে এসে দরজা খোলা সম্ভব!

ভেতরে ভেতরে খুবই দিশেহারা হলো জয়িতা। তারপরই নিজের স্বভাবের কথা ভেবে মৃদু একটা ধাক্কা খেল। জয়িতার স্বভাব হচ্ছে যে কোনও ঘটনার নেগেটিভ দিকটা সে আগে ভাবে। এই মুহূর্তেও তাই ভাবছে। কিন্তু এই ধরনের ঘটনায় প্রথমেই তার ভাবা উচিত ছিল অন্যকথা। রুম লক করে দাদু কি কোথাও বেরিয়েছে? বেরুতেই পারে। সেটাই স্বাভাবিক। কারণ তার ঘুম ভাঙে খুব সকালে। অত সকালে ঘুম ভাঙার পর হোটেলের রুমে বসে থাকতে হয়তো বোর লেগেছে। এজন্য হয়তো বাইরে কোথাও বেড়াতে চলে গেছে।

কিন্তু জয়িতাকে না বলে সে যাবে কেন?

যদিও নাতনির স্বভাবটা তার জানা। জয়িতা অনেকটা বেলা পর্যন্ত ঘুমায়। হয়তো এসব ভেবেই দাদু তাকে ডাকেনি। ভেবেছে জয়িতা জয়িতার মতো ঘুমাক, সে ফিরে এসে দেখবে জয়িতার ঘুম ভেঙেছে, তখন একসঙ্গে দুজনে নাশতা করবে।

যদি সে রকমও হয়ে থাকে তাহলে বুড়োটা এখনও ফিরছে না কেন? সে কি জানে না সকালবেলা চান করার পর খিদেয় পেট জ্বলে যায় জয়িতার। একটা মুহূর্ত সে আর দেরি করতে পারে না!

কিন্তু বুড়ো যে কোথাও বেরিয়েছে তারই বা নিশ্চয়তা কী? কোনও প্রমাণ তো নেই। সবই তো আন্দাজ। রিসেপসানে গেলে অবশ্য কনফার্মড হওয়া যাবে। এইসব হোটেলের নিয়ম হচ্ছে বোর্ডাররা বাইরে কোথাও গেলে রুমের চাবি রিসেপসানে জমা দিয়ে যাবে। দাদু যদি সত্যি সত্যি বাইরে গিয়ে থাকে তাহলে চাবি নিশ্চয় ওখানে আছে। রিসেপসানে গেলে বুকের পাথরটা মুহূর্তেই নেমে যেতে পারে জয়িতার।

 সে রিসেপসানে এলো।

রিসেপসানে দুজন ঝকঝকে যুবক কাজ করছে। নেভি ব্লু স্যুট, সাদা শার্ট আর প্রিন্টেড টাই পরা। দুজনের হাইট প্রায় একই সমান। গায়ের রঙও একই রকমের ফর্সা দুজনের। কাল রাতে এই হোটেলে এসেই জয়িতা বুঝে গেছে হোটেলের মালিক খুবই আধুনিক এবং রুচিবান মানুষ। হোটেলের প্রতিটি ক্ষেত্রে রুচি এবং সৌন্দর্যের ছাপ। এমনকি হোটেল কর্মচারীদেরও প্রত্যেকেরই চেহারা ভালো।

এক্সকিউজ মি।

একজন যুবক চোখ তুলে তাকাল। ইয়েস মেম।

আমার দাদুর রুম নন্বর চারশো চার। কিন্তু সে রুমে নেই। বাইরে গেল কি না বুঝতে পারছি না।

জাস্ট এ মোমেন্ট।

অতি দ্রুত কী-বোর্ড চেক করল যুবক। হাসিমুখে জয়িতার দিকে তাকাল। উনি রুমেই আছেন।

তাই নাকি?

হ্যাঁ। বাইরে গেলে চাবি রেখে যেতেন। চাবি এখানে নেই।

কিন্তু আমি অনেকবার ওই রুমে ফোন করলুম, ডোরবেল বাজালুম, কই দাদু তো ফোন রিসিভ করল না, দরজা খুলল না।

যুবক হাসল। উনি হয়তো ঘুমাচ্ছেন, নয়তো বাথরুমে আছেন।

দাদু এতক্ষণ ঘুমায় না, এতক্ষণ বাথরুমেও থাকে না।

যুবক বুঝে গেল জয়িতা খুব নার্ভাস হয়েছে। হোটেলে নানা ধরনের পরিস্থিতি ফেস করতে হয় তাদের। এত সামান্যে মোটেই বিব্রত হয় না তারা। হাসিমুখে বলল, একদিন একটু অনিয়ম হতেই পারে। ডোন্ট গেট নার্ভাস। আমি দেখছি।

চারশো চার নম্বর রুমে ইন্টারকম করল যুবক। রিং হচ্ছে কিন্তু কেউ ফোন ধরছে না!

যুবকের ভ্রু কুঁচকে গেল। হ্যাঁ উনি তো ফোন ধরছেন না।

ততোক্ষণে হাত পা আবার কাঁপতে শুরু করেছে জয়িতার। বুকের পাথর নতুন করে চেপে বসেছে বুকে। তাহলে কি তার ভাবনাই ঠিক? গোপনে ঘটে গেছে কোনও দুর্ঘটনা!

শুকনো মুখে জয়িতা একটা ঢোক গিলল, কী করা যায় এখন?

অন্য যুবকটিও এবার কথা বলতে শুরু করল জয়িতার সঙ্গে। সব শুনে আমার মনে হচ্ছে উনি আসলে রুমে নেই। নিশ্চয় কোথাও বেরিয়েছেন। বেরুবার সময় রিসেপসানে চাবি জমা দিতে হয়তো তার মনে নেই। অনেক বোর্ডারই কিন্তু এরকম করেন।

কিন্তু আমার খুব নার্ভাস লাগছে। বুড়ো মানুষ, শরীর খারাপ হলো কি না…

প্রথম যুবক বলল, বুঝতে পারছি। আপনি এখন কী করতে চান বলুন। মানে আমরা আপনার জন্য কী করতে পারি?

দাদুর রুমটা খোলার ব্যবস্থা করুন। আমি একটু বুঝতে চাইছি…

কিচ্ছু অসুবিধা নেই।

যুবক একজন বেয়ারাকে ডাকল। ড্রয়ার থেকে চারশো চার নম্বর রুমের ডুপ্লিকেট চাবি বের করে তার হাতে দিল। ম্যাডামের সঙ্গে যাও, রুম খোলো।

কিন্তু রুমে লালুবাবু নেই। রুম ফাঁকা।

জয়িতা বাথরুম খুলে দেখল। বাথরুমও ফাঁকা। তার মানে লালুবাবু বাইরেই গেছেন।

এখন জয়িতার বুকটা আর কাঁপছে না, নার্ভাসনেস কেটে গেছে। কিন্তু খুবই রাগ লাগছে। বুড়োটা যে কী ঝামেলার হয়েছে! কাউকে কিছু না বলে, হোটেলের চাবি নিয়েই বেরিয়ে গেল। জয়িতা যে তাকে নিয়ে ভাববে, নার্ভাস হবে এসব কিচ্ছু ভাবল না!

এসময় বেয়ারা বলল, আরে, রুমের চাবিও তো রুমেই রাখা। তার অর্থ হচ্ছে, স্যার চাবি না নিয়াই বাইর হইয়া গেছেন। এরকম ভুল অবশ্য অনেকেই করে। চাবি রুমের ভেতর রাইখা রুম লক কইরা বাইর হইয়া যায়।

চাবিটা রাখা ছিল ড্রেসিংটেবিলে। বেয়ারা চাবিটা নিল। চলেন,     রিসিপসানে চাবি জমা দেওন লাগবো।

রুম থেকে বেরুতে বেরুতে জয়িতা বলল, আপনি যান। আমি আর যাব না।

জি ঠিক আছে। তয় আপনের রুম নম্বর কতো?

চারশো তিন।

 বেয়ারা চলে যাওয়ার পর ‘চারশো তিন’ কথাটা নিয়ে হাসি পেল জয়িতার। যে কোনও শয়ের সঙ্গে তিন লাগালে সেটা কেমন অন্যরকম শোনায়। যেমন চারশো তিনকে শোনাচ্ছে চার সতিনের মতো।

বুড়োটা আজ সতিনের মতোই আচরণ করল জয়িতার সঙ্গে। ফিরে আসুক তারপর এর শোধটা জয়িতা তুলবে।

জয়িতা তার রুমে এসে সোফায় গা এলিয়ে বসে রইল। নাশতার খিদেটা তার একদমই মরে গেছে।

ভোরবেলা লালুবাবুর আজ ঘুম ভেঙেছে আজানের শব্দে।

গ্র্যান্ড আজাদ হোটেলের দক্ষিণ দিকটায় বাংলাদেশের জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম। সেখান থেকে মাইকে ভেসে এসেছে ফজরের

আজানের ললিত সুর। তারপর এসেছে চারদিককার অন্যান্য মসজিদ থেকে।

বহুদিন পর এরকম আজানের ধ্বনি শুনতে পেলেন লালুবাবু। এদেশ ছেড়ে যাওয়ার পর বলতে গেলে আর শোনাই যায়নি। কালনায় তাঁরা যে এলাকায় থাকেন সেটা পুরোপুরি হিন্দু এলাকা। একটাও মুসলমান পরিবার নেই। মুসলমানই যদি না থাকে তাহলে মসজিদ থাকবে কেমন করে! আজান শোনা যাবে কেমন করে!

ঘুম ভাঙার পরও অনেকক্ষণ বিছানায় শুয়ে রইলেন লালুবাবু। কালনায় এসময়ে উঠে হাঁটতে বেরুতেন। এখনও ইচ্ছে করলে হাঁটতে বেরুনো যায়। কাছে পিঠের কিছুটা এলাকা হেঁটে হেঁটে দেখে এলেন। এলাকাটা দেখা হলো, সকালবেলার হাঁটাটাও হলো। আর এটাই পুরানা পল্টন এলাকা। ঢাকার এক সময়কার বিখ্যাত এবং বনেদি এলাকা। বুদ্ধদেব বসু থাকতেন। তাঁর অনেক লেখায় পুরানা পল্টনের কথা আছে। জয়িতা ওঠার আগে আগে এলাকাটা দেখে ফেলতে পারলে মন্দ হয় না। সে তো উঠবে নটা সাড়ে নটায়। তার আগেই দেখাশোনা শেষ করে ফিরে আসবেন তিনি। জয়িতা কিছু টেরই পাবে না। নাশতা করতে বসে বেশ জমিয়ে ঘোরাফেরার গল্পটা জয়িতাকে করা যাবে। ভালো রকমের একটা সারপ্রাইজ দেওয়া যাবে।

লালুবাবু আর দেরি করলেন না। গা থেকে কম্বল সরিয়ে বিছানা থেকে নামলেন।

জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে শীত বলতে নেইই। তবু মাঝরাতের দিক থেকে একটু একটু ঠান্ডা লাগছিল। ঘুমের ঘোরেই কম্বল টেনে নিয়েছিলেন লালুবাবু। গায়ে হাতাঅলা কোড়া গেঞ্জি, পরনে ধুতি। কম্বলের তলায় কুঁকড়ে মুকড়ে শোয়ার ফলে ধুতিটা একেবারেই দলাই মলাই হয়ে আছে। গুছিয়ে পরা দরকার। তা না করে বাথরুমে ঢুকলেন তিনি। সকালবেলার কাজগুলো সারলেন দ্রুত। তারপর প্যান্ট শার্ট পরলেন, জুতা পরলেন। যে হাফহাতা সুয়েটার পরা ছিলেন কাল, সেটা পরে, মানিব্যাগটা প্যান্টের ডানদিককার হিপপকেটে নিয়ে দ্রুত রুম লক করে বেরুলেন। চাবি সঙ্গে নেওয়ার কথা তাঁর মনেই হলো না। এই ধরনের হোটেল থেকে বেরুবার সময় যে চাবিটা রিসেপসানে জমা দিয়ে যেতে হয় সে কথা তিনি ভুলে গেলেন।

 হোটেলের বাইরে ডাবের পানির মতো ঘোলাটে একটা আলো ফুটে আছে। দুচারজন লোক এর মধ্যেই পথে বেরিয়েছে। মুসল্লি ধরনের কয়েকজন বায়তুল মোকাররম থেকে ফজরের নামাজ পড়ে ফিরছেন।

আকাশের দিকে তাকিয়ে বুকভরে শ্বাস নিলেন লালুবাবু।

ভাঙাচোরা শরীরের একজন রিকশাঅলা জবুথবু হয়ে বসে আছে রিকশার সিটে। রিকশা দেখে অন্য একটা প্ল্যান মাথায় এল লালুবাবুর। আচ্ছা এই রিকশাটা নিয়ে ঘণ্টা দুয়েক ঘুরে বেড়ালে হয় না; সকালবেলা রাস্তাঘাট নিশ্চয় খুব ফাঁকা থাকবে। ফাঁকা রাস্তায় দু ঘন্টা রিকশা নিয়ে ঘুরলে পুরনো ঢাকার অনেকখানি দেখে ফেলা যাবে। বাংলাদেশী টাকার একহাজার টাকা তো পকেটে আছেই। দু ঘণ্টার জন্য রিকশাঅলাকে হয়তো পঞ্চাশ ষাট টাকা দিতে হবে। পঞ্চাশ ষাট টাকা এমন কিছু টাকা না আজকাল। সামান্যই। কিন্তু এই সামান্য টাকায় তিনি যে অসামান্য ভালো লাগাটা অনুভব করবেন তার কি কোনও তুলনা আছে। সেই কবে প্রথম যৌবনে দুচারবার ঢাকায় এসেছেন, মাথার ভেতর ধু ধু করছে সেই স্মৃতি। সদরঘাট, গেন্ডারিয়া, শ্যামবাজার, শাঁখারিবাজার, ওয়ারি, ফুলবাড়িয়া স্টেশান, গুলিস্তান এইতো তখনকার ঢাকা। রমনা রেসকোর্স, তার ভেতর দিকে কালীবাড়ি। রমনা পার্কের সামান্য আগে রাস্তার ধারে ছোট্ট একটা চিড়িয়াখানা। ঢাকেশ্বরী মন্দিরটা যেন কোন এলাকায় ছিল? তবে জয়কালীমন্দিরের দিকটা মনে আছে। নারায়ণগঞ্জ থেকে গেন্ডারিয়া হয়ে রেললাইন এসেছে ফুলবাড়িয়ায়। টিকাটুলির এদিকটায় এসে একপাশে বলদা গার্ডেন আরেক পাশে হরদেও গ্লাস ফ্যাক্টরি, মাঝখান দিয়ে রেললাইন। একটু এগিয়ে গেলে মন্দির।

পরিষ্কার যেন জায়গাগুলো দেখতে পাচ্ছিলেন লালুবাবু। আর গভীর উত্তেজনায় ভেতরে ভেতরে ফেটে পড়ছিলেন। রিকশাঅলার সামনে দাঁড়িয়ে ছটফটে গলায় বললেন, যাবে নাকি গো?

এরকম ভাষা শুনে রিকশাঅলা যেন একটু চমকাল। তবে চমকানো ভাবটা সে প্রকাশ করল না। নির্বিকার গলায় বলল, কই যাইবেন?

ওয়াদুদ খানের মুখে বিক্রমপুরের ভাষা শুনে কাল যেমন হয়েছিল, রিকশাঅলার মুখে প্রায় তেমন ভাষা শুনে আজও সেরকম একটা অনুভূতি হলো লালুবাবুর। না না পশ্চিমবঙ্গের ভাষায় কথা বলা তাঁর ঠিক হয়নি। তিনি তো আসলে এই বাংলারই মানুষ, বিক্রমপুরের মানুষ। বিক্রমপুর অঞ্চলের ভাষাটাও তাঁর জানা।

লালুবাবু হাসিমুখে বললেন, যাইতে তো চাই অনেক জাগায়। তয় টাইম হইল দুই ঘণ্টা। তোমারে লইয়া দুই ঘণ্টা ঘুরুম। কত চাও কও?

সিট থেকে নেমে সোজা হয়ে দাঁড়াল রিকশাঅলা। তার পরনে লুঙ্গি গেঞ্জি। কাঁধে পুরনো ময়লা একটা গামছা। গামছা কোমরে বাঁধতে বাঁধতে সে বলল, দুই ঘণ্টায় একশো টেকা দেওন লাগবো।

লালুবাবু অবাক হলেন। একশো টাকা? এত ক্যান?

এত না, এইটাই রেট। ঘণ্টা পঞ্চাশ টেকা।

আমি তো মনে করছি পঁচিশ তিরিশ টেকা ঘণ্টা হইব।

না, পঞ্চাশ টেকা ঘণ্টা।

কিছু কম হইবো না?

রিকশাঅলা হাসল। আমগ লাহান ভাষায় যত কথাই আপনে কইতে চান, আমি কইলাম যা বোজনের বুইজা গেছি।

লালুবাবু অবাক হলেন। কী বুজছো?

আপনে কইলকাতাইয়া মানুষ।

 কেমনে বুজলা?

আপনের পয়লা কথাহান হুইনাই বুজছি। আমগ দ্যাশের মাইনষে গো মো কয় না। আর আমি পেরায় পেরায়ই এই হইটালের ক্ষেপ মারি। আপনের লাহান বহুত কইলকাতাইয়ারে দেকছি আমগ লগে কথা কওনের টাইমে আমগ ভাষায় কথা কইবার চায়।

লালুবাবু হাসলেন। তয় আমি আসলে এই দেশেরই মানুষ। অহন থাকি ইন্ডিয়াতে।

বুজছি। এর লেইগা আপনের কাছ থিকা ঘণ্টায় পাঁচ টাকা কইরা কম লমু। একঘণ্টা পাচ্চল্লিশ টেকা। দুই ঘণ্টা নব্বুই।

লালুবাবু ততোক্ষণে বুঝে গেছেন লোকটা খুবই ঘাঘু টাইপের। সে বিদেশী লোক বুঝেই ভাড়াটা সে বেশি চাইছে। এই শ্রেণির লোকরা এই ধরনের সুযোগ নেবেই। নিক, কিচ্ছু অসুবিধা নেই।

লালুবাবু রিকশায় উঠে বসলেন। তোমার নাম কী মিয়াভাই?

চানমিয়া।

বাড়ি কই?

বাড়ি আছিল কামরাঙ্গির চরে। অহন আর নাই।

কামরাঙ্গির চরটা কোন এলাকায়?

লালবাগের ওইমিহি দিয়া বুড়িগঙ্গার হেইপারে। আপনে চিনবেন না।

লালবাগটা আমি চিনি। ছোটবেলায় একবার লালবাগের কেল্লা দেখতে গেছিলাম।

বুজছি। অহন কোনমিহি যাইবেন হেইডা কন?

কিছু না ভেবেই লালুবাবু বললেন, টিকাটুলি হইয়া গেনডাইরা যাওন যাইবো না?

হ যাইবো না ক্যা?

তয় যাও।

রিকশা চলতে শুরু করার পর লালুবাবু প্রফুল্ল গলায় ডাকলেন, চানমিয়া।

কন।

কয়হান জাগা তুমি আমারে অহন দেখাইবা। হরদো গেলাস ফেকটারি, ধোলাইখাল আর সূত্রাপুরের লোহারপোলটা। পারলে ইকটু শামবাজারটাও দেখাইয়া আনবা।

চানমিয়া মুখ ঘুরিয়ে লালুবাবুর দিকে তাকাল। হরদো গেলাস ফেকটারি আবার কোন জাগায়?

টিকাটুলি। বলদা গার্ডেনের পুব উত্তর কোণায়।

আরে ওহেনে তো কোনও ফেকটারি মেকটারি নাই। ওহেনে তো একখান মার্কেট হইছে। রাজধানী সুপার মার্কেট।

তাই নাকি?

হ। তয় লোহারপোল, ধোলাইখাল এইডি আমি চিনি। কিন্তু নাই তো কিছু।

মানে?

 ধোলাইখাল ভইরা রাস্তা কমাই ফালাইছে। বিরাট বড় রাস্তা। লোহারপোল কাঠেরপোল এইডি কিচ্ছু নাই।

 বলো কী?

হ।

 গেনডাইরার ধুপখোলা মাঠটা আছে? সাধনা ঔষধালয়টা?

হ এই দুইডা আছে। তয় ধুপখোলা মাঠের চাইরদিকে মার্কেট, বাজার। সাধনাটা জাগা মতনই আছে।

আর বলদা গার্ডেন? বলদা গার্ডেনডা আছে?

হ ওইডা আছে। জাগা মতনই আছে।

লালুবাবু ভেতরে ভেতরে তখন দমে গেছেন। চোখের অনেক ভেতরে স্মৃতি হয়ে আছে যে সমস্ত জায়গা তার সবই প্রায় বদলে গেছে। অনেক কিছুই নেই। তাহলে কী দেখতে যাবেন তিনি? কিশোর যুবক বয়সের কোন স্মৃতি খুঁজতে যাবেন!

লালুবাবু উদাস গলায় বললেন, কিছুই যখন নাই তয় আর ওইমিহি গিয়া লাভ কী? অন্যমিহি যাও।

 কোনমিহি?

গুলিস্তান যাও। ফুলবাইড়া স্টেশনটা দেইখা আসি।

চানমিয়া আবার লালুবাবুর দিকে তাকাল। ফুলবাইড়া ইস্টিশন আবার কোন জাগায়?

চিনো না?

না।

গুলিস্তান সিনেমা হলের দক্ষিণ পশ্চিম কোনায়। রেল ইস্টিশন।

কন কী? ওহেনে রেল ইস্টিশন আইবো কই থিকা? ওহেনে তো বিরাট বিরাট মার্কেট আর বাস ইস্টিশন।

তাই নাকি?

হ।

তার মানে নারায়ণগঞ্জ থেকে গেন্ডারিয়া হয়ে যে রেললাইনটা      ফুলবাড়িয়ায় এসেছিল…

চানমিয়া হাসল। এইবারের আগে আপনে ঢাকা আইছিলেন কবে?

পঞ্চাশ ষাইট বছর আগে।

 হেইডা কন? হেইদিনের ঢাকা আইজ আর নাই। গুলিস্তান সিনেমা হলডাই তো নাই। হল ভাইঙ্গা মার্কেট হইছে। ঢাকার টাউনে অহন খালি মার্কেট, খালি মাকের্ট। গুলিস্তানে আবার মাডির তল দিয়া একহান রাস্তা হইছে। মাডির তলের রাস্তার দুইধারেও মার্কেট। তয় মানুষ যায় না। দোকানদাররা বইয়া বইয়া মাছি মারে।

রিকশা তখন মতিঝিল এলাকায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে এসে রিকশাঅলা বলল, অহন কোনমিহি যামু কন?

এইডা কোন জাগা?

মতিঝিল।

বাহ এই এলাকাটা তো খুব সুন্দর। দারুণ দারুণ বিল্ডিং হইছে।

হইব না এইডা বাংলাদেশের আসল জাগা। দেশের বেবাক বিজনিস হইল এই জাগায়।

বুজছি।

তয় কন কোনমিহি জামু? গেনডাইরা যাইবেন?

না। সব শোনার পর এখন আর যাইতে ইচ্ছা করতাছে না। তুমি এক কাম করো, রেসকোর্সের দিকে যাও।

চানমিয়া হাসল। আমি বহুত পুরানা রিকশাঅলা। কুড়ি পঁচিশ বছর ধইরা রিকশা চালাই। এর লেইগা আপনে রেসকোর্স কওনের পরও চিনছি। ওইডা তো অহন আর রেসকোর্স না, ওইডা হইল সরআর্দি উদ্যান।

বলেই রিকশা ঘুরাল চানমিয়া।

এখনও ডিউটিতে আসেনি ট্রাফিক পুলিশরা। ফলে যে সমস্ত রাস্তায় রিকশা চলা নিষেধ সেই সমস্ত রাস্তায়ও নির্দ্বিধায় চলছে রিকশা। রিকশাঅলারা যে যার মতো করে রিকশা চালাচ্ছে, নিজের মর্জিমাফিক মোড় ঘুরছে।

হাইকোর্ট এলাকায় এসে কার্জন হলটা দেখে খুব ভালো লাগল লালুবাবুর। এইতো একটি জায়গা অনেকটাই সেই রকম আছে। একপাশে কার্জন হল আরেক পাশে হাইকোর্ট। কিন্তু চিড়িয়াখানাটা নেই। সেখানেও আরেকটি হাইকোর্ট বিল্ডিং।

জায়গাটা পেরুবার সময় লালুবাবু বললেন, চানমিয়া, এখানে যে চিড়িয়াখানাটা ছিল সেটা গেল কোথায়?

চানমিয়া খুবই অবাক। এইহানে চিড়াখানা আছিল নি?

হ।

কন কী? দেহন তো দূরের কথা আমি তো হুনিও নাই।

ঢাকা চিড়িয়াখানাটা এখন কোথায়?

মিরপুর। তয় বিরাট চিড়াখানা। পুরাডা দেখলে পুরা দিন লাগে।

তখন আবার ফুলবাড়িয়া স্টেশনের কথা মনে পড়ল লালুবাবুর। স্টেশন উঠে কোথায় গেছে? রেললাইনটাই যে নেই বোঝা যাচ্ছে।

লালুবাবু গম্ভীর গলায় ডাকলেন, চানমিয়া।

কন।

ঢাকার রেল স্টেশনটা এখন কোথায়?

কমলাপুর। বিরাট ইস্টিশন। এশিয়ার মইধ্যে বলে সব থিকা বড়।

তাহলে তো ভালো।

রিকশার গতি কিছুটা কমালো চানমিয়া। আপনেরে দুয়েকখান কথা জিগামু।

জিগাও।

আপনে বাঙালি মানুষ। আগে এই দ্যাশে থাকতেন, অহন থাকেন কইলকাত্তায়। কইলকাত্তা তো বাংলাদেশ থিকা বেশি দূরে না। বোঝলাম এই দেশে আপনে আইছেন বহুতদিন বাদে। তয় কইলকাত্তায় বইয়াও কি আপনে ঢাকার খোজখবর লইতে পারতেন না? ঢাকার চিড়াখানা আগের জাগায় আছে কিনা, ফুলবাইড়া না কোন ইস্টিশনের জানি নাম লইলেন হেইডা আছে কিনা! কমলাপুর ইস্টিশনের খবরই আপনে রাখেন না। আবার কথাও কইতাছেন আমগ লাহান ভাষায়। আপনের ব্যাপারডাই আমি বোজলাম না।

চানমিয়ার কথায় যুক্তি আছে। ঠিকই তো বলেছে সে। যে লোক বাংলাদেশকে নিজের দেশ বলছে সেই দেশের রাজধানীর কোনও খবরই সে রাখবে না এ কেমন কথা? পঞ্চাশ ষাট বছরে কত বদলেছে দেশ কেন সে তা জানবে না! প্রতিদিন কত লোক যাচ্ছে ইন্ডিয়ায়, কত লোক আসছে তাদের মুখে শুনেও কি একজন মানুষ নিজের জন্মভূমির বদলে যাওয়ার খবরটা নেবে না? তাহলে তার আর দেশপ্রেম কি?

লালুবাবু মনে মনে বললেন, কেন যে দেশের কোনও খোঁজখবর নেইনি সে কথা আমি ছাড়া কেউ জানে না! কোন অভিমান থেকে নিইনি সে কথা জানে শুধু আমার মন।

কিন্তু চানমিয়াকে বললেন অন্যকথা। আমি আসলে কলকাতায় থাকি না। থাকি কলকাতা থেকে অনেক দূরে। কালনা নামের একটা জায়গায়। সেখানে বাংলাদেশের লোকজনের যাওয়া আসা কম। তাছাড়া নিজের  ব্যস্ততার জন্য…

লালুবাবুর কথা শেষ হওয়ার আগেই সেগুন বাগিচার এক গলির ভেতর থেকে বেরিয়ে এল তিনজন যুবক। দূর থেকে হাত তুলে রিকশা থামাবার ইঙ্গিত করল। চানমিয়া থতমত খেয়ে রিকশা থামাল। দ্রুত হেঁটে তারা এসে রিকশা ঘিরে দাঁড়াল।

ব্যাপারটা কী, লালুবাবু বুঝতেই পারলেন না। অবাক হয়ে যুবকদের দিকে তাকালেন। ৎ (চলবে)