রূপকথার রাস্তাঘাট
পিয়াস মজিদ – বেঙ্গলবুকস
– ঢাকা, ২০২৫ – ৩২০ টাকা
শূন্য দশকের কবি পিয়াস মজিদের সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ রূপকথার রাস্তাঘাট এ-বছর (২০২৫) অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হয়েছে। রূপকথার রাস্তাঘাট কাব্যগ্রন্থের শিরোনামেই প্রথমে মন আটকে যায়। হয়তো এর কারণ ‘রূপকথা’ শব্দটি। রূপকথা মানে কল্পকাহিনি, উপকথা, কল্পনার রাজ্য – যেখানে সবসময় ভালোবাসা, সাহস, বীরত্ব জয়যুক্ত হয়। আর রাস্তাঘাট এটি বাস্তবতা, ক্লান্তি, নিত্যদিনের লড়াইয়ের প্রতীক। কবি সম্ভবত এই শিরোনামের মধ্য দিয়ে দুই বিপরীত জগৎকে এক করেছেন অর্থাৎ একদিকে রূপকথার কল্পনা, অন্যদিকে যাপিত জীবনের বাস্তবতা। এই কাব্যগ্রন্থে কবিতার সংখ্যা অনেক। এর মধ্যে কয়েকটি কবিতার কথা আলাদাভাবে না বললেই নয়। যেমন : ‘আমরা যারা’, ‘দৃষ্টিভঙ্গি’, ‘অহেতু’, ‘দৃষ্টিবাহার’, ‘নিদারুণ’, ‘কনফেশন’, ‘এমুন বৃষ্টিবাদলা’, ‘সাজঘর’, ‘সালতামামি’ প্রভৃতি।
একজন কবির কাছে মানব অনুভূতির যাবতীয় অনুষঙ্গই ধাপে ধাপে কবিতায় পরিণতি লাভ করে। আবেগ, অনুভূতি, স্থান-কাল-পাত্র ভেদে কবিতার নির্দিষ্ট কোনো গণ্ডি নেই। কবি তাঁর চিন্তাচর্চার প্রাখর্যে প্রায় সর্বত্র বিচরণ করতে পারেন। এতে কবিতায় প্রেমানুভূতির প্রকাশ ঘটতে পারে আবার এর বঞ্চনা থেকে দ্রোহেরও উৎসারণ ঘটতে পারে। যুক্ত হতে পারে না পাওয়ার হাহাকার। সম্প্রীতি, বিশ^চিন্তা, আবেগধর্মিতা ও স্বপ্নচারিতা পিয়াস মজিদের কবিতার প্রবণতা হলেও অমোঘভাবে তিনি প্রেমপিয়াসীও বটে। প্রকৃতিপ্রেমের আশ্রয় নিয়ে তিনি যুগপৎ প্রেমামৃতের সন্ধান করেছেন নিরন্তর। তাঁর রূপকথার রাস্তাঘাট কাব্যগ্রন্থে আমরা এমন বেশকিছু কবিতার সন্ধান পাই যা অতি সংক্ষিপ্ত উচ্চারণ, কিন্তু ভাবের গভীরতায় ঋব্ধ। যেমন :
তোমার কাছে যেতে
পার হতে হতো
ছাতিম ফুলের সেতু।
সেতু ভেঙে গেছে
ফুরিয়েছে সব রহস্যের মৌ।
(‘মেমোরিয়াল’)
কোনো কোনো মেয়ের
খোলা চুল বেঁধে দিলে
সমুদ্র তার নীল রং ফুরিয়ে ফেলে।
(‘এই তো’)
গোধূলির গয়নাগাটি কিনতে
পকেটে যথাযোগ্য বিকেল বুনতে হয়
(জানাজানি’)
কচি চাঁদের রক্তে অঘটিত চুমুরা ভেসে গিয়ে
নোঙর করেছে ঠোঁটের শুকনা দরিয়ায়
(‘নিঠুর’)
আজীবন রোদ মাথায়
আমি তোমার
মেঘলা মনের মুখোমুখি
(‘রেইনি’)
কবিতায় প্রেমের আবেগ যে কখনো কখনো সীমা অতিক্রম করে অসীমে ধাবিত হয় নিম্নোক্ত কবিতার এই কয়টি লাইন তাই প্রমাণ করে। জীবনের পরম সত্যকে তিনি সৎসাহসে স্বাগত জানিয়েছেন। প্রেমের প্রসাদগুণে তাঁর কবিতা হয়ে ওঠে সুখপাঠ্য।
আমার কবিতা শুষে ফেলবে সব ঠোঁটের তুষার
আর তোমার কানের কাজ হবে শুধু শুনে যাওয়া
একটা ছোট পাখির কত বড় গানের মিছিল
(‘নতুন বছরে’)
এমন গরমে
এখানে আমি শেষ হয়ে যাচ্ছি
তুমিও নিশ্চয় শেষ হচ্ছো
অন্য কোনও তল্লাটে
(‘ব্রাইটার সামার ডে’)
এই জীবনে যাদের সঙ্গে
প্রেমে পুড়বার কথা ছিল,
তারা সব বিবাহে ভিজে আছে
(‘এলাস’)
এ কথা কেউ কি জানে
তোমার চুলে
আমার মৃত্যু খোঁপা বেঁধে থাকে। (‘সাজঘর’)
তাঁর কবিতায় দৃঢ়ভাবে শৈশবের স্মৃতিচারণ যথেষ্ট রয়েছে। কিন্তু পরমুহূর্তেই তিনি অনুধাবন করেছেন জীবন কত কঠিন। জীবনের মাপে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়াই যাপিত জীবনের অনন্ত ধর্ম। তাই কবির মননে রাজধানী এবং মফস্বলের পারস্পরিক বোঝাপড়া ধরা পড়েছে যার বনিবনা এখনো চলমান। কবির ভাষায় :
রাজধানীতে আমরা এক টুকরা মফস্বল নিয়ে আসি।
ফেলে আসা মফস্বলে গিয়ে
এক টুকরো রাজধানী নিয়ে যাই।
রাজধানী আর মফস্বলে
আসা-যাওয়া করি
কিন্তু কোথাও ঠিকঠাক ফিটিং হই না।
(‘আমরা যারা’)
মানুষের প্রতি ভালোবাসা থেকেই যে প্রেমের সাধনা শুরু পিয়াস মজিদও কবিতার ভেতর দিয়ে এ-সত্যটি উপস্থাপন করেছেন। কবিতায় প্রতিনিয়ত নতুন বিনির্মাণে বিশ্বাসী কবি সহজ-সরল-অকপট ভাষ্যেও কম সাবলীল নন। তাঁর কাব্যভাষায় :
নিজেকে দেখতে গিয়ে
দেখে ফেলি
আয়নার অসুখ।
(‘দৃষ্টিবাহার’)
তোমার শহরের দিকে
হাঁটতে শুরু করলে
রাস্তা হয়ে যায় বন।
বনের মধ্যে হাঁটতে হয় না,
হারিয়ে যেতে হয়।
(‘অহেতু’)
সারাজীবন কোথাও চুপচাপ বসে থাকার কথা ছিল
পৃথিবীতে এত কোলাহল দেখে
একটু নির্জনতার লোভে কবিতার কাছে আসলাম।
(‘কনফেশন’)
কিছু হেমন্তের পাখি
উড়তে উড়তে
গান ছিটিয়ে চলেছে
বসে থাকা
আমাদের দিকে।
(‘অঘ্রানঘটিত’)
ঋতুবৈচিত্র্যের মধ্যে বসন্ত ও বর্ষা ঋতুর আবেদন সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে বর্ষা বাংলা ভাষার কবিদের মন ও আবেগকে যেভাবে আলোড়িত করে, সচরাচর অন্য কোনো ঋতু তা এভাবে পারে না। যদিও বাংলা ভাষার কবিরা সব ঋতুকে নিয়ে কবিতা লিখে থাকেন, তবু বর্ষার আবেদন সবার কাছে অন্যরকমের, অন্য মেজাজের। বর্ষার অঝোর ধারা আমাদের মনকে যুগপৎ আনন্দ-বেদনা ও বিরহকাতরতায় সিক্ত করে তোলে। বর্ষা তার প্রাণরসে জাগিয়ে তোলে আমাদের প্রাণ-প্রকৃতিকে। সবুজে সবুজে ভরিয়ে দেয় আমাদের পরিবেশ-প্রতিবেশও। বর্ষার প্রতিটি ক্ষণ কবিকল্পনায় বাস্তবের মোড়কে ধরা দেয়। কবি পিয়াস মজিদও এর ব্যতিক্রম নন। তাঁর কবিতায় বর্ষাবন্দনা আমরা পাই স্বতন্ত্র স্বরে। পিয়াস মজিদের কবিতায় বর্ষা ধরা দেয় পূর্ণাঙ্গ ব্যাপ্তিতে, বিভিন্ন ব্যঞ্জনা ও গূঢ়ার্থে। কবির ভাষায় :
তুমি কোনো কথা বলতে চাচ্ছিলে …
আমার কাছে আসতে আসতে
তোমার কথাটা ঢাকা পড়ে গেল
ঋতুচক্রের আবর্তনে।
(‘তোমার কথারা’)
বৃষ্টিতে সব ভিজে গেলেও
আমাদের ভাষা
অনায়াসে শুকনো থাকে।
(‘ঝিম’)
এমুন বাদলার দিনে তোমার প্রেমেরে আমি
কোলে কইরা ঘুম পাড়ামু
জাইগা উইঠা সে দেখুক
কয়শ বছর আগের বৃষ্টিভিজা লাশ
ভাইস্যা উঠতাছে পিরিতির নতুন পানিতে
(‘এমুন বৃষ্টিবাদলা’)
এখানে দেখা যায় কী শব্দের নান্দনিক গাঁথুনি! পাঠককে যেন টেনে নিয়ে যান তিনি তাঁর শব্দ-উদ্যানের চারুশোভায়। প্রতিদিনের জীবনের তাড়নায় তীব্রভাবে তাড়িত হয়েই আমরা পথ চলি। প্রতিদিনের হাসি-কান্না-জীবন মানুষকে বেঁচে থাকার আনন্দ দেয়। মানুষ ক্ষুদ্র বা তুচ্ছ নয় – মানুষের মধ্যে যে অসীম শক্তি রয়েছে তা-ই আমাদের মুক্তবুদ্ধি ও মানবতায় জারিত করে আত্মজাগরণের পথ দেখায়। আবার মানুষের চূড়ান্ত পরিণতি যে মৃত্যু
এ-কথাও আমাদের স্মরণে রাখতে হবে। কবি পিয়াস মজিদের কবিতায় মৃত্যুভাবনা এক অকৃত্রিম উন্মাদনায় প্রতিভাসিত হয়েছে, যা সত্যিই অনন্য। তিনি কবিতায় জগতের সকল জয়-পরাজয় ভুলে অনন্তজীবনে মগ্ন হওয়ার কথা বলেছেন। মৃত্যুর ভেতর দিয়েই যে অন্তিম যাত্রা সূচিত হয় তাই যেন কবি বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন তাঁর কবিতার মধ্য দিয়ে।
জাতপাত-স্থান-কাল-পাত্র ভুলে প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে যে মিশে যেতে হবে চূড়ান্ত ঠিকানায় তাই এ-কবিতায় কবি ইঙ্গিত দিয়েছেন। এ-বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে রূপকথার রাস্তাঘাট কাব্যগ্রন্থে উল্লিখিত মৃত্যুভাবনা নিয়ে কতিপয় নান্দনিক পঙ্ক্তির উল্লেখ করা যায়। কবির ভাষায় :
এত হা হা, হি হি, কেকা, চিঁহি।
কত কবরের কূলে কূলে
জারি থাকা জিন্দেগি।
(‘পূর্বাপর’)
যারা চলে গেছে;
যেমন তুমি আর রাত,
তাদের স্মরণে
এই ভোর ভিজে আছে।
(‘২৯শে শ্রাবণ’)
মানুষের পিছে
অতীত আর বেঁচে থাকা,
সামনে
আগামী আর মরে যাওয়া।
(‘স্টারি নাইট’)
আমি বেঁচে বেঁচে
তোমার বিহৃদয় দেহের
মাগফেরাত কামনা করে থাকি।
(‘ধারাবিবরণ’)
আমি ঘুমের ভেতর থেকে
টাইনা বের করতেছি আমারে,
কিন্তুক মাঘমাসের কুয়াশা
কবরের মাটির মতো
আঁকড়াইয়া ধরে রাখতাছে আমারে
(‘ঘটমান’)
ভাবো আমি মরে গেছি,
মরার আগে
তোমাকে জানিয়ে যাওয়ার মতো
জীবন পাইনি।
(‘ভাবো’)
জগতের যত বৈভব
রিক্ত হৃদয়ে ঢেলে
হে রুমি
হে পিয়াস
নিজের মৃত্যুশেষে
নিজেরই মিলাদে,
বাতাসের মতো ঘুরে ঘুরে
তুমি বাঁচতে চাইছ
কোন ধুলার মাজারে
(‘সাজঘর’)
কখন আমি নিজের স্মরণসভায়
সভাপতিত্ব করতে রাজি হয়ে গেলাম
তা টেরই পেলাম না।
(‘স্বর্গীয় ইউরিন্যাল’)
ঐতিহাসিক সত্যের সঙ্গে সমকালীন বিষয়-আশয়, চিন্তাধারা ও প্রবণতার মিশ্রণ ঘটিয়ে কবি পিয়াস মজিদ তাঁর কবিতায় বয়ন করেন স্বপ্ন ও সুন্দরের দৃশ্যকল্প; যেখানে প্রেম ও দ্রোহ অবিচ্ছিন্ন ঐকতান তোলে। তিনি শ্রুতি ও পাঠের মাধুর্যকে রক্ষা করে স্বকীয় রীতিতে নির্মাণ করে চলেছেন ধ্রুপদী এক কাব্যভাষা, যেখানে ঘটনার সরলতা তাঁর কবিতাকে দিয়েছে বিশেষ বৈচিত্র্য। এ-কাব্যরাশির বুননকর্মে যেমন প্রয়োজন সূক্ষ্মদৃষ্টির তেমনি দরকার শব্দ যোজনের অনন্য কৌশল। কাব্যশিল্পের এ-নিবিড় কর্মে তিনি দৃষ্টিকে সমৃদ্ধ আগামীর দিকে প্রসারিত রেখে নির্মাণ করেছেন দীর্ঘ কবিতাযাত্রার কথকতা।
কবির ভাষায় :
বলা হয় পাহাড়ের ওই পাশে অন্য একটা দেশ।
আমার তো মনে হয় পাহাড়ের ওই পাশে অন্য একটা
শতাব্দী; …
পাহাড়ের ওই নরম ঘাসে
সেই নরম ঘাসের গন্ধ পাওয়া যায়।
(‘জৈন্তা’)
নদী নিভে গেলেও
বেঁচে থাকা এইভাবে বয়ে বয়ে যায়।
(‘নিদারুণ’)
দিল্লিতে গালিবের কবরের কাছে এক কাবাবখানায়
কাবাব মুখে দিয়ে মনে হয়েছিল,
অভুক্ত গালিবের ভাগের কাবার খেয়ে ফেলতেছি আমি।
(‘কাবাবি কবিতা’)
যে-কোনো কবিই তাঁর কবিতাকে শিল্পে উত্তীর্ণ করার জন্য নানা ধরনের উপাচার বা উপাদান বেছে নেন। পাঠককে চমকে দিতে ব্যবহার করেন বোধের অভিনতুন প্রতীতি। কবি পিয়াস মজিদও প্রকৃতি এবং মানবজীবনকে বেছে নিয়েছেন সেই উপকরণ হিসেবে। প্রকৃতিকেন্দ্রিক প্রতীক, উপমা বা প্রতিমা ব্যবহারের আধিক্য থাকা সত্ত্বেও তিনি প্রকৃতিতে পড়ে থাকেননি, বরং মানবজীবনের নতুন স্বপ্ন, শাশ্বত যন্ত্রণাকে তিনি বাস্তবতার নিরিখে বিচার করেছেন। জীবনকে তিনি গণ্ডিবদ্ধ করে রাখতে চাননি। প্রাত্যহিক দুঃখের হিসাবনিকাশ থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছেন। রূপকথার রাস্তাঘাট কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলি পাঠে প্রতীয়মান হয়, কবি পিয়াস মজিদ একটি স্বতন্ত্র ও ধ্যানী কাব্যভাষা সন্ধানে পেয়েছেন। এই ভাষা তাঁর স্বকীয় অনুভূতি ও নিসর্গগত দৃশ্যকল্প উপস্থাপনে ঋদ্ধ। শব্দের জুতসই প্রয়োগের মাধ্যমে তিনি কবিতায় শব্দের কৌশলী বিন্যাস ঘটাতে পেরেছেন। তাই পাঠকের বোধের সূক্ষ্মতর স্তরে অনুরণনও তুলেছেন। তাঁর কবিতা বাগর্থবিজ্ঞানের জটিল পথ ধরে এগোয়। কবিতা বয়নের কৌশলে তাঁর স্বকীয়তা অনন্য। কবিতার লাইনগুলো অপেক্ষাকৃত হ্রস্ব, কিন্তু বোধের বিস্তারে টানটান। তিনি স্বল্পকথায় অনেককিছু ব্যক্ত করেন। আপাতবিচারে একজন সূক্ষ্মদর্শী পাঠকের পক্ষেই তাঁর কবিতার যথাযথ আস্বাদগ্রহণ সম্ভব। তাঁর কবিতা একইসঙ্গে গভীর উপলব্ধির অভিজ্ঞান হিসেবেও ক্রমাগত আঘাত করে চলে পাঠকের মর্মমূলে। আমরা গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করি, তাঁর কবিতায় শব্দ বন্ধনের যে নিবিড় পারম্পর্য তা নিমিষেই আমাদের তন্ময় করে তোলে; নিয়ে চলে অনুভূতির অচিনপুরে। সর্বোপরি এ-গ্রন্থের কাব্যভাষায় যে সাবলীলতা ও গীতিময়তা প্রবহমান তা নিঃসন্দেহে পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে যাবে।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.