দেখার সীমানায় অদেখার অসীম মিথ

In Praise of Niranjan/

Islam, Theatre and Bangladesh

Syed Jamil Ahmed

পাঠক সমাবেশ

ঢাকা, ২০০১

দাম : ৯৯৫ টাকা

তুমি সংগীত

সংগীতের আকাক্সক্ষা

যাও কেন্দ্রে, শ্রবণ ইন্দ্রিয়র মধ্য দিয়ে

যেখানে আকাশ, যেখানে বাতাস

যেখানে সব জানা রহস্যময় নীরবতা

রুমির কিছু পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হয় অধ্যাপক, নাট্য-নির্দেশক ও লেখক সৈয়দ জামিল আহমেদের ইন প্রেইজ অব নিরঞ্জন : ইসলাম, থিয়েটার অ্যান্ড বাংলাদেশ বইটি। পূর্বলেখে লেখক ব্যাখ্যা করেছেন নিরঞ্জনকে। এই নিরঞ্জন হচ্ছেন তিনি, যিনি নিষ্কলঙ্ক, যার সমুদয় সাদা এবং পবিত্র। এই আখ্যাটি প্রাথমিকভাবে উদ্ভব হয়েছিল ‘ধর্ম’ (উযধৎসধ) নামের মতবাদ-অনুসারীদের হাত ধরে, যা ছিল বাংলায় মুসলমানদের আবির্ভাবের পূর্বের এক জনপ্রিয় দেশজ ধর্মীয় বা দর্শনগত বিশ্বাস। পরবর্তীকালে ব্রাহ্মণ্যধর্ম এবং তারও পরে সুফি আধ্যাত্মবাদী ও প্রচলনবিরোধী গোষ্ঠী একে গ্রহণ করে ‘আল্লাহ্’-র সমার্থক হিসেবে। বাংলার সংস্কৃতিতে ইসলাম ও ইসলামের ভাবধারাকে উপলব্ধি করবার জন্য এই শব্দটির ভূমিকা অনেক। বিশেষ করে ইসলাম ধর্ম বা ধর্ম-গাথা নিয়ে যে-সকল নাট্য বা থিয়েটার-পারফরম্যান্সের উপস্থাপন রয়েছে, এই নিরাকার নিরঞ্জনকে অভিবাদন দিয়েই তাদের বেশির ভাগের যাত্রা শুরু। আর সেইসব অগণিত, নাম না জানা কুশীলব, যাদের অন্তরের বিশ্বাস আর জীবনের বিশ্বাস এই নিরঞ্জনকে ঘিরে, তাদেরকে স্মরণ করেই লেখকের এই প্রয়াস। বইটির যাত্রাকালের প্রথম পদক্ষেপে অর্থাৎ নামকরণে তিনিও এই নিরঞ্জনকে স্মরণ করেছেন। লেখকের এই দর্শনলব্ধ উপলব্ধির ছোঁয়া যদি আমাদের তথাকথিত শিক্ষিত শহুরে সমাজ, আমাদের ধর্মান্ধ সংকীর্ণ মৌলবাদী গোষ্ঠীকে এতটুকুও নতুন করে ভাববার অবকাশ করে দেয়, তবেই যেন লেখক জামিল আহমেদের প্রয়াস সফল। বইটির বিষয়বস্তুকে উপলব্ধি করবার প্রয়াসে স্বাভাবিকভাবেই চলে এসেছে কিছু ইতিহাসভিত্তিক তথ্য। সে-সঙ্গে শব্দের সম্ভারে লুকায়িত সেই বোধ, যা অনুভবের সুপ্ত স্তরে উদ্ভাবন করে সৃষ্টির উৎস তথা সৃষ্টিকর্তার অনুভব, ইসলাম ধর্ম ও ধর্মের আবির্ভাব, থিয়েটার বা পারফর্মিং আর্টসের সঙ্গে ইসলামের সম্পর্ক ও তার বিশ্লেষণাত্মক বিবরণ। সহস্র বছরের সময়ের প্রবাহের সাথে যেই জীবন, ধর্মানুভূতি ও তার নানারকম বিকাশ ও শাশ্বত মানবিক চেতনা তারই মিথস্ক্রিয়ায় বিন্যস্ত হয় সেই দেশের সংস্কৃতি। আমাদের দেশের সংস্কৃতির শেকড় খুঁজতে গেলে তাই আস্বাদন করতে হয় মাটির নিচে মিশে যাওয়া অনেক উপাদান। ধর্ম, দর্শন, যাপিত জীবন, জীবনবোধ, আচার-অনুষ্ঠান – সব মিলিয়ে তৈরি হয় সংস্কৃতির শৈল্পিক আধার। সেখানে কখনো কখনো এক ধর্ম বা ধর্মবোধ প্রধান না, মুখ্য হয়ে ওঠে মানব-মানবী ও তার জীবন এবং জীবনদর্শন। সেখানে তাই কারবালার গাথাও যেমন সত্য, তেমনি সত্য রাধা-কৃষ্ণ বা বেহুলা-লক্ষ¥ীন্দর। আমাদের দেশের পল্লী-অঞ্চলপ্রধান দেশের গ্রামে গ্রামে, বটবৃক্ষের নিচে কিংবা নীল আসমান শামিয়ানার নিচে প্রকৃতির পরশে যে-নাট্যকলা বেড়ে ওঠে, তারই গভীরে যেতে যেতে হয়তো বা একদিন শেকড়ের সন্ধান পেতে পারে এ-দেশের মানুষ। নানা সময়ে বিদেশী আগ্রাসনও গ্রন্থিত হয়েছে এই সংস্কৃতির সঙ্গে, মিলেমিশে তৈরি করেছে নতুন ভাষা। এ-এক জটিল প্রবাহ, যেখানে ঐতিহ্য রয়েছে, রয়েছে আধুনিকের সঙ্গে মিলনের এক নতুন সুর। এইসব লোকজ বা দেশজ শিল্পের খোঁজে গ্রামবাংলার আনাচে-কানাচে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে দেখতে পাওয়া যায় স্বতঃস্ফূর্ত সংস্কৃতিচর্চা, যেখানে প্রেম-ভালোবাসার পাশাপাশি ধর্মানুভূতির সংমিশ্রণে তৈরি হয়েছে পালা, জারি প্রভৃতি। শব্দ ও সুরের পরতে পরতে যে-চেতনালোকের সন্ধান মেলে সেই লোকে সৃষ্টিকর্তা শুধুমাত্র আল্লাহ, ভগবান, কিংবা ঈশ্বর নন বরং রং ও আকারবিহীন এক বিমূর্ত নিরঞ্জন। মধ্যবিত্ত সমাজের তৈরি করা অনেক ক্ষেত্রের অনমনীয় বা আড়ষ্ট সংস্কৃতির চাইতে আলাদা সেই সংস্কৃতিচর্চায় মারফতি যেমন অনায়াসে ঘা দেয় অন্তরে তেমনি কীর্তন বা বাউলের সুরও সৃষ্টি করে অন্তরের আলোড়ন। আর এইসব লোকজ থিয়েটার বা নাট্য-ফর্মের মাঝেই লুকিয়ে আছে যুগ-যুগান্তরের মানব-ইতিহাস-সম্পৃক্ত দর্শন-চিন্তা, সংস্কৃতির শক্তি ও সম্পদ, নাট্যচর্চার নিজস্ব একটি ভাষা।

এই পবিত্র ও নিষ্কলঙ্কের প্রতীক, এক ও অদ্বিতীয় নিরঞ্জনের চেতনাকে অবলম্বন করে সারাবিশ্বে তথা বাংলাদেশে যেভাবে থিয়েটার গড়ে উঠেছে এবং সেই ধারণার সঙ্গে ইসলাম ধর্মের যে-সম্পর্ক রয়েছে সে-বিষয়টিকেই মূল বক্তব্য করে লেখক এ-বইটি রচনা করেছেন। ইসলাম ধর্মে থিয়েটারের অবস্থান ও বিশ্বজুড়ে থিয়েটার-বিকাশে ইসলামি সংস্কৃতি কতটুকু সহায়ক ছিল এ-নিয়েই বিস্তারিত আলোচনা করে গবেষণাধর্মী এ-বইটিতে লেখক ইসলামি থিয়েটারের সম্ভাবনা, তার অন্তর্নিহিত মনোমুগ্ধকর ও আগ্রহোদ্দীপক বিষয়বস্তুগুলোকে সহজ ভাষায় তুলে ধরেছেন। ১৬+৩১০ পৃষ্ঠা-সংবলিত সুন্দর বাঁধাইয়ের এই প্রকাশনাটি ইংরেজি ভাষায় যা মুখবন্ধ ও ভূমিকার পর পাঁচটি অধ্যায়ে বিভক্ত। প্রথম অধ্যায় ‘থিয়েটার ও ইসলাম’, দ্বিতীয় অধ্যায় ‘ইসলামী বিশ্বে ইনডিজেনাস (দেশজ) থিয়েটার’, তৃতীয় অধ্যায় ‘বাংলাদেশের ইসলামী পারফর্ম্যান্স’, চতুর্থ অধ্যায় ‘আজকের কারবালার গাথা – বিষাদ সিন্ধুর দৃষ্টান্ত’ পঞ্চম অধ্যায় ‘এক হাজার এক রাত্রির বিভিন্ন সংস্কৃতিব্যাপী রূপান্তর এবং এর সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা’ এবং সবশেষে উপসংহারের পর স্বাভাবিকভাবেই চলে এসেছে এর পরিশিষ্ট, নির্ঘণ্ট, গ্রন্থপঞ্জি প্রভৃতি। প্রচ্ছদ-পরিকল্পক সেলিম আহমেদের শৈল্পিক দক্ষতায় বইটির প্রচ্ছদে ব্যবহৃত অনন্ত নীল আকাশের ইমেজ নিরঞ্জনের ধারণার সঙ্গে সম্পৃক্ত – যা অনন্ত, অসীম। তবু তাকে মানব ও মানবজীবনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত করতে যেন সীমাবদ্ধতা দেওয়া হয় পার্থিব কোনো রেখার মাধ্যমে। এরপর ঝকঝকে ছাপায় বিষয়বস্তুর পাশাপাশি রয়েছে সাদা কালো ও রঙিন আলোকচিত্র, যেখানে কখনো মেভলেভিয়ার ঐতিহ্যবাহী নৃত্যের প্লেট, কখনো গাজীর যাত্রা, মাদার পীরের নারী চরিত্রে অভিনয়কারী পুরুষ কুশীলব, গাজীর পট, পুঁথিপাঠ, বিষাদ সিন্ধুর নাট্য-মঞ্চায়নের নানা দৃশ্য পাঠককে অনায়াসেই নিয়ে যায় দর্শকের সারিতে। অফ হোয়াইট রঙের পৃষ্ঠায় কালো কালিতে ছাপা ইংরেজি ভাষার এই বইটি আন্তর্জাতিক পাঠককে অনায়াসেই নিমগ্ন করতে পারে বাংলাদেশ, ইসলাম ও এই দেশের থিয়েটার-সম্পর্কে জানবার প্রয়াসে। বিষয়বস্তুর পরিপ্রেক্ষিতে এ-ধরনের প্রকাশনা আমাদের দেশে এখনো অপ্রতুল বললে ভুল হবে না। তাই লেখকের নিরলস প্রচেষ্টার ফসল এই প্রকাশনাটি বিশেষভাবে পাঠকের কৃতজ্ঞতা দাবি করে। একইভাবে মার্জিত গাঁথুনির এই ছিমছাম প্রকাশনাটির দায়িত্ব নেওয়ার জন্য প্রকাশক পাঠক সমাবেশ প্রশংসাপ্রাপ্তির দাবিদার।

অন্য বোধের অন্য আঙ্গিকের লোকজ থিয়েটার, যার মধ্যে লুকিয়ে আছে প্রাণের গভীর স্পন্দন, উদারনৈতিক ধর্মীয় চেতনা ও সারল্য তারই সন্ধানে লেখক ঘুরে বেড়িয়েছেন দেশের আনাচে-কানাচে। ভূমিকার একাংশে এ-সম্পর্কিত তথ্য দিয়ে লেখক প্রকাশ করেছেন, থিয়েটারের এই শেকড় সন্ধানই এখনকার শত বিহ্বলতা কাটিয়ে উপস্থাপন করতে পারবে দেশজ নাট্যরীতির মাপকাঠি। একটি দেশের বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় কীভাবে সেই দেশের রাজনৈতিক প্রভাব, তার ধর্ম, ভাষা এমনকি অর্থনৈতিক নির্ণায়কগুলো তার সংস্কৃতি ও স্বরূপত্বকে রূপায়িত করে তারও একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেছেন লেখক বইটির এই অংশে।

থিয়েটার এবং শিল্পের প্রতি ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি আরব বা ইউরো-আমেরিকান পণ্ডিতদের কাছে একটি বিপুল বিতর্কিত বিষয়। ধর্মীয় বিধিনিষেধের ভিত্তিতেই মূলত গড়ে উঠেছে এই বির্তক। প্রতিমাপূজা বা সাকার উপাসনায় রয়েছে ইসলামের গুরুতর নিষেধাজ্ঞা। এক ঈশ্বর বা আল্লাহ্ ব্যতীত আর কোনো শক্তিকেই মুসলমানরা বেছে নেয় না তাদের উপাসনার জন্য। কিন্তু হাদিস ও অন্যান্য উদ্ধৃতি থেকে জানা যায়, শিল্প হিসেবে প্রতিরূপ ব্যবহারে শিথিলতা ছিল এ-ধর্মে। বিভিন্ন উৎসবে সংগীত, নৃত্য বা নানা ধরনের উপস্থাপনের রীতি প্রচলিত ছিল। কোনো এক ঘটনায় নৃত্যরতা শিল্পীদের উদ্দেশ্যে নবীজী (দ:) বলেছিলেন, ‘ভালোমতো নৃত্য চালিয়ে যাও, ও বানু আরফিদা, ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা এ-ও জানবে যে আমাদের ধর্মেও রয়েছে প্রকাশের স্বাধীনতা, বিস্তার।’ এছাড়াও প্রমাণ পাওয়া যায় যে, নবীজী (দ:) কবি বিন জুহাইর-রচিত কবিতা শুনতে পছন্দ করতেন এমনকি কবি হাসান ইব্ন খাতিবকে দিয়েছিলেন তাঁর সাহাবীর মর্যাদা। এরূপ লেখকের দেওয়া আরো নানা দৃষ্টান্ত থেকে পরিষ্কার হয় শিল্পকলার নানা দিক-সম্পর্কে কিংবা পারফরমিং আর্টসে রিপ্রেজেনটেশন বা প্রতিরূপ ব্যবহারের বিষয়গুলো বিতর্কিত হলেও তাতে কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না। সে-সময়কার বিশেষ করে ৬৯৮-৯৯ খ্রিষ্টাব্দের পূর্বে, ইসলামের প্রাচীন যুগের তিনটি পর্যায়ের বিভিন্ন স্থাপত্যকর্মের দেয়ালচিত্রে বা শিল্পকর্মে রয়েছে নৃত্যরতা নারীমূর্তি, মানব-মানবী কিংবা জীবজন্তুর ছবি। তবে পরবর্তী সময়ে নানা কারণে প্রতিরূপ-ব্যবহারে, নৃত্য-গীত বা অভিনয়ের সীমাবদ্ধতা দেখা যায়, যার প্রেক্ষাপটের নানা বিশ্লেষণাত্মক কারণ সুন্দরভাবে উপস্থাপিত হয়েছে বইটির প্রথম অধ্যায়ে। এই অধ্যায়ে ইসলামপ্রসারের কিছু পরে নতুন নতুন ইসলাম-অধিকৃত এলাকাসমূহে সেই এলাকাভিত্তিক সংস্কৃতির কারণে সৃষ্ট সমস্যা মোকাবিলায় কীভাবে ইজতিহাদ (ব্যক্তিগত জীবনে কোরআন ও হাদিসের অর্থ-বিশ্লেষণ ও অনুধাবনের প্রক্রিয়া) কার্যকর করবার চেষ্টা হয়েছে এবং পরবর্তীকালে নানা বিভ্রান্তির ফলে কীভাবে কিয়াস (কোরআন ও হাদিসের আলোকে যুক্তিযুক্ত সিদ্ধান্ত) এবং ইজমা (মনীষীদের মতৈক্যের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা অভিমত) প্রচলিত হয়েছিল তার একটি ধারণা পাওয়া যায়। ১২০০ খ্রিষ্টাব্দে যদিও গোঁড়া ধর্মীয় তত্ত্ববিদগণ, উদারনৈতিক চেতনার ধর্মীয় গোষ্ঠীর উপর কর্তৃত্ব আরোপ করতে সক্ষম হয়েছিলেন, তবুও বিশ্বের বিভিন্ন অংশে কখনো গোপনে, কখনো কৌশলে মুক্তচিন্তাপ্রসূত শিল্পকলা তথা প্রতিকৃতি নির্মাণ, নাট্য-গীত বা থিয়েটারের চর্চা চলতে থাকে। লেখক বইটিতে নানা উদ্ধৃতি ও দৃষ্টান্ত টেনে বিষয়গুলোকে পরিষ্কার-প্রচেষ্টায় অনেকটাই সফল।

ইসলামিক বিশ্বে বিভিন্ন অঞ্চলে স্বকীয় বৈশিষ্ট্য নিয়ে যেভাবে থিয়েটার শিল্প গড়ে উঠেছে, তার একটি সংক্ষিপ্ত ও সুগঠিত বর্ণনা দিয়েছেন লেখক তার দ্বিতীয় অধ্যায়ে। ১৮৪৮ সালে মারুন আল নাক্কাশের (লেবাননের লেখক) পূর্বে ইউরোপীয় ধারার নাটকের কোনো প্রচলন ছিল না আরববিশ্বে। তবে আরব ভূখণ্ড অনেক আগে থেকেই যে-নাট্য ও নাট্যজাতীয় পরিবেশনার চল ছিল তা লেখক আলোচনা করেছেন। এদিকে লেখকের দেওয়া তথ্য থেকে জানা যায়, জ্যাকব এম ল্যানডো বিশ্বাস করেন যে, আরবীয়দের নাট্যকলা নিয়ে কোনো ধারণা ছিল না, কারণ হিসেবে তিনি বলছেন, আরবীয়দের সংস্পর্শে যে-সকল জাতি বা গোত্র এসেছে, তাদের মধ্যেও ছিল না কোনো উন্নত নাট্যচিন্তার ঐতিহ্য। আরেকটি কারণ এই যে, নারী যদিও বা পর্দার বাইরে আসবার সুযোগ পেত তবুও স্টেজে নিজেকে উপস্থাপন করবার সুযোগ তাদের ছিল না। কিন্তু জ্যাকবের এই বক্তব্য পুরোপুরি গ্রহণযোগ্যতা পায় না যখন মনে হয় গ্রিক এবং এলিজাবেথান অভিনেতারাও থিয়েটারকে সমৃদ্ধির দিকে নিয়ে গেছেন এবং পুরুষ কুশীলবগণই প্রথমদিকে প্রয়োজনমতো নারী-চরিত্রে রূপদান করতেন। ৭১১ খ্রিষ্টাব্দে সিন্ধু অঞ্চলে ইসলাম প্রভাব বিস্তার করলে তা এই অঞ্চলের সংস্পর্শে এসেছিল আর সেই সিন্ধু অঞ্চল ছিল নানা প্রকার দক্ষিণ এশীয় থিয়েটার ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ। কাজেই আরবীয়রা যে এই প্রভাব থেকে বঞ্চিত হবে, তা ধারণা করবার অবকাশ কম। এছাড়া প্রমাণ পাওয়া যায় যে, গ্রিক আবাসিড যুগে (৭৪৯-৯৪৫) আরবীয়রা গ্রিকদের সংস্পর্শেও আসে, এমনকি তারা অ্যারিস্টোটলের ‘পোয়েটিক্স’ অনুবাদ করেছিল। কিন্তু তারপরও নানা সামাজিক, সাংস্কৃতিক কিংবা ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রবহমান চিন্তাধারার কারণে এই থিয়েটার শিল্প যে তেমন বিকাশ লাভ করেনি, তা অনুধাবনের উদ্দেশ্যে লেখক নানা জনের নানা মতামতের উদ্ধৃতির মাধ্যমে অনেকগুলো বিশ্লেষণাত্মক তথ্য তুলে ধরেছেন। ইসলামিক বিশ্বে লোকজ বা ইনডিজেনাস থিয়েটারের কতগুলো ধারার অস্তিত্ব পরিলক্ষিত হয়। এই ধারাসমূহের মূল কুশীলব ছিলেন অভিনেতা, নৃত্যশিল্পী, গায়ক, বাদ্যযন্ত্রী এবং পুতুল নাচের কুশীলববৃন্দ (এক্ষেত্রে নারী-পুরুষ উভয়ের অংশগ্রহণ ছিল)। অর্থাৎ শুধুমাত্র সংলাপনির্ভর নয়, পারফরম্যান্স ছিল নৃত্য, সংগীত, যন্ত্রসংগীত, গদ্য, পদ্য বা গীত এবং বর্ণনামূলক সংলাপের নানা ব্যঞ্জনামুখর ভাষায়। এই সকল উপস্থাপন একদিকে ছিল যেমন ধর্ম-সম্বন্ধীয়, অন্যদিকে তেমনি লোকায়ত বা ধর্মনিরপেক্ষ বৈশিষ্ট্যের। পারস্যের চিত্রকলার মিনিয়েচার চিত্রকর্মে এ-ধরনের ধর্মীয় বা লোকায়ত আচার-অনুষ্ঠানের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। তুরস্কের মেভলেভিয়া নৃত্য এমন এক ঐতিহ্যবাহী নৃত্যপ্রধান ধর্মীয় পারফরম্যান্স যা জালালউদ্দীন রুমির সমাধিস্থানে চৌদ্দ শতক থেকে প্রচলিত। এই নৃত্যে ১৮ জন দরবেশ মাথায় পরিধান করেন কালো টুপি (সমাধি ফলকের প্রতীক রূপে), দেহে থাকে কালো আলখাল্লা (শবাধারের প্রতীক রূপে) ও সাদা পোশাক (কাফনের প্রতীক রূপে)। নাচ আরম্ভ হলে কালো আলখাল্লা খুলে ফেলে একবার ঊর্ধ্বলোকে স্বর্গের দিকে ডান হাত প্রসারিত করে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের সঙ্গে আত্মিক সংযোগ ঘটাতে এবং এরপর বুকের কাছে হাত রেখে ও শেষে বাঁ হাত নিচের দিকে প্রসারিত করে পৃথিবীর সাথে সেই সংযোগকে বিস্তৃত করবার প্রয়াসের রূপকধর্মী এই নৃত্যের নেপথ্যে রয়েছে আধ্যাত্মিক ও দর্শনের গভীর চিন্তা। গ্রহ-উপগ্রহ যেমন নিজ অক্ষের চারদিকে ঘুরে ঘুরে অতিক্রম করে মহাকাল, মহাকাশ যেমন সৃষ্টির রহস্য বুকে নিয়ে এক মহান স্রষ্টার অস্তিত্ব প্রচার করে ঠিক তেমনি এই নৃত্যরত শিল্পীবৃন্দ ঘুরে ঘুরে শুধু নৃত্যশৈলী নয়, দর্শকের মনে পরিচালিত করে এক অবর্ণনীয় আধ্যাত্মিক চেতনা। একইভাবে নানা সুফি সাধককে উদ্দেশ্য করে, তাঁদের জন্মদিবস কিংবা ওরস মোবারক (যেমন, শেখ আবদুল কাদের জিলানীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে যে-ওরস সংঘটিত হয়) পালনের জন্য আনুষঙ্গিক আচার-অনুষ্ঠানের সাথে সাথে নৃত্য-গীত কিংবা বাদ্যযন্ত্রলব্ধ সংগীতের মাধ্যমে পারফরম্যান্স উপস্থাপিত হয়। এরকম ধর্ম-সম্বন্ধীয় পারফরম্যান্সে নৃত্য ছাড়াও রয়েছে সংলাপপ্রধান উপস্থাপন কিংবা শোভাযাত্রা, যেমন শিয়া সম্প্রদায়ের নাট্যপালা, তাজিয়া প্রভৃতি। লোকায়ত বা ধর্মনিরপেক্ষ বৈশিষ্ট্যের পারফরম্যান্সে দেখা যায় বর্ণনামূলক, সংলাপপ্রধান, সংগীত ও পুতুল নাচ, ক্লাউনের কারসাজি বা মুখোশ পরিহিত প্রতীকী উপস্থাপন। এগুলো কখনো পথঘাট কিংবা বাজার এলাকায় আবার কখনো বা বিবাহ ইত্যাদি সামাজিক অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে রাজদরবার কিংবা ব্যক্তি-মালিকানাধীন বাড়িঘরের আঙিনায় সংঘটিত হতো। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থান – মিশর থেকে শুরু করে তুরস্ক, ইরান ও নানা দেশে এ-সকল আচার-অনুষ্ঠান বা পারফরম্যান্সের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় আর এদের মধ্যে শিয়া-বাজি, রো-হোজি, খায়াল আল জিল, কারাগোজ, আরাগোজ, কাওয়ালি, নাক্কালি, হাকিয়া, মাকামা, মাদ্দাহ, ইত্যাদি নামের বিশেষ পারফরম্যান্স উল্লেখযোগ্য। লেখকের এই আচার-অনুষ্ঠানগুলোর সংক্ষিপ্ত সাবলীল বিবরণ অনেক না জানা তথ্য দেয়, নিবৃত্ত করে অজানার সুরে সৃষ্ট কৌতূহল।

ধারাবাহিকতার জের টেনে লেখক এরপর প্রবেশ করেছেন বাংলাদেশে প্রচলিত কিছু পারফরম্যান্স, যা ধর্ম এবং ইসলাম ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত। দেশজ থিয়েটারের ওপর গবেষণালব্ধ তথ্য থেকে জানা যায় যে, এই দেশে সত্তরের উপরে পারফরম্যান্সের ধরন রয়েছে, যার মধ্যে পঞ্চাশের অধিক উপস্থাপনই বিষয়বস্তুর দিক থেকে ধর্ম-সম্পর্কিত (যদিও সবগুলো ইসলাম ধর্মের নয়) এবং বাকি বিশটি উপস্থাপন লোকায়ত চরিত্রের এবং তা কখনো বর্ণনামূলক, কখনো সংলাপপ্রধান কিংবা অন্য বৈশিষ্ট্যের। ধর্মীয় উৎস থেকে যেসব পারফরম্যান্স এসেছে তার অল্প কিছুসংখ্যক বৌদ্ধ ও নাথা ধর্মীয় মতবাদের ওপর ভিত্তি করে হলেও অধিকাংশই ব্রাহ্মণ্য এবং কৃষ্ণ এবং চৈতন্য, রামচন্দ্র, শিব ও কালি অথবা মনসাকেন্দ্রিক কাহিনীর ওপর ভিত্তি করে রচিত। যে-সকল পারফরম্যান্স ইসলাম ধর্মকে অবলম্বন করে গড়ে উঠেছে, তাদেরকে মূলত তিনভাগে ভাগ করে দেখিয়েছেন লেখক :

১. ইমাম হাসান ও ইমাম হোসেনেরর কারবালা কিংবদন্তি-সম্পর্কিত (জারি গান, জারি গজল, ইমাম যাত্রা প্রভৃতি)

২. পীরদের নানারকম অলৌকিক ক্ষমতা বা ক্রিয়া-সম্পর্কিত (গাজীর পীর, গাজীর যাত্রা, গাজীর পট, মাদার পীর, সত্য পীরের গান কিংবা যাত্রা, মানিক পীরের জারি, মানিক যাত্রা, মা মাই চাম্পার কিচ্ছা কাহিনী জারি, খাজা খিজির জারি, বেদা ভাসান প্রভৃতি)

৩. নবীজী এবং অলীক কিংবা পৌরাণিক বীর গাথা-সম্পর্কিত (পুঁথি পাঠ, সওয়াল-জওয়াব, পাতিলা গান প্রভৃতি)

এছাড়াও উপস্থাপনের রীতি-অনুযায়ী ইসলামি পরিবেশনাগুলোকে ৭টি ভাগে ভাগ করে দেখিয়েছেন লেখক:

১. বর্ণনামূলক 

২. সংলাপাত্মক          

৩. শোভাযাত্রামূলক   

৪. অধি-ব্যক্তিক          

৫. মিশ্য রীতি  

৬. প্রতিযোগিতামূলক এবং    

৭. পাঠ্যরীতি বা কথন।

এ-সকল উপস্থাপন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিভিন্ন সময়ে বা কোনো অনুষ্ঠান বা উপলক্ষকে কেন্দ্র করে এবং মূলত কৃষক, গ্রামের বধূরা এবং পেশাদারি কলাকুশলীদের দ্বারা সংঘটিত হয়। এই অধ্যায়ে উল্লিখিত বিভিন্ন ধরনের পারফরম্যান্সের বিশদ বিবরণ পাঠককে কখনো কখনো যেন নিয়ে যায় গ্রামের কোনো মেঠোপথের ধারের উন্মুক্ত মঞ্চে।

যেখানে গ্রামেরই কলাকুশলীদের আবেগময় অভিনয়, সংগীত আর সরল উপস্থাপনে মন সহজে মিশে যায় মাটির গভীরে গেঁথে যাওয়া আমাদের শত বছরের এ-সকল ঐতিহ্যময় সংস্কৃতির মূল উপাদানে। আবার কখনো  চিন্তাশীল মননে উত্থাপন করে নানা ধরনের প্রশ্ন, যার উত্তর আছে কিংবা নেই, হয়তো বা আছে অলৌকিক বিশ্বাসের অসীমতার বি¯তৃতি।

“বর্তমানের কারবালা গাথা : বিষাদ সিন্ধুর দৃষ্টান্ত” শিরোনামের চতুর্থ অধ্যায়ে লেখক ঢাকা পদাতিকের বিষাদ সিন্ধু নাট্যরূপের বিশদ বিবরণ দিয়েছেন। লেখকের কথায় রামকৃষ্ণ পরমহংস যেমন ধর্মীয় বেড়াজাল ডিঙিয়ে দাবি করতে পারেন নিজেকে বাঙালি বলে, তেমনি যেন মীর মোশাররফ হোসেন। তাঁর রচিত বিষাদ সিন্ধুর মধ্য দিয়ে তিনি যেন মুসলমানের স্বকীয়তার ঊর্ধ্বে একজন বাঙালি, একজন মানবিকবোধসম্পন্ন মানুষ যাঁর আত্মা কাঁদে, যাঁর অন্তর রক্তাক্ত হয় ইমাম হাসান ও ইমাম হোসেনের জন্য, কারবালা যুদ্ধের মর্মান্তিক পরিণতির জন্য। এ-কান্না যেন সকল কালের সকল স্থানের যুদ্ধবিরোধী চেতনার জন্য হাহাকার, মিথ্যার সঙ্গে সত্যের মোকাবিলার অন্বেষণ। এই খোঁজের সূত্র ধরেই লেখক নিজেই তাড়না বোধ করেন বিষাদ সিন্ধুকে থিয়েটারে রূপায়িত করবার প্রয়াসে। উপরন্তু যুগ যুগ থেকে চলে-আসা দেশজ বা ঐতিহ্যগত যাত্রা বা পালার সোপান বেয়ে এটি হতে পারে একটি আধুনিকায়ন প্রক্রিয়া। লেখক জামিল আহমেদের উদ্ধৃতি থেকে জানা যায়, কারবালার এই গাথা নিয়ে বাংলায় প্রথম মুকতুল হোসেন-শিরোনামে লেখা প্রকাশিত হয় সতেরো শতকের শেষভাগে। আধুনিক সময়ে বিষাদ সিন্ধুকে স্টেজে রূপদান করবার প্রেক্ষাপটে দেশের মৌলবাদী কট্টরপন্থি চিন্তাভাবনায় সমৃদ্ধ একটি শ্রেণির কাছ থেকে এক ধরনের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সম্ভাবনাকে সেই মুহূর্তে অনেকেই উড়িয়ে দিতে না পারলেও লেখক এবং বিষাদ সিন্ধু নাটকের রূপকার জামিল আহমেদ থেমে যাননি তাঁর উদ্দেশ্য থেকে। আমাদের দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা দেশজ থিয়েটারে যে-‘সিনক্রেটিসটিক অ্যাপ্রোচ’ বা সমন্বয়প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হয়, যেখানে ‘আল্লাহ্’ কোনো এক বিশেষ ধর্মের নয়, বরং তিনি সৃষ্টিকর্তা, সকল মানবগোষ্ঠীর জন্য তিনি নিরঞ্জন, সেই ধারণার হাত ধরে এবং সেই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই বিষাদ সিন্ধুকে থিয়েটারে রূপদান করতে চেয়েছেন নাট্যকার। নাটকটিকে সর্বজনের জন্য ও সময়োপযোগী করবার জন্য যে-নিরলস পরিশ্রম ও সময় ব্যয় হয়েছে, যে-কার্যপদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছে, যেভাবে থিয়েটারটি উপস্থাপনের উপষঙ্গ বা উপকরণসমূহকে (যেমন, সেট, আলোক-বিন্যাস, পোশাক-পরিচ্ছদ ইত্যাদি) সংগঠিত করা হয়েছে, তাদের একটি সাবলীল ধারাবাহিক বর্ণনা পাওয়া যায় এই অধ্যায়টিতে।

আরব্য উপন্যাসের ‘এক হাজার এক রাত্রি’র শেহরাজাদ কীভাবে নির্দয় অমানবিক বাদশাহ শাহরিয়ারের পাথরহৃদয় শুধুমাত্র গল্প বলার ছলে প্রভাবিত করেছিল তারই ভূমিকা দিয়ে এবং সেই গল্পকে বিষয় করে যে-থিয়েটার গড়ে উঠেছে তারই একটি বিবরণ দিয়েছেন লেখক এর পরের অর্থাৎ পঞ্চম অধ্যায়টিতে। ‘এক হাজার এক রাত্রি’র গল্প-গাথাগুলো প্রাথমিকভাবে মুখে মুখে প্রচলিত ছিল এবং এর যাত্রা শত শত বছরের সময়কাল ধরে প্রবহমান। এই বইটিতে দেওয়া লেখকের তথ্য-অনুযায়ী ‘এক হাজার এক রাত্রি’র কাহিনীগুলোকে ৬ ভাগে ভাগ করা যায়;

১.         রূপকথা জাতীয় কাহিনী

২.        রোমান্টিক উপন্যাস, নাবিক কিংবা অসৎ ব্যক্তির কাহিনী

৩.        উপকথা বা পৌরাণিক কাহিনী

৪.         উপদেশমূলক বা শিক্ষামূলক কিংবা নীতিকথা-সম্পর্কিত কাহিনী

৫.        রঙ্গকৌতুকপূর্ণ কাহিনী এবং

৬.        কিস্সা বা ছোট মজার গল্প।

লেখক এই অধ্যায়ে এ-সকল কাহিনীর কাঠামো, বিষয়বস্তু, এদের উৎস ও বিবর্তন, এই সকল কাহিনীর সঙ্গে ইউরোপীয় ও দক্ষিণ এশীয় (বাংলা ও উর্দু) সাহিত্য-ক্ষেত্রের সংযোগ ও তার রূপান্তর, এই কাহিনীকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা থিয়েটার পারফরম্যান্স (ইউরোপীয় ও দক্ষিণ এশিয়ার পটভূমিতে) এবং বিশেষ করে এই কাহিনীর প্রচ্ছায়ায় যে-সামাজিক ব্যবস্থা, নারীদের অবস্থান, সমাজের দর্শন প্রভৃতির ভাব আচ্ছাদিত, তার একটি সুন্দর গবেষণাধর্মী ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন। উপসংহারে লেখক প্রথমেই উল্লেখ করেছেন যে, এ-বইটির কোনো উপসংহার নেই। বিষয়টি চলমান। সত্য ও   বাস্তবতাকে ঘিরে যে-প্রশ্নের সম্মুখীন আজ লেখক, কিংবা পাঠক তা যেন রহস্যাবৃতই থেকে যায়, এ যেন উত্তরহীন এক বিশাল প্রশ্ন, যেখানে যোগফল শূন্য কিংবা অসীম – হয়তো বা শেহরাজাদের গল্পের মতোই রাত থেকে রাতে, সময় থেকে সময়ে প্রবহমান। লেখক জামিল আহমেদ একজন অভিজ্ঞ থিয়েটারকর্মী, নাট্য-নির্দেশক এবং ডিজাইনার। থিয়েটার-সংক্রান্ত গবেষণায় নিবেদিতপ্রাণ এই ব্যক্তিত্ব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা ও সংগীত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। তাঁর অভিজ্ঞতা ও গবেষণালব্ধ জ্ঞানের পরিসরে বিচরণ করতে করতে লেখক নিজেও খুঁজে ফিরছেন অনেক উত্তরহীন প্রশ্ন, কখনো বা প্রশ্নের কুজ্ঝটিকার ধূম্রজালে দেখতে পেয়েছেন একছটা আলো। মানুষে-মানুষে, চিন্তায়-চিন্তায়, ধর্মে-ধর্মে যে-ভেদাভেদ যে-ফারাক – তার সমাধান যেন একমাত্র নিরঞ্জনেরই কাছে। এ সেই সাদা, পবিত্রতার প্রতীক, সীমাহীন অসীমের অলৌকিক শক্তি। নিরঞ্জনের এই দর্শনে কোনো শুরু নেই, কোনো শেষ নেই। আর দর্শনের এই স্তরে ভেদাভেদের দেয়াল ভেঙে উপলব্ধি বিচরণ করে সজ্ঞাত আর অজ্ঞাত – এই দুয়ের মিশ্রণে সৃষ্ট এক অলৌকিক পরিমণ্ডলে যার অলৌকিক বিশ্বাসের সৃষ্ট ভূমিতে যুগ যুগ থেকে মানুষ বন্দনা করে আসছে সৃষ্টি ও কল্পনার, জীবন ও উপলব্ধির উপাদানে গড়ে ওঠা আরেক সৃষ্টির উল্লাসকে।