কৃতজ্ঞতার বনবাস

সকালহাঁটাটা ডিসি হিল পার্কেই সারেন অখিলেশবাবু।

বাহাত্তর পেরোনো বয়স। বাহাত্তরের থুত্তুরে বুড়া – এই কথাটি অখিলেশবাবুর জন্য খাটে না। জমাটবাঁধা শরীর না হলেও পেশিগুলো ঢিলেঢালা হয়ে যায়নি এখনো। লম্বাতেও কম না তিনি। পাঁচ ফুট আট ইঞ্চি। তার শরীরে দোষ যে নেই, তা কিন্তু নয়। ওজনটা স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি। সাতাত্তরের স্থলে আশি কেজি। ডায়াবেটিস একটু আছে বইকি! তাই তো সকালে নিয়ম করে হাঁটা।

পনেরো বছর হয়ে গেল, সকালহাঁটা শুরু করেছেন। এই পনেরো বছরে বন্ধুত্ব হয়েছে অনেকের সঙ্গে, আবার মনোমালিন্যও।

‘মনোমালিন্য হবে না! ঘটনাগুলো আপনার বেলায় হলে মাথা ঠিক রাখতে পারতেন হরিদা?’

‘অ অখিলেশদা, আপনি কখন এলেন? টের পাইনি তো!’ একটু কাঁচুমাঁচু হয়ে বললাম।

‘তা বেশিক্ষণ হয়নি।  হাঁটছিলাম। আপনাকে দেখে এগিয়ে এলাম। কাছে এসে শুনলাম – আমার সম্পর্কে ওঁদের কী যেন বলছিলেন! মনোমালিন্যের কথা তুললেন তো, তাই কথা না বলে পারলাম না।’

লজ্জা আমি একটু পেলাম। তারপরও নরম গলায় বললাম, ‘না অখিলেশদা, আপনার বদনাম করছিলাম না। শুধু বলছিলাম …।’

মুখের কথা কেড়ে নিয়ে অখিলেশবাবু চটজলদি বললেন, ‘দামোদর দত্ত আমার সঙ্গে ঠিক কাজ করেছেন, বলেন! একসঙ্গে হাঁটি। দীর্ঘদিনের পরিচয়। আমার সঙ্গে আচরণটা করলেন কি!’ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন অখিলেশ গুপ্ত।

‘ঠিক আছে, ঠিক আছে অখিলেশদা। এতোদিন মনোদুঃখটা মনের মধ্যেই রেখে দিয়েছিলেন। আজ বলার সুযোগ এসেছে। বলুন এঁদের। তাতে বেদনা অনেকটাই লাঘব হবে দাদা। দাদারা, শুনুন অখিলেশদা সম্পর্কে যা আপনাদের বলতে চেয়েছিলাম, তা ওঁর মুখ থেকেই শুনুন আপনারা।’

‘বলছেন বলতে?’ অখিলেশবাবুর চেহারাখানা শান্ত হয়ে এলো। ‘চলুন না, ওই বাদামগাছতলায় গিয়ে বসি। বাঁধানো বেঞ্চি আছে কয়েকটা। মুখোমুখি।’

অখিলেশবাবুর প্রস্তাবে কেউ না করলেন না। অন্যদের সঙ্গে আমিও গিয়ে বসলাম বাদামগাছতলায়। সকালসূর্য তেতে উঠেছে। বাদামগাছের ছায়ায় বসে সবাই স্বস্তির শ্বাস ফেললেন।

অখিলেশ গুপ্তের আরেকটা স্বভাবের কথা আপনাদের বলতে ভুলে গেছি। খুব স্পষ্ট কথা বলেন তিনি। নিজের কথা, পরের কথা – কোনোটাতে রাখঢাকের বালাই করেন না। তিনি করতেন ফোর্টে চাকরি। বিসিএস দিয়ে প্রথম শ্রেণির কাস্টমস অফিসার পদে ঢুকতে চেয়েছিলেন। পাশ করেননি। পাশের পাশাপাশি নম্বর পেয়েছিলেন। সরকার এঁদের ননক্যাডার পদে চাকরি দেয়। তিনিও ননক্যাডারের চাকরি পেয়েছিলেন। কাস্টমসেই। দু-হাতে কামানোর জায়গা ওটা। একটা আদর্শ-টাদর্শ নিয়ে চাকরিতে ঢুকেছিলেন। শেষ পর্যন্ত নিজেকে স্থির রাখতে পারেননি। নিজে না খেলে, অধস্তনরাও খেতে পারে না। চাকরি নিয়ে টানাটানি হওয়ার উপক্রম। শেষমেশ অল্পবিস্তর গিলতে শুরু করলেন। অল্পস্বল্প গিলেও কম কামাননি অখিলেশ গুপ্ত। চাকরি থাকতে থাকতে পতেঙ্গার দিকে সমুদ্রের কাছাকাছি বিঘাতিনেক জায়গা কিনেছেন। বাড়িও করেছেন তিনতলা। ওই বাড়িতে যাবেন না তিনি। শহরের ফ্ল্যাটবাড়িতে থাকেন। ‘নিজের বাড়ি ফেলে ভাড়াবাড়িতে থাকেন কেন?’ কেউ জিজ্ঞেস করলে বলেন, ‘ওখানে বড় নির্জন নির্জন। বন্ধুবান্ধব কেউ তেমন নেই যে কথা বলব! তাই শহরে থাকি।’ শ্রোতারা হিসাব মেলাতে পারেন না। এরকম লোকও আছে তাহলে! বন্ধুসান্নিধ্যের জন্য কাঁড়ি কাঁড়ি টাকার ভাড়াবাড়িতে থাকে! যাক, অখিলেশ গুপ্ত সম্পর্কে অনেক কথাই বলে ফেললাম। বাকিটা ওঁর মুখ থেকেই শুনুন। ও হ্যাঁ, মেজাজ ভালো থাকলে অনেক মজার কথাই শুনতে পাবেন তাঁর মুখ থেকে।

‘এই যে আমার নামের শেষে গুপ্ত পদবি দেখছেন, এটা ফলস।’ খোশমেজাজে শুরু করলেন অখিলেশ গুপ্ত। ‘আমার পৈতৃক পদবি কিন্তু গুদা। চমকে উঠলেন? এই যে দাদা, আপনি তো দেখি একটু মুচকি হাসছেনও। হাসিটা ধরে রাখুন। পরে হা-হা করে হাসার সুযোগ পাবেন।’ বলে নিজেই আপনখেয়ালে হেসে দিলেন অখিলেশবাবু। তারপর বললেন, ‘মাদারীপুরের আমগ্রামে জন্ম আমার। কোন আমগ্রাম চিনেছেন তো? অনেক খ্যাতিমান মানুষ জন্মেছেন ওখানে। কিন্তু একজনই ওই গ্রামটিকে বিখ্যাত করে ছেড়েছেন। তিনি কে, জানেন। আরে মশাই, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। ঠিক ধরেছেন –  প্রথম আলো, পূর্ব-পশ্চিম, সেই সময়ের সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। কী দাদারা, বোর ফিল করছেন না তো? আচ্ছা আচ্ছা, শুনতে চাইছেন? বলছিলাম আমার জন্মস্থানের কথা। আপনারা জানেন কি না জানি না, ওই আমগ্রাম, রাজৈর, সাদুল্যাপুর, কোটালীপাড়া, গোপালগঞ্জ – এসব এলাকায় বর্ণহিন্দুরা যেমন বসবাস করতেন, তাদের দেড়া বাস করত নমঃশূদ্ররা। ওইসব নমঃশূদ্রদের বিচিত্র পদবি।’

রাখাল ভট্টাচার্য বেশ মজা পাচ্ছেন অখিলেশবাবুর কথায়। কৌতুকি চোখে বললেন, ‘থামলেন কেন গুদাবাবু! সেই বিচিত্র পদবিগুলো কী কী বলুন না!’ রাখাল ভট্টাচার্যের উপহাস গায়ে মাখলেন না অখিলেশবাবু।

মৃদু খাঁকারিতে গলাটা পরিষ্কার করে নিলেন, ‘পদবিগুলো সত্যিই বেশ কৌতুক এবং কৌতূহল উদ্রেককারী।’ অবসর জীবন এখন অখিলেশবাবুর। বেশ উপন্যাস-টুপন্যাস পড়েন। কথার মধ্যে তাই ‘মনোমালিন্য’, ‘উদ্রেককারী’ – এসব ছাপানো শব্দটব্দ থাকে।

‘আরে, বলুন না দাদা। আমার যে বেশ শুনতে ইচ্ছে করছে।’ রাখাল ভট্টাচার্যের কথায় এবার কৌতুক না কৌতূহল বুঝতে পারলেন না অখিলেশবাবু। অখিলেশবাবু বললেন, ‘প্যাঁচা, বাগানী, কাউঢমা, চ্যাগা, ভাডা, হাতী, গুদা, ফলিয়া, সা, গয়লা, ট্যাপা, চড়া, ঢাওই, কইটা, চ্যাদরা, বৈরাগী, বউকলা – এসব পদবি ওখানকার নমঃশূদ্রদের।’

‘গুদার কথা তো বললেন না অখিলেশদা!’ হারাণ বিশ্বাস বলে উঠলেন।

‘পদবিটা বুঝি বেশ ভালো লেগে গেছে আপনার? আমার নামের সঙ্গে যুক্ত বলেই কি? ভাই, রায়, অধিকারী, গোলদার, হাওলাদার, বিশ্বাস, দেব, দেবনাথ – এসব টাইটেলের অন্তরালে কী পদবি যে মুখ গুঁজে আত্মগোপন করে আছে, তা অন্য কেউ না জানলেও আমি জানি।’

দেখলাম, প্রসঙ্গটা তেতোর দিকে যাচ্ছে। কথা ফেরাবার জন্য বললাম, ‘অখিলেশদা, আমাদের প্রসঙ্গ কিন্তু বন্ধুত্ব আর মনোমালিন্য নিয়ে। কেন দু-একজনের সঙ্গে আপনার মনোমালিন্য হয়েছে, তা শুনতেই মূলত বসেছি আমরা এখানে।’

‘ঠিক বলছেন, তা-ই বলছি। দামোদর দত্তের কথাই তো বলছিলাম?’

আস্তে করে বললাম, ‘হ্যাঁ, তাঁর কথাই বলছিলেন। আমাদের দীর্ঘদিনের পরিচিত তিনি। ইতিতেনিয়ার। কোতোয়ালির মোড়ে একটা অফিস আছে তার।’

‘তার আগে গুদা-প্রসঙ্গ শেষ করি।’ হারাণ বিশ্বাসের দিকে তাকিয়ে অখিলেশবাবু জিজ্ঞেস করলেন, ‘যোগেন মণ্ডলের নাম শুনেছেন? বরিশালের যোগেন মণ্ডল?’

চোখ নামিয়ে হারাণ বিশ্বাস ডানে-বাঁয়ে মাথা নাড়লেন।

অখিলেশবাবু বললেন, ‘নমঃশূদ্রদের নেতা ছিলেন। তফশিলি সম্প্রদায়ের মানুষদের জাগাতে চেয়েছিলেন। পাকিস্তান রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব। দেশভাগের কয়েক বছরের মধ্যে পাকিস্তানিদের বাঙালিবিদ্বেষের কথা টের পেয়ে গিয়েছিলেন।’

রাখাল ভট্টাচার্য ভ্রু কোঁচকালেন। বললেন, ‘এখানে যোগেন মণ্ডলের কথা এলো কেন বুঝতে পারছি না! আমরা তো কমবেশি যোগেন মণ্ডল সম্পর্কে জানি।’

‘জানেন বলেই অস্বস্তি লাগছে আপনার।’ ঠোঁটকাটা স্বভাব অখিলেশবাবুর। ‘এই যোগেন মণ্ডল নমঃশূদ্রদের উজ্জীবিত করতে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। সেই সময় তাঁর শত্রু ছিল দুটি পক্ষ। পাকিস্তানবাদী মুসলমানরা তাঁর বিরোধিতা করে গেছে। আর উঁচু বর্ণের হিন্দুরা তাঁর উত্থান মেনে নিতে পারেনি।’

রাখালবাবু চুপ মেরে যান। কারণ যোগেন মণ্ডলের আন্দোলন সম্বন্ধে তিনি সম্যক জানেন।

অখিলেশবাবু কণ্ঠকে নরম করলেন, ‘এই যোগেন মণ্ডল যেখানে জন্মেছেন, সেখানেও প্রচুর পরিমাণে গুদা পদবিধারী লোকের বাস ছিল।’ এবার আমার দিকে ঘাড় ফেরালেন অখিলেশবাবু। তার মুখের রং পাল্টে গেছে তখন। আগে যে রাগ রাগ ভাব ছিল, তা তাঁর চোখমুখ থেকে উবে গেছে। সেখানে কষ্টের আবছা একটা আভা।

আমার চোখে চোখ রেখে চুরমেরে স্বরে অখিলেশবাবু বললেন, ‘হরিদা, দামোদর দত্ত সম্পর্কে জানতে চাইছিলেন না?’

আমি চুপ করে থাকলাম। কারণ আমি তো তা আগেই তাঁকে একবার বলেছি। আমার উত্তরের জন্য অপেক্ষা করলেন না অখিলেশবাবু, ‘দামোদরের সঙ্গে আপনাদের যে পরিচয় আর খায়খাতির, তার চেয়ে অধিক ঘনিষ্ঠতা ছিল আমার সঙ্গে। আপনারা ধরে নিয়েছেন, এই ডিসিহিল পার্কে হাঁটতে এসেই বুঝি তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়!’

‘তাই তো। তাই নয় কি?’ একাশি বছরের মৃণাল বড়ুয়া বললেন। তিনি সকাল সকাল আসেন। আজ দেরিতে এসেছেন। তাই আলোচনার মাঝখানে যুক্ত হয়েছেন। বিচক্ষণ মানুষ। প্রসঙ্গটা বুঝতে তাঁর বেগ পেতে হয়নি।

‘আসলে তা নয়। বহু বছর আগেই তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়। ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্ম খোলার আগে তিনি ইনটেন্ডিং ফার্ম খুলেছিলেন। ফোর্ট থেকে মালামাল ছাড়িয়ে আনার কাজই করতেন দামোদর দত্ত। সেই সুবাদে আমার অফিসে বেশ যাতায়াত ছিল তাঁর। নতুন লোক বলে খুব বেশি পাত্তা দিত না অন্য অফিসাররা। একদিন আমার টেবিলে গিয়ে অসহায় কণ্ঠে বললেন, ‘আমার ব্যবসাটা লাটে উঠবে স্যার। আপনি আমাকে সাহায্য করলে প্রাণে বেঁচে যাই।’ দম নেওয়ার জন্য থামলেন অখিলেশ গুপ্ত।

সেই ফাঁকে রাখাল ভট্টাচার্য বললেন, ‘তাই নাকি! জানতাম না তো!’

‘লোকটির বিনয় এবং অসহায়ত্ব দেখে আমার মধ্যে একটু দয়া দয়া ভাব জাগল।’ অখিলেশবাবু আগে বলা কথার সঙ্গে যুক্ত করলেন, ‘সর্বাত্মক সাহায্য করতে থাকলাম তাঁকে। আমার প্রভাবিত যে অফিসাররা ছিল, তাদেরও অনুরোধ করলাম দামোদরবাবুকে সাহায্য করতে। একসময় বেশ দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু ভাগ্য খারাপ, এক চোরাকারবারির মাল খালাস করতে গিয়ে ধরা পড়ে গেলেন। লোকটি ডিকলেয়ার্ড চিনির জায়গায় মাদক এনেছিল। চোরাকারবারির সঙ্গে সঙ্গে দামোদরবাবুকেও জেল খাটতে হলো।’

‘কী! জেল খেটেছেন? দামোদর দত্ত?’ রাখাল ভট্টাচার্যের চোখ ছানাবড়া।

যে-কজন ছিলাম, সবার বিস্ময়ের সীমা থাকল না। চোখ গোল গোল করে আমরা অখিলেশবাবুর মুখের দিকের তাকিয়ে থাকলাম। আমাদের স্তম্ভিত হওয়ার ব্যাপারটি গায়ে মাখলেন না অখিলেশ গুপ্ত। নির্লিপ্ত কণ্ঠে বললেন, ‘তার আগে আরো একটি কথা আছে।’

‘কী কথা দাদা?’ না জিজ্ঞেস করে পারলাম না আমি।

‘দামোদর দত্তের দুই মেয়ে। ছোটটা ইলেভেনে পড়ত তখন। বড়টা এমএসসি করে ঘরে বসে আছে। বিসিএস দিয়েছিল বারদুয়েক। ফেল। তারপর এখানে-ওখানে চাকরির চেষ্টা। ধরাধরির পর এক প্রাইভেট ব্যাংকে চাকরি হলো। ছয় মাস চাকরি করার পর ম্যানেজার প্রস্তাব দিলো তার সঙ্গে ট্যুরে যেতে। মেয়ে এসে দামোদরবাবুকে সটান জানাল, ওই চাকরি আর করবে না। দামোদরবাবু ঠিক করলেন পল্লবীর বিয়ে দিয়ে দেবেন।’

মৃণাল বড়ুয়া বললেন, ‘আরে! আপনি তো দামোদরবাবুর মেয়ের নামও জানেন!’ ততক্ষণে বৃত্তান্তে ঢুকে গেছেন মৃণাল বড়ুয়া।

‘মেয়ের নাম জানার একটা কারণ আছে। বলছি।’ একটু ডানে-বাঁয়ে তাকিয়ে আবার শুরু করলেন অখিলেশ গুপ্ত, ‘আমাকে এসে বললেন, ‘দাদা, বিপদে পড়েছি। মেয়ে নিয়ে সমস্যা।’ তারপর সব কথা খুলে বললেন। শেষে বললেন, মেয়ে চাকরি ছেড়ে দিয়েছে, কিন্তু ম্যানেজার পল্লবীর পিছু ছাড়েনি। ঘন ঘন ফোন দেয়। নানান রকম কুপ্রস্তাব দেয়। তারপর আচমকা আমার দুই হাত জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘আমাকে বাঁচান দাদা।’ আমি তার কাছ থেকে পাঁচদিন সময় নিলাম।’

‘এই পাঁচদিনে কিছু একটা করলেন নাকি?’ আমি জানতে চাইলাম।

‘উপকার করলাম, দামোদর দত্তের।’ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন অখিলেশ গুপ্ত। শক্ত গলায় বললেন, ‘আমার অধীনে বিসিএস করা একটা ছেলে যোগদান করেছে। ও হ্যাঁ, ততদিনে আমি কিন্তু বেশ কয়েকটা প্রমোশন পেয়ে অফিসের হোমড়াচোমড়া ধরনের কিছু একটা হয়ে গেছি। তো অনিরুদ্ধের কথা বলছিলাম। বেশ বিনয়ী ও বাধ্য ছেলে। ভালো লেগে গেছিল অনিরুদ্ধকে। কথায় কথায় জেনে গেছিলাম – বিধবা মা-টি ছাড়া সংসারে আর কেউ নেই। এই অনিরুদ্ধকেই প্রস্তাব দিয়ে বসলাম পল্লবী দত্তের জন্য। ঘাবড়ে গিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থেকেছিল অনিরুদ্ধ। সাহস জুগিয়েছিলাম। গাইবান্ধার অজগাঁ থেকে তার বিধবা মাকে আনিয়ে নিয়েছিলাম। আমার বাড়িতে তুলেছিলাম। তারপর অনিরুদ্ধ আর পল্লবীতে বিয়েটা হলো। ছেলের পক্ষের অভিভাবক ছিলাম আমি।’ তারপর একেবারে থেমে গেলেন অখিলেশবাবু। বেশ কিছুক্ষণ পর কপালে ডান হাতের তালুটা ঘষে বললেন, ‘আজ থাক। আর বলতে ইচ্ছে করছে না।’

আমরা সমস্বরে বলে উঠলাম, ‘বলেন কী দাদা! কাহিনি অসমাপ্ত রেখে উঠে গেলে দুপুরে ভাত হজম হবে না আমাদের।’ আমাদের চাপাচাপিতে অখিলেশ গুপ্ত অগত্যা বলতে আরম্ভ করলেন।

‘বিয়ে চুকে গেলে অনিরুদ্ধ খুলশীর দিকে একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিল। বেশ ক-বছর যোগাযোগ রেখেছিল অনিরুদ্ধ। তারপর আমি রিটায়ারমেন্টে এলাম। কমতে কমতে যোগাযোগ একসময় একেবারে বন্ধ হয়ে গেল। শুনলাম – ইনটেন্ডিংয়ের কাজ ছেড়ে দিয়ে দামোদর দত্ত কনসালটিং ফার্ম খুলেছেন। আবাসন নির্মাণের শলাপরামর্শ দেন।’

‘এইটুকু না হয় বুঝলাম। এত উপকারী আপনার সঙ্গে দামোদরবাবুর মনোমালিন্য হলো কেন?’ রাখাল ভট্টাচার্যের সরু গলার কথায় হুল, না জানার আগ্রহ, অখিলেশবাবু ধরতে পারলেন না।

বিধুর চোখে রাখালবাবুর দিকে একবার তাকালেন অখিলেশ গুপ্ত। তারপর আমার দিকে মুখ ফেরালেন, ‘আপনি তো জানেন, পতেঙ্গার দিকে আমার একটা বাড়ি আছে। তিনতলা। তৃতীয় তলাটা তুলেছি গেল বছর। তেতলায় ভাড়া দিয়েছি। বর্ষাকালে ভাড়াটেরা জানাল – ছাদ দিয়ে আর দক্ষিণের দেয়াল চুপসে বৃষ্টির পানি ঢুকছে ঘরে। মনটা বড় খারাপ হয়ে গেল। স্বপন বড়ুয়ার কাছে পরামর্শ চাইলাম। সেই স্বপন বড়ুয়া, বাংলাদেশ বিমানে চাকরি করতেন একদা। তিনি দামোদরবাবুর নাম বলতেই আমি খুশি হয়ে উঠলাম খুব। স্বপনবাবুকে বললাম, ‘দামোদরবাবু আমার পরিচিত।’ স্বপনবাবু বললেন, ‘তাহলে তো হয়েই গেল। তাঁর ফার্ম বিল্ডিং কনস্ট্রাকশনের পরামর্শ দেয়। দামোদরবাবু নিশ্চয়ই আপনাকে একটা ভালো পরামর্শ দেবেন।’

বিপদ-উদ্ধারের আনন্দ নিয়ে আমি এক বিকেলে দামোদর দত্তের সঙ্গে দেখা করলাম। আমাকে দেখে কী যে খুশি হলেন তিনি, বলে বোঝাতে পারব না!’

নয়টা পেরিয়ে গেছে তখন। যাঁরা যাঁরা হাঁটতে এসেছিলেন, তাঁদের প্রায় সবাই চলে গেছেন। পার্কের এখানে-ওখানে কিছু ভবঘুরে, পাগল, ভিক্ষুক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। সকালের স্নিগ্ধ বাতাস হাওয়া হয়ে গেছে। তাতানো রোদ গাছের ফাঁকফোকর দিয়ে এসে মাটিকে তপ্ত করে তুলেছে। এতসব সত্ত্বেও শ্রোতাদের মনে আগ্রহের ঘাটতি দেখা গেল না। তাঁদের চোখে-চেহারায় এই পণ – এই কাহিনির শেষটা শুনেই তবে উঠবেন।

অখিলেশবাবু বলছেন, ‘আমার সমস্যার কথা শুনে দামোদর দত্ত বললেন, ‘বিল্ডিংটা নিজ চোখে দেখা দরকার আমার। দেখে ভালো একটা পরামর্শ দিতে পারব।’ আমি সানন্দে রাজি হয়ে গেলাম। আমার গাড়িতে করে এক বিকেলে নিয়ে গেলাম তাঁকে পতেঙ্গায়। দুর্ভাগ্য, সেদিন টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছিল। চা-নাস্তা খাওয়ার পর ছাদে যাওয়ার কথা বললে তিনি দোনামনা করে বললেন, ‘এই বৃষ্টিতে কী করে যাই দাদা, ছাদে?’ স্যারট্যার ডাকাডাকি নেই, সরাসরি দাদা। বললাম, ‘বৃষ্টি তো নেই এখন! এতদূর এলেন, ছাদটা দেখলে ভালো হয় না? ভাড়াটেরা কষ্ট পাচ্ছে খুব। আপনার কোনো অসুবিধা হবে না। আমার এই ভাইটি আপনার মাথায় ছাতা ধরবে।’ আমার পঞ্চাশোর্ধ্ব ভাইটিকে দেখিয়ে বলেছিলাম। প্রচণ্ড অনাগ্রহ নিয়ে ছাদে গেলেন দামোদরবাবু। আমিও সঙ্গে সঙ্গে। ছাদের এপাশ-ওপাশ তাকালেন। রেলিংয়ে একটু ঝুঁকে চুপসানো দেয়ালটা দেখতে বললে দামোদর দত্ত বললেন, ‘ওটা দেখতে হবে না। আমার ছেলেরা এসে দেখবে।’ আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনার ছেলেরা এসে দেখবেন মানে?’’

তারপর কখনো শক্ত গলায়, কখনো কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে, কখনো অপমানে চূর্ণবিচূর্ণ ভঙ্গিতে পরের কথাগুলো আমাদের বলে গিয়েছিলেন অখিলেশ গুপ্ত।

ছাদ থেকে নেমে ড্রয়িংরুমে বসেছিলেন দামোদর দত্ত। উঠবার জন্য উসখুস করছিলেন। ভদ্রতার খাতিরে অখিলেশবাবু জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘এতদূর এলেন! আপনাকে কোনো ফিসটিস …।’ মুখের কথা কেড়ে নিয়ে দামোদর দত্ত নাকি বলে উঠেছিলেন, ‘এসব ক্ষেত্রে আমি সাত হাজার নিই। আপনি আমার বহুদিনের পরিচিত। আপনার কাছ থেকে বেশি নেব না। আপনি পাঁচ হাজারই দিন।’ অখিলেশ গুপ্তের মনের অবস্থা অনুমান করুন আপনারা।

পাঁচ হাজার টাকার খামটা দিতে দিতে অখিলেশবাবু বলেছিলেন, ‘বিল্ডিংয়ে জল পড়ার ব্যাপারে একটা সলিউশন বাতলে যান। যা করতে হবে আমাদের বলে গেলে সেইমতো ব্যবস্থা নেব।’ দামোদর দত্ত চোখেমুখে খবরদারি ভঙ্গি করে নাকি বলেছিলেন, ‘তা কী করে হয় দাদা! আমি তো এই ব্যাপারে তেমন কোনো সাহায্য করতে পারব না আপনাকে! যা বলবে আমার জুনিয়ররা বলবে। ওরা একদিন আসবে। গজফিতে দিয়ে মাপজোখ করবে। ছাদের এখানে-ওখানে ঠুকিয়ে-বাজিয়ে দেখবে। তারপর ফিরে গিয়ে কনসাল্ট করে আপনাকে একটা পেপার রেডি করে দেবে। ওদেরই তত্ত্বাবধানে আপনাকে কাজটা করতে হবে।’ অখিলেশবাবু আমতা আমতা করে নাকি জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আপনার জুনিয়রদেরও কি ফিস দিতে হবে?’

আকাশ থেকে পড়ে দামোদর বলেছিলেন, ‘দিতে হবে না! ওদের ফিস তো দিতেই হবে।’

‘কত টাকা দিতে হবে?’ অখিলেশবাবু জানতে চাইলে দামোদর বলেছিলেন, ‘অন্যদের কাছ থেকে অনেক বেশি নিয়ে থাকি। একসময়ের পরিচিত আপনি আমার। তাই জন্য জুনিয়দের আসা-যাওয়ার ফিস বিশ আর পেপার রেডি করার জন্য বিশ, মোট চল্লিশ হাজার দিতে হবে। পরের তত্ত্বাবধানের ফিস আলাদা।’

সেই সকালে অখিলেশ গুপ্ত বলেছিলেন, ‘লোকাল একজন রাজমিস্ত্রি দিয়ে আমি আমার বিল্ডিংয়ের ত্রুটি সারিয়েছিলাম। আমার মোট খরচ হয়েছিল ত্রিশ হাজারের মতো।’ সবশেষে বলেছিলেন, ‘কত বিচিত্র মানুষ এই পৃথিবীতে!’