মোমিন সাব নাকি একলা মানুষ! বিজন, এক ভাবের মানুষ?
মানুষটার ঘরভর্তি স্ত্রী, পুত্র, নাতিনাতকুর, আত্মীয়স্বজন, ভাই-বেরাদর। গুষ্টি-ইষ্টি-পড়শি। সেই মুরুব্বি একলা কেমনে? সত্য, ঘরভরা স্বজন, হইহল্লা। …
কপালি মানুষ, সম্মানী মানুষ, জানেওয়ালা মানুষটা। তাঁর ভাবের দুনিয়া, জাহেরি বাতেনি সকলের মগজে আঁটে না। নুরানি সুরুতের মুরুব্বির আশেকে দিওয়ানা, মহল্লার সহজ-সরল এমনকি কূটকচালি জনমানুষ। জন্মভিটার আদি ঢাকাইয়া কুট্টিজনও তাঁকে ভাই-বেরাদর জানে। আদাব-সালাম তবিয়তের নিকেশ মুহুর্মুহু।
মোমিন সাব জুম্মাবারে লক্ষ্মীবাজার শাহি মসজিদে নামাজ আদায় করতে যান। ফিরতে ফিরতে বেলা প্রায় ঢলে পড়ে। পেয়ারের মুসুল্লি বন্ধুরা মিলেমিশে কত যে আলাপসালাপ হয়। …
মধ্যমণি মোমিন উদ্দিন সরকার। দুপুরের গরম ভাত, মাছের ঝোল সাজিয়ে অপেক্ষা করেন মোসাম্মাৎ খাতুনে জান্নাত। আর হর জুম্মাবার মানুষটা জাদুকর। কুঞ্জবাবু লেনের মুকারম, শিংটোলা লেনের হারু মিয়া – মজলিস গুলজার। বয়সী মুসুল্লি দোস্তরা সব হরবোলা। খানদানি কিস্তি টুপি, পাঁচকল্লি টুপি খুলে হাওয়া খায় হারু মিয়া, মুকারম। দুজনেই জানি দোস্ত, আবার ভোজনরসিক। মাহফিল ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় মুকারম।
গলায় হাজামজা বুড়িগঙ্গা উথলায়, ‘আব্বে হালায় হারু, ভুক লাগছে বহুত। আব্বে হারু – আব্বে হারু মিয়া।’
হারু মিয়ার পাতলা খান লেনে খোলাজা পিঠা হাঁসের মাংস, পোড়ারুটির মশহুর হোটেল। কারিগর মাসুম মিয়া নয়া শাদি করসে, হোটেল মহুয়ার ঝাঁপ বন্ধ।
হারু মিয়াও খিদা সহ্য করতে পারে না। সে হুড়মুড় করে উঠতে চায়; কিন্তু বাতগ্রস্ত পা-দুটো খানিক হড়কে যায়। মামুলি ঘটনা।
– আব্বে হালা ডাকপার লাগছো কেলায়?
মুকারম পানের লালে রাঙা বত্রিশ পাটি ব্যাদান করে,
– হাচা কইতাছি, মিছা কমু কেলা? ভুক লাগছে। লৌর দিয়া যা কিমা বাকরখানি, লাচ্ছি লয়া আয় দোস্ত। আমগোর গুরুর ভি ভুক লাগছে মালুম হয়।
মোমিন সাবের তরে মহল্লার মানুষজনের মহব্বত মজবুত। হর জুম্মাবার তিনি কয়েক ঘণ্টা অন্য আদমি। তাঁর ধ্যানজ্ঞান কলবের ভিতর ঘুম পাড়ে। … মাঝে মধ্যে নামাজ শেষে লতাপাতার গুণাগুণ বাতলে দেন। মহল্লার কয়েক ঘর ছোটখাটো ব্যারামে লতাপাতা শিকড়-বাকড়ের তালাশ করে তাঁর কাছে। মহানন্দে তিনি বাতলে দেন। আরোগ্য হয়।
তথাপি সাবেক কৃষি অফিসার মানুষটা বেহদ্দ বিজন। মায়মুনা মহলের প্রতিটি ইটের ভাঁজে, সুরকি, চুনায় মোমিন উদ্দিনের অস্তিত্বের সুবাস, কলবের কলরব মিলেমিশে সয়লাব।
একশ পঞ্চাশ বচ্ছরের এ-মহলে নিঝুম নিশিকালে মোমিন আলবৎ শুনতে পান বাপ দাদার ভারী খড়মের শব্দ। ফিসফিসানি, গরম নিশ্বাস। আসমানি আওয়াজ শোনেন মোমিন, গায়েবি সাহস। বাপের বিদেহী ছায়া তাঁকে ঘিরে রাখে।
বাপধন নিজামুদ্দিনের গায়েবি আওয়াজ কানে ধাক্কা দেয়,
– ও মোমিন, ও মনুবাবু, ও বাপধন কুশল কও মানিক। বসতভিটাডা যেমন মায়ায় বাইন্ধা রাখছো, তেমন রাখো বাপধন। ভিটিমাটির আত্মার সিন্দুকে কত গুপ্তকথা, কত চক্ষুর জল, কত খুশির ফোয়ারা আটক থাকে তুমি বুঝদার, বোঝো। মনুবাবু আমার বাপধন। তুমি নিশিরাতে মায়মুনা মহলের সঙ্গে কথা কও, জানি বাপধন। বড় মায়ার ভিটাবাড়ি আর পিছদুয়ারে ওই বৃক্ষলতার সাথে আশনাই তোমার মনুবাবু! … নিজ হাতে বপন করসি লকলকে চারাগাছ। তুমি বাপ এখন করো। শোনো মনুবাবু, বৃক্ষের চাইতে আপনজন আর কেউ নাই এ গান্ধা সংসারে।
এই যত ফিনফিনে কুয়াশার হিমানি, ধূমল, ধোঁয়াশা যত বিভ্রম করোটিতে বয়ে বেরান মনুবাবু। এ কি হ্যালুসিনেশনের গুপ্তঘাতক? যে-কারণে নিজঘরে পরবাসী সরকার সাব! মোমিনউদ্দিন সরকার।
তাঁর আঙুলের ডগায় ডগমগ করে এক অচিন আবেগ, রাতবিরেতে জোছনা রাতে সে মানুষটা ছাতিম তলায় নিঃসাড়ে যান, থম মেরে বসে ক্রন্দন করেন। মোজেজা বোঝা দায়! ক্রন্দন করলে দিল শীতল হয়। মনে আসমানি মলম লাগে মালুম হয় তাঁর।
এই যে লক্ষ্মীবাজার! এ-তল্লাটে মনুবাবুর দাদাজান মুন্সিগঞ্জের ভাগ্যকূল থেকে ব্যবসার কাজে এসে দুই বিঘার এই জমিন খরিদ করেছিলেন। দাদা দবিরউদ্দিন খুব শখ করে ক্রয় করেছিলেন এই জমিন। নিয়তি, ইট বালু রড সিমেন্ট পাঁজা করা রইলো। মনুবাবুর দাদাজান মুন্সীগঞ্জের ভাগ্যকূলে আচমকা ফেরত গেলেন। চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন। পিতার কবরের পাশটিতে। সে এক অথই কাসিদা। …
মনুবাবুর পিতা নিজামুদ্দিন সরকার বাপধনের স্বপ্ন তিলতিল যত্নে ফয়সালা করলেন। দ্বিতল এ-দালান খানদানের নমুনা। বাগানবাড়ি। মৌসুমি ফুল-ফলের মনোহর ঠিকানা।
এ-এলাকার পরিচয় ছিল মিয়া সাহেব ময়দান নামে। কোনকালে কাশ্মিরের মিয়া সাহেব আবদুল রহিম রিজভী এই তল্লাটে একটি খানকাহ শরিফ প্রতিষ্ঠা করেন। কালেচক্রে সেখানে লক্ষ্মীনারায়ণ মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়।
সে যাই হোক, লক্ষ্মীবাজারের অস্তিত্ব ঊনআশির মোমিন সাবের শিরায় শিরায় কুলুকুলু বয়। জোয়ান বয়সে সদরঘাট, বাহাদুর শাহ পার্ক, শাঁখারি বাজার, ইসলামপুর, ওয়ারি, যাত্রাবাড়ী সুযোগ পেলেই পথে পথে আনাগোনা। পাগল, পথের ধুলায় খোঁজেন পরশপাথর? চৌরাস্তার হোটেলে হাজির বিরিয়ানি। কোনো কোনো সফেদ সকালে নয়া বউ টুকটুকে খাতুনে জান্নাতও সঙ্গে থাকেন। ইয়ার দোস্তও জুটে যেতো। সেই যত বায়োস্কোপের দিন। চোখ বুঝলে ঝিলমিল করে ওঠে।
মনুবাবুর আসল পরিচয় জানে পিছদুয়ারের তরুপল্লব, বাগবাগিচা। তিনি বৃক্ষলতার পাতায় পাতায় ডালে ডালে পেতে রাখেন তাঁর দরদি প্রাণ। বিঘৎ হৃদয়। রাত ঘন হলে, নিশিচরা পাখির ডানার শব্দে তাঁর মোহমুক্তি ঘটে। কলবের কপাট খুলে যায় পাট পাট। ছাতিমতলায় বসেন ভাবের পাগল। বেহেশতের অচিন নূরে ঝরকাকাটা এক বালামখানা দর্শন করেন দিব্যচক্ষে।
এই যে নিতল সবুজ সারবাঁধা বৃক্ষ, লতাগুল্ম। এই যে রসুন্দি লতার বেগুনি ফুলের মনোহর শোভা। মনুবাবু বলেন, আমার লতা পারুল! কার্নিশে জুঁইফুল! মনে হয় গেরস্ত বউ-ঝিরা এইমাত্র পাতিল ভরে খই ভেজে রেখেছে। নীলমণি লতায় দোলে ঝোপা ঝোপা নিখিলের নীল। জোছনা রাতে সরকার সাব বাগিচায় রাতভর মায়াবাদ্য শোনেন। তিনি এক সন্ত। এক বিজন মানুষ – ধ্যানমগ্ন।
প্রতিটি কোজাগরি পূর্ণিমা, বুদ্ধপূর্ণিমায় মহল্লার জানেওয়ালা ভাবের মানুষটি তাঁর বাগিচায় হেঁটে বেড়ান। সরকার সাব অপরূপ বেদনা খোঁজেন। গাছগাছালির সঙ্গে কথা বলেন। কুশলবিনিময় হয়। রানিপছন্দ আমগাছে মুকুল এলে কী সুখ।
মহানন্দে বয়সী মানুষটা গাছের পুরু বাকলে দয়ালু আঙুল বুলান। চোখে কেন অশ্রু টলটল করে? কে জানে! তিনি নিজেও জানেন কি?
বাতাসে যখন ছয়টা আমগাছের অঢেল মুকুলের অবিশ্বাস্য সুবাস। ঝিম ধরা দুপুরে মায়মুনা মহলও নিঝুম। দুই ছেলে অফিসে, নাতি-নাতনিরা স্কুলে। বউমায়েরা নানা কাজে বাইরে। কেবল খাতুনে জান্নাত ঢুলুঢুলু চোখে দোয়া-দরুদের কেতাবের পাতা ওল্টান। ঈদসংখ্যা বেগমের পাতায় চোখ রাখেন।
এই রকম সুনসান দুপুরে মনুমিয়া নিরুদ্দেশ চেনা ঠিকানায়। শীতের কামড় কিছুটা ছাড় দিয়েছে। আসন্ন বসন্তদিন। মিতালি হবে কৃষ্ণচূড়ার আগুনে।
ফুটবে কি না বেগুনি জারুল? টুকটুকে পারিজাত ডালে ডালে! কুহু কুহু কোকিলা! … উদাসী ঘুঘুর মন কেমন করা ডাকে মনুমিয়া হাসিকান্নার মিলমিশে এক অপরূপ সাধুজন বনে যান। দয়াময়ের দয়ার কূল-কিনারা নাই।
নিড়ানিটা তিনি আপনমনে লোফালুফি করেন। যেন এটা ধাতব কোনো দণ্ড নয়, শ্যামের মুরলী।
কত জাতের সার গাছগাছালির বেড়ে উঠতে লাগে, সে বিষয়ে মনোযোগ তাঁর। রোগবালাই ইত্যাদি বিষয়ও তাঁর নখের ডগায়। কৃষিবিদ্যা তাঁর অধীত। তার সঙ্গে ভালোবাসার অনিবার্য মিশেল।
ছেলেরা মহাবিরক্ত। বাবার এই রাতজাগা, গাছপাগল ভাবের দশায়। বড় পুত্র পারভেজ মনোচিকিৎসকের সঙ্গে বারকয় আলাপ করেছে। রীতিমতো অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে।
ড. নোমান হাসতে হাসতে উত্তর দিয়েছেন, ‘থাকতে দিন। ওনার মতো ওনাকে। এই সব বিভ্রমের মধ্যে উনি তাজা
থাকবেন।’
মায়মুনা মহলে ছোট ছেলে সাবেরের নতুন বউ এসেছে। পরিবারের আবহাওয়া আর একদফা উষ্ণ।
গুলশান কন্যা, ধনীর দুলালি। মুখের বাক্যবাণ বেশ ধারালো। দেমাগ চলনে-বলনে। মেজাজ তুঙ্গে।
মৌমিতা বড় জা মিতুকে বলে, ‘ভাবি, তুমি এই মান্ধাতার আমলের বাড়িতে আছো কেমন করে? রাবিশ! যত্তসব ফালতু সেন্টিমেন্ট। প্রেম করে বিয়ে করেছি বলে এই পানিশমেন্ট? এই ব্রিটিশ আমলের খাড়া খাড়া সিঁড়ি। ঘিঞ্জি গলি। ইলেকট্রিসিটির নমুনা তো জানোই। আই কান্ট টলারেট।’
শ্বশুর সাহেবের হিপোক্রেসি অসহ্য। বুড়ো ভাম!
মিতু মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে। তার কম্প্রোমাইজ শব্দটা খুব চেনা। হাতের মুঠোয় বলা যায়। শাশুড়ি মায়ের কাছে বড়লোকের কন্যার গীবত করতে চায় বইকি। কিন্তু শাশুড়ি তো এখন মৌনী পাথর। তাঁর সঙ্গে এইসব নাখোশ আলাপ জমে না। মিতুর দম বন্ধ হয়ে ওঠে।
শাশুড়ি খাতুনে জান্নাত এক প্রবীণ পাথর। দম দেওয়া এক ফর্সা ছোটখাটো প্রতিমা। শতসহস্র ভ্রুকুটি, ফ্যাসাদ, গোপন ঝড়ের আলামত বেচারির মাথার উপর দিয়ে যায়। তাঁর যে জখমের দাগা সেটা হলো স্বামী মানুষটাকে বুঝতে না পারা। কী তাঁর ভেদবুদ্ধি!
বৃক্ষের সঙ্গে কত কত বছর রাত জাগেন মানুষটা। হুতাসন কিসের বা। নিমগাছের বাকল জড়ায়ে কান্দে। কথা কয় ফিসফিস করে। শখের কান্দন। বুক ফেটে যায় জান্নাতের। শূন্য বিছানায় হুতাসন ধিকিধিকি। দু-চারটা মনের গোপন কথা বলতে হয়, হলুদ দেয়ালের সঙ্গে। পাকঘরের হাঁড়ি-খুন্তির সঙ্গে। মোটা দাগে আর সকলে বিরুদ্ধপক্ষ। ছেলে দুটাও মহাব্যস্ত।
মনুবাবু এই বয়সকালে এমন বিবাগী হইলেন। এই লক্ষ্মীবাজার, এই অলিগলি ঘিঞ্জিতে তাঁর বাপধনের বিশাল আড়ত ছিল। দিনমান নিজামুদ্দিন আড়তদারি নিয়ে মশগুল থাকতেন। কিশোর মনুবাবুরে মোকামে মাঝে মধ্যে বসিয়ে বয়ান করতেন, ‘বাপধন ব্যবসাপাতি নজরদারিত রাখা লাগে। শেখো। কোনো বিদ্যাই ফেলনা না বাপ।’
যুবক মনু কৃষিবিদ্যায় ডিগ্রি নিল। চাকরি-বাকরি করল। বাপ ইন্তেকাল করলেন। আড়তদারি ভণ্ডুল।
মোমিন সরকার এ-মহল্লার অঘোষিত বাদশাহ। ফেরেশতা কিসিমের দয়ালু মানুষ। শিকড়-বাকড়ের গুণাগুণ আলবৎ ধেয়ানে রাখেন। ঔষধি লতাগুল্মের ঘের দেওয়া বাগান। কত মানুষের সর্দি-জ্বর-কাশি, বহুমূত্র, হাঁপানির জন্যে লতাপাতার হদিস দিয়েছেন। অনেকের আরোগ্যও হয়েছে। আনন্দ তাঁর।
ছেলেরা বাবাকে নিরালায় ডেকে নিয়ে নিচুস্বরে ক্ষোভের কথা বলে, ‘তুমি কি কোবরেজি করবা বাবা। প্রতিদিন সকালে দেখি ছোটখাটো জটলা। ওরা তোমার রোগী?’
মোমিন সাব মৃদু হাসেন, ‘নারে বাবা, এই পড়শিজন, সামান্য উপকার করার চেষ্টা করি। এই দেখ একশ তুলসীর চারা করেছি। ওরা ঘরের আঙিনায় লাগালে কত উপকার পেতে পারে। তুলসী, শেফালী পাতা, বাসক পাতা, আদা ছেঁচে রস একটু মধু মিশায়ে ছোটদের পরিমাণমতো খাওয়ালে কাশি পগারপার। লোহা গরম করে একটু ছ্যাঁকা দিলে জীবাণুমুক্ত। গরিব মানুষগুলা এসব টোটকা ভুলে গেছে। শীতকালে বাচ্চাগুলোর হুট করে নিউমোনিয়া হয়ে যায়। কত দেখলাম রে। হাসপাতালে দৌড়ঝাঁপ করেও ব্যর্থ হতে হয় অনেক সময়। তোদের ছোটবেলায় আমি কত খাইয়েছি। তোর মা রস করে দিয়েছে।’
ছেলেদের মুখে কোনো সদুত্তর নেই। কপালের ভাঁজ দেখতে পান না তিনি। বাবা এখন একরোখা। মানসম্মানের সওয়াল।
সাবেকি ডিজাইনের প্রশস্ত ডাইনিং টেবিলে সকালের নাস্তা। মিতু শ্বশুরের পাতে নরম রুটি তুলে দেয়। রসুইঘরে ফুলির মা রুটি সেঁকে। সুবাস এঘর-ওঘর ঘুরে বেড়ায়। খাস্তা পরোটা, ডিম অমলেট, মুরগি ভুনা। ছেলেরা,
নাতি-নাতনিরা প্লেটে তুলে নিয়েছে। আজ শাহি শামি কাবাব ভাজছে খাতুন। কোন উপলক্ষে জানেন না মোমিন সাব। তিনি তো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। লোকালয়ের নিত্য যাপনের খবরাখবর কেমনে জানবেন?
বউমা শ্বশুর সাবের কাছে জানতে চায়, ‘বাবা ডিম সেদ্ধটা খাবেন তো? একটু গাজরের হালুয়া দেবো?’
মোমিন সাব শূন্যে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকেন। ‘কি জানি বউমা, সহজে কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারি না।’
বড় ছেলে পারভেজ, ছোট ছেলে সাবের প্রায় একসঙ্গে কোরাস গায়, ‘বাবা এই বয়সে ডিসিশন নিতে একটু সমস্যা হতেই পারে। বাবা আমরা পুরান ঢাকার এই ঘিঞ্জি ছেড়ে যাব, খুব তাড়াতাড়ি। ধানমন্ডি লেকের পাড়ে ১৬ তলায়! ঠিক আছে না বাবা? খুশি তো। লাইফস্টাইল না পাল্টালে চলবে, বলো?’
বাবা হকচকিয়ে যান।
– কী বলছিস এসব পারভেজ? এই ভিটা, এই গাছগাছালি ছেড়ে কোন মুল্লুকে?
বাবাকে আগেও বারকয় এ-বিষয়ে বলা হয়েছে। তবু তিনি চমকে চমকে ওঠেন। হৃৎপিণ্ড আলগা হয়ে যেতে চায় মানুষটার।
– বাপধন তোমরা জানো শিকড় হলো আত্মার রেশমি সুতা। শিকড় ছিঁড়লে আত্মা টুটাফাটা হয়ে যায়।
সাবের এবার একটু চড়া গলায় বলে ওঠে – ‘বাবা। লজিক্যাল হতে হবে। এইসব বস্তাপচা সেন্টিমেন্টগুলো ঝেড়ে মুছে ফেলুন। সময় পাল্টে গেছে। বাচ্চারা বড় হচ্ছে। ওদের ফিউচার ভাবতে হবে না? আপনি বলেন।’
তিনি নিরুত্তর। কোনো জোরালো উত্তর সহসা খুঁজে পেলেন না।
মোমিন সরকার তোবড়ানো গাল নেড়ে রুটির টুকরো চিবাতে চেষ্টা করেন। নুরানি চেহারায় ব্যথাতুর মেঘ।
আজ রাতে পূর্ণিমা। চটিজোড়া পায় দিয়ে আলগোছে বাগানের কাঠের বেঞ্চিতে গিয়ে বসেন। শিরশিরে হাওয়া।
এ-হাওয়া তাঁর চেনা।
নাজিমুদ্দিন সরকারের বিদেহী ছায়া। চক্ষু মুদে মনুবাবু নিজেকে সঁপে দেন বিদেহী আত্মার অলীক দুনিয়ায়। … কলবের কেচ্ছা।
দাদাজানের অকালমৃত্যুর পর দাদিজান বেগম মায়মুনা এই মায়মুনা মহলে আমরণ বসবাস করেছেন। ক্ষয়িষ্ণু জোতদারের কন্যা, তাঁর রূপের প্রশংসা করত দশ গাঁয়ের জনমানুষ। তিনিও ছিলেন অনন্যসাধারণ মহিলা। অগ্নিশিখা।
যে-রাতে সার সার নিশিপদ্ম ফুটত, রাত কা রানি ফুটত, সে রাতে বেগম মায়মুনা বাগিচায় গিয়ে চুপিসারে বসতেন। এক ঘন রেশমের আলখেল্লা পরা জ্যোতির্ময় সুপুরুষ দীঘল পা ফেলে আসতেন। ছায়া ছায়া। তিনি এক বুজুর্গ জিন! কথা হতো ভাঙা ভাঙা। …
নাজিমুদ্দিন তখনো না-বুঝ! নাদান।
সারা জীবন গুপ্তকথা তাঁকে অশান্তি দিয়েছে। সুরাহা হয়নি। মোমিন মা হারিয়েছেন অল্প বয়সে। জীবিকার লড়াই শুরু হয়ে গেছে।
মনুবাবু গুপ্তকথা খোঁজেন, কিন্তু তার তল নাই, সীমা নাই। সূত্র নাই – নিধুয়া পাথার।
মাথার উপর উঁচু সিলিংয়ে ফ্যান ঘোরে, ঘটাং ঘটাং। জানালার খড়খড়ি খুলে দেন। ঝরকাকাটা ফাঁক-ফোকর গলিয়ে চিরল চিরল রোদ তাঁর শরীরে লুটিয়ে পড়ে। চেয়ে দেখেন অপলক সাবেকি পালঙ্ক, ইজিচেয়ার। আজ জনাকয় বন্ধু আসবেন।
বেগম জান্নাত একগ্লাস লেবুর শরবত হাতে এগিয়ে আসেন। তাঁর আকণ্ঠ পিয়াস।
– দাও, গলাটা শুকিয়ে কাঠ। আর এক গ্লাস দিও।
ছুটির দিন। ট্রাক এসেছে। প্যাকিং হচ্ছে। খাট খোলা হলো। জবড়জং জিনিস একখান। মিস্ত্রি নবা ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে। চান্দ মিয়ারও কাহিল দশা। মেহগনি কাঠ, কিন্তু ডিজাইনে কোনো চিকন শিল্পচাতুর্য নাই।
এক্সপার্ট হেল্পিং হ্যান্ড এসে গেছে। দ্রুত কাজ এগোচ্ছে।
সবাই হাতে হাতে টুকিটাকি মালসামান গুছিয়ে দিচ্ছে। আজ মৌমিতার লম্ফঝম্পের সুমার নাই।
দক্ষিণমুখী পাশাপাশি দুটি ফ্ল্যাট। একেকটা তিন হাজার স্কয়ার ফিট। অত্যাধুনিক ফিটিংস। আর কি লাগে! …
বাবাকে মনমরা বিধ্বস্ত এক নাবিকের মতো লাগছে। আমি আর বাইতে পারলাম না বৈঠা। মনু মিয়া যদিও হাল ছাড়তে নারাজ। কচি লেবু পাতার সুবাস লেপ্টে আছে নাসারন্ধ্রে। তিনি জানেন গাছের জীবন আছে, এটা একটা বোকা কথা। জীবন না থাকলে বৃদ্ধি হয় কেমনে? ফুল-ফল হয় কি করে!
মূল কথা বৃক্ষের বুঝ আছে। অনুভূতি আছে, সুখদুঃখ ভালোমন্দ স্বভাবও আছে বটে। মাটির নিচে গাছগাছালি একে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ করে, খাবার দেয়। আবার কোনো ডানপিটে গাছ অন্যের পুষ্টি, শক্তি কেড়ে নিতে চেষ্টা করে। গাছপালা প্রিয় মানুষের বিচ্ছেদে ক্রন্দন করে। আহা মোমিনের বাগিচা! এইসব গূঢ় রহস্য জানতে সবসময় উদগ্রীব বিজন মানুষটা। হাড়িভাঙা আমগাছ এবার মুকুলে মুকুলে সয়লাব। তিনি দিব্যি শুনতে পান কাগজি লেবু, আম, নিম গাছ বেদনায় বোবা হয়ে গেছে। মায়মুনা দাদিজানের গুপ্ত সিন্দুকের ডালা আজো বেহাল! …
সেই সুপুরুষ জিনের আদল!
পারভেজ পাশে বসে।
– বাবা, ছাদে টবের ব্যবস্থা করে দেবো। ভেবো না। নতুন পরিবেশ। তোমারও ভালো লাগবে। সবকিছু পাবে ঝকঝকে তকতকে। আকাশ পাবে হাত বাড়ালে। পুরো শহর, রাতের আলো ঝলমলে ছবি দেখতে পাবে বাবা।
মনুবাবুর জবান বন্ধ! ভেতর থেকে কে যেন বলে উঠল, ‘আমার আর ভালো লাগা!’
মালবোঝাই ট্রাক প্রায় পৌঁছে গেছে ধানমন্ডি লেকপাড়ে। পাজেরো ছুটছে লেক ভিউ প্লাজার উদ্দেশে।
সবার হাসিখুশি উথলে পড়ছে। বিশেষ করে নাতি মিকি আর রেহনুমার। মৌমিতার আজ সাফল্যের দিন। সাবেরকে উঠতে-বসতে যেভাবে ইনসাল্ট সে করেছে তার তুলনা নেই। নরকবাস ফুরালো!
পারভেজ বাবার দিকে খেয়াল রাখে।
– বাবা ঘুমিয়ে গেলে নাকি? ভালো লাগছে না তোমার? এবার ঈদে খুব মজা হবে।
আচমকা মোমিন সাব অস্পষ্ট উচ্চারণে বলে ওঠেন, ‘আমাদের মায়মুনা মহলে তারাবাতি জ্বলে! … বাগানের ডালে ডালে হীরামন পাখি বিচ্ছেদি গায়। হারু, মুকারম আরো অনেক বন্ধু দরজায় খাড়া। তাদের চোখ এত ভেজা! তাদের চোখ এত লাল! তোমরা কিছু শুনতে পাও না?’
– বাবা, তুমি আরাম করে বসো।
গাড়িভর্তি খানিক নীরবতা। মিরপুর রোড ধরে গাড়ি এগোয়।
মিতু শ্বশুরের দিকে পানির বোতল এগিয়ে দেয়।
– বাবা একটু পানি খান।
তিনি নিশ্চুপ। বেগম খাতুনে জান্নাত একটু ঝিমিয়ে পড়েছেন। সারাদিন কম ধকল যায়নি তাঁর।
পারভেজ এবার ঝুঁকে তাকায় বাবার দিকে। ‘বাবা ও বাবা…’
গাড়িভর্তি ‘বাবা ও বাবা …’
মোমিন সাব আবারো সামান্য কথা বলেন, যেন না বললেই না।
– বাপজান, আপনি বলছেন ভিটামাটি মায়া দিয়া বাইন্ধা রাখতে। বসতভিটার শতেক কথা আনাচকানাচে ঘুমায়। গুপ্তকথা সুলুকসন্ধান কেমনে করি বাপধন আর আমারে রাতবিরাতে জ্বালাতন না করো। আমারে তুমি পাইবা। শত স্মৃতির আতরদানিখান আছে আমার অন্তরের সিন্দুকে। হারায় নাই।
তার সফেদ চুলভরা মাথাটা সিটের সঙ্গে লেপ্টে গেছে।
– ‘বাবা ঘুমালে?’ আবার ডাকে পুত্রধন।
মৌমিতা অতিষ্ঠ।
– ‘বাবার আবার কি হলো? ননসেন্স!’ শব্দটা তার কড়া লিপস্টিকমাখা ঠোঁটের ভেতর চাপা পড়ে যায়।
মৌন পাথর খাতুনে জান্নাত মুখে আঁচল চাপা দিয়ে কাঁদছেন। ফুলে ফুলে। হিক্কা উঠছে।
একটু তফাত ঝলমলে লেক ভিউ বেহায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে। ৎ
মোমিন সাব নাকি একলা মানুষ! বিজন, এক ভাবের মানুষ?
মানুষটার ঘরভর্তি স্ত্রী, পুত্র, নাতিনাতকুর, আত্মীয়স্বজন, ভাই-বেরাদর। গুষ্টি-ইষ্টি-পড়শি। সেই মুরুব্বি একলা কেমনে? সত্য, ঘরভরা স্বজন, হইহল্লা। …
কপালি মানুষ, সম্মানী মানুষ, জানেওয়ালা মানুষটা। তাঁর ভাবের দুনিয়া, জাহেরি বাতেনি সকলের মগজে আঁটে না। নুরানি সুরুতের মুরুব্বির আশেকে দিওয়ানা, মহল্লার সহজ-সরল এমনকি কূটকচালি জনমানুষ। জন্মভিটার আদি ঢাকাইয়া কুট্টিজনও তাঁকে ভাই-বেরাদর জানে। আদাব-সালাম তবিয়তের নিকেশ মুহুর্মুহু।
মোমিন সাব জুম্মাবারে লক্ষ্মীবাজার শাহি মসজিদে নামাজ আদায় করতে যান। ফিরতে ফিরতে বেলা প্রায় ঢলে পড়ে। পেয়ারের মুসুল্লি বন্ধুরা মিলেমিশে কত যে আলাপসালাপ হয়। …
মধ্যমণি মোমিন উদ্দিন সরকার। দুপুরের গরম ভাত, মাছের ঝোল সাজিয়ে অপেক্ষা করেন মোসাম্মাৎ খাতুনে জান্নাত। আর হর জুম্মাবার মানুষটা জাদুকর। কুঞ্জবাবু লেনের মুকারম, শিংটোলা লেনের হারু মিয়া – মজলিস গুলজার। বয়সী মুসুল্লি দোস্তরা সব হরবোলা। খানদানি কিস্তি টুপি, পাঁচকল্লি টুপি খুলে হাওয়া খায় হারু মিয়া, মুকারম। দুজনেই জানি দোস্ত, আবার ভোজনরসিক। মাহফিল ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় মুকারম।
গলায় হাজামজা বুড়িগঙ্গা উথলায়, ‘আব্বে হালায় হারু, ভুক লাগছে বহুত। আব্বে হারু – আব্বে হারু মিয়া।’
হারু মিয়ার পাতলা খান লেনে খোলাজা পিঠা হাঁসের মাংস, পোড়ারুটির মশহুর হোটেল। কারিগর মাসুম মিয়া নয়া শাদি করসে, হোটেল মহুয়ার ঝাঁপ বন্ধ।
হারু মিয়াও খিদা সহ্য করতে পারে না। সে হুড়মুড় করে উঠতে চায়; কিন্তু বাতগ্রস্ত পা-দুটো খানিক হড়কে যায়। মামুলি ঘটনা।
– আব্বে হালা ডাকপার লাগছো কেলায়?
মুকারম পানের লালে রাঙা বত্রিশ পাটি ব্যাদান করে,
– হাচা কইতাছি, মিছা কমু কেলা? ভুক লাগছে। লৌর দিয়া যা কিমা বাকরখানি, লাচ্ছি লয়া আয় দোস্ত। আমগোর গুরুর ভি ভুক লাগছে মালুম হয়।
মোমিন সাবের তরে মহল্লার মানুষজনের মহব্বত মজবুত। হর জুম্মাবার তিনি কয়েক ঘণ্টা অন্য আদমি। তাঁর ধ্যানজ্ঞান কলবের ভিতর ঘুম পাড়ে। … মাঝে মধ্যে নামাজ শেষে লতাপাতার গুণাগুণ বাতলে দেন। মহল্লার কয়েক ঘর ছোটখাটো ব্যারামে লতাপাতা শিকড়-বাকড়ের তালাশ করে তাঁর কাছে। মহানন্দে তিনি বাতলে দেন। আরোগ্য হয়।
তথাপি সাবেক কৃষি অফিসার মানুষটা বেহদ্দ বিজন। মায়মুনা মহলের প্রতিটি ইটের ভাঁজে, সুরকি, চুনায় মোমিন উদ্দিনের অস্তিত্বের সুবাস, কলবের কলরব মিলেমিশে সয়লাব।
একশ পঞ্চাশ বচ্ছরের এ-মহলে নিঝুম নিশিকালে মোমিন আলবৎ শুনতে পান বাপ দাদার ভারী খড়মের শব্দ। ফিসফিসানি, গরম নিশ্বাস। আসমানি আওয়াজ শোনেন মোমিন, গায়েবি সাহস। বাপের বিদেহী ছায়া তাঁকে ঘিরে রাখে।
বাপধন নিজামুদ্দিনের গায়েবি আওয়াজ কানে ধাক্কা দেয়,
– ও মোমিন, ও মনুবাবু, ও বাপধন কুশল কও মানিক। বসতভিটাডা যেমন মায়ায় বাইন্ধা রাখছো, তেমন রাখো বাপধন। ভিটিমাটির আত্মার সিন্দুকে কত গুপ্তকথা, কত চক্ষুর জল, কত খুশির ফোয়ারা আটক থাকে তুমি বুঝদার, বোঝো। মনুবাবু আমার বাপধন। তুমি নিশিরাতে মায়মুনা মহলের সঙ্গে কথা কও, জানি বাপধন। বড় মায়ার ভিটাবাড়ি আর পিছদুয়ারে ওই বৃক্ষলতার সাথে আশনাই তোমার মনুবাবু! … নিজ হাতে বপন করসি লকলকে চারাগাছ। তুমি বাপ এখন করো। শোনো মনুবাবু, বৃক্ষের চাইতে আপনজন আর কেউ নাই এ গান্ধা সংসারে।
এই যত ফিনফিনে কুয়াশার হিমানি, ধূমল, ধোঁয়াশা যত বিভ্রম করোটিতে বয়ে বেরান মনুবাবু। এ কি হ্যালুসিনেশনের গুপ্তঘাতক? যে-কারণে নিজঘরে পরবাসী সরকার সাব! মোমিনউদ্দিন সরকার।
তাঁর আঙুলের ডগায় ডগমগ করে এক অচিন আবেগ, রাতবিরেতে জোছনা রাতে সে মানুষটা ছাতিম তলায় নিঃসাড়ে যান, থম মেরে বসে ক্রন্দন করেন। মোজেজা বোঝা দায়! ক্রন্দন করলে দিল শীতল হয়। মনে আসমানি মলম লাগে মালুম হয় তাঁর।
এই যে লক্ষ্মীবাজার! এ-তল্লাটে মনুবাবুর দাদাজান মুন্সিগঞ্জের ভাগ্যকূল থেকে ব্যবসার কাজে এসে দুই বিঘার এই জমিন খরিদ করেছিলেন। দাদা দবিরউদ্দিন খুব শখ করে ক্রয় করেছিলেন এই জমিন। নিয়তি, ইট বালু রড সিমেন্ট পাঁজা করা রইলো। মনুবাবুর দাদাজান মুন্সীগঞ্জের ভাগ্যকূলে আচমকা ফেরত গেলেন। চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন। পিতার কবরের পাশটিতে। সে এক অথই কাসিদা। …
মনুবাবুর পিতা নিজামুদ্দিন সরকার বাপধনের স্বপ্ন তিলতিল যত্নে ফয়সালা করলেন। দ্বিতল এ-দালান খানদানের নমুনা। বাগানবাড়ি। মৌসুমি ফুল-ফলের মনোহর ঠিকানা।
এ-এলাকার পরিচয় ছিল মিয়া সাহেব ময়দান নামে। কোনকালে কাশ্মিরের মিয়া সাহেব আবদুল রহিম রিজভী এই তল্লাটে একটি খানকাহ শরিফ প্রতিষ্ঠা করেন। কালেচক্রে সেখানে লক্ষ্মীনারায়ণ মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়।
সে যাই হোক, লক্ষ্মীবাজারের অস্তিত্ব ঊনআশির মোমিন সাবের শিরায় শিরায় কুলুকুলু বয়। জোয়ান বয়সে সদরঘাট, বাহাদুর শাহ পার্ক, শাঁখারি বাজার, ইসলামপুর, ওয়ারি, যাত্রাবাড়ী সুযোগ পেলেই পথে পথে আনাগোনা। পাগল, পথের ধুলায় খোঁজেন পরশপাথর? চৌরাস্তার হোটেলে হাজির বিরিয়ানি। কোনো কোনো সফেদ সকালে নয়া বউ টুকটুকে খাতুনে জান্নাতও সঙ্গে থাকেন। ইয়ার দোস্তও জুটে যেতো। সেই যত বায়োস্কোপের দিন। চোখ বুঝলে ঝিলমিল করে ওঠে।
মনুবাবুর আসল পরিচয় জানে পিছদুয়ারের তরুপল্লব, বাগবাগিচা। তিনি বৃক্ষলতার পাতায় পাতায় ডালে ডালে পেতে রাখেন তাঁর দরদি প্রাণ। বিঘৎ হৃদয়। রাত ঘন হলে, নিশিচরা পাখির ডানার শব্দে তাঁর মোহমুক্তি ঘটে। কলবের কপাট খুলে যায় পাট পাট। ছাতিমতলায় বসেন ভাবের পাগল। বেহেশতের অচিন নূরে ঝরকাকাটা এক বালামখানা দর্শন করেন দিব্যচক্ষে।
এই যে নিতল সবুজ সারবাঁধা বৃক্ষ, লতাগুল্ম। এই যে রসুন্দি লতার বেগুনি ফুলের মনোহর শোভা। মনুবাবু বলেন, আমার লতা পারুল! কার্নিশে জুঁইফুল! মনে হয় গেরস্ত বউ-ঝিরা এইমাত্র পাতিল ভরে খই ভেজে রেখেছে। নীলমণি লতায় দোলে ঝোপা ঝোপা নিখিলের নীল। জোছনা রাতে সরকার সাব বাগিচায় রাতভর মায়াবাদ্য শোনেন। তিনি এক সন্ত। এক বিজন মানুষ – ধ্যানমগ্ন।
প্রতিটি কোজাগরি পূর্ণিমা, বুদ্ধপূর্ণিমায় মহল্লার জানেওয়ালা ভাবের মানুষটি তাঁর বাগিচায় হেঁটে বেড়ান। সরকার সাব অপরূপ বেদনা খোঁজেন। গাছগাছালির সঙ্গে কথা বলেন। কুশলবিনিময় হয়। রানিপছন্দ আমগাছে মুকুল এলে কী সুখ।
মহানন্দে বয়সী মানুষটা গাছের পুরু বাকলে দয়ালু আঙুল বুলান। চোখে কেন অশ্রু টলটল করে? কে জানে! তিনি নিজেও জানেন কি?
বাতাসে যখন ছয়টা আমগাছের অঢেল মুকুলের অবিশ্বাস্য সুবাস। ঝিম ধরা দুপুরে মায়মুনা মহলও নিঝুম। দুই ছেলে অফিসে, নাতি-নাতনিরা স্কুলে। বউমায়েরা নানা কাজে বাইরে। কেবল খাতুনে জান্নাত ঢুলুঢুলু চোখে
দোয়া-দরুদের কেতাবের পাতা ওল্টান। ঈদসংখ্যা বেগমের পাতায় চোখ রাখেন।
এই রকম সুনসান দুপুরে মনুমিয়া নিরুদ্দেশ চেনা ঠিকানায়। শীতের কামড় কিছুটা ছাড় দিয়েছে। আসন্ন বসন্তদিন। মিতালি হবে কৃষ্ণচূড়ার আগুনে।
ফুটবে কি না বেগুনি জারুল? টুকটুকে পারিজাত ডালে ডালে! কুহু কুহু কোকিলা! … উদাসী ঘুঘুর মন কেমন করা ডাকে মনুমিয়া হাসিকান্নার মিলমিশে এক অপরূপ সাধুজন বনে যান। দয়াময়ের দয়ার কূল-কিনারা নাই।
নিড়ানিটা তিনি আপনমনে লোফালুফি করেন। যেন এটা ধাতব কোনো দণ্ড নয়, শ্যামের মুরলী।
কত জাতের সার গাছগাছালির বেড়ে উঠতে লাগে, সে বিষয়ে মনোযোগ তাঁর। রোগবালাই ইত্যাদি বিষয়ও তাঁর নখের ডগায়। কৃষিবিদ্যা তাঁর অধীত। তার সঙ্গে ভালোবাসার অনিবার্য মিশেল।
ছেলেরা মহাবিরক্ত। বাবার এই রাতজাগা, গাছপাগল ভাবের দশায়। বড় পুত্র পারভেজ মনোচিকিৎসকের সঙ্গে বারকয় আলাপ করেছে। রীতিমতো অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে।
ড. নোমান হাসতে হাসতে উত্তর দিয়েছেন, ‘থাকতে দিন। ওনার মতো ওনাকে। এই সব বিভ্রমের মধ্যে উনি তাজা
থাকবেন।’
মায়মুনা মহলে ছোট ছেলে সাবেরের নতুন বউ এসেছে। পরিবারের আবহাওয়া আর একদফা উষ্ণ।
গুলশান কন্যা, ধনীর দুলালি। মুখের বাক্যবাণ বেশ ধারালো। দেমাগ চলনে-বলনে। মেজাজ তুঙ্গে।
মৌমিতা বড় জা মিতুকে বলে, ‘ভাবি, তুমি এই মান্ধাতার আমলের বাড়িতে আছো কেমন করে? রাবিশ! যত্তসব ফালতু সেন্টিমেন্ট। প্রেম করে বিয়ে করেছি বলে এই পানিশমেন্ট? এই ব্রিটিশ আমলের খাড়া খাড়া সিঁড়ি। ঘিঞ্জি গলি। ইলেকট্রিসিটির নমুনা তো জানোই। আই কান্ট টলারেট।’
শ্বশুর সাহেবের হিপোক্রেসি অসহ্য। বুড়ো ভাম!
মিতু মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে। তার কম্প্রোমাইজ শব্দটা খুব চেনা। হাতের মুঠোয় বলা যায়। শাশুড়ি মায়ের কাছে বড়লোকের কন্যার গীবত করতে চায় বইকি। কিন্তু শাশুড়ি তো এখন মৌনী পাথর। তাঁর সঙ্গে এইসব নাখোশ আলাপ জমে না। মিতুর দম বন্ধ হয়ে ওঠে।
শাশুড়ি খাতুনে জান্নাত এক প্রবীণ পাথর। দম দেওয়া এক ফর্সা ছোটখাটো প্রতিমা। শতসহস্র ভ্রুকুটি, ফ্যাসাদ, গোপন ঝড়ের আলামত বেচারির মাথার উপর দিয়ে যায়। তাঁর যে জখমের দাগা সেটা হলো স্বামী মানুষটাকে বুঝতে না পারা। কী তাঁর ভেদবুদ্ধি!
বৃক্ষের সঙ্গে কত কত বছর রাত জাগেন মানুষটা। হুতাসন কিসের বা। নিমগাছের বাকল জড়ায়ে কান্দে। কথা কয় ফিসফিস করে। শখের কান্দন। বুক ফেটে যায় জান্নাতের। শূন্য বিছানায় হুতাসন ধিকিধিকি। দু-চারটা মনের গোপন কথা বলতে হয়, হলুদ দেয়ালের সঙ্গে। পাকঘরের হাঁড়ি-খুন্তির সঙ্গে। মোটা দাগে আর সকলে বিরুদ্ধপক্ষ। ছেলে দুটাও মহাব্যস্ত।
মনুবাবু এই বয়সকালে এমন বিবাগী হইলেন। এই লক্ষ্মীবাজার, এই অলিগলি ঘিঞ্জিতে তাঁর বাপধনের বিশাল আড়ত ছিল। দিনমান নিজামুদ্দিন আড়তদারি নিয়ে মশগুল থাকতেন। কিশোর মনুবাবুরে মোকামে মাঝে মধ্যে বসিয়ে বয়ান করতেন, ‘বাপধন ব্যবসাপাতি নজরদারিত রাখা লাগে। শেখো। কোনো বিদ্যাই ফেলনা না বাপ।’
যুবক মনু কৃষিবিদ্যায় ডিগ্রি নিল। চাকরি-বাকরি করল। বাপ ইন্তেকাল করলেন। আড়তদারি ভণ্ডুল।
মোমিন সরকার এ-মহল্লার অঘোষিত বাদশাহ। ফেরেশতা কিসিমের দয়ালু মানুষ। শিকড়-বাকড়ের গুণাগুণ আলবৎ ধেয়ানে রাখেন। ঔষধি লতাগুল্মের ঘের দেওয়া বাগান। কত মানুষের সর্দি-জ্বর-কাশি, বহুমূত্র, হাঁপানির জন্যে লতাপাতার হদিস দিয়েছেন। অনেকের আরোগ্যও হয়েছে। আনন্দ তাঁর।
ছেলেরা বাবাকে নিরালায় ডেকে নিয়ে নিচুস্বরে ক্ষোভের কথা বলে, ‘তুমি কি কোবরেজি করবা বাবা। প্রতিদিন সকালে দেখি ছোটখাটো জটলা। ওরা তোমার রোগী?’
মোমিন সাব মৃদু হাসেন, ‘নারে বাবা, এই পড়শিজন, সামান্য উপকার করার চেষ্টা করি। এই দেখ একশ তুলসীর চারা করেছি। ওরা ঘরের আঙিনায় লাগালে কত উপকার পেতে পারে। তুলসী, শেফালী পাতা, বাসক পাতা, আদা ছেঁচে রস একটু মধু মিশায়ে ছোটদের পরিমাণমতো খাওয়ালে কাশি পগারপার। লোহা গরম করে একটু ছ্যাঁকা দিলে জীবাণুমুক্ত। গরিব মানুষগুলা এসব টোটকা ভুলে গেছে। শীতকালে বাচ্চাগুলোর হুট করে নিউমোনিয়া হয়ে যায়। কত দেখলাম রে। হাসপাতালে দৌড়ঝাঁপ করেও ব্যর্থ হতে হয় অনেক সময়। তোদের ছোটবেলায় আমি কত খাইয়েছি। তোর মা রস করে দিয়েছে।’
ছেলেদের মুখে কোনো সদুত্তর নেই। কপালের ভাঁজ দেখতে পান না তিনি। বাবা এখন একরোখা। মানসম্মানের সওয়াল।
সাবেকি ডিজাইনের প্রশস্ত ডাইনিং টেবিলে সকালের নাস্তা। মিতু শ্বশুরের পাতে নরম রুটি তুলে দেয়। রসুইঘরে ফুলির মা রুটি সেঁকে। সুবাস এঘর-ওঘর ঘুরে বেড়ায়। খাস্তা পরোটা, ডিম অমলেট, মুরগি ভুনা। ছেলেরা,
নাতি-নাতনিরা প্লেটে তুলে নিয়েছে। আজ শাহি শামি কাবাব ভাজছে খাতুন। কোন উপলক্ষে জানেন না মোমিন সাব। তিনি তো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। লোকালয়ের নিত্য যাপনের খবরাখবর কেমনে জানবেন?
বউমা শ্বশুর সাবের কাছে জানতে চায়, ‘বাবা ডিম সেদ্ধটা খাবেন তো? একটু গাজরের হালুয়া দেবো?’
মোমিন সাব শূন্যে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকেন। ‘কি জানি বউমা, সহজে কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারি না।’
বড় ছেলে পারভেজ, ছোট ছেলে সাবের প্রায় একসঙ্গে কোরাস গায়, ‘বাবা এই বয়সে ডিসিশন নিতে একটু সমস্যা হতেই পারে। বাবা আমরা পুরান ঢাকার এই ঘিঞ্জি ছেড়ে যাব, খুব তাড়াতাড়ি। ধানমন্ডি লেকের পাড়ে ১৬ তলায়! ঠিক আছে না বাবা? খুশি তো। লাইফস্টাইল না পাল্টালে চলবে, বলো?’
বাবা হকচকিয়ে যান।
– কী বলছিস এসব পারভেজ? এই ভিটা, এই গাছগাছালি ছেড়ে কোন মুল্লুকে?
বাবাকে আগেও বারকয় এ-বিষয়ে বলা হয়েছে। তবু তিনি চমকে চমকে ওঠেন। হৃৎপিণ্ড আলগা হয়ে যেতে চায় মানুষটার।
– বাপধন তোমরা জানো শিকড় হলো আত্মার রেশমি সুতা। শিকড় ছিঁড়লে আত্মা টুটাফাটা হয়ে যায়।
সাবের এবার একটু চড়া গলায় বলে ওঠে – ‘বাবা। লজিক্যাল হতে হবে। এইসব বস্তাপচা সেন্টিমেন্টগুলো ঝেড়ে মুছে ফেলুন। সময় পাল্টে গেছে। বাচ্চারা বড় হচ্ছে। ওদের ফিউচার ভাবতে হবে না? আপনি বলেন।’
তিনি নিরুত্তর। কোনো জোরালো উত্তর সহসা খুঁজে পেলেন না।
মোমিন সরকার তোবড়ানো গাল নেড়ে রুটির টুকরো চিবাতে চেষ্টা করেন। নুরানি চেহারায় ব্যথাতুর মেঘ।
আজ রাতে পূর্ণিমা। চটিজোড়া পায় দিয়ে আলগোছে বাগানের কাঠের বেঞ্চিতে গিয়ে বসেন। শিরশিরে হাওয়া।
এ-হাওয়া তাঁর চেনা।
নাজিমুদ্দিন সরকারের বিদেহী ছায়া। চক্ষু মুদে মনুবাবু নিজেকে সঁপে দেন বিদেহী আত্মার অলীক দুনিয়ায়। … কলবের কেচ্ছা।
দাদাজানের অকালমৃত্যুর পর দাদিজান বেগম মায়মুনা এই মায়মুনা মহলে আমরণ বসবাস করেছেন। ক্ষয়িষ্ণু জোতদারের কন্যা, তাঁর রূপের প্রশংসা করত দশ গাঁয়ের জনমানুষ। তিনিও ছিলেন অনন্যসাধারণ মহিলা। অগ্নিশিখা।
যে-রাতে সার সার নিশিপদ্ম ফুটত, রাত কা রানি ফুটত, সে রাতে বেগম মায়মুনা বাগিচায় গিয়ে চুপিসারে বসতেন। এক ঘন রেশমের আলখেল্লা পরা জ্যোতির্ময় সুপুরুষ দীঘল পা ফেলে আসতেন। ছায়া ছায়া। তিনি এক বুজুর্গ জিন! কথা হতো ভাঙা ভাঙা। …
নাজিমুদ্দিন তখনো না-বুঝ! নাদান।
সারা জীবন গুপ্তকথা তাঁকে অশান্তি দিয়েছে। সুরাহা হয়নি। মোমিন মা হারিয়েছেন অল্প বয়সে। জীবিকার লড়াই শুরু হয়ে গেছে।
মনুবাবু গুপ্তকথা খোঁজেন, কিন্তু তার তল নাই, সীমা নাই। সূত্র নাই – নিধুয়া পাথার।
মাথার উপর উঁচু সিলিংয়ে ফ্যান ঘোরে, ঘটাং ঘটাং। জানালার খড়খড়ি খুলে দেন। ঝরকাকাটা ফাঁক-ফোকর গলিয়ে চিরল চিরল রোদ তাঁর শরীরে লুটিয়ে পড়ে। চেয়ে দেখেন অপলক সাবেকি পালঙ্ক, ইজিচেয়ার। আজ জনাকয় বন্ধু আসবেন।
বেগম জান্নাত একগ্লাস লেবুর শরবত হাতে এগিয়ে আসেন। তাঁর আকণ্ঠ পিয়াস।
– দাও, গলাটা শুকিয়ে কাঠ। আর এক গ্লাস দিও।
ছুটির দিন। ট্রাক এসেছে। প্যাকিং হচ্ছে। খাট খোলা হলো। জবড়জং জিনিস একখান। মিস্ত্রি নবা ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে। চান্দ মিয়ারও কাহিল দশা। মেহগনি কাঠ, কিন্তু ডিজাইনে কোনো চিকন শিল্পচাতুর্য নাই।
এক্সপার্ট হেল্পিং হ্যান্ড এসে গেছে। দ্রুত কাজ এগোচ্ছে।
সবাই হাতে হাতে টুকিটাকি মালসামান গুছিয়ে দিচ্ছে। আজ মৌমিতার লম্ফঝম্পের সুমার নাই।
দক্ষিণমুখী পাশাপাশি দুটি ফ্ল্যাট। একেকটা তিন হাজার স্কয়ার ফিট। অত্যাধুনিক ফিটিংস। আর কি লাগে! …
বাবাকে মনমরা বিধ্বস্ত এক নাবিকের মতো লাগছে। আমি আর বাইতে পারলাম না বৈঠা। মনু মিয়া যদিও হাল ছাড়তে নারাজ। কচি লেবু পাতার সুবাস লেপ্টে আছে নাসারন্ধ্রে। তিনি জানেন গাছের জীবন আছে, এটা একটা বোকা কথা। জীবন না থাকলে বৃদ্ধি হয় কেমনে? ফুল-ফল হয় কি করে!
মূল কথা বৃক্ষের বুঝ আছে। অনুভূতি আছে, সুখদুঃখ ভালোমন্দ স্বভাবও আছে বটে। মাটির নিচে গাছগাছালি একে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ করে, খাবার দেয়। আবার কোনো ডানপিটে গাছ অন্যের পুষ্টি, শক্তি কেড়ে নিতে চেষ্টা করে। গাছপালা প্রিয় মানুষের বিচ্ছেদে ক্রন্দন করে। আহা মোমিনের বাগিচা! এইসব গূঢ় রহস্য জানতে সবসময় উদগ্রীব বিজন মানুষটা। হাড়িভাঙা আমগাছ এবার মুকুলে মুকুলে সয়লাব। তিনি দিব্যি শুনতে পান কাগজি লেবু, আম, নিম গাছ বেদনায় বোবা হয়ে গেছে। মায়মুনা দাদিজানের গুপ্ত সিন্দুকের ডালা আজো বেহাল! …
সেই সুপুরুষ জিনের আদল!
পারভেজ পাশে বসে।
– বাবা, ছাদে টবের ব্যবস্থা করে দেবো। ভেবো না। নতুন পরিবেশ। তোমারও ভালো লাগবে। সবকিছু পাবে ঝকঝকে তকতকে। আকাশ পাবে হাত বাড়ালে। পুরো শহর, রাতের আলো ঝলমলে ছবি দেখতে পাবে বাবা।
মনুবাবুর জবান বন্ধ! ভেতর থেকে কে যেন বলে উঠল, ‘আমার আর ভালো লাগা!’
মালবোঝাই ট্রাক প্রায় পৌঁছে গেছে ধানমন্ডি লেকপাড়ে। পাজেরো ছুটছে লেক ভিউ প্লাজার উদ্দেশে।
সবার হাসিখুশি উথলে পড়ছে। বিশেষ করে নাতি মিকি আর রেহনুমার। মৌমিতার আজ সাফল্যের দিন। সাবেরকে উঠতে-বসতে যেভাবে ইনসাল্ট সে করেছে তার তুলনা নেই। নরকবাস ফুরালো!
পারভেজ বাবার দিকে খেয়াল রাখে।
– বাবা ঘুমিয়ে গেলে নাকি? ভালো লাগছে না তোমার? এবার ঈদে খুব মজা হবে।
আচমকা মোমিন সাব অস্পষ্ট উচ্চারণে বলে ওঠেন, ‘আমাদের মায়মুনা মহলে তারাবাতি জ্বলে! … বাগানের ডালে ডালে হীরামন পাখি বিচ্ছেদি গায়। হারু, মুকারম আরো অনেক বন্ধু দরজায় খাড়া। তাদের চোখ এত ভেজা! তাদের চোখ এত লাল! তোমরা কিছু শুনতে পাও না?’
– বাবা, তুমি আরাম করে বসো।
গাড়িভর্তি খানিক নীরবতা। মিরপুর রোড ধরে গাড়ি এগোয়।
মিতু শ্বশুরের দিকে পানির বোতল এগিয়ে দেয়।
– বাবা একটু পানি খান।
তিনি নিশ্চুপ। বেগম খাতুনে জান্নাত একটু ঝিমিয়ে পড়েছেন। সারাদিন কম ধকল যায়নি তাঁর।
পারভেজ এবার ঝুঁকে তাকায় বাবার দিকে। ‘বাবা ও বাবা…’
গাড়িভর্তি ‘বাবা ও বাবা …’
মোমিন সাব আবারো সামান্য কথা বলেন, যেন না বললেই না।
– বাপজান, আপনি বলছেন ভিটামাটি মায়া দিয়া বাইন্ধা রাখতে। বসতভিটার শতেক কথা আনাচকানাচে ঘুমায়। গুপ্তকথা সুলুকসন্ধান কেমনে করি বাপধন আর আমারে রাতবিরাতে জ্বালাতন না করো। আমারে তুমি পাইবা। শত স্মৃতির আতরদানিখান আছে আমার অন্তরের সিন্দুকে। হারায় নাই।
তার সফেদ চুলভরা মাথাটা সিটের সঙ্গে লেপ্টে গেছে।
– ‘বাবা ঘুমালে?’ আবার ডাকে পুত্রধন।
মৌমিতা অতিষ্ঠ।
– ‘বাবার আবার কি হলো? ননসেন্স!’ শব্দটা তার কড়া লিপস্টিকমাখা ঠোঁটের ভেতর চাপা পড়ে যায়।
মৌন পাথর খাতুনে জান্নাত মুখে আঁচল চাপা দিয়ে কাঁদছেন। ফুলে ফুলে। হিক্কা উঠছে।
একটু তফাত ঝলমলে লেক ভিউ বেহায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.