সিলেটি নাগরীলিপি অতীত-বর্তমান

দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জনপদ সিলেট। ওই অঞ্চলের ছাপাছাপির ইতিহাস অভিনব। বৃহৎবঙ্গে (পাক-ভারত বিভক্তিপূর্ব বাংলা) উনিশ শতকের গোড়ায় বাংলালিপির মুদ্রণ চালু হলেও সিলেটে ছিল এর ব্যতিক্রম। ইসলামিয়া প্রেসের আব্দুল করিম ১৮৬০ সালে সিলেটে প্রথম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ছাপাখানাটি। তাঁর প্রতিষ্ঠানের সূচনা করেছিলেন নাগরীলিপিতে রচিত কেতাব হালতুননবী ছেপে। মুন্সী সাদেক আলী (পূর্বনাম গৌরকিশোর সেন, ৩০ বছর বয়সে ধর্মান্তর) এই সিরাতবিষয়ক গ্রন্থটি রচনা করেছিলেন ১৮৫৫ সালে। সাদেক আলী (১৮০১-৬২) হালতুননবী পুথির গৌরচন্দ্রিকায় জানান, রচনার পাঁচ বছর পর এই পুথিটি প্রকাশিত হয়েছিল। নাগরীলিপি গবেষক ড. গোলাম কাদির, মোহাম্মদ সাদিক এই সময়কে অনুমিত বিবেচনায় ১৮৭০ হিসেবে অভিহিত করেছেন। অতীতে প্রমাণিত হয়েছে তথ্যটি সঠিক নয়।

ভাষিক জনগোষ্ঠী বাংলার সমতলে অবস্থান করেও কী কারণে সেখানে বাংলালিপির ছাপাখানা প্রতিষ্ঠিত না হয়ে সিলেটি নাগরীলিপির মুদ্রণখানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল – এর পেছনে রয়েছে এক বিস্তৃত ইতিহাস, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। বিষয়টি এখন পর্যন্ত অনালোচিত। এই প্রবন্ধে বিষয়টির পরিপ্রেক্ষিত, বাস্তবতা এবং এর অভিঘাত প্রসঙ্গে ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।

অনিবার্য এক বাস্তবতায় সিলেট অঞ্চলে চৌদ্দ শতকে উদ্ভাবিত হয়েছিল সিলেটি নাগরীলিপি। বাংলা বর্ণমালাকেই অনুসরণ করে তৈরি এই বর্ণমালা চালু হয় গণমানুষের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে। অন্যদিকে কোনো কোনো গবেষক প্রমাণের চেষ্টা করেছেন যে, সিলেটি নাগরীলিপি ফকিরদের গোপন সাধনাকে গোপন রাখার সাংকেতিক লিপি। এটা একান্ত ফকিরদের মধ্যে ‘কোড লিপি’ হিসেবে চর্চায় ছিল। সিলেটি নাগরীলিপি ফকিরদের ডেরা থেকে গণমানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার দায় তিনি প্রকাশকদের ওপর চাপিয়েছেন।

গবেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, মুনাফালোভী প্রকাশকরাই নাগরীলিপি পুণ্যস্থান থেকে টেনে নামিয়েছেন সাধারণ স্তরে। প্রকাশকদের মুনাফালাভের চেষ্টাকে ব্যাখ্যা করেছেন পুণ্যকে পণ্য করার প্রয়াস হিসেবে। তাঁদের মতে, নাগরীলিপি মুদ্রণ অকল্যাণ ও অবক্ষয় ডেকে এনেছে। আবার কেউ কেউ বলেছেন সিলেটি নাগরীলিপির বই প্রকাশ করে এর প্রকাশকরা ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছিলেন। একটা সময় সিলেটি নাগরীলিপিতে সাহিত্যচর্চার একটি নতুন ও বেগবান ধারা সৃষ্টি হয়েছিল। ফলে এর ব্যাপ্তি ও পরিধি যথেষ্ট সম্প্রসারিত হয়েছিল। বর্তমানে সিলেটি নাগরীলিপির পাণ্ডুলিপির দুষ্প্রাপ্যতার বিষয়টি বিবেচনায় রাখলে তাঁদের ভূমিকা আরো অর্থবহ হয়ে ওঠে।

গণমানুষের প্রয়োজনেই এর উদ্ভাবন। বাংলালিপির মুদ্রণ চালু হওয়ার আগেই নাগরীলিপি মুদ্রণ এর এক প্রমাণক। জনপ্রিয়তা না থাকলে বা বাজার না থাকলে প্রকাশকরা নাগরীলিপির বইপত্র প্রকাশে উদ্বুদ্ধ হতেন না। প্রকাশকদের পুঁজি চ্যারিটি তহবিলের ছিল না। গাঁটের পয়সায় প্রকাশকরা নিশ্চয়ই গোপন চর্চায় সীমিত পরিসরে ব্যবহৃত কোনো লিপির বইপত্র প্রকাশের মতো নির্বুদ্ধিতা দেখাতেন না। তাঁরা যে দূরদর্শী ছিলেন, সেটার প্রমাণ নাগরীলিপি মুদ্রিত হলে বিপুল মানুষ কর্তৃক সাদরে অভ্যর্থনা। নাগরলিপির উদ্বোধনী প্রকাশনা কেতাব হালতুননবীর ১২টি সংস্করণ মুদ্রিত হয়েছিল।

ভাষা বা লিপি কখনোই গোপনীয় বা গুপ্ততা চর্চার জন্য সৃষ্ট হয় না, বরং প্রকাশের অন্তর্গত তাড়না থেকে সৃষ্ট – এই সত্যটা মানতেই হয়।

নাগরীলিপি বাংলা ভাষার বর্ণমালাকে অনুসরণ করে তৈরি। এর বর্ণনাম, উচ্চারণ এবং ব্যবহার বাংলালিপির মতোই। শুধু কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম দেখা যায় নাগরীলিপির বর্ণমালা সংক্ষিপ্ত ও পরিমার্জিত হওয়ার কারণে।

আমাদের মতামত হচ্ছে, সাধারণ মানুষকে শিক্ষিত করে তুলতে সিলেটি নাগরীলিপির প্রবর্তন। এ-বিষয়ে আমি আমার যুক্তিতর্ক বিভিন্ন বইপত্র, জার্নালে উপস্থাপন করেছি। আমার বক্তব্যের সারাৎসার হচ্ছে, কোনো লিপি গণমানুষের প্রয়োজন ছাড়া উদ্ভাবন হয় না। লিপির যদি প্রয়োজন না থাকে এ-কাজে কারো উৎসাহিত হওয়ার কথা নয়। আমি আমার এই বক্তব্যের সপক্ষে নাগরীলিপির মান্যজনকেই মান্যতা দিয়ে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি। নাগরীলিপির আদি গ্রন্থ তালিব হুসনের পুথিকার মরমিকবি গোলাম হুসন, সৈয়দ শাহনূর, মুন্সী জফর আলীসহ আরো অনেকের বক্তব্য গ্রহণ করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি। গণমানুষের কাছে আদৃত হওয়ায় নাগরীলিপির পুথিপুস্তক প্রণেতারা এই লিপির ব্যবহার, চর্চা ও ধারণ করেছিলেন। সে-বিষয়ে গবেষকগণ পরিষ্কার ও সুস্পষ্ট অভিমত জ্ঞাপন করেছেন। নাগরীলিপিকে গণমানুষ গ্রহণ না-করলে আঁতুড়ঘরেই তার মৃত্যু অনিবার্য ছিল। অঙ্কুরেই বিনাশ ঘটত।

বাংলা বর্ণমালার সমান্তরালে সিলেটি নাগরীলিপি প্রবর্তনও যুগান্তকারী, অগ্রসর চিন্তার ফসল। বৃহৎবঙ্গের
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কামরূপ (আসাম) বাংলা ভাষা সৃজনের আঁতুড়ঘর। বর্তমান বাংলার পূর্বতন রূপ বঙ্গ-কামরূপী ভাষা। বঙ্গ-কামরূপীর উদরে ছিল বাংলা ভাষা। এ-কারণে এ-অঞ্চল ছিল ভাষাচিন্তায় সুদূর-অগ্রসর জনভূমি। বাংলাভাষা আন্দোলনেও সেই জাগৃতি ছিল অটুট। বাংলার মানুষের মধ্যে যখন ভাষাচিন্তা দানা বেঁধে উঠতে পারেনি, তখনই সিলেটের মনীষীরা আঁচ করতে পেরেছিলেন আগ্রাসনের থাবা কতটা ভয়াবহ হতে পারে। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার দাবিতে ১৯৪৮ সালে আল ইসলাহ পত্রিকায় (সিলেট থেকে প্রকাশিত) একাধিক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। ভাষাপ্রেমে উজ্জীবিত শিলচরে (শিলচর ও সিলেট আসাম প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত ছিল ১৯৪৭ পর্যন্ত) ১৯৬১ সালের ১৯শে মে ভাষা-আন্দোলন সংঘটিত হয়। সেখানে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন কমলা ভট্টাচার্যসহ ১১ জন। ’৫২ সালে ভাষা-আন্দোলনে ঢাকায় প্রাণ দিয়েছিলেন পাঁচজন। ভাষা-চেতনাস্নাত হওয়ার এই সুযোগটি এসেছে উত্তরাধিকার থেকে।

বৃহৎ কামরূপ অঞ্চলের মানুষ একটি স্বতন্ত্র লিপি চালু করে ছয়শো বছর চর্চা করে প্রতিষ্ঠা করেছেন এক স্বাতন্ত্রিক ভাষা ও সংস্কৃতি চেতনা। বাংলা ভাষামণ্ডলে বাস করেও সিলেটের মানুষের এই মৌলিকত্ব তাদের দিয়েছে এক অনন্য গৌরবের মহিমা।

নাগরীলিপি মুদ্রণের আগে সেটি ছিল হাতে লেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ। নকলনবিশদের হাতে কপি হয়ে পাঠকের হাতে পৌঁছাত। ফলে এর বিস্তার ছিল সীমিত। কিন্তু নাগরীলিপির জনপ্রিয়তা ও এর বইপত্রের চাহিদা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন আব্দুল করিম। তিনি সমাজবীক্ষক ছিলেন। একটা সময়ে প্রতিটি বাড়ির অন্তঃপুরে পৌঁছে গিয়েছিল মুদ্রিত পুস্তক।

আব্দুল করিম ইসলামিয়া প্রেসের (১৮৬০) প্রতিষ্ঠাতা। সিলেটে বাংলালিপির মুদ্রণ শুরু হয় এর বেশ পরে – ১৮৭৬ সালে। শ্রীহট্টের প্রাচীন ইতিহাসবেত্তা মোহনী মোহন দাশগুপ্ত তাঁর শ্রীহট্টের ইতিহাস গ্রন্থে জানান, ‘১৮৭৬ খ্রিষ্টাব্দে শ্রীহট্টে প্রথম মুদ্রাযন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ইদানীং এই জিলাতে ৩টি মুদ্রাযন্ত্র আছে।’

কবি প্যারিচরণ দাশ সিলেটে সংবাদপত্র প্রকাশনার পথিকৃৎ। তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত সাপ্তাহিক শ্রীহট্ট প্রকাশ শ্রীহট্ট থেকে প্রকাশিত প্রথম সংবাদপত্র। তিনি তাঁর পত্রিকাটি মুদ্রণের জন্য একটি ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘শ্রীহট্ট প্রকাশ যন্ত্র’ নামে। প্যারিচরণ দাশ ছিলেন মশহুর কবি। তাঁর কবিতা পদ্য পুস্তক নামে প্রকাশিত হয়েছিল। বৃহৎ সিলেটের ইতিহাসবেত্তা অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধি প্রায় দুই হাজার পৃষ্ঠার শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত নামে দুই খণ্ড গ্রন্থ প্রণয়ন ও প্রকাশ করেন। পূর্বাংশ প্রকাশিত হয় ১৯১০ সালে, উত্তরাংশ ১৯১৭ সালে। পূর্বাংশের সূচনাতেই তিনি সিলেটের সার্বিক পরিচিতির জন্য পদ্যপুস্তকের আশ্রয় নিয়েছেন। সিলেটের প্রাণপ্রকৃতি বহু বাক্সময় প্রকাশে এই কবির পদ্যপুস্তকের দুবার স্মরণ নিয়েছেন অচ্যুতচরণ। কবি প্যারিচরণ লিখেছেন –

শ্রীহট্ট লক্ষ্মীর হাট আনন্দের ধাম

স্বর্গাপেক্ষা প্রিয়তর এ ভূমির নাম।

কবিতার অন্যত্র কবি লিখেছেন –

প্রকৃতির ভাণ্ডারেতে শ্রীহট্টের মাঝে;

কত শোভা মনোলোভা সর্ব্বত্র বিরাজে।

প্রতিভা প্রসূত নয়, প্রকৃত বিষয়,

দেখ না পথিক গিয়ে যদি মনে লয়?

প্যারিচরণের পূর্বে ছাপাখানা প্রতিষ্ঠার কোনো প্রামাণ্য নজির নেই। চলন্তিকায় জামান মাহবুব কুমুদরঞ্জন ভট্টাচার্য্যরে বরাতে শ্রীহট্ট প্রকাশ-সম্পর্কিত মন্তব্যটি উদ্ধৃত করেছেন, ‘প্রথমদিকে পত্রিকাটি কলকাতা থেকে ছাপিয়ে আনা হতো। কালক্রমে তখনকার দিনের অনুন্নত সিলেটে প্যারিচরণ দাস একটি প্রেসও বসিয়েছিলেন।’ (মুদ্রণ যন্ত্র : সেকাল-একাল, ২০২৫) এ থেকে কবি প্যারীচরণ যে বাংলালিপির মুদ্রণখানা প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী – সে-তথ্যটি প্রতিষ্ঠিত হয়। প্যারিচরণের নামটিও কালক্রমে প্যারীচরণ দাশ হিসেবে প্রায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। কিন্তু আকরগ্রন্থ শ্রীহট্টের ইতিবৃত্তে তাঁর নামটি ‘প্যারিচরণ দাশ’ নামেই লিপিবদ্ধ হয়েছে। প্যারিচরণ দাশ এবং অচ্যুতচরণ চৌধুরী বাংলাদেশের এক সীমান্ত জনপদ শাহবাজপুরের লাগোয়া লাতুর বাসিন্দা ছিলেন। দুজনেই বয়সে সমকালীন। তাই সংগত কারণে অচ্যুতচরণ কর্তৃক লিখিত নামের বানানটিকেই এগিয়ে রাখতে হয়।

তথ্য ও তত্ত্বের অনুসন্ধানে গবেষকদের একাংশের যথাযথ গবেষণা মেথোডোলজি অনুসরণ না করায় নাগরীলিপির ইতিহাসের বিভিন্ন স্তরে আব্দুল করিম বিষয়েও রয়েছে নানা বিভ্রান্তি, লোকশ্রুতি। করিমের জন্ম সিলেট শহরের হাওয়াপাড়ায়। ‘মুন্সী’ তাঁর পারিবারিক টাইটেল নয়। তিনি নিজেও এটি তাঁর নামের সঙ্গে ব্যবহার করেননি। সেকালে মুসলমান বিদ্বান লোকদেরকে মুন্সী, মৌলভী ইত্যাদি অভিধায় সম্বোধনের রেওয়াজ ছিল। গবেষকেরা উপযাচক হয়ে করিমের নামের সঙ্গে এই টাইটেলটি যুক্ত করে বহুল প্রচার ও ব্যবহারে একে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছেন। আরো একটি ভুল তথ্য সত্যের সমপর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত যে, তিনি বিলেত থেকে ফিরে এই ছাপাখানাটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আমি ক্ষেত্র-সমীক্ষায় দেখেছি (সাক্ষাৎকার, আব্দুল করিমের প্রপৌত্র আনোয়ার রশীদ : ৬.৫.২০১৫), এ-তথ্যটিও সঠিক নয়, করিম কখনোই বিলেত ভ্রমণ করেননি। গবেষক পদ্মনাথ এই তথ্য পরিবেশন করেছিলেন, তাঁকে অনুসরণ করে অন্যরা এই তথ্যটি ঢালাওভাবে গ্রহণ করেছেন তাঁদের লেখায়। সিলেট শহরের বাসিন্দা ছিলেন আরেক দ্যুতিমান মানুষ, ব্রিটিশ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, আব্দুল করিম (মৌলভী আব্দুল করিম নামেও তাঁর পরিচিতি রয়েছে)। কর্মসূত্রে ও পাণ্ডিত্যে তিনি ছিলেন মহীরুহ। বাংলা ও ইংরেজিতে লেখা তাঁর একাধিক গ্রন্থ সর্বমহলে আদৃত। এখানেই সন্দেহ। নাগরীলিপির আব্দুল করিমের সঙ্গে তাঁকে গুলিয়ে ফেলে থাকতে পারেন গবেষকরা।

এছাড়া আব্দুল করিমের সলিলসমাধির তথ্য পরিবেশন করেছেন পদ্মনাথ ভট্টাচার্য। পদ্মনাথ লিখেছেন, ‘ইনি আরব মিসর ও ইউরোপের নানা দেশে ভ্রমণ করিয়া বহু অভিজ্ঞতা লাভ করিয়াছিলেন এবং স্বদেশে আসিয়া নিজ সমাজের হিতানুষ্ঠানের প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন। দুঃখের বিষয় দৈবাৎ নদীগর্ভে জাহাজ হইতে নিপতিত হইয়া অকালে এই কর্ম্মঠ জীবনের অবসান হইয়াছে।’ (সাহিত্য পরিষদ পত্রিকা, চতুর্থ সংখ্যা, ১৩১৫, পৃ ২৩৬) ক্ষেত্র গবেষণায় এ-তথ্যও যে সর্বৈব ভিত্তিহীন ও অসত্য তা উঠে এসেছে। (সাক্ষাৎকার, আব্দুল করিমের পৌত্র আনোয়ার রশীদ : ৬.৫.২০১৫) ।

আব্দুল করিম নাগরীলিপি মুদ্রণের মাধ্যমে সাড়া ফেলেছিলেন নিস্তরঙ্গ সমাজজীবনে। লোকায়ত কাহিনিনির্ভর পুথির সমাদর অন্দরে-বন্দরে বিস্তার ও বিস্তৃতি লাভে সক্ষম হয়। ধর্মীয় ও সামাজিক কাহিনির পুথিসহ নানাবিধ বিষয়ে বৈচিত্র্যপূর্ণ পুথি প্রকাশিত হতে থাকে। মরমি গান ও সুফি বিষয়ক পুথি প্রকাশিত হয় অনেক। তৈরি হতে থাকে পাঠক চাহিদা। করিম যখন কুলিয়ে উঠতে পারছিলেন না তখন সহযোগী হিসেবে প্রকাশনায় আসে সিলেট শহরের ‘সারদা প্রেস’। কলকাতার জেনারেল প্রিন্টিং ওয়ার্কস ও হামিদিয়া প্রিন্টিং প্রেস।

আব্দুল করিমের ব্যবসার প্রসার দেখে নাগরীলিপি মুদ্রণে আগ্রহী হয়ে ওঠে সারদা প্রেস। সারদা প্রেস কত সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং কবে নাগরীলিপি মুদ্রণে যুক্ত হয়, সে-তথ্য আমাদের হাতে না থাকলেও সারদা প্রেস যে উনিশ শতকের শেষদিকে প্রতিষ্ঠিত সে-বিষয়ে আমাদের সন্দেহ নেই। মুরারিচাঁদ কলেজ গোল্ডেন জুবিলি ভলিয়্যুম এক (১৯৮২-১৯৪২) সংকলনটি মুদ্রণ এর প্রাচীনত্বের প্রমাণক (চলন্তিকা, ২০২৫)।

নাগরীলিপির অন্যতম মুদ্রক ছিলেন জেনারেল প্রিন্টিং ওয়ার্কস। কলকাতার ১৪১ আপার চিৎপুর রোডে গার্ডেনার লেনে ছিল তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। চুনীলাল ভট্টাচার্য ছিলেন এই প্রতিষ্ঠানের মালিক। ১৩৩৫ বঙ্গাব্দের এই প্রেসে মুদ্রিত হয়েছিল শাহ আছদ আলীর সহর চরিত। গ্রন্থের প্রকাশক ছিলেন, ‘শ্রীহট্ট নিবাসী শ্রীযুক্ত মুন্সী আব্দুর রহমান মিয়া’।

কলকাতার শিয়ালদহের হামিদিয়া প্রেসেও নাগরীলিপির পুস্তক মুদ্রিত হয়েছিল।

সুনামগঞ্জ শহরে নাগরীলিপির একটি ছাপাখানা থাকার আভাস পাওয়া যায় বড় জঙ্গনামা সূত্রে। তবে প্রেসের নাম কিংবা মুদ্রকের নামও জানা যায়নি। এছাড়া এই প্রেসে ছাপা কোনো পুথিপুস্তকের দেখাও মেলেনি। জঙ্গনামা রচয়িতা ওয়াহেদ আলী তাঁর পুথির ভণিতায় বলেন –

আর এক কথা শুন মমিন ভাই।

পুথির মালিকের কথা শবারে জানাই ॥

শুনামগনজের বাজারেতে এহার মুকাম।

বহুত ভাল মেজাজ ছমিরুদ্দিন নাম ॥

হাফিজ আমিরুদ্দিন ভাই বড়া নাম আর।

নাগরি পুথির ছাপাখানা আছে উহারার ॥

কী কারণে নাগরীলিপি অবলুপ্ত হলো মোহাম্মদ সাদিক তাঁর ব্যাখ্যা দিয়েছেন তাঁর থিসিসে। তবে তিনি গণশিক্ষার মাধ্যম পরিবর্তন হয়ে বাংলালিপি স্থান নেওয়াকে উপেক্ষা করেছেন।

পির-ফকিরদের মধ্যে একান্ত লিপি যদি নাগরীলিপি হয়েই থাকে তাহলে সেই গোষ্ঠী কি উধাও হয়েছেন, না তাঁদের চর্চায় গুপ্ততাকে বিসর্জন দিয়েছেন? মোহাম্মদ সাদিক এই বিষয়ে চুপ থেকেছেন। প্রকৃতপক্ষে, নাগরীলিপি ছিল সাধারণ মানুষের পাঠ ও পাঠকৃতির বাহক ও প্রকাশক। ভাষালিপির আশ্রয়ের অবলম্বনের মাধ্যম ছিল এই লিপি। পিছিয়েপড়া অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর অভ্যর্থনা পেয়েছিল নিজেদের গরজে। তাদের সমর্থনে মূলধারার বাংলালিপির সঙ্গে একপ্রকার প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়ে টিকে ছিল কয়েক শতাব্দী। সাধারণ মানুষের সমর্থনেই এই লিপির বিকাশ। 

আমরা মনে করি, সিলেটি নাগরীলিপি বিলোপের কারণ এ-অঞ্চলে মানুষের গণশিক্ষার অগ্রগতি। গণশিক্ষায় রাষ্ট্রপোষকতায় এগিয়ে থাকা বাংলালিপি অনানুষ্ঠানিক নাগরীলিপিকে পরাভূত করে ফেলে। ভাষা ও লিপি মানুষ যে শুধু ভালোবাসা বা আবেগে গ্রহণ করে না, এর সঙ্গে প্রয়োজনের সম্পর্ক রয়েছে – এটাও বিবেচ্য হওয়া দরকার।

সিলেটি নাগরীলিপির সমাদর কমতে শুরু করে বিশ শতাব্দের মধ্যভাগে। বাংলালিপিতে পড়ালেখা করলে সনদপ্রাপ্তি, চাকরি এবং চাকচিক্যময় জীবনের হাতছানিতে কাবু হয়ে পড়েন ওই সময়ের সিলেটের মানুষ। বাংলালিপিতে পড়ালেখা অগ্রাধিকারের অংশ হয়ে পড়ে। যে-নারীরা পড়ালেখার সুযোগ না পেয়ে বিকল্প হিসেবে সহজে শিখে ফেলতেন, নাগরীলিপি তাদের কাছেও সমাদর হারাল। ব্যবসা হারিয়ে নাগরীলিপি মুদ্রকেরা একে একে বন্ধ করে ফেললেন ঝাঁপি। কেবল ইসলামিয়া প্রেস ঐতিহ্যের ঘানি টানছিলেন। পারলেন ১৯৭১ সাল অবধি। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পাকবাহিনী বন্দরবাজারের ইসলামিয়া প্রেসটি বোমা মেরে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়। দেশ স্বাধীন হলে ইসলামিয়া প্রেস আর ফিরল না নাগরীলিপি মুদ্রণে। শুরু হয় নাগরীলিপির অগস্ত্যযাত্রা।

এই অন্তিম যাত্রা দেখে বেদনার্ত হয়েছিলেন অধ্যাপক এরহাসুজ্জামান (নাগরী স্যার) ও আমীনূর রশীদ চৌধূরী। নাগরী স্যারের উদ্যমে আমীনূর রশীদ একটি বন্দোবস্তে এসেছিলেন। তাঁর লিপিকা প্রেসে নাগরীলিপি মুদ্রণের আয়োজন করেছিলেন। এই প্রেস থেকে প্রকাশিত হতো সাপ্তাহিক যুগভেরী ও ইস্টার্ন হ্যারল্ড। পত্রিকা দুটি সম্পাদনা করতেন আমীনূর রশীদ চৌধূরী। সিলেট শহরের আম্বরখানায় প্রেসটি অবস্থিত ছিল। কিন্তু কোনো বইপত্র প্রকাশের আগেই উদ্যোগটির যবনিকাপাত ঘটে। তবে, রশীদ চৌধূরী নাগরীলিপির বড় সমঝদার এবং সংগ্রাহক ছিলেন।

বিশ শতকের আশির দশকে গোলাপগঞ্জ নিবাসী (ব্রিটেন অভিবাসী) মো. আব্দুল জলিল চৌধুরী কম্পিউটার ফ্রন্ট তৈরি করে তাঁর কিছু নিজের প্রকাশনা করেছিলেন। তাঁর ব্যবহৃত এই ফন্ট তৈরি করেছিলেন খায়রুল হক চৌধুরী। নাগরীলিপির প্রথম কম্পিউটার ফন্টের ডিজাইনার সু লয়েড (ব্রিটিশ, নেটিভ), তাঁর ফ্রন্টের নাম ‘সুরমা’। উৎস প্রকাশনের ‘রাশি’ ফন্টটির ডিজাইন করেছেন প্রকৌশলী মো. আব্দুল মান্নান। এই ফন্টটিকে প্রামাণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন ড. গোলাম কাদির এবং ড. মোহাম্মদ সাদিক। এই ফন্টের ডিজাইনকালে তাঁদের অভিমত গ্রহণ করা হয়। নাগরীলিপির ফন্ট পর্যবেক্ষণ করে আমাদের সিদ্ধান্ত ছিল নাগরীলিপির ফন্ট খানিকটা বাঁকা ছাঁচের। ইটালিক ফন্টের মতো। এই দুই গবেষক আমাদের সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করেছিলেন।

সিলেটি নাগরীলিপি মুদ্রণে ২০০৯ সালে যুক্ত হয় ঢাকার উৎস প্রকাশন। আব্দুল করিম ছিলেন লেটার প্রেস যুগের প্রকাশক। মোস্তফা সেলিম কম্পিউটার যুগের প্রকাশক। সেকালের মুদ্রাক্ষরিকদের হাতে ছিল সিসার তৈরি হরফ, একালে রয়েছে কম্পিউটারের কি-বোর্ড। দুই শতকের দুই প্রকাশকের হাতে নাগরীলিপি পেয়েছে মুদ্রণভাষা, অস্তিত্ব। আব্দুল করিম ছিলেন নাগরীলিপির পথিকৃৎ প্রকাশক এবং বিলোপের পর উৎস প্রকাশ বিলুপ্তপ্রায় বর্ণটিকে দিয়েছে নবজীবন। ঘটেছে এর রেনেসাঁস বা পুনর্জারণ।

২০০৯ সালে সিলেটি নাগরীলিপির প্রকাশনায় নিবিষ্ট হয় ঢাকার উৎস প্রকাশন। এই প্রতিষ্ঠানের দেড় যুগের প্রচেষ্টায় প্রকাশিত হয়েছে ৪০টির বেশি গ্রন্থ। নাগরীলিপি বিষয়ে গবেষণা ও প্রকাশনা, সাংগঠনিক কাজের মাধ্যমে সিলেটি নাগরীলিপি দেশে-বিদেশে সম্প্রসারিত হয়েছে। বর্তমানে সিলেটি নাগরীলিপি শুধু সিলেটবৃত্তে পরিচিত নয়, আমেরিকার শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়সহ বহু বিদেশি প্রতিষ্ঠানের লাইব্রেরিতে রয়েছে নাগরীলিপির বইপত্র। বাংলাদেশের কয়েক হাজার প্রতিষ্ঠানে নাগরীলিপির বইপত্র সযত্নে লালিত হচ্ছে। ইসলামিয়া প্রেস (১৮৬০) সিলেটি নাগরীলিপির মুদ্রণের মাধ্যমে লোকজীবনে যে-তরঙ্গ সৃষ্টি করেছিল প্রায় শতবর্ষ পরে তা স্তিমিত হয়ে পড়ে। উৎস প্রকাশন (২০০৯) নাগরীলিপির নবজাগরণে নেমে এর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিচিতি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। আব্দুল করিম থেকে বর্তমান পরম্পরায় সিলেটি নাগরীলিপি প্রকাশিত হয়ে চলেছে কালে-কালে।

নাগরীলিপির মুদ্রণসৌষ্ঠব না ঘটলে তা অঙ্কুরেই হারিয়ে বা লুপ্ত হয়ে যেত। সৈয়দ শাহনূর কিংবা শীতালং ফকিরের সঙ্গে কোনোকালেই সংযোগ হতো না আমাদের। তাঁদের চেয়েও দূরবর্তী কালের মানুষ বাংলা মরমি গানের আদি পুরুষ গোলাম হুসনের (১৬৯৪) সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটত না। সিলেট যে মরমিবাদের আঁতুড়ঘর – সেই পরিচয় হারিয়ে যেত। বাংলার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষের কয়েক শতাব্দীর চিন্তা ও ভাবদর্শন সম্পর্কে জানারই সুযোগ পাওয়া যেত না। সিলেটের সমাজভাষাকে ভর করে নাগরীলিপির সাহিত্য প্রবাহিত। সিলেট অঞ্চলের লোকায়ত সংস্কৃতি, জীবনচর্চা, জীবনবোধ, ধর্ম-চর্চা এবং সৃষ্টিশীলতার প্রকাশ ঘটেছে নাগরীলিপিতে। এই নাগরীলিপির সৌজন্যে সিলেটি সমাজভাষার লিখিত রূপটি ধরা আছে কয়েক শতাব্দী থেকে। এই কৃতিত্বের অংশত ভাগ রয়েছে নাগরীলিপির  প্রকাশক সমাজের।

তথ্যসূত্র ও সহায়ক গ্রন্থ

১       জ্যোতির্ময় সিংহ মজুমদার, চলন্তিকা, উপেন্দ্র-বীণাপাণি স্মৃতি পরিষদ, ফেব্রুয়ারি ২০২৫।

২.      দেওয়ান গোলাম মোর্তাজা, বর্ণমালার উদ্ভব বিকাশ ও লিপি সভ্যতার ইতিবৃত্ত, বাংলা একাডেমি, ২০০৩।

৩.      ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত, মাওলা ব্রাদার্স, ২০১২।

৫.      ফজলে রাব্বি, ছাপাখানার ইতিকথা, জুন ১৯৭৭, বাংলা একাডেমি।

৬.      সৈয়দ মুর্তাজা আলী, প্রবন্ধ বিচিত্রা, বাংলা একাডেমি, ১৯৬৭।

৭.      মোহাম্মদ সাদিক, সিলেটি নাগরীলিপি : ফকিরি ধারার ফসল, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ২০০৮।

৮.      মোস্তফা সেলিম, মুন্সী সাদেক আলীর কেতাব হালতুননবী, উৎস প্রকাশন, ২০২১।

৯.      এসএম গোলাম কাদির, সিলেটি নাগরীলিপি : ভাষা ও সাহিত্য, বাংলা একাডেমি, ১৯৯৯।

১০.     চৌধুরী গোলাম আকবর সাহিত্যভূষণ, সিলেটি নাগরী পরিচয়, জালালাবাদ লোকসাহিত্য পরিষদ, সিলেট, প্রথম প্রকাশ ১৯৭৮।

১১.     মো. আবদুল মান্নান ও মোস্তফা সেলিম, নাগরী গ্রন্থসম্ভার, উৎস প্রকাশন, ২০১৪।

১২.     ফাতেমা চৌধুরী, সিলেটি নাগরীলিপি সমীক্ষা, উৎস প্রকাশন, ২০১৫।

১৩.     ফজলুল রহমান, সিলেট পরিক্রমা, প্রকাশক মোহাম্মদ আব্দুল জলিল, ২০০১।

১৪.     অণিমা মুখোপাধ্যায়, যখন ছাপা বই ছিল না, গাঙচিল, ২০১৭।

১৫.     দেওয়ান নুরুল আনোয়ার হোসেন চৌধুরী, আমাদের সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা : উত্তরাধিকার ও মুসলমানী নাগরী, প্রকাশক অ্যাডভোকেট মো. মমিনুল হক, ২০০১।

১৬.     অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধি, শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত পূর্বাংশ, উৎস প্রকাশন, ২০১৭।

১৭.     মোস্তফা সেলিম, সিলেটি নাগরীলিপি শিক্ষা, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট, ২০২৩।

১৮.     মোস্তফা সেলিম, গোলাম হুসনের গান, উৎস প্রকাশন, ২০২১।

১৯.     মোস্তফা সেলিম, সিলেটি নাগরীলিপি সাহিত্যের ইতিবৃত্ত, উৎস প্রকাশন, ২০২৪।

২০.     মোস্তফা সেলিম, সিলেটি নাগরীলিপি সাহিত্যে প্রণয়োপাখ্যান, অনিন্দ্য প্রকাশ, ২০২১।

২১.     মোহাম্মদ আব্দুল খালিক, ফসল, অষ্টম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০২৩।

২২.     মোহন দাশগুপ্ত, শ্রীহট্টের ইতিহাস, উৎস প্রকাশন, প্রকাশকাল ২০০৪, পৃ ১৯।