(১৯শে আগস্ট, ১৯৩৫ – ৩০শে জানুয়ারি, ১৯৭২)
জহির রায়হান কীর্তিমান কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রকার। এই দুটি পরিচয় ছাড়াও গীতিকার, সম্পাদক, প্রযোজক, শিক্ষকসহ আরো অনেক পরিচয়ে পরিচিত তিনি। তবে দুঃখের বিষয়, স্বল্পকালীন তাঁর জীবন। এই অল্প সময়েই তিনি অসামান্য কিছু গল্প ও উপন্যাস রচনা করেছেন। পাশাপাশি করেছেন চলচ্চিত্র প্রযোজনা ও পরিচালনা। প্রগতিশীল রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। জহির রায়হান তাঁর জীবনের সামান্য সময়ে অনেক বেশি সৃষ্টি করে গেছেন। শুধু সৃষ্টি বললে ভুল হবে, অসামান্য সৃষ্টি।
জহির রায়হানের প্রকৃত নাম মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ। তাঁর জন্ম ১৯৩৫ সালের ১৯শে আগস্ট ফেনী জেলার মজুপুর গ্রামে। জহির রায়হান তাঁর সাহিত্যিক নাম। শৈশব কেটেছে কলকাতায়। দেশবিভাগের পর ঢাকায় আসেন। চলচ্চিত্রের সঙ্গে তাঁর যোগসূত্র ছাত্রাবস্থায়। বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলনে প্রথম যে দশজন ছাত্র ব্যারিকেড ভেঙেছিলেন, তিনি তাঁদের একজন।
বাঙালির সংগ্রামমুখর জীবন, সমাজবাস্তবতা, মানবিকবোধ, রাজনৈতিক চেতনা, আন্দোলন, আবহমান বাংলার জনজীবন, মধ্যবিত্তের আশা-আকাক্সক্ষা, বেদনা, ভালোবাসা, বিরহ, প্রেম, মনস্তাত্ত্বিক টানাপড়েন পরম মমতায় স্থান পেয়েছে তাঁর সাহিত্যে।
এদেশের মুক্তিসংগ্রামে জহির রায়হানের ভূমিকা অসামান্য। তিনি স্টপ জেনোসাইড নির্মাণের মাধ্যমে সারা বিশ্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠনে ভূমিকা রেখেছেন। যুদ্ধ শেষে আলবদর, আলশামস বাহিনীর হাতে ধৃত অগ্রজ শহীদুল্লা কায়সারকে খুঁজতে গিয়ে ১৯৭২ সালের ৩০শে জানুয়ারি নিখোঁজ হন তিনি। এরপর তাঁর আর সন্ধান মেলেনি।
জহির রায়হানের উল্লেখযোগ্য গল্পের মধ্যে ‘বাঁধ’, ‘অপরাধ’, ‘একুশের গল্প’, ‘মহামৃত্যু’, ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ ইত্যাদি এবং উপন্যাসের মধ্যে আরেক ফাগুন, হাজার বছর ধরে, শেষ বিকেলের মেয়ে, আর কতদিন, বরফ গলা নদী, কয়েকটি মৃত্যু বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর কিছু কিছু গল্প-উপন্যাস বিপুলভাবে আলোচিত, আবার কিছু গল্প সেভাবে আলোচনায় আসেনি। এ-লেখায় চেষ্টা করব তাঁর আলোচিত গল্পের সঙ্গে স্বল্প আলোচিত কয়েকটি গল্প সম্পর্কে আলোকপাত করতে।
‘বাঁধ’ জহির রায়হানের গল্পসমগ্রের একটি গল্প। এই গল্পে সমাজের দারিদ্র্যপীড়িত, প্রকৃতির কাছে অসহায় মানুষের চিত্র তিনি তুলে ধরেছেন। গল্পটি আবর্তিত হয়েছে একটি বাঁধকে কেন্দ্র করে। গাঁয়ের মানুষ ভীষণ বিপদে পড়েছে। প্রতি বর্ষায় বাঁধ ভেঙে তাদের ফসল তলিয়ে যাচ্ছে। এবারো একই আশঙ্কায় সবাই আতঙ্কিত। কীভাবে বাঁধের ভাঙন ঠেকিয়ে ফসল রক্ষা করা যায় সেই চিন্তায় অস্থির। সবাই একমত হলেন, গফরগাঁও থেকে পির সাহেবকে আনতে হবে। তিনিই পারবেন তাঁর অলৌকিক ক্ষমতা দিয়ে ফসল বাঁচাতে। পির সাহেবকে আনার জন্য চাঁদা তোলা হচ্ছে। সবাই চাঁদা দিচ্ছে। বেঁকে বসল মতি মাস্টার আর কলেজপড়ুয়া রশিদ। গ্রামের মানুষ ক্ষিপ্ত তাদের ওপর। পির সাহেব যেদিন তসরিফ রাখলেন সেদিন বিকেল থেকে শুরু হলো অঝোরধারায় বৃষ্টি। পির দোয়া-দরুদ পড়েন। সারা গ্রাম তাঁর সঙ্গে মসজিদে। এদিকে মতি মাস্টার আর রশিদ নিজেদের মতো করে একটা দল গড়েছে। তারা সারা রাত কোদাল চালালো। একসময় তারা বাঁধ রক্ষা করতে সমর্থ হলো। সকালের স্নিগ্ধ আলোয় সবাই দেখল ফসল ডোবেনি, বাঁধ ভাঙেনি। সবাই পির সাহেবের মহিমাকীর্তন করতে লাগল, তাঁর অলৌকিকত্বের বয়ান শতমুখে উচ্চারিত হলো। পির সাহেব হাসলেন, আপেলরঙা হাসি। ঘি, মাখন খাওয়া দেহে এমন হাসিই হয়।
গল্পটি লেখকের গভীর সমাজভাবনার পরিচয় দেয়। এ-গল্পে মানুষকে ঠকানো আর মানুষের অন্ধবিশ্বাসকে পুঁজি করে তাদের বিপথে চালিত করার চিত্র ফুটে উঠেছে। পাশাপাশি ফুটে উঠেছে কতিপয় অন্ধত্ব আর সংস্কারমুক্ত প্রগতিশীল মানুষের কথা, যারা যুক্তিবাদী, বাস্তবের আলোতে যারা পথ চলেন। জহির রায়হান যে-সময় এ-গল্প লিখেছেন সে-সময়ে এমন একটা গল্প লেখার সাহস অনেকেরই ছিল না। জহির রায়হানের ছিল।
দ্বিতীয় গল্পটির নাম ‘অপরাধ’। এ-গল্পটিও কম আলোচিত। এ-গল্পও পিরতন্ত্রের বিরুদ্ধে। আশি বছর বয়সে পলাশপুরের পির সাহেব চৌদ্দ বছরের সালেহাকে চতুর্থ স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন। সালেহার পরিবারের সবাই খুশি, সালেহার জান্নাত নিশ্চিত। কেউ একবারও চিন্তা করেনি, এই মেয়েটি কী করে আশি বছরের একজন বৃদ্ধের সঙ্গে জীবন কাটাবে। আপত্তি ছিল সালেহার মায়ের। তাঁর কথা কেউ আমলে নেয়নি। পিরের বাড়িতে চার বছর কেটে গেছে সালেহার। একখানা ঘর আর ধোঁয়ায় ভরা রান্নাঘরেই তার জীবন আবদ্ধ। জানালার মোটা পর্দা সরানোর অনুমতি নেই। জোরে কথা বলা, জোরে হাসা বারণ। ভাতও খেতে হয় মেপে মেপে। পির বলেন, ‘বেশি খেলে হাশরে হিসাব দিতে হবে।’ অসহ্য হয়ে উঠেছে সালেহার জীবন। এক রাতে সে সমস্ত জীবনীশক্তি একত্রিত করে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে থাকে। সকালে বাপের বাড়ি পৌঁছামাত্র প্রচণ্ড মারধর করে বাপ। মাকেও এভাবেই মারতে মারতে মেরে ফেলেছে। বিকেলে পিরের বাড়ি থেকে লোক আসে। পির সাহেব শাস্তি জারি করেন, ‘একশ কোড়া।’ সালেহার বাপ পিরের কাছে অনুনয় করেন, একশ কোড়া মেয়ের বদলে তাকে মারতে। কিন্তু সমস্ত আলোচনা আচমকা থেমে যায় সালেহার ছোটভাই সামছুলের কথায়। সামছুল উপস্থিত জনতার মুখের ওপর যেন তীর ছুড়ে দিয়ে বলে, ‘সকাল থেকে রক্তবমি করতে করতে সালেহা মারা গেছে।’ সবাই বলে, ‘এটা তো হবেই, পিরের সাথে বেইমানি।’ এ-গল্পে কতিপয় পিরের অনৈতিক কাজ, একের পর এক বিয়ে করা, মেয়েদের প্রতি অমানবিক আচরণ, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, তাদের শ্বাসরুদ্ধকর জীবনের চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। গ্রামের মানুষ অন্ধবিশ্বাসে পিরদের হাতে কন্যাদের বলি দেন। একই সঙ্গে যত পাষাণই হন না কেন মেয়ের জন্য পিতার অন্তর কাঁদে – সে-প্রমাণও এ-গল্পে রেখেছেন লেখক। গল্প দুটি তাঁর প্রবল সমাজভাবনার পরিচয়বাহী।
জহির রায়হানের অতি আলোচিত গল্প ‘পোস্টার’। এটিকে সমাজভাবনার গল্পও বলা যায়, রাজনৈতিক গল্পও বলা যায়। সমাজের মূলে যে-মানুষ সে-মানুষকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয় রাজনীতি।
আমজাদ সাহেব অনেক কষ্টে বাসা চুনকাম করিয়েছেন। দেয়ালে লাগিয়ে দিয়েছেন, ‘বিজ্ঞাপন লাগাবেন না।’ কিন্তু সকালেই দেখেন দেয়ালে লাল-কালো হরফে লেখা ‘সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক।’ মাথায় রক্ত চড়ে যায় তার। ছেলে আনুকে কঠোর নির্দেশ দিলেন সারা দিন বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে। কেউ যেন পোস্টার লাগাতে না পারে। বাড়িতে ঢোকামাত্র বউয়ের গজগজানি শুনলেন। ‘সারাজীবন খাটিয়ে মারল। একটা চাকরানি জীবনে রাখেনি। একটা ভালো কাপড় কিনে দেয়নি। নেংটি পরিয়ে রেখেছে।’ মেজাজ মাথায় উঠল আমজাদ সাহেবের। জোর ধমক দিলেন। ‘না থামলে গলা টিপে দেব।’ আমজাদ সাহেব রওনা দিলেন অফিসের দিকে। পেছন থেকে মেয়ে টুনি ডেকে বলল, ‘মা ভাত খেয়ে যেতে বলছে।’ তিনি কর্ণপাত করলেন না। কয়েক পা এগিয়ে পেছন ফিরতে দেখলেন আবার পোস্টার ‘বাঁচার মতো মজুরি চাই।’ ছেলেকে বললেন, ‘একটা বড় বাঁশ এনে গুঁতিয়ে পোস্টার দুটো ফেলে দে। এখানে ঠায় দাঁড়িয়ে থাক।’ পাশের বাসার আফজাল সাহেব বললেন, ‘সকালবেলা চিৎকার করছেন কেন?’ আমজাদ সাহেব পোস্টারের ঘটনা বললে তিনি ছেলেগুলোর প্রশংসা করে বললেন, ‘তারিফ করতে হয় ছেলেগুলোর। যা করার ওরাই তো করছে।’ আমজাদ সাহেব বললেন, ‘ও তা মন্ত্রীরা বুঝি কিছু করছে না?’ আফজাল বললেন, ‘করছে, টি-পার্টি, ডিনার পার্টি, নিউইয়র্ক যাত্রা।’ আমদাজ সাহেব হাঁটা দিলেন। সময়মতো অফিসে পৌঁছাতে না পারলে বড় সাহেব নির্ঘাৎ পাঁচ টাকা জরিমানা করবেন। বারান্দায় বড় সাহেবের সামনেই পড়লেন। তিনি বললেন, ‘আমজাদ সাহেব আজও পনের মিনিট লেট।’ কিছুক্ষণ পর ক্যাশিয়ার হুরমত আলি মৃদুস্বরে বলল, ‘অফিসে নাকি ছাঁটাই হবে।’ মুহূর্তে কথাটা ছড়িয়ে গেল। সবার হাত শ্লথ হলো, একসময় থেমে গেল। বিকেলের আগেই নোটিশ বোর্ডে টানিয়ে দেওয়া হলো ছাঁটাই হওয়া নামগুলো। তিনটে নামের নিচে নিজের নামটা দেখে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন আমজাদ সাহেব।
কিছুক্ষণ পর হাঁটতে হাঁটতে পাশের পার্কে গিয়ে বসলেন। সেখানে দেখা হলো বন্ধু আবিদের সঙ্গে। ছাঁটাই হয়েছে সেও।
আমজাদ সাহেব বাসায় ফিরছেন। নিঃস্ব সর্বহারার মতো অবস্থা তার। হঠাৎ চোখে পড়ল ময়লা পায়জামা, ছেঁড়া শার্ট পরা কুড়ি-বাইশ বছরের একটা ছেলে পোস্টার লাগিয়ে নেমে আসছে। আমজাদ ছেলেটাকে ধরতে গেলেন। হঠাৎ তার চোখ গেল দেয়ালে। সেখানে পুরনো খবরের কাগজের ওপর লাল কালিতে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা, ‘ছাঁটাই করা চলবে না।’
গল্প এখানেই শেষ। এ-গল্পে স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী সময়ের অফিস-আদালতের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। যখন অকারণে যখন-তখন বাঙালিদের চাকরি থেকে ছাঁটাই করা হতো, কথায় কথায় জরিমানা করা হতো। আমজাদ সাহেবের মতো সরকারভক্ত একজন মানুষের নিজের ওপর যখন ছাঁটাইয়ের খড়্গ নেমে এলো তখন তাঁর এতদিন ধরে লালিত সকল বিশ্বাস ভস্মীভূত হয়ে গেল। আমজাদ, তার অফিসের অনেকে এবং একই দিনে আবিদের ছাঁটাই গোটা দেশের চিত্র তার চোখের সামনে তুলে ধরল। দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে গেল পুরো দেশের বাঙালি চাকরিজীবীদের করুণ অবস্থা। তিনি বুঝতে পারলেন, যে-আন্দোলন হচ্ছে তা ন্যায্য, তাদের জন্যই। ‘পোস্টার’ গল্পের এটি একটি উজ্জ্বল দিক। এ-গল্পের আর একটি দিক নারীর ওপর পেষণ নির্যাতন। আমজাদ সাহেব কাজের লোক রাখেন না, স্ত্রীকে মানবেতরভাবে রাখেন তা নিয়ে তার মনে কোনো গ্লানিবোধ নেই। অন্যদিকে আবার সেই নারী গালমন্দ করার পরও তাকে খেতে ডাকে। এখানে নারীর মমত্ব প্রকাশ পেয়েছে। অন্যদিকে আফজাল সাহেবের দেশপ্রেমের মাধ্যমে গোটা দেশের মানুষের সে-সময়ের মনোভাব পরিস্ফুট। জহির রায়হানের গল্প ‘অপরাধ’ এবং ‘পোস্টার’-এ নারীদের যে-চিত্র আমরা পাই, সেটাই সেকালের নারীদের সামাজিক চিত্র।
জহির রায়হানের গল্প-উপন্যাসের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে একুশে। একুশে নিয়ে তাঁর মতো এত অধিকসংখ্যক সাড়াজাগানো গল্প বোধকরি আর কেউ লেখেননি। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে খুব বেশি তিনি লিখতে পারেননি। সময় পাননি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই তিনি শহিদ হন। বেঁচে থাকলে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে ‘সময়ের প্রয়োজনে’-এর মতো আরো কিছু অসাধারণ গল্প আমরা পেতাম – এ-বিষয়ে সন্দেহ নেই।
‘একুশের গল্প’ ভাষা-আন্দোলনের পটভূমিতে লেখা জহির রায়হানের সর্বাধিক আলোচিত গল্পের মধ্যে একটি। গল্পের মূল চরিত্র তপু। সে একজন ছাত্র। মা ও স্ত্রী রেনুকে নিয়ে তার সুখের সংসার। সে ভাষা-আন্দোলনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একদিন সে মিছিলে ছিল। মিছিলে গুলি হয়। তপুর কপালে গুলি লাগে। তার মৃতদেহ পাওয়া যায় না। চার বছর পরের ঘটনা। তপুর বন্ধু রাহাত ও গল্পের কথক (আমি) মেডিক্যালে পড়ে। একদিন তারা একটা কঙ্কাল পায়। তারা লক্ষ করে কঙ্কালটির কপালে ফুটো। পরীক্ষা করে দেখে কঙ্কালের একটা পা ছোট। তপুর কপালে গুলি লেগেছিল। তার এক পা ছোট ছিল। তারা নিশ্চিত হয়, এ-কঙ্কাল তপুর। তপুর মায়ের খোঁজ করে তারা জানতে পারে, তিনি মারা গেছেন এবং রেনু অন্যত্র বিয়ে করেছে। তারা মুষড়ে পড়ে। চার বছর পর তপুকে ফিরে পেয়ে তারা আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠে। গল্পটি শেষ হয় তপুুর স্মৃতিতর্পণের মধ্য দিয়ে। এ-গল্পে তপুর সংগ্রাম, তার দেশপ্রেম তীব্রভাবে উপস্থিত। তার স্ত্রী রেনুর অন্যত্র বিয়ে করা বাস্তব। গল্পের একটি নান্দনিক দিক তপুর প্রতি বন্ধুদের গভীর ভালোবাসা। চার বছরে তারা ভুলে যেতে পারত তপুর কোথায় গুলি লেগেছিল, তার কোন পা ছোট ছিল। ভোলেনি। গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় বন্ধুকে মনে রেখেছে। ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার প্রকাশ ঘটেছে ভাষা-আন্দোলনের প্রতিও।
ভাষা-আন্দোলন নিয়ে অসাধারণ গল্প ‘মহামৃত্যু’। মৃত্যু যে কত মহান হতে পারে এই গল্পটি সে-কথাই বলেছে। গল্প শুরু হয়েছে একটা গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ এক বাড়ির আঙিনায় নিয়ে আসা হলে। গায়ের জামাটা রক্তে ভেজা। দেহটাকে কীভাবে সৎকার করবে সে-চিন্তা সবার। ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই সাধ্যমতো টাকা দিতে লাগল। কেউ একজন বলল, ‘এত টাকা দিয়ে কী হবে?’ ‘ওর জন্য ভালো একখানা কাপড় আনো। দেখো মিহি হয় যেন।’ মৃত মানুষের মিহি আর খসখসেতে কী আসে-যায় – এ-কথা কেউ একবারও ভাবল না। একসময় জানা গেল, ছেলেটা তাদের চেনা, নুরুর ছেলে শহীদ। এ-বাড়িতেই থাকত। ছেলেটা এ-বাড়ির – জানাজানি হওয়ার পর মমতা আরো বাড়ল। কিন্তু কীভাবে যাবে ওরা। বড় রাস্তায় ট্রাকবোঝাই পুলিশ! হোক পুলিশ। যেতেই হবে। কেউ একজন ওর রক্তমাখা জামাটাকে বাঁশের মাথায় ঝুলিয়ে পতাকা বানালো। এ-পতাকা শবযাত্রার পুরোভাগে বয়ে নেবে দুই শিশুকন্যা। খাটিয়া সবাই কাঁধে নিতে চায়। শেষ পর্যন্ত স্থির হলো কেউ আধাঘণ্টার বেশি কাঁধে রাখতে পারবে না। এই পুণ্য কাজে সবাইকে অংশ নিতে দিতে হবে। শবমিছিল রওনা হলো। দুই পাশের বাড়ির বারান্দা, ছাদ থেকে মেয়েরা, গৃহিণীরা ফুলের পাপড়ি ছিটাতে লাগল। একসময় ফুলের নিচে চাপা পড়ে গেল শহীদ। চলতে চলতে সগীর আলি বলল, ‘আমাদের ভাষাকে বাঁচানোর জন্য প্রাণ দিয়েছে ও। বড় হিংসে হচ্ছে ফজলুরে, আমি কেন ওর মতো মরতে পারলাম না।’
এ-গল্প পড়লে পাঠকের চোখের কোণে পানি না জমে, হাত মুষ্টিবদ্ধ না হয়ে উপায় নেই। সাবলীল ভাষায় ঝরঝরে বর্ণনায় অল্প কথায় লেখক এক অসাধারণ মহামৃত্যু বর্ণনা করেছেন। মৃত্যু সবার জীবনে আসবে, অবধারিত।
সে-মৃত্যু মামুলি। কিন্তু মহৎ কাজের জন্য যে-মৃত্যু সেটাই মহামৃত্যু।
জহির রায়হানের আর একটি বিখ্যাত গল্প ‘সূর্যগ্রহণ’। এটি তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশিত একমাত্র গল্পগ্রন্থ সূর্যগ্রহণ-এ অন্তর্ভুক্ত। সেটি ১৯৫৫ সালে প্রকাশিত হয়।
গল্পটি আনোয়ার সাহেবের জবানীতে তাঁর ভাষাশহিদ বন্ধু তসলিমকে নিয়ে স্মৃতিচারণ। আনোয়ার সাহেব অফিস থেকে ফিরেছেন। আধপোড়া বিড়িতে আগুন ধরিয়ে ক্লান্তদৃষ্টিতে বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। একটু পরেই টিউশনির টাকা আনতে যাবেন। এমন সময় এলো হাসিনার চিঠি। সেই অতিপরিচিত সম্বোধন। একই আকুতি। ‘এক বছরের মধ্যে একটিবার আসোনি তুমি। কেন আসোনি? আমি কি কোন অপরাধ করেছি? অপরাধ করলে তো মাফ করে দিতে পারো।’ ইত্যাদি। চিঠি পড়তে পড়তে থেমে বাক্স খুলে পুরনো চিঠিগুলো বের করলেন আনোয়ার। পড়তে শুরু করলেন, ‘আচ্ছা আমাকে না হয় দেখতে ইচ্ছে করে না তোমার, মানুকেও কি দেখতে ইচ্ছে করে না? একবছরের মধ্যে একবারও দেখলে না। অথচ কী আশ্চর্য ও প্রথম তোমাকেই ডাকল।’ আনোয়ার সাহেবের মানুকে দেখতে ইচ্ছে করে। সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মনে পড়ে তসলিমের কথা। সুন্দর গোলগাল মুখ। তসলিম কবিতা লিখত। একুশে ফেব্রুয়ারি অফিস থেকে ফিরে এসে তসলিম ছিল খুব উত্তেজিত। কী হয়েছে জানতে চাইলে উত্তেজনায় ফেটে পড়ে বলেছিল, ‘হাইকোর্টের সামনে গুলি হয়েছে। ছেলেদের মেরে শেষ করে ফেলেছে। এক হাঁটু রক্ত জমেছে। গিয়ে দেখে আসেন।’ সারারাত জেগে পোস্টার লিখেছে তসলিম। পরদিন পোস্টারগুলো নিয়ে যখন রওনা দিলে আনোয়ার সাহেব বারবার নিষেধ করেছিলেন। বলেছিলেন ঘরে বসে কবিতা লিখতে। তসলিম শোনেনি। বলেছে, ‘ভাষাই যদি বাঁচাতে না পারি কি দিয়ে কবিতা লিখব।’ আর ফেরেনি। আনোয়ারের এক বন্ধু গুলির সময় তাকে হাইকোর্টের সামনে দেখেছিল আর দেখেনি। তার মানে তসলিম মারা গেছে। সেদিন ফিরে এসে হাসিনার চিঠি পেয়েছিলেন আনোয়ার সাহেব, ‘মিনুর বিয়ে দিতে হবে। তুমি ছাড়া কে ওর বিয়ের বন্দোবস্ত করবে বল? কানু শেখ টাকার তাগিদ দিচ্ছে। ঘরে চাল-ডাল কিছুই নেই। একবেলা আলু আর একবেলা ভাত খাচ্ছি। বেতন পেয়েই টাকা পাঠিও।’
হাসিনার আর একটা চিঠি খোলেন আনোয়ার সাহেব, ‘মাস মাস টাকা পাঠিয়ে যদি মনে করো দায়িত্ব শেষ হয়ে গেল তাহলে আর বলার কিছু নেই।’ আনোয়ার সাহেব প্রবল অন্তর্দ্বন্দ্বে পড়েন। তিনি কি জানিয়ে দেবেন হাসিনাকে – তসলিম নেই, মারা গেছে। বুঝতে পারেন না।
এটি একটি অসাধারণ গল্প। বন্ধুর প্রতি বন্ধুর সহমর্মিতা ভালোবাসার অনন্য প্রকাশ। তসলিমের মৃত্যুসংবাদ শুনে আর্তনাদ করে উঠেছিলেন আনোয়ার সাহেব। ‘এ কী হলো। ওদের যে কেউ নেই! ওর মা বোন স্ত্রী কন্যার কী হবে!’ তারপর এই পরিবারের দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নেন তিনি। সামান্য চাকরি আর টিউশনির টাকা থেকেই নিয়মিত টাকা পাঠাতে থাকেন হাসিনাকে। অন্যদিকে হাসিনা চিঠির উত্তর না পেয়ে, স্বামী বাড়ি না যাওয়ায় পাগল হয়ে ওঠে। তার আকুতি বোঝাবার জন্য দুটে বাক্য তিনবার লিখেছেন জহির রায়হান, ‘এ এক বছরে হাসিনা কম চিঠি লেখেনি। অনেক চিঠি লিখেছে।’ আপাতদৃষ্টিতে গল্পটি অবাস্তব মনে হতে পারে। আমাদের চারপাশে প্রতিনিয়ত এমন অনেক ঘটনা ঘটে যা মনে হয় অবাস্তব কিন্তু আসলে তা কঠোর বাস্তব। এমন মানুষ পৃথিবীতে এখনো বিরল নয়। আর যদি বিরলও হয় এমন মানুষ থাকা প্রয়োজন। যারা নিজের দিকে না তাকিয়ে অকাতরে অন্যের ভার কাঁধে নিতে পারে। মানুষ অন্যকে নিজের মতো ভাবে। জহির রায়হান মুক্তিযুদ্ধের সময় জীবন থেকে নেয়ার প্রদর্র্শনী থেকে পাওয়া সমস্ত টাকা মুক্তিযুদ্ধ তহবিলে দান করেছিলেন। অথচ তাঁর সন্তানদের দুধ কেনার পয়সা তখন ছিল না। এ-গল্প ভাষাশহিদ তসলিমের আত্মত্যাগের চরম প্রকাশ। তসলিম নিজের কথা, পরিবারের কথা, কন্যার কথা ভাবেনি, অকাতরে ভাষার জন্য জীবন দিয়েছে।
জহির রায়হানের বিখ্যাত তিনটি উপন্যাস আরেক ফাল্গুন, হাজার বছর ধরে ও বরফ গলা নদী। বরফ গলা নদী ও হাজার বছর ধরে জহির রায়হানের নিবিড় সমাজভাবনার পরিচয় বহন করে। হাজার বছর ধরে আবহমান গ্রামবাংলার হাজার বছরের চিত্র। পরিসরের স্বল্পতা হেতু এখানে দুটি উপন্যাস নিয়ে আলোচনা করব।
আরেক ফাল্গুুন জহির রায়হানের কালজয়ী উপন্যাস। উপন্যাসের পটভূমি ভাষা-আন্দোলনের তিন বছর পরের ১৯৫৫ সালের আরেক ফাল্গুন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শহিদ দিবস পালনের প্রস্তুতি নিয়েছে। সরকার নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। স্লোগান, মিছিল, শোভাযাত্রা সব নিষিদ্ধ। নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে দিবসটি পালনে অনড় শিক্ষার্থীরা। ২১শে ফেব্রুয়ারির আগের রাতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের হলগুলোতে ছাত্রছাত্রীরা সারারাত জেগে রইলো। কোরাস গানে মুখরিত করলো ক্যাম্পাস। ‘ভুলবো না, ভুলবো না একুশে ফেব্রুয়ারি’সহ সরকারবিরোধী নানা সেøাগানে প্রকম্পিত হলো চারদিক। স্লোগানগুলো উচ্চারিত হলো হলগুলোর ছাদ থেকে। রাতেই পুলিশ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের হোস্টেল আক্রমণ করে অনেককেই গ্রেফতার করে। এ-খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। পরদিন সকালবেলা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শত শত শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে জড়ো হয়। প্রতিবাদস্বরূপ কালো পতাকা উত্তোলন করে শিক্ষার্থীরা। পুলিশ সেখানেও হামলা চালায়। গ্রেফতার করে অনেককে। পুলিশের গাড়িতে উঠেও স্লোগান দিতে থাকে শিক্ষার্থীরা, ‘বরকতের খুন ভুলবো না, শহীদদের খুন ভুলবো না। শহীদ স্মৃতি, অমর হোক।’
এত কিছু করেও শহিদ দিবস পালনের প্রস্তুতি থামাতে পারে না স্বৈরাচারী সরকার। নগ্ন পায়ে চলবে, শহিদদের স্মরণ করে রোজা রাখবে, কালো ব্যাজ ধারণ করবে, ২১শে ফেব্রুয়ারিতে কালো পতাকা উত্তোলন করবে – সব প্রস্তুতিই শেষ। যে-কোনো মূল্যে শহিদ দিবস পালন করবেই তারা।
আরেক ফাল্গুন উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬৯ সালে। উপন্যাসের কাহিনি মাত্র তিন দিন দুই রাত ধরে আবর্তিত। প্রথম দুদিন দুই রাত ছাত্ররা শহিদ দিবস পালনের বিরামহীন প্রস্তুতি নিয়েছে। তৃতীয় দিনে শহিদ দিবস পালনকালে মিছিলে ছাত্র-পুলিশ সংঘর্ষ হয়। মিছিলে অংশ নেওয়া আন্দোলনকারী ছাত্রদের গ্রেফতার করে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করে সরকার। এ-চেষ্টা ছিল একটা ব্যর্থ প্রয়াস। এই ব্যর্থতা বর্ণনার মাধ্যমে জেলগেটের সামনে উপন্যাসের সমাপ্তি ঘটেছে।
আরেক ফাল্গুন উপন্যাসের শুরুটা নাটকীয়। সকাল। কুয়াশায় ঢাকা পড়েছে গোটা আকাশ। আকাশে মেঘ আছে। তবে সে-মেঘ আছে আকাশের অনেক নিচুতে। অনেক নিচু দিয়ে ধীরগতিতে ভেসে যাচ্ছে খণ্ড খণ্ড উত্তর থেকে দক্ষিণে। সে-মেঘের রং জমাটবদ্ধ কুয়াশার মতো।
কাহিনি উন্মোচিত হয় ভিক্টোরিয়া পার্কের পাশে। একটা ছেলেকে হেঁটে যেতে দেখা গেল নবাবপুরের দিকে। তার পরনে সদ্য-ধোয়া সাদা শার্ট, সাদা প্যান্ট। পা খালি। জুতো নেই পায়ে। সিপাহী বিদ্রোহের নির্মম স্মৃতিবিজড়িত ভিক্টোরিয়া পার্কের পাশ দিয়ে কুয়াশার মধ্যে মেঘের মতো হেঁটে যাচ্ছে যে-ছেলেটি সে-ই আরেক ফাল্গুন উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র। নাম মুনিম। মুনিম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। ছাত্রনেতা।
জহির রায়হান সিপাহী বিদ্রোহ আর ভাষা-আন্দোলনকে একসূত্রে গাঁথতে চেয়েছেন তাঁর উপন্যাসে। সম্মিলন ঘটিয়েছেন প্রতিবাদী চেতনার। দেশে স্বৈরাচারী সরকার। মুনিমের মতো আসাদ, সালমা, নীলা, রানু, বেনু, রাহাত, কবি রসুল দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে শহিদ দিবস পালনের জন্য।
শহিদ দিবস পালনে বাধার সম্মুখীন হয়ে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে মুনিম। প্রতিবাদস্বরূপ প্রেমিকা ডলির জন্মদিনের উৎসবে মুনিম হাজির হয় খালি পায়ে। ডলি তাকে বাবার কথা বলে জুতা পরার পরামর্শ দেয়। মুনিম উত্তর দেয়, ‘জানো তো আমরা তিনদিন খালি পায়ে হাঁটাচলা করছি। আমায় তুমি ইমমোরাল হতে বলছো?’ মুনিমের মতো আপসহীন বিপ্লবী আসাদ। সেও ছাত্র। সে অদম্য। কোনো প্রতিকূলতাই আমলে নেয় না। বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ, কালো ব্যাজ ও কালো পতাকা বিতরণসহ নানা ধরনের কাজ করে। এই ক্লান্তিহীনতার জন্য উপন্যাসের শেষদিকে মুনিমের চেয়ে আসাদের চরিত্রটিই যেন বেশি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। অন্যদিকে মেডিক্যালের ছাত্রী সালমা। সে বিপ্লবী রওশনের স্ত্রী। রওশন কারারুদ্ধ হয়েছে। স্বামীকে সালমা প্রচণ্ড ভালোবাসে। সেও আন্দোলনে জড়িয়ে গেছে ওতপ্রোতভাবে। শুধু ঢাকা নয়, আন্দোলন দমনের জন্য স্বৈরাচারী সরকার সারা দেশেই দমন-পীড়ন করেছে। তারা জেলে গুলি চালাতে পিছপা হয়নি। রাজশাহী জেলে পুলিশ গুলি চালালে রওশনের হাতে গুলি লাগে। সে তার দু-হাত হারায়। স্বামী রওশন আর কখনো স্লোগান দিতে পারবে না এই বেদনায় মোহ্যমান সালমা। তার এই বেদনা পাঠকহৃদয় ছুঁয়ে যায়। সালমার সঙ্গে সঙ্গেই বেদনাপ্লুত হয়ে পড়ে পাঠককুলও।
চিরকাল যে-কোনো আন্দোলন-সংগ্রামে আন্দোলনকারীদের পাশাপাশি থাকে কিছু সুবিধাবাদী মানুষ। সেই মানুষগুলি এ-উপন্যাসেও আছে। কারণ জহির রায়হান বাস্তবের মানুষ ছিলেন। এখানেও ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের মেরুদণ্ডহীন প্রক্টর। তার কাজ ছিল গুপ্তচরবৃত্তি। বিবেকহীন এই মানুষটির নোংরা চরিত্র প্রতিফলিত হয়েছে উপন্যাসে।
উপন্যাসের অন্যান্য চরিত্র – নীলা, রানু, বেনু, রাহাত, কবি রসুল প্রমুখ রাজপথে অনড় ছিল। একুশে ফেব্রুয়ারিতে ভয়-ভীতি উপেক্ষা করে কালো পতাকা উত্তোলিত করে ছাত্ররা। মুহুর্মুহু স্লোগান দেয়। ব্যারিকেড ভেঙে ফেলে। পুলিশ লাঠিচার্জ করে, এরপর মেডিক্যালের ব্যারাক ঘেরাও করে ছাত্রছাত্রীসহ ১৭ জনকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। এতে আন্দোলন থামে না। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ছাত্রছাত্রীরা এসে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে জড়ো হতে শুরু করে। কালো পতাকা উত্তোলন করে তারা। পুলিশ সেখানেও গুলি চালায়। অনেক ছাত্রছাত্রী আহত হয়। অনেককে পুলিশ গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। প্রিজন ভ্যানে উঠে তারা স্লোগান দিতে থাকে ‘শহীদের খুন ভুলব না, বরকতের খুন ভুলব না’, ‘শহীদ স্মৃতি অমর হোক’।
উপন্যাসের শেষ দৃশ্যটি প্রবলভাবে আন্দোলিত করে পাঠককে। এ-আন্দোলন একজন পাঠক আমৃত্যু বুকে ধারণ করবেন বলে আমার বিশ্বাস। জেলগেটে শত শত শিক্ষার্থী। নাম ডেকে ডেকে ছেলেমেয়েদের ঢোকানো হচ্ছিল জেলখানায়। নাম ডাকতে ডাকতে হাঁপিয়ে উঠেছিলেন ডেপুটি জেলার। তাদের সংখ্যা দেখে, নাম ডাকতে ডাকতে বিরক্ত তিনি। একসময় বিরক্তির সঙ্গে বললেন, ‘উহ অত ছেলেকে জায়গা দেব কোথায়? জেলখানা তো এমনি ভর্তি হয়ে আছে।’ তখন কবি রসুল চিৎকার করে বলছিল, ‘জেলখানা আরো বাড়ান সাহেব। এত ছোট জেলখানায় হবে না।’ আরেকজন বলল, ‘এতেই ঘাবড়ে গেলেন নাকি? আসছে ফাল্গুনে আমরা কিন্তু দ্বিগুণ হব।’
এখানেই উপন্যাসের সমাপ্তি। ছোট্ট পরিসরের উপন্যাসটির রয়েছে মহাকাব্যিক বিস্তৃতি। জহির রায়হানের কাজের বৈশিষ্ট্য এটাই। তিনি বিন্দুতে সিন্ধু ধারণ করতে পারতেন। ‘আসছে ফাল্গুনে আমরা দ্বিগুণ হবো’ – এই একটি উচ্চারণ বলে দেয়, এ-আন্দোলন থামবে না। জেলখানা বড় করতে হবে। কিন্তু কত বড়! কোনো জেলখানাতেই তো আন্দোলনকারীদের আটকে রেখে থামানো যাবে না। কারণ প্রতি ফাল্গুনেই তারা বাড়বে। তারা থামবে না অধিকার আদায় না হওয়া পর্যন্ত।
জহির রায়হানের আরেক ফাল্গুন এক শাণিত তলোয়ার। অত্যাচারীর বিরুদ্ধে রুখে দঁাড়ানোর মারণাস্ত্র। এদেশের ছাত্রসমাজের প্রতিবাদের নিখুঁত চিত্র। তারা কীভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে, অত্যাচারীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় পাহাড়সম দৃঢ়তায় তার এক অসামান্য বাস্তবায়ন। অধিকার আদায়ের জন্য জীবনকে তুচ্ছজ্ঞান করে তারা। অধিকার আর মর্যাদার প্রশ্নে তারা ভালোবাসাকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যায়। তারা অঙ্গ হারায় কিন্তু ভাষা হারাতে দেয় না। জীবন দেয় কিন্তু ভাষার মর্যাদা সমুন্নত রাখে।
ভাষা-আন্দোলনকে উপজীব্য করে প্রথম উপন্যাস আরেক ফাল্গুন। আরো বিস্ময়ের কথা, বিগত ৭৩ বছরে আর কোনো উপন্যাসে সরাসরি এভাবে ভাষা-আন্দোলন উপস্থাপিত হয়নি। ছাত্রদের আন্দোলন দ্রোহ ক্ষোভ একাত্মতা আর পাকিস্তানি শাসনের নগ্ন বর্বরতা ফুটে ওঠেনি। তাই আরেক ফাল্গুন উপন্যাসের শিল্পমূল্য অপরিসীম।
এ-উপন্যাস লেখকের বিপ্লবী চিন্তা-চেতনার প্রতিফলনও বটে। সমকালীন বাংলা উপন্যাস সাহিত্যে তাই আরেক ফাল্গুনের অবস্থান স্বতন্ত্র। এ-কথা বললে বোধহয় অত্যুক্তি হবে না, ভবিষ্যতে ভাষা-আন্দোলনকেন্দ্রিক অন্য কোনো উপন্যাস লেখা হলেও তা আরেক ফাল্গুনের শ্রেষ্ঠত্ব ম্লান করতে পারবে না।
হাজার বছর ধরে উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র মন্তু আর টুনি। বুড়ো মকবুলের তিন বউ। তাদের একজন টুনি। টুনি বালিকা। মকবুল বউদের গাধার মতো খাটায়। ঢেঁকির ওপর জোড়া বউ তুলে দেয়। বউরা চাটাই বোনে, ধান মাড়াই করে, ফসল বোনে। বউদের রোজগারে সে চলে। এ-গ্রামের নাম পরীর দিঘি। উপন্যাস জুড়ে রূপকথা উপকথা পুঁথির সমাবেশ। উপন্যাসটিতে আঞ্চলিক ভাষা ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। মকবুল গোত্রের প্রধান। বংশের সব সিদ্ধান্ত মকবুল নেয়। তবে সে সবাইকে ডেকে সিদ্ধান্ত নেয়। এ-গ্রামে বউ পেটানো নিত্যকার ঘটনা। কমবেশি সবাই বউকে মারে। এর মধ্যে চ্যাম্পিয়ন আবুল। সে মেরে মেরে তিনটে বউকে কবরে পাঠিয়েছে। বংশের লোকগুলো বেশ কয়েকটা ঘরে পাশাপাশি থাকে। একেবারে কোনার ঘরে থাকে মন্তু। সম্পর্কে সে মকবুলের চাচাতো ভাই। অবিবাহিত। উপন্যাসের শুরু থেকেই আমরা দেখি মন্তু আর টুনির বন্ধুত্ব। তারা রাতের আঁধারে মাছ ধরতে যায়, শাপলা তোলে। বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে বোঝা যায় টুনি মন্তুকে ভালোবাসে। কিন্তু মুখ ফুটে কখনো বলে না। মন্তু দোদুল্যমান। তার একবার মাঝিবাড়ির আম্বিয়াকে ভালো লাগে, একবার টুনিকে। সে মাঝিবাড়ির নৌকা বায়। মাঝিবাড়ির সবার হাঁপানি আছে। আম্বিয়ার সঙ্গে বিয়ের কথা উঠেছিল। মকবুল বারণ করেছে, বংশে হাঁপানি হবে বলে। মাঝিবাড়ির কর্তা নান্তু। সে সারা গ্রামের মানুষকে কবর দেয়। টুনিকে তার বাপের বাড়ি থেকে আনতে মন্তুকে পাঠায় মকবুল। ফেরার পথে শান্তির হাটে জোয়ারের কারণে ওদের নৌকা থামায়। টুনিকে নিয়ে যাত্রা দেখতে যায় মন্তু। সেখানে হাজি সাহেবের সঙ্গে দেখা। হাজি সাহের মন্তুর পুরনো পরিচিত। হাজি সাহেব ওদের স্বামী-স্ত্রী ভেবে তার বাড়িতে একরাত আতিথ্য নিতে বলে। মন্তু রাজি হয় না। ওরা পরীর দিঘিতে আসে। গ্রামে ওলাওঠা শুরু হয়। সবার আগে আসে মাঝিবাড়িতে। নান্তু শেখ, করিম, আম্বিয়া আক্রান্ত হয়। টুনি মন্তুকে বারবার নিষেধ করে মাঝিবাড়ি যেতে। মন্তু শোনে না। নান্তু আর করিম মারা যায়। আম্বিয়া সেরে ওঠে। একসময় গ্রাম থেকে ওলাওঠা বিদায় নেয়। মকবুল মন্তুর বিয়ে ঠিক করে আম্বিয়ার সঙ্গে। বিয়ে করলে মন্তু আম্বিয়ার নৌকা, বাড়ির ভিটে আর একটুকরো জমির মালিক হবে। স্বার্থসিদ্ধ হবে বলে আম্বিয়ার হাঁপানি সত্ত্বেও সবাই রাজি হয়। মন্তু নিজেও। রাতে টুনি মকবুলকে বুদ্ধি দেয় আম্বিয়াকে বিয়ে করে নিজেই ওই সম্পত্তির মালিক হতে। টুনির প্রস্তাব মকবুলের পছন্দ হয়। সে মাঝিবাড়িতে গিয়ে আম্বিয়ার সঙ্গে নিজের বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে আসে। ঘটনা জানাজানি হলে বড়, মেজো বউ চরমভাবে বেঁকে বসে। বংশের সবাই মকবুলের সমালোচনা করতে থাকে। মকবুল বিচারের সম্মুখীন হয়। সেখানে রাগের বসে মকবুল দুই বউকে একসঙ্গে তালাক দিয়ে দেয়। কিন্তু আম্বিয়া মকবুলকে বিয়ে করতে রাজি নয়। মকবুল অসুস্থ হয়ে পড়ে। টুনি প্রাণপণ তার সেবা করে। একসময় মকবুল মারা যায়।
মকবুলের বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছে টুনি। মন্তু তাকে দিয়ে আসবে বাপের বাড়িতে। মন্তুর সঙ্গে আম্বিয়ার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। বাপের বাড়িতে যাওয়ার পথে মন্তু শান্তির হাটে হাজি সাহেবের আতিথ্য নিতে চায়। এটাও বলে, ‘হাজিকে বললে সে কাজি ডেকে তাদের বিয়ের ব্যবস্থা করে দেবে।’ টুনি মৃদুস্বরে বলে, ‘এখন আর সেটা সম্ভব না।’
এরপর অনেকদিন গড়িয়ে যায়। টুনির সঙ্গে এখন আর মন্তুর যোগাযোগ নেই। প্রবীণ সবাই মারা গেছে। সে এখন বংশের নেতা। এভাবেই সময়ের চাকা ঘোরে।
হাজার বছর ধরে আসলেই হাজার বছর ধরে চলে আসা আমাদের গ্রামীণ জীবনের বাস্তব চিত্র। তখনো যেমন ছিল এখনো গ্রাম তেমনই আছে। এখনো বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, তালাক চলছে। নারীনির্যাতন, নারীকে অধস্তন করে রাখা হচ্ছে একইভাবে। এখনো মানুষ বেঁচে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত। এখনো সামন্ততন্ত্র বিরাজ করে।
এক-একজনের কথায় চলে অনেক মানুষ। তারা টাকার কাছে অথবা ক্ষমতার কাছে জিম্মি হয়। স্বার্থের জন্য এখনো মানুষ হীন কাজ করতে পিছপা হয় না। তবে ওলাওঠার সেই দাপুটে ভাব এখন আর নেই। চিকিৎসা বেরিয়েছে। এখনো কোনো কোনো মানুষ নান্তুর মতো অকাতরে মানুষের কল্যাণে কাজ করে যায়।
এ-উপন্যাসে মন্তুর দোদুল্যমানতা স্বাভাবিক। সহজ সরল টুনি ভালোবাসার তীব্র টানে একটা অবিশ্বাস্য, কঠিন খেলায় মেতেছিল। ভালোবাসার জন্য মানুষ সব পারে। মকবুলকে আম্বিয়ার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে মন্তুকে নিজের করে রাখতে চেয়েছিল। আম্বিয়া মকবুলকে বিয়ে করতে অস্বীকার করায় পাশার দান উল্টে যায়। প্রাণপণ মকবুলের সেবা করতে করতে কখন যেন মকবুলকে ভালোবেসে ফেলে টুনি। অন্যদিকে মন্তুর দোদুল্যমানতা সে ধরে ফেলে। যে তাকে একান্তভাবে চায় না তার জন্য কেন এই আকুতি! তার আত্মসম্মানে আঘাত লেগেছিল। গল্পের শেষটা তাই টুনির সঙ্গে বিয়োগান্ত, আম্বিয়ার সঙ্গে মিলনান্ত। এটাই স্বাভাবিক, এটাই বাস্তব।
জহির রায়হানের গল্প-উপন্যাসের বৈশিষ্ট্য নিখুঁত ডিটেইলিং। এত পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা সাধারণত দেখা যায় না। তাঁর দেখার চোখ অসাধারণ। অতলান্ত পর্যন্ত দেখতে পেতেন তিনি। ভাষা সহজ-সরল ঝরঝরে নির্মেদ। নদীর স্রোতের মতো টেনে নিয়ে যায়। পড়তে শুরু করলে ওঠা যায় না শেষ না করে। ছোট ছোট বাক্যে লিখেছেন তিনি। যেন এক একটি পাপড়িদল। অপূর্ব ভাষার বিন্যাস। চরিত্রগুলো নিখুঁত। কোনো বাড়তি কমতি নেই। তাঁর গল্প ছোটগল্পের সংজ্ঞা ‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ’-এর উদাহরণ। প্রতিটি গল্প শেষে পাঠক ভাবনায় আবিষ্ট হন।
জহির রায়হানের প্রতিটি গল্প-উপন্যাস একটি অপরটিকে ছাড়িয়ে গেছে। তিনি নিজেকে অতিক্রম করেছেন বারবার। এখানেই তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.