উপনিবেশ ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী একজন বিপ্লবী প্রতিবুদ্ধিজীবী হলেন ফ্রাঞ্জ ফানো (জন্ম : ২০শে জুলাই, ১৯২৫, মৃত্যু : ৬ই ডিসেম্বর, ১৯৬১)। তিনি ছিলেন একজন সাহসী মানুষ, চিন্তাশীল ও জ্ঞানশীল লেখক, চিকিৎসক ও বিপ্লবী। লক্ষণীয় বিষয় হলো, তিনি জীবিতকালের চেয়েও মৃত্যুর পর দিন দিন জনপ্রিয় হয়েছেন এবং এখনো তাঁর জনপ্রিয়তা বেড়েই চলেছে। পশ্চিমা দুনিয়ায় তাঁর জীবন ও কর্মকাণ্ড নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে এবং এই গবেষণার ধারা অব্যাহত আছে। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ইমানুয়েল হানসেন (১৯৩৭) বলেন, ‘O
f all black writers and intellectuals he is perhaps the most written about. In Algeria places have been named after him, and in the United States and Italy research centers have been erected in his memory. He has taken his place alongside Herbert Marcuse, Che Guevara and Reges Debray as intellectual and idiological mentor of the new left and a guru of black militants (Emmanual Hansen, Frantz Fano : Social and Political thought, Ohio State University Press, 1977, USA: P. 4)।
আমাদের প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা – যা-ই হোক না কেন – ফ্রাঞ্জ ফানো কেন জ্ঞানশীল মানুষের আগ্রহের বিষয়? এমন প্রশ্নের জবাবে ফানো-গবেষকদের কেউ কেউ বলছেন, কয়েকটা বিশেষ কারণ আছে। যথা : (১) তাঁর প্রভাব, (২) আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব (৩) কৃষ্ণাঙ্গ প্রতিবুদ্ধিজীবীর আদর্শ হিসেবে তাঁর জীবন এবং (৪) তাঁর বাণীর গুরুত্ব।
ফ্রাঞ্জ ফানো বিষয়ে আমার এই লেখা হবে মূলত পরিচিতিমূলক, কোনো গভীর বিশ্লেষণমূলক নয়। কারণ তাঁর জীবন ও কর্ম সম্পর্কে বাংলাদেশে খুব বেশি মানুষের জানাশোনা আছে তেমন কোনো লক্ষণ দৃশ্যমান নয়। যা হোক, তাঁর জীবন ও কর্মকে একনজরে দেখতে আমরা তাঁর জীবনপরিসরকে সংক্ষেপে পাঁচ পর্বে দেখতে পারি, যথা : (১) তাঁর জন্ম, বুর্জোয়া পরিবারে বেড়ে ওঠা এবং মার্তিনিক দ্বীপে প্রাথমিক পড়ালেখা, (২) ফরাসি সেনাবাহিনীতে চাকরি, (৩) ফরাসি দেশে উচ্চতর পড়ালেখা এবং ফরাসি বাম বুদ্ধিজীবীদের কাছে প্রভাব বিস্তার, (৪) আলজেরিয়ার বিপ্লবে নিবেদিতপ্রাণ একজন মনোচিকিৎসক হিসেবে উত্তর আফ্রিকায় তাঁর কাজ, এবং (৫) উত্তর আফ্রিকা ও সাহারা মরুভূমির সমগ্র দক্ষিণ আফ্রিকা – উভয় এলাকায় একজন পেশাদার বিপ্লবী হিসেবে তাঁর জীবন ও কর্ম। এসব বিবেচনায় আনলে ১৯২৫ সালে জন্ম নেওয়া মার্তিনিকের সামাজিক পরিবেশ বুঝতে সহায়ক হবে, যেখানে তিনি বেড়ে উঠেছিলেন।
জন্ম, পারিবারিক পটভূমি ও প্রাথমিক শিক্ষা
ফ্রাঞ্জ ফানোর জন্ম মার্তিনিক দ্বীপে। এই দ্বীপটি ছিল ফরাসি দেশের অন্যান্য বিদেশি বিভাগের একটি। অর্থাৎ ফরাসি উপনিবেশ। মার্তিনিকের ছোট ছোট বুর্জোয়া পরিবারের একটিতে তাঁর জন্ম ১৯২৫ সালের ২০শে জুলাই। তাঁর পিতা সম্পর্কে তেমন একটা জানা যায় না। যতটুকু জানা যায়, তাঁর পিতার জন্ম ১৮৯১ সালে এবং মৃত্যু ১৯৪৭ সালে। তিনি কাস্টমস পরিদর্শক হিসেবে কাজ করতেন। চিন্তাচেতনার দিক থেকে তাঁর বাবা ছিলেন একজন মুক্তচিন্তার মানুষ। তাঁর মা ছিলেন আচার-আচরণে বিনয়ী, তবে বেশ মোটাসোটা নারী। তিনি নিজেকে অন্য দশজন ফরাসি নাগরিকের একজন হিসেবে বিবেচনা করতেন। তাঁদের পরিবার ছিল ক্যাথলিক খ্রিষ্টান। তাঁর পিতা মুক্তচিন্তার মানুষ ও ফ্রিম্যাশনের সদস্য হওয়ার কারণে পরিবারে ধর্মীয় বিষয়ে স্বতন্ত্র চিন্তার সুযোগ ও পরিবেশ ছিল। এমন পারিবারিক পরিবেশ বাল্যকালে ফানোর চিন্তা ও সংস্কৃতিতে একটা গভীর ছাপ ফেলেছিল।
ফানোর প্রাক-বিদ্যালয়জীবন সম্পর্কে খুব সামান্যই জানা যায়। তাঁর পিতামাতার ছিল চার ছেলে ও চার মেয়ে। তিনি ছিলেন ছেলেদের মধ্যে সবার ছোট। একজন শিশু হিসেবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত অস্থিরচিত্ত ও ঝগড়াপ্রবণ। তাছাড়া ফানো ছিলেন পিতামাতার আট ছেলেমেয়ের মধ্যে সবচেয়ে কালো।
মার্তিনিকে তখন চলছিল ফরাসি দেশের আত্তীকরণবাদী কৌশল। ফানোর প্রাথমিক শিক্ষা সেই ঔপনিবেশিক আত্তীকরণবাদী নীতি অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ করেই চলছিল। তখন তাঁদের পড়ার জন্য ছিল একমাত্র সরকার-নির্ধারিত পাঠ্যপুস্তক। আর সেসব পাঠ্যপুস্তক ছিল শুধু ফরাসি দেশ ও ফরাসি সাম্রাজ্যের মহিমাকীর্তনে ভরপুর। আত্তীকরণ ও ফরাসি শিক্ষা পারস্পরিক সম্পর্কিত। ফরাসি দেশের একটা বিভাগ হিসেবে মার্তিনিকের শিক্ষার্থীরা মূল ফরাসি দেশের শ্বেতাঙ্গ শিক্ষার্থীদের মতোই একই বই পড়ত এবং একই পরীক্ষায় অংশ নিত। মার্তিনিকান শিক্ষার্থীদের নিজ দেশের মতো করেই ফরাসি ইতিহাস শিক্ষা দেওয়া হতো। ফানো ও তাঁর ভাইয়েরা ফরাসি দেশপ্রেমিক সংগীত মুখস্থ করেছেন। ফরাসি সংস্কৃতির আকাশচুম্বী প্রশংসা, ফরাসি ভাষা, ফরাসি সাহিত্য, ফরাসি ইতিহাস, ফরাসি আচার-ব্যবহারকে মার্তিনিকে জীবনযাত্রার একমাত্র বৈধ পন্থা হিসেবে সরাসরি অতিতোষামোদের সঙ্গে গৃহীত হয়েছে। এসবের ফলাফল সুস্পষ্ট। ঔপনিবেশিক ফরাসি শিক্ষা তাঁকে শ্বেতাঙ্গ ফরাসি সংস্কৃতির সঙ্গে একীভূত ও আফ্রিকার সংস্কৃতিকে অবজ্ঞা করার দিকে ধাবিতে করায়।
ফ্রাঞ্জ ফানোর শিক্ষক ছিলেন মার্তিনিক কবি, লেখক ও রাজনীতিবিদ এমে ফার্নান্দ ডেভিড সেজার
(১৯১৩-২০০৮)। ফরাসি ঔপনিবেশিক শিক্ষা ফানোকে চালিত করে আত্তীকরণের দিকে, আবার কবি ও শিক্ষক এমে সেজার চালিত করেন সুশাসন অভিমুখে। ফানোর প্রাথমিক শিক্ষা ও আত্তীকরণ, উচ্চতর শিক্ষা, আত্তীকরণ বিষয়ে আত্মসংযম ও সংশয় এবং শেষমেশ আত্তীকরণকে প্রত্যাখ্যান করার দিকে চালিত করে। তিনি সারাজীবন আত্তীকরণ ও স্বশাসন – এই দুই পরস্পরবিরোধী ধারণা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন।
ফরাসি সেনাবাহিনীতে চাকরি
১৯৪০ সালে জার্মানদের হাতে ফরাসিদেশের পতন ঘটে। তারপর দ্রুত আমেরিকা মার্তিনিক দ্বীপে অবরোধ আরোপ করে। প্রতিক্রিয়া হিসেবে ফরাসি সরকার দ্বীপে সামরিক একনায়কত্ব আরোপ করে। দেখতে দেখতে রাতারাতি দ্বীপটা একটা অধিকৃত অঞ্চলে পরিণত হয়। এই সামরিক শাসন দ্বীপটিতে ধর্ষণ, বর্ণবাদ ও দাঙ্গা সৃষ্টি করে। মার্তিনিক দ্বীপের এমন অবস্থা ফানোর মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। এমন পরিস্থিতিতে ফানো ১৯৪৩ সালে মার্তিনিক দ্বীপ থেকে অন্যত্র চলে যান। তবে ফরাসি জেনারেল চার্লস ডি গলের (১৮৯০-১৯৭০) আহ্বানে ফরাসি দেশ রক্ষার জন্য দুজন আন্তরিক বন্ধুসহ ফানো সাড়া দেন এবং সামরিক প্রশিক্ষণ নেন। ফরাসি সেনাবাহিনীতে যোগদান করে ‘মুক্ত ফরাসি দেশের’ জন্য উত্তর আফ্রিকায় চলে যান।
ফানো তাঁর দুই অন্তরঙ্গ বন্ধু মসোল ও ম্যানভাইলকে নিয়ে মার্তিনিক দ্বীপ ছেড়ে যান। এই দুই বন্ধু ফানোকে অনেক বিষয়ে সহযোগিতা করেছেন এবং অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। মরক্কোতে অল্প সময় অবস্থানের পর তাঁরা আলজেরিয়ায় পৌঁছান। পরবর্তীকালে এটা তাঁর অভিযোজিত দেশ হিসেবে দাঁড়ায়। আলজেরিয়ায় অবস্থানকালে অন্তরঙ্গ দুই বন্ধুসহ ফানো ইউরোপে স্বেচ্ছাশ্রম দেন। ফরাসি সেনাবাহিনীতে প্রচণ্ড বর্ণবাদ ও দারিদ্র্য তাঁদের কাছে ছিল অসহনীয়। ফানো ১৯৪৫ সালে সাহসিকতার জন্য ‘Croix de guesse’ পুরস্কার অর্জন করেন। ১৯৪৬ সালে ‘কর্পোরাল’ পদবিসহকারে সেনাবাহিনী থেকে অবসরগ্রহণ করেন।
যুদ্ধশেষে ফানো ক্রমাগত ফরাসি দেশ ও ফরাসি মূল্যবোধ সম্পর্কে নিন্দা করতে থাকেন। অথচ বিদ্যালয়ে পড়ালেখার সময় তিনি সেসবের প্রশংসা করতে শিখেছিলেন। এই নিন্দার কারণ বাস্তব অভিজ্ঞতা তাঁকে ফরাসি সাম্রাজ্যবাদের আসল চেহারা তাঁকে দেখিয়ে দিয়েছে। খুলে দিয়েছে ফানোর অন্তর্দৃষ্টি। কারণ তিনি ছিলেন একজন সংবেদনশীল তরুণ।
মার্তিনিকে প্রত্যাবর্তন ও এমে সেজারের পক্ষে প্রচার যুদ্ধকালীন কয়েক বছর ও উচ্চশিক্ষার জন্য ফানোর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে খানিক ছেদ পড়েছিল। যুদ্ধশেষে যখন তিনি মার্তিনিকে ফিরে এসেছিলেন, তখন চতুর্থ রিপাবলিকের প্রথম নির্বাচনে মার্তিনিকের সংসদীয় প্রতিনিধি পদে নির্বাচন করেছিলেন এমে সেজার। তিনি নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির একজন নেতা হিসেবে। তখন পর্যন্ত কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি ফানোর কোনোরকম সহানুভূতির প্রমাণ মেলে না। তিনি আগ্রহী ছিলেন এমে সেজারের সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ এবং নিগ্রিটিউড দর্শনের প্রতি। এমে সেজারের নির্বাচনে প্রচার-কর্মকাণ্ডে তাঁর অংশগ্রহণ ছিল অত্যন্ত শিক্ষামূলক।
এমে সেজারের নির্বাচনী প্রচারশেষে ফানো শিক্ষা সমাপনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সময়টা ছিল ১৯৪৬ সাল। সেই সময়ে ফানো হয়ে যান আত্মানুসন্ধানী, গোছানো এবং পড়াশোনায় অত্যন্ত মনোযোগী। এটা আন্দাজ করা সম্ভব যে, ফানো ফরাসি সেনাবাহিনীতে নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করছেন। তিনি সাহিত্য ও দর্শন অধ্যয়নে মনোযোগ দেন। তিনি ফ্রেডারিখ নিৎসে (১৮৪৪-১৯০০), কার্ল জ্যাস্পার্স (১৮৮৩-১৯৬৯), সরেন কিয়ার্কেগার্ড (১৮১৩-৫৫) এবং জর্জ ভিলহেম ফ্রেডারিখ হেগেলের (১৭৭০-১৮৩১) রচনাবলি অধ্যয়ন করেন। তিনি বিশেষভাবে এমে সেজার এবং জ্যঁ পল সার্ত্রের (১৯০৫-৮০) রচনাবলি পাঠে মনোযোগ দেন।
ফরাসিদেশে উচ্চশিক্ষা
ফানোর পিতা ১৯৪৭ সালে ইন্তেকাল করেন। তারপর তিনি উচ্চতর শিক্ষার জন্য ফরাসি দেশে গমন করেন। তিনি প্রথমে প্যারিস শহরে দন্তচিকিৎসা অধ্যয়নের জন্য ভর্তি হন। তবে মাত্র তিন সপ্তাহের পরিচিতিমূলক কোর্স শেষে হঠাৎ প্যারিস ত্যাগ করেন এবং চিকিৎসাবিজ্ঞান অধ্যয়নের লক্ষ্যে লিয়ন শহরে যান। লিয়নে তিনি এক বছর রসায়ন, পদার্থবিদ্যা ও জীববিজ্ঞানে প্রস্তুতিমূলক পড়ালেখা শেষে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ভর্তি হন। অধ্যাপকদের কাছে নিজেকে মেধাবী ছাত্র হিসেবে তুলে ধরার লক্ষ্যে অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে অধ্যয়ন চালিয়ে যান।
বিশ^বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে ফানো দর্শন ও সাহিত্যে তাঁর আগ্রহ বহাল রাখেন। তিনি সে-সময়ে অস্তিত্ববাদী দার্শনিকদের বইপত্র পাঠ করেন। যথা : এডমান্ড হুসার্ল (১৮৫৯-১৯৩৮), মার্টিন হাইডেগার (১৮৮৯-১৯৭৬) এবং জ্যঁ পল সার্ত্রে (১৯০৫-৮০)। তাছাড়া তিনি ফ্রেডারিখ ভিলহেম হেগেল (১৭৭০-১৮৩১), কার্ল মার্কস (১৮১৮-৮৩) এবং ভ্লাদিমির লেনিনের (১৮৭০-১৯২৪) রচনা পাঠ করেন। জ্যঁ লাক্রোয়া (১৯০০-৮৬) এবং মরিচ-মার্লে পন্টির (১৯০৮-৬১) ভাষণ শুনতেন। জ্যঁ পল সার্ত্রের দ্বারা ফানো বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।
ফানো বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন এমে সেজার দ্বারা। তাঁর ব্ল্যাক স্কিন, হোয়াইট মাস্ক বইয়ে এ-প্রভাব সুস্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। এই বইটিতে এমে সেজারের অনেক উদ্ধৃতি তিনি ব্যবহার করেছেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ছাত্র থাকাকালে ফ্রাঞ্জ ফানো নাটক লেখায় আত্মনিয়োগ করেন। সে-সময়ে লেখা তাঁর তিনটি নাটকের সন্ধান পাওয়া যায়। তাঁর স্ত্রীর ভাষ্যমতে, তাঁর নির্দেশনা অনুসরণে সেসব নাটক এখনো ছাপানো হয়নি। তিনি এসব নাটক লিখেছিলেন ১৯৪৯ ও ১৯৫০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে। আমরা আরো জানি, তাঁর বিখ্যাত বই ব্ল্যাক স্কিন, হোয়াইট মাস্ক লেখা হয়ে ১৯৫০ সালে এবং প্রকাশিত হয় ১৯৫২ সালে।
ছাত্র হিসেবে ফানো ছিলেন অত্যন্ত চঞ্চল এবং অধ্যয়নের পাশাপাশি রাজনীতিতেও সক্রিয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে পড়ালেখার সময় তিনি লিয়ন শহরে ছাত্রদের ইউনিয়ন গড়ে তোলেন এবং টাম-টাম নামে একটা পত্রিকাও প্রকাশ করেন। এছাড়া তিনি সর্বদা বিতর্কে যোগ দিতেন অথবা বামদের সভায় অংশগ্রহণ করতেন।
১৯৫১ সালে ফানো নিজের চিকিৎসাবিদ্যার সন্দর্ভ উপস্থাপন করেন এবং লিয়ন শহর ছেড়ে মার্তিনিকে ফিরে যান। তিনি সে-বছর, অর্থাৎ ১৯৫১ সালে, অধ্যাপক ফ্রাঁসোয়া টসকুয়েলের (১৯১২-৯৪)-এর অধীনে কাজ করার উদ্দেশ্যে ফরাসি দেশে ফিরে আসেন। সেই সময়ে অধ্যাপক ফ্রাঁসোয় টসকুয়েল সামাজিক থেরাপির ক্ষেত্রে উদ্ভাবনীমূলক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছিলেন। অধ্যাপক ফ্রাঁসোয়ার এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা ফানোর চিন্তায় গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল। অধ্যাপক ফ্রাঁসোয়ার সঙ্গে ফানো দুই বছর কাজ করেন এবং তাঁরা যৌথভাবে কিছু গবেষণাপত্রও প্রকাশ করেন।
ফানো ১৯৫২ সালে মেরি জোসেপ ডাবল (১৯৩১-৮৯) ওরফে জোসি ডাবল নামে একজন ফরাসি শ্বেতাঙ্গিনীকে বিয়ে করেন। লিয়ন শহরে পড়ালেখা করার সময় জোসি ডাবলের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়েছিল। জোসি ছিলেন খুবই আকর্ষণীয়া ও অত্যন্ত গম্ভীর প্রকৃতির নারী। তাঁর পারিবারিক পটভূমি ছিল সমাজবাদী চিন্তাভাবনাসম্পৃক্ত এবং ফানোর চিন্তাভাবনার বিকাশে তিনি ব্যাপকভাবে সহযোগিতা করেন। ফানোর লেখাজোখার টীকাভাষ্য ও তথ্য-উপাত্ত লেখার কাজে সাহায্য করেছেন জোসি। তিনি এমন এক ব্যক্তিত্বসম্পন্না ছিলেন যাঁর মধ্যে ফানো বুদ্ধিবৃত্তিক বন্ধুত্ব ও দাম্পত্য সঙ্গী – দুটোই খুঁজে পেয়েছিলেন। ফলে তাঁদের দাম্পত্যজীবন ছিল আন্তরিক ও সহযোগিতাপূর্ণ।
ফরাসিদেশে ফানো নিজের লেখা প্রকাশ করেন এবং বাম বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন। তিনি বিশেষভাবে ডা. মার্সেল কলিন নামে একজন বাম বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন, যিনি ফরাসি প্রতিরোধের সময় একটা ‘গোপন’ পত্রিকা প্রকাশ করতেন। ফরাসি দেশে অবস্থানকালে ফানো অনেক দুঃখজনক অভিজ্ঞতা অর্জন করেন এবং ফরাসিদের শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদ ও ভণ্ডামির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেন। ফরাসি লোকজন কখনো ভোলেনি যে, ফানো একজন কৃষ্ণাঙ্গ এবং তাদের চেয়ে আলাদা। ফরাসি দেশে সর্বদা বর্ণ একটা বিশেষ ভূমিকা পালন করে – ফানো এটা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন।
আলজেরিয়ায় ফানো
১৯৫৩ সালে ফ্রাঞ্জ ফানো সকল গুরুত্বপূর্ণ ‘Medicate des hospitaux psychiatriques’ পরীক্ষা সফলতার সঙ্গে সমাপ্ত করেন এবং পরীক্ষা পাশের পর মার্তিনিকের একটা হাসপাতালের পরিচালক পদে যোগদানের জন্য আমন্ত্রণ পান তিনি। তবে তিনি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন এবং আলজেরিয়ায় ‘Chef de Service’ পদ গ্রহণ করেন। ১৯৫৩ সালের নভেম্বর মাসে ফানো আলজেরিয়ায় পৌঁছান। সে-সময়ে ফরাসি দেশে ও আলজেরিয়ায় বিপ্লব ধীরে ধীরে অগ্রসর হতে থাকে। আলজেরিয়ায় খণ্ড খণ্ড সন্ত্রাসবাদের কারণে ইউরোপীয় আবাসস্থল থেকে ঐতিহ্যবাহী ‘কাসচাহ’ বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। ফানো আলজেরিয়ার হাসপাতালের কাজে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে উৎসর্গ করেন এবং অধ্যাপক ফ্রাঁসোয়া এসকুয়েল সেন্ট আলবান হাসপাতালে যেভাবে উন্নয়ন করেছেন, ঠিক সেই ধরনের পরিবর্তন আনার আপ্রাণ প্রয়াস চালান। তিনি হাসপাতালের কর্মচারীদের মধ্যে গভীর প্রভাব বিস্তার করেন এবং কথিত আছে, হাসপাতালের একজন নার্স বলেন, ‘তিনি আমাদের বিংশ শতকে নিয়ে এসেছেন।’
তখন আলজেরিয়ায় আরবদের অবস্থা খুবই শোচনীয়। ফরাসিদের বর্বতার মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলেছে। প্রতিক্রিয়ায় আরবরা হাতে অস্ত্র তুলে নেয়। সশস্ত্র আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। ১৯৪৭ সালে একটা ক্ষুদ্র গোষ্ঠী ‘দি অর্গানাইজেশন স্পেশাল’ অস্ত্র সংগ্রহ ও সশস্ত্র বিদ্রোহের জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৪৯ সালে আহমেদ বেন বেল্লা (১৯১৬-২০১২) ‘দ্য অর্গানাইজেশন স্পেশাল’-এর দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং আলজেরিয়ায় ফরাসিদের বিরুদ্ধে সহিংসতার প্রচার শুরু করেন। আলজেরিয়ার বিদ্রোহী গোষ্ঠীসমূহ সম্মত হয় যে, স্বাধীনতা অর্জনের একমাত্র পথ হলো সশস্ত্র বিদ্রোহ। আলজেরিয়ার বিপ্লবী গোষ্ঠী ‘ফ্রন্ট ডি লিবারেশন ন্যাশনাল’, সংক্ষেপে এফএলএন, ১৯৫৪ সালের ১লা নভেম্বর আলজেরিয়ায় ফরাসিদের উপস্থিতির বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহের ঘোষণা দেয়। ঠিক এমন পরিস্থিতিতে ফানো আলজেরিয়ায় এসেছিলেন।
প্রথমদিকে ফানো আলজেরিয়ায় এফএলএনকে সহযোগিতা করেছিলেন। তিনি দিনের বেলায় ফরাসি নিপীড়কদের চিকিৎসা করতেন এবং রাতে ফরাসিদের হাতে নির্যাতিত আলজেরিয়ানদের চিকিৎসা দিতেন। ১৯৫৬ সাল নাগাদ এই দ্বৈতজীবন অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। তাঁর চারপাশে ত্রাস; তাঁর নার্সরা দিন দিন অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে এবং তিনি বুঝতে পারছেন দিন দিন তাঁর কর্মক্ষমতা অকার্যকর হতে চলেছে। এমন এক ভয়াবহ পরিস্থিতিতে তিনি পদত্যাগ করেন। ফানো দেখলেন, আলজেরিয়ার মতো একটা প্রান্তিক ঔপনিবেশিক অঞ্চলে অর্থনৈতিক অবদমন, রাজনৈতিক সহিংসতা, বর্ণবাদ, অত্যাচার, খুন ও অমানবিক অধঃপতন – সবকিছুর সরাসরি কারণ হলো সামাজিক পরিস্থিতি। ফ্রাঞ্জ ফানোর মতো একজন বিপ্লবী ও সংবেদনশীল মানুষ এটা সহজে হজম করতে পারেননি। এমন পরিস্থিতিতে এফএলএনের প্রতি সহানুভূতিশীল চিকিৎসকদের ডাকা হরতালে তিনি অংশগ্রহণ করেন। এ-কারণে ১৯৫৭ সালের জানুয়ারি মাসে ঔপনিবেশিক সরকার আলজেরিয়া থেকে ফানোকে বহিষ্কার করে।
তিউনিশিয়ায় ফানো
আলজেরিয়া থেকে বহিষ্কারের পর ফানো সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য জোসি ডাবলের পরিবারের সঙ্গে লিয়ন শহরে অবস্থান করেন। তারপর তিনি এফএলএনের পক্ষে কাজ করার উদ্দেশ্যে তিউনিশিয়া গমন করেন। সেখানে তখন তিনি ছিলেন একজন ‘পেশাদার বিপ্লবী’, সম্পূর্ণরূপে এফএলএনের আওতাধীন এবং তাঁর জীবন ছিল আলজেরিয়ান বিপ্লব। মনে হয় তখনো সংগঠন তাঁকে যে দায়িত্ব অর্পণ করে তিনি তা পালন করতেন। তিনি বিপ্লবের কারণে প্রাসঙ্গিক যে-কোনো ধরনের অ্যাকাডেমিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডের প্রসার ঘটাতেন।
ফানো তিউনিশিয়ায় অবস্থানকালে এফএলএনের মুখপত্র আল মুজাহিদ-এর সম্পাদকীয় পরিষদের একজন সদস্য হিসেবে কাজ করতেন। তিনি পত্রিকাটিকে একটা রেডিক্যাল রূপ দান করেন এবং বিপ্লবের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে মন্তব্য লিখতেন। তাছাড়া তিনি কৃষ্ণ আফ্রিকা ও আফ্রিকার ঐক্য প্রসঙ্গে কিছু নিবন্ধ প্রকাশ করেন।
একজন পেশাদার বিপ্লবী হিসেবে তাঁর নতুন মর্যাদা সত্ত্বেও তিনি তিউনিশ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতেন এবং ডাক্তার ফারেস ছদ্মনামে মানুবা শহরে সরকারি একটা মনোচিকিৎসা হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা দিতেন।
তিনি তিউনিশিয়ায় অবস্থানকালে দি ফিফথ ইয়ার অফ দ্য আলজেরিয়ান রেভলিউশন বইটি প্রকাশ করেন। এই বইটা কোনো না কোনোভাবে কার্ল মার্কস (১৮১৮-৮৬) রচিত দ্য এইটটিন ব্রুমায়ার অফ লুই বোনাপার্ট বইটির সঙ্গে বেশ সাদৃশ্যপূর্ণ। এটা হলো আলজেরিয়ার সমাজের ওপর বিপ্লবী যুদ্ধের প্রভাবের একটা সমাজতাত্ত্বিক সমীক্ষা। কারণ এই বইটাকে একদিক থেকে ফ্রাঞ্জ ফানোর অধিকতর প্রসিদ্ধ দ্য রেসেড অফ দ্য আর্থ বইটির পরিশিষ্ট হিসেবে দেখা যেতে পারে।
তিউনিশিয়ায়, মনে হয়, তিনি একজন প্রতিবুদ্ধিজীবীর ভূমিকা ও রাজনৈতিক আন্দোলনকারীর সামাজিক শক্তি অর্জন করেছিলেন। দেখা যায়, আলজেরিয়ার বিপ্লবের জন্য তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ নিবেদিতপ্রাণ। তিনি এফএলএনের কূটনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবেও ভূমিকা পালন করেছেন। ১৯৫৮ সালের ডিসেম্বরে ফানো ঘানার রাজধানী আক্রায় ‘অল আফ্রিকান পিপলস্ কনফারেন্সে’ অংশগ্রহণ করেন। সেই সম্মেলনে তিনি যুক্তি দিয়ে বিউপনিবেশায়নের জন্য সহিংসতার প্রয়োজনীয়তার প্রস্তাব রাখেন।
১৯৫৯ সালের মার্চ মাসে রোমে অনুষ্ঠিত কৃষ্ণাঙ্গ লেখকদের দ্বিতীয় সম্মেলনে ফানো অংশগ্রহণ করেন। সেখানে তিনি একজন অ্যাটিলীয় প্রতিনিধি হিসেবে ভাষণ দেন। তখন ফানোর বিশ্বমানবতা উদার হতে শুরু করে। ১৯৬০ সালের জানুয়ারি মাসে তিউনিশ শহরে অনুষ্ঠিত ‘সেকেন্ড কনফারেন্স অফ আফ্রিকান পিউপিলসে’ আলজেরিয়ার প্রতিনিধিদের একজন সদস্য হিসেবে তিনি অংশগ্রহণ করেন।
এ-সময়ে আলজেরিয়ার স্বাধীনতার পক্ষে ফানোর একক অবদান ছিল আলজেরিয়ার সংগ্রামের আন্তর্জাতিক রূপদান করা। এসব সম্মেলনে তাঁর লেখাজোখা ও বক্তৃতায় তিনি বোঝাতে চেষ্টা করেছেন, এটা শুধু কোনো আরব জাতীয়তাবাদী আন্দোলন নয়, বরং এটা হলো আফ্রিকা এবং তৃতীয় বিশ্বের স্বাধীনতার জন্য সমগ্র বিশ্ব-আন্দোলনের একটা অংশ।
ঘানার রাজধানী আক্রাতে ফানো
১৯৬০ সালের মার্চ মাসে ফানো ঘানার রাজধানী আক্রাতে আলজেরিয়ার অস্থায়ী সরকারের প্রতিনিধি নিযুক্ত হন। আফ্রিকায় ‘দ্য পজিটিভ কনফারেন্স ফর পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি’, গিনির রাজধানী কোনাক্রিতে ‘দি আফ্রো-এশিয়ান সলিডারিটি কনফারেন্স’ এবং ১৯৬০ সালের জুন মাসে ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবাতে অনুষ্ঠিত ‘দ্য থার্ড কনফারেন্স অফ ইনডিপেন্ডেন্ট আফ্রিকান স্টেটসে’ তিনি আলজেরিয়ার একজন সরকারি প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন।
আলজেরিয়ার স্বাধীনতার কথা তুলে ধরার জন্য ফানো অনেক সময় সফর করেছেন এবং আফ্রিকান স্বাধীনতার পক্ষে যুদ্ধ করতে আফ্রিকান সেনাবাহিনী গড়ে তোলার জন্য ব্যাপক প্রচার চালিয়েছেন। গিনির রাজধানী কোনাক্রিতে ফানোর কাজ ছিল নীরবে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। ঘানার জাতীয় বুর্জোয়াদের দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জন, অতিমাত্রায় ভোগ, কর্তৃত্ববাদ এবং দারিদ্র্যের মধ্যে প্রাচুর্যের নির্লজ্জ প্রদর্শন – ফানো তাঁর রেসেড অফ দ্য আর্থ বইতে এসব সমস্যার তীব্র নিন্দা করেছেন। আক্রাতে ফানো কোনো ধরনের চিকিৎসা বা মনোচিকিৎসার কাজ করেননি। কারণ তিনি ছিলেন আক্রাতে সরকারি প্রতিনিধি – চিকিৎসাশাস্ত্রচর্চার কোনো অনুমতি তাঁর ছিল না।
ফানোকে হত্যাচেষ্টা
ফ্রাঞ্জ ফানো জীবিতকালে একাধিকবার হত্যাচেষ্টার মুখোমুখি হয়েছেন। এতে প্রমাণ হয় যে, আলজেরিয়ার স্বাধীনতা আন্দোলন এবং আফ্রিকার সামগ্রিক স্বাধীনতা সংগ্রামী শক্তির জন্য ফানোর গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। ১৯৫৯ সালে একবার ফানো আলজেরিয়া-মরক্কো সীমান্ত এলাকায় ক্যাম্প পরিদর্শনে যান, তখন তাঁর গাড়িতে বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। সেই বোমা বিস্ফোরণ কে বা কারা ঘটিয়েছিল, তা নিয়ে অনেক মতামত বা সন্দেহ ছিল। বলা হয়, সেটা ছিল রহস্যজনক। আর একবার যখন ফানো বিশেষ চিকিৎসার জন্য তিউনিশিয়া থেকে ইতালির রাজধানী রোমে আকাশপথে ভ্রমণ করেছিলেন, সে-সময় তাঁকে দুবার হত্যার চেষ্টা চালানো হয়। অনুমান করা হয়, ফরাসি গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন তাঁকে হত্যার চেষ্টা চালিয়েছিল।
১৯৬০ সালে তাঁকে একবার অপহরণ করার অপপ্রয়াস চালানো হয়েছিল। তিনি যখন গিনির রাজধানী কোনাক্রি থেকে লাইবেরিয়ার রাজধানী মনরোভিয়া যাচ্ছিলেন, তখন অপহরণচেষ্টার মুখোমুখি হন। সে-সময়ে তিনি ছিলেন ঘানার রাজধানী আক্রাতে আলজেরিয়ার অস্থায়ী সরকারের প্রতিনিধি। সে-কারণে তাঁকে পশ্চিম আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ঘনঘন সফর করতে হতো। একধরনের রহস্যের বা বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, হানাদারদের এত প্রয়াস ব্যর্থ করে দিয়ে বিপ্লবী ফানো সক্রিয় ছিলেন।
ফানোর অসুস্থতা ও মৃত্যু
১৯৬০ সালের শেষের দিকে ফানো ‘লিউকোমিয়া’ অর্থাৎ রক্তের ক্যান্সার বা যাকে বলা হয় ব্লাড ক্যান্সারে, আক্রান্ত হন। তাঁকে চিকিৎসার জন্য তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নে পাঠানো হয় এবং রাশিয়ান চিকিৎসকরা তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পরামর্শ দেন – যেখানে ক্যান্সারের উৎকৃষ্ট চিকিৎসাব্যবস্থা বিদ্যমান। তবে বিপ্লবী ফানো বলেন, ‘আমি খুনিদের দেশে যাব না।’ সোভিয়েত ইউনিয়নের চিকিৎসা তাঁকে সাময়িক নিরাময় দান করে। তারপর তিনি পুনরায় ঘানার রাজধানী আক্রাতে ফিরে যান এবং নিজেকে প্রচণ্ডভাবে কাজে ব্যস্ত রাখেন। এমনভাবে কর্মব্যস্ত থাকেন যেন তিনি একদম স্বাভাবিক ও সুস্থ আছেন।
সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে তিউনিশিয়ায় ফিরে ১৯৬১ সালের মে মাসে ফানো তাঁর রেসেড অফ দ্য আর্থ পুস্তকের শেষ অধ্যায় নিয়ে কাজ করছিলেন। এমন সময় তিনি আবার রোগে আক্রান্ত হন। তাঁর বন্ধুরা তাঁকে চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। সেখানে গিয়ে পুনরায় অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তাঁর বই রেসেড অফ দ্য আর্থের প্রুফ দেখতে দেখতে ১৯৬১ সালের ৬ই ডিসেম্বর মারা যান। তাঁর এই বইটি পরবর্তীকালে জগৎজোড়া খ্যাতি ও সম্মান এনে দেয়। আল মুজাহিদ পত্রিকায় লেখা সম্পাদকীয় লেখাজোখার কয়েকটি এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে উপস্থাপিত প্রবন্ধের কয়েকটি সংগ্রহ করে তাঁর ইন্তেকালের পর টুওয়ার্ডস দ্য আফ্রিকান রেভলিউশন পুস্তকটি প্রকাশ করা হয়।
ফ্রাঞ্জ ফানোর জীবনীকার পিটার গিসমার তাঁর ‘ফ্রাঞ্জ ফানো : এভুলেশন অফ এ রেভলিউশনারি’ প্রবন্ধে বলেন, ‘ফানো ছিলেন আলজেরিয়ান, লিভড আলজেরিয়ান – বাট ডাইড আফ্রিকান।’ বিপ্লবী ফানো এমন একজন সংগ্রামী মানুষ যিনি আলজেরিয়া, আফ্রিকা ও তৃতীয় বিশে^র স্বাধীনতার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.