নেমে এসো বৃষ্টি ফোঁটার অনিবার্যতায়
মুজিব রাহমান – তৃতীয় চোখ, চট্টগ্রাম – ঢাকা, ২০২৪ ষ ২৫০ টাকা
ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক মুজিব রাহমান কবিতা রচনার পাশাপাশি একজন অনুবাদক ও প্রাবন্ধিক হিসেবেও পাঠকের কাছে পরিচিত। এ-পর্যন্ত তাঁর তিনটি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে। প্রথমটি কিশোর-কবিতার বই হাসিখুশির খেয়া (২০০৯)। তারপর পাঠকের হাতে আসে সব ডালে পাখিরাও বাঁধে না বাসা (২০২১)। তাঁর সাম্প্রতিক কবিতার বই নেমে এসো বৃষ্টি ফোঁটার অনিবার্যতায় (২০২৪)। পাঁচ ফর্মার একটি বই। বাহাত্তর পৃষ্ঠা জুড়ে পঁয়ষট্টি কবিতা রয়েছে এতে। কবিতাগুলির ভাব, ভাষা ও বিষয় বৈচিত্র্যের চমৎকার উপস্থাপনে পাঠক মুগ্ধ হবেন। মুজিব রাহমানেরকবিতার মনোযোগী পাঠকরা লক্ষ করবেন, তাঁর কবিতায় রয়েছে নানা বিষয়ের সমাহার। তিনি কবিতায় ঐতিহ্য বজায় রাখেন, লুকিয়ে রাখেন নানা রূপকল্প ও গল্পকথা, ছড়িয়ে রাখেন দর্শনের প্রভাব।
পল্লি-প্রকৃতি থেকে শুরু করে ইতিহাস-ঐতিহ্য আর নাগরিক জীবনের অনিবার্য গোঙানি ইত্যাদি নানামুখী শব্দের সমাহার ঘটে তাঁর কবিতায়। সেখানে তিনি যেমন অন্ত্যমিল-ছন্দের ব্যবহার করেন, তেমনি গদ্যছন্দকেও কাজে লাগান নিপুণ মুনশিয়ানায়। আধুনিক উপমা-রূপক-চিত্রকল্পেরও নানারকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন; নতুন পথের সন্ধান করেন প্রতিনিয়ত।
কবির এই ব্যতিক্রমী চিন্তার নমুনা পাই কবিতার বইয়ের নামকরণের বেলায়। এই বইয়ে কোনো নামকবিতা নেই। অর্থাৎ কোনো কবিতার নামকে কেন্দ্র করে বইয়ের নামকরণ করেননি। নামকরণ করেছেন প্রথম কবিতার প্রথম পঙ্ক্তি দিয়ে। তবে কবিতাগুলির নামও বেশ বৈচিত্র্যময়। পাঠকের সামনে কবিতাক্রম বা সূচিপত্র থেকে কবিতাগুলির শিরোনাম তুলে ধরা যাক : ‘অপেক্ষা’, ‘ভেঙে যায় সব গান’, ‘স্মৃতি’, ‘অনর্থ আখ্যান’, ‘জলই প্রবল’, ‘অস্তিত্ব’, ‘সময়’, ‘আত্মরতির বেদিমূলে’, ‘আবহমান সংরাগ’, ‘আলোয় ঢাকা অন্ধকার’, ‘সিসিফাস’, ‘রক্তাক্ত প্রান্তর পেরিয়ে’, ‘হালের দুনিয়া’, ‘অন্তর্লীন উচ্চারণ’, ‘চরৈবেতি’ ইত্যাদি।
‘নেমে এসো বৃষ্টি ফোঁটার অনিবার্যতায়/ ছড়িয়ে যাও জলের একান্ত ধর্মে’ এমন আহ্বান আর অনুভবের একটি কবিতা (‘অপেক্ষা’) এই কটি কথা দিয়ে শুরু হয়েছে। শেষ হয়েছে পাঁচটি পঙ্ক্তি দিয়ে, যাদের সঙ্গে শুরুর কামনার একটা গভীর যোগসূত্র আছে : ‘আহা, ইচ্ছে!/ কতো কোটি কোটিবার/ অশ্রুতে সমাহিত হয়েছো তুমি/ অনিচ্ছায় অপারগতায়/ আহা, ইচ্ছে!’ (‘ইচ্ছে’)। কড়া যে মুজিব রাহমান ভুল ঠিকানায় এসে নাড়েননি, তা এই বইতে সংকলিত কবিতাগুলি পড়লে বোঝা যায়। আরো বোঝা যায় সময়টা তাঁর খুবই নিঃসঙ্গ, কিন্তু নিঃসঙ্গতায় পীড়িত হতে হতেও তিনি আনন্দকে খুঁজেছেন, জীবনানন্দকে, যার ভূগোলটা যদিও খুঁজে পাওয়া কঠিন। তবু তিনি অবলীলায় ঘোষণা করেন :
ধর্ম-বর্ণ-জাত অভিমান সর্বনাশের মূল
মানুষই হোক শেষ পরিচয় ফুটুক অযুত ফুল।
(‘ফুটুক অযুত ফুল’)
‘সর্বনেশে সময়ে’ দাঁড়িয়ে কবি অকপটে জানান তাঁর আকাঙ্ক্ষা আর ইচ্ছের কথা; অথচ কাব্য শেষ হয় তাঁর ইচ্ছা সমাহিত হয়ে। যে মেজাজটা এই চাওয়া-পাওয়ার, আনন্দ-বিষাদের দ্বন্দ্বে প্রকাশ পায়, তাকে রোমান্টিক বললে ভুল হবে না, যদিও রোমান্টিকতাকে আধুনিকেরা সন্দেহ করেন, বান্তবের কঠিন সব আঘাতের সময় তা অপ্রকৃত হয়ে দাঁড়ায় বলে। তবে এইসব অনুভবের বেশ কিছু কবিতা একনাগাড়ে পড়লে, তাদের ভাব ও ভাবনার জগৎটায় ঘুরে বেড়ালে দেখা যাবে, রোমান্টিক মেজাজটাকেই তারা প্রাধান্য দেয়, যদিও মাঝে মধ্যে কিছু কবিতায় বাস্তবতার বোধগুলি প্রবল। ইংরেজ রোমান্টিক কবি পার্সি বাইশে শেলি (১৭৯২-১৮২২) একটি কবিতায় লিখেছিলেন, ‘আমাদের মধুরতম গানগুলি সেই, যা সবচেয়ে দুঃখের চিন্তাগুলি বলে।’ আনন্দ-বিষাদের সমীকরণটা মেলাতে শেলি চেষ্টা করেছেন, অধুনা বিশ্বের রোমান্টিক অন্যান্য কবি করেছেন। মুজিব রাহমানও করেছেন, লিখেছেন : ‘মানুষ তো মারা গেছে আজ বহু কাল/ জেগে আছে শুধু তার স্মৃতির কংকাল। … এখন তো কলম মৃত কালামের কাল/ এখন তো চৌদিকে লেলিহান লাল’ (‘অনর্থ আখ্যান’)। সত্যিকার যাঁরা রোমান্টিক, তাঁরা এই রোদনকে শিল্পকর্মে রূপদানের চেষ্টাটাকেই গুরুত্ব দেন, প্রাপ্তিটা অনেক দূরের বলে। কিন্তু যখন সমীকরণটা তাঁদের হাতে ধরা দেয়, যার স্থায়িত্ব এতই অল্পসময়ের যে শুধু অনুভবেই তার স্পর্শ থেকে যায়, একটা গভীর জীবনসত্য হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তারপর মিলিয়ে যায়। অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের মতে, ‘এই মুহূর্তটা এপিফ্যানির; এর সন্ধানে কবিরা দিনরাত কাটিয়ে দেন। কবি মুজিব রাহমানও এর ব্যতিক্রম নন। তাই তাঁর বিস্ময়জড়ানো প্রশ্ন :
গাছের তো সবই সয় তবু তার
গোড়ায় কুড়োলের কোপ
কার কী আসে যায় এ ধরায়
তাবৎ সবুজ হলে লোপ!
(‘ভেঙে যায় সব গান’)
দুই যুগের অধিক ইংরেজি সাহিত্যে অধ্যাপনার অভিজ্ঞতা অর্জন করে বর্তমানে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড চট্টগ্রামের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের পদে অধিষ্ঠিত কবি মুজিব রাহমান। তাঁর কবিতাগুলি পাঠকের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে।
সুখপাঠ্য বলে একটা কথা আছে। সুখপাঠ্য কবিতার প্রধান যে-দুটো শর্ত : ‘উপমাই কবিত্ব’ আর ‘সুপরিচিত চিত্রকল্প’ –
এ-দুটোই কবি মুজিব রাহমানের কবিতায় লক্ষণীয়। যেমন : ‘সন্তানের মুখ দেখবে বলে/ গর্ভীণীর অপেক্ষা-ধর্ম সম্ভাব্য মৃত্যুকেও/ উপেক্ষা করে, তেমনি অপেক্ষা করো’ (‘অপেক্ষা’)। এখানে তাঁর অপেক্ষার উপমা বস্তু, ভাব ও অনুভবকে জড়িয়ে এক কাব্যময় চিত্রকল্পের রূপ ধরে পাঠকের সামনে হাজির হয়। বাংলার নগর-বন্দর, নদী-নালা ও খাল-বিল থেকে তুলে আনা সাধারণের সুপরিচিত উপমা-চিত্রকল্প দিয়ে মূর্ত করে তোলেন কবি আপন মনোজগৎ। পঞ্চাশ পেরিয়েও তাঁর দিলদরিয়ায় উঁকি দেয় বালকবেলার স্নানঘরের স্মৃতি : ‘সেই সব স্মৃতি পিচ্ছিল মাছ হয়ে/ ঘাই মেরে যায় মনের সরোবরে/ আকস্মিক ফসকে যাওয়া সেই সব/ সাবানের মতো’ (‘স্মৃতি’)! তবে কবি মুজিব রাহমানের এইসব অনুভবের একটা বড় গুণ এর পরিমিতিবোধ। অযথা একটি শব্দও কবি ব্যবহার করেননি; অতিশয়োক্তি নেই, অতিকথন নেই। সমকালের যে বীভৎসতা কিংবা বিমুগ্ধতা কবি হৃদয়ে দোলা দিয়েছে, যে অনিবার্য কাব্যভাষা হয়ে আবির্ভূত হয়েছে, তাদেরই কবি শিল্পসুষমা দিয়ে পাঠকের কাছে পরিবেশন করেছেন। কবিতাপ্রেমী সকল প্রগতিশীল মানুষের ভালো লাগবে এই বইয়ের কবিতাগুলি – এমনটা আশা করা যায়।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.