অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন : কেন কিছুই না থেকে কিছু রয়েছে?

বিশাল এই মহাবিশ্বে আমাদের এখন পর্যন্ত জানামতে মানুষ হচ্ছে একমাত্র প্রজ্ঞাবান প্রাণী। জগৎ সম্পর্কে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে শিশুরা যেমন তাদের পিতা-মাতার কাছে কিছু সরল প্রশ্ন উত্থাপন করে, তেমনি আমাদের দার্শনিক-বৈজ্ঞানিকরাও সেরকম কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন – আমরা কারা? আমরা কোথায় আছি? আমরা কি একা? কেন আমরা এখানে? আমাদের ভবিষ্যৎ কী? অস্তিত্ব কাঁপানো এ-প্রশ্নগুলো আমাদের স্নায়ুতে হিমশীতল স্রোত বইয়ে দেয়। তবে এ-প্রশ্নগুলোর মধ্যেও সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হচ্ছে – কেন কিছুই-না থেকে কিছু রয়েছে (why there is something, rather than nothing)? আমাদের আদিযুগ থেকে আজ পর্যন্ত খ্যাত-অখ্যাত বহুলোকের মনেই হয়তো এরকম একটি প্রশ্ন উঁকি দিয়েছে, কিন্তু আমাদের জানামতে যে বিজ্ঞানী-দার্শনিক এ-প্রশ্নটি লিখিতভাবে উত্থাপন করেছিলেন, তিনি হচ্ছেন গটফ্রিত উইলহেল্ম লাইবনিজ (১লা জুলাই, ১৬৪৬ – ১৪ই নভেম্বর, ১৭১৬)। সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি জার্মানিতে জন্ম নেওয়া বহুশাস্ত্রজ্ঞ এই মানুষটি আমাদের উপহার দিয়েছিলেন আধুনিক সভ্যতার দুটো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যার একটি হচ্ছে ক্যালকুলাস, অন্যটি আধুনিক কম্পিউটারের প্রাণভোমরা বাইনারি পরিগণন পদ্ধতি।

আমাদের অনেক চিন্তাবিদের মধ্যেই হয়তো এ-চিন্তাটা এসেছে যে, মহাবিশ্ব দেখতে কেন ঠিক এরকম? তবে লাইবনিজ তাঁদের চেয়ে আরো একটু এগিয়ে এসে প্রশ্ন করলেন – ‘এই মহাবিশ্বটি আদৌ রয়েছে কেন?’ এ-প্রশ্নটি নিঃসন্দেহে খুবই কৌতূহলোদ্দীপক, কেননা কিছুই না থাকলে কেমন হতো? কোনো পৃথিবী, কোনো তারকা, কোনো ছায়াপথ অথবা মহাবিশ্ব – কিছু নয়! লাইবনিজ স্বভাবতই ভেবে নিয়েছিলেন যে, তেমন হওয়াটাই তো আরো সহজ হতো, কেননা সে-রকম ক্ষেত্রে কেউই প্রশ্ন করত না এতকিছু কেন রয়েছে এবং এগুলো কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে। এজন্যেই লাইবনিজ ভাবলেন, যেহেতু এতকিছু রয়েছে, তাই এগুলো কীভাবে এলো তার একটি যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা অবশ্যই খুঁজতে হবে। তিনি অবশ্য এর কারণ হিসেবে যে-যুক্তি দিয়েছিলেন, তা হচ্ছে – ‘ঈশ্বর একটি মহাবিশ্ব তৈরি করতে চেয়েছিলেন, যেটি হবে সর্বোত্তম ও নিখুঁত’ এবং এটিই হচ্ছে কিছুই-না থেকে কিছু থাকার একমাত্র কারণ। লাইবনিজের মৃত্যুর পর তাঁর উত্থাপিত এ-প্রশ্নটি দার্শনিক ও বিজ্ঞানী মহলে আজ পর্যন্ত আলোচিত হয়ে এসেছে, তবে আধুনিক জগৎ চিরাচরিত ধর্মের প্রবল প্রভাব থেকে বেরিয়ে এসেছে বলে বর্তমান পৃথিবীতে ধীরে ধীরে স্থান করে নিয়েছে ইহজাগতিকতা, যার প্রবক্তা এর সমাধান হিসেবে ঈশ্বরকে টেনে আনাটা খুব একটা পছন্দ করেন না।

সপ্তদশ শতকেরই আরেক দার্শনিক, লাইবনিজের চেয়ে বয়সে সামান্য বড়, ওলন্দাজ দার্শনিক বারুখ স্পিনোজার (২৪শে নভেম্বর, ১৬৩২ – ২১শে ফেব্রুয়ারি, ১৬৭৭) এরকম একটি ধারণা ছিল যে, কিছু না থাকাটা নিয়মবহির্ভূত – কিছু একটা থাকতেই হবে। স্পিনোজা ভাবতেন যে, মহাবিশ্বকে আমরা যে রূপে অস্তিত্বমান দেখে থাকি, তার নিয়মসূত্র ও ঘটনাপ্রবাহ সেরকমটিই থাকা উচিত ছিল এবং তা-ই রয়েছে। তাঁর পরবর্তীকালে আইনস্টাইন, যিনি নিজেই ছিলেন স্পিনোজার ভাবশিষ্য, তিনিও এর কাছাকাছি কিছু বিশ্বাস করতেন। লাইবনিজ-উত্থাপিত প্রশ্নটি নিয়ে নতুন করে আলোচনা করেছেন তাত্ত্বিক পদার্থবিদ লরেন্স ক্রাউস, তাঁর ‘শূন্য থেকে মহাবিশ্ব’ (A Universe from Nothing, ২০১২) বইটিতে। ক্রাউস এতে বলেছেন যে, মহাকর্ষের কোয়ান্টাম শূন্যতা বা অস্থিরতা (Quantum Vacuum  ev fluctuation) থেকে আমাদের মহাশূন্য প্রাকৃতিকভাবে এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবেই সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে শূন্যস্থানে ভার্চুয়াল বস্তুকণা মিলিয়ে যাওয়ার আগে পর্যন্ত স্বতঃস্ফূর্তভাবে অস্তিত্বশীল হয়ে উঠেছে। ক্রাউসের বক্তব্য অনুযায়ী ‘কিছু-না’ বলে কখনো কিছু ছিল না এবং সবসময়ই ‘কিছু একটা’ ছিল – প্রথমে ছিল মহাকর্ষ ও কোয়ান্টাম শূন্যতা, যা থেকে উদ্ভূত হয়েছে মহাবিশ্ব এবং যাকে আমরা এমনটা দেখছি। এ-ধরনের আরো কিছু থিয়োরি রয়েছে, যেগুলোতে ধারণা করা হয় যে, সবসময়ই কিছু একটা ছিল – যেমন স্ট্রিং বা মেমব্রেন, যা থেকেই উদ্ভূত হয়েছে জগৎ। তবে এই মহাকর্ষ, কোয়ান্টাম শূন্যতা, স্ট্রিং কিংবা মেমব্রেন – এগুলোর কথা আমরা কেন চিন্তা করব, তা আমাদের কাছে পরিষ্কার নয়। এমনটিও হতেই পারে যে, একসময়ে একেবারে কিছুই ছিল না!

লাইবনিজ-উত্থাপিত এই বৃহৎ প্রশ্নটির আরো একটি উত্তর হতে পারে – এর যে একটি উত্তর রয়েছে, তা-ই অস্বীকার করা। দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলকে ১৯৪৮ সালে একটি রেডিও বিতর্কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘মহাবিশ্ব কেন অস্তিত্বমান – এর উত্তর তাঁর কাছে কী মনে হয়?’ তিনি তখন উত্তর দিয়েছিলেন – ‘আমি শুধু এটাই বলতে পারি যে, মহাবিশ্ব অস্তিত্বশীল আছে, আর এটাই আমি জানি।’ বিজ্ঞানীরা বলতে সক্ষম কীভাবে এ-মহাবিশ্বের উৎপত্তি হয়েছে, কিন্তু কেন এটির উৎপত্তি হয়েছে – তা বলতে তাঁরা অক্ষম। স্টিভেন ওয়েলবার্গের কথার প্রতিধ্বনি করে আমরা বলতে পারি যে, চন্দ্র-সূর্য-তারকাসমূহ তাদের নিজেদের স্থানে রয়েছে এটা না জেনেই যে, পৃথিবীতে কেউ তাদের দিকে তাকিয়ে রয়েছে এবং তাদের আবর্তন গুনে গুনে বৎসর-দিন-মাস গুনছে।

দার্শনিকদের কাছে এটি হয়তো মাত্র একটি নিষ্ঠুর সত্য (Brute fact) যে, কেন কিছু রয়েছে, তার কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। বার্ট্রান্ড রাসেল এটাই বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, এর কোনো ব্যাখ্যা হয় না। যাঁরা বলতে চান যে, আমাদের এই মহাবিশ্ব আরো অনেক বড় একটি মাল্টিভার্সের ক্ষুদ্র অংশ মাত্র, তাঁরাও এটাই বোঝাতে চান যে, এর কোনো চূড়ান্ত ব্যাখ্যা হয় না। কিন্তু লাইবনিজ-উত্থাপিত এই বৃহৎ প্রশ্নটির কোনো সন্তোষজনক উত্তর যে আমরা এখনো খুঁজে পাচ্ছি না – এটি হয়তো আমাদের বৌদ্ধিক তৃপ্তিদানে অক্ষম। লাইবনিজ হয়তো স্পিনোজা কিংবা রাসেলের মতো এটাই বোঝাতে চেয়েছেন যে, আমাদের মহাবিশ্ব অস্তিত্বমান, কারণ এর অস্তিত্বমান থাকারই কথা। তিনি হয়তো এটিও চিন্তা করেছিলেন যে, সম্ভাব্য সব ধরনের মহাবিশ্বের মাঝে সবচেয়ে উত্তমটি নিয়ে একটি প্রতিযোগিতা হতে পারে – যেমনটা হয় জীবজগতে প্রাকৃতিক নির্বাচনের ক্ষেত্রে। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি সে আইডিয়াটি গ্রহণ করেননি, তার বদলে প্রথাগত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে বলেছেন যে, মহাবিশ্ব অস্তিত্বমান – কারণ ঈশ্বর এমনটাই চেয়েছেন।

কিন্তু সম্ভাব্য এই মহাবিশ্বগুলোর মধ্যে ভার্চুয়াল প্রতিযোগিতা – এরকম একটি ধারণা আধুনিক কিছু বিজ্ঞানী ও দার্শনিকের মাঝে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। যে-মহাবিশ্বে জীবন টিকে থাকতে সক্ষম, সে-মহাবিশ্ব অন্য বন্ধ্যা মহাবিশ্বগুলোর চেয়ে উত্তম শুধু নয়; এমনকি জীবন নিজেই এরকম একটি মহাবিশ্বের অস্তিত্বমান থাকার কারণ – এরকম একটি ধারণাও রয়ে গেছে। অর্থাৎ, ঈশ্বর তৈরি করেছেন বলেই যে আমাদের মহাবিশ্বটি এরকম, তা না-ও হতে পারে। যার পরিবর্তে মহাবিশ্ব নিজেই অনস্তিত্ব থেকে নিজেকে অস্তিত্বমান করেছে। বিষয়টি ভুতুড়ে মনে হচ্ছে? হয়তো তাই, কিন্তু এরকম একটি অসাধারণ দার্শনিক প্রশ্নের উত্তরটিকে অবশ্যই অসাধারণ হতে হবে। এরকমই কিছু উত্তর বেরিয়ে এসেছে বেশ কয়েক বছর আগে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন শহরে অনুষ্ঠিত বিশ্ব নিরীশ্বরবাদী সম্মেলনে (World Atheist Convention) সমবেত ধর্মতাত্ত্বিক ও নিরীশ^রবাদী বিজ্ঞানী-দার্শনিকদের আলোচনা থেকে। এতে অতিথি বক্তা ছিলেন আয়ান হিরসি আলী, রিচার্ড খাউকিন্স, ড্যানিয়েল ডেনেট, স্যাম হ্যারিস, লরেন্স ক্রাউস প্রমুখ স্বনামধন্য চিন্তাবিদ।

২০১২ সালের ১৩ থেকে ১৫ই এপ্রিল পর্যন্ত চলা এই সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীরা তাঁদের মতামত তুলে ধরেন, যা অস্ট্রেলিয়ান মিডিয়াতে প্রচার করা হলে সাধারণ জনগণও তাঁদের তর্ক-বিতর্ক উপভোগ করতে সক্ষম হন। এর মধ্যে সবচেয়ে উপভোগ্য ছিল খ্যাতনামা নিরীশ্বরবাদ জীববিজ্ঞানী রিচার্ড ডাউকিন্স এবং সিডনির আর্চবিশপ কার্ডিনাল জর্জ পেলের মধ্যে অনুষ্ঠিত বিতর্ক – মহাবিশ্ব কীভাবে তৈরি হয়েছিল। এতে আরো আলোচিত হয়েছে, কী করে বিগ ব্যাংগ দেখা দিলো, যার মাধ্যমে ‘কিছু না’ থেকে তৈরি হয়েছে ‘কিছু’ (something from nothing) এবং এটাই ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণ করে কি না।

বিজ্ঞান সম্পর্কে যাঁদের ধারণা খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়, তাঁরাও কিছুটা হলেও চিন্তা করতে পারেন যে, বিগ ব্যাংগের আগে সত্যি কী ঘটেছিল? এর সম্ভাব্য উত্তর দু’রকম হতে পারে – একটি হলো, স্থান ও কাল একই সঙ্গে বিগ ব্যাংগের মাধ্যমেই শুরু হয়েছিল। বিগ ব্যাংগের আগে যেহেতু সময় বলে কিছু ছিল না, তাই প্রকৃত অর্থে ‘আগে’ বলতেও কিছু ছিল না। অর্থাৎ বিগ ব্যাংগের আগে কী ঘটেছিল, এমন প্রশ্ন করাটা অর্থহীন। এ-প্রশ্নটি অনেকটা উত্তর মেরুর উত্তরে কী রয়েছে, এমন একটা  প্রশ্নের মতোই। এর দ্বিতীয় উত্তরটি হলো – আমাদের বর্তমান দৃশ্য মহাবিশ্ব তার উৎপত্তিপূর্ব কোয়ান্টাম শূন্যতা বা অস্থিরতার (Quantum Vacuum  ev fluctuation) একটি ফসল।

আমাদের মহাবিশ্বের জন্ম নিয়ে চেতনা বিকাশ করা এমন বেশ কিছু প্রকল্প এখন আমাদের সামনে চলে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে মাল্টিভার্স বা অগণন মহাবিশ্বের ধারণাও। সেসব আইডিয়া থেকে দু-চারটিকে বিশ্লেষণ করে একটু দেখা যাক।

১. চিরন্তন বিশৃঙ্খল স্ফীতি (Eternal chaotic inflation) : অনেক আগেই এটি রুশ-মার্কিন তাত্ত্বিক পদার্থবিদ আন্দ্রেই লিন্ডে প্রণয়ন করেছিলেন। মহাবিশ্বের স্ফীতি মডেলেরই এটি একটি রূপ, যা ব্যাখ্যা করে যে, জন্মের পরই আদি মহাবিশ্ব কীভাবে অতি দ্রুততার সঙ্গে স্ফীত হয়েছে। এই স্ফীতিকালেই বিভিন্ন স্থান থেকে তৈরি হয়েছে অসংখ্য বুদবুদ মহাবিশ্ব (Bubble Universe) এবং এই স্ফীতি অনন্তকাল ধরে চলতেই থাকবে। এমন একটি বুদবুদ থেকেই আমাদের মহাবিশ্বের জন্ম, যাকে আমরা এখন তার বর্তমান রূপে দেখতে পাচ্ছি। তবে আমাদের দৃশ্য মহাবিশ্ব হচ্ছে অসংখ্য মহাবিশ্ব-বুদবুদের মধ্যে মাত্র একটি – অনেকটা যেন সাবানের ফেনার অসীমসংখ্যক বুদবুদের মাত্র একটি বুদবুদ।

২. আগ্নেয় মহাবিশ্ব (Ekpyrotic Universe) : গ্রিক শব্দ Ekpyrotic মানে হচ্ছে ‘আগুনে রূপান্তরিত হওয়া’, যা থেকে পদার্থবিজ্ঞানী নেইল তুরক এবং পল স্টেইনহার্ড এ-নামটি নিয়েছেন। এটিও অনেকটা বিগ ব্যাংগ প্রকল্পটির মতোই, তবে তার শুরুটা অন্যরকম। এটি বুঝতে হলে আগে স্ট্রিং থিওরিকে ভালো করে বুঝতে হবে। স্ট্রিং থিওরিতে সময়ের অনেক মাত্রা রয়েছে (extra-spatial dimension), যা আমরা চোখে দেখতে পাই না – কারণ তারা অতিক্ষুদ্র জায়গায় ঘনবিন্যস্ত (compactified ev curled up) হয়ে আছে। এর মাধ্যমে বস্তুকণিকাকে ব্যাখ্যা করা হয় স্ট্রিং বা সুতায় এক ধরনের কম্পন বলে, যা রয়েছে ১১ মাত্রায় এবং এই মৌলিক পদার্থকে বলা হয় Membrane (যা এসেছে গবসনৎধহব বা ঝিল্লি থেকে)। M-Theory বলে পরিচিত এই তত্ত্ব আমাদের বলে যে, এই Branes-গুলো ১১ মাত্রার এবং সেগুলো সর্বত্রই ছড়িয়ে আছে। আমাদের মহাবিশ্ব তার ত্রিমাত্রিক জগতে আরো অনেকগুলো মাত্রাকে আবৃত করে রেখেছে। Ekpyrotic Universe তত্ত্ব আমাদের বলে যে, আমাদের মহাবিশ্ব তৈরি হয়েছে এরকম দুটো ঝিল্লির (Branes) মধ্যে সংঘর্ষ ঘটার ফলে, যে-সংঘর্ষে অপরিমেয় শক্তি বিস্ফোরিত হয়েছে। এই শক্তির বিচ্ছুরণ থেকেই বিকিরণ ও বস্তুকণা তৈরি হয়ে আমাদের মহাবিশ্ব গঠন করেছে – অনেকটা বিগ ব্যাংগ তত্ত্ব যেভাবে এ-প্রক্রিয়াকে ব্যাখ্যা করে, সেভাবেই।

৩. উর্বর মহাবিশ্ব (Fecund Universes) : পদার্থবিদ লি স্মলিন এই তত্ত্বের প্রবক্তা, যাতে বলা হয়েছে যে, আমাদের মহাবিশ্ব এসেছে একটি বিশাল কৃষ্ণবিবরের (Black hole) হৃদপিণ্ড হতে, যে বিশাল দানবাকৃতি কৃষ্ণবিবরটির অবস্থান হচ্ছে অন্য মহাবিশ্বে। এই তত্ত্ব আমাদের বলে যে, আমাদের মহাবিশ্বের কৃষ্ণবিবরগুলোও একইভাবে জন্ম দিচ্ছে আরো অনেক শিশু মহাবিশ্বের। এ সমস্ত কৃষ্ণবিবরের ভেতরে জন্ম হচ্ছে নতুন স্থান-কালের, যেগুলো থেকে আমাদের মহাবিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কিত নয় – এমন সব নতুন নতুন মহাবিশ্বের জন্ম হচ্ছে। একে মহাজাগতিক প্রাকৃতিক নির্বাচন (cosmological natural selection) বলেও ডাকা হয়; যেখানে প্রতিটি নতুন মহাবিশ্বে পদার্থবিদ্যার নিয়মগুলো তার জন্ম দেওয়া মাতৃ-মহাবিশ্বটির নিয়মগুলোর চেয়ে কিছুটা ভিন্ন হবে। এভাবে জন্ম নেওয়া ও বিবর্তিত হওয়া নতুন মহাবিশ্বগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তার করবে সে-মহাবিশ্বগুলো, যেগুলোতে নতুন করে কৃষ্ণবিবর তৈরি হচ্ছে। নিঃসন্দেহে আমাদের মহাবিশ্ব হচ্ছে তেমনি একটি মহাবিশ্ব।

৪. স্বার্থপর জৈব মহাবিশ্ব (The selfish Biocosm) : লেখক ও তাত্ত্বিক জেমস এন. গার্ডেনার এ মতের প্রবক্তা, যিনি নিজে কোনো পদার্থবিদ নন। তবে তাঁর এ-সংক্রান্ত নিবন্ধটি বেশ গুরুত্ব দিয়েই প্রকাশিত হয়েছে। ইয়েল ল’ স্কুলের আইনের স্নাতক গার্ডেনার অবশ্য দর্শন ও জীববিজ্ঞানেও ব্যাপক জানাবোঝা মানুষ, যাঁর মতে – নতুন মহাবিশ্বগুলোর জন্মপ্রক্রিয়াকে জীবনের উপস্থিতি কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণ করে। যে-মহাবিশ্বে জীবনের উৎপত্তি হতে কোটি বছর লেগেছে, আরো কোটি বছর লেগেছে প্রজ্ঞাবান প্রাণীর উৎপত্তি হতে, সে-মহাবিশ্বে প্রজ্ঞা সঞ্চালিত হয়। এই প্রজ্ঞা একসময়ে পদার্থবিদ্যার নিয়মগুলোকে আত্মস্থ করে এবং তাদের মাধ্যমেই নতুন মহাবিশ্বের বীজ উপ্ত হয় – যা থেকে প্রজ্ঞাবান নতুন জীবন জন্ম নিতে সক্ষম। এটি একটি চিত্তাকর্ষক আইডিয়া, যেটিতে দাবি করা হয় যে, মহাবিশ্ব-শৃঙ্খলের এমনভাবে বিবর্তন হয় যে প্রতিটি প্রজন্মেই মহাবিশ্ব আরো জৈববান্ধব (Biofriendly) হয়ে ওঠে। এটি হয়তো আমাদের ‘ঈশ্বর’ সম্পর্কিত ধারণারই একটি রূপ। ডারউইন তত্ত্ব ও বুদ্ধিদীপ্ত নকশা (Intelligent design) – এ দুটো তত্ত্বের এটি একটি মাঝামাঝি রূপ। এই অনুমিত হাইপোথিসিস (Speculative hypothesis) অবশ্য আমাদের বর্তমান বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ নয় এবং মহাবিশ্বের বাইরে থেকে ঈশ্বরের কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়াই স্বয়ং নিয়ন্ত্রিত হতে সক্ষম।

চিত্ত বিবশ-করা এসব আইডিয়ার ওপর ভিত্তি করেই নিরীশ্বরবাদী ও আস্তিক্যবাদী বিজ্ঞানী, দার্শনিক, বুদ্ধিজীবী ও ধর্মতাত্ত্বিকেরা তাঁদের তর্ক-বিতর্ক চালিয়ে গেছেন। এর মাধ্যমেই তাঁরা বুঝতে চেয়েছেন, মহাবিশ্ব কি হঠাৎ করেই ‘কিছু না’ থেকে সৃষ্টি হতে পারে, নাকি সেটা অন্য কিছু। তাঁরা যখন পরস্পর পরস্পরের আইডিয়াগুলো সম্পর্কে আরো ভালোভাবে পরিচিত হবেন, তখন তাঁদের চিন্তার পরিধি আরো বেড়ে যাবে। এটি যদিও ঈশ্বরের অস্তিত্ব বা অনস্তিত্ব সম্পর্কে নতুন কোনো ধারণা আমাদের প্রদান করে না, তবু তা আমাদের নিজেদের অস্তিত্ব ও মহাবিশ্বের স্বরূপ সম্পর্কে নতুন দৃষ্টি দান করে।

বিজ্ঞানী ও দার্শনিকরা বহু যুগ আগে থেকেই বলে আসছেন যে, আমরা যে-সমস্যাটির সমাধান করতে চাই, আমরা নিজেরাই যদি সে-সমস্যাটির অংশ হই তাহলে তা কখনোই করতে পারব না। ঠিক এরকমটাই বলেছেন ইমানুয়েল কান্ট, ম্যাক্স প্লাঙ্ক, আইনস্টাইন, কুট গভেল প্রমুখ মনীষী। সন্দেহ নেই যে, কান্টের যুগে অধিবিদ্যা বা Metaphysics অনেক সমস্যা সমাধানের জন্য একটি বহুল সমাদৃত উপায় ছিল, কিন্তু প্লাঙ্ক-আইনস্টাইন-বোহরের যুগে তার পাল্লা ঝুঁকে পড়েছে বিজ্ঞানের দিকে। স্টিভেন ওয়ানবার্গ যেমনটা বলেছেন – ‘একদিন অধিবিদ্যা অন্তর্হিত হবে এবং আমাদের সঙ্গে থাকবে শুধু পদার্থবিদ্যা’ – এটাই হয়তো একদিন সত্য হয়ে উঠবে।