ক্রন্দসী

হয়তো নক্ষত্র ফুটে আছে। আকাশ ফুটো করা দালানকোঠার ভারে তা আর দেখার জো নেই। তারপরও যা একটু ফুটোফাঁকা ছিল, দেখতে দেখতে মেঘ ঢুঁসে দেওয়া দালানে তাও ভরে যাচ্ছে। নতুন নতুন ভবন নির্মাণের কাজের ধুম চারদিকে। সকাল শুরু হতে পারে না, তার আগে থেকেই বড়-ছোট বিস্ফোরণ, লোহা-লক্কড়ের

ঢেং-ঢাং শব্দে মুখর হয়ে ওঠে এলাকা; চলে সেই সন্ধে নাগাদ। একজনের কথা আরেকজনের কাছে পৌঁছাতে গলার রগ ফুলিয়ে চিৎকার করতে হয় – ‘এই যে শুনছ? বলি হলোদে গোলাপ পেলে নিয়ে এসো। যদি না পাও তবে লালটাই …’

ফুলের কথা বলতেও এভাবে যেখানে চিৎকার করতে হয় – সেই এলাকার প্রাচীনতম গলি এটি। অবস্থানগতভাবে মৃত সাগরের মতো বিস্ময়কর। হঠাৎ এর মুখোমুখি হলে, ভেতর থেকে আপনি যে-প্রশ্নটি উঠে আসবে – আরে এটি কোথা থেকে এলো! অনেকটা জীবনানন্দ দাশের বিদর্ভ নগরীর মতো নির্জন। শ্যাওলাপড়া বাড়িগুলোর লোনা ধরা দেয়ালে প্রেতাত্মার গন্ধ পাওয়া যায়। জং-ধরা লোহার গরাদের জানালার ফাঁক দিয়ে তেরচা হয়ে বেরিয়ে আসে বৈদ্যুতিক বাল্বের ধূসর আলো।

যুগ যুগ ধরে হাওয়ারা বাধাগ্রস্ত হয়ে হয়ে এখানে একটা পথ করে নিয়েছে। তাই এই গলিতে ঢুকতেই গা ছমছম করা অনুভূতির সঙ্গে একটা প্রশান্তির জলধারা খুব সহজে ভেতরে ঢুকে পড়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। একে আমি নাম দিয়েছি ভুতুড়ে প্রশান্তি। এর সঙ্গে কোলাকুলি করতে না পারলে মনে হয় কোথায় যেন কী ফাঁকা রয়ে গেল। খাপছাড়া একটা ব্যাপার; কিছুটা নখ উঠে থাকার অস্বস্তিবোধের মতো।

সারাদিনের নানা চিন্তা, কাজের বিচিত্র চাপের পর একে বলা যায় শৈশবে পথে পড়ে পাওয়া অপ্রত্যাশিত একটা আধুলির মতো। শক্ত করে মুঠো করে ধরে শনপাপড়ির দোকানের দিকে দৌড় …

অতঃপর তিনতলা বিল্ডিংটার ভুতুড়ে ছায়ায় এসে দাঁড়াই। গুনগুন করে চলে কান্না। কিছুক্ষণ সেই বেদনার নদীতে অবগাহন করে চলে আসি। ফিরে যাই লোহা-লক্কড়ের বিস্ফোরণের দুনিয়ায়।

দুই

এখানে-সেখানে ইট-পাথরের স্তূপ করে রাখা গলির তকতকে একটা ছয়তলা বিল্ডিংয়ের তৃতীয়তলায় আমি থাকি। চারদিকের তিনদিকে তিনটা বাড়ি নির্মাণের কাজ চলছে। সবগুলোর পরিকল্পনাই বোধহয় আমাদের বিল্ডিংয়ের উচ্চতাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার। যেখানে প্রতিনিয়ত শব্দেরা শব্দের হাতে মার খাচ্ছে, আহত হচ্ছে আর আমাদের অনুভূতিগুলোকে কোণঠাসা করে উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে একটা-একটা ইট।

ওই বিদর্ভ নগরীর ভুতুড়ে প্রশান্তির পথটি তাই আমার কাছে এতটা প্রত্যাশিত। পড়ে আমার কর্মক্ষেত্র
আসা-যাওয়ার মাঝে। নির্মীয়মাণ আকাশছোঁয়া দালানের এই এলাকার একপাশে। পড়ে বললে ভুল হবে। ফেলি। কারণ বাসায় আসার জন্য আরো অনেক পথ আমার আছে। বেছে নিতে পারি সেই পথগুলোও। হয়তো সেটা আমার জন্য সুবিধারও হয়। কিন্তু নানা পথ ঘুরে আমি এই গলিতে এসেই ঢুকে পড়ি। অনেকটা অভ্যাসবশতই যেন। বন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ যেনবা। কাজ শেষে চলে আসি। গল্পগুজব হয়, সুখদুঃখের কথাবিনিময়, তারপর চলে আসা। অচেনা শহরের এই গলিটিই কেবল আমার পরিচিত, আমার একটা দোস্ত।

কাজ বলতে চাকরি করি লাইব্রেরিতে। বিকেল চারটা থেকে দশটা পর্যন্ত অফিস। বাকিটা সময় বাসায় শুয়ে-বসেই কাটিয়ে দিই। ভাবছেন, এত সময় কাটে তাহলে কীভাবে?

ঘটে যাওয়া অফিসের বিভিন্ন ঘটনা ভেবে, বউয়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলে অথবা বিদর্ভ নগরীর সেই কান্নার আওয়াজের ব্যবচ্ছেদ করতে গিয়ে দেখি অফিসে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। শার্ট-প্যান্ট পরে, যত্ন করে ইন করে, জুতা মুছে বেরিয়ে যেতে যেতে দেখি হয়ে গেছে। ফলে দৌড়াই। অথচ দেখেশুনে একটু আগে বেরুলেই কিন্তু এমন হয় না! তা আর হয়ে ওঠে না। দৌড়ের জীবন, দৌড়াতেই যায়।

তবে বেরিয়ে যাই তো যাই, এরপর যদি এ-বাসায় নাও ফিরি, তাতেও আমার কিচ্ছু আসে-যায় না। কারণ এখানে আমার এমন কিছু নেই, যা ফেলে গেলে কষ্ট হবে। যা কিছু তার সবই থাকে আমার কাঁধের এই ব্যাগে। বাকি আর যা কিছু সবই আমার ওই গ্রামে। এখানে, এই শহরে আমার কিচ্ছুটি নেই। কেবল ওই গলিটি ছাড়া। ভাবছেন, এ আবার কেমন কথা?

হ্যাঁ, এটাই কথা। এই শহরের কোটি মানুষের বাস। সবার ভাবনা কমবেশি এমনই। এমনকি যাদের একটি গলির সঙ্গেও কোনো সম্বন্ধ নেই। এ এক টিস্যুতুল্য শহর, যাকে সবাই

খেয়েদেয়ে মুখ মুছে থুক করে ফেলে দেয়। একদিন সেসব থুকে শহর ডুবে যায় এবং তার উপর ভাসতে থাকে কোটিরও অধিক থুক মানুষ। তারপরও এই শহর না হয় কারো আপন, না কেউ এই শহরের।

যেমন ধরুন আমি। ঘরের ফেলে আসা জিনিস বলতে একটা তেল চিটচিটে তোশক, একটা বালিশ, একটা কাঁথা আর জানালার সঙ্গে ঝোলানো রশি। লুঙ্গি-গামছা আর প্যান্ট একটা আর শার্ট দুটো – তাও এই ব্যাগে। এমনকি দুটো জাঙ্গিয়ার একটি ব্যাগে, অপরটি ভেজা বলে বাসায় দড়ির উপর শুকাতে দেওয়া হয়েছে।

সাবলেটে আছি। শুধু বউ আছে বলে। বউ প্রাইমারি স্কুলের মাস্টার। থাকে গ্রামের বাড়ি। মাঝেসাঝে ডাক্তার দেখাতে আসে। তাই মেসে উঠিনি। না হলে সাধে কি আর কেউ সাবলেট নেয়! অথচ মেসে একটা সিট নিলে আমার কত খরচ বেঁচে যেত!

মেস বোঝেন তো, কতগুলো মানুষের একটা বিন; মানে ময়লার ভাগাড়। বিয়ের আগে সেখানেও থেকেছি তো, জানি। খাওয়া, পরা, ঘুমানো একদম গরু কি তক। গোয়াল আর কি। আপনি যদি একটু পরিষ্কার করে রাখার চেষ্টা করেন আপনার দিকটা, সেটা একটা ঝামেলাই হয়ে দাঁড়ায়।

হবেই বা না কেন? তার জন্য আপনাকে বাথরুমটায় একটু বেশি সময় ব্যয় করতে হবে; আধা সেদ্ধ, নুন ছাড়া ঝোলটা গরম করতে পাকের একটা সময় নিতে হবে; আপনার বিছানায় মানুষ ময়লা পায়ে উঠে যাবে, তার জন্য আবার ঝাড় দিতে হবে। এখন কথা হচ্ছে, ঝাড় যে দেবেন, ময়লাটা নেবেন কোন দিকে? একপা ফেলার যে জায়গা নেই!

তবে একটা সময় আর ওভাবে থাকতে মন চায় না। মন চায় একটা ঘর, একটু নির্জনতা। বাসা নেওয়ার পক্ষে তেমন কিছু হয়তো আমার ক্ষেত্রে কাজ করে থাকলেও থাকতে পারে। তবে মূল কারণ ওই বউ। মাঝেসাঝে আসেন তাই।

সাবলেটের বাসাটা মূলত ভাড়া নিয়েছেন রংপুরের এক চাকরিজীবী দম্পতি। দুটো রুম, দুটো বাথ আর একটা ড্রয়িং কাম ডাইনিং। ড্রয়িংরুম বলতে দুদিকে হাত ছড়িয়ে দাঁড়ানো যায় কোনোমতে, দুই রুমের মাঝের এমন একটা শূন্যস্থান – বাড়িওয়ালি যার নাম দিয়েছেন ড্রয়িং কাম ডাইনিং। বাসার কেউ ওখানে কোনোদিন না বসে, না খায়। শুধু জুতা রাখার জন্য ব্যবহৃত হয়।

ছোট্ট একটা ব্যালকনি, সেটা আবার দম্পতিটির রুমের সঙ্গে। আমার রুমের চারদিকে চারটা বোবা-কালা দেয়াল। একটা জানালা আছে। এত ছোট যে সেটা দিয়ে আলোই সেঁধোতে পারে না। জানলার সোজা উপরে একটা ভেন্টিলেটর; কাচ দিয়ে বন্ধ।

তো এই রুমের ভাড়া দিতেই আমার বেতনের প্রায় অর্ধেক নাই হয়ে যায়। বাসায় দেব কী, খাব কী আর হাতখরচাটাই বা চালাব কী করে? অবশ্য এসব নিয়ে আর ভাবি না। যেহেতু চলে যায় বা যাচ্ছে, খেয়েই যাচ্ছে আবার, তাহলে আর ভাবনা কী! তাছাড়া ভাবনার জিনিসের কি আর অভাব হলো! তো, নিরো, বাজাও বাঁশি। আমি ভাতটা চুলায় বসিয়ে দিয়ে তোমার সুরের তালে নাচি।

ভাবছেন এ আবার কেমনতর কথা? এই তো কথা। জীবনে তো আনন্দ করতে হবে। প্রচুর আনন্দ। তাই আনন্দ করছি। নাকি তাও করতে দেবেন না? এর জন্যও ছাড়পত্র নিতে হবে নাকি আবার? ইদানীং দেখেছি, মানুষ কীসের সঙ্গে কীসের মিল-তাল দেয় বোঝাই মুশকিল। বললে বলে, ‘অ্যাবসার্ড, ম্যাজিক রিয়ালিজম।’ আরে কী অদ্ভুত! আমি অত কিছু বুঝি না। আমার দরকার আনন্দ।

তবে মজার ব্যাপার কি জানেন, তিন বছর একসঙ্গে আছি, রংপুরের ওই দম্পতিকে কখনো আমি আনন্দ করতে দেখিনি। এমনকি জোরে হাসতেও শুনিনি। অথচ তাদের স্কুলপড়ুয়া দুটো মেয়ে আছে। অবশ্য বাসায় সারাদিন ধরতে গেলে আমি একাই। শুক্রবার ছুটির দিনটায় তারা সবাই বাসায় থাকে। আর এই দিনটায় ভোরে আমি বেরিয়ে পড়ি বাড়ির উদ্দেশে। রোববার দিন অফিস শেষে বাসায় ফিরি। তাই তাদের আনন্দটা হয়তো আমার দেখা হয়ে ওঠে না। হয়তো শুক্রবারটায় তারা খুব হাসে। বাচ্চাদের হাসিতে নেচে ওঠে বাসার দেয়াল। তা আমার আর দেখার ভাগ্য হয় না।

যাক অন্যের কথা থাক, মেরে দোস্ত, গলির কাছে ফিরি।

অফিসের সব কাজ শেষ করে হাঁটতে হাঁটতে এখানে এসে দাঁড়াই। এত ক্লান্ত হয়ে পড়ি – তখন ওই পুরনো গলির হাওয়াটা রক্তের ভেতর এক ধরনের সঞ্জীবনী এনে দেয়! যেমন সত্যিকার জানিদোস্তের সঙ্গে আলিঙ্গনাবদ্ধ হলে হয়।

কোলাহলময় পৃথিবীর একমাত্র নিঃশব্দে আকণ্ঠ ডোবানো এই গলি। সঙ্গে ওই গুনগুনে কান্না। নিজেকে সেই কান্নার ভেজা আওয়াজের কাছে এত ব্রাত্য মনে হয়! এই কান্নার উৎসের সুখের জন্য আমি যা কিছু করতে পারি।

আমি সেই বিদর্ভ নগরীর ভুতুড়ে বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াই। ইতোমধ্যে দেখতে পাই আরো দুজন শ্রোতা আমার আগেই এসে বসে আছে। দুটো কুকুর। একটার লেজ আর ডান কানের কোনা কাটা, অপরটার লেজ আর গলাটা লোমশ; আদুরে টাইপের একটা চেহারা।

লেজকাটা কুকুরটা মাটিতে কাত হয়ে শুয়ে থাকে আর কাটা কান নাড়ে। লোমশ লেজের কুকুর সামনের পা দুটোর উপর থুতনিটা রেখে নিষ্পলক চেয়ে থাকে। আমি শার্টের ইনটা ছেড়ে, বুকের দুটো বোতাম খুলে তাদের সঙ্গে যোগ দিই।

তিন

খুব পুরনো লাইব্রেরি এটা। দক্ষিণের দেয়াল ঘেঁষে বইয়ের তাক। তাকে তাকে থরে থরে বই। যেসব বই দেখলে মানুষের গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায়, চোখ উঠে যায় কপালে; অর্থাৎ চামড়ার বাঁধাইয়ে তিনশো-চারশো বছরের পুরনো বইও আছে এই গ্রন্থাগারে।

তবে এসব দুর্লভ বইয়ের নেই যত্ন, নেই সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ। ইতিহাসের সাক্ষী শত শত পুরনো দালান যেভাবে বর্তমানের অবহেলোায় ধুলোয় মিশে যাচ্ছে – আমাদের এই গ্রন্থাগারেরও সেই দশা। বই থাকার কথা লেখকদের নামের প্রথম অক্ষরের বিন্যাসে। অক্ষরের বিন্যাসে তো দূরের কথা, ক্যাটাগরিই ঠিক নেই। দেখা গেল প্রবন্ধের বই উপন্যাসের তাকে আর উপন্যাস কবিতার তাকে। এমন ভূরি ভূরি।

সরকারি কাজ! ওসব নিয়ে কে অত মাথা ঘামায়। তার চেয়ে বসে বসে সকালে কী দিয়ে খেয়েছি, তাই মনে করতে চেষ্টা করি। আমার কাছে, এটা তাও একটা কাজের কাজ হতে পারে। তবু ভাই এসব বাজে কাজের ঝামেলা নিতে ভালো লাগে না। নিলেই বা কোথা থেকে যে নেব, তারই তো থই পাই না। এত ঝামেলায় ঠাসা যে, মনে হলে মনে হয় পাঁক-কাদায় ডুবে যাচ্ছি এবং কতগুলো হাত যেন নিচ থেকে আরো টানছে। বুঝতেই পারছেন কী বলতে চাইছি।

তাছাড়া এসব ঝামেলা না নিলেই বা কী। কে দেখার আছে। পুরোটা সময় নিজের পরিচালকগিরি টিকিয়ে রাখার ধান্দায় ঘুরলে লাইব্রেরির উন্নয়নের দিকে তাকানোর আর সময় থাকে! যাক সে-কথা। তবে মাঝেসাঝে মন কেমন যেন করে ওঠে। ‘কী করছি?’ – এমন অদ্ভুত প্রশ্ন হঠাৎ হঠাৎ বড়শির মতো গলায় বিঁধে অসুস্থ করে ফেলে।

তবে এর বাইরেও তো ঝামেলা আছে। মাঝেসাঝে এমন বেয়াড়া পাঠক আসে তাকে সামলাতে হিমশিম খেতে হয়। সামাল দিতে যে পারি না তা কিন্তু না। এলে একটু ঝামেলা করে বইকি। সে কীভাবে উতরাতে হয় আমার বা আমাদেরও তা বেশ ভালোভাবে রপ্ত।

যেমন আজকে একজন এসে চাইল দেবেশ রায়ের ছোট ভাই দিনেশচন্দ্র রায়ের ছোটগল্পের বই। আরে শালা! দেবেশ রায়ের যে ছোট ভাই আছে, তাই তো জানি না। কিন্তু ঘাড় তেড়া পাঠক বলে কথা। জেরা জুড়ে দিলো –

– ভাই, আমি দেখে গেছি। এখানে ছিল।

 – আরে ভাই, তার কোনো বইয়ের এন্ট্রিই এখানে নেই তো বললাম।

 – দেখেন না ভাই। আছে, পাবেন। খুব দরকার। কোথাও পাচ্ছি না। কিনতেও পারছি না, আউট অফ প্রিন্ট। দেখেন না ভাই, প্লিজ।

এমন নাছোড়বান্দা পাঠক দেখেছি বইকি। তবে খুব একটা না। বলি – আপনি যেহেতু দেখেছেন, তাহলে নিয়ে আসুন না? আমাকে বলছেন কেন?

– আমি পাচ্ছি না বলেই তো আপনাকে বলছি। দেখেন না ভাই, প্লিজ। খুব উপকার হয়।

– বললাম তো নেই। অত কথা বলতে পারব না তো! প্রতিটা পাঠকের সঙ্গে যদি এভাবে কথা বলতে যাই, তাহলে তো আমরা পাগল হয়ে যাব।

– চাপে তো মনে হচ্ছে শ^াস বন্ধ হয়ে মারা যাচ্ছেন ভাই। লোকটা ক্ষেপে যায়, দেখছি তো, যে কজন সবাই তো পড়ছে বিসিএসের পড়া, নয় পত্রিকা। একজনকেও তো দেখলাম না তাদের কিছু নিয়ে আপনাদের মহামূল্যবান সময় নষ্ট করতে।

– লোকটা বেরোবার দুয়ারের দিকে যেতে যেতে চিৎকার করে লাইব্রেরি মাথায় তুলে ফেলল।

– আরে ভাই, সরকারের চাকরি করেন, জনগণের টাকা খান – একটু হালাল করে নিয়েন! বলে লোকটা হনহন করে চলে গেল।

যাক, চলে তো গেছে। আপদ দূর হয়েছে। জবাবদিহির তো আর কেউ নেই, কে অত ভাবতে যাবে কী সে বলল না-বলল। গেছে যে এই ব্যস। অপমান তো আর আমার একার না, পুরো লাইব্রেরির। তাছাড়া বউ করেনি যা তা আর অপমান হয় কী করে? যদি নারী পাঠক হতো তাও বলার ছিল, নিদেনপক্ষে যদি চেহারাটা একটু দেখার মতো হতো, তাও না হয় ভাবা যেত। অমন ছিঁচকে চোরের মতো চেহারা! মেনে নিলাম। অমন উটকো চেহারার লোকের কথা, তারও আবার অপমান। ধ্যাৎ!

চার

তবু কেমন যেন। বুকে খচখচ করে বিঁধে। হ্যাঁ, জনগণের টাকাই তো, তাহলে তো আমারও। আমার টাকা আমি নিচ্ছি, তাতে তোমার সমস্যা কী?

এইসব উদ্ভট ভাবনা ভাবতে ভাবতে চলে আসি সেই পুরনো গলিতে। ততোধিক আন্তরিকতায় নতুন তাজা হাওয়া আমাকে অভ্যর্থনা করে। কিন্তু সেই ভুতুড়ে প্রশান্তিটা যেন মনে লাগে না। যেন বন্ধুর করমর্দন আলগা হয়ে গেছে। কেমন গা-ছাড়া উদাস উদাস ভাব।

তার মধ্যে আবার শুনেছি এক দুঃসংবাদ। বউ ফোনে বলল, তার বোন, ওহির মা, প্রেগন্যান্সির ভুল চিকিৎসায় হাসপাতালেই মারা গেছে!

ছোট্ট একটা মেয়ে ওহি। লোকে বলে দেখতে নাকি একদম ওর খালার মতো। নাকের আগা টিয়ে পাখির ঠোঁটের মতো বাঁকানো, কপালটা ছোট। মাথাভরা চুল; কিছুটা কোঁকড়া। আমার বউর উপরের ঠোঁটের ডানদিকে একটা তিল, ওহির নেই – এই যা পার্থক্য। নইলে ওহিটা আমার বউর কার্বন কপি। বললাম – ওর এখন কী হবে?

– ওকে আমরা নিয়ে নিলে কেমন হয়? আমাদের তো কেউ নেই।

– যদি ওর বাবা রাজি হয়, তাহলে নাও না। আমি কি তোমাকে না করেছি বা করব? তুমি বোঝো না আমাকে। তাছাড়া ও তো তোমারই মেয়ে।

জানি ফোন কেটে দেওয়ার পর বউটা একা একা সবার আড়ালে বসে কাঁদবে। কেঁদে ভাসিয়ে দেবে। এ এমন এক সময় যখন ইচ্ছে করলেও ওর পাশে আমি থাকতে পারব না। অথচ ওর ঘুমিয়ে পড়ার আগ পর্যন্ত ওকে আমার বুকে নিয়ে বসে থাকার কথা।

ও যখন কাঁদে, ওর পাপড়ির কিনারগুলো লাল হয়ে ওঠে, অশ্রু দৌড়াদৌড়ি শুরু করে এবং টুপ করে একটা ফোঁটা গালে হালকা স্পর্শ দিয়ে নিচে পড়ে যায়। তারপর অশ্রুর একটা স্রোত নেমে আসে। সে কি আর থামে! শিশুর মতো ওর মনটা।

এইসব নানা কারণে মনটা আজ বিক্ষিপ্ত। গলিতে ঢুকে যে প্রশান্তির দেখা পেয়ে থাকি – যা আজ আরো তীব্রভাবে কামনা করছিলাম – তা যেন আজ কেমন গা-ছাড়াভাবে আমাকে অভ্যর্থনা করল। অপরিচিতের মতো আমার দিকে এগিয়ে এলো। পরক্ষণেই আরেকটা ঝাপটা এসে আমাকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল।

মনে হলো একে আমি চিনি, সেও আমাকে চেনে – তবে তেমন একটা মাখামাখি নেই। তাই প্রশান্তিটা ঠিকঠাক এলো না। পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়া মুখচেনা পথিক যেন।

ব্যাপারটা ঠিক খাপ খাচ্ছিল না। হঠাৎ চিরচেনা কোষে তরবারিটি বড় হয়ে যাওয়ার মতো। অথচ সেই হাওয়া, সেই গলি, সেই বিদর্ভ নগরীর নির্জনতা – কিন্তু সেই দোস্তিটা পাচ্ছি না। কেন? তাহলে কি প্রশান্তি ব্যাপার পুরোটা মনের খেয়াল? নাকি পরিস্থিতি?

মনমতো, পরিস্থিতির অনুপাতে মানুষ যুদ্ধক্ষেত্রেও প্রশান্তি পেতে পারে। ওয়ার অ্যান্ড পিসে মুমূর্ষু আন্দ্রেই যেমন নাতাশাকে কাছে পেয়ে পেয়েছিল! একইভাবে নির্ঝঞ্ঝাট একটি গলির প্রশান্তি উবে যেতে পারে। প্রশান্তি কি তাহলে পুরোটাই মনের পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে? গলির কোনো হাত নেই! তাহলে কেন একজন মানুষ গলিকে ভালোবাসবে?

ঠিক তখনই বাতাসের একটা এলোমেলো ঝাপটা এলো। চোখটা মিটমিট করছে। নিশপিশে হাতে মনের বগলে সুড়সুড়ি দিলো। শার্টের কলারটা এলোমেলো করে দিয়ে চলে গেল। ইতোমধ্যে আমি দূরাগত ঘণ্টাধ্বনির মতো তিনতলা সেই বাড়িটার ভুতুড়ে ছায়ায় এসে দাঁড়ালাম।

গলিটির ভেতর তখন রাতের নৈঃশব্দ্যের রাজত্ব চলছে। যথারীতি আমার আগেই শ্রোতাদ্বয় এসে হাজির। গুনগুন শুরু হয়ে গেছে কান্না। আমাকে দেখে তাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।

গুনগুন কান্নার আওয়াজ এস্রাজের মতো জংধরা জানালার গ্রিলে আছড়ে পড়ছে। আমার হৃদয় কারুণ্যে আর্দ্র হয়ে উঠছে। সেই একই তাল-লয়, একই জায়গায় গিয়ে গমক, একই জায়গায় গিয়ে সম। সেই কোমল নি। ব্যত্যয় নেই। এই যে মুদারা থেকে উদারায় চলে গেল। আওয়াজের এই যে গভীরতম আরোহণ-অবরোহণ – যা বয়ে চলে খেয়ালের বশে। এই স্রোতের মাথায় বসে আমি সাতসমুদ্র খুঁজে বেড়াই।

উত্তাল সমুদ্রে আমার এক-দু-ফোঁটা অশ্রুর সংযোগ হয়তো আমার সেই মহাকাব্যিক ভ্রমণের বৈঠামাত্র, যা আমার ঠিকা হিসেবে পাশে থাকে। যাতে ভর করে আমি দাঁড়িয়ে থাকি।

মনটা, তুমি নুন হতে পারো না? সবটাতেই দিয়ে খাওয়া যায়? দুর্লভ কস্তুরী হলে কেন?

প্রতিদিনের মতো দীর্ঘক্ষণ সেই সংগীত আবহে ঘোরগ্রস্ত হয়ে থেকে চলে এলাম।

পাঁচ

বউ ফোন দিয়ে জানাল, ওহির বাবা রাজি হননি। এতে যে তার মনের অবস্থা কী তা তো আমি বুঝতে পারছি। দশ বছরের প্রেমের বিয়ে। কখন ক্ষুধায় তার পেট মোচড় দেয় আর কখন মনস্তাত্ত্বিক সংকটে – ততটুকু অন্তত ভালো করেই জানি।

মন খারাপ করে কী হবে? মেয়ে তার। তিনি যা বলবেন তাই তো হবে। কিন্তু কী দিয়ে আমি বউকে এ-কথা বোঝাব। এ এমন এক প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুহূর্ত, জোর করে এসে সব কেড়ে নিয়ে যায়। অথচ না ছিল তার পূর্বাভাস, না ছিল কোনো প্রস্তুতি। কারণ ওহির মা হারানোর কথা ছিল না, অথচ হারিয়ে গেছে; এখন সে মা-হারা। তার খালা তার মা হতে চেয়েছে, কিন্তু তার বাবা রাজি না। এতে খালু হিসেবে ওহির জন্য আমার কী করার আছে?

কিন্তু বউয়ের যেহেতু মন খারাপ, সেহেতু আমারও মন খারাপ। ফোনে যতক্ষণ কথা বলি, ততক্ষণ নিশ্চয়ই। এর বাইরেও আমার মন খারাপ। এটা শুধু বউকে দেখানোর জন্য তো না। আমারও তো মন আছে আর তা খারাপ হয়। কখনো কখনো তা আবার কাচের মতো গুঁড়ো হয়ে যায়।

ওহিকে নিয়ে ইতোমধ্যে আমিও কম ভাবিনি। আমার কল্পনাপ্রবণ মন ইতোমধ্যে ভেবে ফেলেছে, তাকে কী কিনে দেব? কী পড়াব? কোথায় ঘুরতে নিয়ে যাব? সবকিছুর একটা ফিরিস্তি আমার করা হয়ে গেছে। অথচ ওহি-ই নেই, সে আমাদের হচ্ছে না!

আহ্! ওহি। দিল্লির গালিবের গলা থেকে ঝরে পড়া একটা শের; যেন জাপানি কূপের ভেতর টুপ করে পড়ে একটা শব্দ হলো।

ভেবে রেখেছিলাম, আমার আর আমার বউয়ের সামনে খেলতে খেলতে হেঁটে যাবে ওহি; আমাদের মেয়ে। আমাকে বাবা বলবে। ভাবতেও আনন্দে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। জীবনানন্দের জাদুকরী পঙ্ক্তির মতো। এই সবকিছু একটি মাত্র শব্দ – না – মাটি করে দিয়ে গেছে। এমন মাটি, যেখানে ঘাস জন্মাবে না।

প্রচণ্ড মানসিক অশান্তি নিয়ে আমি ঢুকে পড়লাম সেই পুরনো গলিতে। মৃদু আলিঙ্গনের মতো হাওয়া বইছে। ঢাকাই মসলিনের মতো তার পরশ। অনুভব আছে কিন্তু পরশ নেই। প্রশান্তির স্প্রে যেন। সঙ্গে সঙ্গে জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় আমার মন ভালো হয়ে গেল।

সত্যি সত্যি কি মন ভালো হলো, না আরো খারাপ হলো – বলতে পারব না। তবে কেমন যেন হলো। আগের মানসিক অবস্থায় আর থাকল না। সেটা আগের থেকে একদম আলাদা। যেন পৃষ্ঠা উল্টে অন্য পৃষ্ঠায় চলে যাওয়ার মতো। সেটা হয়তো মন ভালো হওয়ার মতোই; অথবা এতটাই দুঃখবোধ যাকে আমি ধরতেই পারছি না। আর এই ধরতে না পারাটাকে আমি বরং ভালোই বলতে চাই। অন্তত ধরতে পারার আগ পর্যন্ত ঢের ভালো। কারণ তাতে এমন একটা সংশয় সৃষ্টি হয়, যাতে মনে হয়, মনটা হয়তো আমার ভালোই আছে। আসলে আমার প্রশান্তি দরকার। সেটা কোনো একভাবে পেলেই হলো। ভুলেভালে হলেও চলবে। আর সেই প্রশান্তিটা যেন আমি পেলাম বিদর্ভ নগরীর নির্জনতম এই অন্ধকারে।

পুরনো বাড়িগুলোর তেরচা আলোর ধূসর বাগান ভেঙে আমি ওই তিনতলা বাড়ির ভুতুড়ে আবহে এসে দাঁড়ালাম। শ্রোতা দুজনের একজন বসে, অপরজন দাঁড়িয়ে আছে। আমিও গিয়ে দাঁড়ালাম তাদের পাশে। কান্নার রাগ চলছে। পৃথিবীটা অশ্রুত হয়ে কারো চোখের কোণে ঝুলছে। এই টুপ করে পড়ল বলে।

কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে এবার পায়ের জুতা জোড়া খুলে ফেললাম। হাতের ওপর ভর করে বুকসমান পাঁচিলের উপর উঠে গেলাম। সেখানে থেকে একতলার কার্নিশে।

এগিয়ে যাচ্ছি আর গুনগুন কান্না যেন আমার বুকের খুব কাছ থেকে উঠে আসছে বলে মনে হতে লাগল। এবার গুনগুন কান্নার উৎসের দিকে চোখ রাখলাম।

মোগলাই-রিজেন্সি আমলের কারুকাজ করা আসবাবপত্রে ঠাসা একটা রুম। সেগুলোর কোনো কোনোটায় ইঞ্চি দেড়েক করে ধুলো জমে আছে। মোমের আলোকে চেপে ধরে আছে সেসব ধুলো-ময়লা। ফলে ঘরটা আলোর নামে অন্ধকারেই ডুবে আছে।

মোমটা একটা টেবিলের উপর জ্বলছে। বই-খাতায় ঠাসা টেবিলটার একটা পা বাঘের থাবার মতো আমার দিকে অর্থাৎ জানালার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে রেখেছে। বাতিটা সামনে নিয়ে একটা লোক বসে আছেন। মধ্যবয়স্ক হবেন হয়তো। মাথাটা টেবিলের দিকে ঝুঁকে আছে। সোনার নিকেলে বাঁধাই করা একটা ছবির দিকে স্থির হয়ে আছে তার চোখ।

ছবিটা বছর পঁচিশেকের এক তরুণীর। মাথার চুল গোলাপি রিবনে বাঁধা। কান খালি। তবে নাকে নোলক আর নাকফুল। চোখের কোণে বিষণ্নতা আর ঠোঁটের কোণে জোর করে ধরে রাখা হাসি। ছবিটার পাশে একটা টেপ রেকর্ডার রাখা।

কালো ওই রেকর্ডারটায় পাঁচ রকমের বাতি জ্বলছে-নিভছে। সে যে জীবন্ত যেন সেটাই ঘোষণা দিচ্ছিল বাতিগুলো দিয়ে। এর বাইরে আর কোনো প্রাণের চিহ্নও নেই। লোকটা যেহেতু নীরব আর নিথর, অপরদিকে রেকর্ডারটায় বাতি জ্বলছে। ধারণা করে নিলাম আওয়াজটা ওখান থেকেই আসছে।

স্পষ্ট হওয়ার জন্য জংধরা জানালার গরাদে গালটা লাগালাম। বছরের পর বছর ধরে পড়া মরচেগুলো পুটপুট শব্দে ভাঙতে শুরু করল এবং আমি নিশ্চিত হলাম – করুণতম সেই কান্নার উৎস সম্পর্কে।

লোকটা মাথা ঝুঁকিয়ে স্ট্যাচুর মতো একধ্যানে তাকিয়ে আছে ছবিটার দিকে। ঘরের ঠাসা আসবাবপত্রের মধ্যেকার তিনিও যেন একটি আসবাব; দেখলে মনে হবে সময় তার ভ্রুর নিচে আলোর তিলক হয়ে স্থির হয়ে আছে। যেখানে একমাত্র চলন্ত ওই কান্নার গুনগুন আওয়াজ, যা বেরিয়ে আসছে ওই পাঁচরঙা বাতির জ্বলা-নেভার ভেতর থেকে।