রনি আহম্মেদ : ফ্যান্টাসির সাতমহলা

এমন কথা আমরা প্রায়ই বা হরহামেশাই শুনে থাকি, কবিতা-শিল্পকলা আত্মবিলীন চেতনার রঙে রাঙানো অন্য জগৎ। কবি বা শিল্পীর জগৎ, শিল্পী মানসিকতার রূপনির্ধারক। আরো মানি যে, আধুনিক শিল্পকলা ব্যক্তিগত ভাবনাপ্রকাশের স্বাধীন মাধ্যম। যার মর্মকথা কান পেতে শুনতে

হয় – চোখ মেলে দেখতে হয়। সেক্ষেত্রে কখনোবা শিল্পকলা হয়ে উঠতে পারে শিল্পীর আত্মজীবনী বা আত্মভাবনার অহংবাদ। ব্যক্তির সীমানা না পেরোতে পারলে দর্শকের কাছে কীভাবে তা পৌঁছতে পারে? এ সকল ধারণা আধুনিক শিল্পকলা থেকে একে একে খসে পড়ছে। তা পড়ুক, শিল্পী ও শিল্পকলার ভারমুক্ত হওয়া প্রয়োজন।

আবার এ কথাও কানে আসে – বর্তমানের শিল্পকলার অঙ্গীকার কার কাছে? সাহিত্যে, যেমন- পাঠকের কাছে ঔপন্যাসিকের, দর্শকের কাছে নাট্যকারের, কিন্তু শিল্পীর অঙ্গীকার কার কাছে? আমার নিজের বিশ্বাস এই যে, একেবারে সাম্প্রতিককালের শিল্পকলায় এক ধরনের সারল্য এসেছে – আঙ্গিক থেকে সরে এসে বক্তব্যের দিকে গেছে, নিকট অতীতের অস্পষ্টতা এক্ষেত্রে অপসৃয়মান এবং সুনির্দিষ্ট দর্শককুলের অভাবে শিল্পকলাকে অন্তর্মুখীন করেছে। তা করুক…। শিল্পী-শিল্পকলা কিছুই থেমে থাকে না, থেমে থাকেনি কখনো।

সম্প্রতি আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ গ্যালারিতে শিল্পী রনি আহম্মেদের এক অভিনব চিত্রভাবনা-সমৃদ্ধ প্রদর্শনী হয়ে গেলো। প্রদর্শনীর নামকরণ এবং মূলভাব দুটির এই অভিনবত্বের সঙ্গে একটি যোগসূত্র নির্মাণ করেছেন রনি। প্রদর্শনীর নাম : ‘মিথোরনিয়া’ (গুঃযড়ৎড়হহরধ) বা রনির মিথ। অভিনব নাম – যা গায়ে চড়িয়ে দেয় অহংবাদের রাজ-পোশাক। কিন্তু প্রদর্শনী কক্ষ ঘুরে দেখার পর মনে হলো, যথার্থ নাম। এমন ঔদ্ধত্য রনিকে মানায়। কেননা, রনি তাঁর নিজের জগতের মধ্যে ডুব দিয়ে ফ্যান্টাসির সাতমহলার দরজায় কড়া নেড়েছেন।

শিল্পকলায় সব শাখাতেই ফ্যান্টাসির একটা ভূমিকা রয়েছে। কল্পনাশক্তির পূর্ণ স্বাধীনতার আশ্রয়ে মনোজাগতিক চেতনায় আকণ্ঠ নিমজ্জমান থেকে রনি তাঁর শিল্পকর্ম সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টিশীল শিল্পকর্মের সর্বত্রই ফ্যান্টাসির উপস্থিতি, কম বা বেশি। এই পরিপ্রেক্ষিতে প্রদর্শনীর শিরোনাম নিঃসন্দেহে তাৎপর্য বহন করে।

এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে শিল্পকলার ইতিহাসবেত্তাদের মধ্যে ‘ফ্যান্টাসি’ শব্দের এক বিশেষ তাৎপর্যও চালু আছে। ম্যাজিক রিয়ালিজম ও ফ্যান্টাসটিক রিয়ালিজমের মতো ক্ষণস্থায়ী চিত্র-আন্দোলনে ফ্যান্টাসির বিশেষ প্রকাশ দেখা গেছে।

নানা সময়ে নানা শিল্পী এ নিয়ে কাজ করেছেন। ফরাসি শিল্পী আঁরি রুশোর ছবিতেও পরিচিতি জীব-জগতের মধ্যেই ফ্যান্টাসির বিপুল প্রকাশ লক্ষণীয়।

খুব সাধারণ অবজেক্ট উপস্থাপনায় অসাধারণ ভঙ্গি সৃষ্টি করে ফ্যান্টাসির অপূর্ব প্রকাশ ঘটিয়েছেন কেউ কেউ। এই ধরনের ফ্যান্টাসির সীমাবদ্ধতা আছে চিত্রের বিষয়ে – কিন্তু ছবি আঁকা হয়েছে সুপার রিয়েলিস্ট ভঙ্গিতে।

স্পেনীয় শিল্পী হুয়ান মিরোর ছবিতেই প্রথম দেখা যায় ছবির বিষয় ও ফর্ম, উভয় ক্ষেত্রেই ফ্যান্টাসি। মিরোর এই নতুন চিত্রভাবনাকে পরবর্তীকালে আরো সমৃদ্ধ করেন আরেক ফ্যান্টাসিভক্ত শিল্পী আর্সাইল গোর্কি।

এই কথা বলা যেতে পারে, আমাদের দেশে শিল্পকলাচর্চা ও এর গতি-প্রকৃতি বা প্রবণতা পঞ্চাশের-ষাটের দশকের ইউরোপীয় চিত্রকলার ভাবধারা থেকে এখনো মুক্ত নয়। ক্যানভাসে বর্ণপ্রলেপ থেকে কম্পোজিশন – আমাদেরকে এতটাই মোহিত করেছে যে, এর ঘেরাটোপে আটকে আছি এখনো।

সেই দিক থেকে রনির এই প্রদর্শনী অর্থবহ। পরিচিত এবং সহজ প্রবণতাকে উপেক্ষা করে নতুন বা নিজস্ব অন্যরকমের ভাবনা প্রকাশ করা এবং তা দর্শকদের সম্মুখে তুলে ধরা সাহসের ব্যাপার।

প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত শিল্পকর্মের মধ্যে ড্রাই-পয়েন্ট, মিশ্র মাধ্যমের কাজসহ স্থাপনাধর্মী কাজ ছিল। শিল্পকর্মের বর্ণনায় না গিয়ে বলা যায় – প্রত্যেক শিল্পীরই নিজস্ব জগৎ থাকে, নিজস্ব কিছু অনুষঙ্গ থাকে, যে-অনুষঙ্গগুলো তার সারফেসে বিচরণ করে বেড়ায়। সেইগুলো কখনোবা আনটোল্ড সিচ্যুয়েশন তৈরি করে, তখন একটা আবহ তৈরি হয়। যে যত আবহ বা রহস্য তৈরি করতে পারে সে ততটা সার্থক!

রনির ছবির স্পেস জুড়ে অসংলগ্ন ও বহুবিধ বিষয় (ঠিক দৃশ্যমান আবার দৃশ্যমান নয়) যা আপাত মনে হতে পারে জটিলতায় নিমজ্জমান। সেই জটিলতার জট সরিয়েছেন তার সহজ ড্রইং-শৈলীতে। কখনো কখনো মনে হয়েছে কোনো একটি ফর্মকে ফ্যান্টাসির বাতাবরণে আটকে তৈরি করেছেন গল্প এবং সেই গল্প রহস্যের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। গল্পের ভেতর রয়েছে তুমুল স্যাটায়ার। আর এই সবকিছুই বুদ্ধিবৃত্তির বার্তা বহন করে। এক কথায় ওর ছবি দুর্বোধ্য অথচ চিত্তাকর্ষক। আর সেই মায়াজাল ভেদ করে প্রতিটি কাজের মধ্য থেকে এক প্রতীকী অর্থবহ বার্তাও উঠে আসে।

আসলে শিল্পকর্ম নিয়ে কিছু বলা বা লেখা কঠিন একটি কাজ। একজন শিল্পী হিসেবে সেই দায়িত্ব পালন করা আরো কঠিন। তবু বলি, রনির সাম্প্রতিক প্রদর্শনী দেখে এতটা আলোড়িত হয়েছিলাম যে এই প্রদর্শনীর জ্বলজ্বলে অনুভব চোখের মণিতে এখনো উজ্জ্বল।

প্রদর্শনীতে ‘ইনস্টলেশন’ ধারায় কাজ ছিল। ইনস্টলেশনই বলতে যতটা বুঝি : শিল্পীর হাতে গড়া কিছু অবজেক্টকে শিল্পী নিজস্ব ভাবনায় সাজিয়ে যার মধ্য দিয়ে অদ্ভুত এক সেনসেশান সৃষ্টি করতে চান বিপরীতধর্মী পরিবেশের সংস্পর্শ ও সংঘাতের মধ্য দিয়ে। পৃথিবীতে এখন নানা ধরনের ইনস্টলেশন হচ্ছে। সম্প্রতি ফ্রান্সের পম্পিডু সেন্টারে বিখ্যাত জার্মান শিল্পী জোসেফ বয়েজের কাজ দেখেছি। তিনি অসংখ্য ফেল্ট কম্বল দিয়ে থরে থরে সাজানো গোডাউনের মতো ঘরে রেখেছেন একটি পিয়ানো। এসব কিছুর পেছনে নিশ্চয় তত্ত্বকথাও আছে। হয়ত আছে সামাজিক কোনো বক্তব্য কিংবা প্রতিবাদ!

গত একশ বছরে – আধুনিকতাবাদের পরে ইউরোপ ও আমেরিকায় ভিন্ন ভিন্ন ধারায় শিল্পকলা সৃষ্টি হয়েছে। জুরিখে (১৯১৫-২০) হয়েছে সবচাইতে উল্লেখযোগ্য ‘দাদা’ আন্দোলন। এর মূল আদর্শ ছিল উঁচুস্তরের শিল্পকলার বিরোধিতা করা। মার্শাল দুশাঁর (Marshal Duchamp) ‘বাইসাইকেলের চাকা’ এই আন্দোলনের উল্লেখযোগ্য কাজ। অর্থাৎ অত্যন্ত সাধারণ বস্তু রাস্তা থেকে তুলে এনে শিল্পকর্ম হিসেবে তাকে গ্যালারিতে উপস্থাপন করা। সামান্য বস্তুটিকে তার অবস্থান পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে, তার সামগ্রিক চরিত্রকেও পালটে দেয়া হয়েছে – অর্থপূর্ণ করা হয়েছে।

মার্শাল দুশাঁর এস্টাব্লিসড মডার্নিজমের বিরুদ্ধতার মধ্যেই লুকিয়ে ছিল উত্তর-আধুনিকতার বীজ। এই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইউরোপীয় তাত্ত্বিক মিশেল ফুকো, জ্যাক দোরিদা – এঁদের চিন্তা-ভাবনা।

উত্তর-আধুনিক শিল্পকলা নানা ফর্মে আশ্চর্যজনক সৃজনশীলতায় রূপ নিয়ে প্রকাশিত হচ্ছে। যার সৃজনশীলভাবনার ছোঁয়া আমাদের এখানে এসে পৌঁছেছে। এদেশে এর যৌক্তিকতা নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তোলেন। আমাদের সমাজে, আর্থ-সামাজিক কাঠামোয়, পরিবেশে, সর্বোপরি আমাদের জীবনে, এর যথার্থতা কতটুকু। সামাজিক ও নান্দনিক ক্ষেত্রে।

এসব তর্কের ক্ষেত্রে না গিয়ে বলা যায়, আমাদের তরুণ শিল্পীরা যারা এ-ভাবধারার চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে অন্যধারার শিল্পচর্চা করছেন – অর্থপূর্ণ কিছু সৃষ্টি করার জন্যে তাদের প্রতি রইল আমার আকণ্ঠ সমর্থন। হয়ত এদেশে এঁদের হাত ধরেই নতুনতর শিল্পসৃষ্টির কাজটি সহজ হয়ে উঠবে।

অভিনন্দন রনি আহম্মেদ। ঘোর কৃষ্ণ অমাবস্যার রাতে টর্চের আলোয় চতুর্দিক আলোকিত হয় না হয়ত, কিন্তু কিছুটা পথ এগিয়ে যাওয়া যায়।

সূত্র : নান্দীমুখ / জানুয়ারি ২০০৩; কিছু মানুষ কিছু বই / পূর্ণেন্দু পত্রী; দেশ ২২ এপ্রিল ১৯৯৪।

আন্দোলনে ফ্যান্টাসির বিশেষ প্রকাশ দেখা গেছে।

নানা সময়ে নানা শিল্পী এ নিয়ে কাজ করেছেন। ফরাসি শিল্পী আঁরি রুশোর ছবিতেও পরিচিতি জীব-জগতের মধ্যেই ফ্যান্টাসির বিপুল প্রকাশ লক্ষণীয়।

খুব সাধারণ অবজেক্ট উপস্থাপনায় অসাধারণ ভঙ্গি সৃষ্টি করে ফ্যান্টাসির অপূর্ব প্রকাশ ঘটিয়েছেন কেউ কেউ। এই ধরনের ফ্যান্টাসির সীমাবদ্ধতা আছে চিত্রের বিষয়ে – কিন্তু ছবি আঁকা হয়েছে সুপার রিয়েলিস্ট ভঙ্গিতে।

স্পেনীয় শিল্পী হুয়ান মিরোর ছবিতেই প্রথম দেখা যায় ছবির বিষয় ও ফর্ম, উভয় ক্ষেত্রেই ফ্যান্টাসি। মিরোর এই নতুন চিত্রভাবনাকে পরবর্তীকালে আরো সমৃদ্ধ করেন আরেক ফ্যান্টাসিভক্ত শিল্পী আর্সাইল গোর্কি।

এই কথা বলা যেতে পারে, আমাদের দেশে শিল্পকলাচর্চা ও এর গতি-প্রকৃতি বা প্রবণতা পঞ্চাশের-ষাটের দশকের ইউরোপীয় চিত্রকলার ভাবধারা থেকে এখনো মুক্ত নয়। ক্যানভাসে বর্ণপ্রলেপ থেকে কম্পোজিশন – আমাদেরকে এতটাই মোহিত করেছে যে, এর ঘেরাটোপে আটকে আছি এখনো।

সেই দিক থেকে রনির এই প্রদর্শনী অর্থবহ। পরিচিত এবং সহজ প্রবণতাকে উপেক্ষা করে নতুন বা নিজস্ব অন্যরকমের ভাবনা প্রকাশ করা এবং তা দর্শকদের সম্মুখে তুলে ধরা সাহসের ব্যাপার।

প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত শিল্পকর্মের মধ্যে ড্রাই-পয়েন্ট, মিশ্র মাধ্যমের কাজসহ স্থাপনাধর্মী কাজ ছিল। শিল্পকর্মের বর্ণনায় না গিয়ে বলা যায় – প্রত্যেক শিল্পীরই নিজস্ব জগৎ থাকে, নিজস্ব কিছু অনুষঙ্গ থাকে, যে-অনুষঙ্গগুলো তার সারফেসে বিচরণ করে বেড়ায়। সেইগুলো কখনোবা আনটোল্ড সিচ্যুয়েশন তৈরি করে, তখন একটা আবহ তৈরি হয়। যে যত আবহ বা রহস্য তৈরি করতে পারে সে ততটা সার্থক!

রনির ছবির স্পেস জুড়ে অসংলগ্ন ও বহুবিধ বিষয় (ঠিক দৃশ্যমান আবার দৃশ্যমান নয়) যা আপাত মনে হতে পারে জটিলতায় নিমজ্জমান। সেই জটিলতার জট সরিয়েছেন তার সহজ ড্রইং-শৈলীতে। কখনো কখনো মনে হয়েছে কোনো একটি ফর্মকে ফ্যান্টাসির বাতাবরণে আটকে তৈরি করেছেন গল্প এবং সেই গল্প রহস্যের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। গল্পের ভেতর রয়েছে তুমুল স্যাটায়ার। আর এই সবকিছুই বুদ্ধিবৃত্তির বার্তা বহন করে। এক কথায় ওর ছবি দুর্বোধ্য অথচ চিত্তাকর্ষক। আর সেই মায়াজাল ভেদ করে প্রতিটি কাজের মধ্য থেকে এক প্রতীকী অর্থবহ বার্তাও উঠে আসে।

আসলে শিল্পকর্ম নিয়ে কিছু বলা বা লেখা কঠিন একটি কাজ। একজন শিল্পী হিসেবে সেই দায়িত্ব পালন করা আরো কঠিন। তবু বলি, রনির সাম্প্রতিক প্রদর্শনী দেখে এতটা আলোড়িত হয়েছিলাম যে এই প্রদর্শনীর জ্বলজ্বলে অনুভব চোখের মণিতে এখনো উজ্জ্বল।

প্রদর্শনীতে ‘ইনস্টলেশন’ ধারায় কাজ ছিল। ইনস্টলেশনই বলতে যতটা বুঝি : শিল্পীর হাতে গড়া কিছু অবজেক্টকে শিল্পী নিজস্ব ভাবনায় সাজিয়ে যার মধ্য দিয়ে অদ্ভুত এক সেনসেশান সৃষ্টি করতে চান বিপরীতধর্মী পরিবেশের সংস্পর্শ ও সংঘাতের মধ্য দিয়ে। পৃথিবীতে এখন নানা ধরনের ইনস্টলেশন হচ্ছে। সম্প্রতি ফ্রান্সের পম্পিডু সেন্টারে বিখ্যাত জার্মান শিল্পী জোসেফ বয়েজের কাজ দেখেছি। তিনি অসংখ্য ফেল্ট কম্বল দিয়ে থরে থরে সাজানো গোডাউনের মতো ঘরে রেখেছেন একটি পিয়ানো। এসব কিছুর পেছনে নিশ্চয় তত্ত্বকথাও আছে। হয়ত আছে সামাজিক কোনো বক্তব্য কিংবা প্রতিবাদ!

গত একশ বছরে – আধুনিকতাবাদের পরে ইউরোপ ও আমেরিকায় ভিন্ন ভিন্ন ধারায় শিল্পকলা সৃষ্টি হয়েছে। জুরিখে (১৯১৫-২০) হয়েছে সবচাইতে উল্লেখযোগ্য ‘দাদা’ আন্দোলন। এর মূল আদর্শ ছিল উঁচুস্তরের শিল্পকলার বিরোধিতা করা। মার্শাল দুশাঁর (গধৎংযধষ উঁপযধসঢ়) ‘বাইসাইকেলের চাকা’ এই আন্দোলনের উল্লেখযোগ্য কাজ। অর্থাৎ অত্যন্ত সাধারণ বস্তু রাস্তা থেকে তুলে এনে শিল্পকর্ম হিসেবে তাকে গ্যালারিতে উপস্থাপন করা। সামান্য বস্তুটিকে তার অবস্থান পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে, তার সামগ্রিক চরিত্রকেও পালটে দেয়া হয়েছে – অর্থপূর্ণ করা হয়েছে।

মার্শাল দুশাঁর এস্টাব্লিসড মডার্নিজমের বিরুদ্ধতার মধ্যেই লুকিয়ে ছিল উত্তর-আধুনিকতার বীজ। এই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইউরোপীয় তাত্ত্বিক মিশেল ফুকো, জ্যাক দোরিদা – এঁদের চিন্তা-ভাবনা।

উত্তর-আধুনিক শিল্পকলা নানা ফর্মে আশ্চর্যজনক সৃজনশীলতায় রূপ নিয়ে প্রকাশিত হচ্ছে। যার সৃজনশীলভাবনার ছোঁয়া আমাদের এখানে এসে পৌঁছেছে। এদেশে এর যৌক্তিকতা নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তোলেন। আমাদের সমাজে, আর্থ-সামাজিক কাঠামোয়, পরিবেশে, সর্বোপরি আমাদের জীবনে, এর যথার্থতা কতটুকু। সামাজিক ও নান্দনিক ক্ষেত্রে।

এসব তর্কের ক্ষেত্রে না গিয়ে বলা যায়, আমাদের তরুণ শিল্পীরা যারা এ-ভাবধারার চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে অন্যধারার শিল্পচর্চা করছেন – অর্থপূর্ণ কিছু সৃষ্টি করার জন্যে তাদের প্রতি রইল আমার আকণ্ঠ সমর্থন। হয়ত এদেশে এঁদের হাত ধরেই নতুনতর শিল্পসৃষ্টির কাজটি সহজ হয়ে উঠবে।

অভিনন্দন রনি আহম্মেদ। ঘোর কৃষ্ণ অমাবস্যার রাতে টর্চের আলোয় চতুর্দিক আলোকিত হয় না হয়ত, কিন্তু কিছুটা পথ এগিয়ে যাওয়া যায়।

সূত্র : নান্দীমুখ / জানুয়ারি ২০০৩; কিছু মানুষ কিছু বই / পূর্ণেন্দু পত্রী; দেশ ২২ এপ্রিল ১৯৯৪।