অশরীরী :
মাহমুদুল হক
সাহিত্যপ্রকাশ,
ঢাকা, ২০০৪
দাম : ৬০.০০
মাহমুদুল হক বাংলাদেশের উপ-ন্যাসের গুটিকয় শিল্পসফল ঔপন্যাসিক-দের মধ্যে অন্যতম। স্বভাবজাত জনপ্রিয়তার মোহকে দূরে ঠেলে যাঁরা সাহিত্যচর্চার দূরূহ পথে নিবিষ্ট তেমন কয়েকজনের তালিকায় এই ঔপন্যাসিকের নামটি উজ্জ্বল। তাঁর সাহিত্যপ্রচেষ্টা শুরু অনুর পাঠশালা দিয়ে সেই ১৯৬৭ সালে, যদিও গ্রন্থাকারে উপন্যাসটি প্রকাশ পায় ছ’বছর পর। মাহমুদুল হকের পরবর্তী প্রচেষ্টাগুলোও এর নিকটবর্তী বছরগুলোতেই রচিত। সর্বশেষ ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত মাটির জাহাজ-এর রচনাকাল ১৯৭৭। মাঝখানে লিখিত হয়েছিল নিরাপদ তন্দ্রা, জীবন আমার বোন ও কালোবরফ। খেলাঘর-এর রচনা মাত্র একবছর পর, ১৯৭৮ সালে। ২০০৪-এর বইমেলায় প্রকাশিত অশরীরী হয়ত-বা নিভৃতচারী এ-কথাকারের নতুন প্রকাশ, যা বাংলাদেশের উপন্যাসের যে-কোনো মননশীল পাঠকের জন্যই একটি সুখবর; যদি স্বেচ্ছানির্বাচিত এ-ঔপন্যাসিকের এটি নতুন রচনা হয়, তবে তা হবে সকলের জন্য অশেষ আনন্দের এক সংবাদ যে মাহমুদুল হক আবার কথাশিল্পে ফিরে এসেছেন।
অশরীরী শুরু হয়েছে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবনাপুঞ্জ দিয়ে; যদিও সে-ভাবনার জনক কে তা খুব বেশি স্পষ্ট হয় না সহজে। ‘পাখির শিস, না ট্যাপ থেকে পানি ঝরছে ওভাবে, পাখি হয়ে থাকলে দোয়েল; ভোরের আলো ফুটতে দেখে দোয়েলই ওরকম প্যাটর-প্যাটর জুড়ে দেয় বরাবর, তখন আর তার কোনো তাল থাকে না, বকে চলেছে তো চলেছেই’ – এভাবে অনির্দেশক বাক্যরাশি চলতে শুরু করে যা প্রায় দেড় পৃষ্ঠা পর কেমন এক আকৃতির পর্যায় লাভ করতে চায়, যখন বোঝা যায় ওইসব শব্দের ভেতর আসলে কথা আছে – ‘কথাগুলো নিরীহ; না ভালো, না মন্দ। কেমন আছো? ভালো? ভালো নয়? বুঝতে পারছি, বুঝতে পারছি! এ-রকমই, বুঝলে, এই রকমই। আর কি! কি আর করবে! হ্যাঁ, ভাই। কারো জন্য কারো কিছু করার নেই! চিরকাল এইভাবেই চলছে। চিরকাল! কি জানি, তবে এইরকমই হয়, বুঝলে না? বুঝলে আম্বিয়া?’
এইভাবেই অশরীরীতে আম্বিয়ার অনুপ্রবেশ। তবে খুব সহজেই যে আম্বিয়া চরিত্রটিতে পাঠকের প্রবেশ ঘটছে তা নয়; আম্বিয়া নামের মানুষটির ভেতরের ভাবনাস্রোতের দূর-সম্পর্কিত কিছু কিছু অভিজ্ঞানে পাঠক ক্রমশ স্নাত হতে শুরু করেন। যেমন, যেদিন প্রথম সে তাহেরার হাত নিজের মুঠোয় ভরেছিল, সেদিন চোখ বুজে এসেছিল তাহেরার; অথবা বুটের ছ্যাঁচা খেয়ে-খেয়ে ডান পায়ের পাতায় দগদগে ঘা হয়ে গেছে, উষ্ণ পেচ্ছাবের ধারা গড়ালে বেশ আরাম লাগে। সেই আরামের পেচ্ছাব-বিষয়ক ভাবনাটি মুহূর্তেই ভাষা নেয় : “তাছাড়া পেচ্ছাব জিনিসটা অ্যান্টিসেপটিকও বটে, মেসে থাকতে সে সেই রকমই শুনেছে। ওদুদের অভ্যেস ছিল নিয়মিত পাড়ায় যাওয়ার। ওদুদ বলত, ‘একবার কেন, দশবার পাড়ায় যাও, কিচ্ছু হবে না, কেবল কামকাজ সেরে নিজের মুতে যন্ত্রটাকে ধুয়ে ফেলতে হবে, রোগবালাই ধারেকাছে আসবে না।” মনুষ্যমনের এই যে ক্ষিপ্র ওপরিবর্তনশীল গতিবিধি তার চিত্রায়ণ হতে হতে সূক্ষ্ম যে আলোকরশ্মির বিচ্ছুরণ হতে থাকে তাতে ক্রমশ প্রতীয়মান হয় উপন্যাসের প্রধান এই চরিত্র আম্বিয়ার সাথে মুক্তিযুদ্ধের সংযোগ।
চেতনাস্তরের গভীরে থাকে যে-ভাবনারাশি তার ভাষ্যরূপ কিন্তু মাহমুদুল হকের উপন্যাসের নতুন কোনো অনুষজ্ঞ নয়; অনুর পাঠশালা তো সেই গভীর চেতনাস্তরকেই আশ্রয় করেছে। নিরাপদ তন্দ্রাও কম যায় না এতদপ্রসঙ্গে। মাটির জাহাজ সে-অনুষঙ্গের পরিপূর্ণ পরিচর্যা। তবে অবশ্য-উল্লেখ্য যে, ঔপন্যাসিক তাঁর এ-নির্মাণে ভাষাশৈলী এবং বিষয়বোধে কখনো পৌনঃপুনিক হননি। অভিনবত্বের হাতছানি তাঁর প্রতিটি উপন্যাসকেই নতুনতর মাত্রা দান করে।
অশরীরীতে মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গটি যেভাবে এসেছে তাতেও নিরীক্ষার অনুসন্ধান করা যেতে পারে। তাঁর পূর্ববর্তী উপন্যাস জীবন আমার বোন এবং খেলাঘর-এও মাহমুদুল হক মুক্তিযুদ্ধ-প্রসঙ্গকে আশ্রয় করেছেন। জীবন আমার বোন-এ মুখ্য চরিত্র খোকার সাথে মুক্তিযুদ্ধের সম্পৃক্তি বাহিরীক অবস্থান থেকে মূল্যায়িত। অন্যদিকে খেলাঘর ইয়াকুবের কোমল অনুভবরাশির উচ্চারণ। রেহানা-ইয়াকুবের উচ্ছল কথোপকথন দিয়ে শুরু এ-উপন্যাসটিতে ঝড়ের উথাল-পাতাল শুরু হয় যখন পাঠক জানতে পারেন যুদ্ধ শুরুর দিনগুলোতে রেহানাকে মিলিশিয়ারা ধরে নিয়ে গিয়েছে। উপন্যাসটি শেষ হয় ইয়াকুবের এমন
ভাবনারাশি দিয়ে : ‘সারা বারান্দায় আন্নার (রেহানা) পায়ের ছাপ। ইচ্ছে হয় ওর ওপর গাল পেতে শুয়ে থাকি। … ছলছলে পানির কোল ঘেঁষে ওই তো ঘুমশাক, আন্না আমাকে চিনিয়েছিল। ভাই ঘুমশাক, আন্নাকে তুমি মনে রেখো। ওই তো আমরুল, থানকুনি পাতা, মনে আছে তো ভাই, মনে আছে তো ভাই, মনে আছে।’ ইয়াকুবের দুঃখবোধের এমন যে শ্বাসবোধকারী বর্ণনা তা বোধ হয় মাহমুদুল হকের স্বজাত। দার্শনিকতা-বিবর্জিত অনুভূতির এমন প্রকাশ অশরীরীতেও প্রতুল। আবার উদ্দেশ্যপ্রণোদিত-ভাবনাও কি নেই! আব্বাস উদ্দিনের ওই গানটা শুনলেই মনে হয় : ‘তা মোমিন মুসলমান দেখা হলো, ওটাই বাকি ছিল, মালগুলো কি! দেশটাকে একেবারে ছারখার করে দিলো শুয়োরের বাচ্চারা! আমার শালা প্রাণ ভরে গাল দিতে ইচ্ছে করে, চেঁচিয়ে গাল দিতে ইচ্ছে করে।’ অথবা ‘আহাম্মকের দল! স্রেফ ভাঁওতাবাজি দেশটাকে করে তুলেছে একটা সারগাছা, আঁস্তাকুড়; এক এক শালা আসবে আর দেশটাকে তার বাপদাদার জমিদারি বলে মনে করবে, শালাদের বস্তাপচা ফতোয়া শুনতে শুনতে কানমাথা ঝালাপালা হয়ে গেছে মানুষজনের।’
অবসাদগ্রস্ত আচ্ছন্ন ভাবনা-স্রোতের ভেতরেই একসময়ে জানা যায় মিলিটারি ক্যাম্পে বর্তমানে আটক আম্বিয়া মে মাসের ন’ তারিখে গজারিয়ায় প্রথমবার ধরা পড়েছিল এবং মজার বিষয় হলো যখন আম্বিয়ার সামগ্রিক বর্তমান অবস্থাটি স্পষ্টতর রূপ নিল এমন একটি বাক্যে, ঠিক তখনই লেখক সজোড়ে আবার পাঠককে সরিয়ে নিয়ে যান ‘এর আগে অনেক কথা আছে’ বলে। সে-কথায় প্রথমেই আসে স্ত্রী তাহেরা প্রসঙ্গ, সন্তান পুপুর প্রসঙ্গও সমসাময়িক। নিকট অতীত থেকে সেসব প্রসঙ্গ ক্রমশ দূর অতীতে সম্প্রসারমাণ। দূরতর অতীতে আমরা যখন পৌঁছলাম তখন তাহেরা তার বড় মামা দিলগনির সংসারে আশ্রিত এবং খবরের কাগজের সাহিত্য-পাতার দায়িত্বে নিয়োজিত আম্বিয়া তাহেরার গৃহশিক্ষক। মিলিটারি সেলে আটক আম্বিয়ার অতীত-উপস্থাপনে ঔপন্যাসিক কুশলী – ঘটনা পরম্পরাকে ভেঙে নস্যাৎ করে ফেলেন তিনি; মনের ভেতরে লাফ দিয়ে- ওঠা বিবিধ প্রসঙ্গ গদ্দাগাদির ভেতর দিয়ে ভেসে ওঠে মাথা উঁচিয়ে।
তাহেরা চরিত্রটি অশরীরী উপন্যাসের নিয়ামক। মামা দিলগনির বাসায় আশ্রিত থাকা অবস্থাতেই মামির শয়তানির শিকার হয় সে। ইচ্ছে করেই মামি লেলিয়ে দেয় নিজের ভাই মোস্তাফিজকে। গর্ভবতী হয় তাহেরা। নিজের এই পরিণতির জন্য দায়ী ব্যক্তিটির নাম লুকিয়ে রেখে সে আশ্রয় খোঁজে আম্বিয়ার কাছে। এক পর্যায়ে আম্বিয়া-তাহেরার বিয়ে সম্পাদ্য হলে শুরু হয় নতুন সংকট। আম্বিয়ার সন্নিকটবর্তী যে-কোনো নারীর ব্যাপারেই তাহেরা বোধ করতে থাকে ক্রুরতা। কাজের মেয়ে মনোরমা বা আপন বোন আন্তদুমও তার অপমানকর আচরণ থেকে রক্ষা পায়নি। কুৎসিত ইঙ্গিতে অতিষ্ট করে তুলেছে নিজেদের জীবন।
অশরীরী-র আম্বিয়া কায়াহীন। নির্মম নির্যাতন শরীরবোধের স্বাভাবিকতা থেকে আম্বিয়াকে নিক্ষেপ করেছে শরীরহীনতাবোধে। দীর্ঘ এবং প্রত্যক্ষ নির্যাতন তার মধ্যে যে-অনুভূতির জন্ম দিয়েছে তা হলো : ‘আচ্ছন্নতা কি মনোরম, মনে তোলপাড় করে একথা। আচ্ছন্নতা কী মধুর! সারা শরীর উৎকর্ণ হয়ে বলে – আমাকে আচ্ছন্নতা দাও, আমাকে আচ্ছন্নতা দাও’ – যার বাহিরীক প্রকাশে আমরা আম্বিয়াকে জোড় হাত অবস্থায় ‘আমাকে গুলি করে মারুন-’ বলতে দেখি। শরীর-নিরপেক্ষ এ-অস্তিত্ব আম্বিয়ার জন্য কিন্তু তাৎক্ষণিক কিছু নয়। পঁচিশে মার্চের রাতে ঢাকায় ক্রাকডাউন হলে শত শত লাশ সরানোর কাজে জড়িয়ে গিয়েছিল আম্বিয়াও। মিলিটারির হাতে পড়ে পচা-বীভৎস লাশ সরানোর কাজে সাঁড়াশি হাতে নিযুক্তি পেয়েছিল সে। তারও আগে ছাত্র বয়সেও একবার তাকে লাশ সরানোর কাজ করতে হয়েছিল : হাজার হাজার নিরন্ন মানুষের মিছিলে যখন গুলি চালিয়েছিল পুলিশ, তখন।
সন্দেহ নেই অশরীরী একটি অনুপম সৃষ্টি। কল্পনাশক্তির বিস্তারণ এ-উপন্যাসের উপজীব্য; যেমন-ভাবে উপস্থাপনার কারুকলা উপন্যাসটিতে সঞ্চার করেছে গভীর সংকটবোধ – ব্যক্তিমানুষের সে-সংকটের সঙ্গে কথাশিল্পী সম্পৃক্ততা ঘটিয়েছেন জাতীয় সংকটের। এভাবেই তাঁর সাহিত্যপ্রয়াসে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে এবং অশরীরী-র প্রকাশ
হয়ে উঠেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.