Diary of a Genius:
Salvador Dali
Sristhi Publishers & Distributors
Nwe Delhi
Price : $1.75
‘তিনিই হিরো যিনি বিদ্রোহ করেন পৈত্রিক কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে এবং করেন জয়’ – সিগমন্ড ফ্রয়েডের এই উক্তির মাধ্যমে পরাবাস্তব শিল্পী সালভাদর দালির ডায়েরি শুরু হয় ১৯৫২ সালের মে দিবসে অর্থাৎ মে মাসের পহেলা তারিখে। স্থান, পোর্ট লিগাট, ফ্রান্স। নিজের কথা শুরু করেছেন এইভাবে :
‘লিখবার জন্য আমি প্রথমবারের মতো পরিধান করেছি একজোড়া পেটেন্ট চামড়ার জুতো, যা অস্বাভাবিক আঁটসাঁট বলে অনেকদিন পর্যন্ত পায়ে দিতে পারিনি। সাধারণত কোনো লেকচার দেবার আগে জুতোজোড়া আমি পায়ে দেই। কেননা যেই বেদনাকীর্ণ চাপ সৃষ্টি হয় পদযুগলে, তা আমার কণ্ঠনিঃসৃত শব্দকে বাড়িয়ে দেয় অনেকাংশে। সৃষ্ট বেদনায় আমি নাইটিঙ্গেল পাখির মতো কিংবা সেইসব নিওপলিটান গায়কদের মতো গাইতে পারি, যারা পরিধান করে এমনই আঁটসাঁট জুতো। এই আন্তরযন্ত্রীয় দৈহিক আকাক্সক্ষা, এই প্রবল নিপীড়ন বাধ্য করে শব্দকোষ থেকে পরিশোধিত ও উন্নত সত্যকে বের করে আনতে। আর তাই আমি এই জুতো পরে কোনো দ্বিধা ছাড়া আত্মনিগ্রহে নিপীড়িত হয়ে লিখতে শুরু করেছি পরাবাস্তববাদী আন্দোলন থেকে বেরিয়ে আসবার পেছনের সম্পূর্ণ সত্য এক কাহিনী।’
ডায়েরির শুরু ও এই বর্ণনায় এটিই প্রতীয়মান হয়, শিল্পীর চিন্তাভাবনায় রয়েছে এক সরসবোধের খোরাক, অথচ আশপাশের প্রতিটি বিষয়কে যেন ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেন তিনি আর তাকে বিশ্লেষণ করেন বিজ্ঞানীর চাইতেও সূক্ষ্ম এক বোধের মাধ্যমে। ডায়েরির পরবর্তী অংশে দালি বলছেন, ‘আমি পরোয়া করি না আমার দিকে ক্ষেপণকৃত আঁদ্রে ব্রেঁতোর মিথ্যা অপবাদ, যিনি আমাকে ক্ষমা করতে পারেননি সর্বশেষ ও একমাত্র পরাবাস্তববাদী হবার জন্য, কিন্তু এটি গুরুত্বপূর্ণ যে, কোনো একদিন, যখন আমি প্রকাশ করব এই পৃষ্ঠাগুলো, তখন সকলেই জানবে প্রকৃতপক্ষে কী ঘটেছিল। আর তা বুঝাবার জন্য আমাকে ফিরে যেতে হবে
আমার শৈশবে।’
এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, দালি নিছক দিনপঞ্জি বা প্রতিদিনের ঘটনাকে লিপিবদ্ধ করেননি এই ডায়েরিতে। ডায়েরির মেজাজ ব্যক্তিগত গণ্ডি ছাড়িয়ে বিচরণ করে পাঠকের আকাশে। লেখক নিজেই চেয়েছেন এই ডায়েরির বিষয়বস্তু পাঠকের মাঝে উন্মোচিত হোক, তাঁর জীবন ও জীবনধারাসংক্রান্ত বিশ্লেষণ যেন সকলের কাছে পরিষ্কার হয়। পরাবাস্তবতা যার অস্তিত্বের পরতে পরতে, এমন একজন প্রতিভাধর ব্যক্তি কেন সেই আন্দোলন থেকে বেরিয়ে আসবেন, ডায়েরিটি সেই বিশ্লেষণধর্মী অন্বেষণ করেছে শিল্পীর সূক্ষ্ম লেখনীর আঁচড়ে। এখানে শিল্পী হয়ে উঠেছেন একজন দক্ষ লেখক। কোথাও কোথাও আত্মজীবনীমূলক, কোথাও তৎকালীন সামাজিক, ধর্মীয় কিংবা রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ ও চিন্তাভাবনার উল্লেখ, কখনো কোনো ঘটনা কিংবা কোনো বিষয়ে নিজস্ব রীতি ও ভঙ্গিতে অনুভূতি প্রকাশ, আবার কখনো তৎকালীন বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্ক বা ভাব-আদান-প্রদানের বিষয়গুলোই ডায়েরিতে ঘুরে-ফিরে এসেছে। এসব তথ্য
ও বিবরণ নিয়েই দালির আত্মজীবনীর দ্বিতীয় খণ্ড হিসেবে পরিগণিত এই ডায়েরিটি এক ধরনের ঐতিহাসিক দলিল। লেখকের স্বকীয়তাসমৃদ্ধ এই প্রকাশনাটি হয়ে উঠেছে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। ১৯৫২ থেকে শুরু করে ১৯৬৩ পর্যন্ত সময়কাল ধরে রচিত হলেও ডায়েরিটিতে স্বাভাবিক সময়ের ক্রমধারাবাহিকতা একেবারেই নেই, কোনো কোনো মাসে হয়ত কলম ও কালির সাথে ডায়েরির পাতার একেবারেই সাক্ষাৎ ঘটেনি। খেয়ালি মন যখন চেয়েছে তখনই ডায়েরির পাতা ভরে উঠেছে বৈচিত্র্যময় তথ্যসমৃদ্ধ শব্দসম্ভারে।
বিশ্বচিত্রশিল্পী-জগতের শিল্পানুরাগীদের জন্য স্পেনীয় শিল্পী সালভাদর দালি নামটি যথেষ্ট কৌতূহলোদ্দীপ্ত ও উত্তেজক। শিল্পীর অস্তিত্বই যেন স্যুররিয়ালিজম বা পরাবাস্তবতার চরম ফ্যান্টাসিকে ছাড়িয়ে যাওয়া এক নতুন মাত্রার স্যুররিয়ালিজম, যিনি সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণকে নাটকীয়ভাবে উপস্থাপন করেন ফ্যান্টাসির আশ্রয়ে। কখনো কখনো নিজেই হয়ে যেতেন শিল্পকর্ম, অনেকটা ইনস্টলেশনধর্মী উপস্থাপনায়, কখনো সাধারণের চোখে ভাঁড়ের ভূমিকায়। অবচেতনের এক রহস্যময় চিত্রকল্প-জগতে ছিল তাঁর অবাধ বিচরণ ও অনুসন্ধান। তরুণ বয়সে শিল্পী মাদ্রিদ ও বার্সেলোনায় নানাধরনের রীতির আশ্রয় নিয়ে ও নানা তত্ত্বের প্রচ্ছায়ায় কাজ করে গেছেন। ১৯২০ সাল পর্যন্ত এ-ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবার পর দুটি ঘটনা তাকে একটি পরিণত স্টাইলে পৌঁছতে সাহায্য করে। একটি সিগমন্ড ফ্রয়েডের লেখাবিষয়ক আবিষ্কার, যা অবচেতন নির্জ্ঞান কল্পজগতের কামোদ্দীপক তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে। অন্যটি ছিল প্যারিসের পরাবাস্তববাদী দলের সঙ্গে তার যোগাযোগ। এ-দলের অন্তর্ভুক্ত শিল্পী এবং লেখকরা বিশ্বাস করতেন অতি-বাস্তবতায়। পরাবাস্তববাদীদের পোপ হিসেবে পরিচিত আঁদ্রে ব্রেঁতো ১৯২৪ সালে একটি ইশতেহার প্রকাশ করেন যেখানে তিনি দাবি করেছিলেন, অবচেতন মন থেকেই শিল্পের জন্ম এবং এভাবেই শিল্পী সম্ভাব্য সবচেয়ে স্বাধীন অনুপ্রেরণা লাভ করতে পারেন এবং যুক্তির ঊর্ধ্বে পৌঁছতে পারেন এমন এক জগতে, যেখানে স্বপ্ন এবং বাস্তবতার মধ্যে সীমারেখা মুছে যাবে একটি ‘অতি-বাস্তবতা’ অর্জনের মধ্য দিয়ে। এই বিশ্বাসে অনুপ্রাণিত হয়ে দালি শুরু করেন নতুন প্রচেষ্টা, যেখানে তিনি তাঁর অবচেতন মন থেকে প্রতিচ্ছবি খুঁজে আনতে নিজেকে প্ররোচিত করেন অলীক
দর্শন করতে। প্রক্রিয়াটির নাম দেন ‘Paranoiac critical’। নতুনত্ব বা অসাধারণত্ব দালিকে সবসময়েই আকর্ষণ করেছে। ১৯৪১ সালের দিকে তিনি ক্লাসিক হিসেবে নিজেকে প্রকাশ করতে সচেষ্ট হন এবং রাফায়েলের কম্পোজিশনের ভারসাম্য বা নির্মল বৈশিষ্ট্যকে গ্রহণ করেন। ১৯৫০ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত সময়ে করা কাজগুলো ছিল ধর্মীয় ধারণা-সম্পৃক্ত। এভাবে অতিরিক্ত বৈচিত্র্য ও বিভিন্নতার সম্ভারে সমৃদ্ধ দালি শুধু পেইন্টিং বা প্রিন্ট তৈরি করে নয়, বরং নানা সময়ে শিল্পজগতে নৈবেদ্য দিয়ে গেছেন অভ্যন্তরীণ সজ্জা, থিয়েটারের সেট, ভাস্কর্য এমনকি অলংকার-নকশার মতো নানাবিধ কাজে নিজের দক্ষতা প্রকাশ করবার মাধ্যমে। স্পেনীয় চলচ্চিত্র-পরিচালক ল্যু বুনুয়েলের সঙ্গে তিনি দুটি পরাবাস্তব চলচ্চিত্রও নির্মাণ করেন, An Andalusian Dog (1928) I The Golden Age (1930)। মানবিক সম্পর্ক, বিধিনিষেধ সবকিছুতে ব্যঙ্গ করে রচনা করেন তাঁর শিল্পকর্ম। অনন্য প্রতিভাধর এই শিল্পী জন্মেছিলেন স্পেনে, ১৯০৪ সালের ১১ মে।
শৈশবের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে পহেলা মে তারিখের লেখায় দালি লিখেছেন, কীভাবে তার প্রথম শিক্ষক ডন এস্তাবান ট্রেটার এক বছর যাবৎ বারংবার তাঁকে শুনিয়েছেন সৃষ্টিকর্তার অনস্তিত্বে এবং এই লক্ষণীয় বিষয়ে যে, ধর্ম নারীজাতির জন্যই কেবল প্রযোজ্য। দালি শিক্ষকের এই দীক্ষায় অনুপ্রাণিত হতেন, এমনকি একেই সত্য বলে বিশ্বাস করতেন। কেননা নিজ-পরিবারে শুধুমাত্র মেয়ে-সদস্যদেরই তিনি চার্চে যাওয়া-আসা করতে দেখতেন।
তাঁর বাবা, যিনি ছিলেন একজন মুক্তচিন্তার মানুষ, কখনোই যেতেন না কোনো উপাসনালয়ে। এ-বিষয়ে তর্কে উপনীত হলে তিনি উল্লেখ করতেন তার বন্ধু গ্যাব্রিয়েল আলামারের এক উদ্ধৃতি ‘ঈশ্বরনিন্দা হচ্ছে ক্যাটালান (ফ্রান্স ও উত্তর-পূর্ব স্পেনে ব্যবহৃত আদি ভাষা) ভাষার সবচাইতে সুন্দর অলংকার।’
ডায়েরিতে বিভিন্ন সময়ে দালি বেশকিছু নিজস্ব উদ্ধৃতি ব্যবহার করেছেন, যা দেখা যায় ডায়েরির একেবারে শুরুতেও। যেমন, জুলাইয়ের পহেলা তারিখের ডায়েরির পাতা শুরু করেছেন এই উদ্ধৃতিতে, ‘জুলাই মাসে নয় কোনো নারী কিংবা ঝিনুক’ অথবা ১৭ তারিখে লিখছেন, ‘পরোৎকর্ষতে ভীত হয়ো না। তুমি তা কখনই অর্জন করতে পারবে না। একদিন পরই, ১৮ তারিখে লিখছেন এক স্পেনীয় প্রবাদ, Quieb madruga, Dios ayuda অর্থাৎ ‘ঈশ্বর তাকেই সাহায্য করেন যারা প্রত্যুষে ঘুম থেকে জেগে ওঠেন।’
পরিবারে তার বাবাকে দালি সবচাইতে বেশি প্রশংসা করতেন এবং অনুকরণ করতেন। বাবা তার জীবনের একজন বিশেষ অনুপ্রেরণাকারী হলেও, তিনি আরো প্রেরণা পেয়েছেন নানা বই পড়ে, বিভিন্ন দার্শনিক ও ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্যে এসে। শৈশবে তার জ্ঞানপিপাসু মনকে সন্তুষ্ট করবার প্রয়াসে বাবার পাঠাগারের
অন্তর্ভুক্ত সব নাস্তিকতাবাদী বইয়ের সম্ভারের সংস্পর্শে
আসেন তিনি। পড়েছেন ভলতেয়ারের দার্শনিক অভিধান VoltaireÕs Philosophical Dictionary| নিৎসের প্রথম স্তবক তাঁকে প্রবলভাবে নাড়া দেয়। মাত্র তিনদিন সময় ব্যয় করেন তিনি নিৎসেকে আত্মীকরণ বা হজম করতে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ‘এ যেন সিংহের ভোগ গ্রহণ, তবুও বাকি থেকে যায় নিৎসের মতো দার্শনিকের ব্যক্তিত্বকে বোঝা, বিশেষ করে তাঁর অনন্য গোঁফ পর্যবেক্ষণ।’ তিনি সিদ্ধান্ত নেন, গোঁফের ক্ষেত্রেও তিনি ছাড়িয়ে যাবেন নিৎসেকে। আর সে-প্রতিজ্ঞা তিনি রেখেছিলেন। একরৈখিক, সাম্রাজ্যবাদী ও অতি যুক্তিনিশ্চয়তাবাদী চরিত্রের সূচ্যগ্র গোঁফ ছিল স্বর্গের দিকনির্দেশিত; যেন উল্লম্ব অতীন্দ্রিয়তা কিংবা শীর্ষস্থ স্পেনীয় পরিষদ, দালির এই গোঁফ ছিল সত্যিই চোখে পড়ার মতো। নিৎসের প্রভাব তাঁকে নাস্তিকতার দিকে চালিত করেনি, বরং আধ্যাত্মিকতার প্রশ্নে নানা কৌতূহল ও সন্দেহের উদ্রেক করেছে। তাঁরই প্রভাবে দালি ১৯৫১ সালে এঁকেছেন ‘মিস্টিক্যাল ম্যানিফেস্টো’। ইরানের প্রাক-ইসলামিক বা আদি ইসলাম-বিষয়ক পুস্তক ‘জারাথুস্ট্রা’ তাঁকে নানাভাবে প্রভাবিত করেছে।
এক পর্যায়ে নাস্তিকতা কিংবা সাম্রাজ্যবাদী ধ্যান-ধারণায় নিজেকে এত তীব্রভাবে পরিচালিত করেছেন যে, তাঁর পিতা বাধ্য হয়েছিলেন তাঁকে পরিবার থেকে বহিষ্কার করতে। চার বছরের এই সময়কালে তিনি যেমন নিৎসের জগতে বিচরণ করেছেন, আবার গারসিয়া লোরকার মুখে ‘সেইন্ট জন অব দ্য ক্রস’ কবিতা-আবৃত্তি শুনে তেমনভাবে প্রভাবিত হয়েছেন। পরাবাস্তব-আন্দোলনে শরিক হবার প্রবল আকাক্সক্ষা যখন দালির, তখন তাঁর আঁকা ছবি ‘The Lugubrious Game’ নিন্দিত হয় সেই স্যুররিয়ালিস্ট আন্দোলনের সহযাত্রীদের দ্বারা। দালি এখানে উল্লেখ করেছেন, ‘আমি স্যুররিয়ালিস্টদের শুধুমাত্র আরেকটি সাহিত্যিক ও শিল্পীসুলভ দল হিসেবে বিবেচনা করতে অপারগ ছিলাম, আমি বিশ্বাস করতাম তারা ব্যক্তিবিশেষ বা মানুষকে মুক্ত করে বাস্তব ও যৌক্তিক পৃথিবীর শৃঙ্খল বা অত্যাচারের সীমাবদ্ধতা থেকে।’ কিন্তু স্বয়ং আঁদ্রে ব্রেঁতোও হতবাক হয়েছিলেন দালির চিত্রকর্মের মাত্রাতিরিক্ত অশ্লীলতা (মল-বিষয়ক উপাদান ব্যবহারের কারণে, শিল্পে যার সরাসরি প্রকাশকে তখন নিষিদ্ধ বলে গণ্য করা হতো) পর্যবেক্ষণ করে। দালি তখন স্বেচ্ছায় সীমা ছাড়িয়ে যাবার খেলায় মেতে উঠেছিলেন। এ-রকম নানা মতানৈক্যের ফলে আঁদ্রে ব্রেঁতো এবং তখনকার পরাবাস্তববাদীদের জগৎ থেকে অনেক দূরে সরে এসেছিলেন দালি এবং নিজেই আরেক নতুন ধারার পরাবাস্তবতা সৃষ্টি করেছিলেন। কোনো এক দৈনিক পত্রিকার সাক্ষাৎকারে তার কাছে পরাবাস্তবতার সংজ্ঞা জানতে চাইলে তিনি কোনো দ্বিধা না রেখে দৃঢ়ভাবে উল্লেখ করেছিলেন, ‘আমি নিজেই পরাবাস্তবতা’ এবং এ-ধারণা তিনি চিরকালই বিশ্বাস করে গিয়েছিলেন।
ডায়েরিতে ১৯৫২ সালের ২০ তারিখে হঠাৎ করেই মন্তব্য করেছেন শিশুদের নিয়ে। বাস্তবে শিশু-সাহচর্য তাঁকে কখনো আনন্দ দেয়নি, যদিও শিশুদের আঁকা ছবি প্রবলভাবে উপভোগ করেছেন, অভিভূত হয়েছেন সেইসব চিত্রের প্রভাবহীন বিশুদ্ধতা, সরলতা আর অকপটতায়। পরাবাস্তবতার এক অকপট সাধক, দালি তাঁর কৌতূহলী সংশয়কে ঘিরে নিজের বুদ্ধি ও বিচারে প্রশ্নের উত্তর খুঁজে ফিরেছেন দর্শনের মাধ্যমে, সামাজিক, ধর্মীয় কিংবা নীতিগত অনুশাসনের বাইরে গিয়ে খোলা চোখে, তীক্ষè পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে অন্বেষণ করেছেন চারপাশকে এবং তা প্রকাশ করেছেন একেবারে নিজস্ব ভঙ্গিতে। তিনি একজন প্রতিবাদী শিল্পী, যিনি তাঁর কাজকে প্রকাশ করেছেন চরম ফ্যান্টাসির মাধ্যমে। নানা ধরনের পরীক্ষার মধ্য দিয়ে এগিয়ে গিয়েছেন তিনি, তৈরি করেছেন নিজস্ব শৈলী। কৌতুুুুক, ব্যঙ্গ, আনন্দ, প্রশ্ন – সবকিছুকেই টেনে এনেছেন তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমে। শিল্পসৃষ্টিতে ঝুঁকি বা চ্যালেঞ্জ নিতে একবারও থেমে যাননি। তথাকথিত নান্দনিকতা বা শিল্পবোধকে অস্বীকার করেছেন, ঠেলে ফেলে দিয়েছেন ধর্মীয় বোধকে। আবার কখনো কখনো সংস্কারমুক্ত হয়ে প্রাচীনের সাথে হাত মিলিয়েছেন, কাজ তখন হয়ে উঠেছে ঐতিহ্যধর্মী। কখনো কখনো তাঁর কাজ কিংবা চালচলন সাধারণের দৃষ্টিতে উন্মাদনা বলে মনে হতে পারে। ডায়েরিতে তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘একজন উন্মাদ ও আমার মধ্যে একমাত্র পার্থক্য হলো আমি উন্মাদ নই।’ ডায়েরিটি মূলত একটি আত্মকথন এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে আত্মবিশ্লেষণ, যা পড়লে দালিকে বেশ ভালোভাবে জানা যায়। জানা যায়, বিভিন্ন সময়ে তার সাথে সে-সময়কার বিভিন্ন স্বনামধন্য ব্যক্তিত্বের কথোপকথন, ভাবের আদানপ্রদান, কাজ নিয়ে তাঁর পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রেক্ষাপট। তাঁর গভীর বোধের প্রকাশ কখনো কখনো দুর্বোধ্য মনে হলেও ডায়েরিটি যেন সেই সময়ের সাথে পাঠকের এক নিটোল আড্ডা, তৎকালীন শিল্প-শিল্পী, সামাজিক ও রাজনৈতিক চালচিত্রের দুর্দান্ত এক খোশগল্প। এমন অকপট, নির্ভীক ও তথাকথিত সৌজন্যবিবর্জিত অশালীন উচ্চারণ যেন একমাত্র দালির পক্ষেই সাজে।
ডায়েরি অব এ জিনিয়াস নামের এই আত্মজীবনীমূলক বইটির ভূমিকাটি লিখেছেন জে. জি. ব্যালার্ড। ভূমিকার শুরুতে
দালিরই একটি উক্তি দিয়ে শুরু করেছেন তিনি – ‘আমাদের সময়ের বিশেষায়িত বিজ্ঞানগুলো মনোনিবেশ করে জীবনের তিনটি ধ্রুব বিষয়ে, যৌন-প্রবৃত্তি, মৃত্যুবোধ এবং সময় ও ত্রিমাত্রিকতার অবিভাজ্য এক চতুর্মাত্রিক মহাবিশ্বের ধারণা সম্পর্কিত উদ্বেগ।’ (সালভাদর দালি, হ্যারি এন এব্রামস্ ইনকরপোরেশন, নিউইয়র্ক, ১৯৬৮)
ব্যালার্ড লিখেছেন, বিংশ শতাব্দীতে আধিপত্য-বিস্তারকারী যুক্তি ও দুঃস্বপ্নের অস্বচ্ছন্দ পরিণয়ের পরিণামেই জন্ম নিয়েছিল ক্রমশ বর্ধনশীল এক পরাবাস্তববাদী জগত। আমাদের সময়কার সব ঘটনাকে যেন পরাবাস্তববাদের বিশ্লেষণেই যথাযথভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। আর এই পরাবাস্তববাদের সাথে ফ্রয়েডের তত্ত্বের প্রভাবে আন্দোলিত দালির আবির্ভাবকে তিনি সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন। একাধারে চিত্রশিল্পী, লেখক, ভাস্কর, অঙ্কনশিল্পী, মণিকার এবং ব্যক্তিত্ব – দালির বহুমুখী প্রজ্ঞা ও প্রতিভা লিওনার্দোর সমতুল্য বলে ব্যালার্ড দাবি করেন। ভূমিকা থেকেই জানা যায় দালির আরেকটি উক্তি, ‘ছয় বছর বয়সে হতে চেয়েছিলাম পাচক। সাত বছরে নেপোলিয়ন। আর আমার উদগ্র আকাক্সক্ষা সেই থেকে বেড়েই চলেছে একাগ্রতায়।’ (সালভাদর দালি, ১৯৬২)
ব্যালার্ডের লেখা নতুন করে মনে করিয়ে দেয় দালি ছিলেন অকপট এক সাহসী শিল্পী, যিনি নিজের অনুক্ষণের চিন্তার সাথে ছিলেন চিরবিশ্বাসী। তাঁর সৃষ্ট শিল্পের মধ্যে তিনি সম্পূর্ণভাবে বিরাজ করতেন। তাঁর আঁকা চিত্রগুলোর বিকাশধারাকে পর্যবেক্ষণ করে ব্যালার্ড সেগুলোকে কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করেছেন। যেমন,
ক্লাসিক ফ্রয়েডীয় পর্ব (The Lugubrious Game, The Persistance of Memory)
রূপান্তর বা মেটামরফিক পর্ব (Autumn Cannibalism)
ধর্মীয় পর্ব (Christ of St. John on the Cross, Geopoliticus Child Watching the Birth of the Nwe man) নিউক্লিয়ার পর্ব (Raphaelesque Head Exploding).
ব্যালার্ড ভূমিকার শেষে মন্তব্য করেছেন দালির শক্তিধর চিত্রের অসম্ভব ক্ষমতা নিয়ে, যা উন্মোচন করে পরাবাস্তব কল্পনার মৌলিক উপাদানসমূহ, যা প্রকাশ করে এই যুগের অসামান্য রূপান্তর-সম্পর্কিত সমীকরণের এক অসাধ্য ধারা। লেখক তাঁর ভূমিকা শেষ করেছেন অসামান্য প্রতিভাধর এই শিল্পীকে প্রণতি জানিয়ে এবং পুনরায় দালির আরেকটি উক্তি দিয়ে – ‘কোনো প্রয়োজন নেই জনসাধারণের এই বিষয়ে জ্ঞাত হওয়ার যে, আমি কৌতুক করছি না-কি সুগভীরভাবে আত্মসংবৃত, ঠিক একইভাবে আমার নিজেরও তা জানবার কোনো প্রয়োজন নেই’ (সালভাদর দালি, ১৯৬৮)।
ডায়েরি শুরু করবার আগে সালভাদর দালির লেখা একটি মুখবন্ধও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বইটিতে। মুখবন্ধে তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘বইটি প্রমাণ করবে, একজন প্রতিভাবান ব্যক্তির নিত্যদিনের মুহূর্তগুলো, তার নিদ্রাকাল, তার পরিপাকপ্রণালি, তার স্বপ্নাচ্ছন্ন অনুভূতি, তার নোখর, তার শারীরিক অসুস্থতা, রক্ত, জীবন এমনকি মরণ এ-সবই হবে মানবজাতির বাকি অংশ-অপেক্ষা ভিন্ন কোনো অভিজ্ঞতা। তাঁর সহধর্মিণী গালাকেও একজন অনন্য প্রতিভাধর ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করে তিনি তাকে সে-সময়ের পৌরাণিক নারীর স্থান দিয়েছেন। ডায়েরিতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে এসেছে গালার নাম, যিনি ছিলেন দালির জীবনসঙ্গী ও অনুপ্রেরণাদাত্রী। এক স্থানে লিখেছেন, গালা – আমার তালাতিয়েভ/ আমার রত্ন/ আমার ওজন স্বর্ণে ।
তিনি নিজেই স্বীকার করে গেছেন যে, প্রচলিত রাজনীতি ও মানবতার মধ্যকার সমীকরণে
যে -অসাধ্য শূন্যতা রয়েছে, সেই আবহে তার অনেক লেখাই প্রকাশের অযোগ্য। তাই ডায়েরির সময়কালের প্রবহমানতা বিঘ্ন হয়েছে অনেকবারই। পেপারব্যাক আকারের এ-বইটি সালভাদর দালি উৎসর্গ করেছেন তাঁর প্রতিভাময়ী সহধর্মিণী গালা গ্রাদিভা, হেলেন অব ট্রয়, সেইন্ট হেলেন, গালা গালাতিয়্যে প্লাসিদার এ-সকল নারী-চরিত্রের উদ্দেশে। প্রচলিত ধ্যান-ধারণার ব্যতিক্রমি এই দার্শনিক শিল্পী, যিনি প্রতিদিনই দেখতেন নতুন নতুন স্বপ্ন আর সেই অবচেতনের গভীর থেকে তুলে আনা মার্জিত কিংবা অমার্জিত উপকরণ কিংবা রত্ন দিয়ে সমৃদ্ধ করতেন তাঁর ক্যানভাস, তারই একান্ত চিন্তা ও অভিজ্ঞতার প্রকাশ এ-বই দ্য ডায়েরি অব এ জিনিয়াস নিঃসন্দেহে গভীরবোধের পাঠকের জন্য এক সুদুর্লভ সংযোজন।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.