অগ্নি যাহা করেনি দাহ:
খালেদা এদিব চৌধুরী
জীবন প্রকাশন
ঢাকা, ২০০৪,
দাম : ২৫০.০০
সত্যি কথা বলতে কি, বিশিষ্ট কবি ও কথাশিল্পী খালেদা এদিব চৌধুরীর অগ্নি যাহা করেনি দাহ উপন্যাসটি হাতে নিয়ে পড়া শুরু করতেই মুহূর্তের মধ্যেই বেশ নড়েচড়ে বসলাম। বইয়ের পাতা থেকে চোখ অন্যত্র সরাতেই পারছিলাম না। বইটির বিশেষ আকর্ষণ এর বর্ণনার ব্যঞ্জনা, দ্রুতগতি, lyrical style ও রচয়িতার অদ্ভুত সম্মোহনী শক্তি।
এই কম্পিউটারের শতাব্দীতেও এই যান্ত্রিক সভ্যতার তীব্রগতি ও কর্মচাঞ্চল্যের মাঝে টাকা, ডলার, পাউন্ড, ইয়েন, রিয়াল ও ইউরোর হিসাব মিলাতে মিলাতে যারা জীবনকে এখনো মহৎ প্রেমের দৃষ্টিতে দেখতে চান, ইঞ্জিনের সুতীব্র শব্দ ছাপিয়েও যাদের কাছে এখনো ভেসে আসে ঘুঘু, চড়ুই, কোকিল, শালিক ও বন দোয়েলের ডাক, তামার তারেও যারা দেখতে চান মাধবীলতার দোলা, গনগনে তাপপ্রবাহের মাঝেও যারা খুঁজতে চান স্নিগ্ধ শীতল সরোবর, আমি বলছি, আমি তাদের অনুরোধ করছি, যারা এখনো পড়েননি তারা খালেদা এদিব চৌধুরীর এই উপন্যাসটি পড়ুন, আপনাদের ভালো লাগবে। উপন্যাসটি স্মৃতিকথা-রচনার গতানুগতিক ধারাবাহিকতাকে অতিক্রম করে নিষ্কলুষ অবিনাশী প্রেমের নির্যাসে ভরা এক নিখুঁত অথচ ব্যতিক্রমধর্মী চিত্র-অঙ্কনের দুর্লভ দক্ষতায় উত্তীর্ণ হয়েছে। উপন্যাসের রচয়িতাকে বলা যায় নায়ক জয়ব্রত ও নায়িকা মমতার অনাবিল ভালোবাসা ও তাদের জীবনের বিচিত্র ঘটনাবলির এক বিশ্বস্ত ও নিপুণ ধারা-ভাষ্যকার। সেই সঙ্গে আত্মবিশ্লেষকও। উপন্যাসটি আমার মতে স্মৃতির গতানুগতিক ইশতাহারের বদলে এক নৈর্ব্যক্তিক আত্মকথনের মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়েছে। অভিষিক্ত হয়েছে সত্যিকারের সাহিত্যের মর্যাদায়। বইটির নায়ক জয়ব্রত হিন্দু, নায়িকা মমতা মুসলমান। হোক না, অসুবিধে কোথায়? সত্যিকার ভালোবাসার অনাবিল রাজ্যে তো অসম, অসম্ভব, অস্বাভাবিক ও অবাস্তব বলে কোনো শব্দ নেই। প্রেম অবশ্যই সীমালঙ্ঘনের দাবি রাখে।
ইংরেজিতে একটি কথা আছে – Nothing is unfair in war and in love। প্রকৃত প্রেমিক আসলে সাহসী যোদ্ধা। প্রেম সম্পূর্ণই হৃদয়ের ব্যাপার। প্রেমের উপর কোনো শাসন নেই। সে চলে আপন গতিতে নদীর মতো। ভাবনাচিন্তা করে, যুক্তি দিয়ে, বুদ্ধি দিয়ে আর যা-ই হোক – ভালোবাসা কি যায়? সত্যিকার প্রেম সমাজবিধির নাগ-পাশ-মুক্ত। ইংরেজ দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল বলেছেন, ‘The heart has reasons of its own which the head cannot understand।’
জয় ও মমতার প্রেমের পরিপূর্ণ অভিজ্ঞতা নিরঙ্কুশ নৈপুণ্যে বিশ্লেষিত হয়েছে এই উপন্যাসে। দৃষ্টিভঙ্গির স্বচ্ছতা, উদারতা, সূক্ষ্মতা ও সম্পূর্ণ হৃৎকলমের টানে লেখা
এ-উপন্যাসটি এর রচয়িতাকে পাঠকের ঠিক মনের মাঝখানে ঠাঁই করে দিয়েছে। প্রাণের জোরে তিনি পাঠককে কাছে টেনে নিয়েছেন। দেখুন না কীভাবে তিনি লিখেছেন, ‘সেদিনটা যেন আজ এই মধ্যরাতে ওর কাছে নাচতে নাচতে চলে এল। মনে হচ্ছে এটা সেই সোনালী দুপুর, ওর জীবনের সন্ধিক্ষণের এক আশ্চর্য দুপুর। যেদিন জয়ব্রত ওকে জয় করে নিয়েছিল। ও ভাবেনি এত সুন্দর অনুকূল পরিবেশ পাবে। আকাশের তারাগুলো ওকে দেখে যেন হাসছে। হয়ত-বা আশীর্বাদ করছে। মাধবী ফুলগুলোকে মনে হচ্ছে অন্য কোনো ফুল।’
খালেদা এদিব চৌধুরীর লেখায় সত্যি একধরনের জাদু আছে, মায়াময় কাঁপা কাঁপা, টানা
টানা সুর আছে, যা হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো পাঠককে সারাক্ষণ সঙ্গে করে নিয়ে
যায়। উপন্যাসের রচয়িতা
দক্ষ ঢ়ংুপযরধঃৎরংঃ-এর মতো পাঠককে যেন এক যুঢ়হড়ঃরপ ঃৎধহপব-এ নিয়ে যান। নর-নারীর সম্পর্কের মধ্যে অবশ্যই একটা সূক্ষ্ম নিভৃত সৌন্দর্য আছে, যা আজকাল গল্প-উপন্যাসে খুব একটা দেখা যায় না। এই নিভৃত সৌন্দর্যটি খালেদা এদিব চৌধুরীর উপন্যাসে বিশেষভাবেই ফুটে উঠেছে। এতে আছে চিরন্তন প্রেমানুভূতির এক শিল্পিত রূপ, অন্যদিকে আছে প্রেমের অনতিক্রান্ত বৃত্তের বেদনামথিত কথা, হাহাকার ও হারানো স্বপ্নের বিভোরতা। হৃদয়ভেজা, অশ্রুভেজা উপন্যাসের প্রতিটি পাতা পাঠককে নিয়ে যায় এক স্বপ্ন ও ভালোবাসার ভুবনে।
একটি ডেলিকেট কাহিনীকে তিনি মানবিক মূল্যবোধের একটি গ্রহণযোগ্য দলিল হিসেবে রূপায়িত করতে সক্ষম হয়েছেন। এতে জীবন-সম্পর্কে কোথাও এতটুকু ফাঁক নেই। ফাঁকি নেই। উপন্যাস-পাঠের একটি পরিপূর্ণ ও অনাবিল তৃপ্তিতে ভরে ওঠে পাঠকের হৃদয়মন। লেখক সত্যিকারের সৎ হলে, পাঠককে আপন মনে করলে, তার মনের ভাব-প্রকাশে কখনো পাণ্ডিত্য দেখান না, ডিপ্লোমেসির আশ্রয় নেন না। সম্পূর্ণ প্রাণের জোরেই এখানে লেখক পাঠককে কাছে টানতে সক্ষম হয়েছেন।
যে-কোনো বইয়ের গুণই হচ্ছে তা পড়তে ভালোলাগা। এক কথায় বলা যায়, এই উপন্যাসটি পড়তে সত্যিই ভালো লেগেছে।
আগাগোড়া জীবননির্যাসে ভরপুর উপন্যাসটির ভাষাশৈলী স্বচ্ছ, সাবলীল ও প্রাঞ্জল। মমতা ও জয়ের প্রোজ্জ্বল ও প্রসন্ন প্রেমের সফলতাকে কেন্দ্রবিন্দুরূপে ধরে নিয়ে তার চারপাশের বিভিন্ন চরিত্র ও ঘটনাকে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে রং-বেরঙের মেঘের মতো। চাঁদ ও সুরুজ ঢাকা পড়েনি চারপাশে উড়ে চলা মেঘের আড়ালে। উপন্যাসটিতে বিভিন্ন ধারার ঘটনাস্রোত প্রবাহিত হলেও তা কখনো মূল মোহনার আশ্রয় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়নি। এর নির্মিতিতে কোনো শৈথিল্য নেই। অবসন্নতার অবকাশ নেই কোথাও। টানটান ভাবটি বজায় আছে সর্বত্র। ভাবপ্রকাশে সংহতি আছে, ঘটনার দ্রুতি আছে। বর্ণনার ব্যঞ্জনধর্মিতা ও গভীরতা লক্ষণীয়। সূক্ষ্ম, দৃঢ়, বিচিত্র ও রহস্যঘন, যা পাঠকের মনে এক ধরনের মায়াজাল সৃষ্টি করে।
উপন্যাসটিতে সকালের প্রসন্নতা আছে, দুপুরের নির্জনতা আছে। গোধূলির মায়াময় বিষণ্নতা আছে, আছে রাত্রির গভীরতা। সমুদ্রের অতলজলের আহ্বান আছে। নদীর কলধ্বনি আছে, পাহাড়ি ঝরনা ও তটিনীর আমন্ত্রণ আছে, মরুভূমির হাহাকার আছে। আছে গহিন অরণ্যের হাতছানি ও বনের মর্মর ধ্বনি। উপন্যাসটির রচনায় নাটক আছে, নৃত্যের মনোরম ভঙিমা আছে। তাল আছে। কবিতা আছে, ছবি আছে। আছে গান, পুরানো দিনের গান, হারানো দিনের গান। রবীন্দ্রনাথের প্রার্থনার সংগীত। শান্ত, করুণ, ধ্যান-রসে ভরা। পূরবীর সঙ্গে কোমল ধৈবত যেন মিলেছে। সাহিত্যেরও যে একটি সাংগীতিক রূপ আছে, রস আছে, তা সার্থকভাবে ফুটে উঠেছে এর পাতায় পাতায়। কবিতা ও সংগীতের সমন্বয়ে আলাদা একটি ডাইমেনশনের সৃষ্টি হয়েছে এতে।
উপন্যাসটি কখনো চিঠির মতো, ডায়েরির মতো মনে হয়েছে, মনে হয়েছে আত্মকথনের মতো। কিন্তু স্বগত সংলাপ ও আত্মকথন অভিষিক্ত হয়েছে সাহিত্যের মর্যাদায়। লেখক আন্তরিকতাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন সর্বত্র। যেখানে তার দুর্বলতা, সেখানেই তার শক্তি। তা হলো অকপট সততা, গভীর মমত্ববোধ ও প্রচণ্ড আবেগ, যা আমাদের অন্তর্লোককে এক প্রকৃত সত্যের মুখোমুখি করে, যা অকৃত্রিম ও অবিকৃত। আবেগ ছাড়া, উচ্ছ্বাসবিহীন প্রেম তো মাখন-জেলি ছাড়া শুকনো
রুটির মতো। প্রেমঘটিত
বাস্তব-পরিবেশকে রহস্যঘন করে তুলতে এই উপন্যাস-রচয়িতার মুনশিয়ানার সত্যি জুড়ি নেই।
খালেদা এদিব লিখছেন, ‘আমি যে আলো দেখতে চাই। আলো, আলো। ও যে একটা আলো ছিল আমার কাছে। কেউ যদি একটিবার, শুধু একটিবার হাত ধরে আমাকে ওর কাছে নিয়ে যেত! বকুল, শশিকলা, সত্যি বলছি আজ আমি ওর জন্য আকুল হয়ে আছি। আমি শক্ত হাতে, শক্ত হাতে এই ৪০/৪২টি বছর মুছে ফেলতে চাই।’ কত সহজ সাবলীল ভাষা, অথচ কী গভীর, কী তীব্র তার দহন! মুখের সহজ ভাষা সাহিত্যের ভাষায় পরিণত হয়েছে।
উপন্যাস-রচয়িতা জয় ও মমতার যে-ছবি এঁকেছেন সে-প্রেমে যন্ত্রণা আছে, কষ্ট আছে, আছে হৃদয়ের গভীর পরতে পরতে ফোঁটায় ফোঁটায় রক্তক্ষরণ। কিন্তু কোথাও ধিক্কার নেই, মালিন্য নেই, প্রবঞ্চনার জ্বালা নেই, ক্ষোভ নেই, অবিশ্বাস নেই। আনন্দ আছে, তৃপ্তি আছে, আছে শাশ্বতপ্রেমের অনন্ত মহিমায় অমরত্বলাভের এক অপূর্ব আস্বাদ। উপন্যাসে মমতার মানবতাবাদী, অসাম্প্রদায়িক পিতার চরিত্র আছে। আছে স্নেহশীল কন্যা শারমিনের চরিত্র। আরো আছে মেট্রোন দিদি, গৌতম, ঋত্বিক, সুনন্দ, সবিতা দি, সতী, লক্ষ্মী, গৌরি, শশিকলা, বকুল, অনীশদা, জয়ের বাবা-মা, মাসিমার চরিত্র। সবাইকে মনে হয়েছে রক্ত-মাংসে গড়া মানুষ। আমাদের অনেকদিনের চেনা। জীবন থেকে নেওয়া। কবে কোথায় এদের যেন দেখেছি? প্রতিটি চরিত্রই যেন আমাদের সামনে ঠিক দাঁড়িয়ে কথা বলছে।
সেই সরু মাটির রাস্তা, গাছের ছায়া, শান্ত নদীতীর। দেখতে পাচ্ছি ব্রহ্মপুত্রের ওপারে খেয়া পারাপার। টাঙ্গাইলের নির্জন বারান্দা, আশ্রমের সবুজ উঠোন, পলাশডাঙ্গার আম, জাম, কাঁঠাল গাছে ঘেরা সুন্দর বাড়ি, কামিনী গাছ, বকুলতলা, লন্ডনের টেমস নদী। সব যেন ছবির মতো।
এটি একটি অফুরান ভালোবাসার মধুর স্মৃতির স্মরণ। এটি একটি পবিত্র প্রেমের ও জীবনসত্যের দ্বন্দ্ববিধুর কাহিনী, যা জীবনবোধ থেকে উৎসারিত। জয় ও মমতার শোভন সুন্দর সম্পর্কটি সারাক্ষণ এক স্নিগ্ধ আনন্দের ও বেদনার অনুরণন জাগায়। খালেদা এদিব চৌধুরী একজন সার্থক জীবনশিল্পী। তাঁর উপন্যাসে একটি গল্প আছে, কিন্তু এই গল্প-বলাই লেখিকার মূল উদ্দেশ্য নয়। গল্প-বলার প্রয়োজনীয় আবহ ও পরিবেশ বজায় রেখেও তিনি পাঠকের অনুভূতিতে এক ধরনের শিহরণ জাগিয়ে তোলার কাজটি অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে সম্পাদন করেছেন। যেহেতু এই উপন্যাসের রচয়িতা একজন সার্থক কবি সেহেতু তিনি প্রকাশের ক্ষেত্রে তাঁর কাব্যিক-আবেগ সার্থকভাবে প্রয়োগ করে এতে দান করেছেন এক অপরূপ শিল্প-সুষমা।
উপন্যাসটির বড় সম্পদ হচ্ছে এর সমৃদ্ধ সংলাপ। তীব্র মাধুর্য ও সুগভীর আধ্যাত্মিক অনুভূতিতে ভরা বৈদগ্ধপূর্ণ হৃদয়সংবোদী সংলাপ। কবিত্বময় গদ্যের স্তরে তা প্রসারিত। লসনের ভাষায়, ‘Dialogue without poetry is half alive|
উপন্যাসটি যাকে বলে সত্যিকার feeling of the heart থেকে লেখা। লেখিকার ভাবনায়, কল্পনায় ও উপন্যাসের রচনাশৈলীতে একটি রোমান্টিকতা বিরাজ করছে সর্বত্র। কিন্তু লেখিকা আবেগসর্বস্ব নন। তাঁর আবেগ মননশীল বুদ্ধিগ্রাহ্যতার আলোকে উদ্ভাসিত। সংলাপ উদ্দাম, গতিময়, প্রাণময় উচ্ছ্বাসে ভরা। ভাবতান্ত্রিক হলেও
বিস্তারধর্মী, বাস্তবিক ও স্বাভাবিক। বারবার সংলাপে সুপার ইম্পোজ হয়ে আসে দেবদাস, পারু, অমিত লাবণ্যের সংলাপ। এক ধরনের আবেশ ও ছন্দের দোলা সৃষ্টি করে যায়
বারবার। উপন্যাসটিতে রাজনীতির কথা আছে, কিন্তু উপন্যাসটি রাজনীতিকেন্দ্রিক নয়। রাজনীতির কথা বলাও লেখিকার মূল উদ্দেশ্য নয়। মমতার প্রথম জীবনে অনীশদা ও সবিতাদির বিপ্লবী প্রভাবে তার মনে মার্কস, এঙ্গেলস ও লেনিন প্রচণ্ডভাবে দোলা দিয়ে গেছে, দিয়ে গেছে সমাজতন্ত্রের ঠিকানা। একদিকে ঈধঢ়রঃধষ-এর শিক্ষা অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের গীতবিতানের দীক্ষা, চণ্ডীদাস আর জ্ঞানদাসের দীক্ষা।
পরবর্তী পর্যায়ে জয়ব্রতের সাহচর্য তাকে নিয়ে গেছে উপনিষদের জগতে, এক উদার মানবতার ঠিকানায়। এই উপনিষদের ‘ওম শান্তি’র পরিপ্রেক্ষিতে জয় ও মমতা দুজন দুজনকে পেয়েছে। পেয়েও হারিয়েছে, আবার হারিয়েও পেয়েছে অবিনশ্বর প্রেমের পূর্ণতা।
গোটা উপন্যাসটিই যেন করুণ মাধুর্যে এক রক্তস্নাত শিল্পকর্মে উত্তীর্ণ। নারী ও পুরুষের চিরায়ত সম্পর্ক ফুটে উঠেছে এক অপরূপ মহিমান্বিত সৌন্দর্যে ও গৌরবে।
উপন্যাসে মমতার স্বামী আরেফিনের চরিত্রটি মানবতার উজ্জ্বল আলোকে আলোকিত। অসাম্প্রদায়িক, উদার ধীরস্থির শিক্ষিত একজন আধুনিক মানুষ।
সতীর লেখা নীল রঙের চিঠিটি আমার কাছে উপন্যাসের এক অদৃশ্য অথচ গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের মতো মনে হয়েছে, যার প্রভাবে মমতার হৃদয়, মন, অনুভূতি নিয়ন্ত্রিত হয়েছে বারবার। নীল আকাশে ঘুড়ি উড়ে বেড়ায়, চালকের হাতে নাটাইয়ের নিয়ন্ত্রণে ঘুড়ি যেন সদা খেলা করে। কখনো কাছে, কখনো দূরে, কখনো ডানে, কখনো-বা বামে। উপন্যাসের রচয়িতার কলমের নাটাইয়ের নাটকীয় টানে সতীর লেখা নীল রঙের চিঠিটিও তেমনি উপন্যাসের আকাশে সারাক্ষণ ঘুরে বেড়িয়েছে একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে এক বিশ্বাসযোগ্য নাটকীয় আবহ সৃষ্টি করে।
উপন্যাসের চূড়ান্ত ক্লাইম্যাক্সটি নাটকের মতোই ঔৎসুক্যের পূর্ণতা বিধানের দ্বারা সম্পাদিত হয়েছে। উপন্যাসের শেষপ্রান্তে বহু বছর পর জয়ের ছোট বোন সতীর চিঠিতে ক্যানসারে ভুগে ভুগে জয়ের মৃত্যু-সংবাদ খুব স্বাভাবিকই মনে হয়েছে। এখানেই রচয়িতার মুনশিয়ানা। মমতার বেদনাভরা জীবনের আর্তি প্রকাশ পেয়েছে সতীর কাছে লেখা তার চিঠিতে, ‘আমি জানি আমি কোনো অন্যায় করিনি। আমি শুধু একজন মানুষকে জীবন দিয়ে ভালোবেসেছি। বিধাতা আমাকে জীবনে এক সুন্দর অমৃতময় ভালোবাসা দিয়েছেন, প্রেম দিয়েছেন যার কোনো তুলনা নেই। এই সুন্দর প্রেম এই নশ্বর পৃথিবীতে আমাকে অমরত্বের আস্বাদ দিয়েছে।’
উপন্যাসটিতে আগাগোড়া মমতা-জয়ের সম্পর্কের মাঝে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে এক অদৃশ্য ভিলেন। সে-ভিলেন হচ্ছে নিয়তি, পরিবেশ, পরিস্থিতি ও নিদারুণ সময়। আর এই নিষ্ঠুর সময় ও নিয়তির নির্মম শিকারই হচ্ছে মমতা। দেবতাদের দ্বারা পরিচালিত গ্রিক ট্র্যাজেডির নায়িকার মতো। ঞৎধমরপ, কিন্তু মৎবধঃ, মহান।
দার্শনিক সোফেনহাওয়ারের উক্তিটি কীভাবেই-না ফলে গেল মমতার দুর্বিষহ জীবনে, ‘Tragic pleasure is, in the last analysis, a matter of acceptance.’ হ্যাঁ, মমতা জীবনকে accept করেছে ঠিকই, কিন্তু এইভাবে ধপপবঢ়ঃ করতে গিয়ে তার অন্তর ফেটে গেছে। গলিত লাভার মতো বেরিয়ে এসেছে অন্তর-নিসৃত রক্তস্রোত। মমতা প্রতিনিয়ত ছটফট করেছে, অসহায় শিশুর মতো চিৎকার করে কেঁদেছে। তার অন্তর থেকে বেরিয়ে এসেছে আর্তনাদ। সমাজবিধির অন্ধ নাগপাশ থেকে মুক্তির হাহাকার। মমতার কষ্ট পাঠকের প্রাণকে কাঁপিয়ে তোলে। বুকটাকে মোচড় দিয়ে যায় বারবার। উপন্যাসের প্রতিটি পাতা ভিজে গেছে ফোঁটায় ফোঁটায় গড়িয়ে পড়া মমতার অশ্রুজলে। কিন্তু মমতার সে-কান্না কান্না নয়, আর্তনাদও নয়, আসলে তা যেন নিবেদিত প্রার্থনাসংগীত। প্রেম মিলেছে প্রার্থনায়। অগ্নির দাহে জ্বলে-পুড়ে গেছে মমতা। তার চারপাশে উড়ছে আগুনের হলকা। চারদিকে শুধু দাহ। শুধুই অগ্নি, কিন্তু
সে-অগ্নি পুড়ে ছাই হয় না – জীবনসত্যকে ও প্রেমকে নতুন মহিমায় করে তোলে উজ্জ্বল।
বইটির প্রচ্ছদে শিল্পী সুমনা হকের আঁকা ছবিটিতে একদিকে এই উজ্জ্বলতা অন্যদিকে দাউ দাউ করে জ্বলার ভাবটি কত সুন্দরভাবেই না ফুটে উঠেছে গাঢ় কালো ও লাল রঙের মাঝখানে ঈষৎ ঢেউ-খেলানো ধূসর ও সাদা কোমল রঙের আভাসে। জানি, অগ্নিতে দগ্ধ করা হয়েছে মহান জীবনশিল্পী ও মানবতাবাদের প্রতীক জয়ব্রতকে, কিন্তু তার প্রেম, তার আত্মা তো অমর। প্রেম কখনো জলে ডোবে না, আগুনে পোড়ে না। তাই বুঝি রুমি তাঁর মসনবীতে বলেছেন-
‘আন্দর-ঈ-আতিস
বদীদম আলমে
র্যরা র্যরা অন্দর উ ইসা দমে’
‘এই অনলের মধ্যেও আমি এক বিশ্বকে প্রত্যক্ষ করেছি।
যার প্রতিকণা ইসার ফুৎকারে জীবন্ত প্রাণবন্ত।’
তাই বুঝি কলকাতাতে সতীর বাড়িতে গিয়ে জয়ের ছায়ার সামনে হাঁটু গেড়ে-বসা মমতাময়ী মমতার সেই আবেগভরা গভীর উচ্চারণ-
‘তুমি কী সত্যই আজ অলৌকিক
ব্রত
তোমার স্পর্শ আমাকে অনুভব
করতে দাও
আহা মানুষ যদি এটুকুও না পায়
তবে কী করে ভালোবাসার মন্দির
গড়া হবে
এবং তা বেঁচে থাকবে কোটি
কোটি বছর।’
খালেদা এদিব চৌধুরীকে অভিনন্দন। তিনি নিষ্কলুষ প্রেমের নির্যাসভরা একটি সুন্দর উপন্যাস লিখেছেন, যা পবিত্র প্রেমের একটি দুর্লভ দলিল হয়ে রইল আমাদের কাছে। তিনি দেখিয়েছেন commercial value-র চেয়েও documentation of life -এর value এখনো মূল্যবান, মূল্যবোধের অবক্ষয়ের এই নিষ্ঠুর সময়েও।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.