পঞ্চদশ নবীন শিল্পী চারুকলা প্রদর্শনী ২০০৪

ব্যক্তির জীবন সামাজিক ঘটনাবলির অভিব্যক্তি সাহিত্য ও শিল্পকলায়। একটি সমাজ কী ভাবছে এবং একটি জাতি কোনদিকে যাবে সেটির নির্ণায়ক শিল্পসাহিত্যই। জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক নাকি একবার বলেছিলেন, কোন জাতির কী অবস্থা সেটি বুঝতে হলে যেতে হবে সেদেশের কাঁচাবাজারে এবং বইয়ের দোকানে। জাতি কী খায়, কী পড়ে, সেটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সর্বজনপাঠ্য বই বলতে যদি উপন্যাসকে বোঝানো হয় তবে তার ক্রেতা বরাবরই সাধারণ মধ্যবিত্ত। শিল্পকলাও রাজদরবার থেকে জনমানুষের কাতারে নেমে এসেছে। তাই শিল্পের রসগ্রহণ কেবল শিল্পরসিকের বিষয় নয়, যদিও উচ্চবিত্তরাই আজকের শিল্পকলার পৃষ্ঠপোষক। অনেকেই বলবেন, শিল্পের আলোচনায় বিত্তের প্রসঙ্গ কেন? আসলে

বংশানুক্রমিক শিল্পীদের যুগ তো শেষ, আর কজনই বা শখের আঁকিয়ে। তাই চিত্রকলা কিংবা ভাস্কর্য এখন অন্যান্য অনেক বৃত্তির মতোই একটি। এই দারিদ্র্য ও বেকারত্বের যুগে নগরসভ্যতার ভয়াল নিষ্পেষণের মধ্যেও বৃত্তি হিসেবে ছবি-আঁকা কিংবা ভাস্কর্য-নির্মাণ নিশ্চয় অত্যন্ত সাহসের ব্যাপার।

চারপাশের যান্ত্রিক অত্যাচারে আমরা যখন অতিষ্ঠ, তরুণ শিল্পীদের দিকে চোখ ফেরালে এখনো কিছু শান্তি মেলে। এরা সকলেই উচ্চবিত্তের দুলাল নয়। শিল্পকে এখনো লোকে ভালোবাসে। আর এই ভালোবাসা আমাদের এখনো আশ্বাস দেয়। ছবির মান খারাপ-ভালো হতে পারে, কিন্তু শিল্পমানের দিক থেকে মনের শান্তি কি অনেক বড় কথা নয়? পঞ্চদশ নবীন শিল্পী চারুকলা প্রদর্শনী ২০০৪-কে এ-কারণেই অনেক অশান্তির মধ্যে একটি শান্তিময় ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। বাংলাদেশের সবক্ষেত্রেই এখন মন্দাভাব চলছে, তখন এ-ধরনের প্রদর্শনীর আয়োজন অত্যন্ত সুখকর। আমাদের উচিত খুঁতখুঁতে স্বভাব বর্জন করে তরুণদের উৎসাহ দেওয়া। কারণ এটিই তাদের পথের শেষ নয়।

নবীন শিল্পী চারুকলা প্রদর্শনীটি প্রথম শুরু হয়েছিল ১৯৭৫ সালে। সম্ভাবনাময় তরুণ শিল্পীদের প্রতিভাবিকাশে এবং শিল্পচর্চায় অনুপ্রাণিত করার উদ্দেশ্যেই এ-প্রদর্শনীর আয়োজন করে থাকে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী। এবারে ২০০৪-এ আয়োজিত প্রদর্শনীতে ১৬৯ জন তরুণ শিল্পীর ১৮৩টি শিল্পকর্ম স্থান পেয়েছে। সকলের কাজই যে মান-উত্তীর্ণ হয়েছে এ-কথা বলা যাবে না। তবে এ-কথা সত্য, তরুণ শিল্পীরা বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে তাদের শিল্পকর্মে বৈচিত্র্য এনেছেন। প্রতিবছর চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে প্রায় দুশো শিল্পী পাশ করে বেরোচ্ছেন। তারা কাজ করে যাচ্ছেন নিষ্ঠা ও আত্মপ্রত্যয় নিয়ে। বিভিন্ন শিল্পীর প্রভাব কাটিয়ে স্বকীয়তা অর্জনের চেষ্টা করে যাচ্ছেন। উৎসাহ ও উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে তারা অব্যাহত রেখেছেন শিল্পচর্চা। নব্বই-দশকের প্রথম দিক থেকেই শিল্পকলায় এসেছে বিরাট পরিবর্তন। গ্যালারি ও উচ্চবিত্ত-শ্রেণির পৃষ্ঠপোষকতায় শিল্পকলার জগতে সুবাতাস বইতে থাকে। ছবির ক্রেতা বেড়েছে এবং আগের মতো অসচ্ছল জীবনযাপন করতে হচ্ছে না অনেককেই।

বয়সই কেবল তারুণ্যের চিহ্ন বহন করে না। প্রকৃত শিল্পী সদাতরুণ। তবুও বয়সের হিসাব মাথায় না রেখে উপায় নেই। প্রাতিষ্ঠানিক জগতে বয়স একটি গুরুত্বপূর্ণ আপত্য বটে। প্রত্যেক শিল্পীই তার যুগে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করেন। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের চিত্রকলা, স্বদেশী ধারার মাটিবর্তী যে যে চিত্রকলা জয়নুল আবেদিন, এস.এম সুলতান, কামরুল হাসানের হাত ধরে এগিয়েছিল তার প্রয়োজনীয় সম্প্রসারণ ঘটেনি। পরবর্তীতে বিমূর্ত ধারাতে যত কাজ হয়েছে সেগুলো কতটা পুষ্ট তা নিয়ে সংশয় থাকতে পারে।

নবীন শিল্পী পুরস্কার ২০০৪-এ সেরা শিল্পীর পুরস্কার পেয়েছেন শিল্পী উত্তর কুমার রায়। তার চিত্রকর্মের নাম ‘লক্ষ আমি এবং আমরা’। তার ছবিতে রয়েছে আমাদের অশুভ বর্তমানের ইঙ্গিত। বর্তমান সময়ের যে-অনিশ্চয়তা যে-অরক্ষিত আমাদের দিনগুলো, আমাদের জীবন, জীবনের অবস্থা তার প্রতিফলন ঘটেছে চিত্রটিতে। এই অসময়ের লক্ষ্যবস্তু কেবল কোনো একক ব্যক্তি নয়। ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে গড়া সমষ্টি।

আশরাফুল হাসান পেয়েছেন চিত্রকলায় শ্রেষ্ঠ পুরস্কার তার আঁকা ‘দহন’ ছবিটির জন্যে। তার ছবিতেও ফুটে উঠেছে এক ধরনের অস্থিরতা, এক ধরনের অন্তর্যন্ত্রণা, যা রূপ পেয়েছে তার টেকচারব্যবহারে। সময় ও ব্যক্তির ক্ষরণকে ছোঁয়া যায় এ-ছবিতে।

ভাস্কর্যে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার পেয়েছেন নুরুল আমিন। পোড়ামাটির এ-ভাস্কর্যে নীল রঙের ব্যবহারে বৈচিত্র্য এনেছেন তিনি। বাংলাদেশের ভাস্কর্যেও নতুন ধরনের নির্মাণ আমরা কদাচিৎ লক্ষ করি। এক তাল প্লাস্টার বা চুন জড়ো করলেই ভাস্কর্য হয় না। কিংবা সেগুলো থেকে আঁকাবাঁকা লোহার রড বের করে দিলে সেগুলো শিল্পকর্ম হয়ে ওঠে না। গত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের তথাকথিত ভাস্কর্য-শিল্পীরা কী করছেন সেটির হিসাব খুব সুখকর নয়। ভাস্কর্যের এই বন্ধ্যাত্ব ঘুচিয়েছেন অপেক্ষাকৃত নবীন শিল্পীরাই। বাংলাদেশের ভাস্কর্যের ভবিষ্যৎ শ্যামল চৌধুরীদের মতো পরিশ্রমী শিল্পীদের হাতে। এবারের প্রদর্শনীতে ভাস্কর্যে খুব চমক না থাকলেও ভালো কাজ আছে। শ্যামল সরকারের ‘আধিপত্য’, মাহমুদুল হাসানের ‘যুদ্ধের স্মৃতি’ উল্লেখযোগ্য। এছাড়া সোমা ফারাহর ভাস্কর্যটিও মনোগ্রাহী হয়েছে।

ফিগারেটিভ ধারার কাজও এবার কম নয়। তবে প্রতিষ্ঠিত যে-কজন শিল্পী ফিগারেটিভ ধারায় কাজ করছেন তাদের বাইরে গিয়ে কাজ করতে হলে নবীন শিল্পীদের আরো সতর্ক থাকতে হবে। কামরুজ্জামান, আস্মিতা আলম, আওলাদ হোসাইন, সিরাজুল ইসলামের ফিগারেটিভ কাজগুলো চমৎকার হয়েছে।

বিভিন্ন মাধ্যমে কাজ করেছেন শিল্পীরা। বেশির ভাগ শিল্পীই মিশ্রমাধ্যমে কাজ করেছেন। এছাড়া তেলরং, জলরং, অ্যাক্রিলিক, পাথর, মেটাল, ব্রোঞ্জ, ট্যাপেস্ট্রি, পোড়ামাটি ইত্যাদি। প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণকারী শিল্পীরা বিষয় হিসেবে বেছে নিয়েছেন সমাজে বিদ্যমান অসংগতি, অস্থিরতা, সন্ত্রাস, নিসর্গ, নৌকা, মাছ, পাখি ইত্যাদি। আবার কিছু ছবির বিষয়ের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। কিছু কিছু বিষয়বস্তু চমক আনে। সুলেখা চৌধুরীর ‘আমার সমকাল’ ছবিটি উল্লেখ করার মতো। ছবিটিতে দেখা যাচ্ছে বিলিয়ার্ড বোর্ডের উপরে মানুষের কাটা মাথা, ভাঙা চেয়ার, পরিত্যক্ত জুতো, তেলাপোকা ইত্যাদি। আমাদের প্রাত্যহিকতা নিয়ে অন্তরালে খেলা করে অশুভ শক্তি। অস্তিত্ব বিপন্ন। এই বিপন্নতা তরুণদের ছবিতে বারে বারে ঘুরেফিরে এসেছে।

প্রাচ্যধারার ছবি প্রদর্শনীতে নেই বললেই চলে। প্রাচ্যকলার সঙ্গে আমাদের ঐতিহ্যের সংযোগ সবচেয়ে প্রত্যক্ষ। এ-ধারার শিল্পীরা কিছুটা এ-প্রদর্শনীতে কাজ করেছেন। এলিজা সুলতানার ‘ভয়েস অব সাইলেন্স’ এবং মলয় বালার ‘শকুন্তলা ও সখীরা’ ছবিদুটি অবশ্যই উত্তীর্ণ মানের।

ছাপচিত্রে পুরস্কার পেয়েছেন শেখ মোহাম্মদ রোকনুজ্জামান। তার ছবির নাম ‘সাইকেল’ (কল্পনা)। আলো ও ছায়াকে অবিচ্ছেদ্য না রেখে তিনি ভেঙে দিয়েছেন। ছাপচিত্র এখন তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয় মাধ্যম। সম্মান পুরস্কার পেয়েছেন তিনজন। শাহজাহান আহমেদ বিকাশ এঁকেছেন লাস্ট সাপারের নবতর ভাষ্য। একটি জিনিস লক্ষণীয়। এখনকার তরুণদের মধ্যে বিস্ময় এবং সময়-চেতনার উপস্থিতি প্রকট। বিকাশ তার ‘লাস্ট সাপার’ ছবিতে বলতে চেয়েছেন সেই পুরনো বিশ্বাসঘাতকতার মিথ্যা ও মৃত্যুর গল্প। এছাড়া আরো যে-দুজন শিল্পী সম্মান পুরস্কার পেয়েছেন তারা হলেন আহমেদ সদরুল হাসান রাফী এবং সাবিরা শাহীনুর। আহমেদ সদরুল হাসানের ‘মহাজাগতিক জীবন এবং এর অতীতের স্বপ্ন’ ছবিটিতে পাওয়া যায় রহস্যময় জগতের সন্ধান। দু-ধরনের নীল ব্যবহৃত হয়েছে ছবিটিতে। এর মধ্যে হলুদ এবং সবুজ তৈরি করেছে ব্যতিক্রমি কনট্রাস্ট। তারকারাশি নীহারিকা ও ধূমকেতুর আভাস আছে।

শিল্পী সাবিরা শাহীনুরের ‘উৎস থেকে নিরন্তর’ ছবিতে ছড়ানো-ছিটানো ফিগারগুলোর মধ্যে পাওয়া যায় আদিম এক ছন্দ। চারভাগে বিভক্ত ক্যানভাসে আঁকা ছবিটিতে হলুদ রং আধিক্য পেয়েছে।

তারুণ্যের অভিব্যক্তি নতুনত্বে সে-কথা সকলেই মানবেন, কিন্তু শিল্পমান কেবলমাত্র নতুনত্বের ওপরই নির্ভর করে না। তাহলে আমরা পুরনো জিনিস বারবার ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখতাম না। কিন্তু পৃথিবী এক জায়গায় থেমে থাকে না। পৃথিবীকে এগিয়ে নিয়ে যায় তরুণরাই, সে-কথা সকলেই জানে। জানা সত্ত্বেও আমরা অনেকেই তরুণদের গুরুত্ব দেই না। তরুণরা জায়গা করে নেয় নিজেদের গুণে, প্রবীণদের ঔদার্যে নয়। বিদ্রোহ সর্বদা শিল্পমণ্ডিত হয় না, কিন্তু তাবৎ আধুনিক শিল্পধারাসমূহ বিপ্লবের ফসল। এক্সপ্রেশনিজম, ইমপ্রেস্টনিজম, ফোভিজম, কিউবিজম, ডাটাইজম ইত্যাদি সংঘবদ্ধ শিল্প-আন্দোলনের নাম।

বাংলাদেশে শিল্পকলার জগৎ এ-ধরনের কোনো মননশীল আন্দোলন প্রত্যক্ষ করেনি, কি সাহিত্যে কি চিত্রকলায়। আমাদের চেতনা নির্মিত হয়েছে পশ্চিমের অনুকরণে। তরুণরা সবদেশেই জাতীয়তাবাদের ধারক। আবার আন্তর্জাতিকতার সংঘাত নয়, বরং সমন্বয় ফুটে উঠুক তরুণদের ক্যানভাসে Ñ শিল্পী-বোদ্ধাদের এটিই কাম্য।

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী আয়োজিত পনেরোতম নবীন শিল্পী চারুকলা প্রদর্শনী ২০০৪ শুরু হয়েছে ২ জুলাই, শেষ হবে

২২ জুলাই।