স্যাক্রে ক্যর১-এর চূড়ায় গোধূলি লেগেছে। লাল মরা আলো নেমে এসেছে মঁ’মার্তের২ অলিগলিতে। এখন রাত নটা বাজে, কিন্তু সন্ধ্যাও লাগেনি। সূর্য সবে দিনের কাজ গোছাতে লেগেছে। হয়তো আরো ঘণ্টাখানেক পরে অন্য গোলার্ধে রওনা হবে। গ্রীষ্মের ফ্রান্সে অন্ধকার নামে দেরি করে। মঁ’মার্তের গলি ধরে দ্যানিজের বাড়ির দিকে চলেছি। বড় বড় গাছগুলো আড়াআড়িভাবে ছায়া বিছিয়ে দিয়েছে গলিতে। ১৫ জুন ২০০৪ প্যারিসে উদ্বোধন হলো বাংলাদেশের উনিশজন চিত্রকরের ছাপচিত্র-প্রদর্শনী। ছবিগুলো ঝুলছে দ্যানিজ ফ্রেলোর ‘লাকুরিয়ের এ ফ্রেলো’৩ স্টুডিওর দেয়ালে। উদ্বোধনের সময় সাতটা হলেও বাঙালি ঢঙ্গে সবাই এসেছেন ধীরে-সুস্থে।
স্যাক্রে ক্যর-এর একেবারে কাছে স্টুডিওটি। রাস্তা থেকে দুকদম নামলে স্টুডিওর দরজা। ভারি ভারি গাছ, সিঁড়িগুলো নেমেই চলেছে, ধার বেয়ে দরজার সারি। সামনের লোকটি কখন যে অদৃশ্য হয়ে গেল বোঝাই দায়! আসলে দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকে পড়েছে। এলাকা জুড়েই পুরাতনের গন্ধ। তাই ফ্রেলো স্টুডিওতেও প্রাচীনের অধিষ্ঠান। কড়ি-বর্গার ছাদ, খুব উঁচু, বিশাল জানালা। ঢুকতেই মোহাম্মদ কিবরিয়ার কাজ তিনখানা। তারপর আরো অনেকের। কিবরিয়ার কথা সকলে বললেন, সত্যিই অসাধারণ কাজ। মনিরুল ইসলামের প্রিন্টও আকর্ষণ করেছে অনেককে। গুঞ্জন সেলিনা চৌধুরী মিলির কাজ ঘিরে। সবাই নাকি বলছেন, এমন কাজ যে প্যারিসে দেখা যায় না তা নয়, তবে বাংলাদেশে এই মাপের কাজ হয়, ভাবাই যায় না।
কোনো আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন নয়, সবাইকে দরজায় দাঁড়িয়ে হ্যালো বলা, পরিচিত হওয়া। বহু পুরনো একটি ছাপার যন্ত্রের ওপর খাড়া করে রাখা আমন্ত্রণপত্র ও ক্যাটালগ। আমন্ত্রণপত্রে অতিথি হিসেবে ঢাকার আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ এবং বেঙ্গল গ্যালারি আব ফাইন আর্টসের পরিচালকের নাম মুদ্রিত। মুখোমুখি দেয়ালে সারি সারি ছাপচিত্র, মোট ৩৫টি কাজ।
দ্যানিজের ছোট্ট অফিসকক্ষটির সামনে কিছুটা চওড়া জায়গা। তাতে একটি টেবিলে গুছিয়ে রাখা আছে বাংলাদেশের চিত্রকলা-সম্পর্কে নানান বইপত্র। টেবিলের দুপাশের বড় জানালা গলে আসা আলোয় নড়েচড়ে উঠছে উজ্জ্বল সব ছবি। ঢাকা থেকে এসেছেন তিন শিল্পী। সবারই বয়স অল্প – ভাবছেন সঙ্গী নিয়ে এবার ভালো করে ইউরোপ ঘুরে দেখবেন। ভীষণ সায় দিলাম, বোঝালাম, ঘুরে বেড়ানোর জন্য এই সময়টাই উৎকৃষ্ট। আরো এসেছেন ঢাকা আলিয়ঁসের ফিলিপ নিকেজ এবং উজ্জ্বল। ছাপচিত্রী ত্যাংগো কিছুটা অবাক – কেন বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে কেউ এলেন না। তাঁরা চারজন আমন্ত্রণপত্র নিয়ে দূতাবাসে গিয়েছিলেন। রাষ্ট্রদূত ব্যস্ত থাকেন জেনে অনুরোধ করেছিলেন অন্য কোনো প্রতিনিধি যেন প্রদর্শনীর উদ্বোধনী দিন উপস্থিত থাকেন।
ইতোমধ্যে লোক-সমাগম বেড়েছে। লুইকে ফরিদা পারভীনের সিডিটি বাজাতে অনুরোধ করেছি। ভালো লাগছে – ফরাসিদের উচ্চৈঃস্বরে আড্ডা, পনির, ওয়াইন, ফাঁকে দুচারটে বাংলা শব্দ, তারপিনের গন্ধ, লালন, আঁচল, ভেজা ছাপাই কাগজ, কালি, পাঞ্জাবি, ওড়না – সব মিলে। চিত্রসমালোচক মারি ক্রেভ্ক্যর নিচে নিয়ে যেতে চাইলে, সরু সিঁড়ি বেয়ে নামলাম। আরো পুরনো। অনেকগুলো ছাপযন্ত্র। এখানে নাকি গত একশ বছর ধরে প্রিন্ট হয়। মঁ’মার্ত শিল্পীদেরই জায়গা। ব্রাক, দালি, পিকাসো, মিরো, শাগাল, দাদোসহ বিশ্বখ্যাত শিল্পীরা মঁ’মার্তে আসন গেড়েছিলেন। ফ্রেলো স্টুডিওতে তাঁদের নিয়মিত যাতায়াত ছিল। আগের দিনের প্রদর্শনীগুলোর পোস্টার দেয়ালে। বাতাসে রঙের ভারি গন্ধ। ওপরে দ্যানিজের অফিসের পাশে ছোট্ট ঘরে সব প্রিন্ট রাখা। ওরকম সাদা কাগজের একটা ভারিক্কি ভাব আছে, পবিত্র গোছের, যত্ন করে আলতোভাবে দেখতে হয়।
লোক আসছেই, তাই দ্যানিজ বলেছেন, আমরা যেন আগে বেরিয়ে পড়ি। আমরা পাঁচ-ছজন চলেছি। থামতেই হলো স্যাক্রে র্ক্য-এর সামনে। নিচে প্যারিস ছড়ানো, গম্ভীর সবুজ, ঈষৎ প্রাচীন, চেনা যায় সোনালি গম্বুজ, চকচকে খাল, ভাস্কর্য। নানান গলি ঘুরে দ্যানিজের বাড়িতে পৌঁছুনো গেল। উঁচু পথ, নিচু পথ। দুধারের ক্যাফে সবে টেবিল পাতছে রাস্তায়। অন্ধকার জমলেই ভিড় বাড়বে। এখন সাড়ে নটা, আলো বহাল তবিয়তে আছে। সাথে এসেছে আনাইগ্। পায়ে ব্যথা, কিন্তু যাবেই। অসুবিধে এটিই যে দ্যানিজের ফ্ল্যাটটি ছতলায়, সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয়। দ্যানিজের দুই ছেলে পাঁজাকোল করে ওকে তুলে নিল। কাঠের সিঁড়ি ধরে সবাই উঠছি, হাঁপাচ্ছি। লিফট নেই? দুশো বছরের পুরনো তো তাই। স্টুডিও থেকে অতিথি বিদায় করে অবশেষে দ্যানিজ ওর নিজের বাড়িতে ঢুকল। স্প্যানিশ সালসা রান্না করেছে, আর স্যালাড। খাবারশেষে সবাই উদ্গ্রীব, ঢাকায় ‘আ ফ্রেঞ্চ এপ্রিল’৪ নামে যে-তিনটি প্রদর্শনী হয়েছে, তার ওপর ভিত্তি করে নির্মিত ছবিটি তাঁরা দেখবেন। আধ ঘণ্টা পর ধন্যবাদের ঢল সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ল। বৈঠকখানা থেকে আকাশ দেখা যায়, আর ফাঁকে-ফোকরে যত ব্যালকনি উপচে পড়া ফুল। লালনের গানের একটি ভিস্যুয়াল আমার সহকর্মী পল্লব করেছিল। সেটিও দেখালাম। বাংলাদেশের নদীর ওরকম ধু-ধু বালুর চর কিছুক্ষণের জন্য সব আড্ডা থামিয়ে দিল। ওদের ভালো লেগেছে। বাংলাদেশের ছাপচিত্র-প্রদর্শনীর প্রথম দিনটি ভালো কাটল।
জ্যঁ দমিতি ঢাকায় প্রদর্শনী করে গিয়েছেন। তিনি অভিভূত। ফরাসি শিল্পী, শিল্প-সমালোচকদের উদ্যোগী হয়েই নিজের প্রদর্শনীর ছবি দেখিয়েছেন – স্পেস কেমন, ওঁর কাজ-সম্বন্ধে ঢাকার শিল্পীদের মতামত কী, ওখানে কেমন কাজ হয়? অধিকাংশ লোকেরই কোনো ধারণা নেই বাংলাদেশ-সম্পর্কে – সাইক্লোন ছাড়া আর কী হয় সেদেশে! বারবার বলতে হয়েছে, হ্যাঁ, আমাদের তেমন কিছু নেই, না ইন্ডিয়ার মতো না, সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধ নয়, মাথায় ঘোমটা দিতে বাধ্য না, হ্যাঁ বন্যা হয় – রোজকার ব্যাপার, না, থাইল্যান্ডের মতো পর্যটক বোঝাই না, অত পুরাকীর্তি নেই, স্থাপত্য-ঐতিহ্য অল্পকিছু, অ্যাংকর ওয়াত জাতীয় কিছু নেই, যোগাযোগ-ব্যবস্থার একটু অসুবিধে, ভালো জাদুঘর – আছে, তেমন না… হ্যাঁ, ভালো গান আছে, ভালো আঁকিয়ে আছে, ভালো কবিতা আছে, অসাধারণ নকশিকাঁথা, জামদানি, পাটি আছে… দমিতির বাসায় এক আইরিশ ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা হলো। ঢাকায় ছাপানো, শিল্প বিষয়ক ত্রৈমাসিক যামিনী দেখে আপ্লুত। ‘ফেসটিভ্যাল’ সংখ্যায় বাউলদের ছবি ফরাসিদের খুব পছন্দ হয়েছে। বাংলাদেশের এই দিকটি-সম্বন্ধে ওরা কিছুই জানতেন না।
মারি ক্রেভ্ক্যর ঢাকায় কয়েকবার এসেছেন। মিশেল ব্রুটার গ্যালারিতে আয়োজিত একটি সংবর্ধনায় বললেন, রাস্তাঘাট খুব খারাপ, নিরাপত্তার অভাব, তবে যতই যাচ্ছি ততই প্রেমে পড়ছি বাংলাদেশের। সবচেয়ে আশ্চর্য, দেশটার এত কিছু আছে, কেউ জানে না। আনাইগ্ও একবার ঢাকায় এসেছেন। সেদিন তার পরনে বিবি রাসেলের ড্রেস। দমিতি পরেছেন বিবির নকশায় তৈরি জমকালো কোট। ওরা বাংলাদেশকে খুব তুলে ধরতে চান।
অভিজাত এলাকায় অবস্থিত মিশেল ব্রুটার গ্যালারি। বড় জায়গা জুড়ে। তাঁর স্বামী ভাস্কর, নাম ভানসঁ বাত্বেদাত্। রসিক লোক। কিছুদিন আগে এঁরা গোটা ভারত ঘুরে এসেছেন। শাড়ি পরা দেখে উৎফুল্ল। বললেন, বড্ড ‘গ্রেসফুল’। মিশেল ব্রুটার গ্যালারিতে ঢুকতেই বাত্বেদাতের ভাস্কর্য। কৌণিক রেখা, গতিময়, চৌকো অবয়ব, পরিচ্ছন্ন জ্যামিতিক গঠন। গ্যালারিকক্ষে ঢোকার আগে আবার একটি জংলামতো – পরিপাটি ভলিউম আর নিয়ন্ত্রিত অবয়ব থেকে হঠাৎ বিচ্যুতি। একটি ড্রামা তৈরি হয়। তারপর যথারীতি ছবি ঝোলানো। বাত্বেদাতের ড্রইং একদিকে, অন্যদিকে লুক পিয়েরের কাজ। ঘুরে গেলে জেচের ভীষণ ভালো কিছু তেলরং ও প্রিন্ট। সংবর্ধনায় উপস্থিত আছেন কয়েকজন শিল্পবোদ্ধা। আগের মতোই, তাঁরা বাংলাদেশ-সম্পর্কে বিশেষ জানেন না। এখানকার শিল্প-সাহিত্য-গান-সম্পর্কে তো একেবারেই না। সামনে মেলে রাখা বিভিন্ন শিল্পীর ক্যাটালগ ও প্রকাশনার প্রতি ওদের যথেষ্ট আগ্রহ রয়েছে। বারবার মনে হয়েছে, সবার কাছে তুলে ধরার জন্য আরো অনেক প্রকাশনা দরকার।
গিমে৫ মিউজিয়ামের দুজন, ভানসঁ লাফ্যভ্র এবং হেলেন ভাসাল, আগেই ঢাকায় এসেছেন। ওদের ওয়েবসাইটে এই জাদুঘরটির চার বছরব্যাপী মহাসংস্কার-যজ্ঞের কথা পড়েছি। জাদুঘরের পরিচালক জ্যঁ-ফ্রঁসোয়া জারিজের সঙ্গে এবার সাক্ষাৎ হলো। অনেক গল্প, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া-সম্বন্ধে তাঁর সম্যক জ্ঞান। তিনি এবং তাঁর স্ত্রী দুজনেই নৃতত্ত্ববিদ। পাকিস্তানের বালুচিস্তান অঞ্চলে বহু বছর কাজ করেছেন। জিয়াউল হকের সময় থেকে আর সম্ভব হয়নি। জিজ্ঞেস করলেন, আর্ট মার্কেট আছে? বাংলাদেশের বড়লোকরা ‘কঞ্জুস’ নয় তো? না, বললাম, দু-তিনশ পেশাজীবী আর্টিস্ট তো নিয়মিত কাজ করে চলেছেন। আবার সেই আলাপ, বাংলাদেশকে সাইক্লোনের দেশ বলেই সবাই চেনে। গিমে নতুন চিন্তা করছে। বাংলাদেশ নিয়ে ফরাসিদের ভাবনায় পরিবর্তন ঘটানোর পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান বাংলাদেশে নিযুক্ত ফরাসি রাষ্ট্রদূত মিশেঁল ল্যুমো এবং ফরাসি কাউন্সিলর আন্দ্রে রেনোয়ার। তারাই এত বছর খেটেখুটে গিমেকে রাজি করিয়েছেন ২০০৭-এ বাংলাদেশকে ঘিরে একটি প্রদর্শনী করার জন্য। গিমে করবে? অনেকে এ-কথা শুনে ভ্রƒ ওপরে তুলেছেন। সত্যিই যদি এটি সম্ভব হয়, লুমো এবং রেনোয়ার কাছে আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ থাকবে না। বাংলাদেশের জন্য তাঁরা বড় একটি কাজ করেছেন।
গিমে স্থাপিত হয় ১৮৯৯ সালে। প্রাচীন সভ্যতা, বিশেষ করে ভারতীয় সভ্যতাকে উপজীব্য করে গিমের সম্ভার তৈরি হয়েছে। সেই সাথে ধর্মভিত্তিক আচার ও উপকরণাদি এর অন্যতম সম্পদ। দিনে দিনে ল্যুভ৬ মিউজিয়ামের সঙ্গে আদান-প্রদান, ব্যক্তিগত সংগ্রহকারীদের অনুদান ইত্যাদির মাধ্যমে তার এশিয়ান সংগ্রহ বৃদ্ধি পেতে থাকে। আদ্যোপান্ত সংস্কার সম্পন্ন হলে নতুন অবয়বে জাদুঘরটি খোলা হয়। তখন থেকে তারা চিন্তাভাবনা করছেন এশীয় দেশগুলোকে কীভাবে নতুন করে পরিচিত করানো যায়। ভানসঁ আমাকে গিমের বেসমেন্টে নিয়ে গেলেন। কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ব্যাংকের ভল্টের মতো একেকটি কক্ষ। একেবারে নিস্তব্ধ, শুধু যন্ত্রের মৃদু গুঞ্জন। আমরা কাপড়ের মূল সংগ্রহ দেখতে গেলাম। লোহার চাকা ঘুরিয়ে আলমারিগুলো দেখতে হয়। সেখানে যতসব পুরনো কাপড় যত্নের সাথে ভাঁজ করে, ঝুলিয়ে, ফ্রেম করে রাখা। কিছু এতই ক্ষয়ে গিয়েছে যে কাগজের পরতের মধ্যে হালকাভাবে ছড়িয়ে রাখতে হয়। দেখলাম শত বছরের পুরনো জামদানি, কাঞ্চিবরম, বেনারসি শাড়ি। নিজের দেশে এগুলো দেখার সুযোগ হয় না, কোনোদিন হবে কিনা জানি না! রয়েছে আফগানিস্তান থেকে ভারতবর্ষের নানান জায়গার, নানা যুগের, সব ধরনের কাপড়, জামা, জুতো, কাঁথা, শাল ইত্যাদি। তুলে রাখার মধ্যে এত যত্ন, এত ভালোবাসা!
ভানসঁ আর হেলেন গতবার ঢাকায় এলে শুনেছিলাম ওরা ২০০৬-এ রবীন্দ্রনাথকে কেন্দ্র করে একটি প্রদর্শনী করবেন। দারুণ ভালো লাগল। বাংলাদেশের মাটির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের কেমন গাঁটছড়া বাঁধা আছে – তা ওদের মনে করিয়ে দিয়েছিলাম। পদ্মা, লালন এবং শিলাইদহ বাদ পড়লে রবীন্দ্রনাথকে জানা-বোঝা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। আলাপ হলো আমিনা ওকাদার সঙ্গে। মিশরীয় মহিলা, গিমের পক্ষে দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছেন রবীন্দ্রনাথের প্রদর্শনীটি আয়োজনের। কীভাবে বাংলাদেশ-অধ্যায়কে যুক্ত করে রবীন্দ্র-প্রদর্শনী সম্পূর্ণ করা যায় তা নিয়ে আমার ভাবনা বললাম আমিনাকে। তিনি আমাকে কবির পেইন্টিং-স্লাইডগুলো দেখালেন। ছবির অবস্থা অতটা ভালো নয়। প্রদর্শনীর জন্য আবার বাঁধাই করা অপরিহার্য। আমিনা ভাবছেন কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি উত্থাপন করবেন। কৌতূহলবশে জানতে চাইলাম কবিকে কতদূর চেনে প্যারিসবাসী। আপনি কি তাঁর ভক্ত? আমিনা এ-প্রসঙ্গে সুন্দর একটি গল্প বললেন। তাঁর মায়ের পিতামহ আহমদ শওকি৭ আরববিশ্বে স্বনামধন্য কবি ছিলেন। কবিগুরুর সঙ্গে তাঁর দেখা হয় এবং তাঁকে তিনি আমন্ত্রণ জানান কায়রোতে। তাঁর বাসভবনে রবীন্দ্রনাথ গিয়েছিলেন এবং সেখানে যাঁদের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে ছিলেন রাজনীতিবিদ সাদ জগলুল পাশা এবং আমিনার পিতামহ চিন্তাবিদ তাহা হুসেন। রবীন্দ্রনাথ তখন আহমদ শওকিকে উপহার দেন লক্ষেèৗতে তৈরি হাতে লেখা একটি কোরান শরীফ। আমিনা ওকাদার পরিবার সেটি যত্নের সঙ্গে সংরক্ষণ করেছেন। গল্পটি আমার কাছে রোমাঞ্চকর ঠেকল। রবীন্দ্র-জীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় রবীন্দ্রনাথের কায়রো-ভ্রমণ-সম্পর্কে যে-তথ্য দিয়েছেন এখানে তা তুলে ধরার লোভ সংবরণ করতে পারলাম না।
প্রভাতকুমার রবীন্দ্রনাথের চিঠির উদ্ধৃতি দিয়ে লিখছেন, ১৯২৬ সনের ২৭ নভেম্বর ‘রুমানিয়ান জাহাজ মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া বন্দরে পৌঁছল।…
‘পরদিন কায়রোর পালা। ঘণ্টাচারেক গেল রেলগাড়িতে। এবার হোটেল।… খুব মস্ত খাঁচা। পৌঁছলেম মধ্যাহ্নে। বৈকালেই সেখানকার সর্বোত্তম আরবি কবি [আহমদ সৌকি]-র বাড়িতে নিমন্ত্রণ। সেখানে ইজিপ্টের সমস্ত রাষ্ট্রনায়কদের দল উপস্থিত ছিলেন।… ক্বানুন ও বেহালাযন্ত্রযোগে আরবি গান শোনা গেল – স্পষ্টই বোঝা গেল ভারতের সঙ্গে আরব-পারস্যের রাগরাগিণীর লেনদেন একসময় খুবই চলেছিল।’…
শওকির অসামান্য সৌন্দর্যপিপাসু কবিমন রবীন্দ্রনাথকে মুগ্ধ করেছিল। স্বল্পক্ষণের পরিচয়ও রবীন্দ্রনাথের মনে গভীর রেখাপাত করেছিল।
আমিনাই জানালো প্রস্তাবিত প্রদর্শনীর পরিকল্পনাকারী একোল দ্য বোজ আর্ত৮-এর পরিচালক মি. কুসোঁ। তাঁর সঙ্গে কিছুক্ষণ পরই দেখা। সঙ্গে গিমের ভানসঁ ও হেলেন।
বোজ আর্ত ইউরোপের অতি প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। একদিকে রং-তারপিনের গন্ধ, অন্যদিকে খোদাই-নকশা করা অলংকৃত ঘর-দুয়ার। মি. কুসোঁর কক্ষটিতে দেয়ালে ফ্রেসকো, ছাদে গিল্টি করা নকশা। টেবিলের সামনে উঁচু দরজা, খোলা। ওপারে সবুজ, প্রৌঢ় ডালপালা, লম্বা লেজঝোলা পাখিদের আনাগোনা। কুসোঁ বললেন, রবীন্দ্রনাথের প্রদর্শনী করার পেছনে দশ বছর ধরে চেষ্টা করে যাচ্ছেন। অবশেষে কর্তৃপক্ষ রাজি হয়েছে। গিমেকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে প্রদর্শনীটি আয়োজনের। নিউইয়র্ক ঘুরে প্রদর্শনী প্যারিসে আসবে। বাংলাদেশকে নিয়ে তিনিও ভাবেন। দেশটি ঘুরে দেখে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানালাম। শিক্ষার্থী-বিনিময়ের সুযোগ আছে কিনা জানতে চাইলেন।
আমি হোটেলের দিকে ফিরে যাচ্ছি। রাস্তার ধারের মূর্তিটি নড়েচড়ে ওঠায় আঁতকে উঠলাম। মাইম করছে, পাশে পড়ে থাকা হ্যাটে কটি পয়সা। প্যারিস কখনো বদলায় না, মঁ’মার্তও সেই একইরকম।
পাদটীকা :
১। স্যাক্রে ক্যর : ‘স্যাক্রে ক্যর’ অর্থ ‘পবিত্র হৃদয়’- যীশুখ্রিষ্ট স্মরণে এহেন নামকরণ। প্যারিসের সবচাইতে উঁচু জায়গায় নির্মিত এই ধবধবে সাদা গম্বুজ ফ্রান্সের একটি অন্যতম দর্শনীয় স্থান। মঁ’মার্তের চূড়ায় বিখ্যাত এই গির্জাটির নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৮৭৫ সালে। এটি নির্মিত হয় রোমান-বাইজান্টাইন স্থাপত্যরীতি অনুসারে।
২। মঁ’মার্ত : প্যারিসের সবচাইতে উঁচু টিলা। শহরের উপকণ্ঠে উত্তরদিকে অবস্থিত। শিল্পকলার ইতিহাসে মঁ’মার্তের বিশেষ স্থান আছে। ঊনবিংশ শতক ও বিংশ শতকের গোড়ার দিকে মঁ’মার্ত হয়ে ওঠে বোহেমিয়ান যথেচ্ছাচারী জীবনযাত্রার আরেক নাম। এই দুই শতকেরই প্রচুর প্রখ্যাত শিল্পী মঁ’মার্তেই তাদের শিল্পী-জীবন কাটিয়েছেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো : পাবলো পিকাসো, আমেদেও মদিগ্লিয়ানি, ভ্যান গগ, আঁরি মাতিস, আঁদ্রে দেরাঁই, পিয়ের-অগুস্ত রেনোয়ার এডগার দেগা, মরিস উত্রিলো, কামিল পিসারো, তুলোজ-লত্রেক প্রমুখ।
৩। লাকুরিয়ের এ ফ্রেলো : ফ্রান্সের প্রাচীনতম ও অন্যতম ছাপচিত্রের স্টুডিও।
৪। অ্যা ফ্রেঞ্চ এপ্রিল : ফরাসী দূতাবাস ও আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের মধ্যে শিল্পের ক্ষেত্রে বিনিময়ের একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই উদ্যোগেরই অংশ হিসেবে ২০০৪-এ ঢাকার ৩টি প্রধান গ্যালারিতে ফরাসি ছাপচিত্রের প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। ছাপচিত্রী জাঁ দমিতি ও জাঁ পিয়ের ত্যাংগোর একক প্রদর্শনী ও লাকুরিয়ের এ ফ্রেলোর সংগ্রহ থেকে বিশ্বখ্যাত শিল্পীদের একটি প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। এই তিনটি প্রদর্শনী ভিত্তি করে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন একটি ভিডিওচিত্র নির্মাণ করে ‘আ ফ্রেঞ্চ এপ্রিল’ নামে।
৫। গিমে মিউজিয়াম : গিমে মিউজিয়ামের যাত্রা শুরু হয় ১৮৯৯ সালে। এর প্রতিষ্ঠাতা শিল্পপতি এমিল গিমে। শুরুতে এই প্রতিষ্ঠানটির মূল আগ্রহ ছিল প্রাচীন মিশর, গ্রেকো-রোমান ও এশীয় ধর্মসমূহ। পরবর্তী সময়ে গিমে মিউজিয়াম সুপরিচিত হয়ে ওঠে এশীয় সভ্যতাসমূহের নিদর্শনের সংগ্রাহক হিসেবে।
৬। ল্যুভ : প্যারিসের সবচাইতে নামকরা জাদুঘর। এর মূল ভবনটি নির্মিত হয়েছিল রাজপ্রাসাদ হিসেবে, প্যারিসের কেন্দ্রে, স্যেন নদীর ধারে। রাজপ্রাসাদের অংশবিশেষ, ফরাসি বিপ্লবের সময়ে, ১৭৯৩-এ সাধারণ দর্শকের জন্যে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। ল্যুভের সংগ্রহে রয়েছে ফরাসি শিল্পকলার প্রাচীন নিদর্শন থেকে শুরু করে আধুনিক শিল্পকলা।
৭। আহমদ শওকি : আধুনিক আরবি সাহিত্যের প্রধানতম এই কবির জন্ম ১৮৬৫ সালে কায়রোতে। তিনি মিশরে ব্রিটিশ আধিপত্যের বিরুদ্ধে কবিতা লিখে জনমানুষের মনে ঠাঁই করে নেন। তাঁর ব্যাপক জনপ্রিয়তার কারণে ব্রিটিশ সরকার তাকে স্পেনে নির্বাসনে পাঠায়। নির্বাসনের পাঁচ বছরে স্বদেশের উদ্দেশ্যে লেখা কবিতাসমূহকে তাঁর শ্রেষ্ঠ কাজ বলে গণ্য করা হয়। মিশরীয় সাহিত্যে শওকি প্রথম কাব্যনাটক রচনা করেন। তিনি ১৯৩২ সালে মৃত্যুবরণ করেন। প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়-রচিত রবীন্দ্রজীবনীর তৃতীয় খণ্ড (পৃষ্ঠা ২৯২) থেকে জানা যায়, শওকির মৃত্যুতে অনুষ্ঠিত স্মরণসভায় উপস্থিত থাকবার জন্য মিশরের শিক্ষাসচিব রবীন্দ্রনাথকে ‘তার’ করেন। রবীন্দ্রনাথের যাওয়া সম্ভব হয়নি। তিনি শওকির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে একটি চিঠি লেখেন।
৮। একোল দ্য বোজ আর্ত : ল্যুভ জাদুঘরের সন্নিকটে অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানটি ইউরোপের প্রাচীনতম ও নামকরা চারুকলা ও স্থাপত্যকলা শিক্ষালয়। এটি ১৬৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত। এই শিক্ষালয়ের প্রশিক্ষণের ধারা-অনুসারে ‘বোজ আর্ত’ বলে স্থাপত্যকলার একটি রীতি আছে, যা ‘মডার্ন ফ্রেঞ্চ’ স্থাপত্য বলেও পরিচিত।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.