তাঁকে নিয়ে লিখব, যিনি আমাকে লিখিয়েছেন। তাঁর শিক্ষকজীবন, তাঁর লেখকজীবন, সমূহ বক্তৃতা আর
সভা-সেমিনারের শোভনীয় বয়ান নিয়ে উচ্ছ্বাস কিংবা আক্ষেপ সবই হচ্ছে। যখন তিনি অতর্কিতে হারিয়ে গেলেন, আমাদের অপ্রস্তুত রেখে, আমাদের অতৃপ্ত রেখে। চুয়াত্তর বছর অতিক্রান্ত একজন পরিপূর্ণ মানুষ, জীবনের একটি দিন যাঁর কর্মহীন ছিল না, তাঁর চলে যাওয়া আমাদের অপ্রস্তুত করে দিলো! অতৃপ্তি আর আফসোসের থইহীন সমুদ্রে নিমজ্জিত করল!
এই যে প্রতিটি দিনের কর্মব্যস্ততা, প্রতিটি মুহূর্তকে মূল্যবান করে তোলা তাও নিজের জন্য নয়, অন্যের জন্য। কারা সেই অন্য – এই প্রশ্নের আগে করতে হয় এই প্রশ্নটি কার জন্য নয়? সমাজের জন্য, সমাজের মানুষের জন্য, তাঁর অগণিত ছাত্রছাত্রী, গুণমুগ্ধ, লেখক সমাজ, পাঠককুল। কার জন্য নয়? এই বিনিময় কিংবা স্বীকৃতি প্রত্যাশাহীন কর্মমুখরতাই মূলত তাঁকে অপরিহার্য করে রেখেছিল সময়ের কাছে। আমরা সচেতনে কিংবা অচেতনে জানতাম, আমাদের একজন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম আছেন। কোনো সুযোগ-সুবিধা, অনুদান, সম্মানের কাছে তিনি মাথা নত করেন না। সময়ে সত্য কথাটি তিনি বলবেন, বলবেনই। তাঁর বলায় আগ্রাসী ভঙ্গি নেই। ঋজু আর নম্রতায় বলেন। কিন্তু যা বলেন, তা আপামরের কথা হয়ে ওঠে। সময়ের অপরিহার্য মানুষ হয়ে উঠেছিলেন তিনি ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তায়। তাঁর এই হঠাৎ চলে যাওয়া সংশ্লিষ্ট সমাজ আর গোষ্ঠীকে পতিত করেছে আক্ষেপে, আফসোসে। ডুবিয়ে দিয়েছে বিষাদের সিন্ধুতে।
একজন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম জন্ম নেন না। হয়ে ওঠেন। এই জন্ম নেওয়া আর হয়ে-ওঠার মাঝখানে ইচ্ছা, মেধা, প্রজ্ঞা, শ্রম আর বোধের এক সৌরজগৎসমান দূরত্ব। যেমনটি আমরা জানি, বাংলা সাহিত্যের আরেক দিকপাল সৈয়দ মুজতবা আলীর উত্তরাধিকার তিনি। বিজ্ঞানস্বীকৃত জিনগত মেধা আর রসবোধ অন্তর্গত রক্তে। কিন্তু এই যে সংযোগ কিংবা উত্তরাধিকার সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম তা দিয়ে নিজেকে চেনাননি। বরং উল্টোটাই ঘটেছে। আমরা তাঁকে চিনেছি তাঁর কর্মে, তাঁর সৃজনী প্রতিভায়, তাঁর মৃদুকণ্ঠ অথচ দৃঢ় উচ্চারণের বলিষ্ঠতায়, পেশাগত সততায় আর প্রতিনিয়ত কর্মমুখরতায়। আর তাঁকে চেনার সূত্রে তাঁর শেকড় খুঁজতে গিয়ে আবিষ্কার করেছি সৈয়দ মুজতবা আলীর সংযোগ।
শৈশবের সামান্য কিছু স্মৃতি। মায়ের ভাই মামার সঙ্গে যে-স্নেহময় বন্ধন থাকে তার বেশি কিছু নয়। একই ভূগোল, চা-বাগান পরিবেষ্টিত ছায়াবৃক্ষের শীতল ছায়া, একই সুরমা কুশিয়ারা মনু আর খোয়াইয়ের জল তাদের বেড়ে ওঠায় অনায়াস বয়ে গেছে সংযোগসূত্র হয়ে। এর বাইরে যেটুকু সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম তা তিনি নিজেই নিজেকে তৈরি করেছেন। কতক নিজের মেধায়, কতক ইচ্ছা আর অধ্যবসায়ে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন – শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী কেন্দ্রিক বিদ্যাপীঠের প্রধান অনুষঙ্গই এই দুই। আসা যাওয়ার পথের ধারে আর যা কিছু, অনড় অবকাঠামো ছাড়া কোনো কিছুই আবশ্যিক নয়। কিংবা অন্যভাবে বললে, এই গবেষণা, সভা, সেমিনার, জার্নাল ইত্যাদি যা কিছু তার সবকিছুই সময় কিংবা শিক্ষার্থীর প্রয়োজন।
শিক্ষণ-শিখন কর্মকাণ্ডের জন্য আবশ্যিক যে শিক্ষক, তিনি একজন এসএমআই থেকে সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের মতো কালেভদ্রে দুর্লভ হয়ে উঠতে পারেন। শিক্ষকতাকে শ্রেণিকক্ষের বাইরে, নিবন্ধিত শিক্ষার্থীদের বাইরে যিনি ব্রত হিসেবে নিতে পারেন। অস্বীকার করেন না নিজের দায় ও দায়িত্ববোধকে।
তাঁর চলে যাওয়ার পর জনৈক সতীর্থ ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণের পর্যায়ে স্বগতোক্তির মতো প্রশ্ন করেন, স্যার এই বয়সে এত কাজ করতেন কেন? স্যারের বিশ্রাম দরকার ছিল। সত্যি ভাববার বিষয়। প্রায় তিন দশক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার দায়িত্ব পালনের পর, প্রায় ডজনখানেক সৃজনশীল, মননশীল গ্রন্থ লিখে ফেলার পর স্যারের কি এমন প্রয়োজন ছিল আরো ক্লাস নেওয়ার, সেমিনার, সিম্পোজিয়ামে কথা বলার, আরো লেখার, আরো আরো বহুমুখী দায়িত্ব নেওয়ার!
এই যে আমাদের অপার আকাক্সক্ষা আর অতৃপ্তিতে ফেলে রেখে তিনি পাড়ি জমালেন অনন্তলোকে, আমরা অতল হাহাকার থেকে প্রথমবার উপলব্ধি করতে চাইলাম, তাঁর এত কাজ করার প্রয়োজনটা কী ছিল।
স্যারের সঙ্গে কথা হলে প্রায়ই স্ত্রীর কথা বলতেন, তিনি অসুস্থ। তাঁর ওষুধপথ্য, ডাক্তারের নির্দেশ অনুযায়ী সময়ানুবর্তিতা, ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শের জন্য দেশের বাইরে সিঙ্গাপুরে যাওয়া। মাঝে একবার বললেন, যুক্তরাষ্ট্রে হয়তো থেকে যাবেন স্যারের সহধর্মিণী। কখনো স্যারের নিজের স্বাস্থ্য নিয়ে কোনো উদ্বিগ্নতার আভাস দেননি। শুধু শেষ যখন যুক্তরাষ্ট্রে গেলেন, শারীরিক অসুস্থতার জন্য মূল অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারলেন না। আমরা একে মামুলি জ্বর-ঠান্ডাই ভাবলাম।
ফেব্রুয়ারিতে বিস্তর কথা হলো স্যারের সঙ্গে কয়েকদিন। হবিগঞ্জের সাহিত্য আয়োজনে স্যারকে সম্মানিত করে সম্মানিত হতে চাইলাম আমরা। স্যার প্রথমে রাজি হলেন, পরে আবার ফিরতি ফোনে বললেন, ‘এ-বছর সুব্রত বড়ুয়াকে দাও। আমি আগামী বছর। সুব্রত বড়ুয়া, মহতী এই মানুষটির বয়স হয়েছে, অসুস্থ থাকেন প্রায়ই। আমি পরেও যেতে পারবো।’ স্যারের পরামর্শে সুব্রত বড়ুয়ার সঙ্গে কথা, সিদ্ধান্ত। যদিও শেষ পর্যন্ত তিনিও যেতে পারেননি।
সে অন্য প্রসঙ্গ। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্যারের পিতৃপুরুষের বাস ছিল হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং উপজেলায়। সেখানে তিনি জীবনের দিন কাটাননি বলে ব্যাপারটি অনুচ্চই থাকতো। কিন্তু ঘরোয়া আড্ডায়, আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকারে তিনি সবসময় নিজের গ্রামটির কথা বলতেন, শেকড়ের কথা বলতেন। হবিগঞ্জবাসী হিসেবে এর দায় আমারও। কখনো স্যারকে হবিগঞ্জে নিয়ে নিজেরা সম্মানিত হতে পারিনি। কত আমলা, কত অখ্যাত, বিখ্যাত মানুষ হবিগঞ্জের নানা আয়োজন অলংকৃত করেছেন, অথচ স্যারকে হবিগঞ্জ নেওয়া হয়নি। চেষ্টা করা হয়নি তেমনটা নয়, কোনো অনিবার্য কারণে হয়ে ওঠেনি শেষ পর্যন্ত।
ব্যক্তিগতভাবে আমার কেবলই মনে হতো, শুধু স্যারের জন্য একটি অনুষ্ঠান। যেখানে স্যারই মুখ্য, স্যারই প্রধান, স্যারই মূল। বলতেন, ‘তোমার নাটক থাকতে হবে। তোমার নাটক দেখতে আমি হবিগঞ্জ আসবো।’ কতবার যে এই ইচ্ছেটা প্রকাশ করেছেন! কতবার! আমরাও কত পরিকল্পনা করেছি শুধু স্যারের জন্য একটা শো হবে। শুধুই স্যারের জন্য। স্যার যদি হবিগঞ্জ না যেতে পারেন, তো ঢাকায় এসে শো করবো।
স্যারের চলে যাওয়ার খবরটা যখন পেলাম, তখন মনে করার চেষ্টা করছিলাম বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের দীর্ঘ বিরতির পর স্যারের সঙ্গে পুনরায় যোগাযোগটা স্থাপিত হয়েছিল কী করে! কী বিপুলাতয়ন গৌরবে সিক্ত হয়ে আমার মনে পড়ল, কোনো ঈদসংখ্যায় আমার গল্প পড়ে স্যার ফোন করেছিলেন আমাকে, ‘তুমি লিখতে শুরু করেছো রুমা এবং খুব ভালো লিখছো।’ কোনো সুহৃদের কাছ থেকে ফোন নম্বরটা সংগ্রহ করেছিলেন নিজেই। প্রসঙ্গক্রমে স্মরণ করি আরেক দিকপাল নাট্যকারের কথা – সেলিম আল দীন। নাটকের পাণ্ডুলিপি পড়ে নম্বর সংগ্রহ করে যিনি নিজ থেকে ফোন করেছিলেন আমাকে।
মনজুর স্যার খুব চাইতেন আমি লিখি, লেখায় থাকি। আমার লেখায় ফিরে আসা স্যারকে যে অপার আনন্দ দিয়েছিল তাতে মোটেই খাদ ছিল না। গুরুর স্নেহে তিনি শিষ্যের কলম ছুঁয়ে ছিলেন। খুব বেশি চাইতেন আমার থিয়েটারচর্চাও অব্যাহত থাকুক।
অদ্ভুত আর অভূতপূর্ব এক শালীনতা জড়িয়ে রাখতেন নিজের চারপাশে। আমার গল্পের বইগুলো পাঠাতাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ঠিকানায়। কী উচ্ছ্বাস যে প্রকাশ করতেন! প্রায়ই বলতেন, ‘তুমি তো এসেছো অনেক দূর যাওয়ার জন্য।’ বিশেষত যখন জনৈকের অনাকাক্সিক্ষত আক্রমণে স্যারকে ফোন করলাম। ধীর, স্থির, শান্ত স্যারের তীব্র রাগ টের পেলাম আমি প্রথমবারের মতো। কী সৌম্য আর সুস্থির তার প্রকাশ। বললেন, ‘আমি তার কবিতা খুব পছন্দ করতাম। এরপর যখন দেখা হবে, সেই দেখা হওয়াটা খুব সুখকর হবে না তার জন্য।’
এসএমআই কাউকে বলতে পারেন, এই দেখা হওয়াটা খুব সুখকর হবে না। স্যারের সান্নিধ্য পাওয়া, স্যারের স্নেহধন্য মানুষগুলো কখনো স্যারকে এটুকু কটু কথা বলতে শুনেছে কি না আমি জানি না। আমি অন্তত কয়েক দশকের পরিচয়ে শুনিনি।
আমার লেখা পড়ে যখন প্রশংসা করতেন, আমি বলতাম, ‘স্যার আপনার দু-কলম লেখা হবে, আমার জন্য অনন্য প্রাপ্তি।’ বলতেন, ‘লিখবো রুমা, দু-কলম নয়, বড় করেই লিখব। তুমি তো অনেক দূর যাবে।’ কতদূর যাবো জানি না, যেতে পারব কি না তা-ও জানি না। কিন্তু সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ভাবতেন, আমি অনেক দূর যাবো – এই ভাবনাটুকুই আমার লেখকজীবনের অমূল্য পাথেয়। স্যার ভাবতেন, ভাবতেন বলেই আমাকে সুদূর হবিগঞ্জ থেকে বেঙ্গল ফাউন্ডেশনে বলার জন্য ডেকে আনতেন।
এই যে প্রান্তিকে পড়ে থাকা আমাকে ডেকে আনা নগরের টেবিলে – এটুকু তাঁর দায়বদ্ধতা। যে-দায়বদ্ধতা আমরা সমকালে সফল মানুষদের মাঝে পাই না। সে বয়সে কম হোক কিংবা বেশি। অনেক হিসাব তাঁদের। কার সঙ্গে কতখানি বলবেন, কতদূর যাবেন, কতটা সম্পর্ক রাখবেন – সবকিছুতেই বড় হিসাব তাদের। এই হিসাব যে তাদের কতটা ছোট করে দেয়, একজন সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের সঙ্গে তুলনা করে টের পাই প্রতিনিয়ত। যেমন করে উত্তরাধুনিকতাকে সহজবোধ্য করে ব্যাখ্যা করতেন তিনি, আরোপিত আধুনিকতার মানকে প্রশ্ন করতেন। অল্টার্ন আর সাব-অল্টার্নের সীমারেখাকে অস্বীকার করতেন – তা কেবলই তাঁর সাহিত্যিক, জ্ঞানগর্ভ প্রজ্ঞা নয়, বরং বিশ্বাসজাত আচরণেও তার প্রতিফলন দেখেছি সব কাজে।
এই বয়সে কেন ক্লান্তিহীন কাজ করে বেড়াতেন তিনি? তাঁর চলে যাওয়ার পর প্রশ্নটি ঘুরেফিরেই এসেছে নানা প্রসঙ্গে। তিনি তো নেই, তাঁকে জবাবদিহি করা যায়, কেন তিনি সন্তের মতো পায়ে হেঁটে বেড়াতেন বিদ্যাপীঠ থেকে বিদ্যাপীঠে, সাহিত্যের আসর থেকে সেমিনারের প্রাজ্ঞ শ্রোতার সামনে। ঘোর শত্রুও বলবে না এ কোনো বৈষয়িক নেশার টানে। টান যদি কিছু থাকে তো সে-টান তারুণ্যের। তারুণ্যের আহ্বান। শ্রেণিকক্ষে বসে থাকা তারুণ্য। চিন্তা দিয়ে ভাষণ দিয়ে যে তারুণ্যের মস্তিষ্ক উদ্দীপ্ত করা যায়। তারুণ্যকে উদ্দীপ্ত করার অদম্য নেশাই তো শিক্ষকজীবনের আবশ্যিক অনুঘটক। তিনি পেশাটাকে নিয়েছিলেন নেশা করে।
তাঁর চলে যাওয়ার পর গভীর বিষাদরেখা ছুঁয়ে নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে এটুকু বিবেচনা করা যায়, তিনি কখনো কোনো মুহূর্তে নিজেকে কর্মহীন কিংবা অকর্মণ্য ভাবেননি। কাজ ছাড়া সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম নিজে নিজেকে ভাবেননি। আমরা যারা তাঁর গুণমুগ্ধ স্নেহধন্য, আমরাও ভাবতে পারিনি।
সাধারণত আমরা যা দেখে অভ্যস্ত – একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, লেখালেখিতে সুপ্রতিষ্ঠিত, সুবক্তা, তিনি সোকল্ড বুদ্ধিজীবীদের মতো বসে থাকবেন কৃত্রিম ভাবগাম্ভীর্য নিয়ে। মানুষ তাঁকে তোষামোদ করবে, পাঁচ জায়গায় ডাকলে তিনি এক জায়গায় তশরিফ রাখবেন। কিন্তু সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্যারের বেলায় উল্টোটা। তিনি সবার ডাকে ছুটে যাচ্ছেন বক্তৃতা করতে। নগর, প্রান্তিক ভাবছেন না। এলিট, গ্রাম্যতা বিভেদ করছেন না। ছুটে যাচ্ছেন ক্লাস নিতে। নিজে আয়োজক হয়ে একে-তাকে ডেকে আনছেন মঞ্চে। মনে ও মননে এমন উত্তরাধুনিক মানুষ তো আমাদের আর একজনও নেই। আমাদের আক্ষেপ, আফসোস আর বিষাদেরও তাই সীমা নেই। আমাদের প্রত্যাশার পারদ যেন আকাশ স্পর্শ করেছিল সৈয়দ মনজুরুল ইসলামকে ঘিরে। তিনি আরো বলবেন, আরো লিখবেন, আরো দিকনির্দেশনার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে আরো দীর্ঘদিন পথ দেখাবেন আমাদের। সদাহাস্য মুখ, অক্লান্তকর্মা, বিনয়ের পরাকাষ্ঠা সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম তাঁর ক্রমাগত ছুটে চলা দিয়ে মুহূর্তের জন্য আমাদের ভাবতে দেননি, তিনি থাকবেন না – এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে আমাদের, তা-ও এত দ্রুত!
মনজুর স্যারের এই যে নানা কাজে ছুটে ছুটে যাওয়া, এই বয়সেও অক্লান্ত পরিশ্রম – এর একটাও কি তাঁর নিজের কোনো স্বার্থসংশ্লিষ্ট? না মোটেই। বরং আর দশজন প্রতিষ্ঠিত আর সফল মানুষের মতো তিনি নিজেকে জনবিচ্ছিন্ন করেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন, শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত মানুষের কাছে যেতে হবে। মানুষকে অমৃতবাণী শোনাতে হবে। মানুষের মস্তিষ্কে যদি সামান্য অভিঘাত তৈরি করা যায়, তবে সেটাই তাঁর দায়িত্ব। এটা তাঁর মহত্ত্ব নয়, বরং সততা। আমাদের এরকম সৎ অভিভাবক আর কেউ রইল না।
ব্যক্তিগতভাবে তাঁর চলে যাওয়া আমার মাথার ওপর ছায়া, মায়া আর আশ্রয় দেওয়া বটগাছটি হারিয়ে যাওয়ার মতো। এই নির্দয় নগরীতে সৃজনশীলতার ভুবনে আমার আর কোনো স্বজন নেই, যিনি অখণ্ড মনোযোগে আমাকে পড়বেন, পুঙ্খানুপুঙ্খ সমালোচনা করবেন, মান্যবরদের সম্মুখে আমাকে তুলে ধরবেন। আমি অন্তর থেকে জানতাম, অভিভাবকহীন, মায়াহীন এই ময়দানে কেবল কব্জির জোর দিয়ে যে যৎসামান্য লেখক পরিচয় অর্জন করেছি, তা অন্তত একজনের মনোযোগ আর স্নেহাশিসে সিক্ত ছিল। আমি হারিয়ে ফেলেছি আমার পিতৃতুল্য অভিভাবককে। এই শহরে ফোন করে খাস হবিগঞ্জের ভাষায়, ‘কিতা খবর রুমা’ – বলার মতো আর একজন স্বজনও রইল না। কেবলই কি ব্যক্তি আমি? অভিভাবকহীন হলো এই নগরের সৃজনশীলতা, মুক্ত-উদার ও পক্ষপাতহীন মননশীলতার জগৎ। নির্মোহ হয়ে সত্য ভাষণ দেওয়ার কেউ আর রইল না আমাদের।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.