শতবর্ষ স্মরণ – মুসলিম সাহিত্য সমাজ ও তার মুখপত্র শিখা একটি আনুপূর্বিক পর্যালোচনা

চলতি বছরের (২০২৬) জানুয়ারি মাসে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজে’র শতবর্ষপূর্তি। উপলক্ষটি সারা দেশে নানা আয়োজন ও কর্মসূচির মধ্য দিয়ে উদ্যাপিত হচ্ছে বলে আশা করা যায়। বর্তমান সামাজিক-সাংস্কৃতিক বাস্তবতায় এই উপলক্ষটি এবার এক নতুন আবেদন বা বাড়তি মাত্রা নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। ‘সাহিত্য-সমাজে’র নেতৃস্থানীয় চিন্তক এবং অন্য যাঁরা কমবেশি এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, গত শতকে বাঙালি মুসলমানের
বুদ্ধিবৃত্তিক-সাংস্কৃতিক তথা সামাজিক অগ্রগমনে তাঁদের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ প্রভাব কিছুতেই অস্বীকার করা যাবে না। বস্তুত রোকেয়া ও নজরুলের পর বাঙালি মুসলমান সমাজের সংস্কারমুক্তি ও জাগরণ প্রচেষ্টায় ঢাকা মুসলিম সাহিত্য সমাজ বা শিখাগোষ্ঠীর অবদানই ছিল সর্বাধিক। সংগঠনটি তার বার্ষিক মুখপত্র শিখার নামে ‘শিখাগোষ্ঠী’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। যদিও গোড়ায় বিরোধীরাই তাঁদের সম্পর্কে বিদ্রƒপার্থে ‘শিখাপন্থী’ অভিধাটি ব্যবহার করত। তবে শিখা যে মুসলিম সাহিত্য সমাজের মুখপত্র, প্রথম সংখ্যা থেকেই পত্রিকার আখ্যাপত্রে সে-কথা লেখা থাকত। আর যে-পাতা থেকে পত্রিকার মূল রচনা ছাপা শুরু হতো তার শীর্ষে লেখা থাকত ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব’ – এই কথাগুলো। এ থেকে এ-বাক্যটিকেই মুসলিম সাহিত্য-সমাজের ‘মটো’ বা মর্মবাণী হিসেবে গণ্য করা হয়। পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় ‘প্রকাশকের নিবেদন’ হিসেবে যা লেখা হয় তার বৃহদংশ আমরা এখানে (বানানের সামান্য প্রমিতকরণসহ*) উদ্ধৃত করছি :

এই সমাজের মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে ‘চিন্তা চর্চা করা’। … পরিপুষ্ট চিন্তাই সাহিত্যের খোরাক জোগায়। … ‘শিখার’ প্রধান উদ্দেশ্য বর্তমান মুসলমান সমাজের জীবন ও চিন্তাধারার গতির পরিবর্তন-সাধন। শিখার প্রথম সংখ্যায় আমরা যে প্রবন্ধগুলি সন্নিবেশ করেছি তার প্রত্যেকটি সমাজের দারুণ অভাবের এক একটি দিক লক্ষ্য করে লিখিত হয়েছে। … সে জন্য হয়ত অনেক অপ্রিয় সত্যের অবতারণা করতে হয়েছে। কিন্তু আমরা মনে করি, সমাজের প্রকৃত সহৃদয় সুহৃদ-বর্গের কেহই সেই অপ্রিয় সত্য হজম করতে নারাজ হবেন না – কারণ নিতান্ত আত্মীয় যে সেই তো আঘাত দিতে পারে। এই প্রবন্ধগুলি কাহারও কাহারও নিকট নীরস মনে হবে – বিশেষত যখন তাঁরা দেখবেন এ সংখ্যায় কোনো হালকা গল্প নাই বা মিষ্টি কবিতা নাই। সে জন্য পাঠকবর্গের নিকট ত্রুটি স্বীকার করি, কেননা আমাদের দুঃস্থ সমাজের বর্তমান অবস্থা চিন্তা করলে আনন্দের হাসির পরিবর্তে বেদনার অশ্রুতে জীবন ভরে উঠে। আশা করি, সমাজের সারথিগণ আমাদের এই মনোভাবের প্রতি একটু দরদের দৃষ্টি দিতে কুণ্ঠিত হবেন না।

গোড়ার এই উদ্ধৃতি থেকে মুসলিম সাহিত্য সমাজ বা শিখাগোষ্ঠীর উদ্দেশ্য ও দৃষ্টিভঙ্গি সহজেই উপলব্ধি করা যায়।    

   মুসলিম সাহিত্য সমাজের প্রাণপুরুষ ছিলেন দুজন – আবুল হুসেন (১৮৯৭-১৯৩৮) ও কাজী আবদুল ওদুদ (১৮৯৪-১৯৭০)। আবুল ফজল তাঁর এক প্রবন্ধে কাজী আবদুল ওদুদকে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের ‘ভাবযোগী’ ও আবুল হুসেনকে ‘কর্মযোগী’ বলে অভিহিত করেছেন। যদিও এই আন্দোলনের মর্ম বা ভাব-উপাদানের ক্ষেত্রেও আবুল হুসেনের মুখ্য ভূমিকা ছিল। একেবারে শুরু থেকে কিংবা পরে বিভিন্ন সময় আরো অনেকে সাহিত্য-সমাজের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হন। তাঁদের মধ্যে বিশিষ্ট কয়েকজন (যাঁরা উত্তরকালে লেখক হিসেবে বিশেষ খ্যাতির অধিকারী হয়েছেন) হলেন কাজী মোতাহার হোসেন (১৮৯৭-১৯৮১), আবুল ফজল (১৯০৩-৮৩), মোতাহের হোসেন চৌধুরী (১৯০৩-৫৬) ও আবদুল কাদির (১৯০৬-৮৪)। অধ্যাপক সুরেন্দ্রনাথ মৈত্র, প্রথম থেকেই মুসলিম সাহিত্য সমাজের কার্যক্রমের সঙ্গে যাঁর ঘনিষ্ঠ যোগ ছিল, তিনি কাজী আবদুল ওদুদকে শিখাগোষ্ঠীর ‘মস্তিষ্ক’, আবুল হুসেনকে ‘হাত-পা-মাথা’ এবং কাজী মোতাহার হোসেনকে ‘হৃদয়ে’র সঙ্গে তুলনা করেছেন। শিখার মাত্র পাঁচটি সংখ্যা বেরিয়েছিল। এর মধ্যে প্রথম সংখ্যাটির (১৯২৭) সম্পাদক ছিলেন আবুল হুসেন। দ্বিতীয় ও তৃতীয় সংখ্যার (১৯২৮ ও ১৯২৯) সম্পাদক ছিলেন কাজী মোতাহার হোসেন, চতুর্থ সংখ্যার (১৯৩০) মোহাম্মদ আবদুর রশিদ এবং পঞ্চম বা শেষ সংখ্যার (১৯৩১) আবুল ফজল। তবে আবুল ফজলের লেখা থেকে জানা যায়, সম্পাদক হিসেবে যাঁর নামই ছাপা হোক, পত্রিকা সম্পাদনার আসল দায়িত্ব পালন করতেন আবুল হুসেন। প্রকাশনা খরচেরও বেশিরভাগ তিনিই বহন করতেন। এ-প্রসঙ্গে আবুল ফজলের মন্তব্য :

‘সাহিত্য-সমাজ আর ‘শিখা’র পেছনে অর্থ এবং শ্রম দুই-ই যোগাতেন আবুল হোসেন [য.প্র.] সাহেব নীরবে আর আমাদের অজ্ঞাতে। দেনার দায়ও তাঁর, মতামতের জন্য জবাবদিহি বা নিগ্রহভোগের বেলায়ও তিনি।’ এবং ‘পেছন থেকে সবকিছুই তিনি করতেন কিন্তু নিজেকে জাহির করতে চাইতেন না মোটেও। সে যুগেও এমন প্রশংসা-ভীরু আত্মপ্রচারণা-বিমুখ লোক ছিল বিরল।’ প্রধানত মুসলিম সাহিত্য সমাজের বার্ষিক অধিবেশনে পঠিত প্রবন্ধ, অভিভাষণ, কার্যবিবরণী ইত্যাদিই পরবর্তী বছরের শিখায় প্রকাশিত হতো। যে-কারণে ১৯২৬ সালে মুসলিম সাহিত্য সমাজ প্রতিষ্ঠিত হলেও শিখার প্রথম সংখ্যাটি প্রকাশিত হয় ১৯২৭ সালে। অবশ্য সাহিত্য-সভার বার্ষিক অধিবেশনে কিংবা অন্যান্য সভায় পঠিত সকল রচনাই যে-শিখায় প্রকাশিত হতো তা নয়। স্থানাভাববশতও সেটা সম্ভব ছিল না। কোনো কোনো রচনা সমকালীন অন্যান্য পত্রিকায়ও প্রকাশিত হয়। এসব পত্রিকার কিছু ছিল শিখার সমমতাবলম্বী, যেমন : তরুণপত্র, অভিযান, জাগরণ, সঞ্চয়, মোয়াজ্জিন, জয়তী ও সবুজ বাঙলা। এ-পত্রিকাগুলোর কোনোটি শিখার আগে আর কোনোটি শিখার পরে প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে প্রথম চারটি পত্রিকার প্রকাশক বা মূল উদ্যোক্তা ছিলেন আবুল হুসেন। তবে উল্লিখিত পত্রিকাগুলো ছাড়াও সাহিত্য-সমাজের অধিবেশনে পঠিত কিছু রচনা ভারতবর্ষ, প্রবাসী, সওগাত, জাগরণ এমনকি দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে সাহিত্য-সমাজের বিরোধী পত্রিকা, যেমন মোহাম্মদীর পাতায়ও ছাপা হয়। এ-প্রসঙ্গে যে-তথ্যটি বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার তা হলো, মুসলিম সাহিত্য সমাজের আয়ুষ্কাল ছিল এক দশকের কিছু বেশি। এর মধ্যে প্রথম ছয় বছরে শিখার পরপর মাত্র পাঁচটি সংখ্যা বেরিয়েছিল। সাহিত্য-সমাজের কার্যক্রম এরপরও কয়েক বছর অব্যাহত থাকলেও শিখা আর বের হয়নি। তবে অন্য কয়েকটি পত্রিকা তখন কমবেশি শিখার দায়িত্ব পালন করে।

দুই

মুসলিম সাহিত্য সমাজের প্রতিষ্ঠা ১৯২৬ সালের ১৭ই (মতান্তরে ১৯শে) জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম হলে (এখন যার নাম সলিমুল্লাহ মুসলিম হল) এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। আর এর এক বছর পর, ১৯২৭ সালে (চৈত্র ১৩৩৩ বঙ্গাব্দ), সংগঠনের বার্ষিক মুখপত্র হিসেবে শিখা প্রকাশিত হয়। শিখা প্রকাশের আগে তো বটেই, এমনকি সংগঠন হিসেবে মুসলিম সাহিত্য সমাজ-এর আবির্ভাবেরও কয়েক মাস পূর্বে আবুল হুসেনেরই উদ্যোগে ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয় মাসিক তরুণপত্র  (বৈশাখ ১৩৩২)। পত্রিকাটির সম্পাদক হিসেবে মুহম্মদ ফজলুল করিম মল্লিক ও আহমদ হোসেনের নাম ছাপা হলেও এর আসল পরিচালক ছিলেন আবুল হুসেন। পত্রিকার আর্থিক

পৃষ্ঠপোষকতা তিনিই করতেন। স্বনামে-বেনামে অধিকাংশ লেখাও তিনিই লিখতেন। ‘পাথেয়’ এই মূল-শিরোনামের অধীনে প্রতি সংখ্যায় আবুল হুসেনের একটি করে প্রবন্ধ ছাপা হতো। আবুল হুসেনের শাস্ত্রবিরোধী ও চূড়ান্তরকমে যুক্তিবাদী চিন্তাধারার পরিচয় পাওয়া যায় এই লেখাগুলোর মধ্যে। অন্যান্যের মধ্যে কাজী আবদুল ওদুদ ও আবুল ফজলেরও লেখা ছাপা হয় তরুণপত্র-এ। শেষের দিকের দু-এক সংখ্যায় পত্রিকার সহ-সম্পাদক হিসেবে আবুল ফজলের নাম ছাপা হয়েছিল।৬ প্রথম সংখ্যা তরুণপত্র-এর সম্পাদকীয়তে লেখা হয়, ‘বিধিনিষেধ, অনুশাসন, প্রথা ইহার একটিকেও চিন্তাবিহীন হইয়া মানিয়া লওয়া শুধু অন্যায় নহে, অপন্যায়ও বটে।’ বলা হয়,
হিন্দু-মুসলমান-ব্রাহ্ম-খ্রিষ্টান নির্বিশেষে ‘বাঙলার তরুণ সম্প্রদায়কে সমাজ ও দেশহিতব্রতে উদ্বোধিত করা’ই পত্রিকার উদ্দেশ্য।৮ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মাধ্যমে তরুণপত্র-এর কয়েকটি সংখ্যা হাতে পান প্রমথ চৌধুরী। সংখ্যাগুলো দেখার পর তিনি তাঁর সম্পাদিত সবুজপত্র পত্রিকায় (অগ্রহায়ণ ১৩৩২) তরুণপত্র-কে অভিনন্দন জানিয়ে একটি নিবন্ধ লেখেন। ‘তরুণপত্র’ শিরোনামে লেখা সে-নিবন্ধে প্রমথ চৌধুরী বলেন :

মানুষের চোখ ফোটাবার একমাত্র উপায় হচ্ছে তাকে চিন্তারাজ্যে নিয়ে যাওয়া। সে রাজ্যে জাতিভেদ নেই। বাঙলার তরুণের দল যে হিন্দু-মুসলমান নির্বিচারে এই রাজ্যে প্রবেশ করতে উন্মুখ হয়েছেন, এর চাইতে আনন্দের কথা আর কী হতে পারে?

তরুণপত্র যদি নতুন করে ভাবতে পারে, তাহলে সে ভাব সে কথায় বলতে পারবে। তার সহজ সরল ভাষা পড়ে আমি একটু অবাক হয়ে গিয়েছি। এই ভাষাই পরিচয় দেয় যে মুসলমান হিন্দুর কত কাছে এগিয়ে এসেছে – আর ঢাকা, কলকাতার। সবুজপত্র তরুণপত্রকে তাই ডেকে বলছে – ‘ভাই, হাত মিলা না!’

তরুণপত্র দীর্ঘজীবী হয়নি। মোট পাঁচটি কি ছটি সংখ্যা বেরিয়েছিল বলে আবুল ফজলের লেখা থেকে ধারণা পাওয়া যায়।১০

তরুণপত্র-এর কয়েকমাস পরই (ভাদ্র ১৩৩৩) প্রকাশিত হয় মাসিক অভিযান। পত্রিকার এই নামকরণ করেছিলেন নজরুল আর এর সম্পাদক ছিলেন মোহাম্মদ কাসেম।১১ সেবার মুসলিম সাহিত্য সমাজের অধিবেশনে যোগ দিতে এসে নজরুল ঢাকায় বসেই পত্রিকাটির এই নামকরণ এবং এর প্রথম সংখ্যার জন্য ‘অভিযান’ নামে একটি কবিতা লিখে দিয়ে যান।১২ এছাড়াও পত্রিকার নামপত্রে নজরুলের ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতার কয়েকটি পঙ্ক্তি ছাপা হতো।১৩

অভিযান-এর অবশ্য মাত্র দুটি সংখ্যাই বেরিয়েছিল। কাজী আবদুল ওদুদের ‘সম্মোহিত মুসলমান’ এবং আবুল হুসেনের ‘নিষেধের বিড়ম্বনা’ এই দুটি চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী প্রবন্ধ – শিখায় নয় – অভিযান-এই প্রকাশিত হয়। পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার আগে কাজী আবদুল ওদুদের ‘সম্মোহিত মুসলমান’ প্রবন্ধটি সাহিত্য-সমাজের প্রথম বর্ষের চতুর্থ সাধারণ অধিবেশনে পঠিত হয়েছিল। অভিযান-এর পর এটি তাঁর প্রবন্ধগ্রন্থ নবপর্যায়-এ (১৩৩৩) প্রকাশিত হয়। ওদুদ তাঁর প্রবন্ধে লিখেছিলেন :

আজ আমাদের বুদ্ধি নিসাড় হয়ে পড়েছে – আমরা স্থূল বিশ্বাসে জড়িয়ে গিয়ে বুদ্ধির ঘরে তালা দিয়ে রেখেছি। কয়েকটি ধারণার বশবর্তী হয়ে আমরা দুনিয়ার এত ভাঙাগড়া, পরিবর্তন, আবর্তন কিছুতেই সাড়া দিতে চাই না। ইসলাম আজ শত শত বৎসর ধরে চলেছে নানা দেশ, নানা আবহাওয়া, নানা জাতির মধ্য দিয়ে – তাতে তাকে দেশকালের প্রভাবে কিছু কিছু স্বরূপ বদলাতে হয়েছে। আজ আমরা তা না স্বীকার করে ইসলাম, ইসলাম বলে ধর্মের জোশ ও বড়াই প্রকাশ করি। আজ আমাদের ইসলামের গৌরব রক্ষা করতে যুগধর্মের সত্যকে আশ্রয় করতে হবে এবং সেই সত্যে ইসলামকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। তবেই ভরসা।১৪

আর আবুল হুসেন তাঁর ‘নিষেধের বিড়ম্বনা’ প্রবন্ধে লিখেছিলেন :

ধর্মশাস্ত্রসমূহ আলোচনা করলে দেখা যায়, প্রত্যেক ধর্মই কতকগুলি ‘নিষেধ’-এর সমষ্টি মাত্র। শাস্ত্রকার এই নিষেধের প্রয়োজন বোধ করেছেন মানব-প্রকৃতির স্বেচ্ছাচারিতার নিগ্রহ হতে মানুষকে বাঁচাবার জন্য – তার ভিতরকার উচ্ছৃঙ্খল জন্তুর হাত হতে তাকে রেহাই দেওয়ার জন্য। …১৫

কাজী আবদুল আবদুল ওদুদ ও আবুল হুসেনের এ-প্রবন্ধ দুটি সে-সময় কারো কারো মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। মোহাম্মদ আকরম খাঁ-সম্পাদিত সাপ্তাহিক মোহাম্মদী এবং মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী-সম্পাদিত দৈনিক ছোলতান পত্রিকায় প্রবন্ধ দুটির তীব্র সমালোচনা করা হয়। তারা এতে ধর্ম-বিরোধিতার উপাদান খুঁজে পায়। মাসিক অভিযান-এ প্রবন্ধ দুটি ছাপা হওয়ার পরপরই এ নিয়ে আকরম খাঁ তাঁর মোহাম্মদী পত্রিকায় ‘নব পর্য্যায় না নব পর্য্যয়’ শিরোনামে কয়েক কিস্তিতে (ফাল্গুন ১৩৩৪-জ্যৈষ্ঠ ১৩৩৫) সে-বিষয়ে সমালোচনা লিখে প্রকাশ করেন। সে-লেখার জবাব দেন আবুল হুসেন (অবশ্য ‘সবজানতা’ ছদ্মনামে) এক দীর্ঘ রচনার মাধ্যমে, ঢাকা থেকে প্রকাশিত মাসিক জাগরণ পত্রিকার পরপর দুটি সংখ্যায় (বৈশাখ ১৩৩৫ ও জ্যৈষ্ঠ ১৩৩৫) যা মুদ্রিত হয়।১৬ আবুল হুসেন ও কাজী আবদুল ওদুদের প্রবন্ধের প্রতিক্রিয়ায় সৃষ্ট ক্ষোভ ও বিতর্কের পটভূমিতে (ঢাকা) বলিয়াদির জমিদার কাজেমুদ্দীন সিদ্দিকীর উদ্যোগে তাঁর বৈঠকখানায় এক সালিশসভার আয়োজন করা হয়। কাজী ওদুদ ও আবুল হুসেনকে তলব করা হয় সেখানে। উভয় পক্ষের মধ্যে কয়েকদিন ধরে চলে সওয়াল-জবাব। শেষে একপর্যায়ে মনে হয় ‘ত্যক্ত-বিরক্ত’ হয়েই তাঁরা দুজন দুটি ঘোষণাপত্র লিখে দেন।১৭ ১৯২৮ সালের ২০শে আগস্ট স্বাক্ষরিত
সে-ঘোষণাপত্রে আবুল হুসেন লেখেন : ‘… আমার ব্যবহৃত ভাষার জন্য আমার মনের কথা যদি সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ পাইয়া না থাকে এবং তাহা যদি আমার মুসলিম ভ্রাতৃবৃন্দের মনে দুঃখ পয়দা করিয়া থাকে, তজ্জন্য আমি আন্তরিক দুঃখিত। … হজরত মুহাম্মদ (দঃ) ও ইসলামের রওনক নিজের জীবনে ও আধুনিক মুসলিম সমাজে ফুটাইয়া তুলাই আমার একমাত্র উদ্দেশ্য। …’  আর কাজী আবদুল ওদুদ লেখেন : ‘আমার জ্ঞান [-] বিশ্বাস অনুসারে ইসলাম ও হজরত মুহাম্মদ (দঃ) সম্বন্ধে এমন কোনো কথা আমি ব্যবহার করি নাই যাতে অসম্ভ্রম বা অশ্রদ্ধা প্রকাশ পেতে পারে। বরং আমি বিশ্বাস করি যে কোর-আন ও হজরত মুহম্মদ (দঃ) থেকে আমি আমার এই সামান্য জীবনে প্রেরণা লাভ করেছি ও করি …। … দুঃখের বিষয় আমার ভাষা বর্তমানে অনেকেরই কাছে অদ্ভুত ঠেকছে, এবং অনেকের নিকট এমন অর্থ জ্ঞাপন করছে যা লিখবার সময় আমার স্বপ্নেরও অগোচর ছিল। …’১৮ মোহাম্মদী পত্রিকার ১৫ই ভাদ্র ১৩৩৫ (৩১শে আগস্ট ১৯২৮) সংখ্যায় ‘ঢাকার দুইটি ঘোষণাপত্র’ শিরোনামে পত্র দুটি প্রকাশিত হয়।১৯

তবে উপরিউক্ত ঘোষণাপত্রের পাশাপাশি আবুল হুসেন এসময় ‘কৈফিয়ৎ’ শিরোনামে একটি লেখা প্রকাশ করেন। জাগরণ পত্রিকায় (শ্রাবণ ১৩৩৫) প্রকাশিত সে-লেখায় বলা হয় : ‘… হজরতকে আমরা ধর্ম ও নৈতিক জীবন যাপনে সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ বলে বিশ্বাস করব, কিন্তু আধুনিক ও ভবিষ্যৎ জীবন-ধারার সকল বিষয়েও তাঁকে চরম গুরু বলে ধরলে আমরা নব-নব সমস্যায় নব-নব সমাধান উদ্ভাবন করতে পারব না। কারণ, আর্থিক, রাষ্ট্রিক বা সামাজিক প্রয়োজন প্রতিদিন পরিবর্তন লাভ করছে। সে-প্রয়োজন মিটাতে হবে আমাদের জ্ঞান বুদ্ধি খাটিয়ে। …’২০ মোহাম্মদী পত্রিকার তরফে কাজী আবদুল ওদুদ ও আবুল হুসেনের এই ঘোষণা ও কৈফিয়তে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে লেখা হয় : ‘আমরা আনন্দের সহিত প্রকাশ করিতেছি যে, এই কৈফিয়ৎ পাঠ করিয়া আমরা সন্তুষ্ট হইয়াছি।’২১ হুসেন-ওদুদের এই বক্তব্য বা বিবৃতি অবশ্য সাহিত্য-সমাজের তরুণতর সদস্যদের মধ্যে খানিকটা হতাশার সঞ্চার করে। এ-অবস্থায় তাদেরকে উজ্জীবিত করতেই আবদুল কাদির ‘আমি বা কাফের হই’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লেখেন ও বাংলার বাণী পত্রিকায় তা প্রকাশ করেন।২২

তিন

সংগঠন হিসেবে মুসলিম সাহিত্য সমাজ অনেক সময় ‘ঢাকা মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ এই নামেও উল্লিখিত হয়ে এসেছে। এ-প্রসঙ্গে ‘ঢাকা’ ও ‘মুসলিম’ শব্দ দুটিকে আবুল ফজল বলেছেন ‘স্থান-কাল-পাত্রের নির্দেশক’।২৩ তিনি বিষয়টিকে এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন : ‘কর্মক্ষেত্রের একটা স্থানীয় পরিচয় দরকার বলেই এর নামের পূর্বে ঢাকা না লিখে উপায় ছিল না। না হয় এই ঢেউয়ের প্রভাব ঢাকার বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছিল। এর বিভিন্ন অধিবেশনে ঢাকার বাইরের বহু সাহিত্যিক ও চিন্তাশীল সুধীও যোগ দিয়েছেন।’ এবং ‘মুসলিম সমাজ ও তার নানা সমস্যাই এই সমাজের প্রধান আলোচ্য ছিল বটে কিন্তু বহু সুধী অমুসলিমও এই সমাজের প্রত্যেক অধিবেশনে যোগ দিতেন, প্রবন্ধ পড়তেন, আলোচনায় অংশগ্রহণ করতেন।’২৪ বস্তুত শুরু থেকেই মুসলিম সাহিত্য সমাজ সুরেন্দ্রনাথ মৈত্র, চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ও হেমন্তকুমার সরকারের মতো কয়েকজন হিন্দু বিদ্বজ্জনকে তাদের শুভানুধ্যায়ী হিসেবে পেয়েছিল। সংগঠনের নিয়মিত কার্যক্রমে তাঁদের উপস্থিতি থেকেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়। বিভিন্ন সময় কিছু অনুষ্ঠানে তাঁদের কেউ কেউ সভাপতিত্বও করেছেন। মোটকথা মুসলমান সমাজের সমস্যা-সংকট ও তা থেকে উত্তরণের উপায় সংগঠন সদস্যদের চিন্তা ও আলোচনার কেন্দ্রে থাকলেও, সকল সম্প্রদায়ের মানুষের জন্যই সাহিত্য-সমাজের দ্বার উন্মুক্ত ছিল। এ প্রসঙ্গে প্রথম বর্ষ সংখ্যা শিখার ‘বার্ষিক বিবরণী’তে যা লেখা হয় তা এখানে উদ্ধৃতিযোগ্য :

আপনাদের কেহ কেহ হয়ত মনে করবেন এ সমাজের নাম ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ হওয়ায় হিন্দু সাহিত্যিকগণের কোনো সম্পর্ক এতে নাই। কিন্তু এই বার্ষিক বিবরণ হতে আপনারা বুঝবেন যে এ সমাজ কোনো একটি বিশিষ্ট গণ্ডীর মধ্যে আবদ্ধ নয়। কিংবা এ কোনো এক বিশেষ সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য গঠিত হয় নাই।
সাহিত্য-সৃষ্টি করাই এর উদ্দেশ্য। আর সেই সাহিত্যে মুসলমানের প্রাণ ও জীবন ফুটিয়ে তোলাই ইহার অন্যতম উদ্দেশ্য।২৫ 

সাহিত্য-সমাজের প্রথম বার্ষিক অধিবেশনে রমেশচন্দ্র মজুমদার, সুশীল কুমার দে ও চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় উপস্থিত ছিলেন। আলোচনাপর্বেও তাঁরা অংশ নেন।২৬

সাহিত্য-সমাজের দশম বার্ষিক অধিবেশনে (৩১শে জুলাই ১৯৩৬) মূল সভাপতি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। এটিই ছিল সাহিত্য-সমাজের সর্বশেষ বার্ষিক অধিবেশন। অধিবেশনে শরৎচন্দ্র একটি দীর্ঘ ভাষণ দিয়েছিলেন। ‘অভিভাষণ’ শিরোনামে যা পরে বুলবুল পত্রিকার ভাদ্র ১৩৪৩ সংখ্যায় ছাপা হয়। এই ভাষণে শরৎচন্দ্র বলেছিলেন : ‘যাঁরা প্রাচীনপন্থী যাঁরা পিছনে ছাড়া সুমুখে চাইতে জানেন না, তাঁদের জাগরণ কি মুসলিম কি হিন্দু সকল সমাজেরই বিঘ্ন স্বরূপ। … মানুষ যখন সাহিত্যরচনায় নিবিষ্টচিত্ত তখন সে ঠিক হিন্দুও নয়, মুসলিমও নয়। তখন সে তার সর্বজন পরিচিত ‘আমি’ তাকে বহুদূরে অতিক্রম করে যায়, নইলে তার সাহিত্যসাধনা ব্যর্থ হয়।’২৭ এই ভাষণেই শরৎচন্দ্র মুসলমান সমাজ নিয়ে তাঁর উপন্যাস লেখার আগ্রহের কথা জানান।২৮ যদিও তাঁর সে-ইচ্ছা আর বাস্তবায়িত হয়নি। ঢাকা থেকে ফিরে যাওয়ার পরপরই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং দু-বছরেরও কম সময়ের মধ্যে মৃত্যুবরণ করেন।

চার

মুসলিম সাহিত্য সমাজের প্রায় সমসময়ে ঢাকায় আরো দুটি সমিতি বা সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়। এর একটির নাম ‘আল-মামুন ক্লাব’ এবং অপরটির নাম Anti Purdah League। সপ্তম আব্বাসীয় খলিফা আল-মামুনের
(৭৮৪-৮৩৩) শাসনামলে তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় প্রসার লাভ করা মুতাজিলা দর্শন (ইসলামের যুক্তিবাদী ব্যাখ্যার
যে-ধারাটির উদ্গাতা ছিলেন ওয়াসিল বিন আতা নামক একজন ধর্মবেত্তা) দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েই ১৯২৭ সালে গঠিত হয় ‘আল-মামুন ক্লাব’। আবুল হুসেন ছিলেন এর মূল উদ্যোক্তা। তখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও বাণিজ্য বিভাগের প্রভাষক। ক্লাবের প্রথম ও দ্বিতীয় বার্ষিক অধিবেশনে তিনি যথাক্রমে ‘ইসলামের দাবী’ ও ‘আল-মামুন’ নামে দুটি প্রবন্ধ পাঠ করেন। শেষোক্ত প্রবন্ধটিতে আবুল হুসেন বিংশ শতাব্দীতে তুরস্কের মুস্তাফা কামাল ও আফগানিস্তানের বাদশাহ আমানুল্লাহকে দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে খলিফা আল-মামুনের উত্তরসূরি হিসেবে তুলে ধরেন। ১৯২৭ সালে ফজিলতুন্নেসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে মাস্টার্স পাশ করলে আল-মামুন ক্লাবের পক্ষ থেকে তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সংবর্ধনার উত্তরে দেওয়া ফজিলতুন্নেসার লিখিত ভাষণটি ‘মুসলিম নারী-শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা’ শিরোনামে পরে মাসিক সওগাত-এ (অগ্রহায়ণ ১৩৩৪) মুদ্রিত হয়। এতে ফজিলতুন্নেসা লেখেন, ‘নারী ও পুরুষ সমাজ দেহের দুটি অঙ্গ। উভয়ের প্রয়োজনই তুল্যরূপ। কিন্তু আমাদের সমাজ এই প্রয়োজনীয় অর্ধাংশকে উপেক্ষা করে উন্নত হতে – অগ্রসর হয়ে যেতে চেষ্টা করছে, এর চেয়ে দুঃখের বিষয় – নিরাশার বিষয় আর কী হতে পারে? নারীকে পর্দার অন্তরালে রেখে দেওয়া হয়েছে, বাইরের কোনো সাড়া তার মনকে জাগিয়ে তুলতে পারছে না।’২৯ আবুল ফজলের স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, আল-মামুন ক্লাব আয়োজিত ফজিলতুন্নেসার ওই সবংর্ধনায় ওস্তাদ মোহম্মদ হোসেন খসরু গান গেয়ে ‘সভাকে মাতিয়ে তুলেছিলেন’।৩০

Anti Purdah League গঠনের সঙ্গেও সাহিত্য-সমাজের অপেক্ষাকৃত তরুণ সদস্যরা যুক্ত ছিলেন, এর প্রথম সম্পাদক ছিলেন নাজিরউদ্দীন আহমদ, তখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের কৃতী ছাত্র ও মুসলিম হলের আবাসিক। সংঘের অন্যান্য সদস্যও প্রায় সবাই ছিলেন ছাত্র। সমিতি গঠিত হওয়ার কয়েকদিন আগে মুসলিম হল ছাত্র সংসদের সাহিত্য শাখার এক অধিবেশনে আবুল ফজল ‘পর্দাপ্রথার সাহিত্যিক অসুবিধা’ নামে একটি প্রবন্ধ পাঠ করেছিলেন। সে-প্রবন্ধে তিনি লেখেন :

জীবনকে প্রকাশের জন্য চাই মানুষের জীবন সম্বন্ধে গভীর পরিচয়। এখন বিবেচনা করে দেখতে হবে আমরা মুসলমানেরা মানব-জীবন সম্বন্ধে কতখানি পরিচয় পাচ্ছি। আমাদের সমাজের পুরুষেরা নারীর জীবন সম্বন্ধে একেবারে অজ্ঞ। নারীরা পুরুষের জীবন সম্বন্ধে ততোধিক অজ্ঞ। …

… বাঙলার মুসলমান সাহিত্যিকের জন্য মুসলমান সমাজের কল্পলোকের রঙমহল আজ তালাবন্দী, তাই আমাদের দ্বারা যথার্থ সাহিত্য সৃষ্টি হচ্ছে না – যা হচ্ছে তা হয় অসম্ভব কল্পনা অথবা পরানুকরণ।৩১

পরিবর্তিত শিরোনামে (‘মুসলিম কথা-সাহিত্যের গতি ও পরিণতি’) প্রবন্ধটি মাসিক নওরোজ-এ ছাপা হয়। প্রবন্ধটি সে-সময় বিশেষ করে শিক্ষিত তরুণ মহলে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। পর্দাবিরোধী লীগ গঠনের অনুপ্রেরণা বা প্রাথমিক তাগিদটা তা থেকেই আসে।

পাঁচ

শিখার প্রথম সংখ্যাটি (১৩৩৩/ ১৯২৭) শুরু হয় কবি নজরুলের ‘খোশ-আমদেদ’ শিরোনামের একটি গানের বাণী দিয়ে। সাহিত্য-সমাজের অধিবেশনে যোগ দিতে ঢাকায় আসার পথে পদ্মা নদীতে স্টিমারে বসে তিনি যে-গানটি লিখেছিলেন। গানের কয়েকটি লাইন এরকম : ‘… এল কি অলখ-পথ বেয়ে তরুণ হারুণ-অল রশীদ/ এল কি আলবেরুনী হাফিজ খৈয়াম কায়েস গাজ্জালী।/ সানাইয়াঁ ভয়রো বাজায়, নিদ-মহলায় জাগল শা’জাদী। … বাসি ফুল কুড়িয়ে মালা নাই গাঁথিলি, রে ফুল-মালি!/ নবীনের আসার পথে উজাড় করে দে ফুল-ডালি।’৩২ এরপর দ্বিতীয় রচনাটি (স্যার) এ এফ রহমানের (১৮৮৯-১৯৪৫) অভিভাষণ, মুসলিম সাহিত্য সমাজের বার্ষিক অধিবেশনে অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি হিসেবে তিনি যা পাঠ করেছিলেন। বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ও শিক্ষাবিদ এ এফ (আহমেদ ফজলুর) রহমান ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বাঙালি উপাচার্য। তবে সেটা আরো পরের কথা, এই ভাষণটি দেওয়ার সময় তিনি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় মুসলিম হলের প্রভোস্ট। মুসলিম সাহিত্য সমাজের প্রথম বার্ষিক অধিবেশনে প্রদত্ত তাঁর এই অভিভাষণে তিনি কিছু মূল্যবান কথা বলেছিলেন। যেমন জাতীয় জীবনে সাহিত্যের গুরুত্ব বা আবশ্যকতা সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য : ‘যুদ্ধের সময় জাতীয় সঙ্গীত (National anthem) যে কাজ করে শান্তির কালে সাহিত্যও ঠিক সেই কাজ করে। যে জাতির পরিবর্তন নাই, তার কোনো ইতিহাস নাই। যে জাতিতে সাহিত্যচর্চা নাই তারা নিজেদের ইতিহাসের উপর সমাধি মন্দির তুলে দিয়েছে।’৩৩ বাঙলার মুসলমানের মাতৃভাষার প্রশ্নে নিজের অভিমত প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘জাতি বা ধর্ম হিসাবে ভাষা হয় নাই, দেশ হিসাবেই ভাষা হয়েছে। এক এক দেশের এক এক ভাষা। সুতরাং যে দেশে আমাদের বাস তার ভাষাও আমাদের।’৩৪ ভাষণের শেষাংশে মুসলিম সাহিত্য সমাজের কাছে প্রত্যাশা ব্যক্ত করে তাঁর বক্তব্য : ‘… যে নিজের দোষত্রুটিটুকু ধরতে পারে সেই কৃতকার্য হতে পারে। এই ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ একটা অসীম অভাব দূর করবার জন্যই হয়েছে। এ আমাদের জাতীয় জীবনে একটি নূতন স্পন্দনের চিহ্ন। এই ক্ষীণ প্রবাহটুকু কালে একটি স্রোতে পরিণত হয় এই প্রার্থনা করি।’৩৫

অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেছিলেন (খান বাহাদুর) তসদ্দক আহমদ। তিনি তখন ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলের প্রধান শিক্ষক। তসদ্দক আহমদ তাঁর সভাপতির ভাষণে মুসলমানদের বাংলা সাহিত্যচর্চার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে বলেন, ‘এই বাঙলা দেশে আমরা হিন্দু মুসলিম দুইটি বৃহৎ সম্প্রদায় বহুকাল যাবৎ একত্র বাস করিয়া আসিতেছি। সাহিত্যকে গঠন করিবার জন্য ও পুষ্ট করিবার জন্য আমাদের উভয়েরই সমান অধিকার। কিন্তু বলিতে লজ্জাবোধ হয় আমাদের কর্তব্যবোধ সম্বন্ধে আমরা এতদিন সম্পূর্ণ উদাসীন ছিলাম। যখন বাংলা সাহিত্য হিন্দু সমাজের বহু কৃতী সন্তানের দ্বারা শনৈঃ শনৈঃ গঠিত, পুষ্ট ও বর্ধিত হইতেছিল তখন আমরা কেবল সমরখন্দ ও বোখারা, আরব ও ইস্পাহানের স্বপ্ন দেখিতেছিলাম। ইংরাজি শিক্ষার প্রথম আমলে যেমন অদূরদর্শী জননায়কগণের প্ররোচনায় পড়িয়া আমরা ‘কাফের’ হইবার ভয়ে ইংরাজি ভাষাকে প্রত্যাখ্যান করিয়াছিলাম, বাংলা ভাষার উদ্বোধনকালেও আমরা সেইরূপ দূরে দাঁড়াইয়া নিজেদের পবিত্রতা রক্ষা করিয়াছি, আর পরের গালি খাইয়া নীরবে হজম করিয়াছি।’৩৬ সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে বাঙালি মুসলমানের ভাষার আদর্শ কী হবে সে-প্রসঙ্গে তসদ্দক আহমদ তাঁর ভাষণে বলেছিলেন, ‘এক সম্প্রদায় বলেন, ‘আমরা বাঙালি মুসলমান যে ভাষায় কথা বলি তাহা ঠিক বাংলা নয়; উর্দু, পারশি আরবি-বহুল এক মিশ্র ভাষা। সেই ভাষাই আমাদের সাহিত্যের ভাষা হওয়া উচিত।’ কথাটা মন্দ নয়, কিন্তু তাহার মধ্যে একটা মস্ত গলদ রহিয়া গিয়াছে। আমির হামজা বা হাতেম তাইয়ের পুঁথি, কাসাসুল-আম্বিয়া বা সোনাভানের পুঁথি যে ভাষায় রচিত তাহা আমাদের সমাজের বহুতর ব্যক্তির আদরের জিনিস হইতে পারে কিন্তু তাহা সাহিত্য হিসাবে পৃথিবীর লোকের নিকট আদরণীয় বা অনুকরণীয় কোনো কালেই হয় নাই। তাহা হইলে আজ শুধু বটতলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকিয়া তাহা পৃথিবীময় ব্যাপ্ত হইয়া পড়িত।’৩৭

শিখার প্রথম সংখ্যায় সমিতির আগের এক বছরের কার্যবিবরণী – বিভিন্ন অধিবেশনে পঠিত রচনা ও তার লেখকদের নামোল্লেখ ছাড়াও, কাজী আনোয়ারুল কাদির, কাজী আবদুল ওদুদ, কাজী মোতাহার হোসেন, আবদুল কাদিরসহ (তখন তাঁর নামের বানানটি ছিল ‘কাদের’) মোট এগারোজন লেখকের প্রবন্ধ এবং নজরুলের উপরোল্লিখিত কবিতাটিসহ মোট দুটি কবিতা ছাপা হয়। আবুল হুসেনের প্রবন্ধটির নাম ছিল ‘শিক্ষা-সমস্যা’ (একই শিরোনামে মমতাজউদ্দীন আহমদেরও একটি প্রবন্ধ ছিল এই সংখ্যায়)। কাজী আনোয়ারুল কাদিরের প্রবন্ধটির শিরোনাম ছিল ‘সামাজিক গলদ’। কাজী আবদুল ওদুদের প্রবন্ধের নাম ‘সাহিত্য-সমস্যা’ এবং কাজী মোতাহার হোসেনের ‘সঙ্গীত চর্চায় মুসলমান’। সংগীত বিষয়ে আবদুল কাদিরেরও একটি প্রবন্ধ ছিল এ-সংখ্যায়,
‘লোক-সঙ্গীত’ শিরোনামে। ‘নাট্যাভিনয় ও মুসলমান সমাজ’ নামে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন আবদুস সালাম খাঁ। ‘আর্থিক-সমস্যা’ এই শিরোনামে ছিল দুটি প্রবন্ধ। প্রথমটির লেখক ছিলেন রকীবউদ্দীন আহমদ ও দ্বিতীয়টির আনোয়ার হোসেন। এছাড়া আরো যাঁদের প্রবন্ধ ছিল সংখ্যাটিতে তাঁরা হলেন শামসুল হুদা (‘হজরত মুহম্মদের প্রতিভা’) ও আবদুর রশীদ (‘নব জাগরণ ও শরিয়ত’)। পত্রিকার এই প্রথম এবং পরবর্তী চারটি সংখ্যায় মুদ্রিত প্রবন্ধগুলির শিরোনাম বা বিষয়বস্তু থেকে আমরা মুসলিম সাহিত্য সমাজ এবং তার মুখপত্র শিখার উদ্দেশ্য বা অভিমুখ সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা পেতে পারি।

আমন্ত্রণক্রমে সাহিত্য-সমাজের প্রথম বার্ষিক অধিবেশনে যোগ দিতে কবি নজরুল ইসলাম শুধু যে কলকাতা থেকে ঢাকায় এসে উপস্থিত হয়েছিলেন তাই নয়। কিছুটা অসুস্থ (কদিন আগে জ্বরে ভুগে ওঠা) শরীর নিয়েও দুদিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। উদ্বোধনী সংগীত ছাড়াও অধিবেশনের নানা পর্বে তিনি একাধিক গান গেয়েছিলেন। তাঁর সুবিখ্যাত ‘খালেদ’ কবিতাটিও আবৃত্তি করে শুনিয়েছিলেন তিনি। এছাড়া সমাপ্তি অধিবেশনে তিনি আবেগ-উদ্দীপ্ত একটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন। তাতে তিনি বলেছিলেন : ‘আজ আমি এই মজলিসে আমার আনন্দবার্তা ঘোষণা করছি। বহুকাল পরে কাল রাত্রে আমার ঘুম হয়েছে। আজ আমি দেখছি এখানে মুসলমানের নূতন অভিযান শুরু হয়েছে। আমি এই বার্তা চতুর্দিকে ঘোষণা করে বেড়াব। আর একটি কথা – এতদিন মনে করতাম আমি একাই কাফের কিন্তু আজ দেখে আমি আশ্বস্ত হলাম যে মৌঃ আনোয়ারুল কাদির প্রমুখ কতকগুলি গুণী ব্যক্তি দেখছি আস্ত কাফের। আমার দল বড় হয়েছে এর চেয়ে বড় সান্ত্বনা আর আমি চাই না।’৩৮

নজরুল ছাড়াও দুদিনের অধিবেশনে আরো কয়েকজন সংগীত পরিবেশন করেন। তাঁরা হলেন অধ্যাপক বীরেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলি, আক্কাস আলী, অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন ও মুহম্মদ সেরার। সেতার বাজিয়ে শুনিয়েছিলেন (কাজী) আনোয়ারুল হক (পরবর্তীকালে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমলের মন্ত্রী)। কিন্তু অধিবেশনে এতগুলি গান পরিবেশিত হলেও এবং প্রথমদিনের অধিবেশনেই কাজী মোতাহার হোসেন ‘সঙ্গীতচর্চায় মুসলমান’ শিরোনামে একটি ‘সুলিখিত ও তথ্যবহুল’ প্রবন্ধ পাঠ করলেও, আবুল ফজলের মতে, গান সম্বন্ধে মুসলমান সমাজের অবস্থান তখনো ‘দ্বিধামুক্ত হতে পারেনি’।৩৯ লিখিত কার্যসূচি অনুযায়ী বার্ষিক অধিবেশনের উদ্বোধনী পর্বে কোরআন তেলাওয়াতের ঠিক পরপরই গান পরিবেশনের কথা ছিল। কিন্তু ব্যক্তিবিশেষের আপত্তির মুখে তা পিছিয়ে দিতে হয়।৪০ যদিও শিখার প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত সম্পাদকের ‘বার্ষিক বিবরণী’ থেকে জানা যায় সে-বছর সাহিত্য-সমাজের নিয়মিত অধিবেশনগুলোর প্রতিটিতেই সংগীত পরিবেশিত হয়েছে। এ-প্রসঙ্গে অর্দ্ধেন্দু ভূষণ মুখোপাধ্যায় ও গোলাম আহমদ নামক দুজন শিল্পীর নামও উল্লিখিত হয়েছে।৪১

শিখার দ্বিতীয় সংখ্যাটি (১৩৩৫/ ১৯২৮) শুরু হয় নজরুলের ‘নতুনের গান’ (‘চল চল চল/ ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল’) এই কবিতা বা গানটি দিয়ে, যা মুসলিম সাহিত্য সমাজের দ্বিতীয় বার্ষিক অধিবেশনে উদ্বোধনী সংগীত হিসেবে গীত হয়। সে-অধিবেশনে অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন ড. মাহমুদ হাসান। তিনি তখন মুসলিম হলের ভারপ্রাপ্ত প্রভোস্ট, পরে একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হয়েছিলেন (১৯৪২-৪৮)। অবাংলাভাষী মাহমুদ হাসান অধিবেশনে তাঁর বক্তৃতাটি দিয়েছিলেন ইংরেজিতে, বাংলা অনুবাদে যার সারসংক্ষেপ শিখায় মুদ্রিত হয়। ড. মাহমুদ হাসান তাঁর ভাষণে বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা প্রশ্নে তাঁর মতামত এভাবে ব্যক্ত করেছিলেন : ‘আমার দৃঢ় বিশ্বাস, মনকে সচল করতে হলে মাতৃভাষায় শিক্ষা দেওয়া চাই এবং মাতৃভাষায় সাহিত্য হওয়া চাই। … বাংলা দেশে জোর করে উর্দুকে মাতৃভাষা করতে চাওয়ার মতো আহাম্মকি আর নাই। আপনারা মাতৃভাষা চর্চায় মন দিয়েছেন এতে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। … আমার মনে হয়, এইবার বাংলার মুসলমান তাড়াতাড়ি উন্নতি করতে পারবে। এই উন্নতি আরও দ্রুত হোক এই প্রার্থনা করি।’৪২ অধিবেশনের সভাপতি আবদুর রহমান খান তাঁর দীর্ঘ ভাষণে নানা প্রসঙ্গের মধ্যে সাহিত্যের ভাষা, বাংলা সাহিত্যে মুসলিম ভাব, মুসলিম সমাজে সাহিত্যচর্চার অন্তরায়, সাহিত্যের উৎকর্ষ সাধনে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা, শিক্ষা ও ধর্মের সম্পর্ক, প্রাথমিক ও স্ত্রীশিক্ষা ইত্যাদি বিষয়ে বক্তব্য রাখেন। শিখার দ্বিতীয় সংখ্যায় এই ভাষণটি মুদ্রিত হয়। ভাষণে সাহিত্যের ভাষা প্রসঙ্গে আবদুর রহমান খান বলেন, ‘বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্যের ভাষা কি হইবে তাহা লইয়া আজ মাথা ঘামাইয়া সময় নষ্ট করিতে যাওয়া নিরর্থক বিড়ম্বনা বৈ আর কি হইতে পারে? … বাংলাকেই বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা বলিয়া গ্রহণ করিতে হইবে এবং তাহাতেই তাহার সাহিত্য প্রকাশ করিতে হইবে।’৪৩ শিখার এই দ্বিতীয় সংখ্যায় আরো যেসব প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় সেগুলো হলো : ‘বাঙলার জাগরণ’ (কাজী আবদুল ওদুদ), ‘সমবায় আন্দোলনে মুসলমানের কর্তব্য’ (খান বাহদুর কমরুদ্দীন আহমদ), ‘মোগলযুগে চিত্রচর্চা’ (আবদুস সালাম), ‘বাঙ্গালার লুপ্ত-শিল্প’ (রকীবউদ্দীন আহমদ), ‘বাঙলার পীরপূজা’ (সৈয়দ আবদুল ওয়াহেদ), ‘মানব মনের ক্রমবিকাশ’ (কাজী মোতাহার হোসেন), ‘ইংরাজি সাহিত্যে রোমান্টিক যুগ’ (কাজী আনওয়ার-উল কাদির), ‘স্থাপত্যচর্চায় মুসলমান’ (আবদুল মঈদ চৌধুরী), ‘মুসলিম ভারতে শিক্ষাচর্চা’ (আতাউর রহমান), ‘বৈদেশিক বাণিজ্য ও বাঙলার মুসলমান’ (এ কে আহমদ খাঁ) এবং ‘নারীজীবনে আধুনিক শিক্ষার আস্বাদ’ (ফজিলতন নেসা)। এই সংখ্যায় প্রকাশিত প্রবন্ধগুলোর শিরোনাম থেকেও পাঠক আজ সহজেই বুঝতে পারবেন মুসলিম সাহিত্য সমাজের অধিবেশনগুলোতে সাধারণত কী ধরনের বিষয় নিয়ে আলোচনা হতো এবং শিখাতে কী ধরনের প্রবন্ধ ছাপা হতো। ‘মানব মনের ক্রমবিকাশ’ শিরোনামের প্রবন্ধটিতে কাজী মোতাহার হোসেন মানব সমাজে ধর্মের উদ্ভব ও বিকাশের বিষয়টিকেও যুক্তির আলোকে বিচার করেছেন।

শিখার এই দ্বিতীয় সংখ্যার সম্পাদকীয়তে (‘নিবেদন’) পত্রিকা প্রকাশে ‘বহু বিলম্ব ঘটা’ এবং ‘অর্থ ও সময়াভাবে’ সব লেখা ছাপতে না পারায় দুঃখ প্রকাশ করা হয়। তবে জানানো হয়, (সাহিত্য-সমাজের অধিবেশনে পঠিত) সেসব লেখার অনেকগুলো ইতিমধ্যে ‘জাগরণ ও সওগাত-এ পত্রস্থ হয়েছে’।৪৪

শিখার তৃতীয় বর্ষ সংখ্যায় (১৩৩৬/ ১৯২৯) ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ নামে মোহিতলাল মজুমদারের একটি প্রবন্ধ ছাপা হয়। এর অল্প কিছুদিন আগে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। মোহিতলাল তাঁর প্রবন্ধে মুসলিম সাহিত্য সমাজের ‘মুসলিম’ নামকরণের সার্থকতা ব্যাখ্যা করে লেখেন, ‘ইংলণ্ড ও আমেরিকা দুই এর ভাষা ইংরাজী, তথাপি সকলেই জানেন – ইংরাজী সাহিত্য ও মার্কিন সাহিত্যে একটা ভাব ও ভঙ্গীগত প্রভেদ স্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছে। এখানে ধর্ম ও ভাষা এক – তথাপি দেশভেদে প্রকৃতিভেদ ঘটিয়াছে – এবং উভয়ের জীবনযাত্রার আদর্শ নানা কারণে ভিন্ন হইয়া দাঁড়াইয়াছে; এই জন্য সাহিত্যে, এমন কি ভাষায় পর্যন্ত একটি বৈশিষ্ট্য ফুটিয়া উঠিয়াছে। বাঙালি মুসলমান ও বাঙালি হিন্দু উভয়ের ভাষা এক, দেশও এক, তথাপি শিক্ষাদীক্ষা এবং আধ্যাত্মিক আদর্শে উভয়ের মধ্যে বিশেষ পার্থক্য রহিয়াছে – এজন্য একের আদর্শ, ভাব ও চিন্তাপ্রণালী ঠিক অন্যের মতো হইতে পারে না। অতএব সাহিত্যে উভয়েরই একটি বিশিষ্ট ভঙ্গি থাকিবে। কিন্তু, এই ভঙ্গির বৈশিষ্ট্য সমাজে ও ধর্মজীবনে যেমনই প্রকটিত হউক, আজ পর্যন্ত সাহিত্যে তাহা কোনো বিশিষ্টরূপ গ্রহণ করিতে পারে নাই। ইহার একমাত্র কারণ, বাঙালী মুসলমান আজ পর্যন্ত সাহিত্যে স্পষ্ট করিয়া আত্মপ্রকাশ করেন নাই – এবং করেন নাই বলিয়াই তাঁহাদের প্রাণের আদর্শটি তেমন জীবন্ত হইয়া উঠে নাই। …’৪৫

একই সংখ্যায় আরো যাঁদের প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় তাঁরা হলেন কাজী আকরম হোসেন (‘আব্বাসীয় যুগ’), কালিকারঞ্জন কানুনগো (‘দারার ধর্মমত’), মোহাম্মদ আবদুর রশীদ (‘ইউরোপীয় সভ্যতায় মুসলিম স্মৃতি’), আবদুর রহমান খাঁ (‘ইউরোপে শিক্ষার আদর্শের ক্রমবিকাশ’), (খানবাহাদুর) কমরুদ্দীন আহমদ (‘কোরানে মানবের স্থান ও অর্থনীতি’), মোখতার আহমদ সিদ্দিকী (‘ফিকাহর উদ্ভব ও পরিণতি’), আকবর উদ্দীন (‘চলার কথা’), ফসীহ্ (‘আরবি ভাষা ও কাব্য’), মমতাজউদ্দীন আহমদ (‘দার্শনিক ইবনে রোশদ’), বিলায়েত আলী খাঁ (‘ইসলাম ও শরীরচর্চা’), নাজিরুল ইসলাম (‘মানব প্রগতি ও মুক্তবুদ্ধি’), শামসুল হুদা (‘কুসংস্কারের একটা দিক’), মোসলেমউদ্দীন খাঁ (‘ময়মনসিংহের গীত’), মোহাম্মদ কাসেম (‘আরবি কাব্য’), কাজী মোতাহার হোসেন (‘ধর্ম ও সমাজ’), কাজী আবদুল ওদুদ (‘বাংলা সাহিত্যের চর্চা’), আবুল হুসেন (‘স্যার সৈয়দ আহমদ’) এবং আবুল ফজল (‘তরুণ আন্দোলনের গতি’)। লক্ষ করার বিষয়, এই তৃতীয় সংখ্যা থেকে শিখায় কোনো কবিতা বা গান আর মুদ্রিত হয়নি।

অন্য চারটি সংখ্যার তুলনায় ক্ষীণ কলেবর চতুর্থ বর্ষ  (১৩৩৭/ ১৯৩০) শিখার প্রথম রচনাটি একটি সংক্ষিপ্ত অভিভাষণ। ১৯৩০ সালে  (চৈত্র ১৩৩৬) কার্জন হলে অনুষ্ঠিত মুসলিম সাহিত্য সমাজের চতুর্থ বার্ষিক সম্মেলনে অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি হিসেবে ড. সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন এটি পাঠ করেছিলেন। তিনি তখন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের প্রধান (পরে উপাচার্য হয়েছিলেন)। ভাষণে তিনি বলেন :

‘সাহিত্য সমাজ’ একদল শক্তিশালী সাহিত্যিক ও চিন্তাশীল লেখক ইতিমধ্যেই গড়িয়া তুলিয়াছে। আশা করা যায় অদূর ভবিষ্যতে এর কর্ম ও সাধনার ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত এবং বহুধা বিভক্ত হইবে। অতীতের স্বপ্ন আমরা বহুদিন দেখিয়া আসিতেছি। আজ আমাদিগকে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিতে হইবে। বর্তমানকে ভিত্তি করিয়া আমাদের স্বপ্নসৌধ গড়িতে হইবে। তবেই আমাদের জয়যাত্রা সফল হইবে।৪৬

এই সংখ্যার দ্বিতীয় রচনা একই অধিবেশনে দেওয়া (খান বাহাদুর) নাসির উদদীন আহমদের সভাপতির ভাষণ। নাসির উদদীন আহমদ ছিলেন তখন কলকাতার অতিরিক্ত চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট। তাঁর ভাষণটি বেশ দীর্ঘ। এতে নানা বিষয়ে তিনি আলোকপাত করেন। আমরা এখানে ভাষণটি থেকে কিছু অংশ উদ্ধৃত করছি : 

যদিও এ যাবৎ আমার সুযোগ ও সৌভাগ্য হয়নি আপনাদের সাহিত্য সমাজে যোগ দিতে, তবুও তিন বৎসরের ‘শিখা’ আমি মনোযোগ সহকারে পাঠ করেছি ও তদ্বারা বিশেষ উপকৃত হয়েছি। মুসলমান সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান ইত্যাদি সম্বন্ধে এমন সুচিন্তিত ও সুলিখিত প্রবন্ধাবলী একত্রে কমই পাঠ করবার সুযোগ হয়েছে। আপনারা যে এরই মধ্যে আপনাদের মহৎ উদ্দেশ্যে এতদূর সফলতা লাভ করতে পেরেছেন তা শ্লাঘণীয়। আপনাদের
সাহিত্য-সমাজ স্বতঃই আমাকে মুসলমানদের গৌরবের ‘ইখওয়ানুসসফা’ ভ্রাতৃমণ্ডলীর [দশম শতাব্দীতে বসরা ও বাগদাদে গড়ে ওঠা একটি বুদ্ধিচর্চা গোষ্ঠী – মো.শ.হা.] কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। …

দেশকে পর করে দিয়ে দেশের ভাষা মাতৃভাষাকেও মুসলমানেরা ঘৃণার চক্ষে দেখেছে। যদি মাতৃভাষার সঙ্গে বাঙালি মুসলমানদের নিবিড়ভাবে পরিচয় থাকত, দেশপ্রেম বোধ হয় অন্তরে তার জাগরিত হত। কিন্তু বাংলাকে সে এতদিন উপেক্ষা করেছে। তাই তার চিন্তাশক্তি প্রসার লাভ করতে পারেনি।৪৭   

এছাড়া সংখ্যাটিতে আর যেসব রচনা ছাপা হয় সেগুলো হলো : ‘প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য দর্শনে জগৎ ও জীবন’ (উমেশচন্দ্র ভট্টাচার্য), ‘প্রাচ্য ও প্রতীচ্য’ (কামাল-উদ্দিন), ‘তরুণের দায়িত্ব’ (ফাতেমা খানম), ‘ধর্ম ও শিক্ষা’ (কাজী মোতাহার হোসেন), ‘বর্তমান বাংলার মহিলা ঔপন্যাসিক’ (করুণাকণা গুপ্তা), ‘গ্যেটে’ (কাজী আবদুল ওদুদ), ‘সাহিত্যে শুচিতা’ (সুরেন্দ্রনাথ মৈত্র), ‘ব্রিটিশ-ভারতে মুসলমান-আইন’ (আবুল হুসেন) এবং ‘মুসলিম জাগরণ’ (নাজির উদ্দিন আহমদ)। এর মধ্যে ‘ধর্ম ও শিক্ষা’ প্রবন্ধে কাজী মোতাহার হোসেন লেখেন, ‘সামনের দিকে চলতে গেলে অন্ধভাবে চললে এগুনো যাবে না – সেখানে গতিশীল বৈজ্ঞানিক উপায়ই অবলম্বন করতে হয়। অবশ্য
ধর্ম-ব্যাপারে ভক্তিরই প্রাধান্য, কিন্তু বিচারশক্তিকে বাদ দিলে সে ভক্তি বেশিদিন টিকতে পারে না। যে ভক্তির মূলে বিচারের নির্দেশ নাই, তা অত্যন্ত দুর্বল ও টলটলায়মান।’ এবং ‘ধর্মশিক্ষা যাতে মানুষকে একদেশদর্শী করে না রাখে, এজন্য ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান, ভূতত্ত্ব, সাহিত্য সমস্তই শেখা দরকার। … ইতিহাসের সহিত পুরাতন কথার, ভূগোল ও বিজ্ঞানের সহিত পৃথিবীর ধর্মোক্ত  আকৃতি ও গতির, ভূতত্ত্বের সহিত পৃথিবীর বয়সের, এবং সাহিত্যের সহিত ধর্মনীতির কিছু কিছু বিরোধ থাকতে পারে। এই বিরোধকে এড়িয়ে না চলে, ধীরভাবে এগুলি বিচার করে দেখাই প্রকৃষ্ট উপায়। সৎশিক্ষার লক্ষণ এই যে তাতে স্বাধীনভাবে সব বিষয় চিন্তা করে দেখবার ক্ষমতা জন্মে; তাতে মানুষের দৃষ্টি তীক্ষè হয় এবং মোটের উপর সে সর্বাংশে উৎকৃষ্ট জীবন যাপন করে।’৪৮

উল্লেখ্য, শিখার এই চতুর্থ সংখ্যাটি প্রকাশের আগেই আবুল হুসেন সাহিত্য-সমাজের সম্পাদক পদ থেকে সরে দাঁড়ান। অতঃপর, চতুর্থ বর্ষের বাকি সময়ের জন্য, সে-পদে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন আবদুর রশীদ। পত্রিকা সম্পাদকতার দায়িত্বও তিনিই পালন করেন। এই সংখ্যায় পত্রিকার কলেবর হ্রাসের পেছনে সাহিত্য-সমাজ বা শিখার সঙ্গে আবুল হুসেনের সম্পর্কচ্যুতি বা অন্তত প্রকাশ্য নিষ্ক্রিয়তার কোনো প্রভাব ছিল কি না জানা যায় না। তবে সম্ভাব্য একটি কারণ তা হতে পারে।

আবুল ফজলের সম্পাদনায় প্রকাশিত শিখার পঞ্চম সংখ্যায় রীতি অনুযায়ী সাহিত্য-সমাজের পূর্ববর্তী বার্ষিক অধিবেশনের অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতির অভিভাষণ ও অধিবেশন-সভাপতির ভাষণ ছাড়াও মোট তেরোটি প্রবন্ধ ছাপা হয়। অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি আবদুর রব চৌধুরী ছিলেন তখন ঢাকার ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজের ইংরেজির অধ্যাপক। তিনি তাঁর অভিভাষণে বলেন, ‘ভাষা-সমস্যার পূর্ণ সমাধান প্রকৃতভাবে এখনও আমাদের হইয়া উঠে নাই। হয়ত তর্কের খাতিরে যেন বিশেষ দয়াপরবশ হইয়া আমরা স্বীকার করি যে বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। কিন্তু এই কথার পূর্ণ অনুভূতি আমাদের মনে এখনো জাগে নাই। বাংলা ভাষাকে এখনও আমরা অন্তরের সহিত নিজের বলিয়া গ্রহণ করিতে শিখি নাই। কাজেই বাংলা সাহিত্যে আমাদের দান আজও এরূপ নগণ্য।’৪৯ উক্ত ভাষণে তিনি আরো দুটো গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিলেন : (১) ‘লেখ্যভাষা ও কথ্যভাষার অতি নিকট সম্বন্ধ। লেখ্যভাষা কথ্যভাষা হইতে যতই দূরে চলিবে, ততই উহা আড়ষ্ট ও প্রাণহীন হইবে। লেখ্যভাষা যতই কথ্যভাষার নিকটবর্তী হইবে ততই উহা সতেজ, সহজ ও সুন্দর এবং ততই কথ্যভাষাকে আদর্শের দিকে টানিয়া তুলিতে পারিবে; এবং কথ্যভাষার বহুরূপী রূপকে একত্বের দিকে টানিয়া আনিবে।’ (২) ‘মুসলমান-সম্প্রদায়ই প্রকৃতপক্ষে বাংলার কৃষক। মুসলমান কৃষকের আশা ও আকাঙ্ক্ষায় সোনার বাংলা সোনার ফসলে ভরিয়া উঠে। মুসলমান সাহিত্যিকদের এই বিপুল আশা ও আকাক্সক্ষায় কি সোনার বাংলা সোনার সাহিত্যে ভরিয়া উঠিবে না?’৫০ আর হাকিম হাবিবুর রহমান তাঁর ভাষণের এক জায়গায় মুসলিম সাহিত্য সমাজের সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমরা বাঙালি মুসলমান ভারতের সমগ্র মুসলমান-জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের অধিক, অথচ আমরাই সর্বপ্রকারে অবনতির গভীর তলে পতিত আছি। কিন্তু আফসোস করিয়া আর কি লাভ হইবে। আপনারা একদল তরুণ কর্মক্ষেত্রে অগ্রসর হইতেছেন, এর চাইতে আশা ও আনন্দের কথা আর কি হইতে পারে?’৫১

পত্রিকার এই সংখ্যায় পত্রস্থ প্রবন্ধগুলো হলো : ‘নাস্তিকের ধর্ম’ (কাজী মোতাহার হোসেন), ‘সভ্যতার উত্তরাধিকার’ (কামাল উদ-দীন), ‘ভারতের আদর্শ’ (আলী নূর), ‘আল-বেরুণী’ (মোহাম্মদ আবদুল ওদুদ), ‘ইউরোপে এখানে ওখানে কিছুদিন’ (আবদুল হাকিম), ‘আমাদের রাজনীতি’ (আবুল  হুসেন), ‘মোহাদ্দেস-প্রসঙ্গ’ (আবুয-জোহা নূর আহমদ), ‘মুসলিম নারীর কথা’ (ডাক্তার শামস-উদদীন আহমদ), ‘হিন্দু-মুসলমানের কথা’ (মোহাম্মদ আবদুর রশীদ), ‘রবীন্দ্রনাথ ও বৈরাগ্য-বিলাস’ (মোতাহের হোসেন চৌধুরী), ‘স্বাধীন ভারতের দাস’ (নাজির উদ্দিন আহমদ), ‘মিলন-সৌধ’ (মোসলেম উদ্দিন খাঁ) এবং ‘পাটের কথা’ (আবদুল ওহাব)। এর মধ্যে কাজী মোতাহার হোসেন তাঁর ‘নাস্তিকের ধর্ম’ প্রবন্ধে লেখেন, ‘স্বর্গ-নরকে বিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও সংসারে এত পাপাচরণ কেন, এটি বাস্তবিকই বড় আশ্চর্যের বিষয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে, অধিকাংশ লোকই মুখে বিশ্বাস করে, হৃদয়ে করে না। উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া ধনের যেমন প্রকৃত কদর হয় না, বিশ্বাসেরও তাই। আপন চেষ্টার দ্বারা, চিন্তার দ্বারা, সাধনার দ্বারা  আয়ত্ত না করলে কোনো জিনিসই আমাদের নিজস্ব হয় না। কিন্তু সংসারে অধিকাংশ লোকই অন্যের চোখে দেখে, অন্যের বুদ্ধিতে ভাবে, অন্যের অনুভূতির স্পন্দনকে নিজের অনুভূতি বলে ভুল করে। …’৫২ আর আবুল হুসেন তাঁর ‘আমাদের রাজনীতি’ প্রবন্ধে স্বাতন্ত্র্যনীতির বিরোধিতা করতে গিয়ে লেখেন, ‘… ‘সাহিত্য-সমাজে’র তরুণ বন্ধুদের নিকট আমার এই আবেদন যে, রাষ্ট্রীয় অধিকার মানুষের বড় অধিকার, সে-অধিকারকে সার্থক বা চরিতার্থ না করতে পারলে মানব-জীবনের কোনো সাধনাই সাফল্যমণ্ডিত হয় না, কাজেই সে-অধিকারকে আয়ত্ত করবার সাধনার চেয়ে কোনো সাধনাই মহত্তর হতে পারে না। … কিন্তু রাষ্ট্রীয় অধিকার ভিক্ষা করে অর্জন করা যায় না। সে অধিকার লাভের জন্য সর্বোচ্চ ও সর্বশ্রেষ্ঠ মূল্য দিতে হয়। …’৫৩

পঞ্চম সংখ্যার পর শিখার প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়। যদিও এরপরও আরো অন্তত পাঁচ বছর মুসলিম সাহিত্য সমাজের কর্মতৎপরতা – আলোচনা সভা, অনুষ্ঠান ও বার্ষিক অধিবেশন – অব্যাহত ছিল। সাহিত্য-সমাজের ষষ্ঠ বার্ষিক অধিবেশন হয় ১৯৩২ সালের মার্চ মাসে, কার্জন হলে। কলকাতা থেকে এসে আবুল হুসেন সে-অধিবেশনে যোগ দেন। অধিবেশনে তিনি অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। এ-উপলক্ষে প্রদত্ত ভাষণে তিনি মুসলিম সাহিত্য সমাজ ও শিখা পত্রিকার ভূমিকা বিষয়ে বলেন :

… এই ‘সাহিত্য-সমাজ’ বঙ্গীয় মুসলমান সমাজে এক নবযুগের সূচনা করেছে তাতে সন্দেহ নাই। …

এই সমাজের মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে ‘চিন্তা-চর্চা’। মানুষের জীবন নিয়ত গতিশীল ও পরিবর্তন প্রিয়। চিন্তা সেই গতির অগ্রদূত। বাঙলার মুসলমান সমাজে জীবন-স্রোত রুদ্ধ। সেই জীবন সক্রিয় ও গতিশীল করতে হলে চিন্তা-চর্চার প্রয়োজন। এই চিন্তাই সাহিত্যের পরিপুষ্টি সাধন করবে। সাহিত্য সৃষ্টি হলেই সমাজের কর্মধারা চারিদিকে উৎসারিত হবে।

গত ছয় বৎসর এই সমাজে চিন্তা-চর্চা হয়েছে। ‘শতকরা পঁয়তাল্লিশ’ হতে মিশ্র নির্বাচন পর্যন্ত কোনো বিষয়েই এই সমাজ আলোচনা করতে ভীত বা কুণ্ঠিত হয় নাই। আপনারা মেহেরবানি করে যদি সমাজের পাঁচ বৎসরের ‘শিখা’ পড়েন তাহলেই বুঝতে পারবেন যে, এই সমাজ জীবনকে seriously নিয়েছে – জমিজেরাত ঘরবাড়ি বন্ধক রেখে, ঘৌড়দৌড় খেলে ও পোলাও-কোরমা খেয়েই জীবন ফুৎকারে উড়িয়ে দিতে চায় না। …

একটি প্রতিষ্ঠানের পূর্ণ বিকাশের পক্ষে ছয় বৎসর অতি সামান্য সময়। বিশেষত এই ছয় বৎসরের মধ্যে এই সমাজ উৎসাহ স্থলে পেয়েছে তিরস্কার, সাহায্য স্থলে পেয়েছে গালি। যাঁরা সাহায্য করেছেন তাঁদেরও অনেকে প্রকাশ্যে সাহায্য করতে সাহসী হন নাই। তবু আমি আনন্দের সাথে ঘোষণা করছি যে, যাঁরা এই ‘সমাজে’র পৃষ্ঠপোষক তাঁদের সংখ্যা নেহাৎ কম নয়। তাঁরা সংঘবদ্ধ হয়ে দাঁড়ালে ‘সমাজে’র ভবিষ্যৎ যে উজ্জ্বল হবে সে বিষয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করা কিছুমাত্র কঠিন নয়।৫৪

দেখা যায় শিখার পাঁচটি সংখ্যার মধ্যে তিনটিতেই ‘শুদ্ধিপত্র’ সংযোজিত হয়েছে।৫৫ আগের দিনে অনেক বই ও সাময়িকপত্রে যেমনটা দেখা যেত। যা লেখক-সম্পাদক-প্রকাশকদের বানান তথা ভাষা সচেতনতার পরিচয় দেয়। বর্তমানে বই বা পত্রিকায় যে বানান বা ভাষার ভুল থাকে না তা নয়। বরং অনেকক্ষেত্রে বেশি পরিমাণেই থাকে। তবে ‘সৌন্দর্যবোধ’ থেকে প্রকাশকরা এই কর্তব্যটি এড়িয়ে যান। শিখায় এই ‘শুদ্ধিপত্র’ যুক্ত হয় পত্রিকার একেবারে গোড়ায়, অর্থাৎ সৌন্দর্যের চেয়ে শুদ্ধতা সম্পাদক-প্রকাশকদের কাছে অধিক গুরুত্ব পেয়েছিল।

ছয়

শিখার দ্বিতীয় সংখ্যায় মুদ্রিত মুসলিম সাহিত্য সমাজের ‘দ্বিতীয় বর্ষের কার্যবিবরণী’ থেকে অধিবেশনে পঠিত ‘প্রথম প্রবন্ধ’ হিসেবে আবুল হুসেনের ‘আদেশের নিগ্রহ’-এর নাম পাওয়া যায়। যদিও লেখাটি শিখায় ছাপা হয়নি। মুসলিম সাহিত্য সমাজের অধিবেশনের পর প্রবন্ধটি আবার কলকাতার কারমাইকেল হোস্টেলের এক আলোচনাসভায় পঠিত হয়। ছাপা হয়েছিল ঢাকা থেকে প্রকাশিত ও যোগেশচন্দ্র

দাস-সম্পাদিত মাসিক শান্তির আশ্বিন ১৩৩৬ সংখ্যায় (একই সংখ্যায় কবি জসীম উদ্দীনের রাখালী কাব্যগ্রন্থের একটি আলোচনা লিখেছিলেন আবুল ফজল৫৬)। শান্তিতে প্রবন্ধটি প্রকাশিত হওয়ার পর সেই একই প্রবন্ধের কতকাংশ সাপ্তাহিক বাংলার বাণীতে সংকলিত বা পুনর্মুদ্রিত হয়।৫৭ ‘আদেশের নিগ্রহ’ শিরোনামের এই প্রবন্ধটিতে আবুল হুসেন ধর্ম প্রসঙ্গে কিছু মন্তব্য করেন, যা সমাজের রক্ষণশীল অংশের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। আবুল হুসেনের এই প্রবন্ধের তীব্র সমালোচনা করে মাসিক মোহাম্মদীতে (অগ্রহায়ণ ১৩৩৬) লেখা হয় :

আলোচ্য প্রবন্ধে এছলাম ধর্মের উপর যেরূপ আক্রমণ চালান হইয়াছে, তাহাতে আর্যসমাজের ও খৃষ্টান মিশনারীরা তাঁহার নিকট হার মানিতে বাধ্য হইবে। মজার কথা এই যে, এই শ্রেণীর লোকদিগকে বাছিয়া বাছিয়া, আমাদের ভাবী বংশধরদিগের শিক্ষক ও আদর্শরূপে নির্বাচন করা হইয়া থাকে – মুছলমান বলিয়া।৫৮

‘শিক্ষক’ বলতে এখানে বলা বাহুল্য আবুল হুসেন ও কাজী আবদুল ওদুদকে বোঝানো হয়েছে। তাঁদের দুজনকে এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কারের দাবি জানানো হয়। যদিও কাজী ওদুদ আসলে বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়, ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজে চাকরি করতেন আর আবুল হুসেনও ততদিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি ছেড়ে জজকোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করেছেন (শেষোক্ত বিষয়টি নিয়ে এই প্রবন্ধের পরের অংশে আমরা কিঞ্চিৎ আলোকপাত করেছি), হতে পারে মোহাম্মদীর সেটা জানা ছিল না কিংবা বিতর্ক সৃষ্টির উত্তেজনায় তারা এতে মনোযোগ দেয়নি। আবুল হুসেনের প্রবন্ধের এই ‘ধর্মবিরোধী’ মন্তব্য নিয়ে সমালোচনা-বিতর্কের মাঝেই এ নিয়ে ঢাকার আহসান মঞ্জিলে এক বিচারসভার আয়োজন করা হয়। ইতোমধ্যে আবুল হুসেনের প্রবন্ধের বিষয়বস্তু উর্দুতে অনুবাদ (সঠিক বা বেঠিক যেভাবেই হোক) করে তা ঢাকার নবাব পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের হাতে পৌঁছে দেওয়া হয়। ঢাকা ইসলামিয়া আঞ্জুমান অফিসে অনুষ্ঠিত সে-বিচারসভায় উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের চাপের মুখে আপন অপরাধ স্বীকার করে আবুল হুসেন একটি ‘একরারনামা’ বা স্বীকারোক্তি পত্র লিখে দিতে বাধ্য হন। তাতে তিনি লেখেন, ‘ঐ প্রবন্ধের ভাষা দ্বারা আমি মুসলমান ভ্রাতৃবৃন্দের মনে যে বিশেষ আঘাত দিয়াছি, সেজন্য আমি অপরাধী।’ (ঘটনাটি আমাদেরকে সপ্তদশ শতাব্দীতে রোমান ধর্ম-আদালতের সামনে গ্যালিলিওর আপন দোষ স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়ার ঘটনা মনে করিয়ে দেয়।)

আপন বিশ্বাসের বিরুদ্ধে গিয়ে এই আপোস বা নতিস্বীকার, একে আবুল হুসেন তাঁর নৈতিক পরাজয় বলেই বিবেচনা করেছিলেন। এ-অবস্থায় বিবেকের গ্লানি নিয়ে একদিনও তিনি সাহিত্য-সমাজের সম্পাদকের পদ আঁকড়ে থাকা উচিত মনে করেননি। পরদিনই (৯ই ডিসেম্বর ১৯২৯) তিনি লিখিতভাবে ওই পদে ইস্তফা দেন। পদত্যাগের ‘আসল উদ্দেশ্য’ বর্ণনা করে তিনি লেখেন, ‘‘সাহিত্য-সমাজে’র মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল চিন্তা করা। কিন্তু বর্তমান মুসলমান সমাজে চিন্তা-চর্চা করা অসম্ভব বলে মনে করি। আর সম্ভব হলেও যে-উপায়ে চিন্তা-চর্চা করলে বর্তমান মুসলমান সমাজের বাহবার পাত্র হওয়া যায়, তাতে চিন্তা-চর্চার মূল উদ্দেশ্যটি সার্থক হয় না, বরং তাতে চিন্তা চর্চাই রুদ্ধ হয়। সম্প্রতি আমার ‘আদেশের নিগ্রহ’ নিয়ে যে-আন্দোলন হয়েছে, তাতে আমি এটুকু বুঝতে পেরেছি যে, সমাজের প্রকৃত কল্যাণাকাক্সক্ষী দার্শনিকের কথায় কেউ কর্ণপাত করবে না, বরং তাঁর কথার উল্টা অর্থ করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করবে।’৫৯ আবুল হুসেনের লেখা এই পদত্যাগপত্রটি ‘একখানি পত্র’ শিরোনামে মাসিক সঞ্চয় পত্রিকায় (পৌষ ১৩৩৬) প্রকাশিত হয়। আহসান মঞ্জিলের বিচারসভায় তাঁর সঙ্গে যা ঘটেছিল তার বিবরণ দিয়ে আবুল হুসেন উক্ত পদত্যাগপত্রে আরো

লেখেন :

গতকল্য সন্ধ্যার পর ‘আহসান-মন্জিলে’ একটি ছোটখাট মজলিস হয়েছিল। ঢাকার মুসলমান সমাজের ৎবঢ়ৎবংবহঃধঃরাব লোক অনেকে সেখানে ছিলেন। তাঁদের নিকটে উর্দুতে ‘আদেশের নিগ্রহ’ প্রবন্ধটির অর্থ করা হয়েছে। তাতে সমবেত ব্যক্তিবর্গ একবাক্যে যে রায় দিলেন, সেটা এই – আমি ইসলামের (?) শত্রু। ইসলামকে নিয়ে উপহাস করেছি। মুসলমানের কল্যাণ আমি চাই না। অন্য সম্প্রদায়ের নিকট মুসলমান সমাজকে ঘৃণ্য বলে প্রতিপন্ন করবার জন্য এই প্রবন্ধ লিখেছি, তা না হলে ‘শান্তি’তে (সম্পাদক যোগেশচন্দ্র দাস) ঐ লেখাটি প্রকাশিত হবে কেন?

এই রায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা নিরর্থক। কালই এর পুনর্বিচার করবে। তবে এখন বর্তমান মুসলমান সমাজের মধ্যে থেকে যখন আমি কাজ করতে চাই, তখন বাধ্য হয়ে আমাকে এই রায় মাথা পেতে নিতে হবে এবং আমি নিয়েছি। আমি বলেছি – ‘আমি অপরাধী (?)।’ এরপর আর ‘সাহিত্য-সমাজে’র সম্পাদক থাকা তো দূরের কথা, সভ্য থাকাও আমি সঙ্গত মনে করি না। বর্তমান মুসলমান সমাজেকে নিয়ে কি উপায়ে কল্যাণের পথ প্রশস্ত করা যায়, তারই চিন্তা করা ছাড়া গত্যন্তর কি?৬০

এই ‘দোষ স্বীকার’ বা ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি নিয়ে অন্যত্র আমি [বর্তমান প্রবন্ধকার] যা লিখেছি এখানে তা উদ্ধৃত করা প্রাসঙ্গিক মনে করছি :

আবুল হুসেন-কাজী ওদুদদের এই ‘আপোস’ বা পরাজয়ের প্রেক্ষিতটি আমরা বুঝতে পারব না যদি না সেদিনকার ঢাকার সমাজজীবনে নবাব পরিবারের প্রভাব-প্রতিপত্তির ব্যাপকতা সম্পর্কে আমাদের ধারণা থাকে। বিশ^বিদ্যালয়সহ ঢাকার বিশেষত মুসলমান জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক, সামাজিক, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক জীবন এই শতাব্দীর তৃতীয় দশক পর্যন্ত বলতে গেলে পুরোপুরিভাবে নবাবদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতো। ফলে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজে’র উদ্দেশ্যের সঙ্গে আদর্শগতভাবে যাঁরা সহানুভূতিশীল ছিলেন, সংঘাতময় পরিস্থিতিতে তাঁদেরও অনেকে প্রকাশ্যে তার সমর্থনে এগিয়ে আসেননি।৬১

আবুল হুসেনের ‘আদেশের নিগ্রহ’ প্রবন্ধ সম্পর্কে মোহাম্মদীতে প্রকাশিত সমালোচনার জবাবে আবদুল কাদির ‘শাস্ত্র-বাহকের হুমকি’ নামে একটি নিবন্ধ লেখেন, যা শান্তি পত্রিকারই অগ্রহায়ণ ১৩৩৬ সংখ্যায় মুদ্রিত হয়। আবদুল কাদির উক্ত নিবন্ধে মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ এবং তাঁর সাপ্তাহিক ও মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকা দুটির বিরুদ্ধে প্রধান যে অভিযোগটি করেন তা হলো, তারা আবুল হুসেনের মূল প্রবন্ধটি না পড়েই, বাংলার বাণীতে প্রকাশিত তার উদ্ধৃতাংশের ভিত্তিতে লেখকের সমালোচনা করেছেন। আর একে আবদুল কাদির ‘সাংবাদিক সততার বিচারে ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ’ বলে অভিহিত করেন। নিবন্ধটিতে আবদুল কাদির আরো যা লিখেছিলেন তাও এখানে উদ্ধৃতিযোগ্য :

আবুল হুসেন সাহেবের লেখাটি ‘হিন্দু পত্রে প্রকাশিত’ হইয়াছে বলিয়া ‘মোহাম্মদী’-সম্পাদক তাঁহার প্রতি বক্রদৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়াছেন। কিন্তু জিজ্ঞাসা করি, এই জন্য মুসলমান পত্রিকাওয়ালাদের কি লজ্জিত হওয়া উচিত নয়? বিশেষতঃ মোহাম্মদীর এই কথা বলিয়া রক্তচক্ষু প্রদর্শন করা নির্লজ্জতার পরাকাষ্ঠা দেখান নয় কি? … (১) আবুল হুসেন সাহেবের প্রেরিত ‘মোস্তফা চরিতের সমালোচনা’, (২) ‘শতকরা পঁয়তাল্লিশের জের’ নামক প্রতিবাদের প্রতিবাদ, (৩) কাজী আবদুল ওদুদ সাহেবের  ‘মোহাম্মদীর ধৃষ্ঠতার পরাকাষ্ঠা’ শীর্ষক আলোচনার প্রতিবাদ ইত্যাদি মোহাম্মদীতে প্রকাশার্থ পাঠান হইলে ‘মোহাম্মদী’ সে-সমস্ত প্রকাশিত করেন নাই, উপরন্তু লেখা ফেরৎ পাঠাইবার ডাকটিকেট পুনঃ পুনঃ পাঠান সত্ত্বেও সে-সমস্ত লেখা ফেরৎ পর্যন্ত পাঠান নাই। মুসলমান-পরিচালিত পত্রিকায় স্থান না পাইয়া যদি কোনো লেখক তাঁহার রচনা হিন্দু পত্রিকায় প্রকাশ করেন, তাহাতে রচনা-ধৃত সত্যের কোনো পরিবর্তন ঘটে না। …৬২

‘আদেশের নিগ্রহ’ নিয়ে মোহাম্মদীর ওই সমালোচনা ও আহসান মঞ্জিলের বিচারসভার পর প্রথমে মুসলিম হলে এবং পরে লিটন হলে (সাবেক ঢাকা ও বর্তমান শহীদুল্লাহ হল) ও কার্জন হলে সাহিত্য-সমাজের সভা অনুষ্ঠান নিষিদ্ধ হয়ে যায়। এছাড়াও আরো নানারকম বাধা ও অপপ্রচারের মোকাবিলা করতে হয় তাঁদের। এখানে এমন একটি অপপ্রচারের উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। তৃতীয় বর্ষ অবধি শিখা পত্রিকার পাঠ শুরুর পৃষ্ঠার শিরোভাগে একটি ছবি ছাপা হতো। জানা যায় সে-ছবিটিও ছিল আবুল হুসেনের আঁকা। ছবির একদিকে ছিল রেহেলে রাখা একটি উন্মুুক্ত কোরআন আর অন্যপাশে আগুনের শিখা। এতে কোরআনকে জ্ঞানের আর অগ্নিশিখাকে আলোর প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়। কিন্তু বিরুদ্ধবাদীরা ছবিটির অপব্যাখ্যা দেয় এভাবে যে, অগ্নিশিখা অর্থাৎ পৌত্তলিকতা কোরআনকে গ্রাস করছে। চতুর্থ বর্ষ (১৯৩০) শিখা থেকে সে-ছবিটি বাদ দেওয়া হয়।  

আবুল হুসেনই ছিলেন মুসলিম সাহিত্য সমাজের মূল সংগঠক। সাহিত্য-সমাজের সম্পাদক পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার পরও নেপথ্য থেকে তিনি এই সংগঠন ও তার মুখপত্র শিখা প্রকাশনার কাজে তাঁর ভূমিকা অব্যাহত রাখেন। তবে ১৯৩২ সালে তাঁর কলকাতা হাইকোর্টে আইনব্যবসায় যোগদানের ফলে মুসলিম সাহিত্য সমাজের কার্যক্রমে শিথিলতা আসে। যদিও এরপরও আরো চার বছর সাহিত্য-সমাজের অধিবেশন হয়। শিখার সর্বশেষ (পঞ্চম) সংখ্যাটি প্রকাশিত হয় ১৯৩১ সালে অর্থাৎ তাঁর কলকাতায় স্থায়ী হওয়ার বছরখানেক আগে। এ-সংখ্যায়ও আবুল হুসেনের একটি প্রবন্ধ ‘আমাদের রাজনীতি’ প্রকাশিত হয়, যার উল্লেখ আমরা ইতিপূর্বে করেছি। সামাজিক বাধা বা প্রতিকূলতা ছাড়াও পরবর্তী সময়ে মুসলিম সাহিত্য সমাজের কার্যক্রমে শৈথিল্য এবং একপর্যায়ে তার গতিরোধের পেছনে কিছু বাস্তব কারণও কাজ করেছিল। এ-সম্পর্কে আবুল ফজল লিখেছেন, ‘কাজী আবদুল ওদুদ কলকাতায় বদলি হয়ে গেলেন। আবুল হুসেন সাহেব বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে প্রথমে ঢাকা বারে, পরে কলকাতা হাইকার্টে যোগ দিলেন। উৎসাহী ও কর্মী ছাত্ররা পাস করে বিশ্ববিদ্যালয় তথা ঢাকা ছেড়ে নানা কর্মক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়লেন। মুসলিম সাহিত্য সমাজের নেতৃস্থানীয়দের মধ্যে একমাত্র সবেধন নীলমণি কাজী মোতাহার হোসেন রইলেন ঢাকায়।’৬৩   

সাত

মুসলিম সাহিত্য-সমাজের সে অর্থে কোনো সাংগঠনিক কাঠামো ছিল না। গোষ্ঠী হিসেবেও এটি দীর্ঘমেয়াদ লাভ করেনি। শিখা পত্রিকারও মাত্র পাঁচটিই সংখ্যা বেরিয়েছিল। সাহিত্য-সমাজের সঙ্গে গোড়া থেকে কিংবা কোনো না কোনো পর্যায়ে জড়িত ছিলেন এমন সকলেই যে স্বাধীন চিন্তাচর্চা বা বুদ্ধিমুক্তির চেতনাটিকে শেষ পর্যন্ত লালন বা ধারণ করেছিলেন তা  নয়। অন্নদাশঙ্কর রায় ও শিবনারায়ণ রায়ের মতো কেউ কেউ মুসলিম সাহিত্য সমাজ বা শিখাগোষ্ঠীর অবদান বিচার করতে গিয়ে উনিশ শতকে ডিরোজিওর শিষ্য ইয়ং-বেঙ্গলদের সঙ্গে তাঁদের তুলনা করেছেন।৬৪ তো সেই ইয়ং-বেঙ্গলদেরও অনেকে উত্তর-জীবনে কক্ষচ্যুত হয়েছিলেন। কেউ কেউ হয়ে উঠেছিলেন এমনকি রক্ষণশীলতার প্রতিভূ। এটাই সমাজের, ইতিহাসের নিয়ম। মুসলিম সাহিত্য-সমাজ বা শিখাগোষ্ঠীর বেলায়ও এই নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটেনি। (ড.) মুহম্মদ শহীদুল্লাহ মুসলিম সাহিত্য সমাজের প্রথম অর্থাৎ প্রতিষ্ঠা অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেছিলেন। ১৯২৮ সালে ফ্রান্স থেকে ডি-লিট করে ফিরে আসার পর সাহিত্য-সমাজের পক্ষ থেকে তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। পরের বছর সাহিত্য-সমাজের তৃতীয় বার্ষিক অধিবেশনেও অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন তিনি। কিন্তু আবুল হুসেন ও কাজী আবদুল ওদুদের বিশেষ করে
ধর্ম-সংক্রান্ত কিছু বক্তব্যের সঙ্গে একমত হতে না পেরে কিংবা সেসব বক্তব্যের ফলে সৃষ্ট সামাজিক আলোড়নের প্রতিক্রিয়ায় তিনি পরে এই গোষ্ঠীর কার্যক্রম থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেন। কাজী মোতাহার হোসেনের লেখা থেকে আমরা একথা জানতে পারি।৬৫ এর আগেও অবশ্য ১৯১৯ সালে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-সমিতির এক অধিবেশনে আবুল হুসেন তাঁর পঠিত প্রবন্ধে (‘সুদ ও রেবা’) সুদের যৌক্তিকতা তুলে ধরলে শহীদুল্লাহ তাঁর
সে-বক্তব্যের বিরোধিতা করেন। উল্লেখ্য যে, শহীদুল্লাহই ছিলেন সে-সভার সভাপতি।৬৬ বস্তুত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের (১৯২১) পর শিক্ষকতার পাশাপাশি ড. শহীদুল্লাহ ইসলাম প্রচারকেই তাঁর জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন।  

আবদুস সালাম খাঁ ছাত্রাবস্থায় মুসলিম সাহিত্য সমাজ ও  Anti Purdah League-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
সে-সময় ভালো খেলোয়াড় ও সুবক্তা হিসেবে তাঁর পরিচিতি ছিল। মুসলিম সাহিত্য সমাজের বিভিন্ন অধিবেশনে তিনি ‘নাট্যাভিনয় ও মুসলমান সমাজ’, ‘ভারতীয় মুসলমানের রাজনীতি’ এবং ‘সেভিং ব্যাংকের সুদ’ নামে কয়েকটি প্রবন্ধ পাঠ করেন। একইভাবে সাহিত্য-সমাজের পঞ্চম বর্ষের তৃতীয় অধিবেশনে (১৪ই ডিসেম্বর ১৯৩০) পঠিত তাঁর ‘সেভিং ব্যাংকের সুদ’ প্রবন্ধেও তিনি সঞ্চয়ের সুদ না নিয়ে মুসলমান সমাজ কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তা তুলে ধরেন।৬৭ উত্তরজীবনে আবদুস সালাম খাঁ আইনজীবী ও রাজনীতিক হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। যুক্তফ্রন্ট (১৯৫৪) থেকে নির্বাচিত হয়ে প্রাদেশিক মন্ত্রীও হয়েছিলেন। তাঁর পূর্তমন্ত্রিত্বের আমলেই শহিদ মিনারের পরিকল্পনা ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। ছিলেন আওয়ামী মুসলিম লীগের সহ-সভাপতি। কিন্তু দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেওয়ার কারণে তিনি মূল দল ছেড়ে যান। পরে স্বল্পসময়ের জন্য ফিরে এলেও, আবার পিডিএম হয়ে পিডিপিতে যোগ দেন (১৯৬৯)। তিনি ছিলেন পিডিপির প্রাদেশিক কমিটির সভাপতি। মাঝে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় (১৯৬৮) তিনি আসামিপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি হয়েছিলেন।

১৯৭০-এ পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে পিডিপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন। তবে রাজনীতিতে দক্ষিণপন্থী অবস্থান নিলেও, ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতায় তাঁর কোনো ভূমিকার কথা জানা যায় না।  

আট

আজ আমাদের সমাজে বুদ্ধিবৃত্তিক সততা ও চারিত্রিক সংহতি বিষয় দুটি যখন দুর্লভ থেকে দুর্লভতর হয়ে উঠছে, তখন আবুল হুসেন ও কাজী আবদুল ওদুদ মুসলিম সাহিত্য সমাজের এই দুই পুরোধার ব্যক্তিগত জীবন আমাদের সামনে অনুপ্রেরণাদায়ী দৃষ্টান্ত হতে পারে। ১৯২৬ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি মুসলিম সাহিত্য সমাজের দ্বিতীয় সাধারণ সভায় আবুল হুসেন ‘শতকরা পঁয়তাল্লিশ’ নামে একটি প্রবন্ধ পাঠ করেছিলেন। প্রবন্ধে তিনি সরকারি চাকরিতে মুসলমানদের জন্য সংরক্ষণ ব্যবস্থার সমালোচনা করে লিখেছিলেন :

[এতে] আমাদের নবীন সম্প্রদায়ের আকাক্সক্ষা ক্ষুদ্র হতে ক্ষুদ্রতর হবে; কর্মস্রোতে ভাটা পড়বে; মন সংকীর্ণ হবে, মস্তিষ্ক শ্রমবিমুখ হবে। তারা জীবন সমস্যার জন্য ক্ষমতা অর্জনে পরাক্সমুখ হবে। সমাজের মধ্যে বিভিন্ন দিক হতে জীবনের স্রোত আনবার সকল চেষ্টা ক্রমে ক্রমে রুদ্ধ ও শিথিল হয়ে যাবে।৬৮

সংরক্ষণ ব্যবস্থার সুফলভোগী শিক্ষিত মুসলমান মধ্যবিত্তের ব্যাপক অংশের কাছে স্বভাবতই আবুল হুসেনের এই অভিমত প্রীতিপদ মনে হয়নি। কারণ যুক্তি ও আত্মসম্মানবোধের চেয়ে বরং উপস্থিত লাভালাভের বিবেচনাটিই তাদের কাছে প্রাধান্য পায়।৬৯ আবুল হুসেনের উক্ত প্রবন্ধটি সাপ্তাহিক মোহাম্মদীতে প্রকাশিত হওয়ার পর একই পত্রিকার ৩১শে বৈশাখ ১৩৩৩ সংখ্যায় আবুল হুসেনের বক্তব্যের সমালোচনা করে একটি লেখা ছাপা হয়, যার লেখক ছিলেন কবি গোলাম মোস্তফা। লেখাটিতে আবুল হুসেনের প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হয় তিনি যে বিশ^বিদ্যালয়ের চাকরিটি করছেন সেটি তো এই সংরক্ষণ ব্যবস্থারই ফল। ‘শতকরা পঁয়তাল্লিশের জের’ নামে আবুল হুসেন লেখাটির একটি জবাব তৈরি করেন ও তা মোহাম্মদীতে প্রকাশের জন্য প্রেরণ করেন। মোহাম্মদী অবশ্য লেখাটি ছাপেনি। পরে মোহাম্মদ কাসেম-সম্পাদিত পূর্বোল্লিখিত মাসিক অভিযান-এর দ্বিতীয় (আশ্বিন ১৩৩৩) সংখ্যায় তা প্রকাশিত হয়। গোলাম মোস্তফার সমালোচনার জবাবে আবুল হুসেন যা লিখেছিলেন তা তাঁর উদার ও যুক্তিবাদী মনোভঙ্গির পরিচয় দেয়। তিনি লিখেছিলেন : 

Concession-এর ফলে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র সংকীর্ণ হয়; আমি যদি অনুগ্রহের ফলে অধ্যাপক না হতাম, তা হ’লে আমার সাধনা সার্থক হতো; কারণ যে-সাধনা ব্যাহত না হয় সে-সাধনা সত্য হয়ে ওঠে না …। সমালোচক সাহেব আমার ত্রুটি দেখিয়ে দিয়ে বন্ধুর কাজই করেছেন।৭০

কথাগুলো লিখেই আবুল হুসেন অবশ্য তাঁর কর্তব্য শেষ করেননি। আপন ‘ত্রুটি’ সংশোধন করতে, কথায় ও কর্মে মিল রাখতে, বিশ^বিদ্যালয় শিক্ষকের নিরাপদ চাকরিটি ছেড়ে ১৯২৮ সালে ঢাকা জজকোর্টে আইনজীবীর অনিশ্চিত পেশা গ্রহণ করেছিলেন। যদিও, আবুল ফজলের লেখা থেকে জানা যায়, ‘একটা সুবৃহৎ পরিবারের বোঝা’ তখন তাঁর ঘাড়ে।৭১ এমন দৃষ্টান্ত আজকের দিনে এবং শুধু আমাদের দেশে কেন, সবকালে সবদেশেই বিরল বলে মনে হয়।

কাজী আবদুল ওদুদের জন্ম বর্তমান বাংলাদেশের ফরিদপুরে। তাঁর পেশা ও সাহিত্যিক জীবনের বড় একটা অংশ কেটেছে ঢাকায়। ছিলেন তখনকার ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজের অধ্যাপক। কিন্তু উপমহাদেশের সাম্প্রদায়িক সমস্যার সমাধান হিসেবে পাকিস্তান দাবিকে তিনি যৌক্তিক মনে করেননি। বাঙালি মুসলমান লেখক-বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে অঙ্গুলিমেয় যে-কয়েকজন আগে বা পরে কখনোই পাকিস্তান আন্দোলনকে সমর্থন করেননি তিনি তাঁদের একজন। দেশভাগের পরও তিনি একাকী কলকাতায়ই রয়ে যান এবং সেখানে বসেই আমৃত্যু (তিনি মারা যান ১৯৭০ সালের ১৯শে মে) সাহিত্যচর্চা ও বুদ্ধিমুক্তির সাধনা করে গেছেন। বাংলা ও ইংরেজিতে অনেক মূল্যবান সাহিত্যকর্মের পাশাপাশি কোরআনের প্রাঞ্জল বঙ্গানুবাদ, জনপ্রিয় বাংলা অভিধান ব্যবহারিক শব্দকোষ এবং হযরত মোহাম্মদ ও ইসলাম-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো তিনি শেষজীবনে সেখানে বসেই সম্পন্ন করেন। তাঁরই মতো ফরিদপুরের আরেক কৃতী সন্তান হুমায়ুন কবিরও দেশবিভাগের পর ভারতে রয়ে যান। তবে লেখক-অধ্যাপকের পরিচয় ছাড়িয়ে তিনি ছিলেন একজন সক্রিয় রাজনীতিক, ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও হয়েছিলেন। কিন্তু কাজী আবদুল ওদুদ ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ সাহিত্যসেবী, আজীবন একাগ্রচিত্তে জ্ঞানসাধনা ও সাহিত্যচর্চাই করে গেছেন।

আবুল হুসেন দীর্ঘজীবী হননি। ১৯৩৮ সালে মাত্র ৪১ বছর বয়সে তিনি প্রয়াত হন। কিন্তু বুদ্ধিমুক্তি আন্দোলনের অন্য পুরোধারা প্রায় সকলেই মুসলিম সাহিত্য সমাজের চিন্তাচর্চার ঐতিহ্যকেই আমৃত্যু কমবেশি ধারণ এবং লেখালেখি ও অন্যান্যভাবে প্রকাশ করেছেন। পাকিস্তান আমলে স্বাধীন চিন্তা, উদার অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সাহসী ও স্পষ্ট বক্তব্য প্রকাশের মাধ্যমে তাঁরা তাঁদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে সমাজে বুদ্ধিজীবীর উচিত কর্তব্য পালনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। এ-প্রসঙ্গে কাজী মোতাহার হোসেন, মোতাহের হোসেন চৌধুরী ও আবুল ফজলের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মোতাহের হোসেন চৌধুরীর প্রবন্ধ-সংকলন সংস্কৃতি-কথা (১৯৫৮) তো উত্তর-প্রজন্মের জন্য মুক্তবুদ্ধি চর্চার ক্ষেত্রে একটি গাইড-বই হয়ে রয়েছে। কাজী মোতাহের হোসেনও তাঁর লেখা বিভিন্ন প্রবন্ধ এবং বক্তৃতা-বিবৃতিসহ প্রাতিষ্ঠানিক-সামাজিক নানা ভূমিকার মাধ্যমে একইরকম দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়ে গেছেন। আর আবুল ফজল তো লেখক হিসেবে তাঁর ভূমিকার জন্য ‘জাতির বিবেক’ অভিধায়ই ভূষিত হয়েছিলেন। আবদুল কাদিরের পরিচয় প্রধানত কবি ও ছন্দবিশেষজ্ঞ হিসেবে। কিন্তু তিনিও তাঁর সম্পাদনাকর্মের মধ্য দিয়ে উত্তরকালের জন্য বুদ্ধিমুক্তি আন্দোলনের চেতনাটিকেই প্রবহমান রাখার প্রয়াস করেছেন। রোকেয়া ও আবুল হুসেনের রচনাবলি সম্পাদনা তাঁর এই দায়িত্বশীলতার প্রমাণ দেয়। এমনকি প্রায় একযুগ (১৯৫২-১৯৬৪) সরকারি সাহিত্য পত্রিকা মাহেনও-এর সম্পাদক পদে নিযুক্ত থাকাকালেও তিনি তাতে পাকিস্তানবাদী ভাষা ও সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গির লেখকদের পাশাপাশি অন্য ধারার লেখকদের রচনাও সযত্নে প্রকাশ করেছেন। ১৯৬৭ সালে রবীন্দ্রসংগীত বিতর্ককালে আবদুল কাদির সরকারি প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ডে কর্মরত ছিলেন। ফলে সে-বিতর্কে সরকারি অবস্থানের প্রকাশ্য বিরোধিতা তিনি করতে পারেননি। তবে, লক্ষ করবার বিষয়, এসময় অন্য অনেকের মতো, সরকারের সমর্থনে দেওয়া লেখক-বুদ্ধিজীবীদের বিবৃতিতেও তিনি স্বাক্ষর করেননি।

নয়

মুসলিম সাহিত্য সমাজ বা শিখাগোষ্ঠীর লেখকরা তাঁদের মতামত প্রকাশে কোথাও যে আতিশয্য বা বাড়াবড়ির পরিচয় দেননি তা নয়। আন্দোলনের সারথিদের বক্তব্যেই পরবর্তীকালে যা স্বীকৃত হয়েছে। যেমন কাজী মোতাহার হোসেন লিখেছেন, ‘কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংস্কারের উন্মাদনায় সাধারণ জনমতের প্রতি সহানুভূতিহীন অবাঞ্ছিত উক্তিও উচ্চারিত হয়েছে।’৭২  আবুল ফজল লিখেছেন, ‘সাহিত্য সমাজের কোনো কোনো সভায় কিছু কিছু উগ্র মতামতও যে প্রকাশ পায়নি তা নয়, অনেক সময় নেহাত অপ্রত্যাশিত ক্ষেত্র থেকেও প্রক্ষিপ্ত হয়েছে এ সব মত।’৭৩ স্মৃতি থেকে তিনি তেমন কিছু মতামত উদ্ধৃতও করেছেন।৭৪ তবে সবকালে সবদেশেই
রাজনৈতিক-সামাজিক বিপ্লবেই হোক কিংবা ভাব-আন্দোলনে এমন কিছু অবাঞ্ছিত বাড়াবাড়ি বা আতিশয্য ঘটে। ইতিহাস তেমন সাক্ষ্যই দেয়।

তথ্যসূত্র

১       আবুল আহসান চৌধুরী (সম্পা.), শিখা : বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের মুখপত্র (প্রতিলিপি-সংকলন), ঢাকা : ২০২৫, পৃ ৬৭।

২       আবুল ফজল, সাহিত্য ও সংস্কৃতি সাধনা, ঢাকা : ১৯৬১, পৃ ৪৪-৪৫।

৩       কাজী মোতাহার হোসেন, ‘ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের স্মৃতি ও অন্যান্য প্রসঙ্গ’, আবুল আহসান চৌধুরী (সম্পা.), কাজী মোতাহার হোসেন রচনাবলী, তৃতীয় খণ্ড,

পৃ ৩১-৩২।

৪       আবুল ফজল, রেখাচিত্র, চট্টগ্রাম : ১৯৬৬, পৃ ১১৬।

৫       ওই, পৃ ১৩৫।

৬       ওই, পৃ ১১৭।

৭       খোন্দকার সিরাজুল হক, মুসলিম সাহিত্য-সমাজ : সমাজচিন্তা ও সাহিত্যকর্ম, ঢাকা : ১৯৮৪, পৃ ১৪৩।

৮      ওই, পৃ ১৪৩।

৯       ওই, পৃ ১৪৬।

১০     আবুল ফজল, প্রাগুক্ত, পৃ ১১৭।

১১      খোন্দকার সিরাজুল হক, প্রাগুক্ত, পৃ ১৪৬।

১২      ওই, পৃ ১৪৬।

১৩     ওই, পৃ ১৪৭।

১৪      আবুল আহসান চৌধুরী (সম্পা.), প্রাগুক্ত, পৃ ৯৮।

১৫     আবুল হুসেন, নির্বাচিত প্রবন্ধ, মোরশেদ শফিউল হাসান (সম্পা.), ঢাকা : ১৯৯৭, পৃ ৪৯-৫০।

১৬     খোন্দকার সিরাজুল হক, প্রাগুক্ত, পৃ ১২২।

১৭     ওই, পৃ ১২২।

১৮     ওই, পৃ ১২৩।

১৯     ওই, পৃ ১২৩-২৪।

২০     ওই, পৃ ১২৩-২৪।

২১      ওই, পৃ ১২৫।

২২     ওই, পৃ ১২৫।

২৩     আবুল ফজল, সাহিত্য ও সংস্কৃতি সাধনা, ঢাকা : ১৯৬১, পৃ ৫৭।

২৪     আবুল ফজল, ‘বুদ্ধির মুক্তি’, নির্বাচিত প্রবন্ধ (মাহবুবুল হক সম্পা.) ঢাকা : ২০০১, পৃ ১২৯।

২৫     ওই, পৃ ৯৯।

২৬     ওই, পৃ ৯৯।

২৭     উদ্ধৃত : খোন্দকার সিরাজুল হক, প্রাগুক্ত, পৃ ১৭৫-৭৬।

২৮     আবুল ফজল, ‘বুদ্ধির মুক্তি’, নির্বাচিত প্রবন্ধ, (মাহবুবুল হক সম্পা.), ঢাকা : ২০০১, পৃ ১২৯।

২৯     উদ্ধৃত : খোন্দকার সিরাজুল হক, প্রাগুক্ত, পৃ ১০৭।

৩০     আবুল ফজল, রেখাচিত্র, পৃ ১৪৮।

৩১     আবুল ফজল, আবুল ফজল রচনাবলী : প্রথম খণ্ড, চট্টগ্রাম : ১৩৮২, পৃ ৫৬৭ ও ৫৬৯।

৩২     আবুল আহসান চৌধুরী (সম্পা.), প্রাগুক্ত, পৃ ৭৩।

৩৩     প্রাগুক্ত, পৃ ৭৫।

৩৪     প্রাগুক্ত, পৃ ৭৬।

৩৫     প্রাগুক্ত, পৃ ৭৮।

৩৬     প্রাগুক্ত, পৃ ৮০-৮১।

৩৭     প্রাগুক্ত, পৃ ৮০।

৩৮     আবুল আহসান চৌধুরী (সম্পা.), প্রাগুক্ত, পৃ ১৩৭।

৩৯     আবুল ফজল, রেখাচিত্র, পৃ ১৩৭।

৪০     ওই, পৃ ১৩৯-৪০।

৪১      আবুল আহসান চৌধুরী (সম্পা.), প্রাগুক্ত, পৃ ৯৯।

৪২     ওই, পৃ ২২১।

৪৩     ওই, পৃ ২২৬।

৪৪     আবুল আহসান চৌধুরী (সম্পা.), প্রাগুক্ত, পৃ ২১৫।

৪৫     ওই, পৃ ৩৮০।

৪৬     আবুল আহসান চৌধুরী (সম্পা.), প্রাগুক্ত, পৃ ৫০৭।

৪৭     ওই, পৃ ৫০৮ ও ৫১৪।

৪৮     ওই, পৃ ৫৫২ ও ৫৫৫।

৪৯     ওই, পৃ ৫৯৮।

৫০     ওই, পৃ ৬০০-০১।

৫১     ওই, পৃ ৬০৭।

৫২     ওই, পৃ ৬২৭।

৫৩     আবুল আহসান চৌধুরী (সম্পা.), প্রাগুক্ত, পৃ ৬৬৪।

৫৪     উদ্ধৃত : খোন্দকার সিরাজুল হক, প্রাগুক্ত, পৃ ১৬৫-৬৬।

৫৫     দেখুন : আবুল আহসান চৌধুরী (সম্পা.), শিখা : বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের মুখপত্র, ঢাকা : পাঠক সমাবেশ, ২০২৫।

৫৬     আবুল ফজল, প্রাগুক্ত, পৃ ১২০।

৫৭     আবদুল কাদির, ‘শাস্ত্র-বাহকের হুমকি’, আবুল হুসেন : নির্বাচিত প্রবন্ধ, পৃ ১৭৫।

৫৮     উদ্ধৃত : খোন্দকার সিরাজুল হক, প্রাগুক্ত, পৃ ১২৫-২৬।

৫৯     উদ্ধৃত : খোন্দকার সিরাজুল হক, প্রাগুক্ত, পৃ ১২৬-২৭।

৬০     ওই, পৃ ১২৭।

৬১     মোরশেদ শফিউল হাসান, বুদ্ধিমুক্তির দায় ও দায়িত্ব, ঢাকা : ২০১৩, পৃ ৩৪।

৬২     ওই, পৃ ১৭৫।

৬৩     আবুল ফজল, নির্বাচিত প্রবন্ধ, পৃ ১৩০।

৬৪     দেখা যেতে পারে : অন্নদাশঙ্কর রায়, বাংলার

রেসেসাঁস, কলকাতা : ১৯৭৪ এবং Shibnarayan Ray, ‘The Sikha (1927-32) Movement : A Note on the Bengali Muslim Intelligentsia in search of modernity’, The Radical Humanist, December 1977 & January 1978.

৬৫     কাজী মোতাহার হোসেন, ‘ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্কে যেমন দেখেছি’, শহীদুল্লাহ সংবর্ধনা গ্রন্থ, ঢাকা : ১৯৬৭, পৃ ১৭১-৭২।

৬৬     মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমান, আত্ম-অন্বেষায় বাঙালি মুসলমান ও অন্যান্য প্রবন্ধ, ঢাকা : ১৯৯৫, পৃ ৮৬।

৬৭     ওই, পৃ ৬১৮।

৬৮     উদ্ধৃত : খোন্দকার সিরাজুল হক, প্রাগুক্ত, পৃ ২০৬।

৬৯     মোরশেদ শফিউল হাসান, ‘ভূমিকা’, আবুল হুসেন : নির্বাচিত প্রবন্ধ, ঢাকা : ১৯৯৭, পৃ ২৫।

৭০     উদ্ধৃত : খোন্দকার সিরাজুল হক, প্রাগুক্ত, পৃ ২০৭।

৭১     আবুল ফজল, ‘মরহুম আবুল হুসেন স্মরণে’, আবুল ফজল রচনাবলী : প্রথম খণ্ড, চট্টগ্রাম : ১৩৮২, পৃ ৬৭৪।

৭২     কাজী মোতাহার মোতাহার হোসেন, ‘আমার সাহিত্যিক জীবনের অভিজ্ঞতা’, কাজী মোতাহার হোসেন রচনাবলী : ১ম খণ্ড (আবদুল হক সম্পা.), ঢাকা : ১৯৮৪।

৭৩     আবুল ফজল, রেখাচিত্র, পৃ ১৩৫-৩৬।

৭৪     দেখুন : ওই, পৃ ১৩৬।