অনুবাদ : আলম খোরশেদ
তৃতীয় কিস্তি
স্টকহোমে একবার এক পার্টিতে গিয়েছিলাম আমি, সেখানে একজন বক্সার উপস্থিত ছিলেন। তিনি কিচেনে বসেছিলেন, তার শারীরিক উপস্থিতি দেখার মতো ছিল, এবং তিনি আমাকে এক সুনিশ্চিত কিন্তু নিরানন্দ হীনম্মন্যতাবোধে ভরিয়ে তুলছিলেন। এমন একটা অনুভূতি যে, আমি তার চাইতে অধমর্ণ। অদ্ভুতভাবে সেই সন্ধ্যাটা আমি যে সঠিক, সেটাই প্রমাণ করেছিল। পার্টির আহ্বায়ক ছিল লিন্দার এক বন্ধু, কোরা, তার ফ্ল্যাটটা ছোট ছিল, ফলে লোকেরা যেখানে-সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করছিল। লিভিংরুমে একটা যন্ত্র থেকে গান ভেসে আসছিল। বাইরে রাস্তাগুলো তুষারে সাদা হয়ে আছে। লিন্দা খুব ভারিক্কিরকম অন্তঃসত্ত্বা, সেটাই সম্ভবত বাচ্চা হওয়ার আগে আমাদের শেষ কোনো পার্টি ছিল, বাচ্চা হওয়ার পর সব পালটে গিয়েছিল, তাই সে ক্লান্ত থাকলেও সেখানে যেতে ও কিছুক্ষণ সময় কাটাতে চেষ্টা করেছিল। আমি একটু ওয়াইন খেয়ে টমাসের সঙ্গে গল্প করছিলাম, যে ছিল আলোকচিত্রী ও গাইয়েরের বন্ধু; সে তার পার্টনার ম্যারির মাধ্যমে কোরাকে চিনত, যে কি না একজন কবি এবং বিশপস আর্নো ফোক স্কুলে কোরার শিক্ষক ছিল। লিন্দার ভারি পেটের জন্য সে টেবিল থেকে ছুটিয়ে আনা একটা চেয়ারে বসে ছিল, সে হাসছিল ও খুশি দেখাচ্ছিল তাকে, এবং আমিই বোধহয় একমাত্র ব্যক্তি ছিলাম, যে লক্ষ করেছে গত কয়েকমাসে তার মধ্যে এক চাপা দীপ্তি ও অন্তর্মুখিতার ছোঁয়া লেগেছে। কিছুক্ষণ পরে সে উঠে দাঁড়ায় ও বাইরে যায়, আমি তার দিকে চেয়ে হাসি এবং আমার মনোযোগ ফেরাই টমাসের দিকে, সে লালচুলো লোকদের জিন বিষয়ে কিছু একটা বলছিল, যাদের সংখ্যা সেই সন্ধ্যায় ছিল চোখে পড়ার মতো।
কেউ একজন দরজা ধাক্কাচ্ছিল।
‘কোরা!’ আমি শুনি। ‘কোরা!’
সেটা কি লিন্দা ছিল?
আমি উঠি এবং হলরুমের দিকে যাই।
দরজা ধাক্কানোর শব্দটা বাথরুমের ভেতর থেকে আসছিল।
‘লিন্দা?’ আমি জিজ্ঞেস করি।
‘হ্যাঁ,’ সে বলে। ‘আমার মনে হয় দরজার তালাটা আটকে গেছে। তুমি কি কোরাকে ডাকতে পারো? এটা খোলার নিশ্চয়ই কোনো কৌশল রয়েছে।’
আমি লিভিংরুমে গিয়ে কোরার কাঁধে টোকা দিই। সে এক হাতে একটা খাবারভর্তি প্লেট ও অন্য হাতে রেড ওয়াইনের গ্লাস ধরে রেখেছিল।
‘লিন্দা বাথরুমে আটকে গেছে,’ আমি বলি।
‘হায় হায়!’ সে বলে, তারপর গ্লাস ও প্লেটখানি নামিয়ে রেখে দৌড়ে যায়।
তারা কিছুক্ষণ আটকে যাওয়া দরজার মধ্য দিয়ে আলাপ-পরামর্শ করে। তাকে যে-নির্দেশগুলো দেওয়া হয় লিন্দা তা অনুসরণ করে, তবে তাতে কোনো কাজ হয় না, দরজাটা আটকেই থাকে। এতক্ষণে ফ্ল্যাটের সবাই এ-পরিস্থিতি বিষয়ে সচেতন হয়ে ওঠে, তাদের মনোভাব একাধারে হাসির ও উত্তেজনার, পুরো এক বাহিনী লোক হলরুমে থেকে লিন্দাকে উপদেশ দেয়, আর কোরা উদ্বিগ্ন ও বিব্রতভাবে বলতে থাকে যে, লিন্দা ভীষণরকম অন্তঃসত্ত্বা, আমাদের এক্ষুনি কিছু একটা করতে হবে। শেষমেশ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় একজন তালার মিস্ত্রিকে ফোন করার। আমরা যখন তার জন্য অপেক্ষা করছিলাম তখন আমি দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে লিন্দার সঙ্গে কথা বলি, বিব্রতকরভাবে সচেতন যে, সবাই আমার কথা শুনতে পাচ্ছে এবং আমার অসহায়তাকে অনুভব করছে। আমি কি স্রেফ লাথি মেরে দরজাটা ভেঙে তাকে বের করে আনতে পারি না? সহজ ও কার্যকর সমাধান?
আমি এর আগে কখনোই কোনো দরজা লাথি মেরে ভাঙিনি। আমি জানি না এটা কতটা মজবুত। ধরা যাক, এটা তেমন নমনীয় হয়নি। আমাকে তাহলে কেমন নির্বোধ দেখাবে?
আধঘণ্টা পরে মিস্ত্রি আসে। সে মেঝেতে একটা কাপড়ের ব্যাগ মেলে ধরে যেখানে তার যন্ত্রপাতি রয়েছে এবং তালাটা নিয়ে কাজ করতে শুরু করে। সে দেখতে ছোটখাটো, চশমাপরা এবং ছোট্ট একটা টাক শুরু হয়েছে সদ্য, তার চারপাশের মানুষদের কিছুই বলে না, একটার পর আরেকটা যন্ত্র ব্যবহার করে যায় বৃথাই, নচ্ছার তালাটা কিছুতেই খুলবে না। অবশেষে সে হাল ছেড়ে দেয়, কোরাকে বলে অবস্থা সুবিধার নয়, সে তালাটা খুলতে পারবে না।
‘আমরা তাহলে কী করব?’ কোরা জিজ্ঞেস করে। ‘তার শিগগিরই বাচ্চা হবে।’
সে কাঁধ ঝাঁকায়।
‘আপনাদের এটা লাথি মেরে ভাঙতে হবে,’ সে বলে, তার যন্ত্রপাতি গোছাতে গোছাতে।
কে এটা লাথি মেরে ভাঙবে?
এটা আমাকেই হতে হবে। আমি লিন্দার বর। এটা আমারই দায়িত্ব।
আমার বুক ধুকপুক করে।
আমি কি তা করব? এক পা পিছিয়ে সবার চোখের সামনে শরীরের সকল শক্তি দিয়ে তাকে আঘাত করব?
কী হবে যদি দরজাটা না ভাঙে? কিংবা ছিটকে গিয়ে ভেতরে লিন্দাকে আঘাত করে?
তাকে একটা কোনায় আশ্রয় নিতে হবে।
ঠান্ডাভাবে আমি কয়েকবার শ্বাস নিই ও ফেলি। তবে এতে কোনো উপকার হয় না, আমি তখনো ভেতরে ভেতরে কাঁপতে থাকি। এভাবে অন্যদের মনোযোগ আকর্ষণ করা আমার জন্য ছিল রীতিমতো অপছন্দের কাজ। যদি সেখানে ব্যর্থ হওয়ার কোনো ঝুঁকি থাকে তাহলে সেটা তো আরো খারাপ।
কোরা চারদিকে তাকায়।
‘আমাদের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকতে হবে,’ সে বলে। ‘কে করতে পারবে এটা?’
তালামিস্ত্রি দরজা দিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়। যদি এটা আমাকেই করতে হয়, তাহলে এখনই সময়।
কিন্তু আমি সেটা করতে নিজেকে রাজি করাতে পারি না।
‘মিক্কে,’ কোরা বলে। ‘সে একজন বক্সার।’
সে দ্রুত দৌড়ে যায় তাকে সঙ্গে নিয়ে আসার জন্য।
‘আমি তাকে জিজ্ঞেস করতি পারি,’ আমি বলি। এভাবে অন্তত আমার বিব্রতভাবটা লুকাতে হবে না আমাকে, আমি তাকে সরাসরি বলব, আমি, লিন্দার স্বামী হয়েও, দরজাটা লাথি দিয়ে ভাঙার সাহস করছি না, আমি আপনাকে অনুরোধ করছি একজন বক্সার ও বড়সড় মানুষ হিসেবে আমার হয়ে কাজটা করে দিতে।
সে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বিয়ারের গ্লাস হাতে দুজন নারীর সঙ্গে কথা বলছিল।
‘হ্যালো মিক্কে,’ আমি বলি।
সে আমার দিকে তাকায়।
‘সে এখনো বাথরুমে আটকা পড়ে আছে। মিস্ত্রি দরজাটা খুলতে পারেনি। তুমি কি লাথি মেরে খুলতে পারবে দরজাটা, কী মনে হয়?’
‘নিশ্চয়ই,’ সে বলে, আমাকে কিছুক্ষণের জন্য দেখে নিয়ে বিয়ারের গ্লাস নামিয়ে রাখতে হলঘরে যায়। আমি অনুসরণ করি। লোকজন পাশে সরে যায়, সে যখন দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।
‘তুমি কি ভেতরে আছো?’ সে জিজ্ঞেস করে।
‘হ্যাঁ,’ লিন্দা বলে।
‘দরজা থেকে যতটা দূরে সম্ভব দাঁড়াও। আমি এটাকে লাথি মেরে ভাঙতে যাচ্ছি।’
‘ঠিক আছে,’ লিন্দা বলে।
সে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে। তারপর তার পা তোলে এবং দরজায় এত জোরে লাথি মারে যে তালাটা ভেতরের দিকে ছিটকে যায়, তার টুকরো-টাকরা ছড়িয়ে পড়ে; লিন্দা যখন বেরিয়ে আসে, কিছু লোক হাততালি দেয়।
‘বেচারা তুমি,’ কোরা বলে। ‘আমি সত্যি দুঃখিত। তোমাকে এই অবস্থায় ফেলার জন্য, এবং তারপর।’
মিক্কে ঘোরে এবং চলে যায়।
‘তুমি কেমন আছো?’ আমি জিজ্ঞেস করি।
‘আমি ঠিক আছি,’ লিন্দা বলে। ‘তবে আমার মনে হয় আমাদের তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরা উচিত।’
‘নিশ্চয়ই,’ আমি বলি।
ড্রয়িংরুমে গানের আওয়াজটা কমিয়ে দেওয়া হয় যেহেতু দুজন ত্রিশের নারী তাদের প্রশংসিত কবিতা পড়বেন। আমি লিন্দাকে তার জ্যাকেট দিই, নিজেরটা গায়ে চাপাই, কোরা ও টমাসকে বিদায় বলি, আমি ভেতরে ভেতরে লজ্জায় মরে যাচ্ছিলাম, তবে শেষ কর্তব্যটা বাকি থাকে, আমাকে অবশ্যই মিক্কেকে ধন্যবাদ জানাতে হবে, সে যা করেছে তার জন্য। আমি কবিতার শ্রোতাদের মধ্য দিয়ে পথ করে জানালার ধারে গিয়ে তার সামনে দাঁড়াই।
‘আপনাকে অনেক ধন্যবাদ,’ আমি বলি। ‘আপনি তাকে উদ্ধার করেছেন।’
সে তার চোয়াল ফোলায় ও কাঁধ ঝাঁকায়। ‘এটা কিছুই না।’
বাড়ি ফেরার পথে ট্যাক্সিতে আমি লিন্দার দিকে তাকাতে পারি না। আমি আমার দায়িত্বটা পালন করতে পারিনি। আমি এতই ভীতু ছিলাম যে, অন্যকে দিয়ে এই কাজটা করাই, এবং তার সবটাই আমার চোখেমুখে দৃশ্যমান ছিল। আমি একটা শোচনীয় ভীতুর ডিম।
আমরা যখন বিছানায় যাই, সে জিজ্ঞেস করে আমার কী হয়েছে। আমি বলি, আমি লজ্জিত যে দরজাটা ভেঙে তাকে বের করতে পারিনি। সে বিস্ময় নিয়ে আমার দিকে তাকায়। এই চিন্তাটা তার মাথাতেই ঢোকেনি। আমি কেন সেটা করতে যাব/ আমি সেই গোছের মানুষই না, নয় কি।
টেবিলের অপর পাশে বসা মানুষটাও স্টকহোমের সেই বক্সারটার মতো একইরকম অনুভূতির বিকিরণ করছিল। এর সঙ্গে তার দেহের আকারের কোনো সম্পর্ক নেই অথবা পেশিগুচ্ছের, কেননা এখানে উপস্থিত বেশ কজন পুরুষেরই শরীরের ঊর্ধ্বাঙ্গ সুগঠিত, শক্তিশালী হলেও তাদের ভাবভঙ্গি কম ওজনদার, ঘরের মধ্যে তাদের উপস্থিতি শিথিল চিন্তার মতো দ্রুত ধাবমান ও অগুরুত্বপূর্ণ ছিল। না, সেখানে অন্য একটা কিছু ছিল, এবং যখনই আমি এর দেখা পেয়েছি আমার খারাপ কিছু হয়েছে, আমি নিজের সেই দুর্বল, বন্দি পুরুষ, যে তার জীবনটা শব্দের ভুবনেই কাটিয়ে দিয়েছে। আমি বসে বসে এইসব ভাবছিলাম আর সেই লোকটাকে দেখছিলাম মাঝেমধ্যে চোরাচোখে আর আধা-কানে চলমান আলোচনাটা শুনছিলাম। এখন সেটা নানারকম শিক্ষণপদ্ধতিতে পালটে গেছে, এবং কোন কোন স্কুলকে তারা তাদের বাচ্চাদের জন্য বিবেচনা করছিল সেটা নিয়ে আবর্তিত হচ্ছিল। একটা ছোট্ট বিরতির পর যখন লিনুস তার অংশ-নেওয়া একটা খেলার দিনের কথা বলে, আলোচনাটা তখন বাড়ির দামের বিষয়ে মোড় ফেরে। সেখানে ঐকমত্য হয় যে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাড়ির দাম প্রচণ্ড বেড়ে গেছে, তখন এখানকার চাইতে স্টকহোমে বেশি, এবং অনুমিতভাবেই এর জোয়ার-ভাটার দিকে যাবে, সময়ের ব্যাপার মাত্র এবং যেভাবে উঠেছিল সেভাবেই নেমে আসবে তার দাম। তারপর লিনুস আমার দিকে ফিরে তাকায়।
‘তা, নরওয়েতে বাড়ির দাম তাহলে কেমন?’ সে জিজ্ঞেস করে।
‘অনেকটা এখানকার মতোই,’ আমি বলি। ‘অসলো স্টকহোমের মতোই দামি। প্রদেশগুলোতে একটু সস্তা অবশ্য।’
সে তার চোখ নিবদ্ধ রাখে আমার ওপর, যদি আমি তার দেওয়া সুযোগের অপব্যবহার করি, তবে সেটা অমূলক প্রমাণিত হওয়ায় সে আবার আড্ডায় ফিরে যায়। সে একই জিনিস করেছিল আমাদের প্রথম সাধারণ সভায়, তবে সেবার একটা প্রশ্নমুখর গলায়, কারণ, সে যেমনটি বলেছিল, সভাটা শেষ হয়ে আসছিল এবং আমি ও লিন্দা তখনো কিছু বলছিলাম না, উদ্দেশ্যটা ছিল সব অভিভাবকই কিছু না কিছু বলবে, অভিভাবক-সমবায়ের সেটাই তো লক্ষ্য। আমার কোনো ধারণাই ছিল না আলোচ্য বিষয়টা নিয়ে, এবং লিন্দাই একধরনের লজ্জাশীলতায় পরিবারের হয়ে বিষয়টার ভালোমন্দ নিয়ে অল্পবিস্তর আলোচনা করে, পুরো সমাবেশ তার দিকে চেয়ে থাকে। প্রথম আলোচ্য ছিল নার্সারির উচিত কি না সেখানে কর্মরত রাঁধুনিকে ছাঁটাই করে দেওয়া এবং তার পরিবর্তে কোনো একটা ক্যাটারিং সার্ভিসের সেবা নেওয়া, এবং দ্বিতীয়ত, যদি তারা সেটা করে, তাহলে কোন ধরনের খাওয়ার ব্যাপারে তারা আগ্রহী হবে : নিরামিষ, নাকি সাধারণ? লডজুরেট বাস্তবে একটা নিরামিষ নার্সারি ছিল, সেই নীতির ওপরে সেটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তবে এখন চারজন অভিভাবকমাত্র নিরামিষাশী, এবং বাচ্চারা যেহেতু অসংখ্য ধরনের সবজি খুব একটা খেত না, অনেক অভিভাবক ভেবেছিল, তারাও তাহলে এই নিয়মটা তুলে দেওয়ার পক্ষে। আলোচনাটা কয়েক ঘণ্টা ধরে চলে এবং বিষয়টাকে সমুদ্রতলার মাছধরা জালের মতো আগাপাশতলা চষে ফেলে। বিভিন্ন ধরনের সসেজে মাংসের অনুপাত উঠে আসে আলোচনায়; দোকানে কেনা সসেজের গায়ে মাংসের অনুপাতের কথা লেখা থাকে, কিন্তু ক্যাটারিং কোম্পানিগুলোর সরবরাহ করা সসেজে কতটা পরিমাণ মাংস রয়েছে – সেটা বোঝার উপায় কী? আমার কাছে সসেজ হলো সসেজ। সেই সন্ধ্যায় আমার চোখের সামনে যে পৃথিবীটা খুলে যাচ্ছিল তার সম্পর্কে আমার বিন্দুবিসর্গ ধারণা ছিল না, লোকেরা যে তার এত গভীরে যেতে সক্ষম সেটা তো আরো নয়। এটা কি ভালো নয় যে, একজন রাঁধিয়ে তাদের রান্নাঘরে বাচ্চাদের জন্য খাবার তৈরি করছে? আমি এটা ভাবি, কিন্তু বলি না, এবং আমি আশা করতে থাকি, আমাদের অংশগ্রহণ ছাড়াই আলোচনাটা একপর্যায়ে শেষ হয়ে আসবে, যতক্ষণ না লিনুস তার বুঝদার ও সরল চোখজোড়া আমার ওপর নিবদ্ধ করে।
ড্রয়িংরুম থেকে হ্যাইদির কান্নার শব্দ আসে। আবারো আমি ভানইয়ার কথা ভাবি। সাধারণত এইসব পরিস্থিতিতে সে সমস্যার সমাধান করে ফেলে, অন্যরা ঠিক যেভাবে করে সেভাবেই। তারা যদি একটা চেয়ার টেনে বের করে সেও তা-ই করে, তারা যদি বসে সেও বসে, তারা হাসলে সেও হাসে, যদিও সে বুঝতে পারে না তারা ঠিক কী কারণে হাসছে। তারা যদি কোনো একটা নাম বলে দৌড়ে বেড়ায় সেও আরেকটা নাম বলে দৌড়ায়। এটা তার পদ্ধতি। তবে স্তেলা এটা আগেও দেখেছে। একবার আমি সেখানে ছিলাম যখন তাকে বলতে শুনি, তুমি শুধু আমাদের নকল করবে! তুমি একটা তোতাপাখি! একটা তোতা! সেটা তাকে নিরস্ত করে না, যতক্ষণ পর্যন্ত এই পদাবনতি তার কাছে দারুণ সার্থক বলে মনে হচ্ছে, তবে এখন যখন স্তেলা নিজেই আসর দখল করে আছে তখন সেটা সম্ভবত তাকে বারণ করে। আমি জানতাম, সে বোঝে গোটা ব্যাপারটা কী নিয়ে। বেশ কয়েকবার সে এই কথাটা হ্যাইদিকে বলেছে যে, সে তাকে অনুকরণ করেছে, সে একটা তোতাপাখি!
স্তেলা ভানইয়ার চেয়ে আঠারো মাসের বড়, যে তাকে সবার চেয়ে বেশি প্রশংসা করত। তাকে যখন তার সঙ্গে চলতে দেওয়া হতো সেটা স্তেলার বদান্যতায় এবং নার্সারির সব বাচ্চার ওপর তার এই কর্তৃত্ব ছিল। সে একটা সুন্দর বাচ্চা ছিল, সোনালি চুল, বড় বড় চোখ, সবসময় সুন্দর ও সুচিন্তিতভাবে পোশাক পরিহিত এবং
যে-নিষ্ঠুরতার অংশ তার মধ্যে ছিল সেটা শ্রেণিবিন্যাসের ওপরের দিকে থাকা আর সব বাচ্চার চেয়ে কম কিংবা বেশি ছিল না। সেজন্য আমার তার সঙ্গে সমস্যা হয়নি। আমার জন্য সমস্যা ছিল, সে বড়দের ওপর যে অভিঘাত সৃষ্টি করে সে-বিষয়ে এতটা সচেতন ছিল এবং সে যেভাবে তার এই আকর্ষণীয় নির্দোষিতার সুযোগ নিত, সেটা। নার্সারিতে আমার বাধ্যতামূলক দায়িত্ব পালনের সময় আমি কখনো তার শিকার হইনি। তা সে যত উজ্জ্বলভাবেই তার দৃষ্টি ফেলুক না কেন আমার ওপর, যখন সে কোনো কিছু চাইত, আমার প্রতিক্রিয়া ছিল একধরনের উদাসীনতার, যা অবশ্যই তাকে বিভ্রান্ত করত, এবং আমাকে মুগ্ধ করার জন্য তার প্রচেষ্টাসমূহকে দ্বিগুণ করত। এবং সে নার্সারি শেষ হওয়ার পরও আমাদের সঙ্গে রয়ে যায় পার্কে যাবে বলে এবং দুজনের গাড়িতে সে ভানইয়ার পাশে বসে এবং আমি হ্যাইদিকে কোলে করে নিয়ে যাই এবং অন্য হাতে তাদের ঠেলে নিয়ে চলি। পার্কে পৌঁছবার কয়েকশো মিটার আগে সে লাফ দিয়ে উঠে বাকি পথটা দৌড়ে যায়, যা নিয়ে আমি তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করি। আমি তাকে বলি, তাকে আমার গাড়িতে ভদ্রভাবে বসে থাকতে হবে যতক্ষণ না আমরা পার্কে পৌঁছাচ্ছি, আশেপাশে গাড়ি চলছে, সে কি সেটা দেখতে পাচ্ছে না? সে বিস্ময়ের সঙ্গে আমার দিকে তাকায়, সে এই স্বরে অভ্যস্ত নয়, আমি যদিও যেভাবে এই পরিস্থিতির সুরাহা করি, তাতে পুরোপুরি সন্তুষ্ট ছিলাম না, তবু আমি ভাবি যে, একমাত্র না-ই সম্ভবত এই প্রাণীটার জন্য সবচেয়ে খারাপ শাস্তি নয়। কিন্তু সে এটা মনে রাখে, কেননা, আধঘণ্টা পরে আমি যখন তাদের প্রবল আনন্দের মধ্যে পা ধরে বাতাসে ঘোরাই, এবং হাঁটু গেড়ে তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করি, যেটা ভানইয়া খুব ভালোবাসে, বিশেষ করে যখন সে দৌড়ে এসে আমাকে একটা লাথি মেরে ঘাসের ওপর শুইয়ে দেয়, স্তেলা, যখন তার পালা আসে, আমাকে উল্টো পায়ের গুলে লাথি মারে, এবং সেটা একবার ঠিক ছিল, দুবার ঠিক ছিল, কিন্তু সে যখন সেটা তৃতীয়বারের মতো করে, আমি তাকে বলি, এটা আমাকে ব্যথা দেয়, আমি ব্যথা পাই, এটা করা বন্ধ করো তুমি এক্ষুনি স্তেলা, সেটা সে উপেক্ষা করে এবং ব্যাপারটা ততক্ষণে উত্তেজক হয়ে উঠেছে, এবং সে আমাকে আবারও লাথি মারে, সঙ্গে উচ্চহাসি, এবং ভানইয়া, যে সবসময় তাকে অনুকরণ করে, সেও হাসে, তখন আমি উঠে দাঁড়িয়ে স্তেলাকে তার কোমর ধরে দাঁড় করিয়ে দিই। ‘আমার কথা শোনো, ক্ষুদে শয়তান,’ আমার বলার ইচ্ছা হয়, এবং হয়তো বলতামও যদি না আধাঘণ্টার মধ্যে তার মা তাকে নিতে আসত। ‘শোনো স্তেলা,’ আমি তার বদলে বলি, রুক্ষভাবে, বিরক্তিসহকারে তার চোখে চোখ রেখে। ‘আমি যখন না বলি, আমি না-ই বোঝাই। তুমি কি এটা বোঝো?’ সে মাথা নিচু করে থাকে, উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে। আমি তার চিবুক তুলে ধরি। ‘তুমি কি এটা বোঝো?’ আমি আবারো বলি। সে মাথা নাড়ে, এবং আমি তাকে যেতে দিই। ‘আমি ওখানের ওই বেঞ্চটাতে বসব। তোমার মা আসা পর্যন্ত তুমি তোমার নিজের মতো করে খেলতে পারো।’ ভানইয়া আমাকে একটা বিস্মিত চাহনি দেয়। তারপর সে হেসে দিয়ে স্তেলার সঙ্গে জুটে যায়। তার জন্য এ-ধরনের দৃশ্য প্রাত্যহিক ঘটনা। সৌভাগ্যক্রমে স্তেলা বিষয়টা মুহূর্তের মধ্যে ভুলে যায়, কেননা আমি তখন পাতলা বরফের ওপর দিয়ে হাঁটছিলাম – খোদার কসম আমি কী করতাম যদি কাঁদতে কিংবা চিৎকার করতে শুরু করত সে? তবে সে ভানইয়ার সঙ্গে বড় ‘ট্রেন’টাতে চড়ে, যেটা বাচ্চাকাচ্চায় পরিপূর্ণ ছিল। তার মা যখন আসেন, তাঁর হাতে তখন দুটো কাগজের কাপে লাটে কফি। সাধারণত তিনি আসার সঙ্গে সঙ্গেই আমি চলে যাই, কিন্তু তিনি যখন আমাকে একটা কফির কাপ দেন তখন আমার কোনো উপায় থাকে না তাঁর পাশে বসে তাঁর কাজ সম্পর্কে বকবকানি শোনা ছাড়া, নভেম্বরে নিচু সূর্যে চোখ আধা বোজা রেখে অন্য চোখে বাচ্চাদের দিকে নজর রাখতে রাখতে।
যে-সপ্তাহে আমার নার্সারির কাজ ছিল এবং সেখানে নীতিগতভাবে আমাকে আর যে-কোনো কর্মচারীর মতোই কাজ করতে হতো, আমি ঘড়ির কাঁটার মতো কাজ করি, আমি এর আগে অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রচুর কাজ করেছি, এবং দ্রুত সব রুটিন মুখস্থ হয়ে যায় আমার, যা কর্মচারীরা কোনো অভিভাবকের বেলায় দেখতে অভ্যস্ত ছিল না, এবং আমিও বাচ্চাদের কাপড় খোলা ও পরানো, তাদের ডায়াপার বদলানো এমনকি প্রয়োজনে তাদের সঙ্গে খেলার বিষয়েও অনভ্যস্ত ছিলাম না। আমার উপস্থিতিতে বাচ্চারা নানাভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে, বলাই বাহুল্য। যেমন, একটি বেমানান সাদাচুলো ছেলে, যে একলা একলা বন্ধুহীন ঘুরে বেড়াচ্ছিল, সারাক্ষণই আমার কোলে উঠে বসতে চাইছিল, হয় একটা গল্প পড়ে শোনানোর জন্য অথবা স্রেফ সেখানে বসে থাকার জন্য। অন্যেরা চলে যাওয়ার পর আমি আরেকজনের সঙ্গে আধাঘণ্টার মতো খেলি, তার মায়ের আসতে দেরি হচ্ছিল, কিন্তু সে সব ভুলে যায় যখন আমরা ডাকাতের জাহাজ খেলাটা খেলি। তার প্রবল আনন্দের সঙ্গে আমি নতুন নতুন জিনিস, যেমন হাঙ্গর, দস্যুদের নৌকা, আগুন ইত্যাদি যোগ করতে থাকি। অন্যদিকে, তৃতীয় একটি ছেলে, সেখানকার সবচেয়ে বয়স্ক, তাৎক্ষণিকভাবে আমার একটা দুর্বল জায়গা আবিষ্কার করে ফেলে, আমরা যখন টেবিলে বসে খাচ্ছিলাম তখন আমার পকেট থেকে চাবির তোড়াটা চুরি করে নেয়। আমি যে তাকে থামাইনি, যদিও আমি রাগান্বিত ছিলাম, এটা তাকে গন্ধ অনুসরণ করে আরো এগোতে উদ্বুদ্ধ করে। প্রথমত সে জিজ্ঞাসা করে, সেখানে গাড়ির কোনো চাবি আছে কি না। আমি যখন মাথা নাড়ি তখন সে জানতে চায়, নয় কেন? আমার কোনো গাড়ি নেই, আমি বলি। কেন নয়? সে জিজ্ঞাসা করে। আমার কোনো লাইসেন্স নেই, আমি বলি। তুমি কি গাড়ি চালাতে পারো না? সে জিজ্ঞেস করে। তুমি কী বয়স্ক নও, তাহলে? সে জানতে চায়। সব বয়স্কই তো গাড়ি চালাতে পারে, পারে না কি? তারপর সে চাবিগুলো আমার নাকের সামনে নাচাতে থাকে। আমি তাকে সেটা করতে দিই, ভাবি – সে এতে দ্রুতই ক্লান্ত হয়ে পড়বে, কিন্তু তা সে হয় না, উল্টো সেটা সে চালিয়েই যেতে থাকে। তোমার চাবি আমার কাছে, সে বলে। এবং তুমি সেগুলো পাবে না। সে সেগুলো আমার নাকের ডগায় নাচাতেই থাকে। অন্য বাচ্চারা আমাদের দেখে, তিনজন কর্মচারীও। আমি সেগুলো কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে ভুল করি। সে ঠিকসময়ে সেগুলো সরিয়ে নেয়, এবং হাসতে ও ব্যঙ্গ করতে থাকে, হা, হা, তুমি এগুলো নিতে পারোনি! সে ভেংচি কাটতে থাকে। আবারো আমি আমার বিরক্তি প্রকাশ না করতে চেষ্টা করি। সে টেবিলের ওপর চাবিগুলো দিয়ে আঘাত করতে শুরু করে। এটা করো না, আমি তাকে বলি। সে কেবল চালাকির হাসি হেসে তা করে যেতেই থাকে। নার্সারির একজন কর্মীও তাকে থামতে বলে। তারপর সে থামে। কিন্তু তার হাত থেকে সেগুলো ঝুলিয়েই রাখে। তুমি কোনোদিনই এগুলো পাবে না, সে বলে। তখনই ভানইয়া দৌড়ে এসে ঢোকে।
‘চাবিগুলো বাবাকে দাও!’ সে বলে।
এটা কী ধরনের পরিস্থিতি ছিল?
আমি এমন ভাব করি যে কিছুই হয়নি, টেবিলে ঝুঁকে পড়ে আবারো খেতে শুরু করি। কিন্তু ক্ষুদে শয়তানটা আমাকে নিয়ে মশকরা করে যেতেই থাকে। জিঙ্গল, জিঙ্গল। আমি তাকে সেগুলো রাখতে দিই আমাদের খাওয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত। কিছু পানি খাই, আমার মুখের মধ্যে একধরনের উত্তেজনা টের পাই এই সামান্য ব্যাপারে। এটা কি ওলাফ, নার্সারিপ্রধান, দেখতে পেয়েছে? যে-কোনো কারণেই হোক, সে ইয়োকেকে চাবিগুলো ফেরত দেওয়ার হুকুম দেয়। এবং ইয়োকে আর কোনো দুষ্টুমি না করে সেটা ফেরত দেয়।
আমার গোটা প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে আমি অন্য মানুষদের কাছ থেকে দূরত্ব রক্ষা করে চলেছি, এটা আমার একটা আত্মরক্ষার কৌশল, কেননা আমি আমার মনে মনে চিন্তায় ও অনুভূতিতে মানুষের এত অবিশ্বাস্য ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ি, তারা একটু নাকচের ভঙ্গিতে তাকালেই আমার ভেতরে একটা ঝড় ভেঙে পড়ে। সেই ঘনিষ্ঠতা বাচ্চাদের সঙ্গে আমার সম্পর্ককেও প্রভাবিত করে, সেটাই আমাকে তাদের সঙ্গে বসে খেলতে প্ররোচিত করে; কিন্তু প্রাপ্তবয়স্কদের মতো তাদের যেহেতু ভদ্রতা ও সৌজন্যের লেশমাত্র নেই, সেটা এটা বোঝায় যে, তারা খুব সহজে আমার বাইরের ব্যক্তিত্বের বর্ম ভেদ করে তাদের ইচ্ছামতো ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে পারে। আমার একমাত্র প্রতিরক্ষা, যখন গোটা ব্যাপারটা শুরু হয়, আমার শারীরিক শক্তি, যা আমি ব্যবহার করতে অক্ষম ছিলাম, অথবা ভান করা যে, আমার কোনো বিরক্তি হচ্ছে না, সম্ভবত সবচেয়ে ভালো উপায়, কিন্তু এতে আমি আবার অতটা দক্ষ ছিলাম না, যেহেতু বাচ্চারা, অন্তত তাদের মধ্যে যেগুলো বেশি আগ্রাসী, দ্রুতই বুঝে ফেলত তাদের উপস্থিতিতে আমি কতটা অস্বস্তিতে ভুগি।
হায় কী অমর্যাদাকরই না ছিল বিষয়টা!
পুরো ব্যাপারটাই হঠাৎ করে উল্টে গেল। যে আমি ভানইয়ার এই নার্সারিটা তেমন পছন্দ করতাম না, যে কেবল চাইত তারা আমার হয়ে ভানইয়াকে দেখে রাখবে, যেন প্রতিদিন আমি কয়েকটি ঘণ্টা শান্তিতে কাজ করতে পারি, সে কী করছে কেমন আছে না ভেবে, যে আমি আমার জীবনে কোনো ঘনিষ্ঠতা কামনা করিনি, যে যথেষ্ট দূরত্ব পায়নি কখনোই, যথেষ্ট একাও হতে পারেনি, যাকে হঠাৎ করে সেখানে একটি সপ্তাহ কর্মী হিসেবে কাটাতে হচ্ছে এবং সেখানে যা ঘটছে তার সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত হতে হচ্ছে, কিন্তু এটা কেবল সেখানেই থেমে থাকেনি, কেননা আপনি যখন আপনার বাচ্চাদের নামিয়ে দেন কিংবা তুলে দেন তখন খাবারঘরে কিংবা খেলার ঘরে কিংবা যেখানেই হোক তাদের সঙ্গে কয়েক মিনিট বসা, এবং অন্য অভিভাবকদের সঙ্গে গল্প করা, হয়তো বাচ্চাদের সঙ্গে খানিকটা খেলা করাটাও স্বাভাবিক, এবং সপ্তাহের প্রতিটা দিন … আমি সাধারণত এটাকে একেবারে নিম্নতম পর্যায়ে রাখতাম, ভানইয়াকে নিয়ে কেউ কিছু বোঝার আগেই তাকে কোট পরিয়ে দিতাম, তবে মাঝেমধ্যে আমি করিডোরে কারও ফাঁদে পড়ে যেতাম, একটা আলাপ শুরু হয়ে যেত, এবং, তারপর যা হয়, আমি কোনো একটা নিচু সোফায় বসে কোনো বিষয়ে সম্মতির আওয়াজ করতাম, যা সম্পর্কে আমার কোনো আগ্রহই নেই, ঠিক যখন সবচেয়ে পাজি বাচ্চাগুলো আমাকে নিয়ে টানাহ্যাঁচড়া করা শুরু করত, আমার সঙ্গে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে চাইত আমি তাদের কোলে তুলি, ছুড়ে ফেলি, শূন্যে ঘোরাই, আর ইয়োকের কথা কী বলব, যে ঘটনাচক্রে সেই দয়ালু, বইপড়ুয়া গুস্তাভের ছেলে, সে তৃপ্ত ছিল কেবল ধারালো কোনোকিছু দিয়ে আমাকে আঘাত করেই।
শনিবারের বিকেল ও সন্ধ্যাটা একটা টেবিলে অন্যদের সঙ্গে চাপাচাপি করে বসে, মুখে চেষ্টিত ভদ্রতার হাসি নিয়ে সবজি খাওয়াটাও সেই একই বাধ্যবাধকতার অংশ।
এরিক কাজের টেবিলের ওপরের আলমারি থেকে একস্তূপ প্লেট বের করে আর ফ্রিদা ছুরি-চামচ গুনতে থাকে। আমি ওয়াইনে একটা চুমুক দিই এবং বুঝতে পারি কতটা ক্ষুধার্ত আমি। স্তেলাকে দেখা যায় দরজার সামনে, তার মুখ লাল এবং কিছুটা ঘর্মাক্ত।
‘কেকের সময় হয়েছে?’ সে হেঁকে বলে।
ফ্রিদা পাশে ঘুরে যায়।
‘শিগগিরই, সোনা। তবে প্রথমে আমাদের কিছু সত্যিকারের খাওয়া খেয়ে নিতে হবে।’
তার মনোযোগ বাচ্চাটার থেকে টেবিলের চারপাশে বসে-থাকা লোকদের দিকে ধাবিত হয়।
‘খাওয়া প্রস্তুত,’ সে বলে। ‘নিজেদের সাহায্য করো তোমরা। এখানে প্লেট ও চামচ রয়েছে। এবং তোমরা বাচ্চাদের খাওয়াও নিতে পারো এখান থেকে।’
‘আহ, খুব ভালো কথা,’ উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে লিনুস বলে। ‘এখানে কী আছে?’
ওয়াইন শেষ হওয়া পর্যন্ত আমি বসে থাকারই পরিকল্পনা করি। আমি যখন দেখি লিনুস ফিরে এসেছে – শিম, সালাদ এবং অতি আবশ্যিক কুসকুস, এবং একটা গরম খাওয়া নিয়ে, আমার ধারণা মটরশুঁটির পাই – আমি উঠে দাঁড়িয়ে রান্নাঘরে যাই।
‘ওখানে খাবার আছে,’ আমি লিন্দাকে বলি, যার হাতে-ধরা হ্যাইদি, পায়ে জড়ানো ভানইয়া, গল্প করছে মিয়ার সঙ্গে। ‘আমি কি বাচ্চাদের ধরব?’
‘হ্যাঁ, সেটা খুব ভালো হবে,’ লিন্দা বলে। ‘আমি ভয়ংকর ক্ষুধার্ত।’
‘আমরা কি এখন বাড়ি যেতে পারি, বাবা?’ ভানইয়া বলে।
‘কিন্তু আমরা তো এখন খাচ্ছি,’ আমি বলি। ‘এরপর কেক আসবে। আমি কি তোমার জন্য কিছু খাবার নিয়ে আসব?’
‘আমি কিছু চাই না,’ সে বলে।
‘আমি তবু তোমার জন্য কিছু নিয়ে আসব,’ আমি বলি এবং হ্যাইদিকে হাতে নিই। ‘এবং তুমি আমার সঙ্গে এসো।’
‘হ্যাইদি একটা কলা খেয়েছে, ভালো কথা,’ লিন্দা বলে। ‘তবে সে আরো কিছু খেতে চাইতে পারে।’
‘এসো তেরেসা তোমার জন্য কিছু খাবার নিয়ে আসি।’ মিয়া বলে।
আমি তাদের অনুসরণ করি। হ্যাইদিকে কোলে তুলে নিয়ে লাইনে দাঁড়াই। সে তার মাথা আমার কাঁধে ফেলে দেয়, সে এটা তখনই করে যখন খুব ক্লান্ত হয়ে পড়ে। আমার শার্ট বুকের সঙ্গে লেগে থাকে। আমার দেখা প্রতিটা মুখ, প্রতিটা চাহনি, আমার শোনা প্রতিটা শব্দ ভারি সিসার মতো আমার ওপর চেপে বসে থাকে। আমাকে যখন একটা প্রশ্ন করা হয়, অথবা আমি নিজেই কোনো প্রশ্ন করি, তখন মনে হয় যেন ডাইনামাইট দিয়ে শব্দগুলো বের করে আনতে হয়। হ্যাইদি এটাকে সহজ করে দেয়, তাকে সঙ্গে রাখা মানে একধরনের সুরক্ষা, উভয়ত, কেননা আমাকে কিছু একটা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে আর তার উপস্থিতি অন্যদের মনোযোগকেও সরিয়ে দিচ্ছে। অন্যত্র। তারা তার দিকে তাকিয়ে হাসে, জিজ্ঞেস করে সে ক্লান্ত কি না এবং তার গাল ধরে আদর করে। হ্যাইদির সঙ্গে আমার সম্পর্কের একটা বড় অংশের ভিত্তি ছিল তাকে কোলে করে রাখা, সেটাই ছিল আমাদের সম্পর্কের ভিত্তি। সে সবসময় চাইত কোলে উঠতে, হাঁটতে চাইত না একেবারে, আমাকে দেখা মাত্রই দু-হাত বাড়িয়ে দিত, এবং যখনি সে আমার হাত থেকে ঝুলতে পারত তখন আনন্দের হাসি দিত। এবং আমিও তাকে কাছে পেতে খুশি হতাম, মোটাসোটা ক্ষুদে প্রাণীটার লোভী একটা মুখসমেত।
আমি একটা প্লেটে কিছু শিম, কয়েক চামচ মটরের ঘুগনি, খানিকটা কুসকুস নিয়ে লিভিংরুমে আসি, যার মধ্যখানে একটা নিচু টেবিলের চারপাশে বাচ্চারা বসেছিল, সঙ্গে একজন সাহায্যকারী অভিভাবক।
‘আমি কিছু চাই না,’ তার সামনে আমাকে প্লেটটা নামিয়ে রাখতে দেখেই ভানইয়া বলে ওঠে।
‘ঠিক আছে,’ আমি বলি। ‘তোমাকে খেতে হবে না তুমি যদি না চাও। কিন্তু তুমি কি মনে কর হ্যাইদি কিছু খেতে চায়?’
আমি কাঁটাচামচে কিছু শিম আটকে তার মুখের সামনে ধরি। সে তার ঠোঁট বন্ধ করে ফেলে মাথা নাড়ায়।
‘এসো দেখি,’ আমি বলি। ‘আমি জানি তোমরা দুজনেই ক্ষুধার্ত।’
‘আমি কি ট্রেনটা নিয়ে খেলতে পারি?’ ভানইয়া জিজ্ঞেস করে।
আমি তার দিকে তাকাই। সাধারণত সে হয় ট্রেনটার দিকে অথবা আমার দিকে তাকাত, কাকুতি-মিনতি করত, কিন্তু এখন সে সোজা সামনের দিকে তাকিয়ে আছে।
‘নিশ্চয়ই পারো,’ আমি বলি। আমি হ্যাইদিকে নামিয়ে রেখে, ঘরের কোনায় যাই যেখানে আমাকে প্রায় আমার হাঁটুজোড়াকে বুকের কাছে নিয়ে আসতে হয় ক্ষুদে বাচ্চাদের আসবাব এবং খেলনার বাক্সোগুলোর ভেতর দিয়ে চলার জায়গা করার জন্য। আমি রেললাইনটাকে খুলে আলগা করে ফেলি এবং টুকরোগুলিকে ভানইয়ার কাছে দিই, যে সেগুলোকে জোড়া লাগানোর চেষ্টা করে। যখন টুকরোগুলো মিলছিল না তখন সে তার সমস্ত শক্তি দিয়ে সবগুলো একসঙ্গে জোড়া লাগাতে চেষ্টা করে। সে রেগেমেগে সেগুলো ছুড়ে ফেলার উপক্রম করা পর্যন্ত আমি অপেক্ষা করি, শেষ পর্যন্ত হস্তক্ষেপ করার আগে। হ্যাইদি সারাক্ষণই চাইছিল পথটাকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলতে, আমার চোখ কিছু একটা খুঁজছিল তার মনোযোগ অন্যদিকে ফেরাতে। একটা ধাঁধা? একটা পুতুল? একটা ছোট্ট প্লাস্টিকের ঘোড়ার বাচ্চা, বড়বড় চোখঅলা এবং লম্বা কৃত্রিম কেশরসহ? সে সবগুলোকে ছুড়ে ফেলে দেয়।
‘বাবা, তুমি আমাকে সাহায্য করতে পারবে?’ ভানইয়া বলে।
‘নিশ্চয়ই আমি পারি,’ আমি বলি। ‘দেখো। এখানে একটা ব্রিজ দেওয়া যাক, যাতে করে ট্রেন এটার ওপর ও নিচ দিয়ে যেতে পারে। এটা খুব ভালো হবে, তাই না।’
হ্যাইদি একটা ব্রিজের টুকরো হাতে তুলে নেয়।
‘হ্যাইদি!’ ভানইয়া ডাকে।
আমি সেটা তার কাছ থেকে নিই এবং সে চিৎকার করতে শুরু করে। আমি তাকে কোলে নিয়ে উঠে দাঁড়াই।
‘আমি এটা করতে পারব না!’ ভানইয়া বলে।
‘আমি এক সেকেন্ডের মধ্যে চলে আসব। আমি শুধু হ্যাইদিকে মাম্মির কাছে দিতে যাচ্ছি,’ আমি বলি, এবং হ্যাইদিকে অভিজ্ঞ গৃহবধূর মতো আমার কোমরে বসিয়ে রান্নাঘরের দিকে যাই। লিন্দা গুস্তাভের সঙ্গে গল্প করছিল, একমাত্র লডজুরেট অভিভাবক, একজন ভালো পুরনো পেশাজীবী, যে-কোনো কারণেই হোক যার সঙ্গে লিন্দার ভালো বনিবনা হতো। সে হাসিখুশি, তার মুখ উজ্জ্বল, তার বেঁটে কিন্তু সবসময় সুবেশী শরীর ছিল শক্ত ও মাংসল, তার ঘাড় মজবুত, চিবুক চওড়া, তার মুখ ফোলা কিন্তু খোলামেলা ও আনন্দময়। সে যেসব বই পড়ে উপভোগ করেছে, সেগুলো নিয়ে কথা বলতে পছন্দ করত, সর্বশেষগুলো ছিল রিচার্ড ফোর্ডের।
‘সেগুলো দারুণ,’ সে বলত। ‘তুমি কি তাদের পড়েছো? সেগুলোর বিষয় কোনো একটা জমিদারির কর্মচারী, একজন সাধারণ মানুষ, হ্যাঁ, তার জীবন এত সহজে চেনা যায় এবং সাদামাটা। ফোর্ড পুরো আমেরিকার আত্মাটাকে ধরতে পারে! আমেরিকান মানসিকতা, পুরো দেশটার আসল স্পন্দনটাকে!’
আমি গুস্তাভকে পছন্দ করি, বিশেষ করে তার ভদ্রতা যা তার ওই সাদামাটা সৎ একটি কাজে থাকারই ফল মনে হয়, যা ঘটনাচক্রে আমার বন্ধুদের কারো ছিল না, আমার তো নয়ই। আমরা সবাই এক বয়সীই ছিলাম, কিন্তু তাকে আমার দশ বছরের বড় মনে হতো তার চেহারা দেখে। আমরা যখন বেড়ে উঠছিলাম আমাদের পিতামাতারা যে অর্থে প্রাপ্তবয়স্ক ছিল তাকেও দেখতে সেরকমই বয়স্ক লাগত।
‘আমার মনে হয় হ্যাইদির এটা ঘুমের সময় তো তাই,’ আমি বলি। ‘সে ক্লান্ত মনে হয়। এবং সম্ভবত ক্ষুধার্তও। তুমি কি ওকে বাড়িতে নিয়ে যাবে?’
‘হ্যাঁ। খাওয়াটা একটু শেষ করে নিই, ঠিক আছে?’
‘নিশ্চয়ই।’
‘এখন আমি তোমার বইটা আমার হাতে ধরে আছি!’ গুস্তাভ বলে। ‘আমি বইয়ের দোকানে গিয়েছিলাম এবং সেখানেই সেটা দেখি। দেখে বেশ মজার মনে হলো। এটা কি নুরস্তেদ বের করেছে?’
‘হ্যাঁ,’ আমি একটা জোরকরা হাসি দিয়ে বলি। ‘হ্যাঁ, তারাই করেছে।’
‘তুমি তাহলে সেটা কেনোনি?’ লিন্দা জিজ্ঞেস করে, তার গলায় সামান্য খোঁটার আভাস দিয়ে।
‘না, এবার নয়,’ সে বলে, ন্যাপকিন দিয়ে তার মুখ মুছে। ‘এটা পরীদের সম্পর্কে, নয় কী?’
আমি মাথা নাড়ি। হ্যাইদি আমার কোল থেকে খসে পড়ে, এবং আমি যখন তাকে আবার তুলে ধরি, তখন তার ন্যাপিটাকে ভীষণ ভারি মনে হয়।
‘তুমি যাওয়ার আগেই আমি ওটা পালটে দেব,’ আমি বলি। ‘তুমি ন্যাপি পালটানোর ব্যাগটা এনেছো তো?’
‘হ্যাঁ। ওটা হলঘরে আছে।’
‘ঠিক আছে,’ বলে আমি একটা ন্যাপি আনতে যাই। লিভিংরুমে ভানইয়া ও আকিলেস ছোটাছুটি করছিল, সোফা থেকে মেঝেতে লাফ দিয়ে পড়ছিল, হাসতে হাসতে উঠে পড়ে আবারো লাফ দিয়ে পড়ছিল। আমি আমার বুকে একধরনের উষ্ণতার উন্মীলন টের পাই। ঝুঁকে পড়ে একটা ন্যাপি, কিছু মুছুনি তুলে নিই যখন হ্যাইদি আমার গায়ের ওপর কোয়ালা ভালুকের মতো লেপ্টে থাকে।
বাথরুমে কোনো ন্যাপি পালটানোর টেবিল ছিল না, তাই আমি ওকে বাথরুমের মেঝের টাইলে শোয়াই, তার মোজা খুলি, ন্যাপির গায়ে যে-দুটো আঠালো কাপড় থাকে সেগুলোকে ছিঁড়ি, এবং বেসিনের নিচের ঝুড়িতে ফেলি, যখন হ্যাইদি গভীর এক প্রত্যাশা নিয়ে আমার দিকে চেয়ে থাকে।
‘শুধু হিসু করেছি’, সে বলে। তারপর সে তার মাথা পাশে ঘুরিয়ে দেয়ালের দিকে চেয়ে থাকে, আমার পরিষ্কার ন্যাপি পরানোর ব্যাপারে বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে, বাচ্চাকাল থেকেই সে যা করে এসেছে।
‘এই তো,’ আমি বলি। ‘তোমার ন্যাপি পালটানো হয়ে গেল।’
আমি তাকে হাতে ধরে দাঁড় করিয়ে দিই। তারপর তার টাইটসগুলো ভাঁজ করি, যেগুলো কিঞ্চিৎ ভেজা ছিল, তারপর সেগুলো গাড়িতে রাখা ব্যাগের কাছে নিয়ে যাই, সেখানে পাওয়া একধরনের জগিং প্যান্ট পরিয়ে দিই তাকে, তারপর বাদামি বাবল-লাইনড কর্ডুরয় জ্যাকেটটা পরিয়ে দিই, যেটা তাকে তার প্রথম জন্মদিনে উপহার দিয়েছিল ইংভে। হ্যাইদির জুতো পরানোর সময় লিন্দা আসে।
‘আমিও দ্রুতই আসব,’ আমি বলি। আমরা চুমু খাই, লিন্দা একহাতে ব্যাগ ও আরেক হাতে হ্যাইদিকে নিয়ে প্রস্থান করে।
ভানইয়া হলরুমে সর্বোচ্চ গতিতে দৌড়ায়, আকিলেস তার পায়ে পায়ে, একটা ঘরের ভেতরে, যেটা নিশ্চয়ই তাদের শয়নকক্ষ, সেখান থেকে একটু পরেই তার অতি উত্তেজিত গলা শোনা যাবে। আবারো রান্নাঘরে গিয়ে খাওয়ার টেবিলে বসার ভাবনাটা তেমন উদ্দীপক ছিল না, ফলে আমি বাথরুমের দরজা খুলে, ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিয়ে, কয়েক মিনিটের মতো স্থির দাঁড়িয়ে থাকি। তারপর ঠান্ডা পানিতে মুখ ধুই, একটা সাদা তোয়ালেতে সাবধানে মুখ মুছি, আয়নায় আমার চোখজোড়াকে দেখি, এত কালো এবং এমন এক হতাশায় কঠিন যে, আমি নিজেই আতঙ্কে চমকে উঠি সেই দৃশ্যে।
আমি যে ফিরে এসেছি সেটা কিচেনের কেউ খেয়াল করে না। ছোটচুলের কঠিন দৃষ্টির সাদামাটা কৌণিক গড়নের এক ছোটখাটো নারী ছাড়া, যে তার চশমার পেছন থেকে কিছুক্ষণের জন্য আমার দিকে তাকায়। সে এখন কী চায়?
গুস্তাভ ও লিনুস পেনশন ব্যবস্থা নিয়ে আলাপ করছিল, পঞ্চাশ দশকের শার্ট পরিহিত চুপচাপ মানুষটির সঙ্গে তার বাচ্চা ছিল, এক উদ্দাম বালক, সোনালিপ্রায় সাদাচুল বিশিষ্ট, তার কোলে বসা, এফসি মালমো নিয়ে তার সঙ্গে আলাপ করছিল, আর ফ্রিদা ও মিয়া কথা বলছিল ক্লাবে সন্ধ্যার অনুষ্ঠান নিয়ে, যা সে ও আরো কিছু মেয়ে মিলে শুরু করতে যাচ্ছিল শিগগির। এদিকে এরিক ও মাতিয়াস টিভি স্ক্রিন নিয়ে তুলনামূলক আলাপ করছিল, একটা আলোচনায় লিনুস অংশ নিতে চাচ্ছিল, আমি তার দীর্ঘ চাহনি থেকে সেটা বুঝতে পারছিলাম, এবং গুস্তাভের প্রতি ছোট চাহনিতে, যেন তাকে অভদ্র না দেখায়। একমাত্র মানুষ যে কোনো আলোচনায় গভীরভাবে লিপ্ত ছিল না সেটা সেই ছোটচুলের নারীটি, এবং আমি যদিও তাকে ছাড়া আর সবদিকে দেখছিলাম, সে টেবিলের ওপর ঝুঁকে এসে আমাকে জিজ্ঞেস করে, আমি নার্সারিটি নিয়ে খুশি কি না। আমি বলি, হ্যাঁ। সেখানে সম্ভবত একটু বেশিই কাজ, আমি যোগ করি, তবে এটা নিশ্চয়ই সময়ের সদ্ব্যবহারই, আপনি আপনার বাচ্চাদের খেলার সাথিদের চিনতে পারেন, এবং সেটা নিশ্চয়ই ভালো, আমি মত দিই।
সে আমি যা বলি তাতে হেসে সায় দেয়। তার মধ্যে কী একটা বিষণ্নতা, অসুখী ভাব ছিল।
‘ব্যাপারটা কী?’ লিনুস আচমকা বলে ওঠে, তার চেয়ারটা পেছনে ঠেলে দিয়ে। ‘তারা সেখানে কী করছে?’
সে উঠে দাঁড়িয়ে বাথরুমে যায়।
পরের মুহূর্তেই সে ভানইয়া ও আকিলেসকে তার সামনে নিয়ে বের হয়ে আসে। ভানইয়ার মুখে বিরাট হাসি, আকিলেসকে বরং একটু অপরাধী বলে মনে হচ্ছিল। তার ছোট স্যুট জ্যাকেটের হাতাদুটো ভেজা। ভানইয়ার খোলা হাতগুলোও ভেজা।
‘অমি যখন ভেতরে যাই তাদের হাতগুলো টয়লেটের এতটা ভেতর অব্দি ডোবানো ছিল,’ লিনুস বলে। আমি ভানইয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে না হেসে পারি না।
‘এগুলো এখন খুলে ফেলতে হবে আমাদের, খোকাবাবু,’ লিনুস বলে, আকিলেসকে হলের দিকে নিয়ে যেতে যেতে। এবং তুমি নিশ্চিত করবে তোমার হাতগুলো ভালো করে ধুয়েছ।’
‘একই জিনিস প্রযোজ্য তোমার বেলাতেও,’ উঠতে উঠতে আমিও বলি ভানইয়াকে। ‘আমার সঙ্গে বাথরুমে চলো।’
সে বেসিনের ওপর তার হাত বাড়িয়ে দিয়ে আমার দিকে তাকায়।
‘আমি আকিলেসের সঙ্গে খেলছি!’ সে বলে।
‘আমি সেটা দেখতে পাচ্ছি,’ আমি বলি। ‘কিন্তু এর জন্য তো তোমাকে টয়লেটের ভেতর হাত ঢোকানোর কোনো দরকার নেই, আছে কি?’
‘না,’ সে বলে এবং হাসে।
আমি টেপের নিচে হাত ভেজাই, সাবান মাখি, এবং হাত ধুয়ে দিই আঙুলের ডগা থেকে কাঁধ অবধি। তারপর আমি তা মুছে দিয়ে তার কপালে চুমু খাই এবং তাকে ভেতরে পাঠিয়ে দিই। আমি বসার সময় যেরকম ক্ষমাপ্রার্থনাসুলভ হাসি দিই, সেটা অদরকারি ছিল, কেউই এইসব তুচ্ছ বিষয়ে আগ্রহী ছিল না, এমনকি লিনুসও নয়, যে কি না ফেরামাত্রই একটা লোকের গল্প বলা শুরু করে, যাকে সে থাইল্যান্ডে বানর দ্বারা আক্রান্ত হতে দেখেছিল। তার মুখে হাসির লেশমাত্র নেই, যখন অন্যরা হেসে খুন হচ্ছিল, কিন্তু তাকে মনে হয় তাদের হাসিকে শুষে নিতে, যেনবা তার গল্পটাকে নতুন করে শক্তি দিতে, যা সেটা দিয়েছিল, এবং পরবর্তী হাসির দমক ওঠার পরই কেবল সে হাসতে শুরু করে, খুব বেশি নয় যদিও, এবং তার নিজের ইচ্ছাতেও নয়, আমার কাছে তেমনটাই মনে হয়; এটা অনেকটা সন্তুষ্টির অভিব্যক্তির মতো, যা সে অনুভব করেছিল, যখন তার মুখ কল্পিত আনন্দের আভায় উদ্ভাসিত হতে পারছিল। ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ,’ সে বলে বাতাসের গায়ে হাত ছুড়ে দিয়ে। কঠিন নারীটি, যে তখন জানালা দিয়ে এতক্ষণ বাইরে দেখছিল, তার চেয়ার টেনে টেবিলের সামনে ঝুঁকে বসে আবারো।
‘এমন কাছাকাছি বয়সের দুটো বাচ্চা থাকাটা কি কঠিন নয়?’ সে বলে।
‘হ্যাঁ এবং না,’ আমি উত্তর দিই। ‘এটা একটু ক্লান্তিকর তো বটেই। তারপরও একজনের চাইতে দুজনই ভালো। আপনি যদি আমাকে জিজ্ঞেস করেন তাহলে আমি বলব, এক বাচ্চার পরিস্থিতিটা একটু দুঃখময় … আমি সবসময় ভেবেছি আমি তিনটে বাচ্চা চাই। তাহলে সেখানে অনেকগুলো বিন্যাস সম্ভব, যখন তারা খেলবে। আর বাবা-মায়ের বিপরীতে বাচ্চাদের সংখ্যাধিক্যের ব্যাপারটা …’
আমি হাসি। সে কিছু বলে না। হঠাৎ করে আমি অনুভব করি, তার একটিমাত্র সন্তান।
‘তবে একটা বাচ্চার ব্যাপারটাও দারুণ হতে পারে বইকি,’ আমি বলি।
সে তার হাতের ওপর মাথা রাখে।
‘তবে আমি প্রত্যাশা করি গুস্তাভের একটা ভাই কিংবা বোন থাকত যদি, আমার দুজনমাত্র, ব্যাপারটা আমার জন্য একটু চাপের বইকি।’
‘একেবারেই না,’ আমি বলি। ‘নার্সারিতে তার হাজারটা বন্ধু হবে এবং সেটা দারুণ নিশ্চয়ই।’
‘সমস্যা হচ্ছে আমার কোনো স্বামী নেই,’ সে বলে। ‘আর তাই সেটা সম্ভব নয়।’
আমার সঙ্গে এসব ফালতু কথার কী সম্পর্ক?
আমি তাকে একটা সহানুভুতির দৃষ্টি দিই, এবং আমার দৃষ্টি যেন না সরে যায় তার ওপর মনোনিবেশ করি, এই ধরনের পরিস্থিতিতে যা খুব সহজেই ঘটতে পারে।
‘এবং আমি যেসমস্ত পুরুষের সাক্ষাৎ পাই তাদের আমার বাচ্চার বাবা হিসেবে ভাবতে পারি না,’ সে বলতে থাকে।
‘বাজে কথা,’ আমি বলি। ‘এই বিষয়গুলো নিজেরাই নিজেদের মতো করে সমাধান করে নেয়।’
‘আমি বিশ^াস করি না তারা করে,’ সে বলে। ‘তারপরেও আপনাকে ধন্যবাদ।’
আমি চোখের কোনা দিয়ে একটা নড়াচড়া টের পাই। আমি ফিরে দরজার দিকে তাকাই। ভানইয়া আমার দিকে তাকিয়ে হাসছিল। সে ঠিক আমার পাশে এসে থামে।
‘আমি বাড়ি যেতে চাই, আমরা এখন যেতে পারি না?’
‘আমাদের আরো একটু সময় থাকতে হবে,’ আমি বলি। একটু পরেই তো কেক আসবে, তুমিও নিশ্চয়ই তার ভাগ চাও, চাও না?’
সে মাথা নাড়ে। আমি আমার ওয়াইন গ্লাস সরিয়ে রেখে তাকে কোলে তুলে নিই।
‘তুমি আমার সঙ্গে কিছুক্ষণ বসো, আমরা আবার ভেতরে যাব। আমি তোমার সঙ্গে থাকতে পারি, ঠিক?’
‘হ্যাঁ, ঠিক আছে।’
সে বসে টেবিলের চারপাশে অন্যদের দেখে। আমি ভাবি সে কী চিন্তা করছিল। এই অবস্থায় তার কেমন লাগছিল?
আমি তাকে পর্যবেক্ষণ করি। তার সোনালি চুল কাঁধ অবধি ছাড়িয়ে গেছে। ছোট নাক, ছোট মুখ, দুটো ছোট কান, দুটোই তীক্ষ্ণ, পরীদের মতো। তার নীল চোখ, যা সবসময় তার অনুভূতিকে ফাঁকি দিত, সামান্য ট্যারা, আর তাই এই চশমা। প্রথমে সে তা নিয়ে গর্বিতই ছিল। এখন সে রাগ করা মাত্র প্রথমেই সেগুলো খুলে ফেলে। হয়তোবা সে জানত, এটা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ যে সে সেটা পরে থাকে সবসময়। (চলবে)


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.