চারুকলা ভবন : বৈশ্বিক বাঙালির আত্মানুসন্ধানের রাজনীতি

গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের গোড়ায় মাজহারুল ইসলাম (১৯২৩-২০১২) স্থপতি হিসেবে তাঁর জীবন কিভাবে শুরু করেছিলেন? কী ছিল তাঁর জীবনদর্শন? স্থাপত্য, সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি নিয়ে তিনি কী ভাবতেন? এই প্রশ্নগুলো গুরুত্বপূর্ণ কারণ মাজহারুল ইসলাম এমন একসময়ে আমেরিকা থেকে পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে এসেছিলেন, যখন পাকিস্তান রাষ্ট্রের জাতীয় পরিচয়ের রাজনীতি এবং ‘মাতৃভাষা বাংলা চাই’ আন্দোলন তুঙ্গে। সেই পটভূমিতে মাজহারুল ইসলামের স্থাপত্যচেতনা আর রাজনৈতিক দর্শনের সংযোগ কি ঘটেছিল? আর যদি ঘটেই থাকে, সেটা কিভাবে, তা জানা জরুরি।

১৯৫২ সালের জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ ওরেগন, ইউজিন, থেকে মাজহারুল ইসলাম স্থাপত্যে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর বয়স তখন ঊনত্রিশ। এর আগে ১৯৪৬ সালে তিনি কলকাতার বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ শিবপুর থেকে পুরকৌশলে পড়াশোনা শেষ করেন। ইউজিন পর্ব সমাপ্ত করে তিনি বেশ কয়েক মাস যুক্তরাষ্ট্রে ঘুরে বেড়ান – বিশাল দেশটাকে যেন বোঝার চেষ্টা করেন নবীন স্থপতির দৃষ্টিকোণ থেকে। 

যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে মাজহারুল ইসলাম তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বিল্ডিংস, কমিউনিকেশন্স, অ্যান্ড ইরিগেশন (সিবিআই) বিভাগে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন। পূর্ব পাকিস্তানে কোনো সরকারি বিভাগে তখনো স্থপতির পদ সৃষ্টি হয়নি। দেশে স্থাপত্যশিক্ষার কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল না। মাজহারুল ইসলামই একমাত্র স্থানীয় স্থপতি, তাও আবার প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পূর্ব পাকিস্তানের নির্মাণশিল্প ছিল আমলাতান্ত্রিক এবং তার নিয়ন্ত্রণকারী ছিল সিবিআই-এর সার্ভেয়ার, ড্রাফটসম্যান ও ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার। তাঁদের বেশিরভাগ প্রশিক্ষণ লাভ করেছিলেন কলকাতা আর বোম্বের (মুম্বাইয়ের) কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে। ১৯৪৮ সালে, দুজন ব্রিটিশ স্থপতি এডওয়ার্ড হিক্স (Edward Hicks) এবং রোনাল্ড ম্যাককোনেল (Ronald McConell) সিবিআই-এ স্থপতি হিসেবে যোগ দেন। এই দুজন ঢাকার নগর পরিকল্পনা প্রণয়নসহ বেশ কয়েকটি বড় স্থাপনার কাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তাঁদের চিন্তাভাবনা এবং কাজের ধারা, যুক্তরাষ্ট্রের আধুনিক স্থাপত্যশিক্ষায় উদ্দীপিত মাজহারুল ইসলামকে উদ্বুদ্ধ করতে পারেনি। 

কাজে যোগদানের পর (১৯৫৩-৫৬) স্থপতি ম্যাককোনেল মাজহারুল ইসলামকে দায়িত্ব দেন শাহবাগে গাছগাছালিতে পরিপূর্ণ একটি জমিতে পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম চারুকলা শিক্ষাভবন অর্থাৎ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ অফ আর্টস অ্যান্ড ক্রাফটস (বর্তমানে ফ্যাকাল্টি অফ ফাইন আর্টস) ডিজাইন করার জন্য। 

দক্ষিণ এশিয়ায় আধুনিক স্থাপত্যের উৎস নিয়ে যতদূর গবেষণা হয়েছে সেখানে সাধারণত চারুকলা ভবনকে চিহ্নিত করা হয় এদেশে নান্দনিক আধুনিকতার সূচনাকারী হিসেবে। কিন্তু এই ভবনটির বিমূর্ত আধুনিকতার সঙ্গে দেশভাগ-পরবর্তী ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে ওতপ্রোত সম্পর্ক ছিল – সেটা নিয়ে কোনো গবেষণা হয়নি। অর্থাৎ, পঞ্চাশের দশকের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মাজহারুল ইসলামের নান্দনিক আধুনিকতার অর্থ কী ছিল? সেই আধুনিকতার উৎসটাই বা কী? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা যেতে পারে চারুকলা ভবন বিন্যাসের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের মধ্যে। 

পঞ্চাশের দশকের শুরুতে আধুনিক স্থাপত্যজগৎ কেমন ছিল তা খোঁজ করলে জানা যায় যে, মাজহারুল ইসলাম যখন ১৯৫৩ সালে চারুকলা ভবন ডিজাইন করা শুরু করেন, তখনো ফরাসি-সুইস স্থপতি ল্য কর্বুসিয়ের (Ronald McConell)-এর বিখ্যাত রনসাম্প চ্যাপেল (Ronchamp Chapel) তৈরি হয়নি। ফ্রাঙ্ক লয়েড রাইট (Frank Lloyd Wright, 1867-1959)-এর গুগেনহাইম মিউজিয়াম (Guggenheim Musuem) পৃথিবীর আলো দেখেনি। লুই কান (Louis Kahn) তখনো লুই কান হয়ে ওঠেননি। ১৯৫৩ সালে কানের তেমন কোনো পরিচিতি ছিল না। তাঁর ইয়েল আর্ট গ্যালারির নির্মাণকাজ সবে শুরু হয়েছে।

ভারতে ল্য কর্বুসিয়েরের কর্মযজ্ঞ তখন আরম্ভ হয়েছে মাত্র। উত্তর-পশ্চিম ভারতের পাঞ্জাব অঙ্গরাজ্যের চণ্ডিগড়ে একটি প্রাদেশিক রাজধানী শহর ধীরে ধীরে গড়ে উঠছিল। কিন্তু বিশ্বস্থাপত্য মানচিত্রে এই শহরের কোনো অস্তিত্ব নেই তখনো। আহমেদাবাদে তৈরি হয়নি ল্য কর্বুসিয়েরের মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন (Mill Owners’ Association Building) ভবনটি। তাঁর মাইসো জাউল (Maison Jaoul) তখনো আলোকিত করেনি প্যারিসের নগর আবাসন স্থাপত্য। নিউইয়র্ক শহরে নির্মিত হয়নি মিজ ভ্যান ডের রোহ (Mies van der Rohe,
 1886-1969)-এর সিগ্রাম স্কাইস্ক্রেপার। কাজেই বোঝা যাচ্ছে, চারুকলা ভবন যখন তৈরি হয়েছিল যখন সারাবিশ্বে আধুনিক স্থাপত্য কেবল যৌবন অতিক্রম করছে।

১৯৫৩ সালে ঢাকা শহর কেমন ছিল, তার স্থাপত্যরীতিই বা কী ছিল? পঞ্চাশের দশকে ঢাকা ছিল বড় পরিসরের স্বপ্লোন্নত জনবসতি। শহরের জনসংখ্যা ছিল তিন লাখ ৩০ হাজার। গুটিকয়েক গুরুত্বপূর্ণ ভবন সংবলিত শহরটির উত্তর সীমানায় ছিল রমনা। শহরের সীমিত স্থাপত্যরীতির মধ্যে অন্যতম ছিল মুঘল-ইউরোপীয় শৈলীর সংমিশ্রণে তৈরি ইন্দো-সারাসেনিক নান্দনিক ধারা, যার উৎকৃষ্ট উদাহরণ ছিল কার্জন হল, পুরনো হাইকোর্ট ভবন আর পুরনো সেক্রেটারিয়েট ভবন (বর্তমানে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ)। এমন এক স্থাপত্যরীতির মুখোমুখি হয়ে মাজহারুল ইসলাম খুঁজে পাননি বাঙালি মানবতাবাদের কোনো দিকনির্দেশনা।

পঞ্চাশের দশকে পূর্ব পাকিস্তানে আরো একটি স্থাপত্যরীতি প্রচলিত ছিল। বিল্ডিংয়ের সোজাসাপ্টা সম্মুখভাগ, লম্বা করিডর আর সারি সারি কক্ষ – এই নিয়ে আধুনিক ধারার কিছু স্থাপনা গড়ে উঠছিল ঢাকায়। মূলত সিবিআই-র দুই ব্রিটিশ স্থপতি এডওয়ার্ড হিক্স এবং রোনাল্ড ম্যাককোনেল এই স্থাপনাগুলো ডিজাইন করেছিলেন। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যায়, ম্যাককোনেলের করা তৎকালীন হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল এবং হিক্সের করা ঢাকা নিউ মার্কেট। তাঁদের কাজের মধ্যে মাজহারুল ইসলাম খুঁজে পাননি গভীর কোনো মনস্তত্ত্ব, সমাজ-সচেতনতা অথবা একটি নতুন জাতির নান্দনিক চরিত্র গঠনের কোনো বলিষ্ঠ উদ্যোগ।

আমাদের মনে রাখতে হবে, চারুকলা ভবনটি শুধু পূর্ব পাকিস্তানের নয়, সারা ভারতীয় উপমহাদেশের নান্দনিক আধুনিকতার অগ্রদূত ছিল। তার মাত্র বছর আটেক আগে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ভারতে নির্মিত হয়েছিল ইউরোপীয় ধারার প্রথম আধুনিক ভবন ‘গোলকন্ডে’ (Golconde)। বঙ্গোপসাগরের তীরে ভারতের দক্ষিণাঞ্চলে পন্ডিচেরিতে অবস্থিত এই ভবনটি ছিল শ্রী অরবিন্দ আশ্রমের ছাত্রাবাস। স্থপতি আন্তোনিন রেমন্ড আর জর্জ নাকাশিমার ডিজাইন করা ভবনটিতে অলংকারবর্জিত পরিচ্ছন্ন নান্দনিক চেতনার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল 
 জলবায়ু-সচেতন নির্মাণ। গোলকন্ডে এবং চারুকলা ভবন এই উপমহাদেশের প্রথম প্রজন্মের আধুনিক স্থাপত্যরীতির প্রতিভূ। আরো মনে রাখা দরকার যে, মাজহারুল ইসলাম যখন চারুকলা ভবন ডিজাইন করছিলেন, তখন ভারতে আধুনিক স্থাপত্যচর্চাকারী হিসেবে শুধু অচ্যুত কানভিন্দের (Achyut Kanvinde, 1916-2002) নাম শোনা যায়। কানভিন্দে ছিলেন মাজহারুল ইসলামের চেয়ে সাত বছরের বড়। তখনো বালকৃষ্ণ দোশি, চার্লস কোরিয়া, রাজ রেওয়াল দূর দিগন্তে উদিত হননি। 

প্রথম দর্শনে চারুকলা ভবনকে মনে হতে পারে ইউরোপীয় ইন্টারন্যাশনাল স্টাইলের অনুসারী একটি স্থাপত্যকর্ম। কিন্তু একটু মনোযোগ দিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, প্যারিসে ল্য কর্বুসিয়েরের ভিলা সাভোয়ার (Villa Savoye) পিলোটিস বা গোলাকার কলামগুলো এখানে গ্রীষ্মকালীন আবহাওয়া-উপযোগী করে কিভাবে প্যাভিলিয়নের মতো একটা সদর মহলকে ওপরে ভাসিয়ে রেখেছে। এই প্যাভিলিয়নটাই পুরো চারুকলা ভবন আর প্রাঙ্গণের প্রবেশপথ হিসেবে কাজ করে, যা ছিল সেকালে ব্যতিক্রম। প্যাভিলিয়নটির নিচতলায় প্রবেশপথ ছাড়াও আছে আর্ট গ্যালারি আর ওপরে খোলা বারান্দাসহ অফিস। একটা মুক্ত ঘোরানো সিঁড়ি একতলা আর দোতলাকে যুক্ত করেছে। তারপরে একটা কোর্টইয়ার্ড বা উঠান পেরিয়ে সারি সারি ক্লাসরুম। সবশেষে একটা গোলাকার পুকুরকে কেন্দ্র করে আংশিক বৃত্তাকারে স্টুডিও ক্লাস। পুরো কমপ্লেক্সের পরিকল্পনা করা হয়েছে তিনটি মৌলিক জ্যামিতিক ফর্মকে ঘিরে। এই ফর্মগুলো শাহবাগের গাছগাছালিতে ভরা প্রকৃতিকে ঘিরেই শুধু নির্মিত হয়নি, এর ফলে প্রকৃতি আর স্থাপত্যের সহমর্মী বন্ধনও তৈরি হয়েছে। ডিজাইন করার আগে মাজহারুল ইসলামের বিশেষ নির্দেশে গাছগাছালিসহ জায়গার নিখুঁত সার্ভে করা হয়। দর্শনার্থীরা চারুকলা ভবনে এলে রবীন্দ্রনাথের ‘বলাই’ গল্পের তাৎপর্য যেন পুনর্বার অনুধাবন করেন। বিশেষজ্ঞদের মতামত যে, স্থপতি গাছ না কেটেই পুরো কমপ্লেক্স ডিজাইন করেন। উল্লেখ্য, পঞ্চাশের দশকে প্রকৃতিঘনিষ্ঠ আধুনিক স্থাপত্যচর্চার তেমন কোনো উদ্যোগ পশ্চিমা দেশগুলোতেও মেলে না। 

এখন দেখা যাক, আধুনিক স্থাপত্যে মাজহারুল ইসলামের হাতেখড়ি কীভাবে। ১৯৫০ সালে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক সরকারের একটি ডেভেলপমেন্ট স্কলারশিপ নিয়ে মাজহারুল ইসলাম আমেরিকার ওরেগন অঙ্গরাজ্যে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অফ ওরেগন, ইউজিনে পড়তে যান। সেখানে ভর্তি হন স্থাপত্যে পাঁচ বছরের স্নাতক প্রোগ্রামে। কিন্তু যেহেতু তাঁর এরই মধ্যে পশ্চিম বাংলার শিবপুর থেকে পুরকৌশলে স্নাতক ডিগ্রি ছিল, তাই তাঁকে দুই বছরের মধ্যে স্থাপত্যে ডিগ্রি লাভের সুযোগ দেওয়া হয়। 

ওরেগন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। আমেরিকায় আধুনিক স্থাপত্যশিক্ষার এটি ছিল অগ্রগামী প্রতিষ্ঠান। সে-দেশে স্থাপত্যের অধিকাংশ স্কুল গড়ে উঠেছিল প্যারিসকেন্দ্রিক, ইতিহাসমুখী 
 বোজ-আর্টস (Beaux-Arts) শিক্ষা কার্যক্রম অনুসরণ করে। ১৯২২ সালে ইউনিভার্সিটি অফ ওরেগনের স্থাপত্য বিভাগ সর্বপ্রথম বোজ-আর্টসকে প্রত্যাখ্যান করে মিশিগান অঙ্গরাজ্যে অবস্থিত এলিয়েল সারিনেন-এর ক্র্যানব্রুক অ্যাকাডেমি অফ আর্টস-এর (Eliel Saarinen, Cranbrook Academy of Fine Art) আদলে একধরনের পরীক্ষামূলক, মুক্তমনা, আধুনিক নন্দনতত্ত্বভিত্তিক স্থাপত্য শিক্ষাকার্যক্রম চালু করে। স্থপতি মাজহারুল ইসলাম এই স্কুলেরই ফসল।

ইউনিভার্সিটি অফ ওরেগনে দুজন অধ্যাপক মাজহারুল ইসলামকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছিলেন। তাঁরা হলেন – ওয়ালেস হেইডেন (Wallace S. Hayden, 1905-1994) এবং মারিওন ডিন রস (Marion Dean Ross, 1913-1991)। হেইডেন ছিলেন একজন পেশাজীবী স্থপতি। দুই দশক ধরে ইউজিনে ডিজাইন স্টুডিও পড়াচ্ছিলেন। তাঁর কাছ থেকে মাজহারুল ইসলাম অনুপ্রেরণা লাভ করেছিলেন স্থানিক বৈশিষ্ট্য ও জলবায়ু কীভাবে আধুনিক স্থাপত্য রচনার ভিত্তি হতে পারে। অন্যদিকে রস ছিলেন স্থাপত্য-ইতিহাসের শিক্ষক, বিখ্যাত সোসাইটি অফ আর্কিটেকচারাল হিস্টোরিয়ান্স-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। ইউজিনে তিনি তিন দশক ধরে শিল্প আর স্থাপত্যের ইতিহাস পড়াচ্ছিলেন। 

মাজহারুল ইসলাম প্রায়ই স্মরণ করতেন ডিন রস কীভাবে তাঁকে ইতিহাস-সচেতন ও অনুসন্ধিৎসু করে তোলেন। প্রকৌশলী থেকে স্থপতিতে রূপান্তরের সময় মাজহারুল ইসলামের ওপর রসের প্রভাব ছিল জোরালো। বয়সে দশ বছরের বড় ডিন রস ইউজিনে যোগদান করেছিলেন ১৯৪৮ সালে। তিনি স্থাপত্যে স্নাতকোত্তর হন হার্ভার্ড থেকে, বাউহাউস-এর জার্মান প্রতিষ্ঠাতা-পরিচালক ওয়াল্টার গ্রোপিয়াসের (Bauhaus, Walter Gropius) তত্ত্বাবধানে। গ্রোপিয়াস ছিলেন ইউরোপীয় স্থাপত্যে আধুনিকতার অগ্রদূত। ১৯২০-এর দশকের মাঝামাঝি জার্মানির ডেসাউ (Dessau) শহরে তাঁর ডিজাইন করা বাউহাউস ভবনটি আধুনিক স্থাপত্যের অন্যতম প্রতীক। তিরিশের দশকে গ্রোপিয়াস নাৎজি জার্মানি থেকে চলে আসেন আমেরিকায়। ১৯৩৭ সালে হার্ভার্ডের গ্র্যাজুয়েট স্কুল অফ ডিজাইন-এ যোগদান করেন। পরের বছর এই বিভাগের চেয়ারম্যান হন। এরই মধ্যে হার্ভার্ড ১৯৩০ সালে বাউহাউসের প্রদর্শনী আয়োজন করে এবং যুক্তরাষ্ট্রে বাউহাউসের প্রতিনিধি হিসেবে এক ধরনের প্রথাবিরোধী বা র‌্যাডিকেল পরিচিতি লাভ করে। রস সেই হার্ভার্ডেরই ছাত্র ছিলেন।

এক হিসেবে বলা চলে যে, মারিওন ডিন রস আধুনিকতার এক মৌলিক উৎস থেকেই স্থাপত্যশিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। রস ছিলেন আমেরিকার সেই প্রজন্মের সদস্য যাঁরা ইতিহাসসচেতন স্থাপত্যশিক্ষাকে ইউরোপীয় আধুনিকতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যান। কিন্তু সেই পরিবর্তন অতীতকে পরিহার করে নয়। নিকোলাস পেভসনার, এরউইন প্যানোফস্কি, রুডলফ উইটকোয়ার আর হেনরি রাসেল হিচকক (Nikolaus Pevsner, 1902-1983; Erwin Panofsky, 1892-1968; Rudolf Wittkower, 1901-1971; Henry-Russell Hitchcock, 1903-1987)-এর সহযাত্রী হয়ে ডিন রস ইতিহাস ও আধুনিকতার সাহসী মিলন ঘটিয়েছিলেন। কাজেই রসের ছাত্র হিসেবে মাজহারুল ইসলামও সেই ধারাবাহিকতায় আধুনিকতা আর বিশ্লেষণধর্মী ইতিহাস শিক্ষার মধ্যে কোনো বৈপরীত্য দেখেননি। 

যে-বছর মাজহারুল ইসলাম ইউজিনে এসেছিলেন, সে- বছরেই মারিওন ডিন রস ‘Ten Books on Architecture’ শিরোনামে Journal of the American Institute of Architects-এ একটি প্রবন্ধ রচনা করেন। সেখানে রস জেফ্রি স্কট (Geoffrey Scott, 1884-1929), ল্য কর্বুসিয়ের, হেনরি রাসেল-হিচকক, নিকোলাস পেভনার, লুইস মামফোর্ড (Lewis Mumford, 1895-1990), জন সামারসন (John Summerson, 1904-92) আর জিগফ্রিড গিডিওনের (Sigfried Giedion,1888-1968) বইগুলোর গুরুত্ব সম্পর্কে জোরালো মত প্রদান করেন। মাজহারুল ইসলামের ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারে তাঁদের বই যত্নের সঙ্গে সংগৃহীত ছিল। একবার মাজহারুল ইসলাম আমাকে দশটি বইয়ের তালিকা দিয়েছিলেন। সেই তালিকার সঙ্গে রসের তালিকার মিল ছিল। তার কারণ হয়তো এই যে, মাজহারুল ইসলাম ও তাঁর সতীর্থদের ওপর ওই বইগুলো সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করেছিল। 

এতক্ষণ আমরা বোঝার চেষ্টা করেছি চারুকলা ভবনের নান্দনিক আধুনিকতার উৎস কোথায়। এবার দেখা যেতে পারে মাজহারুল ইসলাম ইউজিন থেকে দেশে ফিরে কোন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চারুকলা ভবনের কাজ হাতে নিলেন। তাঁর দেশে ফেরার কিছুদিন আগে থেকেই ঢাকার রাজপথ মুখর ছিল ‘মাতৃভাষা বাংলা চাই’ স্লোগানে। ১৯৪৮ সালের ২৪শে মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ সদম্ভে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। দেশভাগের কয়েক বছরের মধ্যেই বাঙালি অনুধাবন করেছিল যে, ভিন্ন ভাষা আর সাংস্কৃতিক পরিবেশে লালিত পাকিস্তান রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে রাজনৈতিক ইসলামের কৃত্রিম ভিত্তি। সে-সময় ভাষার অধিকার আদায়ের দাবিতে আন্দোলনকারীরা পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারায়। সালাম, বরকতরা শহিদ হন। উত্তাল দেশে ততদিনে স্বাধিকার আন্দোলনের বীজ বপন হয়ে গেছে। 

দেশভাগের আগে পূর্ব বাংলার মুসলমানরা ইসলামভিত্তিক পাকিস্তান রাষ্ট্রের সম্ভাবনা নিয়ে উৎসাহী ছিল। পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতায়ন সূচিত হবে বলে তারা বিশ্বাস করেছিল। কিন্তু দেশভাগের পরে, যখন দেখা গেল উর্দু ভাষা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, পূর্ব আর পশ্চিমের মধ্যে অর্থনৈতিক আর রাজনৈতিক সমতার সম্ভাবনা ক্ষীণ, তখনই ধর্মনিরপেক্ষ, মানবিক বাঙালি জাতীয়তাবাদ পরিণত হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক দর্শনের চালিকাশক্তি হিসেবে। বদরুদ্দীন ওমর একে বলেছিলেন, ‘পূর্ব-বাংলার মুসলমানদের বোধোদয়।’

এমনই এক প্রেক্ষাপটে মাজহারুল ইসলাম উপলব্ধি করেন চারুকলা ভবন কীভাবে হয়ে উঠতে পারে বাঙালি মানবিকতার বিমূর্ত প্রতীক। ইসলামিক বা ঐতিহাসিক স্থাপত্য-অনুগামী অলংকরণ ছাড়া, প্রকৃতির সঙ্গে অনাড়ম্বর মিলন ঘটিয়ে এই ভবনের ডিজাইন-দর্শনকে তিনি কল্পনা করেন একধরনের রাজনৈতিক শুদ্ধিকরণের প্রক্রিয়া হিসেবে। 

মাজহারুল ইসলাম বাঙালি জাতীয়তাবাদকে উপলব্ধি করেছিলেন রবীন্দ্রনাথের চোখ দিয়ে। আজীবন 
 রবীন্দ্রনাথ-পাঠে মগ্ন মাজহারুল ইসলামের কাছে রবীন্দ্রনাথ কোনো অদৃশ্য, কাল্পনিক শক্তি নন। তাঁর ব্যক্তিগত পাঠাগারে ঠাঁই পেয়েছিল রবীন্দ্রনাথের বিপুল রচনাসম্ভার। চল্লিশের দশকে মাজহারুল ইসলাম যখন শিবপুরে পুরকৌশলের ছাত্র, সে-সময় ১৯৪১ সালে রবীন্দ্রনাথ মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর শবদেহ ঘিরে কলকাতার রাজপথ ছিল জনারণ্য। রবীন্দ্রনাথের মানবিক বোধে উদ্দীপিত ভবিষ্যতের স্থপতি মাজহারুল ইসলাম তখন খুব কাছ থেকে উপলব্ধি করেছিলেন বাঙালির জীবনে রবীন্দ্রনাথ কতটা প্রাসঙ্গিক ও অপরিহার্য। 

চারুকলা ভবনের নান্দনিক তাৎপর্য এবং এর আধুনিকতার শাশ্বত অর্থ বুঝতে হলে, বিশেষ করে বাঙালি জাতীয়তাবাদের সঙ্গে বিশ্ব-মানবিকতার সম্পর্ক কী তা জানতে হলে, রবীন্দ্রনাথের ঘরে বাইরে (১৯১৫) উপন্যাস আমাদের সহায় হতে পারে। এখানে রবীন্দ্রনাথ দেখাতে চেয়েছেন যে, আত্মকেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদ শেষ পর্যন্ত জাতির পরিচয়কে সংগঠিত করতে পারে না। বাইরের সবকিছুকে দূষিত ও পরিত্যাজ্য করে আত্মমগ্ন জাতীয়তাবাদ গড়ে তোলে কৃত্রিম এক দুর্গ। বিশ্ববাসীর সঙ্গে তার আর কোনো সম্পর্ক থাকে না। 

বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় ব্রিটিশবিরোধী স্বদেশি আন্দোলনের সমালোচনা করে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন যে, এই আন্দোলন ঔপনিবেশিক আগ্রাসন আর পাশ্চাত্যের মানবিক মূল্যবোধের মধ্যে পার্থক্য অনুধাবন করতে পারেনি। পাশ্চাত্যের সবকিছুই পরিত্যাজ্য নয়। প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যের সংমিশ্রণে তৈরি হতে পারে বিশ্ব-মানবিকতার কাঠামো। ঘরের পরিচয় পাকাপোক্ত হয় তখনই যখন অন্দর আর সদরের উদার সংমিশ্রণ ঘটে। ইতিহাসবিদ ও ঔপনিবেশিক তাত্ত্বিক দীপেশ চক্রবর্তী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন যে, জাতীয়তাকেন্দ্রিক সংগ্রাম চায় সর্বজনীন মানবাধিকার; কিন্তু সেই সংগ্রামের রাজনৈতিক চালিকাশক্তি হয় জাতির নিজস্ব সংস্কৃতি – ভাষা, সাহিত্য, কৃষ্টি, ধর্ম, ইতিহাস এবং রাজনীতি। জাতীয়তাবাদী দর্শনের সীমাবদ্ধতা এখানেই যে, যৌক্তিক রাষ্ট্র পরিচয়ের শাশ্বত কাঠামো আর সংস্কৃতির স্থানীয় ভাবনা – এই দুইয়ের দ্বন্দ্ব জাতীয়তাবাদী শক্তি সমাধান করতে পারে না। কিন্তু এই দ্বন্দ্বেই রয়েছে সংকীর্ণ রাষ্ট্র প্রকল্প থেকে দার্শনিক অবমুক্তির সম্ভাবনা। দ্বন্দ্বের দুটো দিক একটি আরেকটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এক ধরনের তৃতীয় ধারার চৈন্তিক রসায়ন তৈরি করতে পারে। 

মাজহারুল ইসলামের চিন্তায় একটি সমান্তরাল স্রোত লক্ষ করা যায়। চারুকলা ভবনের আধুনিকতা এককভাবে বাঙালিত্বকে অথবা বাঙালির মুঘল ইতিহাসকে ঘিরে নয়, বরং বাঙালিত্বকে কত অনায়াসে বিশ্বের মানবিক চত্বরে স্থাপন করা যায়, সেই সাবলীল শক্তিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে। ভবনটির স্থাপত্যিক অবকাঠামো আর এর নান্দনিক দর্শন দুটোই তৈরি হয়েছে ঘরে-বাইরে, অন্দর-সদর, পূর্ব-পশ্চিমের মনস্তত্ত্ব নিয়ে। এখানে একটিকে প্রাধান্য দিয়ে আরেকটিকে স্থুল করার চেষ্টা নেই। মাজহারুল ইসলাম বলেছিলেন, বিশুদ্ধ বাঙালি বলে কিছু নেই। তার বক্তব্য খুবই অর্থবহ : ‘বাঙালি হতে হলে বিশ্বমানব হতেই হবে। এর বিকল্প নেই।’

সবশেষে চারুকলা ভবনে মাজহারুল ইসলামের তর্কটা এরকম : দেশভাগের পরে ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি জাতীয়তাবাদকে স্থাপত্যের নান্দনিক ভাষায় ফুটিয়ে তুলতে প্রয়োজন ছিল বাঙালির পোশাকি ইতিহাসের শুদ্ধিকরণ। ইতিহাসের অলংকারবিহীন, প্রকৃতিঘেরা আধুনিকতা সেই প্রক্রিয়াকে সম্ভব করেছিল। এই শুদ্ধিকরণ বাঙালিত্বের সংকীর্ণ সংজ্ঞাকে অতিক্রম করে সাবলীলভাবে। চারুকলা ভবনে বাঙালি একই সঙ্গে ঘরে আর বাইরে বিচরণ করে। বাঙালি বসবাস করে পূর্বে, পশ্চিমে। এখানে পলিমাটির তৈরি ইটের ধ্যানমগ্ন দেয়াল মিলেমিশে আছে কংক্রিটের ফ্ল্যাট সø্যাবের শুদ্ধতার সঙ্গে। ওখানে কূপমণ্ডূকতার সুযোগ নেই। চারুকলা ভবনকে দেখতে হবে ‘সাত কোটি সন্তানেরে, হে মুগ্ধ জননী,/ রেখেছ বাঙালি ক’রে, মানুষ কর নি’ রাবীন্দ্রিক অভিযোগের বিরুদ্ধে একটি নান্দনিক প্রতিবাদ হিসেবে। এটাই স্থপতি মাজহারুল ইসলামের সবচেয়ে বড় অবদান।

স্থপতি মাজহারুল ইসলামের বৃহত্তর মূল্যায়ন এখনো অধরা। তাঁর কাজ নিয়ে মৌলিক গবেষণা যৎসামান্য। সিংহাসনে বসিয়ে তাঁকে কুর্নিশ করা হয়েছে; কিন্তু শ্রমসাধ্য বলেই হয়তো তাঁর কাজ নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা হয়নি। মাজহারুল ইসলামের স্থাপত্য ও সমাজচিন্তা এবং তাঁর নন্দনতাত্ত্বিক ভাবনাকে তীক্ষ্ণ, বিশ্লেষণধর্মী গবেষণার আওতায় আনতে পারলে হয়তো অন্যরা সেখান থেকে কিছু গ্রহণ করতে পারবেন। কুর্নিশ নয়, গবেষণালব্ধ জ্ঞান উৎপাদনের মধ্য দিয়েই তাঁকে প্রকৃত সম্মান প্রদর্শন করা সম্ভব।

যখন ইউনিভার্সিটি অফ ওরেগন, ইউজিনের আর্কাইভে বসে মাজহারুল ইসলামের মার্কশিট দেখছিলাম, তখন তাঁকে রক্ত-মাংসের মানুষ মনে হচ্ছিল। আর সবার মতো তাঁর প্রতিভা ও সীমাবদ্ধতা দুটোই ছিল। সেটাই স্বাভাবিক। মুক্তমনা গবেষণার জন্য এই উপলব্ধিটাই প্রথম শর্ত। মাজহারুল ইসলামের ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারে রেইচেল কারসন-এর বিখ্যাত পরিবেশবাদী বই সাইলেন্ট স্প্রিং (১৯৬২) দেখে বুঝেছিলাম তিনি স্থাপত্যপেশায় জ্ঞানচর্চাকে কতটা প্রাধান্য দিতেন। তাঁর স্থপতি-মন কীভাবে কাজ করত, এই বইয়ের উপস্থিতি সেই ইঙ্গিত বহন করে। 

মার্কিন লেখক উইলিয়াম আর্থার ওয়ার্ড (William Arthur Ward, 1921-94) বলেছিলেন, সাদামাটা শিক্ষক শুধু বলেন। ভালো শিক্ষক ব্যাখ্যা করেন। আরো ভালো শিক্ষক ব্যবহারিক জ্ঞান দান করেন। আর একজন মহান শিক্ষক অনুপ্রাণিত করেন। মাজহারুল ইসলাম ছিলেন শেষ গোত্রের। তিনি জানতেন, একজন ছাত্রের কল্পজগতে জ্ঞানচর্চার শিখা কীভাবে প্রজ্জ্বলিত করতে হয়। 

আমাদের প্রত্যাশা, নতুন প্রজন্মের স্থপতি, শিক্ষক ও গবেষক মাজহারুল ইসলামকে গভীরভাবে পাঠ করবেন। তাঁর কাছ থেকে এখনো অনেক নেওয়ার আছে।