শুক্তি হাতিরপুল বাজার থেকে যে মাছটা এনেছিল, সেটা খেতে গিয়ে দুপুরে কাঁটা ফুটল বাহারুলের গলায়। দিন গেল। রাত গেল। সকালও যায় যায়। কাঁটা যায় না।

বাহারুল চা খেতে বসে খকখকিয়ে কাশছেন দেখে শুক্তি অবাক হয়ে বলল, ‘তুমি কী বাবু নাকি? বুড়ো বয়সে খোকাদের মতো মাছ খেয়ে গলায় কাঁটা বেঁধে, আশ্চর্য!’

একটু লজ্জার ছায়া পড়ল মানুষটার মুখে।

দুই মুহূর্ত নীরব থেকে বিব্রত গলায় বললেন, ‘এজন্য আমাকে দায়ী করতে পারো। কিন্তু এটা তো ইচ্ছে করে করিনি। চেষ্টা করেছি কাঁটা বেছে খেতে। কিন্তু এটা এমন হিডেন ছিল যে সহজে চোখে পড়েনি। অথচ খোঁচাটা ঠিকই টের পাচ্ছি। ওটা আছে এবং বিশ্রীরকমভাবে আটকে আছে গলায়।’

মেহজাবিন আফরোজ শুক্তি কলেজে যুক্তিবিদ্যা পড়ায় বলে একটা দার্শনিক যুক্তি দাঁড় করাল একটু প্যাঁচানো কথায়, ‘এই যেমন তোমার প্রমোশনটা আটকে গেল আনসিন কাঁটার কারণে। কাঁটাটা আমরা দেখছি না বটে, কিন্তু কাঁটাটা ঠিকই আছে। শুধু সাদা চোখে এটা আমরা দেখতে পাচ্ছি না। তোমার মতো অনেস্ট সিনসিয়ার অফিসারের প্রমোশন কেন আটকে গেল! এটা ইনজাস্টিস। অন্যায়।’

শুক্তির গলায় ক্রোধের আগুন ফুঁসে উঠল।

বাহারুল কাশিটা সামাল দিয়ে শান্ত গলায় বললেন, ‘সেটা ভালো বলতে পারবেন পিডি কাদেরি সাহেব। সোনাখালি ব্রিজের কাজটা টেককেয়ার করেছেন ইঞ্জিনিয়ার মহসিন সাহেব। উনি বদলি হওয়ার পর রুটিনওয়ার্ক হিসেবে অ্যাডিশনাল দায়িত্ব পড়ল আমার কাঁধে। দায়িত্ব নেওয়ার পর কাজের ল্যাকনেস নিয়ে যা বলার অফিসিয়ালি বলেছি। কাজও বন্ধ করে দিয়েছি বারদুয়েক। কিন্তু পাবলিক ফাংশনের অজুহাতে চক্রান্তের তীর বুমেরাং হলো আমার বিরুদ্ধে। প্রতিবাদ করে সরে এলাম কাজ থেকে। লাভ হলো না। কাঁটাটা ঠিকই আটকে গেল গলায়।’

শুক্তি চায়ে চুমুক দিয়ে মজার মুখ করে বলল, ‘তাহলে মাছের কাঁটাটা ঠিকই লুকিয়ে আছে খাবারের আড়ালে। যতই বেছে খাও না কেন, সুযোগমতো ঠিকই আটকে যাবে গলার নালিতে।’

‘ঠিক। আমাদের মতো হাঁদারামদের মাছ খেতে যাওয়াই বোকামি। অথচ করমোরেন্ট টাইপের লম্বা গলার লোকগুলো আস্ত মাছ গিলে খেলেও সমস্যা নেই। সমস্যাটা কাঁটার নয়, মানুষের…।’

গুরুগম্ভীর কথার ফাঁকে সহসা দোতলার কায়সার সাহেবের বাসা থেকে দড়াম দড়াম আওয়াজ ভেসে এলো। বিষয়টা কী! শুক্তির বিষম খাবার অবস্থা হলো। সে চায়ের কাপ গুছিয়ে উঠে গেল বারান্দার কাছে। গ্রিল বেয়ে ওঠা বোগেনভেলিয়ার ডাল সরিয়ে উঁকি দিলো নিচে।

হ্যাঁ, ঠিকই শীলা ভাবির গলা। কি হলো সাত সকালে! দেয়ালের ওপর দাঁড়িয়ে দারোয়ান রবিউল কি যেন দেখছে জানালায় উঁকিঝুঁকি মেরে। ডাকাডাকিতে সাড়া দিলো না। ব্যাপারটা খটকা লাগছে দেখে কাজের মেয়ে জয়গুনকে নিয়ে শুক্তি নিচে গেল।

আসলে এখন সাত সমুদ্রে হাবুডুবু খাওয়া ছাড়া গতি নেই। গলার কাঁটার খোঁচাটা পুনরায় ফিরে আসায় অসহ্য এক যন্ত্রণায় মুখ বেঁকিয়ে বাহারুল বসে থাকলেন সোফার ওপর।

শীলা ভাবির দরজায় পুনরায় দড়াম দড়াম আওয়াজ উঠল। মনে হলো সাত রিখটার স্কেলে ভূমিকম্প শুরু হলো বুঝি! কদিন আগে যে-কঠিন ভূমিকম্পটি হয়েছিল সেই স্মৃতি মুছে যায়নি এখনো। মোটামুটি বড় ধাক্কাই বলতে হবে। শুয়ে একটু আরাম করছিলেন। হঠাৎ শুরু হলো কেয়ামতি ধাক্কা। 

সুরা-কালাম আওড়াতে আওড়াতে হাঁকডাক শুরু করলেন সবার নাম ধরে। ভেবেছিলেন এটাই শেষ। মরতে হয় একসঙ্গেই মরবেন। কিন্তু মরতে হলো না শেষতক। কম্পন থেমে গেল কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে। সবাই ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল পরস্পরের মুখের দিকে। শুক্তির মুখখানা ফ্যাকাসে। দুই মুহূর্ত নীরব থেকে সে উদাস গলায় বলল, ‘দরকার নেই এই পোড়া শহরে থেকে। এটা তো এমনিতে গার্বেজ হয়ে গেছে। চলো, আমরা ধানসাগরে ফিরে যাই। ওখানে একটা মাটির ঘর বানিয়ে থাকব। কি পারবে না?’

‘কেন পারব না! আগে অবসরটা নিয়েনি। তখন দেখা যাবে।’

‘তাহলেই হয়েছে! মধ্যবিত্তের এটাই বড় সমস্যা। তাদের এক পা মাটিতে। আরেক পা কার্পেটে। এরা না পারে মরতে। না বাঁচতে। মাঝখান থেকে জ্বলেপুড়ে খাক হয়ে যায়।’

শুক্তি নিচতলা থেকে কাঁপতে কাঁপতে এসে ধপাস করে বসে পড়ল চেয়ারে, ‘ওহ মাই গড, দেখা যায় না! কী ভয়ংকর! হায় আল্লাহ, কী হলো জমানা?’

বাহারুল চোখ কপালে তুলে বলল, ‘কী ব্যাপার বলো তো, অমন করছ কেন? একটু শান্ত হও। ফ্যান চালিয়ে দেব?’

‘না, না, লাগবে না। আমাকে একটু পানি দাও। গলা শুকিয়ে গেছে।’

‘দিচ্ছি। তার আগে তুমি আরাম করে সোফায় বসে সামান্য জিরিয়ে নাও।’

বারান্দা থেকে তেরচা রোদ পিচকারি দিয়ে আলো করে দিলো ভেতরটা। বোগেনভেলিয়ার ডালে আগুন হয়ে ফুটেছে লাল ফুলের থোকা। একটা চড়ুই খুব মন খারাপ করে সেখানে দু-দণ্ড বসে সহসা উড়ে গেল ব্যস্ত ডানায়।

শুক্তি এক চুমুকে পানিটুকু শেষ করে স্থির হয়ে বসল। দুই মুহূর্ত নির্বাক থেকে ফিসফিসিয়ে বলল, ‘নীলু কোথায়?’

‘ঘুমোচ্ছে।’

‘এতো বেলা হলো এখনো ঘুমিয়ে কেন? কোচিংয়ে যাবে না!’

‘আজ তো শুক্রবার। ছুটির দিনে ঘুমোক না আর একটু।’

‘শোনো, ও যে বাইক কেনার বায়না ধরল তার কী করলে?’

‘পাগল নাকি! এতো অল্প বয়সে বাইক পেলে মাথা ঠিক থাকবে?’

‘কেন, ওর কলেজের বন্ধুরা অনেকেই তো বাইক চালায়। রিংকু, তুহিন, পলাশ…।’

‘যে চালায় চালাক। ওর দরকার নেই। দ্যাটস ফাইনাল।’

‘তুমি তো বলেই খালাস। যত ঘ্যানঘ্যান আমার সঙ্গে। আমি বলি কী…।’

শুক্তি সোফায় মাথা হেলিয়ে নিঃসাড় পড়ে থাকল কয়েক মুহূর্ত। ফ্যাকাসে ঠোঁটদুটো কেঁপে উঠছে বারবার। এলোমেলো ক’গাছা চুল আলগোছে এসে পড়েছে কপালের ওপর।

বাহারুল একটু ঝুঁকে উদ্বিগ্ন গলায় ডাকলেন, ‘শুক্তি।’

‘বলো।’

‘তুমি ওরকম করছ কেন? কি হয়েছে বল তো!’

‘কই, কিছু হয়নি তো!’

‘কায়সার সাহেবের বাসায় কি দেখলে শুনি?’

‘কি বলব, এটা কী বলার মতো কিছু!’

‘আহা, বলোই না।’

‘রিতু সুইসাইড করেছে।’

‘কী বললে! কেন? ও তো বাচ্চা একটা মেয়ে..!’

‘জানি না। কেউ কিছু বলতে পারে না।’

শুক্তি আড়মোড়া ভেঙে ধীরে ধীরে উঠল। তারপর মন্থর শরীর টেনে টেনে নীলুর শিয়রে গিয়ে বসল, ‘নীলু, এই নীলু, ওঠ, এত বেলা করে কেউ ঘুমোয় নাকি? কী যে তোদের হলো বুঝতে পারি না!’

নীলু আর রিতুরা এমনই। কেউ তাদের বুঝতে পারে না।