হৃদয়ের জলছবি

শাবল, গাঁইতি, কোদাল, কুড়াল কোনোটাই বাদ যায়নি। সঙ্গে হাতুড়ি, বাটাল, দা-কাঁচি, কুর্নিসহ দরকারি-অদরকারি এমন কোনো সরঞ্জাম নেই, যা ওদের আয়োজনে যুক্ত হয়নি। 

লটবহরে ঠাসা লাল পিকআপ। ডাক বিভাগের গাড়ি ওটা। সারা গা ধুলোয় মাখামাখি। রাষ্ট্রীয় ডাক অথচ দেখতে কী কদাকার! জায়গায় জায়গায় রং চটে গেছে। বিভাগের ‘বি’ নেই। ডাকের নেই ‘ক’। বাংলাদেশের ‘একার’ নেই। নেই ‘শ’। সব মিলিয়ে ডাক বিভাগের মতোই ত্রাহি-ত্রাহি অবস্থা পিকআপের। 

ওদিকে ডাকহরকরা ঠিকই ছুটছে বল্লম হাতে। কাঁধে ঝোলা। পায়ে ক্ষিপ্রগতি। সামনে গন্তব্য। চোখে যেন ঘড়ির কাঁটার লাগাম টেনে ধরা। রাষ্ট্রীয় ডাকের তকমা আঁটা পিকআপের গায়ে। শরীরজুড়ে ওর এবড়ো-খেবড়ো গর্ত। কোথাও ধেবড়ে গেছে, কোথাও ট্যামা হয়ে আছে। শরীরের লেখাজোখারাও ফোকলা বুড়ির মতো মাড়ি বের করে হাসছে।

যক্ষ্মারোগীর মতো হাড় খিঁচিয়ে পিকআপটি প্রধান বিচারপতির বাংলোর সামনে সবুজ চত্বরে এসে সাইড করে দাঁড়ায়। দমকে দমকে কাশির রোগীর যেমনি বুক ভেঙে আসে ব্যথায়, তেমনি গিয়ারের চাপে উটকো দমকে পিকআপ কাঁপছিল। ঝ্যারেঝ্যার একঘেয়ে বিরক্তিকর এক শব্দ। সেইসঙ্গে মাঝেমধ্যেই বুকফাটা আর্তনাদ। কখনো গোঁ-গোঁ করে বিকট শব্দে কঁকিয়ে উঠছে। গলগল করে কালো ধোঁয়া বেরিয়ে আসছে তখন গাড়ির হাঁপর ছেড়ে। কী এক অস্থির পায়চারি। একটু পরপরই আগুপিছু করছে পিকআপটি। ওর শক্তিমত্তা আর উপস্থিতি জানান দিতে বোধহয় মরিয়া হয়ে উঠেছে পিকআপটি। 

এবার অনেকটা সময় ধরে টপ গিয়ার চেপে ধরেছে ড্রাইভার। ফুটপাত ডিঙিয়ে উঁচু চাতালে ওঠার চেষ্টা ওর। পিকআপজুড়ে গরগর-গরগর শব্দ। এ-শব্দ যেন বুকভরে উপভোগ করছে ড্রাইভার। মোটা গোঁফ ওর দু-গালের অনেকখানি ছুঁয়েছে। মুখে পান। লাল চিপটি ঠোঁটের কষ বেয়ে পড়ছে। চোখদুটোও নির্ঘুম। কেমন যেন ঢুলুঢুলু ভাব। পড়ন্ত বেলার লালচে আভা ওর দুচোখ জুড়ে। তাকালে বুকে কাঁপন ধরে। সবমিলিয়ে ডাকাবুকো চেহারা ড্রাইভারের। কী এক মাদকতা ওর চোখেমুখে!

ও আচ্ছা করে গিয়ার চাপছে আর পিকআপে কাঁপুনি ধরলে মাথা বের করে পেছনের চাকার দিকে খেয়াল রাখছে। মহাবিরক্ত! না, চাকার কোনো হেলদোল নেই। একেবারে নড়ছে না। একটু দোল খাচ্ছে শুধু। কাজের কাজ তেমন কিছুই হলো না। সামান্য দম নিয়ে ফের টপ গিয়ার চেপে ধরেছে ড্রাইভার। ভাবগতিক এমন, যেন কারো গলা বুঝি চেপে ধরেছে। 

এতে কাজ হলো না। ওদিকে কিম্ভুতকিমাকার গাড়ির উটকো আচরণে বিচারপতির বাড়ির বেশ কজন মালি, আর্দালি, চৌকিদার, পাঁচিলের ফাঁক গলে চারপাশ দেখে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করছিল। ও-বাড়ির দোতলার লনেও দু-চারজন করে ভিড় করছিল। কারো চোখে-মুখে বিরক্তি। কারো আবার বিস্ময়! তবে পিকআপের চাকার ঘষায় চাতালের অনেকখানি জায়গার ঘাস ধেবড়ে গেছে, ছড়ে গেছে, কোথাও একেবারে উঠে গেছে। সেইসঙ্গে ধুলোর ওড়াউড়ি। মুহূর্তে চাতালের বৃষ্টিধোয়া সবুজ লাবণ্যটুকু কে যেন খামচে ছিবড়ে একেবারে ত্যানা করে দিয়েছে। বিবর্ণতার ছাপ ঘাসজুড়ে।

রাস্তাটি এমনিতেই বেশ নীরব। বিচারপতির বাংলো মাঝখানে রেখে দুদিক থেকে দুটো রাস্তা এসে মিশেছে ওখানে। এতে ‘ইউ’ আকৃতির একটা দ্বীপ মাথা উঁচিয়েছে। বেশকিছু গাছ খানিক দূরে-দূরে দাঁড়িয়ে। কোনো-কোনো গাছ আবার গায়ে-গায়ে জড়িয়ে। ফলফলাদির গাছই বেশি। গাছগুলোর গুঁড়ির চারপাশে নিচুমতো বেদি গড়া। 
 ফাঁকে-ফাঁকে ঘাসে মোড়া চাতাল। জায়গাটি ছায়াছায়া। বেশ নিরিবিলিও বটে। মাঝেমধ্যে চড়ুই এসে ঘাস খোঁটে। শালিক লাফিয়ে লাফিয়ে এদিক-ওদিক যায়। কখনো বুলবুলি লেজ তুলে এ-ডাল ও-ডাল করে। সবমিলিয়ে পাখির মৃদু কিচিরমিচির চারপাশে মায়া ছড়ায়। অদ্ভুত এক ভালোলাগায় ভরিয়ে রাখে সারাক্ষণ।

সেখানেই তিনটে ডাকবাক্স দাঁড়িয়ে আছে – অ্যাটেনশন ভঙ্গিতে। একটি নীল, একটি লাল, অন্যটি হলুদ। ডাকবাক্সগুলো অনেকদিনের চেনা অঙ্কনের। বাক্সগুলোর বয়সও ম্যালা। সেই থেকে ওদের সঙ্গে একধরনের নীরব সখ্য অঙ্কনের। এর আগে ডাকবাক্সের কোনো ভাগ ছিল না। একটি মাত্র লালবাক্স ছিল। তাতে সাদা অক্ষরে লেখা ছিল ডাক খোলার সময়সূচি। হঠাৎ একদিন বাক্সটি উধাও। তার বদলে তিনটি বাহারি বাক্স এসে বসেছে। তিনটি তিন রঙের। তাতে ডাক খোলার সময়সূচি লেখা আছে। লেখা আছে ওদের পরিচয়। লালবাক্স – বিদেশবিভুঁইয়ে পাঠাতে হলে এ-বাক্সে ফেলতে হবে চিঠি। হলুদ বাক্স – সারা বাংলাদেশে ওর গন্তব্য। নীল বাক্সের চিঠির দৌড় শুধু ঢাকা শহর পর্যন্ত।

যখন থেকে তিনরঙা তিন ভাই এসে দাঁড়িয়েছে এ-চাতালে, তখন থেকেই ওদের সঙ্গে ভাব অঙ্কনের। এর আগে যখন লাল বাক্সটি একা-একা দাঁড়িয়ে থাকত উদাস ভঙ্গিতে, তখন ওদিকে ফিরেও তাকাত না অঙ্কন। মনে হতো বাক্সটি বোবা। কোনো বোধশক্তি নেই। প্রয়োজন নেই বলে তেমন কোনো ভ্রূক্ষেপও ছিল না তখন। অথচ সময়ের হাত ধরে মানুষের মনও কেমন বদলে যায়, ভেবে অবাক হয় অঙ্কন।

আসলে নীলিমার সঙ্গে সম্পর্ক বাঁধার পর থেকেই ডাকবাক্সর সঙ্গেও কেমন এক নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে ওর। প্রায় প্রতিদিনই নীলিমাকে চিঠি না লিখলেই নয়। শুধু কি চিঠি! শুধুই ঈদকার্ড! ঈদকার্ড ছাড়াও নববর্ষের কার্ড না হয় জন্মদিনের শুভেচ্ছা কার্ড। এর বাইরেও কতশত ভিউকার্ড! নানা দেশের কত বর্ণের, কত ধরনের ভিউকার্ড। মনকাড়া সব কার্ড। অনেক খুঁজে পেতে কার্ডগুলো কিনত অঙ্কন। তাতে মনের মাধুরী মিশিয়ে লেখা থাকত 
 দু-চারটে লাইন। কার্ড বাছাই করতে করতে গুনগুনিয়ে গান করার মতো কথাগুলো সাজিয়ে নিত মুখে মুখে। তারপর পার্কে, কোনো গাছতলায় কিংবা কোনো উঁচু ভবনের ছায়ায় বসে মনের কথাগুলো কার্ডে লিখে পাঠিয়ে দিত নীলিমার ঠিকানায়। 

যখন নীলিমা ছিল না, তখন এলেবেলে লাল বাক্সটির দিকে ওর কোনো চোখও ছিল না। বাক্সটির কোনো প্রয়োজনও ছিল না। ফলে বাক্স খোলার সময়সূচি নিয়ে তেমন কোনো মাথাব্যথাও ছিল না ওর। নীলিমার জন্য 
 এ-চাতালের সবকিছু কেমন যেন বদলে গেছে। ডাকবাক্স ছাড়াও চারপাশের গাছ, নিবিড় ছায়া, আশপাশের ঘরবাড়ি, রাস্তার ব্যস্ততা – সবই প্রিয় এখন অঙ্কনের। এ-গাছ এ-ঘাস এ-ছায়া এ-পাখির কিচিরমিচির এবং ওদের ঘিরে তিনরঙা তিনটে বাক্স, সব মিলিয়ে, জায়গাটি কখন যেন এত মায়াময় হয়ে উঠেছে তা একটুও টের পায়নি অঙ্কন। 

নীলিমাকে ভালোবেসে চোখের সঙ্গে ওর মনের চোখও বুঝি বদলে গেছে অবাক রকম। মনের গভীরে গাঢ় রং ধরেছে। মনের সে-রঙে চোখের রং মেখে একটু একটু করে কখন যেন এ-জায়গাটির ভীষণরকম প্রেমে পড়ে গেছে অঙ্কন। সে-প্রেম এখন ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশের সবকিছুতে।

প্রিয় ডাকবাক্সগুলোকে আজ উপড়ে ফেলতে এসেছে ডাকবিভাগের লোকজন। 

ওরা বলছে, বাক্সগুলো এখন অকেজো। কেউ আর চিঠি ফেলে না। কেউ চিঠির জন্য অপেক্ষাও করে না। সবমিলিয়ে বেহাল অবস্থা। বাক্সগুলোর গোড়ার দিকে মরচে ধরেছে। উঁচু ঢিবির মতো মাটি জমেছে। ঘাস গজিয়েছে বেয়াড়ারকম। উইয়েরাও উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে আজকাল। সে-কারণে কি না জানি না, তবে ডাকবাক্সগুলো মেইনটেইন করতে ডাক বিভাগকে নাকি এখন ম্যালা টাকা লোকসান গুনতে হয়। রোজ রোজ গাড়ি করে ঝোলা নিয়ে লোক আসে বাক্স হাতিয়ে দেখার জন্য। যদি একটিও খাম থাকে, না হয় পোস্টকার্ড – তাহলেই তো দায় ঠেকে যায়। ডাকবাক্সে চিঠি ঘুমোবে অথচ গন্তব্যে পাঠানোর দায় থাকবে না, তা তো হতে পারে না! সরকারি দফতর বলে কথা!

ব্রিটিশ আইন! এখনো অনড়। তাই প্রতিদিনই সময়সূচি মেনে ডাকবাক্স খুলে দেখার জন্য লোক আসে খাকি পোশাকে। তিন বেলায় গাড়িপিছু তেল পোড়াতে হয়। জানার বাইরে আরো তো কত খরচ! এতসব খরচের ঠাঁট এবার ছেঁটে ফেলতেই খোদ বাক্স তিনটিই উপড়ে ফেলতে চাইছে ডাক বিভাগ। তাই বেশ ঘটা করে এসেছে ওরা। আয়োজন, জোগাড়-যন্তর কোনোটাতেই কমতি নেই। এবার কিছু একটা ঘটিয়েই ছাড়বে – ভাবটা এমন ওদের। 

তবে কী ওরা ভাবছে আশপাশের লোকজন বাধা দেবে? তাই দেখিয়ে দেওয়ার মহড়া ওদের সবকিছুতেই। লাভের মুখ দেখাবে বলে ওরা বুঝি পণ করেছে এবার। তাই আদাজল খেয়ে লেগে পড়েছে। অচ্ছুৎ অপয়া অনাবশ্যক এ-বাক্সগুলোর মুখ আর দেখতে চায় না ওরা। ডাকবাক্সের ছায়া মাড়াতেও ওদের বুঝি সম্মানের গায়ে ঘা পড়ে। 

সারাক্ষণ কী একটা হামবড়া ভাব। বুঝি আশপাশের লোকজন থেকে ভীষণ আপত্তি আছে। তাই বাক্সগুলোর অস্তিত্ব হাপিশ করতে ওদের আর তর সইছে না। সে-ভাবের আঁচ অনেকটা পিকআপের গায়েও এসে পড়ছে। তাই 
 ঘোঁত-ঘোঁত খ্যাক-খ্যাক করে নীরব জায়গাটিকে সেই কখন থেকে মাথায় তুলে রেখেছে। বড় গলায় হাঁক দিচ্ছে অনবরত। হাট্-হাট্, সরে দাঁড়াও।

শেষ পর্যন্ত বাক্সগুলো উপড়ে ফেলা হবে! বুকের ভেতর মোচড় খায় অঙ্কনের। হৃদয় ভাঙার আগে ওর বুকের পাঁজরগুলো যেন ভেঙে যাচ্ছে এক এক করে। কত স্মৃতি, কত কথা। কত মায়া, কত ব্যথা, কত অপেক্ষা, কত উপেক্ষা আর অবজ্ঞা জড়িয়ে আছে এ-বাক্সগুলোর সঙ্গে। 

এছাড়া আর উপায়ই বা কী! তখন তো আর মোবাইল ছিল না। ই-মেইল ছিল না। ছিল না ফেসবুক কিংবা ইমো। না হয় ভাইবার। টেলিফোনও ছিল হাতের নাগালের বাইরে। সারা পাড়ায় দু-তিনটে ঘরেও টেলিফোন ছিল না। থাকলেও লাইন থাকত প্রায়ই নষ্ট। কথা বলা তো আর কথা বলা নয়। রীতিমতো গলার ব্যায়াম হয়ে যেত – হ্যালো … হ্যালো … শুনতে পাচ্ছো …। কখনো ক্রস কানেকশনের বিড়ম্বনা!

অন্যের বাড়ি গিয়ে ফোনে না হয় খুব দরকারি দু-একটা কথা বলা যায়। তাই বলে প্রেম!

চিঠিতেই প্রেমের বানভাসি। চিঠিতে প্রেমকাব্য লেখা ছাড়া আর কী কোনো গতি ছিল! মানুষে মানুষে যোগাযোগ তো ছিলই চিঠিকেন্দ্রিক। সে-চিঠি নিতে রোজ দু-ঘণ্টা পরপর ডাকের লোকজন এসে বাক্সগুলো খুলত যখন, হুমড়ি খেয়ে খামবন্দি চিঠিগুলো লাফিয়ে পড়ত। 

বাক্সের ভেতরে। কত বাহারি সব খাম। কত চোখকাড়া সব ডাকটিকিট। ডাকের লোক দু-হাতে খাবলে পুরু খাকি থলেতে পুরত সেসব চিঠি। এত্তো এত্তো চিঠি! কখন যে জমা হতো। সে এক বিস্ময় বটে। ফের দু-ঘণ্টা বাদে যখন বাক্স খোলা হতো সেই একই দৃশ্য। থলে ভরে উঠত মুহূর্তে। আন্তর্জাতিক, বাংলাদেশ, ঢাকা – কোনো থলেতেই কমতি নেই। চিঠির পর চিঠি। খামের পর খাম। হারানো সেসব চিঠির ভিড়ে যখন মগ্ন অঙ্কন, তখনই ঘটাং-ঘটাং শব্দে ওর মগ্নতা ভেঙে যায়। প্রথমে নীল বাক্স কব্জা করতে নেমে পড়েছে লোকগুলো। মুগুরের মতো ভারি হাতুড়ি দিয়ে বাক্সের গোড়ায় বেদম পেটাচ্ছে ওরা পালা করে। শরীরের সব শক্তি ঢেলে দিচ্ছে ওরা প্রচণ্ড ক্ষিপ্রতায়।

লোহার তৈরি বাক্সগুলো। ওদের শরীর মাটির অনেক গভীর পর্যন্ত গাঁথা। মনে হচ্ছে না খুব সহজেই উপড়ে ফেলা যাবে। বাক্স শুধু লোহার হলে হতো, তা আবার লোহার বেড়ি দিয়ে শক্ত করে বাঁধা। বেড়ির গায়ে আবার মোটা শেকল জড়ানো। শেকলের গায়ে গায়ে তালা ঝুলছে। যে-সে তালা নয়, পেল্লায় সাইজ। অনেকটা পুলিশের ডাণ্ডাবেড়ির মতো দেখতে। বাক্সের গায়ে গায়ে জড়ানো বেড়িটা। আষ্টেপৃষ্ঠে এত ভার জড়িয়ে এতদিন কী করে যে কাটিয়েছে বাক্সটা। রীতিমতো হাঁসফাঁস অবস্থা। গলায় বেড়ি, শেকল, তালা। তার সঙ্গে মাটির গভীর থেকে পাকা গাঁথুনি। সব মিলিয়ে যক্ষের ধনের মতোই বাক্সের যত্নআত্তির ব্যবস্থা। সব দেখে মনে হয়, চিঠির বাক্স না, যেন গুপ্তধনের বাক্স ওটা।

চারদিকে মানুষ করছেটা কী! দিনেদুপুরে এত বড় বড় সব বাক্স উপড়ে ফেলছে দু-তিনজন মানুষ। অথচ বলার কেউ নেই। মহাবিরক্তিতে কপালের চামড়া কুঁচকে আসে অঙ্কনের। চোখ দুটো খুদিখুদি। সেখানে বিস্ময়, রাগ না ক্ষোভ বাসা বেঁধেছে তা ঠিক বোঝা যায় না বাইরে থেকে।

এতদিন চিঠি ফেলার জন্য শুধু বাক্সের মুখের দিকেই নজর ছিল অঙ্কনের। এখন ভালো করে খেয়াল করে দেখল, ঢাকনাটা ভেতরমুখো। আলতো ঠেলে দিলেই সরে যেত। আর টুপ করে ছেড়ে দিত চিঠি। নীরবে জায়গা করে নিত বাক্সের ভেতরে। কখনো আবার দেখা যেত চিঠি আর খামের ভিড়ে বাক্সের মুখ অবধি ঠাসা। বাড়তি আরেকটা চিঠি যে ঢোকাবে তারও জো নেই। কাঠি দিয়ে ঠেলেঠুলে অনেক কষ্ট করে একটু জায়গা বের করত। তারপর ঠেসে দিত ওর চিঠিটা। কখনো সেটুকু জায়গাও হতো না। মিস করলে ঘড়ি ধরে অপেক্ষা করতো ডাকের গাড়ির জন্য।

একবার ডাক মিস করলে কমপক্ষে তিন ঘণ্টা পেছনে। তার মানে নীলিমার কাছে চিঠি পৌঁছতে পৌঁছতে বাড়তি আরো এক থেকে দুদিনের হ্যাপা!

একেবারে ঘড়ি ধরে যে গাড়ি আসত তা নয়, তেমন হলে অপেক্ষার যন্ত্রণাও তীব্র হতো। একসময় ডাকের লোক এলেও সেভাবে পাত্তা পেত না ওদের কাছে। মহাব্যস্ততা ওদের চোখেমুখে। একমনে খাবলে খাবলে চিঠি বের করত বাক্সের ভেতর থেকে। সঙ্গে সঙ্গে চালান হয়ে যেত খাকি রঙের ডাকব্যাগে। বাক্সে ঠাঁই হয়নি বলে হাতে হাতে চিঠি বাড়িয়ে দিলেও কাজ হতো না। মহাবিরক্তি নিয়ে কেবল একটু তাকাতো চোখ তুলে। ট্যারা সে চোখ। হাজারো জিজ্ঞাসা। কখনো সেটুকুরও ফুরসত হতো না ওদের। বুকে জ্বালাধরানো সব কথা। কেমন একটা ভাব ওদের চোখেমুখে। কখনো মুখে একটু রা সরলেও মনে হতো ঝালমুখে কথা বলছে। শরীরের ভাষাও তেমনি। যেন ফোস্কা পড়ে গা জ্বালা করছে। কথায় কোনো রসকষ নেই। ছিবড়ানো আখের মতোই রসহীন। নাছোড়বান্দা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চোয়াল শক্ত করে খিঁচড়ে উঠত, – কতবার বলব, ও হবে না। একেবারে নিষেধ। হাতে হাতে চিঠি নিলে চাকরি থাকবে না। সরকারের কড়া হুকুম আছে।

কখনো কেউ একটু নিমরাজি হলেও চিঠি হাতে নিয়ে বলত, ম্যালা ওজন। কত টাকার ডাকটিকিট লাগাতি হবে তা জেনে সেঁটেছ তো!

আন্দাজমতো লাগিয়েছি।

আন্দাজে কাজ হবি না নে বাপ! মেপে দিতি হয় সেটা। কত ওজনে কত টাকার টিকিট লাগাতি হবে, তা সরকার বেঁধে দিয়েছে।

চিঠির ওজন মাপ দিলি তবে তো ওরা বলবি, কত টাকার টিকিট খাওয়াতি হবি! সেমতো টিকিট লাগাতি হয়!

এ কি মুদি বেটার কারবার! পাল্লায় মাপলাম আর সের ছটাক পোয়া কাচ্চি হিসাব করে বলে দিলাম। খাড়ার ওপর টাকা দিয়ে সব দেনা মিটে গেল। বাবা, ডাক বিভাগের মাপ লাগবি। মেশিনের মাপ। মেপেটেপে ওরা বলে দেবে,

আট-বারো-ষোলো না পঁচিশ টাকার টিকিট লাগাতি হবি! আর তুমি বলছো আন্দাজে লাগিয়েছি। এটা কি আন্দাজের ব্যাপার? সরকারের আয় এর সঙ্গে বাঁধা আছে। তোমার মতো যদি প্রত্যেকেই এক টাকা করে কম টিকিট লাগায়, তাহলে সারাদিনে কত লাখ টাকার ক্ষতি ডাক বিভাগের ভেবে দেখেছ!

তা তো বুঝলাম। যদি আপনার কাছে টাকা দিয়ে দিই তাহলে?

মানে?

মানে মাপের পর টিকিট আরো লাগলে সে টাকায় কিনে লাগিয়ে নেবেন।

যদি বেশি লাগে? যদি এ টাকায় না কুলোয় তখন?

ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে অঙ্কন তাকিয়ে থাকে ডাকের লোকটির দিকে।

তখন তোমার চিঠি ওভাবেই পড়ে থাকবে। মাঝখান থেকে তোমার টাকাকটিও যাবে আমার পকেটে। কী দাঁড়াল! টাকাও পেলে না। চিঠিও গেল না! তখন আমাকে শুধু শুধু অপরাধী করে রাখবে।

অগত্যা আর কী করে।

ওদিকে খপ-খপ করে চিঠি ব্যাগে পুরে ডাকের গাড়ি চলে যায় একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে।

সোজা জিপিওতে গিয়েও স্বস্তি নেই। সেখানেও আবার অফিসের ভেতরেই কাচের বড় বড় জারের মতো বাক্স রাখা আছে। দেশি-বিদেশি আর ঢাকা শহরের জন্য আলাদা সব বাক্স। তার জন্য আবার মহাহ্যাপা। প্রথমে চিঠি মাপার জন্য লাইন ধরো। ওরা মেপে টাকার অংক লিখে দেবে। এবার ডাকটিকিটের জন্য লাইন ধরো। ডাকটিকিট কিনে চিঠির গায়ে লাগাও। তার জন্যে আবার আঠার খোঁজ করো। আঠা না লাগালে গাম শুকিয়ে টিকিট খসে যেতে পারে। টিকিট আবার যে সে টিকিট নয়। নতুন নতুন বিষয়ের ডাকটিকিট। নীলিমা আবার ডাকটিকিট জমায়। ওর সংগ্রহে সারা পৃথিবীর কত না রঙের বিচিত্র বিষয়ের সব ডাকটিকিট! দেখলে একেবারে হাঁ হয়ে যেতে হয়। বিশেষ করে স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের আনকমন, সবরকম ডাকটিকিট ওর সংগ্রহে। তাই নীলিমা সুন্দর ও আনকমন ডাকটিকিট না পেলে ভীষণ কষ্ট পায়। নরম হাসি ছড়িয়ে দিয়ে বলে, পছন্দের ডাকটিকিট না পেলে আমি আর তোমার চিঠি গ্রহণই করব না। সোজা ফিরিয়ে দেবো। বলব, এ-নামে কেউ থাকে না এ-ঠিকানায়। বলে আর মিটিমিটি হাসে। 

বলা তো যায় না। শেষমেশ চিঠি যদি সত্য সত্যই ফিরিয়ে দেয়। তাই আনকমন টিকিট পেতেও নানা ফিকির করতে হয়। ব্যাপারটা অত সহজ নয়। 

ডাক বিভাগের লোকজনের অত সময় কোথায় খুঁজে পেতে পছন্দের টিকিট বের করে দেবে। কী ব্যস্ততা ওদের! কেবল টাকার অংক মিলিয়ে টিকিট ধরিয়ে দিতেই হিমশিম খায় ওরা। ডাকটিকিট হলেই হলো! অথচ তার না আছে সৌন্দর্য, না আছে বৈচিত্র্য। বাজারচলতি সব দায়সারা গোছের টিকিট। রাস্তাঘাটে হরহামেশাই চোখে পড়ে এসব টিকিট। পথে-ডাস্টবিনে, ছেঁড়া ঠোঙায় কুড়িয়ে পাওয়াও বিচিত্র কিছু নয়, যা নীলিমার একেবারেই অপছন্দ। তাই অনেক ন্যাকামো করে কাকা মামা ডেকে কখনো এক-আধটু সফলতার মুখ দেখলেও অন্যদিকে মুখ বাড়ায় নতুন জটিলতা! মানে এ-আয়োজন শেষ করতে না করতেই জাদুর বাক্সের মতো কাচের বাক্সও ফাঁকা। ভুস করে চিঠিগুলো যেন উধাও! ডাকের লোকজন চিঠি নিয়ে চলে গেছে কখন যেন। ফের চার ঘণ্টা পর খুলবে। এ চিঠি যেতে তাহলে আরো একদিন পিছিয়ে গেল। তারপর অফিস খোলা তো! হিসাব করে দেখে খোলা নেই। বন্ধ পড়ে যাচ্ছে। ঈদের সঙ্গে পুজোর বন্ধ হলে বেশ কদিনের হ্যাপা। তার মানে নীলিমা আর কার্ড পেল না ঈদের আগে। পেল না চিঠি পর্যন্ত! এক অবোধ্য কষ্ট তখন কুড়ে কুড়ে খেত অঙ্কনকে। চিঠি ঠিকঠিক পাঠিয়েও শান্তি পেত না। নীলিমা পেল কি পেল না, এ নিয়ে আরেক অশান্তি। অগত্যা ফোনে নিশ্চিত হলে তবে শান্তি; কিন্তু এ নিয়েও বিড়ম্বনা কম পোহাতে হয়নি। নীলিমার বাসার অন্য কেউ ফোন ধরলে খাড়ার ওপর না করে দিত – ও বাসায় নেই।

সেই ডাকবাক্সগুলো আজ হাপিশ হয়ে যাবে ওর চোখের সামনেই! ডাক বিভাগ বলছে, এ আবর্জনাগুলো রেখে আর কী হবে! আর কদিন ওভাবে পড়ে থাকলে কটকটিওয়ালাও নেবে না। ব্যাপারটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারে না অঙ্কন। মাঝেমধ্যে মনে হচ্ছিল বাধা দেয়। রুখে দাঁড়ায়। প্রতিবাদ করে। পরে মনে হয়, সবই নিষ্ফল। এ তো সারাদেশেই চলছে। যেখানে চিঠি নেই। সেখান থেকেই বাক্স নেই হয়ে যাচ্ছে। এটা কোনো কথা হলো। তাজ্জব ব্যাপার। অঙ্কনের ঠোঁট বিড়বিড় করে কেঁপে ওঠে। অগত্যা আর কী করে! অসহায় দু-চোখ মেলে অপলকে দেখতে থাকে অঙ্কন ওদের দানবীয় সব কর্মকাণ্ড। নীলিমা তুমি কী জানো, একসময় তোমাকে ছুঁয়ে থাকা ডাকবাক্সটি ভেঙে ফেলছে। ডাক বিভাগের কিছু লোক দুর্দমনীয় শক্তি নিয়ে হামলে পড়েছে বাক্সগুলোর ওপর। নীলিমা, কী পৈশাচিক আচরণ করছে লোকগুলো ডাকবাক্সগুলোর সঙ্গে। তুমি কষ্ট পাচ্ছো? আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে নীলিমা!

সময়মতো নীলিমার হাতে চিঠি ধরাবে বলে কতদিন জিপিওর নিষিদ্ধ অঞ্চলে ঢুকে পড়েছে। ওখানে শর্টিং শেষে চিঠির থলে সিলগালা হয়ে চলে যায় যার যার গন্তব্যে। ওখানে দিতে পারলেও শেষে রক্ষা হবে। নীলিমার হাতে অন্তত সময়মতো চিঠি পৌঁছে যাবে। কিন্তু সে-রুমে সাধারণের প্রবেশ নিষেধ। সংরক্ষিত এলাকা। লোকেরাও মহাব্যস্ত। শেষবারের মতো যাচাই-বাছাই করে দেখছে ডাকের লোকজন। একটুও ভুলচুক হতে দেওয়া যাবে না! তা না হলে রাজশাহীর ব্যাগ রংপুরে, নোয়াখালীর ব্যাগ চিটাগাংয়ে চলে যাবে না, তার গ্যারান্টি কে দেবে! তাই মগ্ন হয়ে ওরা যার যার মতো কাজ চালিয়ে যাচ্ছে! সে-সময়ে অপ্রতিরোধ্য গতিতে নিষিদ্ধ ঘরে ঢুকে পড়ে অঙ্কন। ওকে দেখে লোকজন প্রথমে ‘থ’, পরে মারমুখো হয়ে তেড়ে আসে – বেরিয়ে যান। বেরিয়ে যান। এখানে আসার অনুমতি আপনাকে কে দিলো? দেখছেন না। প্রবেশ নিষেধ লেখা আছে। 

সবই দেখেছি সবই জানি। কিন্তু আমার এ-চিঠিটা আজ ধরাতে না পারলে ভীষণ ক্ষতি হয়ে যাবে! একজন আড়চোখে তাকায় খামের ওপর লেখা ঠিকানার ওপর। নীলিমা গোটা গোটা তাকিয়ে আছে।

তাতেও কাজ হয় না। কারো মন গলে না। অগত্যা বেরিয়ে আসতে হয় ওকে নিষিদ্ধ ঘর থেকে। কিন্তু বাইরে এসে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। বেশ খানিকটা সময় অপেক্ষার পর ঠিকই মওকা পেয়ে যায়। টি-বয় ঢুকছে চা-খাবার নিয়ে। ইশারায় ওকে কাছে ডাকতেই ছেলেটি মহাবিরক্ত হয়। তারপরও কাছে আসে। জিজ্ঞাসার দৃষ্টিতে তাকায়। ডাকেন ক্যা?

একটু কথা বলতাম।

যা কইবার তাড়াতাড়ি কন।

অঙ্কন কোনো কথা না বাড়িয়ে একটা দশ টাকার নোট আর খামটা বাড়িয়ে দেয়। বলে ঢাকা সিটির ব্যাগে ধরিয়ে দিতে হবে। নিউমার্কেট পোস্ট অফিস। মিস করা যাবে না।

– আপনে খাড়ান। কথা দিতে পারুম না। তয় চেষ্টা কইরা দেখতে পারি। 

কখনো এসে বলত, কাম হইয়া গেছে। বাড়ি যান গিয়া। কখনো টাকা আর খাম ফেরত দিয়ে বলত – কেউ রাজি অইল না। উল্টা মাইর খাইলাম আপনার লাইগা। ওর কথা শুনে অঙ্কনের মায়া হয়। পাঁচ-দশ টাকা ওর হাতে ধরিয়ে দেয়। অন্যমনস্ক হাতে চিঠি ফেরত নিয়ে নেয়। ফেরত চিঠির সে কী যন্ত্রণা! যেন ওরা ঠোঁট বাঁকা করে কাঁদছে।

একবার সবদিকে যখন ব্যর্থ, অগত্যা নীলিমাদের বাসায় চলে যায় অঙ্কন। গেটের দারোয়ানকে গিয়ে বলে ডি/২ ফ্ল্যাটে যাবে। জরুরি। চিঠিটা পৌঁছে দিতে হবে।

জরুর! জরুর! তুম কাহাছে আয়া পুরান ঢাকাছে আয়া!

একটু কষ্ট করে পৌঁছে দেবেন। বলুন পৌঁছে দেবেন তো?

দারোয়ান মাথা নেড়ে সায় দেয়। তারপরও স্বস্তি পায় না অঙ্কন। ফের বলে, চিঠিটা বেশ দরকারি, খুব জরুরি।

এবার ক্ষেপে যায় দারোয়ান। অবাঙালি হলেও পাকিস্তান ফিরে যায়নি। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে থেকে গেছে। মহাবিরক্তি কণ্ঠে ওর। 

তুমরার কাম তুম করো, হামরার কাম হামকো কারনে দো! এই বলে পাশে এসে গেটের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয় দারোয়ান। মানে আপদ বিদায় হও এবার। 

এমনি কত অপমান-অবজ্ঞার কথা মনে পড়ে অঙ্কনের। 

ঠিক তখুনি বাক্সের গোড়ায় ঘা পড়তে থাকে দড়াম দড়াম। বুক কেঁপে ওঠে অঙ্কনের। ঢাকার বাক্সে ওর কতশত চিঠির ছোঁয়া লেগে আছে। নীলিমা ছুঁয়ে আছে কী নিবিড়ভাবে। কত ঈদকার্ড, ভিউকার্ড এ-বাক্সে বিশ্রাম নিয়ে শেষে ঠিক ঠিক পৌঁছে গেছে নীলিমার ঠিকানায়। সে-বাক্সের ওপর আজ এ কী নির্মম অত্যাচার। সহ্যের বাইরে। গা কাঁটা দিয়ে ওঠে। অস্ফুটে ফের অঙ্কন বলে, জানো নীলিমা! তোমার কাছে পাঠানো চিঠিগুলো যে-বাক্সে ফেলতাম তা আজ ভেঙে ফেলছে ডাক বিভাগের লোকজন। জানি, এতে তোমার কিছু আসে-যায় না। সেসব চিঠির কথা তোমার মনেও নেই আর; কিন্তু আমি কেন এত কষ্ট পাচ্ছি! ভীষণ কান্না পাচ্ছে। চোখ ফেটে জল আসছে। তোমার জন্য আমার যেটুকু প্রেম, তোমার জন্য আমার যে-হৃদয় ছিল তার ছোঁয়া রয়েছে এ-বাক্সে। তাই বুঝি এত কষ্ট হচ্ছে আমার নীলিমা!

মনের ভেতর জমে থাকা কথাগুলো বলব বলব করে একবার দীর্ঘ এক চিঠি লেখা হলো। এক-দু পৃষ্ঠা নয়। গুনে গুনে পঞ্চাশ পৃষ্ঠা। ক্র্যাপ পেপারে মোড়া এ-ফোর সাইজের খামে ভরা হলো সে-চিঠি। ডাকে দেওয়া হলো। মেপে জানাল পঁচিশ টাকার টিকিট লাগাতে হবে। আটত্রিশ বছর আগে পঁচিশ টাকা!

মন ভরে অনেক কথা লেখা ছিল সে-চিঠিতে। মন যা বলতে চেয়েছে তা-ই বলেছে, যা লিখতে চেয়েছে তাই লিখেছে। তারপরও চিঠি পাঠিয়ে স্বস্তি নেই। বারবার মন বলছে, চিঠি পেয়েছে তো? এ-চিঠি না পেলে তা আর লেখা সম্ভব নয়। কোনো কপি নেই ওর কাছে। তখনো ফটোস্ট্যাট আসেনি আমাদের দেশে! কতদিন সময় নিয়ে তবে চিঠি লেখা শেষ করেছে। কত কাটাকাটি, কত আঁকিবুঁকি করে তবে চিঠির কথা সাজানো হয়েছে। সেসব কথা সেসব ভাষা সেসব বর্ণনা ফের কোথায় পাবে! হাজার মাথা কুটে মরলেও তো এ-চিঠি ফের লেখা সম্ভব হবে না। 

যদি কোনো কারণে এ-চিঠি না পেয়ে থাকে নীলিমা, তাহলে ওর না-বলা কথাগুলো আর কোনোদিন জানা হবে না ওর। ওকে যে ফোন করে জানাবে সে-সুযোগও আর নেই, কারণ নীলিমা তখন অনেক দূরের মানুষ। বেশ ক-মাস হলো নীলিমার ওপর সব অধিকার হারিয়েছে ও। হঠাৎ এমন করে ও বদলে গেল কেন তার কোনো উত্তর খুঁজে পায়নি অঙ্কন। তবে চিঠি পাঠানোর পরপরই একবার ফোন দিয়েছিল নীলিমাকে। অঙ্কনের কণ্ঠ শুনেই চিল-চিৎকারে বাড়ি মাথায় তোলে মেয়েটি। ওদিকে ওর মা বুঝি বেশ চমকে উঠেছিল মেয়ের ঝাঁঝালো কণ্ঠ শুনে।

তোমাকে না ফোন করতে বারণ করেছি। 

আমার চিঠিটা পেয়েছ নীলিমা!

কীসের চিঠি! না কোনো চিঠি পাইনি। ফের যদি চিঠির কথা শুনি, ভীষণ খারাপ হয়ে যাবে। বলেই এক ঝটকায় রিসিভার রেখে দেয় নীলিমা। 

বায়তুল মোকাররমের এক বুথ থেকে ফোন করেছিল অঙ্কন। ওর কাকুতি-মিনতি বেশ খেয়াল করছিল পেছনের লোকজন। হঠাৎ কথা থেমে যাওয়ায় ওরাও বুঝতে পারছিল ওপার থেকে পাত্তা মেলেনি। কিংকর্তব্যবিমূঢ় অঙ্কন। খানিক সময় বোকার মতো দাঁড়িয়ে থেকে রিসিভারের দিকে তাকিয়ে ছিল অপলকে। পেছন থেকে তাড়া দিতেই ঢিমেতালে বেরিয়ে আসে ও। কেউ কেউ টিপ্পনি কাটছিল ওকে নিয়ে। বুঝতে পারে অঙ্কন। ব্যালেন্স করতে পারে নাই মামা। ভাজতে পারে নাই। মাখনে ভেজাল আছিল। সব কথা কানে আসে অঙ্কনের; কিন্তু কথাগুলো বোধের বাইরে। কারণ ওর কানে তখন শুধু বদলে যাওয়া নীলিমার ঝাঁঝালো কণ্ঠ!

মাখন না ঘি। ওই হইল একটা! কিন্তু মাথা তোলার মতো শক্তি কিংবা মনোবল কিছুই অবশিষ্ট ছিল না তখন যে মাথা উঁচু করে দেখবে কারা তাকে টিপ্পনি কাটছে। 

সেই থেকে আর কখনো ফোন করেনি অঙ্কন। ইচ্ছেও হয়নি। তবে চিঠির খাঁজে খাঁজে যে-কথাগুলো আঁকা হয়েছিল সেসব বর্ণনা থেকে কোনোভাবেই মুক্ত হতে পারছিল না অঙ্কন। নীলিমার সঙ্গে একবার দেখা হলে যেটুকু কথা হতো তাই অলংকার বানিয়ে গলায় ধরে রাখত নতুন করে ফের দেখা না হওয়া পর্যন্ত। নীলিমার কথাগুলো বারবার আওড়াত। প্রিয় সংলাপগুলো বারবার কণ্ঠে তুলে শুনত, নিজ কানে শোনার জন্য। একা একা কী এক ঘোরে যেন কথাগুলো বলত অঙ্কন। সে-চিঠির জন্য ওর মনোকষ্ট সামান্য সময়ের জন্য ভুলতে পারেনি অঙ্কন। পারবে কেন! আগের চিঠির সঙ্গে সে-চিঠির ছিল বিস্তর ফারাক। আগে চিঠি ছিল রংমাখানো নানা স্বপ্নে ভরা। পরের সে-চিঠি জুড়ে ছিল ভাঙা স্বপ্ন জোড়া দেওয়ার কেবলই ব্যর্থ চেষ্টা। ফিরে পাওয়ার আকুলতা!

আগে আধেক কথা হতো চোখে চোখ রেখে। বাকি আধেক লেখা হতো চিঠিতে। তাই সে-চিঠির জন্য অপেক্ষা ছিল। প্রত্যাশা ছিল। ছিল একরাশ স্বপ্ন এবং তা ছিল দুদিক থেকেই। অঙ্কন কথাগুলো মন থেকে ঝেড়ে চিঠির খামে পুরে দিতে পারলেই ছিল স্বস্তি।

ওদিকে চিঠি হাতে পাওয়ার জন্য, প্রতিটি লাইন বারবার পড়ার জন্য, নীলিমার ছিল অন্যরকম এক ব্যাকুলতা। কিন্তু দীর্ঘ চিঠিটি ছিল প্রত্যাখ্যাত একজন মানুষের না বলা কথায় ভরা। নীলিমা ওর ফোন ধরে না। ফোন করে না। চিঠি লেখে না। ওর চিঠিও পড়ে দেখে না। তবু ব্যর্থ চেষ্টা হিসেবে ওর কথাগুলো নীলিমার কাছে পৌঁছানোর জন্য 
 সে-চিঠি লেখা। কিংবা নীলিমার কথাগুলো নীলিমাকে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য চিঠি লেখা। নীলিমা যে ওর কথা থেকে, ওর আশ্বাস আর প্রতিশ্রুতি থেকে সরে গেছে, তা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্যই ওর চিঠি লেখা! যদি কথাগুলো ওর মনে নাড়া দেয়। যদি ওর ভুল ভাঙে। যদি ফের বলে ও, ‘সুন্দর ডাকটিকিট না হলে তোমার চিঠি আমি ছুঁয়েই দেখব না। বলব এ-নামে কেউ থাকে না।’ 

কিন্তু না। অঙ্কনের ভাবনা আর বাস্তবের মধ্যে বিস্তর ফারাক থেকে যায়। বিশেষ করে অঙ্কনের কেন যেন মনে হয়েছিল, এ-চিঠির এক ক্লাসিক মূল্য আছে। কোত্থেকে যে কথাগুলো এসেছে। কে যে এত কথা কইয়ে নিয়েছে ওর হাত দিয়ে! এত কথা কখন যে লিখেছে, তা কখনো ভেবে পায়নি অঙ্কন। শুধু বুঝেছে, হারানো মন ফিরে পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে মানুষ যা করে, সে-চিঠিতে আসলে তারই চেষ্টা ছিল। যেন লাইনে লাইনে ছিল ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা। যা সে খুঁজে পেয়েছিল। শীতলক্ষ্যার দু-পাড়ের পাকা টমেটোর ক্ষেত। কাঁচকি মাছের ঝাঁপি আর সন্ধ্যার আবির থেকে!

নীলিমাকে হারিয়ে যখন-তখন যেখানে-সেখানে ঘুরে বেড়াত অঙ্কন। যেখানে মন চাইত চলে যেত। একবার কাপাসিয়ার ভেতর দিয়ে বাসে যাচ্ছিল। গন্তব্যহীন যাত্রা, হঠাৎ চোখে পড়ে শালবনের ফাঁকে ফাঁকে এক চিলতে রুপালি নদী। অমনি মন নড়ে বসে। হেলপারকে বাস থামাতে বলে নেমে পড়ে। নদীর কাছে চলে যায়। মগ্ন হয়ে কাটিয়ে দেয় সন্ধে পর্যন্ত। লাস্ট বাস। লাস্ট বাস। শোনার পর সম্বিৎ ফিরে পায় অঙ্কন। এমনি পথে-পথে কুড়িয়ে পাওয়া স্বপ্নগুলো সাজিয়ে ছিল সে সেদিনের চিঠিতে। নীলিমাকে আর না পেলেও ওর কথাগুলো যাতে নীলিমা একবার হলেও পড়ে, তাই ছিল অঙ্কনের মনের চাওয়া। একান্ত প্রত্যাশা; কিন্তু কোনোদিন জানতে পারেনি চিঠিটি নীলিমা পেল কি না। 

অগত্যা সে-চিঠির জন্য যখন সব স্বপ্ন ফিকে হয়ে গেছে। নীলিমা ঘরসংসার করছে দস্তুরমতো। তখনই এক দৈনিকের সাময়িকীতে নীলিমার লেখা ছাপা হলো। সে-লেখার মাঝে মাঝে হুবহু অঙ্কনের চিঠির বর্ণনা নদীপাড়ের সন্ধ্যা, ঝোপঝাড় পড়ন্ত আলোয় পাকা টমেটোর শৈল্পিক ছবির হুবহু বর্ণনা উঠে এসেছে। সে-লেখা পড়ে অঙ্কন অন্তত বুঝেছে, নীলিমা যতই অস্বীকার করুক, ওর চিঠিটা ঠিকই পেয়েছে এবং পুরো চিঠিই পড়েছে নীলিমা। এত দীর্ঘদিন পরে সে-চিঠি থেকে কোট করা হয়েছে। তাহলে চিঠিটি এখনো নীলিমা ফেলে দেয়নি। হারিয়ে ফেলেনি। যত্নে রেখে দিয়েছে। তবে কি নীলিমা ওকে এখনো মনে …। আর ভাবতে চায় না। ভাবতে পারে না অঙ্কন। তবে সেদিন নিজেকে ভীষণ পলকা মনে হয়েছে অঙ্কনের। হারানো নীলিমাকে বারবার খুঁজে ফিরে দেখতে থাকে।

নীলিমার হাত ধরে রাখার মধ্যে যে এত সুখ লুকিয়ে ছিল তা আগে কখনো বোঝেনি। এক সন্ধ্যায় ওরা বসে ছিল রমনা পার্কের বটতলার নিচে। তখন সূর্য ডুবছে। লাল কুসুম-কুসুম সূর্যটা দেখিয়ে বলে, ‘দেখো সূর্যটা কী সুন্দর! কী ধীরস্থিরভাবে ও বিদায় নিচ্ছে পৃথিবী থেকে। বোধহয় অভিমানে জমাট বেঁধে আছে সূর্যটা। তারপরও কী সুন্দর! মনে হয় অনেক কথা বলার ছিল ওর; কিন্তু বলা হলো না। হয় বলার মতো কাউকে পায়নি। না হয় যাকে বলতে চেয়েছে সে শুনতে চায়নি।’ 

এমনি কথাগুলো যখন একমনে বলে যাচ্ছিল নীলিমা, তখন বটপাতা ছুঁয়ে ছুঁয়ে লালচে আভা মিইয়ে এসেছে। ঝুপ-ঝুপ অন্ধকার গাঢ় হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। তখন আনমনে কখন যে ওর হাতে হাত রেখেছে তা খেয়ালই করেনি নীলিমা। কেবল অঙ্কনের ছোঁয়া পেয়ে কথা থেমে যায় ওর। চোখে চোখ রাখে। সে চোখেমুখে কী এক বিস্ময়। ফের সূর্যের দিকে চোখ ফেরায় নীলিমা। এবার আর কোনো কথা নেই। শুধুই মুগ্ধতা ওর দু-চোখ জুড়ে। হাতটাও সরিয়ে নেয়নি নীলিমা! দুটো হাত জুড়ে ছিল অনেকটা সময়। কারো মুখে কোনো রা নেই। তারপরও মনে হয়েছিল, কোনো কথা অব্যক্ত থাকেনি। হাতে হাত রেখে অনেক কথাই হয়েছে সেদিন দুজনের মধ্যে। মুখে ভাষা না থাকলেও যৌথ ছোঁয়ায় ভাষা থেমে থাকেনি। কথা থেমে থাকেনি। কথারা গতি হারায়নি। পথ হারায়নি একটুকুর জন্যও।

নীলিমা ওকে ছেড়ে গেলেও সে-ছোঁয়া কখনো ছেড়ে যায়নি ওকে। বারবার মনে হয় অঙ্কনের, এখনো নীলিমার হাত ধরে রেখেছে ও। নীলিমার হাত ওর গাল ছুঁয়ে দিয়েছে কতবার।

একবার নীলিমা অনেকগুলো নতুন দু-টাকার নোট দিয়েছিল ওকে। নতুন বেরিয়েছে। প্রথমে গুনে গুনে পাঁচটি নোট দিলো। বললো, উঁহু শেষে শূন্য পড়ে গেল। বলেই আরো একটি নোট জুড়ে দিলো। এবার দুই বসলো, আমার লাকি নাম্বার। বলেই নোটগুলোর ওপর গাঢ় করে একবার চুমু এঁকে অঙ্কনের শার্টের বুকপকেটে ঢুকিয়ে দিলো। এ টাকা দিয়ে কী করবে অঙ্কন?

রেখে দেবো। খুব যত্ন করে রেখে দেবো। তোমার স্মৃতি যে!

খুশি হলাম। বলেই খুব মিষ্টি করে হেসেছিল নীলিমা। অঙ্কনের গালে একটা টুসকিও এঁকে দিয়েছিল মনের সবটুকু মাধুরী মিশিয়ে। সে-টুসকি মাঝে মাঝে এখনো নড়েচড়ে ওঠে অঙ্কনের গালে!

সে-টাকা সত্যি বড্ড যত্নে রেখেছিল অঙ্কন। ওর পড়ার টেবিলের ড্রয়ারে কাগজের ভাঁজে সে-টাকা রেখে দিয়েছিল ও। রাতে শোবার আগে সে-টাকা চোখে-গালে আলতো করে বুলিয়ে শেষে গাঢ় করে একটা চুমু এঁকে ফের রেখে দিত কাগজের ভাঁজে। এর কোনো অন্যথা হতো না কখনো। 

নীলিমা দূরে সরে যাওয়ার পর অনেকদিন তেমনিভাবে যত্ন করে টাকাগুলো রেখেছিল অঙ্কন। তবে আগে টাকাগুলো ছুঁয়ে দিলে ওর সামনে এসে নীলিমা দাঁড়াত কখন যেন! কিন্তু নীলিমা হারিয়ে যাওয়ার পর সে-টাকাগুলো মুখে ছোঁয়ালেই ওর চোখ থেকে জল ঝরত অঝোরে। একদিন মনের বিষণ্নতাকে আর এড়াতে পারেনি অঙ্কন। কী মনে করে দু-টাকা করে ছজন ভিখিরিদের বারো টাকা দিয়ে দিলো অঙ্কন। তার আগে টাকাগুলো ওর বুকে ছুঁইয়ে রেখেছিল অনেকটা সময়। শেষে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে টাকাগুলো বিলিয়ে দেয় ভিখিরিদের মধ্যে।

অঙ্কনের মনে পড়ে নীলিমার সঙ্গে যখন দেখা হতো, কথা হতো। ও তখন অঙ্কনের চুলে কেবলই হাত বোলাত। যেন ওর চুলের সঙ্গেই কথা হতো ওর। অঙ্কন শুধু উপলক্ষ মাত্র। ওর চুলের প্রতিটি ভাঁজে ভাঁজে ছিল নীলিমার হাতের ছোঁয়া। নীলিমা চলে গেলে বহুদিন আর চুল কাটায়নি অঙ্কন। অনেকবার সেলুনে গিয়েছে; কিন্তু ফিরে এসেছে চুল না কাটিয়েই। বড্ড মায়া হয় চুলগুলোর জন্য। কেটে ফেললেই যেন নীলিমা হারিয়ে যাবে। নীলিমার স্পর্শ মিলিয়ে যাবে চিরতরে। শেষে একদিন প্রবাল বলল, নীলিমা কী তোর চুলে, না হৃদয়ে আছে।

কেন হৃদয়ে! অবাক কণ্ঠ অঙ্কনের। 

হৃদয়েই যদি থাকবে ও তাহলে চুলে কৃত্রিম ছোঁয়া আগলে থাকার কী মানে থাকতে পারে!

এ-কথার পর কী মনে করে একদিন সেলুনে গিয়ে বসে অঙ্কন। একটা চেয়ার খালি হতেই এগিয়ে যায়। দাদা চুল কাটব, না সেভ? নির্মলের নির্লিপ্ত কণ্ঠ।

অঙ্কন অনেকটা সময় চুপ থাকে। অবোধের মতো তাকিয়ে থাকে নির্মলের দিকে। 

বলেন, কী করব, কাস্টমারের মেলা চাপ। 

আগে শেভ করো, পরে ভেবে দেখব। শেভ হলে বেশ যত্ন নিয়ে ওর গালে ফিটকিরি ঘষতে থাকে নির্মল। দাদা, ভাবলেন কিছু!

অনেকটা সময় ওর কপালে ঝুল খেয়ে থাকা চুলের গোছায় হাত বুলোয়। নীলিমার মুগ্ধ চোখদুটো ভেসে ওঠে কী এক গভীর মায়া নিয়ে। মগ্ন হয়ে সে-চোখে ডুবে যায় অঙ্কন। নির্মল কাঁচি ব্রাশ ক্ষুর এগুলো বেসিনে ফেলে জলে ধুতে থাকে। মাঝেমধ্যে তাকিয়ে দেখে অঙ্কনকে। অঙ্কন চোখ তুলে তাকাতেই নির্মলের চোখে চোখ পড়ে। কী যেন ভাবল খানিক সময়। শেষে দু-আঙুলে কাঁচি চালানোর ভঙ্গি করে মাথার দিকে দেখায়।

নির্মল আর কথা না বাড়িয়ে কপালের ঝুলের ওপর কাঁচি চালায়। তীব্রগতিতে সারা মাথা জুড়ে কাঁচি দাপিয়ে বেড়ায় ক্যাচ-ক্যাচ, কুটকাট শব্দে। চুল যত কমে আসছিল, অঙ্কনের চোখে জলের ধারা ততোই তীব্র হচ্ছিল।

ব্যাপারটি খেয়াল করে নির্মল – দাদা চোখে জল ক্যান!

বোধহয় চুল পড়েছে। ও বেসিনের কাছে অঙ্কনের মুখটা নিয়ে চোখে জলের ঝাপটা দেয়। দেখেন তো এখন বন্ধ হলো কি না। নির্মলের জলে নয়, মনের ভেতর থেকে শক্ত বাঁধন দিয়ে সেদিন চোখের জল রুদ্ধ করেছিল অঙ্কন। 

নীলিমার শেষ স্মৃতি ডাকবাক্সটিও আজ চিরদিনের জন্য আড়াল হয়ে যাচ্ছে।

একদিন ভালোবেসে যে-মানুষ এত স্মৃতি দিয়েছিল, সে আবার কেন অমন বদলে যায় কোনো কারণ ছাড়াই! উত্তর পায় না অঙ্কন। বুকের ভেতর খসখসে কী এক শব্দ ওঠে। দুর্বোধ্য। অচেনা। সে-অচেনা শব্দের খোঁজে মগ্ন থাকে অঙ্কন। কিছুক্ষণ পর চোখদুটো নড়ে ওঠে। ডাকবাক্সের ওপর স্থির হয়। 

বাক্সের গায়ে এবার তিনজন মিলে হামান দিস্তা চালাচ্ছে। দড়াম দড়াম শব্দ। কান পাতা দায়। সে-শব্দে কান স্তব্ধ হয়ে আসে। দৃষ্টিও ঝাপসা। বিকট শব্দের ভিড়ে ওর বুকের গভীরে শুধুই ধুকপুক ধুকপুক!

ক্রমেই তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে সে-আঘাত। চোখে ওর জলের ধারা। যেন পাহাড় ছাপিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে পড়ছে 

সে-জল। ঠোঁটের কষ বেয়ে চোখের লোনা জল নামছে। যাচ্ছে ওর মুখের ভেতরে। নোনা স্বাদেও কোনো সম্বিৎ নেই ওর। 

এ-জলে যেন নীলিমার হাত ডুবে আছে। ছুঁয়ে আছে ওর সবটুকু অনুভব। জলের সঙ্গে মিশে আছে নীলিমা। তার সবটুকু আবেশে, অনুভবে আর বিশ্বাসে তখন শুধুই নীলিমা! এবার আর সাড়া না দিয়ে পারে না ও। যেন এক জলছবি হয়ে দূরে ভেসে ওঠে নীলিমা। ওর চোখেও জল। 

নীলিমার চোখে জল। কেন? হারানো বেদনায় দুজনেই বুঝি ভিজছে আজ!

Published :


Comments

Leave a Reply