বাইরে কাচের মতো স্বচ্ছ প্রকৃতি। আকাশে তুলার মতো মেঘ ভাসছে। খাঁচার ময়নাটি শবনমকে দেখেই একটানা বলে যাচ্ছে, সাদা মেঘ, সাদা মেঘ –
ময়নাটির কণ্ঠস্বরে শবনম আঙুল বাঁকিয়ে বলে, এই দুষ্ট কী বলছিস?
– সাদা মেঘ, সাদা মেঘ।
– সাদা মেঘ নয়, বল, ‘ও মেঘ পান করো মানসহ্রদজল, স্বর্ণকমলের প্রসূতি।’
মেঘদূত কাব্যের এই লাইনটুকু বলে সহসা নিজের ভেতর প্রগাঢ় চাঞ্চল্য অনুভব করে শবনম। ভাবে, এই নির্লিপ্ত নীলাকাশের সাদা সাদা মেঘপুঞ্জ নিয়ে ওর গান গাওয়া উচিত। কিন্তু মেঘগুলো সামনের উঁচু উঁচু অ্যাপার্টমেন্টের আড়ালে চলে গেলে শবনমের মনটা বেশ খারাপ হয়ে যায়। শহরের আকাশটা আরো ছোট হয়ে আসে।
কে যেন থেমে থেমে দরজায় কড়া নাড়ছে। দরজা খুলতেই দেখা গেল, যুবক বয়সী একজন ভিক্ষুক দাঁড়িয়ে আছে। মুখটা অদ্ভুত রকমের বিষণ্ন। দেহ এতটাই শুকনো, চামড়ায় আবৃত হাড়গুলি স্পষ্ট চোখে ঠেকে। একটি পায়ের গোড়ালিতে কাটা দাগ। গা শিউরে ওঠে শবনমের। ততক্ষণে ছেলেটির নিষ্প্রভ চোখ দুটি কি এক প্রত্যাশায় জ্বলজ্বল করে ওঠে, বলে, আপা একমুঠ খাবার দিবেন।
– নেই।
– কিছু ট্যাকা দেন তাইলে।
কথার সঙ্গে কাটা পা একটু একটু উঠে যাচ্ছে। পিঠও কুঁজো হয়ে যাচ্ছে নির্বোধের মতো। এমন ভয়ংকর ভিক্ষুক তো আগে চোখে পড়েনি। একশ টাকা দিয়ে দরজা বন্ধ করে পেছনের বারান্দায় আসতেই মনটা খারাপ হয়ে গেল। উঁচু উঁচু অ্যাপার্টমেন্টগুলি আকাশটাকে কেমন ঢেকে রেখেছে। একটু আগে হেলে পড়া সাদা মেঘ কেমন আছে এখন? বড় নিঃসঙ্গ লাগতে থাকে। স্বামীর কাছে এই দমবন্ধ জীবনের সীমিত গণ্ডি নিয়ে কথা বলতে ইচ্ছে হলো। এভাবে প্রকৃতি ও আকাশকে ঢেকে একেকটি ইমারত লাফিয়ে ওঠার কোনো মানে হয়! শবনম মোবাইলে কল করতেই রাশেদ বলল, কী ব্যাপার?
– একটা কাজ করে দেবে?
– একটা না, হাজারটা, এক এক করে বলো।
– হাউজিং এস্টেটের বড় অ্যাপার্টমেন্টগুলোর জন্য আমি ঠিকমতো সাদা মেঘ দেখতে পারি না, তুমি ডেভেলপারদের আমার সমস্যাটার কথা গিয়ে বলবে।
– হা হা হা …
– ওভাবে হাসছ কেন?
– শিল্পীদের নানারকম অবসেশন নিয়ে হঠাৎ ভাবনা এলো কি না তাই।
– আমি আর কি এমন শিল্পী বলো।
– মন্দই-বা কি, রুচিশীল শ্রোতারা তোমার গান বেশ ভালোই তো চুজ করে, আমি বরং এক কাজ করি, ওসব ডেভেলপারের কাছে না গিয়ে তোমাকে সেইন্টমার্টিনে একটা বাড়ি করে দিই। সমুদ্র আর আকাশের সাদা মেঘ দেখে গান করবে।
– তাই, কিন্তু …
ইতস্তত শবনমের ভেতরটা সহসা খলবল করে ওঠে। কিছু বলতে পারে না। অথচ একসঙ্গে কত কথা যেন মোচড় দিয়ে উঠল বুকের ভেতর। অপ্রকাশের দহন কিংবা চেতনার অর্ধবিলুপ্তি নিয়ে ঠোঁট কামড়ে নীরবে কেবল হাঁপাতে থাকে।
– শবনম।
– হুঁ।
– কিছু ভাবছ?
– তুমি কি যেন বললে, ও হ্যাঁ সেইন্টমার্টিন। আচ্ছা দ্বীপাঞ্চলে কি কোনো রাখাল থাকে? যেমন ধরো, মিথ্যাবাদী রাখালের মতো বাঘ বাঘ চিৎকার করে আমাদের ভয় ধরিয়ে দিলো।
– রাখাল আছে কি না জানি না, তবে জেলে আছে। তোমাকে সৈকতে দেখে সবাই হয়তো একসঙ্গে গেয়ে উঠবে, খেলিছে জলদেবী, সুনীল সাগর জলে –
– বেশ বলেছ তো, জানো, তোমার কথা শুনে চমৎকার একটা চিত্রকল্প ভেসে উঠল।
– আমার কি ধারণা জানো?
– কী?
– তোমার এসব অবসেশন নিয়ে ডাক্তারের সঙ্গে একটু কথা বলা দরকার।
শবনম ম্লান হেসে বলে, রাখি।
শবনম ভয় পায় কালো মেঘ দেখলে। ঝড় কিংবা জলোচ্ছ্বাসের তীব্র নাশকতা আঁচ করে চোখ বন্ধ করে দেয়। কেন যে এত ভীতি, মেঘমালার কৃষ্ণপুঞ্জ ঘিরে ভীমরুলের মতো কিলবিল করে যেন একদল বিপজ্জনক মানুষ। ছেলেবেলায় ভূগোলের স্যার বলতেন, সাদা মেঘে জলের ঘনত্ব কম, মানুষের ঝরঝরে সুন্দর অনুভূতির সঙ্গে সাদা মেঘের চমৎকার মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
সেদিন ছুটির পর বিকেলের অতি ধীর শান্ত আকাশের দিকে তাকাতেই শবনমের বুকটা হিম হয়ে যায়। দিনান্তের কেমন তীর্যক আলোয় আলোয় সাদা মেঘগুলি ওর আপাতসলজ্জ চোখে রেশমি সুতার মতো ঝলমল করছিল। ব্যাপারটা মনের ভেতর এমনই রেখাপাত করে, যেন চোখ মেললেই দেখতে পায় মানুষের মনোজগতে মিশে আছে একধরনের সাদা মেঘ – নির্ভার এবং সুন্দর।
এরপর ঘুমাতে গেলেই শবনম স্বপ্ন দেখে। কখনো স্বপ্নের রেশ নিয়ে জেগে ইতস্তত স্মৃতি রোমন্থন করে। কী যে মর্মস্পর্শী উদাসীন ভাবনার ভেতর জীবনটাকে সুন্দর লাগে ওর! গানে গানে মনের সমস্ত নিবিড়তা কিংবা উত্তাপ নিয়ে আকাশের সাদা মেঘে মিশে যেতে ইচ্ছে হয়। রাতে রাশেদ এসে বলে, আমার কথাই ঠিক, ডাক্তার তোমাকে সমুদ্র দেখতে বলেছে।
– আমিও সেরকম ভাবছি।
– গুড।
– তুমি যাবে না?
– নিশ্চয়ই। অনেক বোরড লাগছে, একটু চেঞ্জ দরকার।
মুহূর্তেই শবনমের মনে পড়ে সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসের কথা। তারচেয়ে অন্য কোথাও যাওয়া যেতে পারে। যেখানে সূর্যের উত্তাপ, সাদা মেঘ, সংসার ও প্রকৃতিকে ঘিরে নানারকম স্বপ্ন খেলা করবে। কিন্তু এসব রাশেদকে বলতে পারে না। সমুদ্রবিলাসী রাশেদ একান্তই দ্বিধাহীনভাবে দেখছে সেইন্টমার্টিনের স্বপ্ন। রাশেদ জানে, সমুদ্র কত সুন্দর। ওখানে দলে দলে মানুষ যায়। প্রাণোচ্ছল মানুষের জলোদৃষ্টি রাঙিয়ে সূর্যের উদয়-অস্ত ঘটবে। সবাই যেমন করে ভাবে, রাশেদ নিজেও তেমন করে ভাবছে। ও হয়তো কাল হোটেল বুকিং দিয়ে টিকিট কনফার্ম করবে, অথচ সমুদ্রের প্রতি শবনমের আগ্রহটুকু ক্যাকটাসের মতো জটিল হয়ে উঠছে। ওর নিজস্ব ঘর, দেয়াল, কার্পেট, বিভিন্ন আসবাব ও অনুভূতি জুড়ে আছে কতগুলি ব্যক্তিগত বিশ্বাস, যা ও হারাতে পারে না।
অমন গা সিটিয়ে পড়ে আছে দেখে রাশেদ শবনমের মাথায় হাত রেখে বলল, শরীর খারাপ লাগছে।
– না, ভাবছি সমুদ্রে যাব না।
– হা হা হা …
– অমন করে হাসছ কেন?
– জানতাম তুমি যে-কোনো সময় বদলে যাবে।
– কষ্ট পেয়েছ?
– মোটেই না।
রাশেদের আহ্লাদ কিংবা আন্তরিকতা দেখে উল্টো শবনমই মনে মনে কষ্ট পায়। কিন্তু ওর কী দোষ, ও তো সাদা মেঘের মতো অক্লেশে নিজের অস্তিত্ব ভাসিয়ে নেওয়ার স্বপ্নাক্রান্ত ঘোরটুকু নিয়ে বেঁচে আছে।
রাশেদ আর কিছু না বলে মৃদু আলোয় নুয়ে থাকা টেবিলে বসে। এ সময় ওকে শিশুর মতো সরল দেখায়। পরিচ্ছন্ন হাসি দিয়ে নিজেকে অসম্ভব বিনয়ী করতে চায়। তখন ওকে এসময়ের সার্থক ব্যবসায়ী বলে মনে হয় না। আদরপিপাসু নিরুপায় কোনো নগরসন্তানের মতো একা লাগে। শবনম ইতস্তত ভঙ্গিতে বড় বড় কয়েকটি নিশ্বাস ফেলে। স্বামীর কাছে ফের নালিশ জানাতে ইচ্ছে হয়। মানুষের নানারকম ভুল-ত্রুটি-বিচ্যুতি কিংবা জাগতিক উদাসীনতা নিয়ে মনে কতরকম বিচিত্র ক্ষোভ যে জমা হয়। যেমন দারোয়ান লোকটির দায়িত্বহীনতা নিয়ে রাশেদকে কিছু বলা যেতে পারে। ও থাকার পরও কীভাবে সময় সময় ভিক্ষুক ঢুকে পড়ে। কিন্তু রাশেদকে বলার পর যা হবে তা নির্ঘাৎ কালো মেঘের মতো বিপজ্জনক। তারচেয়ে বরং হৃদয়স্পর্শী সাদা মেঘের নিবিড় ভেসে চলা নিয়ে গল্প হতে পারে।
রাশেদ একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। ওর চোখে স্পষ্ট কালো মেঘ। ও কি তবে ঝড় চাইছে? শবনমের নির্মেদ সাদা একটি অনুভূতি কুঁকড়ে উঠতেই রাশেদ বলল, ফাইলের পেপারগুলি ঠিকমতো মেলাতে পারছি না।
– ঠিক আছে, বিশ্রাম নাও।
– মাইন্ড করেছ?
– নাহ।
– কেমন যেন পাথর হয়ে আছ।
শবনম নড়েচড়ে বলল, আমি ভাবছি অন্যকিছু।
– কী?
– আমি সাদা মেঘ ভালোবাসি।
– আসলে সাদা রংটা তোমার অবসেশন।
– না তা নয়, আসলে …
শবনম থেমে যায়। রাশেদের কথা শুনে মনে হচ্ছে, আকাশের কোথাও-না-কোথাও বুঝি সাদা মেঘ থেমে গেছে। সাদা মেঘের প্রান্তদেশ একটু একটু করে ক্ষয়ে মহাশূন্যের আশ্চর্য রহস্যময়তায় মিশে যাচ্ছে। ছায়ার মতো নিঃশব্দ ভঙ্গিতে রাশেদ ওর হাত স্পর্শে নিতেই শবনম শিশুর মতো আধো আলোছায়াময় ঘরের নীলাভ শূন্যতাকে হাতড়াতে থাকে। কিছু বলতে পারে না। তবু যদি গান গাওয়া যেত, খুব পরিচিত কোনো গান, ‘মোর ঘুমঘোরে এলে মনোহর, নমঃ নমঃ -’
যেভাবে জানালার পর্দা দুলছে, বাইরের বাতাস বুঝি ওর অস্তিত্বের জলোমেঘ টের পেয়ে মাতামাতি শুরু করে দিয়েছে। কোনো বিয়োগান্ত নাটকের শেষ পরিণতি যেন, সাদা ফিনফিনে গাউনের ভেতর নিশ্চল ডেসডিমোনা, বাইরের তাপদগ্ধ জীবন ও মৃত্যু-বিভীষিকা নিয়ে ওর আর কোনো প্রশ্ন নেই, বরং মৃত্যুই শীতল। ওথেলো, তোমার কাণ্ডজ্ঞানহীনতাকে আজ বড়ই মর্মস্পর্শী লাগছে!
শবনম পাশের ঘরে এসে লাইট অফ করে বসে থাকে। কালো মেঘের ভীতি থাকলেও কালো অন্ধকারকে ওর ভালো লাগে। অন্ধকারের ধ্যানমগ্নতায় অনেক জটিল প্রশ্নের জট খুলে যায়। শবনম জানালার পর্দা টেনে বাইরে তাকাল। আকাশে মধ্যরাতের একফালি চাঁদ। মুহূর্তেই আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। একটু নিচেই ঈষৎ চন্দ্রকিরণে প্রকাশমান গোল গোল বৃত্তের মতো সাদা মেঘগুলি এতক্ষণ যে নজরেই আসেনি। আলো জ্বেলে নাচের মুদ্রার মতো কার্পেটের দুদিকে ঘুরে গেল। ও চায় সংসারের প্রতিটি বস্তু ওকে দেখুক। ওর অস্তিত্বে এখন জলের ঘনত্ব কম হলেও ঝরঝরে।
দরজা খুলে ছাদে উঠে এলো শবনম। ওর ধারণা, মধ্যরাতের সাদা মেঘ ওকে একা পেতে চায়। গুনগুনিয়ে গান গেয়ে ওঠে। খোলামেলা একটি আকাশ একবুক ভাবনা নিয়ে ওকে দেখছে যেন। সিঁড়িঘরের দরজায় গাঢ় ছায়াপিণ্ডের মতো কে যেন নড়ে উঠতেই গলা বুজে আসে শবনমের। অবাক হয়ে বলল, রাশেদ?
কোনো সাড়া নেই। শবনম দেয়ালে ঠেস দিয়ে নিপুণ চোখে ছায়াপিণ্ডের দিকে তাকিয়ে বলে, কে!
ছায়াটি বলে, কেমন আছ, এতদিনে আমার কথা মনে নেই হয়তো, জানো –
ইত্যাদি ইত্যাদি উল্টাপাল্টা কীসব যে বলতে থাকে, শবনম ভালো করে তাকায়। হালকা হাওয়ায় জলপৃষ্ঠ যেমন তিরতির করে কাঁপে, ছায়া-যুবকটিও তেমন এক কম্পমান ভঙ্গি নিয়ে তাকিয়ে আছে, কিন্তু কে সে?
শবনমের ঘাড়-গর্দানে ভার নেমে এলো। মাথা টলছে, স্মৃতির পৃষ্ঠাগুলি ফড়ফড় শব্দে উল্টাতে থাকে। তেমন কাছের কেউ বলে তো মনে হচ্ছে না। ছায়াটি তেমনি স্বতঃস্ফূর্ত গলায় বলে, চিনতে পারোনি?
– মনে হয় চিনেছি, আচ্ছা তোমার সঙ্গে পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে কোনোদিন কি সাদা মেঘ দেখেছি?
– না।
– তবে?
শবনম অস্পষ্টতা নিয়ে ফের ছায়াযুবকের গতিবিধি লক্ষ করে। সহসা চিনে ফেলার আকুলতায় কিছুটা বিরক্তি নিয়ে গদগদ কণ্ঠে বলে, ও – তুমি সেই ব্যর্থ গল্পকার, অ্যাকাডেমির মঞ্চে গান গাওয়ার সময় তোমার লেখা ফালতু একটা বই হাতে ধরিয়ে বলেছিলে, ম্যাডাম আমি আপনার ভক্ত।
– হুঁ।
– আমাকে তুমি তুমি করে কথা বলছ কেন?
ছেলেটি এর উত্তর না দিয়ে শবনমের খুব কাছে এসে দাঁড়ায়। ঘামের কেমন উঠকো গন্ধ। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, ওর আত্মায় জমে আছে কালো মেঘ। ক্রোধ কিংবা হিংসায় শবনমের অনুভূতির সাদা মেঘগুলিকে এখনই হয়তো মুচড়ে দেবে। শবনম ভয় পায়। ছেলেটি বলে, তোমার আজকের সাফল্য আর সাদা মেঘের মতো জীবন নিয়ে বহুদিন গল্প লেখার ব্যর্থ চেষ্টা করেছি, একটুও হয় না।
– তাহলে …
– একজন লেখক নিজের কমিটমেন্টকে কখনো খাটো করে দেখে না। তাই তো আত্মাকে ট্রান্সমিউট করে তোমার
সাবকনশাস মনে জায়গা করে নিয়েছি।
– তো?
– এখন গল্প লেখা হবে বেশ।
– না না, ওসব গল্পটল্প আমার ভালো লাগে না, তুমি বরং যাও।
– কিন্তু সৃষ্টি তো ব্যর্থ হওয়ার নয়।
– তুমি … তুমি এখন যেতে পারো।
ছেলেটি আরো কাছে এসে দাঁড়ায়। শবনম তাকাতে পারে না। গা কুঁচকে অদ্ভুত এক দমবন্ধ মনোপীড়নে কাঁপতে থাকে। টের পায়, ছেলেটি ওর কানে ফিসফিস করে বায়রনের কবিতা বলছে, ‘আই হ্যাভ সিন মাচ ফাইনার উইম্যান, রাইপ অ্যান্ড রিয়েল।’
মুহূর্তেই সচকিত হয়ে শবনম ডানে-বাঁয়ে তাকায়, কেউ নেই। ওকে ঠেসে আছে মধ্যরাতের ভয়াল ও নিঃসঙ্গ এক অনুভূতি। ততক্ষণে মেঘ ও চাঁদ দুটোই অ্যাপার্টমেন্টের আড়ালে চলে গেছে। নেপথ্যের মরাটে আলোয় কালো ভৌতিক স্তম্ভের মতো অ্যাপার্টমেন্টগুলি ওর দিকে চেয়ে আছে। দ্রুত নিচে নেমে এক ঢোকে গ্লাসের পানিটুকু খেয়ে রাশেদকে ঠেলে দেয়, শুনছ?
– হুঁ।
– শোন না।
রাশেদ ওপাশে হেলে পড়ে। নাক ডাকছে ভূতের মতো। কী যে বদভ্যাস ওর। প্রতিদিন দেখার পরও আজ যেন সংসারের প্রতিটি বস্তুকণা অচেনা লাগছে। বিছানায় উবু হয়ে বালিশ আঁকড়ে ধরে, থেকে থেকে গা অমন শিউরে উঠছে কেন!
খুব ভোরবেলা শবনমের ঘুম ভাঙল। আজো আকাশে সাদা সাদা মেঘ। এখনই সূর্য উঠবে, একটু রেওয়াজ করা দরকার। নানারকম ভাবনায় গলার স্বর বুঝি নেমে গেছে। হারমোনিয়াম নিয়ে প্রথম সুর তুলতেই কে যেন থেমে থেমে দরজায় কড়া নাড়ল। সেই যুবকবয়সী ভিক্ষুকটিকে দেখে ভয়ে আঁতকে ওঠে। সেদিনের কাটা পা’টি আজ হাঁচু পর্যন্ত বীভৎস রকম ফোলা। মারাত্মক কোনো ইনফেকশন, একটি শুকনো পায়ের পাশে দানবের মতো মাংসল ফোলা পা দেখে রীতিমতো শ্বাসরুদ্ধকর ভয়ে শবনম আড়ষ্ট হয়ে যায়। দারোয়ানের দায়িত্বহীনতা নিয়ে এবার সত্যিই কিছু বলা দরকার। ততক্ষণে ছেলেটি নিজের ভারবহ অস্তিত্ব বাঁকিয়ে বাঁকিয়ে কেমন যেন ফ্যাঁসফ্যাঁসে গলায় বলে, সাহায্য করেন আফা, পাউ কাটামু।
ছেলেটি তাকিয়ে আছে কেমন আত্মবিশ্বাস নিয়ে। এই ছেলেটিও কি ওর আত্মাকে ট্রান্সমিউট করে শবনমের সাবকনসাস মনে জায়গা করে নেবে! হয়তোবা নিতেও পারে। মানুষের মনটা তো অনেক বড়। শবনমের দুচোখ জলে ভরে উঠল। ও জানে, এভাবে কিছুক্ষণ কাঁদতে পারলে ও হয়ে উঠবে সাদা মেঘের মতো নির্ভার। খাঁচার ময়নাটি একটানা বলে যাচ্ছে, সাদা মেঘ, সাদা মেঘ –
বিছানায় শুয়ে থেকেই রাশেদ ধমকে ওঠে, চোপ, সাদা মেঘ নয়, বল গুড মর্নিং।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.