সুলতান মিয়ার ছুরি

ভূতের গলি এলাকার বাসিন্দারা কমবেশি সবাই সুলতানের নামটির সঙ্গে পরিচিত। সুলতান মিয়া, তার নিজস্ব ভঙ্গিমায় হাতে একগাদা আংটি, বালা, ব্রেসলেট পরে প্রতিদিন বসে থাকে, আর হাতে থাকে একটা সুদৃশ্য ছুরি। কবে থেকে সুলতান প্রথম ভূতের গলিতে এলো বা তখন তার বেশভূষা ইত্যাদি কী ছিল সে-বিষয়ে এলাকার পুরনো বাসিন্দারাও একমত হতে পারেন না। তবে একটা ব্যাপারে তারা একমত, আসার পর থেকে তার বসার জায়গায় তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি, প্রায় একই জায়গায় সে তখন থেকে ঘাঁটি গেড়েছে। তার বসার জায়গার বিস্তার মোটামুটি হাক্কানি মসজিদের আশেপাশে, পুরনো কলাবাগান থানার বেশ খানিকটা আগে। কলাবাগান থানাটা কলাবাগান নামে পরিচিত এলাকা থেকে এত দূরে কেন ছিল – সেই বিস্ময়সূচক প্রশ্নের উত্তর এলাকাবাসী পাওয়ার আগেই, থানাটা সরে কারওয়ান বাজারের কাছাকাছি এক জায়গায় চলে গেছে। যদিও থানার অবস্থান কলাবাগান বলে জনমনে থাকা মানসিক মানচিত্রের বাইরের জায়গাতেই কেন হতে হবে – এ-প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।

ভূতের গলি এমনই এক জায়গা, এখানকার বাসিন্দারা স্বতন্ত্র কোনো পরিচয়ের জন্য লালায়িত নন। কলাবাগান থানা পাশে থাকায় কলাবাগানের বাসিন্দা বলে পরিচিত হওয়া যাবে, মানুষ ধানমন্ডির লোক বলে তোয়াজ করবে – এমন খায়েশ তাদের মধ্যে দেখা যায় না। বরং সুদূর বসিলা ব্রিজের আশেপাশে একদল লোক পশ্চিম ধানমন্ডি আবাসিক এলাকা খুলে নিজেদের বেশ সম্ভ্রান্ত ভাবছে বলে জানা যায়। সুতরাং কলাবাগান থানাটি বসিলা ব্রিজের কাছাকাছি কোথাও নতুন অবস্থান নিলে, ওই এলাকার বাসিন্দাদের জন্য সেটি বেশ আনন্দের উপলক্ষ হতে পারতো। ভূতের গলি স্বয়ংসম্পূর্ণ তো বটেই, বরং জায়গাটাকে একটা প্রহেলিকাময় স্থান বললে যথার্থ হয়। নতুন লোকজনের কাছে, নর্থ রোডটাকেই আসল ভূতের গলি বলে মনে হয়। কিন্তু কিছুদিন বা কিছুদূর গেলেই, বা এদিক-সেদিক নজর রেখে হাঁটলেই সার্কুলার রোড, নর্থ সার্কুলার রোড, ওয়েস্ট এন্ড স্ট্রিট এমনকি ক্রিসেন্ট রোড পর্যন্ত চোখে পড়ে ভূতের গলির বিস্তার। সেন্ট্রাল রোডের অবস্থান নিয়ে তেমন কোনো বিতর্ক না থাকলেও (যদিও নামকরণ নিয়ে আছে, সাবেকি আমলের হাতি সম্পর্কিত পিলখানা, এলিফ্যান্ট রোড, হাতিরপুল বা হাতিরঝিলের মতো নামগুলোর পেছনের গল্পের মতো এত অবশ্যম্ভাবী না হওয়ায়, কোনো কোনো সৃজনশীল মানুষের ধারণা, দক্ষিণ ঢাকার বেশিরভাগ পুরনো ও বনেদি ঘরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থানের কারণেই এ-নামকরণ), সেখান থেকে চট করে ডানে ঢুকে পড়া মাংসের দোকানের গলি বা আরেক মাথায় গ্রিন কর্নার, আল-আমিন রোডও আদৌ ভূতের গলিরই অংশ কি না, তা নিয়ে সবার মধ্যেই একধরনের দ্বিধাদ্বন্দ্ব রয়েছে।

নানা রোড মিলেমিশে একটা গোলকধাঁধা তৈরি করলেও আসল প্রহেলিকা শুরু হয় ফ্রি স্কুল স্ট্রিট থেকে। এই ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের শুরুর বা শেষের হদিস নতুন আসা মানুষের পক্ষে করা সম্ভব হয় না। হাতিরপুল বাজার থেকে শুরু করে পুকুরপাড় থেকে বাউলি কেটে বা কাঁঠালবাগানের দিকে এগিয়ে গেলে সামনে-পিছনে, হয়তো বা 
 উপরে-নিচেও চোখে পড়বে ফ্রি স্কুল স্ট্রিট। বাড়িগুলোর নামফলকে কখনো সার্কুলার রোড, কখনো ক্রিসেন্ট রোড কিংবা কাঁঠালবাগান বা গ্রিন রোড লেখার ফাঁকে ফাঁকে মাঝেই মাঝেই নিজের উপস্থিতি জানান দেয় ফ্রি স্কুল স্ট্রিট। প্রায় সমস্ত আর্থ-সামাজিক বা সাংস্কৃতিক বর্গের প্রতিনিধিত্ব করে চলা এই গলি-উপগলি ধরে চোখে পড়ে চৌধুরীর বাড়ির মতো সামন্ততান্ত্রিক অস্তিত্ব থেকে শুরু করে নিরালা কুটিরের মতো ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদী ইমারতও। গলিগুলো ধরে চরকির মতো ঘুরে বেড়ালে, একপর্যায়ে কারো কারো মনে হতে থাকে, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট ঢাকা শহরের এলিটদের হারিয়ে যাওয়া ওয়ান্ডারল্যান্ড। এখানে অন্যমনস্ক হয়ে ঘুরে বেড়ানো একজন পরিব্রাজক যেমন বেরিয়ে আসতে পারে হাতিরপুল কাঁচাবাজারের সামনে, আরেকজন আবার নিজেকে আবিষ্কার করতে পারে মেরাক্কেশের কোনো প্রাচীন মসজিদ বা স্কটিশ হাইল্যান্ডের কোনো মন-খারাপ করা পাহাড়চূড়ায়।

ভূতের গলির বৈশিষ্ট্যই হলো, যেকোনো আলাপই সে তার রাস্তাঘাটের ভুলভুলাইয়ার মধ্যে গিলে খেয়ে ফেলে। তাই সুলতান মিয়ার ছুরির গল্প বলতে গিয়ে, আমরাও খেই হারিয়ে পৌঁছে গেছি এ-অঞ্চলের এক বদ্ধগলির শেষ মাথায়। গলি ধরে একটু পিছনে এসে, ফের যদি গল্পের খেই ধরতে যাই, তাহলে যে-প্রশ্নের মাধ্যমে শুরু করা যেতে পারে তা হলো, সুলতান কেন ভূতের গলিতে এলো, বা এর পেছনের ইতিহাস কী? তুলনামূলক পরিষ্কার জামাকাপড় পরা ছোটখাটো সুলতানের অতীত নিয়ে 

জল্পনা-কল্পনা কম নেই। পথচলতি ভাসমান নাগরিক, এলাকাবাসী বা নিয়মিত রিকশাওয়ালা, প্রত্যেকের কাছ থেকেই জানা যায় নানা রকম কিচ্ছা। এসব আলাপের ফাঁকেই পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সুলতানকে গালি দেয় কোনো রিকশাওয়ালা, আর প্রত্যুত্তরে ছুরি নাচিয়ে পাল্টা খিস্তিখেউড় শুরু করে সে। এই দৃশ্য নৈমিত্তিক হলেও কেউ তাকে জায়গা ছেড়ে কাউকে তাড়া করতে দেখেনি। সময়ের পরিক্রমায় ভূতের গলির জ্যাম ও রাস্তার জটিলতায় চিন্তামগ্ন নারী ও শিশুরা একপর্যায়ে কিছুটা নিস্পৃহ হয়ে পড়ে, সুলতানকে নিয়ে তারা ঠিক চিন্তিত হতে গিয়েও হতে পারে না। তাই বলে জল্পনা-কল্পনা থেমে থাকে না। হাতিরপুলের ফেসবুক গ্রুপগুলোতে সুলতান মিয়া থ্রেডের প্রচলিত অনেক গল্পের একটির সঙ্গে মিল রেখে, এক গম্ভীর রিকশাওয়ালা বিস্তারিত কাহিনি তুলে ধরেন এবং নিজেকে দাবি করেন সবচেয়ে বিশ্বস্ত সূত্র হিসেবে। রংপুরের এক ধনী কৃষক হিসেবে সুলতানের বাবা ও তার ছোটভাইয়ের নাম, এমনকি তাদের জমির পরিমাণ ও প্রতিচাষে ধানের ফলনের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনার মাধ্যমে নিজের দাবির সত্যতার পক্ষে বেশ শক্ত প্রমাণও হাজির করেন তিনি। জানা যায়, সুলতান ভালোবেসে বিয়ে করেছিল সোনাভান নামে শ্যামল সুন্দরীকে। তাদের সুখের সংসার আলো করে জন্ম নেয় একটি সন্তানও। তারপর কোনো এক পূর্ণিমায় বা অমাবস্যায়, আপনারা জানেন যে, চাঁদের অবস্থানের সঙ্গে মানুষের জীবনের জোয়ার-ভাটার সম্পর্ক খুব সামান্যই, এক অজানা কারণে সোনাভান ছেড়ে চলে যায় সুলতানকে। অন্যসব তাৎক্ষণিক কারণ ও তার ফলে সৃষ্ট চিরস্থায়ী ফলের সঙ্গে যথাযথ সাযুজ্য রেখেই, সোনাভানের ছেড়ে যাওয়ার কারণটিও সুলতানের ক্রমশ পাকতে থাকা চুলদাঁড়ি বা ঘোলা হয়ে আসা চোখের দৃষ্টির মতোই ম্লান হয়ে আসে, আর ফলটি তার হাতের আংটি বা ছুরির ফলার মতো ঝকঝকে হয়ে আমাদের চোখের সামনে দৃশ্যমান থাকে। সোনাভানের খোঁজে ঢাকায় আসা সুলতান এলিসের মতোই কোনো এক ভুল দরজার ফেরে এসে পড়ে এই ভূতের গলিতে। দিনের সবটুকু সময় সুলতানকে দেখা যায় এমন নয়, কালেভদ্রে রংপুরের বাড়িতেও তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় বলে গুজব শোনা যায়; কিন্তু সেখানে ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের কোনো বাড়ির নম্বর নামফলকের কোণায় উঁকি দেয় না বলে, সে বারবার ফিরে আসে। আবার তাকে ফিরে পেয়ে খানিকটা আশ্বস্তই বোধ করে ভূতের গলির মানুষ। চলমান গতানুগতিক জনস্রোতের মাঝে তার খিস্তিখেউড় আর ছুরিবাজির চমকেই যেন, ভূতের গলি নামক জায়গাটি জাদুবাস্তবতায় হারিয়ে না গিয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় টিকে থাকে।

সুলতানের পাশ দিয়ে সারাদিন চলে যাওয়া ঘরফেরতা উদগ্রীব মানুষ, তাদের নিত্যকার বের হওয়া আর ফেরার বৃত্তে ঘুরতে ঘুরতে, জানতে পারে না যে, পৃথিবীর সব ঘরেরই প্রধান ফটকের পাশাপাশি আরেকটা দরজা থাকে বের হয়ে যাওয়ার জন্য। কোনো কোনো ঘরে দরজাটা দৃশ্যমান থাকে, আবার কোথাও তা থাকে অদৃশ্য। কিন্তু বের হওয়ার অপেক্ষায় একটা বিকল্প দরজা থাকতেই হয়; কিন্তু জীবন যাদের জন্য সদর দরজাটা বন্ধ করে দেয়, তাদের অনেকেই এ-সত্যটা অনুধাবন করতে না পেরে সেই দরজার খোঁজে মাথা কুটে মরতে থাকে দেয়ালে দেয়ালে। এই দেয়াল ভাঙার যন্ত্রণায় নীল হতে হতে, তারা চার দেয়ালের ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে এসে বাঁচতে চায়, ঠাঁই নেয় খোলা আকাশের নিচে। তাদের জানা নেই, এই অদৃশ্য দেওয়ালের ঘরে আটকা পড়ার জন্য কোনো বিখ্যাত গলির ছাপ্পাওয়ালা বাড়ির প্রয়োজন হয় না, ভূতের গলি, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট বা তার জালের মতো ছড়িয়ে থাকা রাস্তার সঙ্গে সম্পৃক্ত গোটা দুনিয়াই পরিণত হতে পারে সেই দরজাহীন আন্ধার-কোঠায়।

দিনভর সুলতানের নৈমিত্তিক চালে কেউ কোনো ব্যত্যয় দেখতে না পেলেও ওই দরজা খুঁজে পাওয়ার আকুতি বা দেয়াল ভাঙতে চাওয়ার বোবা যন্ত্রণাতেই, কোনো কোনো রাতে সে ঘুম থেকে জেগে উঠে অকস্মাৎ। ক্ষেপে গিয়ে উন্মাদের মতো চালাতে থাকে তার ছুরি। সেই ছুরির প্রতিটি ঘায়ে ভূতের গলি থেকে বিচ্ছিন্ন হয় নর্থ রোড, নর্থ রোড থেকে এক ঘায়ে আলাদা হয়ে যায় নর্থ সার্কুলার কিংবা সার্কুলার রোড। ঝিকিয়ে ওঠা ছুরির একেকটা কোপে খুলে খুলে পড়ে ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের একেকটা রহস্যময় গলি, উপগলি, অদৃশ্য সব দরজা। এভাবে সব বিচ্ছিন্ন করে ফেললেও সোনাভানের সঙ্গে তার অতীতের সুতাটি কিছুতেই কাটতে পারে না সুলতান, খুলতে পারে না তার নিজের কাক্সিক্ষত দরজাটি। কোপের পর কোপ চালিয়ে ব্যর্থ হলে, একসময় ক্লান্ত-বিধ্বস্ত হয়ে সে ঘুমিয়ে পড়ে। আর পরদিন আবার ফিরে যায় তার বসে থাকার পুরনো জায়গাটিতে। সেখানে ঘোলা চোখে ছুরি হাতে সে অপেক্ষা করতে থাকে, আরো অনেক শক্তি সঞ্চয় করতে পারলে, কোনো এক রাতে সোনাভান আর তার অতীতের সুতাটা সে কেটে ফেলবে ছুরির এক ঘায়ে, আর তারপর, হারিয়ে যাবে ভূতের গলির একটা অনাবিষ্কৃত গলিপথ ধরে, চিরতরে।