আনিস রহমান

  • হৃদয়ের জলছবি

    হৃদয়ের জলছবি

    শাবল, গাঁইতি, কোদাল, কুড়াল কোনোটাই বাদ যায়নি। সঙ্গে হাতুড়ি, বাটাল, দা-কাঁচি, কুর্নিসহ দরকারি-অদরকারি এমন কোনো সরঞ্জাম নেই, যা ওদের আয়োজনে যুক্ত হয়নি।  লটবহরে ঠাসা লাল পিকআপ। ডাক বিভাগের গাড়ি ওটা। সারা গা ধুলোয় মাখামাখি। রাষ্ট্রীয় ডাক অথচ দেখতে কী কদাকার! জায়গায় জায়গায় রং চটে গেছে। বিভাগের ‘বি’ নেই। ডাকের নেই ‘ক’। বাংলাদেশের ‘একার’ নেই। নেই ‘শ’। সব মিলিয়ে ডাক বিভাগের মতোই ত্রাহি-ত্রাহি অবস্থা পিকআপের।  ওদিকে ডাকহরকরা ঠিকই ছুটছে বল্লম হাতে। কাঁধে ঝোলা। পায়ে ক্ষিপ্রগতি। সামনে গন্তব্য। চোখে যেন ঘড়ির কাঁটার লাগাম টেনে ধরা। রাষ্ট্রীয় ডাকের তকমা আঁটা পিকআপের গায়ে। শরীরজুড়ে ওর এবড়ো-খেবড়ো গর্ত। কোথাও ধেবড়ে গেছে, কোথাও ট্যামা হয়ে আছে। শরীরের লেখাজোখারাও ফোকলা বুড়ির মতো মাড়ি বের করে হাসছে। যক্ষ্মারোগীর মতো হাড় খিঁচিয়ে পিকআপটি প্রধান বিচারপতির বাংলোর সামনে সবুজ চত্বরে এসে সাইড করে দাঁড়ায়। দমকে দমকে কাশির রোগীর যেমনি বুক ভেঙে আসে ব্যথায়, তেমনি গিয়ারের চাপে উটকো দমকে পিকআপ কাঁপছিল। ঝ্যারেঝ্যার একঘেয়ে বিরক্তিকর এক শব্দ। সেইসঙ্গে মাঝেমধ্যেই বুকফাটা আর্তনাদ। কখনো গোঁ-গোঁ করে বিকট শব্দে কঁকিয়ে উঠছে। গলগল করে কালো ধোঁয়া বেরিয়ে আসছে তখন গাড়ির হাঁপর ছেড়ে। কী এক অস্থির পায়চারি। একটু পরপরই আগুপিছু করছে পিকআপটি। ওর শক্তিমত্তা আর উপস্থিতি জানান দিতে বোধহয় মরিয়া হয়ে উঠেছে পিকআপটি।  এবার অনেকটা সময় ধরে টপ গিয়ার চেপে ধরেছে ড্রাইভার। ফুটপাত ডিঙিয়ে উঁচু চাতালে ওঠার চেষ্টা ওর। পিকআপজুড়ে গরগর-গরগর শব্দ। এ-শব্দ যেন বুকভরে উপভোগ করছে ড্রাইভার। মোটা গোঁফ ওর দু-গালের অনেকখানি ছুঁয়েছে। মুখে পান। লাল চিপটি ঠোঁটের কষ বেয়ে পড়ছে। চোখদুটোও নির্ঘুম। কেমন যেন ঢুলুঢুলু ভাব। পড়ন্ত বেলার লালচে আভা ওর দুচোখ জুড়ে। তাকালে বুকে কাঁপন ধরে। সবমিলিয়ে ডাকাবুকো চেহারা ড্রাইভারের। কী এক মাদকতা ওর চোখেমুখে! ও আচ্ছা করে গিয়ার চাপছে আর পিকআপে কাঁপুনি ধরলে মাথা বের করে পেছনের চাকার দিকে খেয়াল রাখছে। মহাবিরক্ত! না, চাকার কোনো হেলদোল নেই। একেবারে নড়ছে না। একটু দোল খাচ্ছে শুধু। কাজের কাজ তেমন কিছুই হলো না। সামান্য দম নিয়ে ফের টপ গিয়ার চেপে ধরেছে ড্রাইভার। ভাবগতিক এমন, যেন কারো গলা বুঝি চেপে ধরেছে।  এতে কাজ হলো না। ওদিকে কিম্ভুতকিমাকার গাড়ির উটকো আচরণে বিচারপতির বাড়ির বেশ কজন মালি, আর্দালি, চৌকিদার, পাঁচিলের ফাঁক গলে চারপাশ দেখে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করছিল। ও-বাড়ির দোতলার লনেও দু-চারজন করে ভিড় করছিল। কারো চোখে-মুখে বিরক্তি। কারো আবার বিস্ময়! তবে পিকআপের চাকার ঘষায় চাতালের অনেকখানি জায়গার ঘাস ধেবড়ে গেছে, ছড়ে গেছে, কোথাও একেবারে উঠে গেছে। সেইসঙ্গে ধুলোর ওড়াউড়ি। মুহূর্তে চাতালের বৃষ্টিধোয়া সবুজ লাবণ্যটুকু কে যেন খামচে ছিবড়ে একেবারে ত্যানা করে দিয়েছে। বিবর্ণতার ছাপ ঘাসজুড়ে। রাস্তাটি এমনিতেই বেশ নীরব। বিচারপতির বাংলো মাঝখানে রেখে দুদিক থেকে দুটো রাস্তা এসে মিশেছে ওখানে। এতে ‘ইউ’ আকৃতির একটা দ্বীপ মাথা উঁচিয়েছে। বেশকিছু গাছ খানিক দূরে-দূরে দাঁড়িয়ে। কোনো-কোনো গাছ আবার গায়ে-গায়ে জড়িয়ে। ফলফলাদির গাছই বেশি। গাছগুলোর গুঁড়ির চারপাশে নিচুমতো বেদি গড়া।  ফাঁকে-ফাঁকে ঘাসে মোড়া চাতাল। জায়গাটি ছায়াছায়া। বেশ নিরিবিলিও বটে। মাঝেমধ্যে চড়ুই এসে ঘাস খোঁটে। শালিক লাফিয়ে লাফিয়ে এদিক-ওদিক যায়। কখনো বুলবুলি লেজ তুলে এ-ডাল ও-ডাল করে। সবমিলিয়ে পাখির মৃদু কিচিরমিচির চারপাশে মায়া ছড়ায়। অদ্ভুত এক ভালোলাগায় ভরিয়ে রাখে সারাক্ষণ। সেখানেই তিনটে ডাকবাক্স দাঁড়িয়ে আছে – অ্যাটেনশন ভঙ্গিতে। একটি নীল, একটি লাল, অন্যটি হলুদ। ডাকবাক্সগুলো অনেকদিনের চেনা অঙ্কনের। বাক্সগুলোর বয়সও ম্যালা। সেই থেকে ওদের সঙ্গে একধরনের নীরব সখ্য অঙ্কনের। এর আগে ডাকবাক্সের কোনো ভাগ ছিল না। একটি মাত্র লালবাক্স ছিল। তাতে সাদা অক্ষরে লেখা ছিল ডাক খোলার সময়সূচি। হঠাৎ একদিন বাক্সটি উধাও। তার বদলে তিনটি বাহারি বাক্স এসে বসেছে। তিনটি তিন রঙের। তাতে ডাক খোলার সময়সূচি লেখা আছে। লেখা আছে ওদের পরিচয়। লালবাক্স – বিদেশবিভুঁইয়ে পাঠাতে হলে এ-বাক্সে ফেলতে হবে চিঠি। হলুদ বাক্স – সারা বাংলাদেশে ওর গন্তব্য। নীল বাক্সের চিঠির দৌড় শুধু ঢাকা শহর পর্যন্ত। যখন থেকে তিনরঙা তিন ভাই এসে দাঁড়িয়েছে এ-চাতালে, তখন থেকেই ওদের সঙ্গে ভাব অঙ্কনের। এর আগে যখন লাল বাক্সটি একা-একা দাঁড়িয়ে থাকত উদাস ভঙ্গিতে, তখন ওদিকে ফিরেও তাকাত না অঙ্কন। মনে হতো বাক্সটি বোবা। কোনো বোধশক্তি নেই। প্রয়োজন নেই বলে তেমন কোনো ভ্রূক্ষেপও ছিল না তখন। অথচ সময়ের হাত ধরে মানুষের মনও কেমন বদলে যায়, ভেবে অবাক হয় অঙ্কন। আসলে নীলিমার সঙ্গে সম্পর্ক বাঁধার পর থেকেই ডাকবাক্সর সঙ্গেও কেমন এক নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে ওর। প্রায় প্রতিদিনই নীলিমাকে চিঠি না লিখলেই নয়। শুধু কি চিঠি! শুধুই ঈদকার্ড! ঈদকার্ড ছাড়াও নববর্ষের কার্ড না হয় জন্মদিনের শুভেচ্ছা কার্ড। এর বাইরেও কতশত ভিউকার্ড! নানা দেশের কত বর্ণের, কত ধরনের ভিউকার্ড। মনকাড়া সব কার্ড। অনেক খুঁজে পেতে কার্ডগুলো কিনত অঙ্কন। তাতে মনের মাধুরী মিশিয়ে লেখা থাকত  দু-চারটে লাইন। কার্ড বাছাই করতে করতে গুনগুনিয়ে গান করার মতো কথাগুলো সাজিয়ে নিত মুখে মুখে। তারপর পার্কে, কোনো গাছতলায় কিংবা কোনো উঁচু ভবনের ছায়ায় বসে মনের কথাগুলো কার্ডে লিখে পাঠিয়ে দিত নীলিমার ঠিকানায়।  যখন নীলিমা ছিল না, তখন এলেবেলে লাল বাক্সটির দিকে ওর কোনো চোখও ছিল না। বাক্সটির কোনো প্রয়োজনও ছিল না। ফলে বাক্স খোলার সময়সূচি নিয়ে তেমন কোনো মাথাব্যথাও ছিল না ওর। নীলিমার জন্য  এ-চাতালের সবকিছু কেমন যেন বদলে গেছে। ডাকবাক্স ছাড়াও চারপাশের গাছ, নিবিড় ছায়া, আশপাশের ঘরবাড়ি, রাস্তার ব্যস্ততা – সবই প্রিয় এখন অঙ্কনের। এ-গাছ এ-ঘাস এ-ছায়া এ-পাখির কিচিরমিচির এবং ওদের ঘিরে তিনরঙা তিনটে বাক্স, সব মিলিয়ে, জায়গাটি কখন যেন এত মায়াময় হয়ে উঠেছে তা একটুও টের পায়নি অঙ্কন।  নীলিমাকে ভালোবেসে চোখের সঙ্গে ওর মনের চোখও বুঝি বদলে গেছে অবাক রকম। মনের গভীরে গাঢ় রং ধরেছে। মনের সে-রঙে চোখের রং মেখে একটু একটু করে কখন যেন এ-জায়গাটির ভীষণরকম প্রেমে পড়ে গেছে অঙ্কন। সে-প্রেম এখন ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশের সবকিছুতে। প্রিয় ডাকবাক্সগুলোকে আজ উপড়ে ফেলতে এসেছে ডাকবিভাগের লোকজন।  ওরা বলছে, বাক্সগুলো এখন অকেজো। কেউ আর চিঠি ফেলে না। কেউ চিঠির জন্য অপেক্ষাও করে না। সবমিলিয়ে বেহাল অবস্থা। বাক্সগুলোর গোড়ার দিকে মরচে ধরেছে। উঁচু ঢিবির মতো মাটি জমেছে। ঘাস গজিয়েছে বেয়াড়ারকম। উইয়েরাও উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে আজকাল। সে-কারণে কি না জানি না,…