প্রিয় বইগুলো

বিষয়টি নিয়ে ভাবতে গেলে প্রথমেই হোঁচট খাই| আমার প্রিয় বই, এ কি পড়াশোনা আমার গোষ্পদে জলবিন্দুতুল্য হলেও, তার ভেতর থেকে একটি বেছে নিয়ে তাকেই পছন্দের সেরা বলে জাহির করা, না-কি তা হতে পারে একাধিক? লেখারও আছে প্রকারভেদ| গল্প-উপন্যাস-কবিতা, এমন বিভাজন যেন স্বতসিদ্ধ| একটিতে অন্যটির স্বাদ চাইতে পারি| কিন্তু তা ব্যতিক্রমী| বাস্তবও ক্রমাগত রূপ-বদলায়| কাল নিরবধি| তার ছাপ, জীবন-মৃত্যুর ওঠা-পড়া, মানব জীবনে সম্ভাবনার চলমান বহুমুখী বিকাশ, তাতে দ্বন্দ্বে সৌহার্দ্যে নানা রকম পালাবদল, জীবনযাপনে ও জীবন-ভাবনায় প্রবহমান রূপান্তর প্রত্যক্ষের উপকরণ রাশির আকর্ষণ-বিকর্ষণ, বিশ্বপ্রকৃতি ও মানুষী চাহিদায় তাল-বেতালের চূড়ান্ত সমাধানহীন ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার নিত্য প্রসারণ, এ সবই সাহিত্যে সৃষ্টিশীলতার প্রেক্ষাপট এক জায়গায় থাকতে দেয় না| তার পরেও কোনো স্থিরবিন্দুর
তৃষ্ণা কি কোনো সাহিত্যকর্মের আ¯^াদনের অনিবার্য আকুতি? তেমন হলেও তৃষ্ণার স্বরূপ কি সব জায়গায় অভিন্ন? এদের সঠিক জবাব আমার জানা নেই| তবে নিজের দিকে তাকিয়ে বলি, কোনো একটি রচনাকে পছন্দ তালিকায় সর্বোত্তম বলা আমার পক্ষে মুশকিলই| অর্থনীতির প্রাথমিক পাঠে আমরা নিরপেক্ষ রেখার, বা নিরপেক্ষ তলের (surface) ধারণা পাই| তাতে প্রতিটি বিন্দুতে সমান পরিতৃপ্তি| একটি বিন্দুতে দুই বা ততোধিক তৃপ্তিদায়ী বস্তুর সমাহার| দুইয়ের বেশি হলে রেখায় আঁকা যায় না| যাকে বলে ভেক্টর স্পেস (vector space) তাই দিয়ে বোঝাতে হয়| সাধ্যের ভেতরে কোনো নির্দিষ্ট সময়ে পরিতৃপ্তি-মান সর্বোচ্চ করা প্রত্যেকের লক্ষ্য| এই ধারণাটাকে আমার প্রিয় বইয়ের ভাবনায় আমি নিয়ে আসি| স্যামুয়েলসন অবশ্য বলেন, যে যা বাছাই করেছে, সেই তার পছন্দ| অসংখ্য কাল্পনিক বিন্দুর কথা না ভাবলেও চলে| তবে বই পড়ায় চাওয়া ও পাওয়ায় সমীকরণ যে ঘটবেই, এমন নিশ্চিত বলা যায় না| অতদূর না গিয়ে পছন্দের পরিসরটাকে শুধু একে না রেখে একাধিকের সমাহারে নিয়ে যাই| আর এখানে বিপরীত মেজাজের সহাবস্থানকেও মেনে নিই| কারণ, বেঁচে থাকার অভিজ্ঞতাই তা দাবি করে|
আরো একটা কথা| শুধু কল্পনাপ্রতিভা নয়, বাস্তবে মানব
প্রকৃতির বিপুল রহস্যের গভীরে কল্পনায় দৃষ্টি প্রক্ষেপণও নয়, মননের ˆনর্ব্যক্তিক গদ্য অনুশীলনও কোথাও-কোথাও আমার কাছে মহার্ঘ্য মনে হয়| অনেক প্রশ্ন-মীমাংসায় তারা পথ দেখায়; প্রেরণা জোগায়| এমনকি প্রিয় হয়ে ওঠে| এটা আমার কাছে অ¯^াভাবিক মনে হয় না| বরং এমনটি হওয়াই সংগত বলে ভাবি| ভাষায় সৃষ্টিশীলতার ব্যাপ্তি ও গভীরতা কিন্তু নির্ভর করে চেতনায় কতটা সাবালক হয়েছি তার ওপর| এবং ওই সাবালকত্ব অর্জন সুশৃঙ্খল গদ্যে জগৎ ও জীবনের বিবিধ অনুধ্যানের অনুসরণেরই পরিণাম| যতই গৌরব করি, বাংলা বই কিন্তু এদিকে আমাদের মনের ক্ষুধা বা, মনের প্রয়োজন খুব একটা মেটায় না| তেমন পড়ে আনন্দ পেয়েছি, এমন ইংরেজি বইও তাই আমার প্রিয় হয়ে ওঠে| ইংরেজি একটু-আধটু পড়তে পারি, তাই| আর কোনো ভাষা কিছুই জানি না| আর আমার পড়াশোনার বহর নিয়ে বড়াই করার মতো কিছু নেই| তবে ইংরেজি অনুবাদে ওই সাংস্কৃতিক মণ্ডলের অন্য ভাষার বই হলেও তাকে আমি সমান মূল্য দিই| স্প্যানিশ, ফরাসি বা রুশ জানলে বাড়তি আরো কত কী পেতাম, জানি না| ইংরেজিতে যা পাই, তাতে কিন্তু চেতনার জগৎ অপূর্ণ থাকে না| একই রকম কোনো-কোনো বাংলা অনুবাদেও| অবশ্য মূল সেখানে এই সাংস্কৃতিক বৃত্তের| আরো বলে রাখি, কোনো পাঠ্যবই আমার বিবেচনায় আসে না| তারকাচিহ্নিত অবশ্যপাঠ্য যদি হয়, তা-ও না| পড়ার আনন্দ, আমার কাছে শুধুই বিনোদন নয়, শুধুই বিষয়-নিরপেক্ষ সিঁড়ি-ভাঙা তত্ত্বজ্ঞানও নয়| উভয়েরই যে প্রয়োজন আছে, এবং তা আত্যন্তিক, তা কিন্তু অ¯^ীকার করি না|

দুই
আমার পড়া প্রিয় বইয়ের তালিকায় প্রথমেই আসে রামায়ণ ও মহাভারত| সংস্কৃতে মূল বই পড়িনি| রাজশেখর বসুর সারানুবাদ| তাতেই আমি অভিভূত| সংস্কৃতে ছাড়া-ছাড়া উদ্ধৃতি, বা পর্বাধ্যায়, যেমন সীতয়া পাতাল প্রবেশঃ, পড়েছি| তাতে ধ্বনির বাড়তি ব্যঞ্জনা আরো কিছু দেয়| কিন্তু রাজশেখর বসুর অনুবাদে মূলের করুণা ও গাম্ভীর্য হারিয়ে যায় না| আর একটা গুণ, ভাষার নিরাসক্তি|
কৃত্তিবাসী রামায়ণে বা কাশীদাসী মহাভারতে তা নেই|
তাই বলে গীতা আমাকে সেভাবে টানে না, যদিও অসামান্য সুসম্বন্ধ দার্শনিক কাব্য বলে তার খ্যাতি সবখানে; এবং শ্রীকৃষ্ণের বিশ্বরূপ বর্ণনায় ˆচতন্যের আকাশ পুরোপুরি বিভাসিত হয়| কিন্তু ‘চাতুর্বর্ণং ময়া সৃষ্টং গুণকর্মবিভাগশঃ’ — এই বাণীর তামসিক অর্থ, এবং সম্পূর্ণত যৌক্তিক, এই উপমহাদেশে যুগ-পরম্পরায় মানবমুক্তির ও বিচিত্র কর্মের পথে তার অগ্রগতির পথ যে রুদ্ধ করে রেখেছে, তা অ¯^ীকার করা যায় না| এরই সম্পূরক আর এক বাণী, ‘কর্মেণ্যবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন’ — কর্মেই তোমার অধিকার, ফলে কখনো নয় — প্রেরণাসঞ্চারী অবশ্যই, কিন্তু কাণ্ডজ্ঞানকে খণ্ডন করে| বর্ণবিভাজনের যৌক্তিক ভূমিও ˆতরি রাখে| আবার যখন উচ্চারিত হয় ‘ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভোবামি যুগে যুগে’ — তখন কি তা যে-কোনো সময়ে একনায়কের দর্পিত উত্থানকে উৎসাহ জোগায় না? সত্য কথা, ‘ধর্ম’ বলতে আজ যা বুঝি, ভগবদ্গীতার কালে তা তেমন ছিল না| ধর্ম বলতে বোঝাত মানুষের জীবনযাপনে সর্বজনগ্রাহ্য বিধিনিষেধ, যা কল্যাণকর বলে মান্যতা পেত| সবসময় তা যে নির্দ্বান্দ্বিক হতো, এমন নয়| তবে যূথবদ্ধ জীবনের সংজ্ঞার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক ছিল না| তারপরেও ধর্মসংস্থাপন ছিল স্থান-কাল ও বস্তুগত অবস্থার মুখাপেক্ষী| এবং যাঁর বা যাঁদের আপেক্ষিক কর্তৃত্ব বেশি, তিনি বা তাঁরাই বিধান দেন ধর্মাধর্মের| অন্যথায় সর্বতোসিদ্ধ কোনো কিছু খাড়া করা আয়ত্তের বাইরেই ছিল| মহাভারতে ধর্ম-বকের পথ কী? — এই প্রশ্নের জবাবে যখন যুধিষ্ঠির বলেন, বেদ বিভিন্ন, স্মৃতি বিভিন্ন, মুনিবাক্য এক-একজনের এক-এক রকম, ধর্মের তত্ত্ব গুহায় নিহিত, অতএব মহাজন যে-পথে গেছেন সেইটেই পথ| এখানে ঋষিবাক্যের বিভিন্নতার উল্লেখ করে আগেই সর্বজ্ঞ ব্যক্তির নির্দেশকে খণ্ডন করা হয়| কারণ তা অবাস্তব| ফলে ‘মহাজন’ শব্দের আর যে অর্থ করা যায়, তা বহুজন| স্পষ্টতই গীতার বাণীতে যুগে-যুগে একক অবতারের আগমনের আশ্বাস থেকে এ দূরে সরে|
আরো একটা কথা মাথায় রাখি| রামায়ণ-মহাভারতে যেমন প্রচুর স্বার্থবাহী প্রক্ষেপণ আছে, তেমন গীতাতেও আছে, এমনটিই যৌক্তিক| তাই ‘চাতুর্বর্ণং ময়া সৃষ্টং’ বা ‘ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভোবামি যুগে যুগে’, এ জাতীয় নির্ঘোষ কতটা বিনা বাক্যে মেনে নেওয়া যায়, তা বিবেচনার বিষয়|
প্রক্ষেপণ যেমন থাক, যতই থাক, রামায়ণ বা মহাভারতের মূল ধারা কিন্তু তাদের প্রত্যাখ্যানই করে| খুঁটিয়ে দেখলে, স্বয়ং মহাভারতেই ‘চতুর্বর্ণময়া কৃত্বা’ — এমন দাবির কোনো যুক্তিসংগত ভিত্তি খুঁজে পাওয়া মুশকিল| গোটা কাহিনির উৎসে পাই আমরা সত্যবতীকে| প্রতীকী মায়া তুলে নিলে দেখি, তিনি এক জেলেনির সন্তান, যে-জেলেনি সন্তানের জন্ম দিয়েই মারা যায়| পরে সত্যবতী ধীবর রাজের পালিত কন্যা| নিশ্চয় সেই ধীবররাজ, ব্রাহ্মণ বা ক্ষত্রিয় নন| সত্যবতী ও রাজা শান্তনুর দুই ছেলে, চিত্রাঙ্গদা ও বিচিত্রবীর্য| শান্তনুর পর চিত্রাঙ্গদা রাজা হলেও তাঁর অকালমৃত্যু ঘটে| বিচিত্রবীর্য তখন রাজা হলে সত্যবতীর অনুরোধে শান্তনু-গঙ্গার সন্তান, ভীষ্ম, কাশীরাজের কন্যা অ¤ি^কা ও অ¤^ালিকাকে ¯^য়ংবর সভা থেকে জয় করে এনে তাঁর সঙ্গে বিয়ে দেন| কিন্তু বিচিত্রবীর্যও ¯^ল্পায়ু ছিলেন| নিঃসন্তান অবস্থায় তিনি মারা গেলে রাজবংশ লোপ পায় দেখে সত্যবতী ভীষ্মের সম্মতিতে মুনি পরাশরের ঔরসে তাঁর কানীনপুত্র কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাসকে নিয়োগ করে অ¤ি^কার গর্ভে জন্মান্ধ ধৃতরাষ্ট্র ও অ¤^ালিকার গর্ভে পাণ্ডুবর্ণের পুত্র পাণ্ডুকে পৃথিবীর আলো দেখালেন| ব্যাস ছিলেন এমন কুৎসিত যে, তাঁকে উচ্চবর্ণের বলে ভুল করার কোনো কারণ থাকে না| কিন্তু মহাভারত কাহিনির সূত্রপাত ঘটালেন এই তিনজন — সত্যবতী, পরাশর ও ব্যাস| অশেষ গুণের অধিকারী হয়েও তারা কেউই জন্মে কোনোরকম বর্ণগৌরবের দাবিদার নন| মহাভারত যে অসংকোচে তার বর্ণনা দেয়, এতেই তার গৌরব কর্ণের তেজোদ্দীপ্ত আত্মবিশ্বাসী উচ্চারণ — ‘ˆদবায়ত্তং কুলে জন্ম, মদায়ক্তং তু পৌরুষম&’, — এও পাই মহাভারতে| হিড়ি¤^া, উলুপী, চিত্রাঙ্গদা — এঁদের কাউকেই আর্যবৃত্তে ফেলা চলে না| অবশ্য হরপ্পা-মহেনজোদারোর ভাস্কর্য-নিদর্শনসমূহ থেকে পণ্ডিতদের অনুমান, প্রাক-আর্য দ্রাবিড় সভ্যতায় পুরোহিততন্ত্র প্রবল ছিল, আর্য যাযাবরদের ভেতর তেমন হওযার সুযোগ ছিল না| পরে আর্যরা কৃষিকাজ শিখে থিতু হলে দ্রাবিড় ও অন্য প্রাচীন অধিবাসীদের সঙ্গে তাদের মিশ্রণ অনিবার্য হয়ে পড়ে| মিশ্রণের সঙ্গে ভাবধারাও যুক্ত হয়| মহাভারত-কথার অন্তর্দেশে তাদের অবিরাম প্রবাহ আন্দাজ করা কঠিন নয়| এতে এই মহাকাব্য সাহিত্যরসের পশ্চাতে আরো এক মাত্রা নির্দেশ করে| তার আকর্ষণও কম নয়|
মহাভারত মহাকালের প্রেক্ষাপটে অসংখ্য মানব-মানবীর ভাগ্যরেখা পরম নিস্পৃহায় অনুসরণ করে| কাহিনি কিন্তু নীরস হয় না| ˆনতিকতার একরঙা প্রাচীরও এ তোলে না| কাহিনির শীর্ষবিন্দু কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ| তাতে হার-জিত আছে| কিন্তু শেষ পর্যন্ত একক কোনো জিত নেই, হার নেই| পাণ্ডবদের রাজ্য উদ্ধার তাদের জন্য কোনো সুখের বার্তা বয়ে আনে না| মর্মান্তিক অনুশোচনা, প্রাত্যহিকতায় দিনাতিপাত ও আপন-আপন কর্তব্যের বোঝা টানা, এই তাদের নিয়তি হয়ে দাঁড়ায়| বাকি থাকে মৌষলপর্বে কাণ্ডজ্ঞানহীন হিংসায় উন্মত্ত যাদবদের পারস্পরিক হননের কালে নিষ্ক্রিয় শ্রীকৃষ্ণের আলোড়নহীন-গৌরবহীন-পরিজনহীন মৃত্যু ও পাণ্ডবদের অনাড়¤^র মহাপ্রস্থান যাত্রা| নতুন কোনো আশার বাণী ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয় না| তবু পাই অন্তিমে এক আশ্চর্য প্রশান্তি| ‘ফল চেয়ো না, কর্মেই শুধু তোমার অধিকার’ — এই বাণী যেন ফিরে এসে চেতনাজগৎ গ্রাস করে| আর প্রতিবাদ করি না| হাহাকারও না| আবার জীবনের মুখোমুখি হই| যে-কারণে আমার মহাভারত প্রিয়, ঠিক সেই একই কারণে রামায়ণ নয়| রামায়ণের সাহিত্য-মূল্য তুলনায় বেশি| অনেক সুস¤^দ্ধ| কোনো-কোনো জায়গা মূলে বাল্পীকি-রচনা বারবার পড়লেও পুরনো হয় না| আর উত্তর-কাণ্ডের পরিসমাপ্তিতে ‘সীতার পাতাল প্রবেশ’ অংশও অতুলনীয়| অনেকে গোটা
উত্তর-কাণ্ড পরবর্তী সংযোজন বলে মত দেন| তুলসী দাস তাঁর রামচরিত মানসে উত্তর-কাণ্ড পুরোটাই বাদ দিয়েছেন| কিন্তু আমার কাছে এটা সংগত মনে হয় না, যদিও রাজশেখর বসুও পূর্ব-কবি ও
উত্তর-কবি দুই অংশের রচয়িতাকে পৃথক করেছেন| রামায়ণের শুরুতে পাই কৌঞ্চবধ ও বাল্মীকির কবি হয়ে-ওঠা| আমার বিবেচনায় গোটা মহাকাব্যের মূল সুর ধরা আছে এতে| উত্তর-কাণ্ড না থাকলে কিন্তু এর কোনো প্রাসঙ্গিকতা থাকে না| এমনি আলাদা একটুকরো কাহিনি হয়ে ঝুলে থাকে| সত্য কথা, আমাদের মহাকাব্যের ঐতিহ্যে তার বাঁধন বড় আলগা| নানা দিক থেকে নানা স্রোত তাতে এসে মেশে| তার পরেও প্রস্তাবনাতেই তালকানা হয়ে পড়া বিসদৃশ ঠেকে|
উত্তর-কাণ্ড বাদ দিলে ক্রৌঞ্চবধ বৃত্তান্তও মূল্য হারায়| তা গোটা রামায়ণকে হতমান করে|
রামায়ণে সীতার লাঞ্ছনা অনেককে রুষ্ট করে| কিন্তু এমন একটা বিষয়, যেখানে ব্যক্তিগত হিসাব-নিকাশে সুষ্ঠু সমাধান মেলে না| ভুলে যাওয়া ঠিক নয়, তখনো রাষ্ট্রব্যবস্থা আধুনিক গণতান্ত্রিক আকার পায়নি| বিচারব্যবস্থাও কোনো ˆনর্ব্যক্তিক প্রতিষ্ঠানের রূপ নেয়নি| যৌক্তিক সিদ্ধান্ত সবটা নির্ভর করে রাজার ওপরে| তাঁর উপদেষ্টামণ্ডলী থাকতে পারে| সভাসদবৃন্দও| কিন্তু দায়িত্ব পুরোটাই তাঁর| এরকম একটা পরিস্থিতিতে জড়িয়ে পড়েন রাম ও সীতা| রাম জানতে চান জনগণের অভিপ্রায়| এবং তাকেই প্রাথমিকতা দেন| প্রথমবার সীতার অগ্নিপরীক্ষা — আসলে বিচারসভা, সেখানে উপস্থিত ছিলেন ব্রাহ্মণ ও দেবতারা, অর্থাৎ যাকে বলি সোশ্যাল এলিট, তাঁরা| আরো ছিলেন সাধারণ জনগণ| এই জনগণ প্রথম থেকেই এই বিচারে প্রতিবাদমুখর| শেষে বিজ্ঞজনেরাও রামকে নির্দেশ দিলেন, সীতাকে গ্রহণ করো| রাম বললেন, তিনি অন্তর থেকে জানেন সীতার কোনো পাপ নেই| কিন্তু সবার অনুমোদন ছাড়া রাজা হলেও তাঁর ব্যক্তিগত ন্যায়বোধ তিনি একক অধিকারে কার্যকর করতে পারেন না| পরম আদরে এরপর তিনি সীতাকে গ্রহণ করেন| তাঁর আপন রাজ্যে পরিস্থিতি কিন্তু ভিন্ন| অভিযোগ জনগণের, সীতা অসতী| তাকে উপেক্ষা করার ক্ষমতা তাঁর ছিল| কিন্তু রাজধর্ম পালনে কি তাতে ব্যাঘাত ঘটত না? নিরুপায় রাম দ্বিতীয়বার অনুরূপ বিচারের আহ্বান করেন| উপস্থিত জনগণ কিন্তু পাথরের মতো অবিচল থাকেন, যদিও তিনি ওই সভাতেও বারবার বলেন, সীতা যে নিষ্কলুষ, এ-বিষয়ে তিনি নিশ্চিত| জনগণ তাঁর আকুতিতে সাড়া দেননি| ‘কৃত্তাঞ্জলির্জলোনেত্রা’, ‘অধোধৃষ্টিরবাঙ&মুখী’, ‘কাষায়বাসিনী’ সীতা তখন বললেন, ‘মনসাকর্মনাবাচা’ যদি তিনি শুধু রামেরই অর্চনা করে থাকেন এবং রাম ভিন্ন অন্য কারো চিন্তা যদি বিন্দুমাত্র না করে থাকেন, তবে মাতা মাধবী (পৃথিবী) বিদীর্ণ হয়ে তাঁর গহ্বরে তাঁকে গ্রহণ করুন| মাতা ধরিত্রী ভূতল থেকে ¯^র্ণ সিংহাসনে উঠে এসে দুবাহু মেলে সীতাকে কোলে তুলে পাতালে অন্তর্হিত হলেন|
এটা খেয়াল করবার, রামও সীতা ছাড়া দ্বিতীয় কোনো নারীকে তাঁর জীবনে আহ্বান করেননি| যজ্ঞানুষ্ঠানে ¯^র্ণসীতা পাশে নিয়ে আপন কাজ সম্পন্ন করেছেন| সিংহাসন যদি পরিত্যাগ করতেন, তাতে সমস্যার সমাধান হতো না| অপবাদ শতগুণ হয়ে
পেছন-পেছন তাড়া করে তাঁদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলত| রামায়ণের শুরুতে নারদকে বাল্মীকির প্রশ্ন — কে আছেন পৃথিবীতে, যিনি সর্বগুণাšি^ত ও কর্তব্যে অবিচল, বিপুল দুঃখমন্থনে তার জবাবও অন্তিমে এসে মিলল|
হোমারের ইলিয়াডও আমার প্রিয়| তবে তাতে স্থান-কালের পরিসর অনেক সীমিত এবং ঘটনাক্রম অনেক সুশৃঙ্খল| ট্রয়ের যুদ্ধে গ্রিক শিবিরে যুদ্ধে-জেতা নারীর দখল নিয়ে সেনাপতি আগামেমনন ও বীরশ্রেষ্ঠ একিল্লিসের ভেতর কলহ, তা থেকে একিল্লিসের যুদ্ধ থেকে সরে দাঁড়ানো, ট্রয় সেনাপতি হেক্টর সুযোগ বুঝে হামলা চালালে তার হাতে একিল্লিসের সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু পেট্রোক্লাসের মৃত্যু, এতে প্রতিশোধস্পৃহায় একিল্লিসের যুদ্ধে ফেরা ও হেক্টর বধ, এই হলো ইলিয়াডের কাহিনিসার| মূল সূত্রের বাইরে এ কদাচিৎ যায়, তাই রামায়ণ-মহাভারতে যেমন যথেচ্ছ প্রক্ষেপণ ঘটে, এখানে তার সুযোগ নেই বললেই চলে| আমাদের মাইকেলের মেঘনাদবধ কাব্য ইলিয়াডে হেক্টরবধের ছাঁচে গড়া| অবশ্য মাল-মশলা সবই ভিন্ন| মেজাজও অনেকটা| তবে মেঘনাদবধে অহঙ্কার ও ক্রোধের বিস্ফোরণ ততটা নেই| করুণা অপ্রতিরোধ্য| তার সামনে নতজানু হতে হয়|
কালিদাসের (খ্রিষ্টীয় পঞ্চম শতক) কবিত্ব-প্রতিভা কিংবদন্তিতুল্য| শুদ্ধ সাহিত্যিক কলাকৃতিতে তাঁর মৌলিকত্বে ও ˆনপুণ্যে আমাদের বিস্ময় আকাশ ছোঁয়| বোঝা যায়, সাহিত্যের নিজ¯^ ভুবন একটা ˆতরি হচ্ছে| তা সম্পূর্ণত জীবননিরপেক্ষ না হলেও তা থেকে কিছু উপকরণ নিয়ে ¯^য়ংক্রিয়ায় সগৌরবে ¯^য়ংসিদ্ধ হতে চাইছে| আমরা মুগ্ধ হই, কিন্তু আকৃষ্ট হই না| তার জগৎ আমাদের চেতনার অন্তর্লোকে প্রবেশ করে না| রামায়ণ-মহাভারতের কাহিনি-চূর্ণের ওপর তিনি তাঁর কাব্য-প্রতিমা নির্মাণ করেছেন| কিন্তু ওই দুই মহাকাব্যের প্রবল জীবনসংলগ্নতা থেকে তা দূরে সরেছে| আমি তাকে নমস্কার জানাই, প্রিয় বলে কাছে টানি না|
আরো পরে ইতালিতে দান্তে (খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতক) তাঁর অসামান্য মহাকাব্য ডিভাইন কমেডিতে স্ফুটনোন্মুখ য়োরোপীয় সংস্কৃতির সাধারণ মনোভূমির নয়নাভিরাম দৃশ্যমালার বর্ণোচ্ছল প্রকাশ ঘটান| তা ওখানে গণমানসে শ্রদ্ধার ও গৌরবের অবশ্যই| সচেতনভাবে যদি না হয়, তবু ঐতিহ্যের ¯^ীকৃতিতে তো বটেই| কিন্তু আমার কাছে এ দূরের মিছিল| একান্ত আপন হয়ে ওঠে না| একই রকম গ্যেটের (উনিশ শতক) ফাউস্ট| অবশ্য মেফিস্টফিলিস ও ফাউস্টকে অপর মনে হয় না, যেন আমার ভেতরেও তাদের বাস| ফরাসি বিপ্লব ও শিল্প-বিপ্লবের আঁচ তাদের পোড়ায়| প্রায় দুশো বছর পর এখানেও তার জ্বালা বুঝি| মনকে শুধু প্রফুল্ল করলেই কোনো বই যে প্রিয় হয়, তা নয়| সে যদি আমাকে ঠিক-ঠিক চেনায়, — আমার গ্লানিতে, আমার গোপন চাওয়ায়, আমার পরাজয়ে — তাহলেও তা আমার মন কেড়ে নিতে পারে| তবে গ্যেটের রচনায় মেয়েদের ভূমিকা অকিঞ্চিৎকর — পুরুষ-কর্তৃত্বে অসহায়| এটা আজ বড়ই বেমানান| তাঁকে আপন ভাবা যায় না|
শেক&সপিয়র আরো আগের (ষোড়শ-সপ্তদশ শতক) হলেও তাঁর মহিমা অম্লান| বিশেষ করে হ্যামলেট ও ম্যাকবেথের আবেদন অ¯^ীকার করা যায় না, চিরায়ত| এমনকি দ্য মার্চেন্ট অফ ভেনিসে শাইলককে তো মনে হয় বিশ্বসাহিত্যের সেরা সৃষ্টির একটি| খলচরিত্রের বলে নয়, — অপমানে, ক্রোধে, প্রতিহিংসায় পরিপূর্ণ জীবন্ত হয়ে ওঠায়| এসবই হলো বিগত কালের কীর্তি থেকে কোনো মানদণ্ড খোঁজা| এবার নজর দিই অপেক্ষাকৃত নিকটে| ঘটমান সাম্প্রতিকেও|

তিন
অত্যুক্তি হবে না, যদি বলি, বাংলা কথাসাহিত্যের প্রকৃত পথিকৃৎ বঙ্কিমচন্দ্র| তাঁর আগে প্যারীচাঁদ মিত্র ও কালীপ্রসন্ন সিংহ নকশা জাতীয় কিছু রচনা ধারাবাহিক গদ্যে উপহার দিয়েছিলেন| খ্রিষ্টান মিশনারিদের উদ্যোগেও গদ্য কল্পকাহিনি রচিত হয়| কিন্তু এদের সত্যিকার উপন্যাস বলা যায় না| বঙ্কিমের দুর্গেশনন্দিনী প্রথম বাংলা উপন্যাস| এবং তা সার্থক (১৮৬৫ খ্রিষ্টাব্দ)| তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস কপালকুণ্ডলা (১৮৬৬)| বাংলা ভাষায় আমার প্রিয় কথাসাহিত্যের তালিকায় একেই প্রথম গণ্য করি| অবাক হই, কী করে বিষয়, ভাষা ও পরিমিতিবোধে এমন সামঞ্জস্য এনে তিনি তাকে প্রাণময়ী করলেন| অবসান তার পূর্ণতায়| রেশ কিন্তু কাটে না| এখনো মনের আয়নায় ভেসে ওঠে| দীপ্তি একই রকম অম্লান| তিলোত্তমাই বলতে হয়| এতটুকু বাড়াবাড়ি নেই| ঘাটতিও নেই| ঐশ্বর্যে-সংযমে এ এক অনন্য সৃষ্টি| এবং প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্য জীবন্ত| সমগ্রতেও| ভাবপ্রতিমা যেন মহাশ্বেতা| অতুল গৌরবে অধিষ্ঠিতা| বঙ্কিম পরে আরো উপন্যাস লিখেছেন| সবলে সব প্রতিরোধ ভেঙে এগিয়েছেন| কিন্তু মোক্ষলাভ বুঝি ঘটে যায় কপালকুণ্ডলাতেই| পরে তাঁর অনেক লেখার অভিঘাত আরো প্রবল হয়ে বেজেছে|
মেধার প্রাবল্য তাঁর দিগি¦দিকে ছড়িয়েছে| জীবনযাপনের ˆনতিক ও নান্দনিক ভিত্তি নিয়ে ক্রমাগত ভেবে চলেছেন| অতৃপ্তিও অনিঃশেষ সঙ্গে-সঙ্গে চলেছে| এতে লেখা অনেক প্রশ্নের পেছনে ছুটেছে| নানা বিতর্ককে উস&কে দিয়েছে| সাহিত্য-জগতে বীর নায়কে তিনি পরিণত হয়েছেন| কিন্তু কপালকুণ্ডলার সপ্রাণ সুমিতি, আমার মনে হয়, সুন্দরকে আশ্রয় করে সেভাবে আর ফিরে আসেনি| বলা কথার ঝোঁক একটা বড় হয়ে নিজেকে জানান দিয়েছে| তার গুরুত্বের প্রাথমিকতা অবশ্যই থাকা অযৌক্তিক নয়| কিন্তু সাহিত্যের শিল্প-সার্থকতা সে-অনুপাতে ক্ষুণ্ন হওয়াও সম্ভব|
কপালকুণ্ডলা ও নবকুমারের প্রথম দেখা হওয়ার দৃশ্য রচনা অতি প্রসিদ্ধ| এখানে উদ্ধৃতি দিই :
নবকুমার অকস্মাৎ এইরূপ দুর্গমমধ্যে ˆদবীমূর্তি দেখিয়া নিস্পন্দশরীর হইয়া দাঁড়াইলেন| তাঁহার বাকশক্তি রহিত হইল, — স্তব্ধ হইয়া চাহিয়া রহিলেন| রমণীও স্পন্দহীন অনিমেষলোচনে বিশাল চক্ষুর স্থিরদৃষ্টি নবকুমারের মুখে ন্যস্ত করিয়া রাখিলেন| উভয়মধ্যে প্রভেদ এই যে, নবকুমারের দৃষ্টি চমকিত লোকের দৃষ্টির ন্যায়, রমণীর দৃষ্টিতে সে লক্ষণ কিছু মাত্র নাই, কিন্তু তাহাতে বিশেষ উদ্বেগ প্রকাশ হইতেছিল| অনন্তর সমুদ্রের জনহীন তীরে, এই রূপে বহুক্ষণ দুইজনে চাহিয়া রহিলেন| অনেকক্ষণ পরে তরুণীর কণ্ঠ¯^র শুনা গেল| তিনি অতি মৃদু ¯^রে কহিলেন, ‘পথিক তুমি পথ হারাইয়াছ?’
দৃশ্য মায়া শব্দমায়ায় সঞ্চারিত হয়ে আমাদের মনোভূমিতে স্পন্দন জাগায়| তার ব্যাকুলতা ফুরোয় না| অবশেষ থেকে যায়| হঠাৎ-হঠাৎ বিদ্যুচ্চমকের মতো চেতনাকে দীর্ঘ রেখায় দীর্ণ করে| প্রাত্যহিকতায় মিলিয়েও যায়| বর্ণনায় বিন্দুমাত্র আতিশয্য নেই| অপূর্ণতাও নেই| অমরত্ব আছে| যে-কোনো বিকল্পই বেমানান|
কপালকুণ্ডলায় বঙ্কিম অতিসাবধানে যাকে ¯^তঃসিদ্ধ বলে ধরে নেওয়াই রেওয়াজ, তা নিয়ে এক জায়গায় সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন| কিন্তু কাহিনির কুহকজাল তা ভেদ করে না| আমরা সচকিত না হয়ে বরং ওই জালের টানে আরো আগ্রহে সামনে এগিয়ে যেতে চাই| ঘটনাক্রমে এক শীর্ষ মুহূর্তে আমরা দেখি, পদ্মাবতী, পরে
লুৎফ-উন্নিসা, কপালকুণ্ডলাকে বলছেন, ‘স্বামী ত্যাগ কর’, দুই-এক কথার পর, আমরা পড়ি : ‘কপালকুণ্ডলা আবার চিন্তা করিতে লাগিলেন| পৃথিবীর সর্বত্র মানসলোচনে দেখিলেন — কোথাও কাহাকে দেখিতে পাইলেন না| অন্তঃকরণমধ্যে দৃষ্টি করিয়া দেখিলেন — তথাচ এ নবকুমারকে দেখিতে পাইলেন না, তবে কেন লুৎফ-উন্নিসার সুখের পথ রোধ করিবেন? —’ দৃষ্টবাদী দর্শনে (positivism) বঙ্কিম আকৃষ্ট ছিলেন| এখানে যেন তারই প্রতিফলন| উনিশ শতকের বাংলায় ‘পতি পরম গুরু’ — এটা এরকম অপ্রতর্ক্য ছিল| তার অবাধ্য হওয়ার, বা তাকে ত্যাগ করার কথা কোনো নারীর ভাবা ছিল ভদ্রসমাজে অকল্পনীয়| অথচ বঙ্কিম এমন এক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে কপালকুণ্ডলাকে এঁকেছেন, যেখানে তা অসম্ভব মনে হয় না, তার সুখেরও হেরফের হয় না| অথচ লুৎফ-উন্নিসার সুখ বাড়ে| অর্থাৎ সমাজে মোট সুখ বাড়ে| মিল&, বেনথাম, কোঁৎ-এর তত্ত্বকে এইভাবে সুকৌশলে তিনি এখানে প্রয়োগ করেন| কোথাও তাল কাটে না| যদিও সমাজ-ভাবনার মূলকাণ্ডে একগাছা শিকড় ধরে টান মারেন|
কপালকুণ্ডলা কোনো সুখের পরিণতি আনে না| আসলে দৃষ্টবাদী ধারণার চেয়ে সুখ অনেক জটিল| শুধুই যোগাশ্রয়ী (additive) সরলাঙ্কে তার পরিমাণ মাপা যায় না| যদিও ভাবনার একটা মুখ তা চেনায়| বঙ্কিমের শিল্পীসত্তা ওই পর্যন্তই তাকে অনুসরণ করে| তারপরে ব্যক্তিগত যৌক্তিক পছন্দ-অপছন্দ যা-ই হোক, সৃষ্টিকে তার শিল্প-সম্ভাবনার পূর্ণতার দিকে নিয়ে যান| এখানে তিনি দ্বিতীয় ঈশ্বর| একই রকম অনাসক্ত| ‘সুখ নয় সে, দুঃখ সে নয়, নয় সে কামনা’ — এক গভীর পার্থিব পূর্ণতা-অপূর্ণতার শিল্প-ˆবভবের ¯স্বাদ এনে দিয়ে তিনি আমাদের উত্তরণ ঘটান|

কপালকুণ্ডলা ছেপে বেরোবার পর প্রায় আড়াইশো বছর কেটে গেল| কিন্তু আশ্চর্য! এখনো তা শিখরস্পর্শী| বাংলাভাষায় তার গরিমা ছাপিয়ে গেছে, এমন কোনো উপন্যাস চোখে পড়ে না| বোধ হয়, বাস্তবই তা হতে দেয় না| ভাঙা-গড়ার ভেতর দিয়ে অসংখ্য চিন্তাস্রোত ঘটনার জন্ম দিয়ে, অথবা ঘটনার পেছন-পেছন নানা দিকে ছোটে| মিত্রতা-শত্রুতা, দুইয়েরই উদ্ভব ঘটে সেসব থেকে| কাটাকাটি-মারামারি-জড়াজড়ি, এসবে প্রেক্ষাপট আচ্ছন্ন এবং তারা প্রতিমুহূর্তে ভোল পালটায়; প্রতি মুহূর্তে প্রসারিত হয়| যাকে বলে, চারদিকে খোলা ও বন্ধনহীন, তাই| শিল্পীর চোখ যতদূরই যাক, সবটা ধরতে পারে না| আবার, বিন্দুতে বিশ্বের প্রতিফলন ঘটে না| দৃষ্টি টুকরো-টুকরো হয়ে ছড়িয়ে যায়| কোনোভাবে জোড়া লাগে না| দূর থেকে সবটা দেখতে গেলে আবরণের তলে চোখ যায় না| এমন অবস্থায় উপন্যাসসমগ্রের কোনো ভাবনা জাগায় না| বড়জোর ক্ষুদ্র সীমায় দ্বন্দ্বমুখর বাস্তবতার একটা পিঠ দেখায়| এবং সেখানেও পূর্ণ দৃষ্টির ও পূর্ণ প্রাণের প্রসাদ তা পায় না| কারণ, শিল্পী নিজেও উঠে আসেন এই বাস্তব থেকে| ভালো-মন্দর বিবেচনা তাঁর মতো তিনি গড়ে তোলেন| কিন্তু তা অনন্যনির্ভর থাকে না| খণ্ডিত স্থান-কাল ও ঘটনারাশি তাঁর পছন্দ-অপছন্দের ওপর নিশ্চিত ছাপ ফেলে| বঙ্কিমের ওপরেও যে এমন ঘটেনি তা নয়| অনেক জায়গায় তা খুবই প্রকট| কিন্তু কপালকুণ্ডলা আমাদের বিস্মিত করে| এখানে তেমনটি ঘটেনি| তাই বলে অসাধারণ কোনো বাংলা উপন্যাস এর ভেতরে লেখা হয়নি, তা নয়| অনেকই হয়েছে| শরৎচন্দ্র তো এখনো সবার প্রিয়| এই এক লেখক, যিনি তাঁর কথার জাদুতে পাঠককে বশ করেন| একই লেখা যে কতবার পড়া, কেউ তার ইয়ত্তা রাখেন না| অন্যমনস্ক হয়ে এমনকি বিরূপ মন নিয়েও, কেউ হয়তো শুধু সময় কাটাবার জন্যে, হাতের কাছে পড়ে থাকা তাঁর কোনো বই তুলে নিই| তারপর আর ছাড়তে পারি না| কথার জাদু চুম্বুকের মতো টেনে রাখে| শেষ না করে ওঠা যায় না| তিনি নিজেও বোধহয় এটা বুঝতে পারতেন| তাই একে তিনি পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছেন| যে-কোনো পাঠককে এবং অবশ্যই পাঠিকাকে, বশে আনায় তাঁর জুড়ি ছিল না| এখনো কেউ আছেন বলে মনে হয় না| বই পড়ার অভ্যাস এমন তাঁদের সবার আছে, এটা কিন্তু ধরে নিই|
কিন্তু এতেই তিনি একটা বৃত্তে আটকে যান| বাঙালি পড়ুয়াদের সাধারণ মান তাঁর সময়ে কী ছিল? এখনই-বা কী? অবশ্যই তা বাড়েনি| এবং মোটামুটিভাবে বলা যায়, চিন্তায় আলস্য ও আবেগের প্রাবল্য তাতে বড় বেশি| তাঁরা স্বভাবগুণে শরৎচন্দ্রে আকৃষ্ট হন| শরৎচন্দ্রও তাঁদের ভালো লাগার প্রতি সুবিচার করায় সচেতন থাকেন| এখন যাকে সাধু-ভাষা বলি, তাঁর অধিকাংশ লেখা সেই ভাষায়| কিন্তু তা এমন সহজ ও সাবলীল যে, কোথাও চাপিয়ে দেওয়া মনে হয় না| কাহিনি তরতর করে এগোয়| যিনি পড়ছেন, তিনি কাহিনির ভাবনাতেই মশগুল থাকেন| নিজে কিছু ভাবেন না| তার প্রয়োজনও পড়ে না| শরৎচন্দ্রের রচনা তাঁর ভাবনার স্তরকে অতিক্রম করে না| তাতে যে আমরা সমৃদ্ধ হতে চাই, তা-ও না| তিনি আমাদের ¯^ল্পোন্নত, কিন্তু তীব্র অভাবতাড়িত নন, আটপৌরে জীবনে ওই বাস্তবতার সীমাতেই মায়া রচনা করে চলেন|
এদিক থেকে তাঁর পরের বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁদের সৃষ্টিতে জীবনকে অনেক গভীরভাবে ফুটিয়ে তোলেন| তিনজন তিনরকম| কিন্তু প্রত্যেকে নিজের ছাপ নির্ভুল রেখে যান| এবং আমাদের চেতনার সীমা আপন-আপন সৃষ্টিতে প্রসারিত করেন| আমরা ঋদ্ধ হই| বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালী-অপরাজিত, তারাশঙ্করের কবি, হাঁসুলি বাঁকের উপকথা এবং মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুতুলনাচের ইতিকথা ও পদ্মানদীর মাঝি যে-কোনো মানদণ্ডে সেরা সাহিত্যের পর্যায়ে| এরা আমার প্রিয়, একথা বলতে পেরে নিজেই কৃতার্থবোধ করি| সতীনাথ ভাদুড়ির ঢোঁড়াই চরিতমানস ও ˆসয়দ ওয়ালীউল্লাহর চাঁদের অমাবস্যাকেও উপেক্ষা করতে পারি না| তবে চাঁদের অমাবস্যা উৎকৃষ্ট কীর্তি হলেও, বোধহয়, ভাবনায় যথেষ্ট মৃত্তিকা-সংলগ্ন নয়|
ছোটগল্পও কথাসাহিত্যের ভেতরে পড়ে| গত শতকে বাংলা ছোটগল্পের খুব কদর ছিল| এখনো কি তা আছে? সে যাই হোক, অসংকোচে বলতে পারি, আমার পড়া সেরা ছোটগল্পের বই — এবং অবশ্যই প্রিয় — হাসান আজিজুল হকের আত্মজা ও একটি করবী গাছ| এই নামের গল্পটির খ্যাতি এখন বিশ্বজুড়ে| তবে আমার বেশি পছন্দ ‘আমৃত্যু-আজীবন’| ছোটগল্পের আবেদন যে মহাকাব্যিক হতে পারে, এবং একই সঙ্গে শিল্প-সার্থকতায় তা পূর্ণতা পায়, এ তারই অতিবিরল উদাহরণ| হাসান অসংখ্য অসামান্য সাহিত্যকীর্তির জন্ম দিয়েছেন — গল্পে, উপন্যাসে ও মননশীল রচনায়| তাদের সবার ভেতরে আমার কাছে সবার ওপরে এই ‘আমৃত্যু-আজীবন’| কপালকুণ্ডলা, আমার বিবেচনায়, যেমন চিরকালের সম্পদ, এ-ও তাই|
‘থামিল কালের চিরচঞ্চলগতি’ — নির্দ্বিধায় এদের নিয়ে বলা যায়| আরো একটি ছোটগল্পের বই, কমলকুমার মজুমদারের নিম অন্নপূর্ণা| প্রথম যখন এই গল্পটি পড়ি, তখন মনে হয়েছিল, মাথার ভেতরে বুঝি বিস্ফোরণ ঘটল| পড়ার পর রাতে ঘুম হয়নি| প্রতিটি গল্প এতে অসাধারণ| এ বই নিঃসন্দেহে আমার সেরা পছন্দের একটি| কমলকুমার তখনো বোধহয় প্রুস্তের অনুসরণে অবিচ্ছিন্ন চেতনা-স্রোতের আক্ষরিক রেকর্ড বাজাতে শুরু করেননি| গদ্যের নিজ¯^ চিত্রময়তা তাতে এতটুকু ম্লান হয়নি, বরং প্রখরতা পেয়ে তা স্থায়ী হয়েছে|
গদ্য-রচনায় স্মৃতিকথাও উপাদেয় হয়ে উঠতে পারে| অথবা জীবনীগ্রন্থ| কেইনসের Essays in Biography বা বার্ট্রান্ড রাসেলের The Antobiography সত্যিই অসাধারণ|
ছত্রে-ছত্রে মেধার দীপ্তি| মার্কেজের Living to tell the Tale তাঁর উপন্যাসের চেয়ে কম আকর্ষণীয় নয়| আমাদের হাসান আজিজুল হকের ফিরে যাই ফিরে আসিও ওই রকম| তপন রায় চৌধুরীর রোমন্থন বা ভীমরতি গ্রন্থের ‘পরচরিতচর্চা ও বাঙালনামা’ অনাবিল মুগ্ধতার রেশ রেখে যায়| আনিসুজ্জামানের আমার একাত্তর বুকে দাগ কাটে| বিপুলা পৃথিবী নির্মেদ গদ্যে মেধাবী কল¯^রে বহু বিদগ্ধ মানব-মানবীর বর্ণিল চিত্রশালা| এসবই আমার প্রিয়|
কবিতায় জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতার মতো এমন করে আর কোনো বই আমাকে টানে না| যতবার পড়ি, ততবার কিছু না কিছু নতুন ¯^াদ যোগ হয়| চিত্রমায়ার রং বদলায়| চিন্তা-কল্পনায় ব্যঞ্জনা ছড়ায় অনিঃশেষ| আমরা দেখি, সপ্তসিন্ধু-দশ দিগন্তের খোলা হাওয়া কী নিঃশব্দ ধ্যানে তিনি টেনে নেন নিজের ভেতরে| তারপর সৃষ্টিতে তাঁর ক্রমাগত ফুটে উঠতে থাকে অনন্য মহিমা| উঠতেই থাকে| বিস্ময়ে-বিস্ময়ে প্রাণ আমাদের জাগে|

চার
মননশীল গদ্যও ভাষার সামর্থ্য দেখায়| এখানে বঙ্কিম এখনো বাংলা ভাষায় রাজাধিরাজ| তাঁর লোকরহস্য, কমলাকান্ত, বিবিধ প্রবন্ধ, এদের তুল্য প্রবল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন যুক্তিগ্রাহ্য বিচার-বিশ্লেষণ পরে ক্রমশ খেই হারিয়ে ফেলে| ঝোঁকটা বেশি পড়ে গদ্যের কাব্যিক ভাষা-লালিত্যের দিকে| সেই অনুপাতে বাঙালি চেতনায় যুক্তিশৃঙ্খলা নির্মাণের প্রয়াস ও দার্ঢ্যরে বিকাশ ক্ষুণ্ন হয়| আরো একটা বিষয় এখানে কাজ করে| মননশীলতার অনুশীলন প্রধানত ঘটতে থাকে উচ্চতর বিদ্যায়তনসমূহকে কেন্দ্র করে| সেসব জায়গায় বিদ্যাবত্তায় ¯^ীকৃতি মেলা সহজ হয়, যদি বাইরে বিদ্বৎকুলের প্রাক-অনুমোদন তা পায়| বাইরে নিজের যোগ্যতা জাহির করতে হলে ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় ইংরেজি ভাষার ওপর নির্ভর করাই তুলনায় সহজ| যাঁরা মেধাবী, তাঁরা বেশিরভাগ এই পথেই যান| প্রতিভার বিকাশ তাঁদের ঘটে এই ভাষার মাধ্যমে| ওই প্রতিভা যোগ্য মর্যাদা পাক, সেটা আমরাও চাই| কিন্তু পরিণামে বাংলা ভাষায় বাঙালি মেধার বিকাশ-সাধনা, একটা শক্ত ভিত গড়া থাকলেও, সেদিকে অগ্রসর হয় না| আমরাও ব্যক্তিগতভাবে এবং সমষ্টিগতভাবেও, এইটি বাস্তব বলে মেনে নিই| বাঙালি মেধার চালিয়াতির পথও অবশ্য একটা খুলে যায়| এই পরিস্থিতিতে মননশীলতায় আমরা নিজেরাই বাংলা ভাষাকে দ্বিতীয় ভাষা, অথবা, অবসরের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করি| তা অগ্রাধিকার পায় কদাচিৎ|
এমন অবস্থায় আমার পড়া সেরা বইগুলোও পাই ইংরেজিতে| দুরূহ তাত্ত্বিক গবেষণায় বিশ্বখ্যাত হওয়ার পর অমর্ত্য সেন লেখেন পরপর The Argumentative Indian I Identity and Violence ও The Idea of Justice; আগে লিখেছেনOn Ethics and Economics| এদের প্রত্যেকটি নিয়ে আমরা গর্ব করতে পারি| তবে আমি সবার ওপরে রাখি The Argumentative Indiaকে| একই রকম পার্থ মিত্র (Partha Mitter) ভারতীয় চিত্রকলার ইতিহাসের ওপর দুটো অসাধারণ বই লিখেছেন, Art and Nationalism in colonial India, 1850-1922 I The Triumph of Modernism, India Artists and the Avanti grade, 1922-1947| দ্বিতীয় বইটি আমার বেশি পছন্দ| তিনি অবশ্য ভারতীয় চিত্রকলা ইতিহাসের ওপর আরো বই লিখেছেন| ছেলে রানা মিত্র (Rana Mitter) এখন অক&সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে চীনের ইতিহাসের ওপর সবচেয়ে খ্যাতিমান তরুণ অধ্যাপক| তাঁর লেখা, A Bitter Revolutions : China’s Struggle with the Modern World I China’s War with Japan 1937-1945, The Struggle for Survival দুটো বই-ই গোটা বিশ্বে আলোচনার ঝড় তুলেছে| রানার মা স্বস্তি মিত্র (Swasti Mitter) জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন| তাঁর লেখা Common Fate Common Bond : Women in the Global Economy, গত শতকেই বিশ্ববিদ্বৎসভায় সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল| এঁদের সবকটি বই আমার প্রিয়| সবাই এখন অক&সফোর্ডে|
আমি ইতিহাসের ছাত্র নই| অল্পস্বল্প যেটুকু পড়ার সুযোগ পেয়েছি, সবই ওপর-ওপর| তবু অল্পবয়সে যে পড়েছিলাম দয়ানন্দ দামোদর কোসাম্বিরAn Introduction to the study of Indian History তার ফলে যে উত্তেজনা ও শিহরণ, এখনো মনে পড়লে যেন ওই সময়ে ফিরে যাই| তাঁর অনেক সিদ্ধান্ত মোটা দাগে| ঘটনার পেছনে আরো অনেক বিষয় কাজ করে| তবু তিনি যে একটা বদ্ধ দরজা প্রবল আঘাতে খুলে দিয়েছিলেন, তাতে ভেতরে চোখ গলিয়ে ইতিহাস আমার কাছে অনেক বেশি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে| রমিলা থাপারের A History of India-1ও আমাকে মুগ্ধ করে, যেমন করে হব&সবোমের The Age of Revolution : Europe 1789-1848। তবে এই ধারায় তাঁর পরের দুটো বই, The Age of Capital ও The Age of Extremes আমাকে অতো টানে না| ইদানীং উত্তর-আধুনিকতার ছকে ফেলে আমাদের
কোনো-কোনো মাথা-ভারি চাঁই নতুন-নতুন জ্ঞান দিতে মুক্তকচ্ছ হয়ে নেমে পড়েছেন| যেমন নিম্নবর্গের ইতিহাস নির্মাণ| পরের মুখে ঝাল খাওয়া আমাদের বহুদিনের অভ্যাস| তাই বলে এত?
অন্য ভাষার সাহিত্য নিয়ে কথা বলার আমার কোনো এখতিয়ার নেই| শুধু ‘লাগল ভালো’, এটুকু বলা| উপন্যাস হিসেবে টলস্টয়ের ওয়ার অ্যান্ড পিস, ক্যামুর দ্য প্লেস ও মার্কেজের ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ারস অফ সলিচ্যুড যে পড়েছি তার স্মৃতি নানাভাবে নানা সময় আমার ভেতর জাগে| জানি, এতে নতুনত্ব নেই| হয়তো ক্লিশে| কিন্তু না বললে আমার তালিকা অসম্পূর্ণ থাকে| ক্যামুর কোনো ভানহীন মননশীল রচনা দ্য রেবেল ও দ্য মিথ অফ সিসিফাস আমার অসম্ভব-অসম্ভব প্রিয়|
কেউ বলতে পারেন, আমার পছন্দের কোনো মাথামুণ্ডু নেই| সুকুমার রায়ের ছড়া, ‘এই দুনিয়ায় সকল ভালো, আসল
ভালো-নকল ভালো’ — আমি বুঝি সেই-রকম বুলি আওড়াচ্ছি|
প্রিয়-অপ্রিয়র তফাৎ জানি না, হয়তো সেইটেই ঠিক| মনে পড়ছে, ছেলেবেলায় স্কুলে পড়ার সময় একবার আমাদের ভাব-সম্প্রসারণ করতে দেওয়া হয়েছিল — ‘দু-দেল& বান্দা কল&মা চোর, না পায় শ্মশান, না পায় গোর|’ এখন দেখি, আমার দিল& (দেল) দুই নয়, তার চেয়ে ঢের-ঢের বেশি| এতে লজ্জা-শরম নেই| দুঃখও নেই| শ্মশান বা গোর, কোনোটাই চাই না| মেডিক্যাল কলেজে শরীরটা যেমন খুশি কাটাছেঁড়া হোক, কংকাল নিয়ে যা খুশি তাই করুক, সেইটেই জীবিত আমার কাছে প্রার্থনার| প্রত্যক্ষে বহুর আকর্ষণ আমার যায় না|
অবশেষে একটা কথা কবুল করি| গোটা আলোচনায় রবীন্দ্রনাথকে আমি বাইরে রেখেছি| সমস্যা হলো, তাঁকে কোথায় আনব, কোথায় বাদ দেবো? চরণচিহ্ন তাঁর গোটা আকাশে| ‘গগন নহিলে তোমারে ভরিবে কেবা?’ — তাঁকেই বলি| ৎ