অন্তঃশূন্য

পুবের জোলায় টপাস টপাস করে লাটিম পড়ার শব্দ ছাড়া এই মুহূর্তে আর কিছু শুনছে না বাদল। ওর ঘাড়ের পেছনে বিশ্বনাথের ক্ষুর সেই যে নেমেছে আর নড়ার নামগন্ধ নেই যেন। মনে মনে খুব বিরক্তবোধ করলেও মুখে কিছুই বলে না কখনো সে। বিশ্বনাথের কাজের ধারাই যে এমন। তাছাড়া বাড়ি বয়ে এসে এখন আর কে চুল কেটে দেবে? বংশের শেষ নাপিতের খাতায় ওর নামটা লেখা হবে খুব সম্ভব। ছেলেরা কেউ এই পেশায় আসেনি। গত মাসে বাদল তার চোখ দেখিয়ে একটা ভালো চশমার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। কিন্তু তাতে একটুও ওর কাজের গতি বাড়েনি। ঘাড় নিচু ছিল বলে অনেকক্ষণ ধরে একটা কাকলাসকে মন দিয়ে দেখছিল বাদল। সামান্য দূরে দোপাটি ফুলের ঝোপে দুটো ফড়িং উঠি-নামি উঠি-নামি মতো খেলা খেলছিল, এদিকে গোবর ফেলানো ডালিতে কাকলাসটা ঘাপটি মেরে আছে। কিন্তু বাদলের মন বলছে, ফড়িংগুলো উড়ে যাক। অমনি কোথা থেকে মোরগের ধাওয়া খেয়ে বাসন্তী বেড়াল গিয়ে লুকালো ডালির তলায়। ওই শব্দটুকুই ফড়িংদের খেলা ভেঙে দিলো মুহূর্তে। কাকলাসটা এক লাফে মানকচুর শুকনো ডালে গিয়ে সটান হলো। এদিকে বাসন্তীর গো-গো শব্দে বিশ্বনাথের ক্ষুর অন্যমনস্ক হয়ে বাদলের ঘাড়ে হালকা হোঁচট খেল সম্ভবত। চিকন শব্দ বেরুলো তার গলা থেকে। কিন্তু বাদল তাকিয়ে ছিল কাকলাসটার চোখের দিকে, শিকার হাতছাড়া হওয়ার জন্য নিশ্চয়ই, না বাদলের মনের অভিসন্ধি টের পাওয়াতে, ব্যাটা বুঝি রক্তমস্তক।

চুল কাটার পয়সা নিতে নিতে বিশ্বনাথ পা দিয়ে ডালি তুলে বাসন্তীকে উদ্ধার করল। অবশ্য তার দরকার ছিল না, এ বেড়াল যেই সেই শেয়ানা নয়, পাড়ার মাস্তান একেবারে। খালি মাঝেসাঝে মোরগের তাড়া খেয়ে বেগতিক হয়ে দৌড় দেয়। বাড়ির বউ-ঝি কামলারা গেছে পাট শুকোতে তপনের খোলায়। টানা বৃষ্টিতে কদিন সব কেমন স্যাঁতসেঁতে হয়ে উঠেছিল। ওর গোসলের জল তুলে রেখে গেছে এনামের মা। তাতে একটা সেদ্ধ নিমের ডাল ফেলা। সারা কলতলায় লাটিম ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। গাছটা কাটি কাটি করেও কাটায় না ওর বাপ। অথচ মদ্দা তালগাছটা কাটালো জ্যৈষ্ঠ মাসে। এ-বাড়িতে বাদলের কথা কেউ শোনে না, মা ছাড়া। ওর ভালো-মন্দের ভাবনা এখন মায়ের হাতে। বাদলের ডান হাতটায় আগের মতো জোর নেই। তবু মা এ-তাবিজ সে-তাবিজ গুঁজেই যাচ্ছে কোমরের তাগায়। আজ বুঝি কোনো শাপ লেগেছে কপালে ওর। নাভির নিচেও কেটে গেল রেজার চালাতে গিয়ে। রক্তের রেখা মুছে নিল বাঁ-হাতের চেটোয়, মুখের ভেতরটায় বিষের স্রোত বয়ে গেল সহসা। কেউ বুঝি গলায় বালতিতে চুবিয়ে রাখা নিমের ডালটা গুঁজে দিচ্ছে প্রাণপণ! কোনোক্রমে গায়ে জল ঢেলে ঘরে এসে কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল বাদল।

কতক্ষণ ঘুমিয়েছে জানে না, মাগরিবের আজান ভেসে আসছে দক্ষিণপাড়া থেকে। গরুর দল এসে পড়েছে মাঠ থেকে, সব ঘরে বাতি দেওয়া হয়ে গেছে। এনামের মা রুস্তমকে ঘরে তুলেছে চু-চু শব্দ তোলে। সমস্ত শব্দ মন দিয়ে শোনে বাদল। ঘোড়াটা মুখ দিয়ে একটা আওয়াজ করল, তাতে এনামের মা কলকল করে উঠল, ‘দিন দিন তোমার আহ্লাদ বাইড়েই যাচ্ছে।’ বলে চটের পর্দাটা টান দিলো, ক’খানা কাচের চুড়ি রিমঝিম করে উঠল তাতে। আবেশে ঘোর চলে এলো বাদলের সদ্য পয়পরিষ্কার করা শরীরে। সামান্যতম শব্দ বাদলের ভালো লাগে।

রাতে সবার খাওয়া হয়ে গেলে মা আর ও খেতে বসলো। বাসন্তীর দিকে এঁটো ছুড়ে দিতে দিতে মা জানাল, ‘শুনছিস কাল থেকে এনামের মা আসবে না, ওর ভাশুরঝি আসবে। বাচ্চা খালাস-টালাস করে ঝরঝরা হয়ে কামে ঢুকবে। এ ক’মাস রুস্তমের চাড়িমাখা, ঘাসঘুস জলিল আর ওই মেয়েটা দেখবে।’ বাদল নীরবে ভাত খেতে খেতে শুনল সবিস্তারে। খাওয়ার পর তেল মালিশ করে দিলো ওর ডান হাতে মা।

– কাল একবার আব্বাস জ্যাঠার কাছে যা না বাপ। আসার পর তো একবার দ্যাখা করা দরকার। এই আট বছর দিন-রাত কত জায়গায় গেছি, সবাই মুখ অন্ধকার করে ফেলছে; কিন্তু আব্বাসভাই একমাত্র গলা নরম করে পরামর্শ দিছেন। আমি নরেশের বাড়ি থেকে ঘি আনায় রাখছি। কাল যা একবার।

– মা, আব্বা আসেনি বাড়ি?

– সে তো এতো তাড়াতাড়ি আসার মানুষ না, পাটের বোঝা তুলতে গেছে নৌকায়। হাট ধরতে হবে না সকালে! তুই ঘুমা বাপ।

দুই

উনিশশো চুরানব্বই সাল, হেমন্তের বিকেল। হাটুরেরা সব বোয়াল মাছ নিয়ে যাচ্ছে। বোয়ালের চওড়া মসৃণ পিঠে পড়ন্তবেলার কিরণ, নাইওরে আসা কিশোরী বধূর লাজুক হাসির মতো স্মিত খেলছিল সেই আলো। বাদল মাছের দামদর জিজ্ঞেস করল, কাউকে কাউকে বাহবাও দিলো ইয়া পেল্লায় মাছ কেনার জন্য। দামে জেতার জন্য প্রায় সবাইকে এক রায় দিলো। সেই রাতে ওদের বাড়িতেও বোয়াল মাছ রান্না হয়েছে। সবাই গোল হয়ে বসে গালগল্প করতে করতে হাত ধুয়ে বসেছে কেবল, বাড়ির কুকুর দুটো গলা ফুঁড়ে চেঁচামেচি শুরু করে দিলো। গাংপাড়ার নেয়ামতদের বাড়ির লোকজন এসেছে। শাহীনকে নাকি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না কাল থেকে। বাদলদের সঙ্গেই ক্যারম খেলে সে দোকান বন্ধ করে। বাদল সাফ জানাল, বুধবারের হাটে ছাড়া কথাই হয়নি আর। কে যেন বলে উঠল, বউয়ের বাচ্চা হবে শুনছিলাম, ও-বাড়ি যায়টায় নাই তো। সব খোঁজখবরই নিচ্ছি আমরা, দেখি বজলু কাকার বাড়ি গিয়ে একবার। খাওয়া-দাওয়া সেরে দাদির ঘরে এসে বাদল কোলপাঁজা করে মোতালো তাকে। কোমরে আঘাত পাওয়ায় হাঁটতে পারে না তেমন, তাছাড়া বেশ আছেন। ‘শোন, তুই একবার হুসেনদের বাড়ি যা তো’, প্রায় ফিসফিস করে বলল দাদি। ‘বউ পোয়াতি হলে ব্যাটাছেলেরা এখানে-সেখানে রাত কাটায় বুঝলি। তোর দাদাও নিখোঁজ হতো।’ বাইরে এসে ভাবতে লাগলো, দাদি কী করে এতো খবর রাখে। সারাদিন ঘরে শুয়ে পুরো গাঁয়ের নাড়ি বুঝতে পারে বুড়ি!

হুসেনদের বাড়ি খবর যে পৌঁছে গেছে, সেটা বাদল জানে। শাহিদার স্বামী লিবিয়া গেছে আজ প্রায় ছয় বছর। সেই থেকে বাপের বাড়ি সে। ওদের বাড়ির পাশেই খলিফাবাড়ি। সেখানেই ক্যারম খেলে বাদলদের গ্রুপটা। পরপর দুবার ডিগ্রি পরীক্ষায় ফেল করেছে ও আর মমিন। মমিন লিবিয়া যাওয়ার জন্য শাহিদার কাছে ধরনা দিতে দিতে এক প্রকার সম্পর্ক স্থাপন করে ফেলেছে। এদিকে শাহিদার খালাত ভাই শাহীন ওদের যাওয়া-আসা খুব একটা ভালো নজরে দেখে না। ক্যারম খেলার সময় প্রায়ই ঝগড়াঝাটি লেগে যায় ওদের। শাহিদা উঠোন লেপে, গোবরমাখা হাতে শাড়ি ঠিক করে। তাই দেখে দেখে মমিন শালা প্রেমে পড়ল। বাদলের বাবা এ-গ্রামের দু-দফার চেয়ারম্যান, পয়সার বিচারে ওরা সাত গাঁয়ের এক মাথা। আর শাহিদা কি না মমিনের মতো হ্যাংলায় মজে গেল?

ক্যারম যে ওরা শখে খেলে তা নয়, ফাঁক পেলেই ব্যাপারটা জুয়ায় গড়ায়। বেশ চলছিল, কিন্তু বাদ সাধে শাহিনের অতি খবরদারি। এই নিয়ে তলে তলে ফুঁসছিল আসলে বাদলদের দল। পরের হাটেই বাদল নৌকা ভাড়া করে বড় ক্যারম আনাল শহর থেকে। তারপর মধুর দোকানের পাশে হিজলতলায় ছাউনি তুলে খেলার জায়গা করল। সেখানে বেশ জমে উঠেছিল। পাড়ার ছেলে-বুড়ো সবাই জড়ো হয়ে খেলতে লাগল। কিন্তু মমিন আর আগের মতো খেলায় মন দিতে পারছিল না। আজ হারে, কাল হারে। একদিন ঝুম বৃষ্টি, খেলা শেষ। মমিনের জুয়ার পয়সা আজকাল বাদল পরিশোধ করে। খুব যে স্বেচ্ছায় করে তা নয়। সে নাকি লিবিয়া গিয়ে সব বাকি মিটিয়ে
 দেবে – সেই ভরসায়।

কিন্তু সেদিন আচমকা মমিন জানায়, শাহিদার সঙ্গে নাকি ওর খালাত ভাইয়ের সম্পর্ক চলছে। বাদল কথাটায় এতো মনোযোগ দেয়নি। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে বাড়ি এলো সে-রাতে। পরদিন সকালে মমিন এসে টেনে তুলল ওকে। মুখে বেশ একটা মারধরের ছাপ। কথা না বাড়িয়ে সোজা চালের মিলে চলে এলো ওরা। সবকিছু শুনে বাদল সিদ্ধান্ত নিল, শাহিদার সঙ্গে আগে বোঝাপাড়া করতে হবে। এতদিন মমিনকে নাচিয়ে এখন শাহিনকে কোলে তোলা হয়েছে! তাহলে বাদলকে কী চোখেই দেখে না সে?

মমিন গতরাতে আচ্ছা ধোলাই খেয়েছে শাহিনের হাতে। শুধু মমিন না, এখন নাকি ওদের দলের সবকটাকে পেটাবে বাগে পেলে। কথার গুরুত্ব বাদলের কাছে অনেক। একটা রোগাপটকা কালো লোকের আছেটা কী, যে ওদের সবাইকে ধরে মুগুরপেটা করবে। বাদলের রক্ত উনুনে চড়ল যেন। মিলের চৌকির তলা থেকে বাঁশ বের করল একঝটকায়। শালার আজ একদিন কি কাল একদিন। মমিন এতো মার খেয়েছে কিন্তু বোঝা যাচ্ছে না তেমন। সে শান্ত স্বরে বলল, ‘এভাবে না, শালার শায়েস্তা অন্যভাবে করবো। তার আগে টাউনে চল। জিনিসপাতি না এনে জবাব দেওয়া যাবে না।’

তিন

রুস্তম বেশ নাদুস-নুদুস হয়েছে খেয়েদেয়ে। অঘ্রান মাসে ধান তোলার পর ঘোড়ার দৌড়ের প্রতিযোগিতা হয় পাশের গাঁয়ে। অনেক জেলা থেকেই খেলতে আসে মানুষ। বাদল একটু একটু করে নিজেকে এবং সেই সঙ্গে রুস্তমকে প্রস্তুত করছে খেলায় অংশ নেওয়ার জন্য। কিন্তু ওর ডান হাতটাই যত সমস্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

মায়ের কথা রাখতে আজ আব্বাস জ্যাঠার কাছে এসেছে বাদল। আট বছরে অনেক কিছু পালটে গেছে। গ্রামের সেই নিঝুম নিঝুম দুপুর যেন আর নেই। সবকিছুতে আলগা একটা শব্দ লাগছে কানে। বাড়িঘর বেড়ে বেড়ে অনেক পাড়ার চেহারা অচেনা হয়ে গেছে। তাছাড়া একটু ঘুরে ঘুরে দেখবে যে, তেমন অবস্থা তো নেই! জ্যাঠা অজু করছিলেন উঠোনে, বাদলকে ইশারায় বসতে বললেন। এ-বাড়িতেও কুকুর আছে বেশ কয়েকটা। বাদলের কাছে এসে কুই কুই খানিকটা করল। নামাজ শেষে জ্যাঠা ঘরে ডাকল ওকে।

 সঙ্গে আনা ঘিয়ের বয়ামটা টেবিলে রেখে, পা ছুঁয়ে সালাম করল জ্যাঠার। তিনি মুখে কিছুই বললেন না। লম্বা একটা ফুঁ দিয়ে হাসিমুখে বেশ উষ্ণ গলায় ওকে সাদর সম্ভাষণ জানালেন। বালিশের তলা থেকে একটা কাগজ বের করে বাদলের হাতে দিয়ে বললেন,

– খুব ভালো ডাক্তার। এখনো সময় আছে, খুব বেশি হলে তিন মাসেই তোমার হাত ঠিক হয়ে যাবে। শোনো তোমার মা খালি খালি চিন্তা করে। বেশি চিন্তা করতে বারণ করো।

– কিন্তু আপনি নিজে না দেখে ডাক্তারের কাছে পাঠাচ্ছেন কেন জ্যাঠা?

– আরে এটা ঝাড়-ফুঁকের কাজ না, ডাক্তারি বিদ্যার কাজ। আমি তো ফুঁ দিয়েই দিলাম। বালা যিনি দেন তিনিই মুসিবত দূর করেন, মালিকের ওপর বিশ্বাস হারাচ্ছে বলেই না মানুষ এখন চারদিকে ছোটাছুটি করে। 

– আচ্ছা জ্যাঠা আপনি কি সবার মতো খুনি মনে করেন আমাকে?

জ্যাঠা মুখে কিছুই বললেন না। শিশুর মতো চোখ-মুখ করে অবুঝের হাসি হাসলেন।

– আট বছর তুমি ছিলে তো জেলে, কিন্তু তোমার বাড়ির লোকজন কিন্তু শান্তিতে ছিল না। শেষবেলায় চাঁদবিবি ডেকে পাঠান আমাকে। শোনো, দাদির কথাগুলো রেখো। মায়ের মুখের হাসিটা দেখেছ একবার! বাহিরের লোকে কে কী বলছে সেসবে আর কান দিও না।

– আপনি একবার বলেন জ্যাঠা, সবার মতো দরজায় খিল দিচ্ছেন না কেন?

– ওরে পাগল, তোর নিজেকে প্রশ্ন কর, এখন তুই স্বাধীন। পূর্বে কি ছিলি না ছিলি সেসব দেখার আমি কে? আমার দ্বার সবার জন্য খোলা। জীবন তোকে একটা মুহূর্তে ধাক্কা দিয়ে ফেলেছিল হয়তো, এখন তো সাজা শেষ। আর কী!

বাদল বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে ছিল দীর্ঘ সময়। আর একটি কথাও হলো না ওদের। সূর্য অস্তগামী, মাঠের তলদেশ আগুনরাঙা।

বলতে গেলে বাদলদের বাড়ি প্রায় জনশূন্য। খুব দরকার না হলে কেউ আসে না এদিকে। চেয়ারম্যানের বাড়ির বদলে লোকে খুনির বাড়ি বলে ডাকে নাকি আড়ালে। তবু পুরনো লোকেরা আসে, গল্পগুজব করে চলে যায়। জেল থেকে ছাড়া পেয়েছে মাস পাঁচেক, অথচ বাদলের কাছে স্বাধীনতা বলতে কিছু নেই। নদীর ঘাটে যেতে পারে না, হাটে যেতে পারে না। সবার সঙ্গে বসে মন খুলে কথাও বলতে পারে না। সবার ভেতরে ওর যে পরিচয় গেড়ে বসেছে তাতে করে বাদল নিজেকে নতুন কোন পরিচয়ে দাঁড় করাবে?

রুস্তমকে নিয়েই ওর সারাদিন কাটে। বাবার সঙ্গে দেখা হয় না বলতে গেলে। নতুন মেয়েটা রুস্তমের ঘর পরিষ্কার করছিল। ভঙ্গিটা দেখে শাহিদার কথা মনে পড়ে গেল বাদলের। চোখ সরিয়ে নিল। কিন্তু ওকে দেখে মেয়েটির চোখেমুখে সেই অজানা আশঙ্কা খেলা করছে না। মেয়েটি সাবলীল গতিতে তার কাজ করে চলেছে। যেন বাদল বলে কোনো মানুষ বারান্দায় বসে নেই। বাদল ইচ্ছে করে চুক চুক করে বাসন্তীকে ডাকল। পশম চাটছিল বেড়ালটা। একলাফে ওর কোলে চেপে বসলো। বাদল যেন মেয়েটিকে শুনিয়ে শুনিয়ে বাসন্তীর সঙ্গে কোমল আলাপ জুড়ে দিলো। আদরে বাসন্তী সাড়া দিলো। গরগর আওয়াজে মুখ গুঁজে দিলো কোলের উষ্ণ অঞ্চলে।

দেখতে দেখতে অঘ্রান মাস এসে পড়লো গাঁয়ে। উঠান-বাড়ি, মাঠ-ঘাট ধান তোলার জন্য প্রস্তুত হতে লাগল পাড়ায় পাড়ায়। বাড়িতে লোক বলতে বাদল আর মেয়েটি। এনামের মায়ের আত্মীয়া বলেই বেশ সহজ হয়ে উঠেছে ওদের বাড়িতে সে। লম্বায় বাদলের সমান প্রায়। মুখের আদলে একটা কঠিন ভাব ফুটে থাকে সারাক্ষণ। তাই নাকি বিয়ে ভেঙে যায় তার। কিন্তু মেয়েটি কথা বলে যখন, খুব মিষ্টি শোনায় গলা। বাদল সারাদিন কান পেতে থাকে তার কথা শোনার জন্য। তবে বেশিরভাগ কথা রুস্তমের সঙ্গেই হয়। নয়তো মায়ের সঙ্গে। বাদলের ডান হাতটা সেরে এসেছে প্রায়। তবে এখনো আগের বল ফিরে পায়নি। আজকাল অল্প অল্প বের হয়। দু-একজন কথাও বলে। বাদলের একটাই আক্ষেপ, মেয়েটি তেমন একটা কথা বলে না ওর সঙ্গে। অনেক ভেবে আজ ও সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, কথা বলবে তার সঙ্গে। দুপুরে খাওয়ার পর ইচ্ছে করে জগের পানি ফেলে দিলো বাদল। গলায় সামান্য নকল বিরক্তি এনে ডাকল,

– জলি! এই জলি!

– কাকা ডাকছেন? গলায় সুষমা তার, কপালে মৃদু ঘাম।

বাদল আকাশ থেকে পড়ল, কাকা! মেয়েটি ওকে কাকা ডাকছে কেন? ও অনেক বয়স্ক লোক হয়ে গেছে নাকি!

‘পানি নাই’, বলল শুধু। এক দৌড়ে মেয়েটি পানি নিয়ে এলো। মাটির মেঝে ততক্ষণে শুষে নিয়েছে পড়া জল।

– আমাকে ভয় লাগে না তোমার? আচমকা বলেই বসল বাদল।

– এ আল্লাহ! ভয় লাগবে কেন?

– তুমি শোনোনি আমি জেলে ছিলাম।

– কাকির কাছে শুনছি, কিন্তু সবাই তো বলে মমিন কাকা নাকি আপনাকে ফাঁসায় বিদেশ পালায় গেছে।

– ও, তুমি আগে দেখেছ আমাকে?

– হ্যাঁ, দেখছি তো, ছোট থাকতে স্কুলে যাওয়ার সময়। আপনারা মধুর দোকানে ক্যারম খেলতেন।

– তুমি কোন ক্লাস পর্যন্ত পড়েছ?

– ক্লাস সেভেন। আব্বা অ্যাক্সিডেন্ট করার পরে আর যাইনি। বলেই জলি জড়োসরো হয়ে নিজেকে গুটিয়ে চলে গেল।

বাদলের মনের ভেতর আজ বেশ খুশির আমেজ। নদীর জোয়ারের মতো দেহে কী একটা সুখের প্রবাহ বয়ে গেল যেন। আট-নয় বছরে এই প্রথম খুব ইচ্ছে করছে, ছটফটিয়ে ইচ্ছে করছে, কাউকে জড়িয়ে চুমোয় চুমোয় ভিজিয়ে তুলতে। কিন্তু কাকে?

চার

বসুদের পরিত্যক্ত ভিটেয় প্রায়ই আড্ডা বসাত বাদলের চেয়ে বড় ভাইদের একটা গ্রুপ। তবে তারা সব শহরে পড়তে যাওয়ার দল। ছুটিছাটায় এসে সামান্য ফুর্তি করত বড়দের আড়ালে। পুরো ভিটেজুড়ে তালের গাছ আর ছাতিমের জটলা। শুধু একটা চালা ঘর আর তার চারদিকে হাতিশুঁড়ের ঝোপঝাড় ভিটেটাকে আঁকড়ে আছে। না, হলো না। চালার একটু দূরেই তুলসীগাছের বাঁধানো ঢিবি আছে, তবে গাছটা মরে গেছে। কিছু রাত থাকে অভিশপ্ত, ঠিক সেরকম রাতেই মমিনকে ভূতে ধরার মতো স্থির করাল, শাহিনকে যে করেই হোক দুনিয়া থেকে সরাতে হবে। কাজটা অতি জেদে হলো নাকি অতি ক্ষোভে – ভেবে পায় না বাদল। মমিনের পরিকল্পনা অনুযায়ী শাহিনের দুনিয়ায় থাকা হলো না আর। তবে বাদল জেলে থাকা অবস্থায় সারা দিন-রাত ভেবে মরতো মমিন কতটা বোকা বানিয়েছে ওদের। বিদেশে যাওয়ার সব রাস্তা গুছিয়ে তবেই খেলায় নেমেছিল সে। মাঝখান থেকে বাদল, রুবেল আর সজিব জেল খেটে মরেছে। বাকিদের কথা জানে না বাদল; কিন্তু নিজের বাবার মুখের দিকে সারাজীবন তাকাতে পারবে না।

রুস্তম এবারের খেলায় হেরে গেছে। কিন্তু মাঠের জৌলুস বলতে রুস্তম একাই ছিল। খামতিটা ট্রেনিং আর বাদলের অন্যমনস্কতায় যে ছিল সবাই বুঝেছে সেটা। সারাক্ষণ লোকের চিন্তায় ও যেন নিজেকে মেলে ধরতে পারছিল না ঠিকমতো। রুস্তম মনিবের মনের দুর্বলতা টের পেয়ে গিয়েছিল, তাই সেও অনেকটা ঘাবড়ে ছিল। অবলা জন্তু সে হার-জিত বোঝে না। কিন্তু বাদলের ডান বাহুতে ঠিক আদুরে জিভ ছোঁয়াল রুস্তম।

কিন্তু খেলা যেমনই হোক, বাড়ি ফেরার পর মা ফুরফুরে মেজাজে কথা বলছিল। অনেকদিন পর ওর বড় বোন বাপের বাড়িতে পা রেখেছে। সবাই ভেবেছিল রুস্তম জিতে আসবে। হাঁড়িভর্তি খিচুড়ি রান্না হয়েছে, পাড়ার লোকজনও এসেছে বেশ। কিন্তু রুস্তম হারলেও নাম করেছে তার রূপের, তার লেজের ঝিলমিলে চুলের চমকে।

পরদিন বাদলের বাবা এক লোক ডাকালেন বাড়িতে, লোকটির কাজ ঘোড়াটিকে দৌড়ের জন্য পর্যাপ্ত ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা। খাটো গাট্টাগোট্টা ধরনের বেশ চটপটে লোক সে। নাম আমির হামজা।

দিন যায়, মাস যায়। খা-খা মাঠঘাট। চৈত্র মাসের রোদের হলকায় বাড়ির কুকুরগুলো জিভ বের করে লালা ফেলছে। জলির বদলে এনামের মা কাজে যোগ দিয়েছে বাড়িতে। বাদলের মনের ভেতর চৈত্র মাসের চাইতেও অধিক খা-খা। জলির নীরব উপস্থিতি ওর বুকের ভেতর যে শান্ত জলাধারের প্রবাহ বইয়ে দেয়, সেটিতে ভাটা পড়তে দেওয়া যাবে না কিছুতে। তাই ও ফন্দি আঁটল একটা। রুস্তমের মন ভালো নেই বলে সুরটা তুলল প্রথমে। কিন্তু মা এর মাথামুণ্ডু কিছু বুঝল না। পরবর্তী ধাপে অবশ্য রুস্তমের ঘর অপরিচ্ছন্ন বলে একটা মিথ্যা চাপিয়ে দিলো এনামের মায়ের ঘাড়ে। তাতে যে কাজ হয়ে যাবে বোঝেনি বাদল। কিন্তু পরদিনই জলি এসে কাজে লেগে গেল। কী লাবণ্য সে-মুখে! সবার অলক্ষে বাদল চেয়ে চেয়ে দেখে। পরে অবশ্য জানতে পারে, জলির কাজটা থাকা বেশ দরকার। এমন যুবতী মেয়ে কার বাড়ি দেবে কাজে। তার চেয়ে এই বাড়িটা সুবিধার। কাকির সঙ্গে
 আসবে-যাবে ব্যস।

জলি আজকাল চোখ তুলে তাকায় বাদলের দিকে। বাদল সামান্য ভরসা করে। খরার দিনে কলস কলস পানি লাগে। সব এখন জলির হাতে। মা কদিন হলো কোমরে চোট পেয়েছে। আব্বাস জ্যাঠার কাছে ঝাড়-ফুঁ নিতে গেছে এনামের মায়ের সঙ্গে। পুরো বাড়ি বলতে গেলে ফাঁকা। বাদল এখন ডান হাত দিয়ে কল চেপে জল তুলতে পারে। কিন্তু জলি মানা শুনবে না। বালতি ভরে জল তুলে দিলো ও। বাদল সেই পানি গায়ে ঢালতেই সহসা পূর্ণ হয়ে উঠল যেন। ভীষণ আবেগে মনের সব খিড়কি খুলে গেল ওর। মনের যাবতীয় ক্লেশ ধুয়েমুছে নিচ্ছে এই বালতিভর্তি পানি। কোনোদিন শোনেনি মমিন, শাহিনদের নাম। শাহিদা বলে সেই ঢলোঢলো চোখের মেয়েটিকেও চেনে না। ও শুধু জলি নামে এক আশ্চর্য কোঁকড়া চুলের মেয়েকে জানে। ঝড়ের বেগে যে মেয়ে বালতি বালতি জল তুলতে সক্ষম। যার কথায় উল্কা ছোটে, রক্তে বিদ্যুৎ খেলে – সে আওয়াজ শুনে। মরূদ্যান হয়ে ওঠে চারদিক। সবুজ চকচকে সব।

পাঁচ

নব্বইয়ের দশক সমাপ্ত হলো। বাদলের বাপ বাড়িতে বিদ্যুৎ আনল অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে। রুস্তমের লোকপ্রিয়তা বেড়ে আজ আকাশচুম্বী। লোকে হাটে এলেও এক পাক দেখে যায় ঘোড়াটাকে। খবর এসেছে আব্বাস জ্যাঠা রোগশয্যায়। বাদল দোয়া নিতে এসেছে তার কাছে। শরীরটা মিশে আছে বিছানার সঙ্গে; কিন্তু তার মুখের হাসি আজো শিশুর মতো দীপ্তমান। হাতটা বাদল ধরতেই বলে উঠলেন,

– রুস্তম জিতে গেলে আর খেলাবি না বুঝলি। জানিস আমার বাপের পেশা কী ছিল? এক জমিদারবাড়ির লাঠিয়াল। কত লোকের রক্ত যে তার লাঠিতে!

অঘ্রান মাস এবার বেশ তাড়াতাড়ি এলো। রুস্তমকে মাঠে নামানোর জন্য যথেষ্ট প্রস্তুত করেছে আমির হামজা। দিন ঘনিয়ে আসছে যত, বাদল তত চিন্তিত হয়ে পড়ছে। এবার যদি হেরে যায় রুস্তম! কিন্তু আব্বাস জ্যাঠার কথার সুরে জেতার আভাস ছিল সেদিন। সাহসে বুক ফুলিয়ে রুস্তমকে গোসল করাল আজ। চোখ দুটিতে দ্যুতি ছিটকে বেরুচ্ছে, ঘাড়ের চুলগুলোয় সামান্য হাত বুলিয়ে কপালে চুমু খেল বাদল। বাড়ির সবাই একে একে চুমু খেল। বাদল ঘোড়ার পিঠে চাপতেই মা জলিকে ডাক দিলো। জলিও রুস্তমের গায়ে হাত বুলিয়ে চুমু খেল। বাদলের সারা শরীরে শিহরণ বয়ে গেল পলকে। জলির দিকে তাকিয়ে সামান্য হাসার চেষ্টা করল।

হাজার তিনেক লোক জড়ো হয়েছে ঘোড়দৌড় খেলার মাঠ ঘিরে। বাদলের চোখ ধাঁধিয়ে এলো, পলক ফেলা যাচ্ছে না এতো আলো, এতো রং চারদিকে। আমির হামজা কী একটা কানে কানে বলল রুস্তমের, খেলা শুরুর আগে। সামনের ডান পা-টা সামান্য উঁচু হলো ওর, মাটিতে ধুলো উড়ল। এরপর বাদলের শুধু জনতার উল্লাস মনে আছে। কানে হাজার কণ্ঠের স্রোত, তাতে ভেসে আসছে রুস্তম, রুস্তম নামের ধ্বনি। এরপর অনেক বিকেলের জন্ম হলো, যেন মুহূর্তে ঘুমন্ত ঘুঙুর নেচে উঠেছে বাদলের আশপাশে। পড়ন্ত বিকেলের অনিন্দ্য আলোয় রুস্তম বিজয়ের মালা গলায় জড়িয়ে বাড়ি ফিরল। কলস কলস দুধে বাদল আর রুস্তমকে ধুয়েমুছে বাড়ি তোলা হলো। তখন সবাই আমির হামজার খোঁজ করছিল; কিন্তু না, কোথাও সে নেই।

পাড়ার সবার জন্য ধুমধাম করে রান্না হচ্ছে পরদিন। বাড়িভর্তি লোক গমগম করছে। রুস্তমের নাম-যশে যার অবদান সেই লোককে পাওয়া যাচ্ছে না দেখে কেমন একটা ভৌতিক গলায় বাদলের মা কাকে যেন বলছে, ‘যা তো বসুর ভিটায় একবার!’ যেন ওখানেই হারানো মানুষ পাওয়া যায়।

বাদলের চোখ অবশ্য জলিকে চাইছিল। গতকালের সেই চুমু এখনো ওর বুক আবেশে ভরে রেখেছে। জলিদের বাড়ি যাবে একবার ভাবছে। রক্তের কাকা তো নয় সে। তাছাড়া এখন লোকের মুখে মুখে ওদের বাড়ির সুনাম। মানুষ পুরনো দিনের কথা ভুলতে বসেছে। জলিরও দেখা নেই সকাল থেকে। এনামের মা – সে-ও আসেনি আজ। বাড়িভর্তি রান্নার লোক ছোটাছুটি করছে। খাওয়ার পর্ব শেষ হতে হতে বিকেল গড়িয়ে গেল। রুস্তম আজ পূর্ণ বিশ্রামে। শুধু বাদল বারবার এদিক-সেদিক করছে। মাকে এক ফাঁকে জিজ্ঞেস করেই বসল জলি ও এনামের মায়ের কথা। মা অদ্ভুত স্বরে গলা নামিয়ে জানাল, ‘জলি পালিয়েছে।’

– মানে? কোথায়? বাদল মূর্ছা যাওয়ার দশায়।

– আর বলিস না, মেয়েটার কী দোষ, বিয়ের বয়স হয়ে গেছে। তাছাড়া আমির হামজার বউ মরে গেছে। ভালোই হয়েছে একদিক থেকে। কিন্তু পালানোর কী ছিল, সেটা বুঝলাম না।

বলেই মা চলে গেল। বাদলের উদাস দৃষ্টি। শূন্য অথচ রক্তিম সে-দৃষ্টি। রুস্তমের পশমের চাইতেও লালচে রক্তচক্ষুর বাদলকে দেখে কে বলবে সে বিজেতা। তার এই সংসার, আদরের ঘোড়া ফেলে রেখে দূরে যেতে ইচ্ছে হলো। হয়তো সে এখানে নেই। শরীর কাঠামোর মধ্যে যে বাদল বসে আছে তাকে কেউ আর দেখতে পাচ্ছে না।